শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত দেশে প্রথম রেল লাইন চালু হয় ১৮৬২ সালে। বাংলাদেশের সর্বপ্রথম রেলওয়ে স্টেশন জগতি রেলওয়ে ষ্টেশন। পুরাতন স্টেশন হিসাবে উন্নয়নের ছোয়া লাগেনি এ স্টেশনের। সংস্কার না থাকায় এ স্টেশনের পুরাতন বিল্ডিংগুলো ধ্বসে ধ্বসে পড়ছে। সরকারীজায়গাগুলোও বেহাত হতে বসেছে।
সূত্রমতে, জগতি রেল স্টেশনটি ১৮৬২ সালে স্থাপিত হয়। ১৮৬২ সালে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে চালু করে শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট পর্যন্ত রেললাইন। সেটি বাড়িয়ে আনা হয় আজকের কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত। ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর, ঐতিহাসিক সেই দিনে আজকের বাংলাদেশের মাটিতে ঢুকে পড়ে প্রথম রেলগাড়ি। কলকাতার শিয়ালদহ থেকে ছুটে আসা ট্রেনের গন্তব্য ছিল কুষ্টিয়ার ‘জগতি রেলস্টেশন’। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় তৎকালীন বাংলাদেশ ভূখণ্ডে রেলের যাত্রা। যা পরে যোগাযোগব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। তাই বলা হয়—কুষ্টিয়ার জগতি রেল স্টেশন বাংলাদেশের প্রথম রেল স্টেশন।
সেই সময়ে রেলের ইঞ্জিন চলত কয়লা পুড়িয়ে। ধোঁয়ার কুণ্ডলি পাকিয়ে হুইসেল দিতে দিতে ট্রেন ঢুকত স্টেশনে। ব্রিটিশরা জগতিতে তৈরি করেছিল লাল ইটের দোতলা স্টেশন ভবন, ওয়েটিং রুম, পানির ট্যাংক, টিকিট ঘর, সিগন্যাল ল্যাম্প।
ওই সময় প্রথম স্টেশন হওয়ার জন্য এখানেই সকল লোকজনের উঠা নামার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত ছিল। লোক সমাগমের কারণেই জগতি বাণিজ্যিকভাবে আমদানী রপ্তানীর কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়। স্টেশনটি ইঞ্জিলের জ্বালানির উপর নির্ভরশীল ছিল। স্টেশনের দুইপাশে দুটি বড় ইন্দারা আজও আছে। লোকজনের ভীড় সামাল দিতে এক সময়ে এখানে ২৬জন রেলওয়ে কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগ ছিল। এখন সেখানে মাত্র ৩জন রয়েছে। লোকবলের অভাবে এখন স্টেশনের কার্যক্রমও ভেঙে পড়েছে। যাত্রীরা বিভিন্নভাবে হয়রানী শিকার হচ্ছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় স্টেশনের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেছে। ট্রেনের যাত্রীরা সুযোগ সুবিধা না পাওয়ায় এ ষ্টেশনে আর কেউ যায় না বললেই চলে। স্টেশনটির সংস্কার জরুরী।
এখন জগতি স্টেশন যেন পড়ে আছে ইতিহাসের খাতার বাতিল পৃষ্ঠা হয়ে। চারপাশে নিঃশব্দ, প্ল্যাটফর্ম ভাঙা, ভবনে ফাটল। আর আসবাবপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ভগ্নপ্রায় সেই স্টেশন ভবনে। কুলির হাঁকডাকও নেই। নেই ট্রেনের হুইসেল। রাত নামলেই যেন এক ভুতুড়ে জায়গা।
এই রেলপথের সুফল হিসেবে ১৯০৮ সালে কুষ্টিয়ায় গড়ে ওঠে তখনকার এশিয়ার সবচেয়ে বড় টেক্সটাইল মিল- মোহিনী মিল। ট্রেন ছাড়া এত বড় মিলের কাঁচামাল আনা বা পণ্য পাঠানো সম্ভবই হতো না। পাকিস্তান আমলেও কুষ্টিয়ায় তৈরি হয় চিনিকল। যেখানে আখ পৌঁছাত এই রেলপথ দিয়েই।
যাতায়াতের জন্য রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও অযত্ন অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কুষ্টিয়া-ভেড়ামারা রায়টা ঘাট রেল লাইন। সংস্কারের অভাবে স্টেশনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
অপরদিকে পুরাতন লাইন রায়টা। ব্রিটিশ শাসনামলে এ লাইন নির্মিত হয়। ১৯১৬ সালে এ লাইন স্থাপন করা হয়। রায়টা-দামুকদিয়া থেকে ছেড়ে আসা ট্রেন রায়টা ট্রেন নামেই নামকরণও হয়। তিন দশক আগেও এ লাইনটি বেশ জম-জমাট ছিল। কিন্তু লোকসান দেখিয়ে ওই রেল লাইনটি বন্ধ করে দেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এ লাইন বন্ধ হওয়ায় এলাকার জনসাধারণের জীব-যাত্রার মান অনেকটাই থমকে গেছে।
উনবিংশ শতাব্দিতে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন রেল কোম্পানি ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে ছোট ছোট রেলপথ সেকশন চালু করতে থাকে। প্রথমদিকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কাজের জন্য রেলপথ চালু করা হয়। ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে নামক কোম্পানি প্রথম বাংলাদেশে রেলপথ স্থাপন করে।
ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি কোলকাতা থেকে রানাঘাট পর্যন্ত ব্রডগেজ (৫ ফুট ৬ ইঞ্চি) রেলপথ সেকশনটিকে ১৮৬২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর এবং রানাঘাট থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেলপথ সেকশনটিকে ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর চালু করে। গোয়ালন্দ পর্যন্ত সেকশনটি চালু হয় ১৮৭১ সালের ১ জানুয়ারি। ১৮৭৪ থেকে ১৮৭৯ সালে দুর্ভিক্ষ মোকাবেলার জন্য সাড়া থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত সেকশনটি নর্দান বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে মিটারগেজে (৩ ফুট ৩.৩৮ ইঞ্চি) চালু করে। পার্বতীপুর থেকে দিনাজপুর এবং পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত মিটারগেজ সেকশনটিও এই কোম্পানি চালু করে। ১৮৮৪ সালের ১ জুলাই ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলে আসে এবং ১ এপ্রিল ১৮৮৭ সালে তা নর্দান বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ের সাথে একীভূত হয়।
১৯১৫ সালের ১ জানুয়ারি, হার্ডিঞ্জ ব্রিজসহ ভেড়ামারা শাকোলে সেকশন চালু হয়। ১৯১৪ সালে শাকোলে থেকে সান্তাহার পর্যন্ত মিটারগেজ সেকশনটিকে ব্রডগেজে রূপান্তরিত করা হয় এবং ১৯২৪ সালে সান্তাহার থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত প্রায় ৯৬ কিলোমিটার সেকশনটিকে মিটরগেজ থেকে ব্রডগেজে রূপান্তরিত করা হয়। ১৯২৬ সালে পার্বতীপুর থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত প্রায় ১৩৭ কিলোমিটার মিটারগেজ সেকশনটিকে ব্রডগেজে রূপান্তরিত করা হয়।
১৯১৬ সালে ভেড়ামারা রায়টা ব্রডগেজ সেকশনটি চালু করা হয়। ১৯২৮–২৯ সালে তিস্তা হতে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত ন্যারোগেজ সেকশনটিকে মিটারগেজে রূপান্তর করা হয়। ১৯৩০ সালে আব্দুলপুর–আমনুরা ব্রডগেজ সেকশনটি চালু করা হয়। বাহাদুরাবাদ–জামালপুর টাউন মিটারগেজ সেকশনটি চালু হয় ১৯৪১ সালে।
১৮৯৭ সালে দর্শনা পোড়াদহ সেকশনটি সিঙ্গেল লাইন থেকে ডাবল লাইনে উন্নীত করা হয়। পর্যায়ক্রমে ১৯০৯ সালে পোড়াদহ ভেড়ামারা, ১৯১৫ সালে ভেড়ামারা ঈশ্বরদী এবং ১৯৩২ সালে ঈশ্বরদী আব্দুলপুর সেকশনগুলোকে ডাবল লাইনে উন্নীত করা হয়। সংস্কারের অভাবে এসব লাইনের বেহাল দশা।
দেখা যায়, জগতি রেল স্টেশনটি যেন এক ভুতের আড্ডা। স্টেশন মাস্টার তো দূরের কথা সেখানে গার্ড কিংবা টিকিট কাউন্টারও নেই। নেই যাত্রীদের বসার কোনো স্থান। প্ল্যাটফর্মে জন্মেছে গাছ ও লতাপাতা। অফিস রুমে নেই কোনো জানালা, দরজা থাকলেও তালা দেওয়া। রয়েছে ট্রেনের সিডিউল বোর্ড যা সর্বশেষ ২০০৯ সালের। দ্বিতল ভবনের অফিসের ছাদ থেকে কংক্রিটের সঙ্গে খসে পড়েছে লোহাও। দেয়ালের চারিদিকে ধরেছে ফাটল। কক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে সূর্যের আলো। প্রথমতলায় প্রায় সব কিছু লুটপাট হয়েছে। দ্বিতীয়তলার জানালা থেকে বের হওয়া বটগাছ ও আগাছাগুলো বলে দেয় এর অবহেলার চিত্র। একসময় বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের পানি নেওয়ার জন্য জগতির যে দীঘি ও পানির ট্যাংক ব্যবহার হতো সেই দীঘি ও ট্যাংকগুলোর অবস্থা আরও নাজুক।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ ভগ্নপ্রায় ‘জগতি রেলস্টেশন’-এর লাল ইটের তৈরি দ্বিতল ভবনটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লাল ইটের দালান এখন মলিন। আশপাশ শ্যাওলা, ময়লা জীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ভবনে ফাটল ধরায় উপরতলাতে কেউ যায়নি বহু বছর। অনেক দিন আগে যাত্রীদের সুবিধার জন্য তৈরি করা ওয়েটিং রুমও ভেঙে গেছে। প্ল্যাটফর্মের ইটও ভেঙে গেছে। ক্ষয়ে গেছে গাঁথুনিও। কক্ষের ভেতরের যন্ত্রাংশ সবই বিকল। এগুলোর কোনো ব্যবহার ও সংস্কার কিছুই নেই।
ব্রিটিশরা ওই সময় সরকারি স্থাপনাগুলোতে লাল রং ব্যবহার করত। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ব্রিটিশরা চলে গেছে বহু আগে, পাকিস্তানিরাও। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের সময়েও এ রঙের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ব্রিটিশ আমলে তৈরি এমন অনেক ভবন বাংলাদেশ-ভারতে দেখা যায় যেগুলোতে আজও লাল রং বিদ্যমান।
পরে ঢাকার সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর করতে ১৮৭১ সালের ১ জানুয়ারি জগতি স্টেশন থেকে বর্তমান রাজবাড়ী জেলার পদ্মা তীরবর্তী গোয়ালন্দঘাট পর্যন্ত রেললাইন চালু হয়।
দেশের রেললাইনের উন্নয়ন নেই জগতি রেলওয়ে স্টেশনের। তাই পূরাতন ঐতিহ্যবাহী এ রেল স্টেশন উন্নয়নের জোরদাবী জানিয়েছেন যাত্রী ও এলাকার সুশীল সমাজ।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
