ফিচার

Feature / ফিচার

  • ইতিহাসে ঐতিহ্যে বাংলাদেশের পাঁচটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ

    ইতিহাসে ঐতিহ্যে বাংলাদেশের পাঁচটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ

    বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মসজিদ। এমনকি রাজধানী ঢাকাকে বলা হয় ‘মসজিদের নগরী’। দেশের প্রতিটি প্রান্তে আজানের সুমধুর ধ্বনিতে একদিকে যেমন সকাল শুরু হয়, অন্যদিকে তেমনি সন্ধ্যাও নামে মুয়াজ্জিনের আহ্বানে।

    এসব মসজিদের কোনোটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দী, আবার কোনোটি আধুনিক স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলীতে মুগ্ধ করছে অসংখ্য দর্শনার্থীকে। বিশাল গম্বুজ, সুউচ্চ মিনার, কারুকার্যময় দেয়াল কিংবা বিস্তৃত প্রাঙ্গণ—প্রতিটি স্থাপনার সৌন্দর্যের ধরন আলাদা।

    বাংলাদেশের মসজিদ স্থাপত্যে যেমন সুলতানি আমলের ঐতিহ্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে আধুনিক নির্মাণশৈলীর বৈচিত্র্য। সেই বৈচিত্র্যের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হলো দেশের পাঁচটি বৃহৎ ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। চলুন, জেনে নেওয়া যাক এসব মসজিদের ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী ও বিশেষত্ব।

    ১. বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, ঢাকা

    বায়তুল মোকাররম মসজিদের পূর্ব ফটক ও মিনার
    বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পূর্ব ফটক ও মিনার, ঢাকা। ছবি: T. Galib, উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

    ঢাকার ব্যস্ত কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা বায়তুল মোকাররম শুধু বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদই নয়, স্থাপত্যের দিক থেকেও এটি বেশ স্বতন্ত্র। শহরের ব্যস্ততার মধ্যে এর বিশাল ঘনকাকার অবয়ব সহজেই চোখে পড়ে। প্রচলিত মসজিদের নকশা থেকে কিছুটা ভিন্ন এই স্থাপনাটি দেশের আধুনিক মসজিদ স্থাপত্যের অন্যতম পরিচিত নিদর্শন।

    মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি। এর নকশা করেন স্থপতি টি. আবদুল হুসেন থারিয়ানি। নির্মাণকাজ শুরুর প্রায় তিন বছর পর, ১৯৬৩ সালের ২৫ জানুয়ারি শুক্রবার, এখানে প্রথম জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

    বায়তুল মোকাররমের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক এর ঘনকাকার নকশা, যা পবিত্র কাবা শরিফের স্থাপত্যরীতির কথা মনে করিয়ে দেয়। আটতলা এই মসজিদের মূল নামাজকক্ষের ছাদে প্রচলিত গম্বুজ নেই। মসজিদের এই ব্যতিক্রমী নকশা ও সংযত অলংকরণই একে দেশের অনেক পরিচিত মসজিদ থেকে আলাদা করেছে।

    বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বায়তুল মোকাররমে একসঙ্গে প্রায় ৪০ হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। বিশাল ধারণক্ষমতা, স্বতন্ত্র স্থাপত্য এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান—সব মিলিয়ে মসজিদটি বাংলাদেশের ধর্মীয় ও স্থাপত্য ঐতিহ্যে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।

    ২. ২০১ গম্বুজ মসজিদ, টাঙ্গাইল

    কেন্দ্রীয় গম্বুজ ঘিরে ২০১ গম্বুজ মসজিদের ছোট গম্বুজের সারি
    ওপর থেকে টাঙ্গাইলের ২০১ গম্বুজ মসজিদ। ছবি: Md shahanshah bappy, উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

    টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে ঝিনাই নদীর তীরে অবস্থিত ২০১ গম্বুজ মসজিদ। ব্যতিক্রমী নির্মাণশৈলী, অসংখ্য গম্বুজ ও সুউচ্চ মিনারের কারণে মসজিদটি ইতোমধ্যে দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে।

    ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় ১৫ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই মসজিদ কমপ্লেক্সের প্রধান আকর্ষণ এর ২০১টি গম্বুজ। এর মধ্যে রয়েছে একটি বড় কেন্দ্রীয় গম্বুজ, যেটিকে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে ২০০টি ছোট গম্বুজ। গম্বুজগুলোর পাশাপাশি মসজিদের চারপাশে থাকা মিনারগুলোও এর স্থাপত্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

    মসজিদটির সবচেয়ে আলোচিত স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর ৪৫১ ফুট উচ্চতার মিনার। ২০১৯ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে এটিকে বিশ্বের অন্যতম উঁচু কংক্রিটের মিনার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। বিশাল গম্বুজের বিন্যাস ও সুউচ্চ মিনারের সমন্বয়ে মসজিদটি বাংলাদেশের আধুনিক ইসলামি স্থাপত্যের একটি ব্যতিক্রমী নিদর্শন হয়ে উঠেছে। ২০১৯ সালে আরব নিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে সময় মসজিদটিতে একসঙ্গে ১৫ হাজারের বেশি মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা ছিল।

    ৩. বাইতুল আমান জামে মসজিদ (গুঠিয়া মসজিদ), বরিশাল

    গুঠিয়া মসজিদ, মিনার ও চারপাশের বাগান
    ওপর থেকে বরিশালের গুঠিয়া মসজিদ কমপ্লেক্স। ছবি: Azim Khan Ronnie, উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

    বরিশালের উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়নের চাংগুরিয়া গ্রামে অবস্থিত বাইতুল আমান জামে মসজিদ, যা স্থানীয়ভাবে গুঠিয়া মসজিদ নামেই বেশি পরিচিত। সাদা রঙের বিশাল মসজিদ ভবন, সুউচ্চ মিনার, পুকুর ও ফুলের বাগান—সব মিলিয়ে পুরো কমপ্লেক্সটি দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে।

    ২০০৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর মসজিদ ও ঈদগাহ কমপ্লেক্সটির নির্মাণকাজ শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দা এস. সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু। প্রায় ১৪ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০০৬ সালে। নির্মাণকাজের তত্ত্বাবধানে ছিলেন তাঁর ছোট ভাই মো. আমিনুল ইসলাম নিপু।

    মসজিদটির স্থাপত্যে রয়েছে ২০টি গম্বুজ এবং প্রায় ১৯৩ ফুট উঁচু একটি মিনার। এর নকশায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মসজিদের স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব রয়েছে। তবে গুঠিয়া মসজিদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও চোখে পড়ার মতো। ভেতরের দেয়ালে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের ক্যালিগ্রাফি, রঙিন কাচ, মার্বেল পাথর ও সিরামিকের কাজ মসজিদের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে।

    মসজিদের মূল প্রবেশপথের পাশে রয়েছে একটি বড় পুকুর। পুকুরের পানিতে মসজিদের প্রতিবিম্ব দেখা যায়, যা পুরো স্থাপনাটিকে অন্য রকম সৌন্দর্য দেয়। চারপাশে ফুলের বাগান, পাকা হাঁটার পথ এবং প্রবেশপথের দুটি ফোয়ারা রয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জায় মসজিদ ও এর আশপাশের পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়।

    মসজিদটির পাশেই রয়েছে ২০ হাজারের বেশি মানুষের ধারণক্ষমতার একটি ঈদগাহ মাঠ। এ ছাড়া কমপ্লেক্সে রয়েছে এতিমখানা, হাফেজি মাদ্রাসা, কবরস্থান ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। ধর্মীয় উপাসনালয়ের পাশাপাশি স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই কমপ্লেক্স বরিশালের অন্যতম পরিচিত দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

    ৪. ষাট গম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট

    ষাট গম্বুজ মসজিদের লাল ইটের দেয়াল ও গম্বুজের সারি
    বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ। ছবি: Belayet, উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

    বাগেরহাটের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে ষাট গম্বুজ মসজিদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পঞ্চদশ শতকে নির্মিত এই মসজিদ বাংলার সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম নিদর্শন। বিশাল ইটের ভবন, পুরু দেয়াল, খিলান ও সারিবদ্ধ পাথরের স্তম্ভ মসজিদটির স্থাপত্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

    মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৪৪২ সালে এবং ১৪৫৯ সালে তা সম্পন্ন হয় বলে বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। খান জাহান আলীর উদ্যোগে নির্মিত এই স্থাপনা একসময় শুধু নামাজের স্থান হিসেবেই নয়, মাদ্রাসা ও সভাকক্ষ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। এর নির্মাণশৈলীতে মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্যদক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।

    নাম ষাট গম্বুজ হলেও মসজিদটির ছাদে রয়েছে ৭৭টি গম্বুজ। এর মধ্যে ৭০টি অর্ধগোলাকার এবং মাঝের সারিতে রয়েছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী চৌচালা ঘরের ছাদের আদলে তৈরি সাতটি গম্বুজ। চার কোণের মিনার বা বুরুজের ওপর থাকা আরও চারটি গম্বুজ যুক্ত করলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৮১টি। অন্যদিকে, মসজিদের ভেতরে উত্তর থেকে দক্ষিণে ছয় সারিতে ১০টি করে মোট ৬০টি পাথরের স্তম্ভ রয়েছে। এই স্তম্ভগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে মসজিদের বিশাল ছাদ ও গম্বুজের কাঠামো।

    মসজিদের লাল ইটের দেয়াল, খিলান এবং পোড়ামাটির অলংকরণ এর সৌন্দর্যকে আরও স্বতন্ত্র করে তুলেছে। বিশাল প্রার্থনাকক্ষের ভেতরে সারিবদ্ধ স্তম্ভ ও খিলানের বিন্যাস স্থাপনাটির নির্মাণকৌশলের পরিচয় বহন করে।

    বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদ নগরী ১৯৮৫ সালে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই ঐতিহাসিক নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ষাট গম্বুজ মসজিদ। ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণকৌশলের সমন্বয়ে এটি বাংলাদেশের মধ্যযুগীয় ইসলামি ঐতিহ্যের এক মূল্যবান নিদর্শন।

    ৫. পাগলা বড় জামে মসজিদ, সুনামগঞ্জ

    মোগল প্রাসাদের আদলে নির্মিত পাগলা বড় জামে মসজিদের সম্মুখভাগ
    সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে পাগলা বড় জামে মসজিদ। ছবি: স্বরুপ চক্রবর্তী, উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

    সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামে মহাসিং নদীর তীরে অবস্থিত পাগলা বড় জামে মসজিদ। স্থানীয়ভাবে এটি রায়পুর বড় জামে মসজিদ নামেও পরিচিত। মোগল প্রাসাদের আদলে নির্মিত দ্বিতল এই মসজিদটি এর ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলী ও কারুকাজের জন্য পরিচিত।

    স্থানীয় ব্যবসায়ী ইয়াসিন মির্জা ভারতের কলকাতাসহ বিভিন্ন জায়গা ভ্রমণের সময় সেখানকার স্থাপত্যশৈলী দেখে নিজ গ্রামে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। মসজিদটির প্রধান স্থপতি ছিলেন মুমিন আস্তাগার। নির্মাণকাজ শেষ করতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগে। স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়াসিন মির্জার ভাই ইউসুফ মির্জাও মসজিদটি নির্মাণে যুক্ত ছিলেন।

    মসজিদটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এর তিনটি বড় গম্বুজ ও ছয়টি সুউচ্চ মিনার। দ্বিতল ভবনটির বাইরের নকশায় যেমন মোগল প্রাসাদের স্থাপত্যের ছাপ রয়েছে, তেমনি ভেতরেও রয়েছে নানা ধরনের কারুকাজ। মসজিদের মেঝেতে ব্যবহার করা হয়েছে সাদা ও কালো পাথর। পাথরখচিত মেহরাব, নকশা করা প্রবেশপথ এবং দেয়ালের অলংকরণ এর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে।

    নির্মাণশৈলীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, মসজিদটির মূল কাঠামো ইটের গাঁথুনির ওপর নির্মিত; এতে প্রচলিত রডের ব্যবহার করা হয়নি। নিচতলার ছাদ নির্মাণেও ব্যবহার করা হয়েছে রেললাইনের স্লিপার। মসজিদের উত্তর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মহাসিং নদী। নদীর তীরঘেঁষা অবস্থান, সামনের ঈদগাহ মাঠ এবং চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ পুরো স্থাপনাটিকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য।

    বাংলাদেশের মসজিদ স্থাপত্যের সৌন্দর্য কেবল বিশাল গম্বুজ কিংবা সুউচ্চ মিনারে সীমাবদ্ধ নয়। কোথাও শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস ও সুলতানি আমলের নির্মাণশৈলী, কোথাও আধুনিক স্থাপত্যের বৈচিত্র্য, আবার কোথাও বিস্তৃত প্রাঙ্গণ ও নান্দনিক নকশায় ফুটে উঠেছে এই স্থাপত্যের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

    আলোচিত পাঁচটি মসজিদ বাংলাদেশের সেই বৈচিত্র্যময় স্থাপত্যঐতিহ্যেরই কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি এসব স্থাপনা দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে এসব মসজিদের স্থাপত্যসৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব ধরে রাখতে প্রয়োজন যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ।

  • শীতে বাড়তে পারে  শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি

    শীতে বাড়তে পারে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি

    শীতের আগমনে প্রকৃতিতে পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের শরীরেও নানা ধরনের স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিতে পারে। তাপমাত্রা কমে যাওয়া, বাতাসের আর্দ্রতা হ্রাস, ধুলাবালু ও বায়ুদূষণ এবং শ্বাসতন্ত্রের জীবাণুর সংক্রমণের কারণে এ সময়ে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

    সর্দি-কাশি ও গলাব্যথা : বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণে এসব সমস্যা হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির কণা এবং দূষিত হাতের সংস্পর্শে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি, নাক বন্ধ থাকা, গলাব্যথা, কাশি, মাথাব্যথা ও কখনো জ্বরের মতো লক্ষণ দেখা যেতে পারে। এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে সাধারণ সর্দি, ভাইরাসজনিত গলাব্যথা, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ। এর পাশাপাশি কানের সংক্রমণ, সাইনাসের প্রদাহ, হাঁপানির অবনতি এবং কিছু ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া হতে পারে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, পানি ও উপযুক্ত তরল পান করুন। কুসুম গরম পানি গ্রহণ করতে পারেন। নাক বন্ধ থাকলে জীবাণুমুক্ত স্যালাইন ব্যবহার করা যায়। এক বছরের বেশি বয়সিদের কাশিতে সামান্য মধু উপকার দিতে পারে; তবে এক বছরের কম বয়সি শিশুকে মধু দেওয়া যাবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করবেন না।

    হাঁপানি ও শ্বাসকষ্ট : ঠান্ডা বাতাস, ধুলাবালু, ধোঁয়া, অ্যালার্জি এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ হাঁপানির উপসর্গ বাড়াতে পারে। শ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতো শব্দ, বুক চেপে আসা, কাশি ও শ্বাস নিতে অসুবিধা হতে পারে। এসব উপসর্গ হাঁপানি, দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং সংক্রমণজনিত শ্বাসকষ্টের কারণে দেখা দিতে পারে। গুরুতর শ্বাসকষ্ট, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া এবং হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

    ধোঁয়া ও ধুলাবালু এড়িয়ে চলুন, ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করুন এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত ইনহেলার ব্যবহার করুন। গরম পানির পাত্র থেকে বাষ্প নেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। তীব্র শ্বাসকষ্ট হলে ঘরোয়া চিকিৎসার অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নিন।

    চুলকানি ও ঠোঁট ফাটা : বাতাসের আর্দ্রতা কমে যাওয়া, অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল, কড়া সাবান এবং ত্বকের যথাযথ পরিচর্যার অভাবে চুলকানি ও ঠোঁট ফাটা হতে পারে। ত্বক খসখসে হওয়া, চুলকানি, লালচে দাগ, ঠোঁট ফেটে যাওয়া ও ত্বকে ছোট ফাটল তৈরি হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়। অতিরিক্ত চুলকানোর কারণে ক্ষত ও জীবাণুর সংক্রমণের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। কুসুম গরম পানিতে অল্প সময় গোসল করুন। গোসলের পরপরই সুগন্ধিবিহীন ময়েশ্চারাইজার লাগান। ঠোঁটে পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করতে পারেন। ত্বক আঁচড়ানো থেকে বিরত থাকুন। ক্ষতস্থানে পুঁজ, তীব্র লালভাব বা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

  • ৫১টি সুপারিশের মাত্র একটি গ্রহণ করেছে সরকার: স্থানীয় সরকার সংস্কার নিয়ে অধ্যাপক ফেরদৌস আরফিনা ওসমান

    ৫১টি সুপারিশের মাত্র একটি গ্রহণ করেছে সরকার: স্থানীয় সরকার সংস্কার নিয়ে অধ্যাপক ফেরদৌস আরফিনা ওসমান

    স্থানীয় সরকার সংস্কার নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফেরদৌস আরফিনা ওসমান কথা বলেছেন বিডি গ্লোবাল টাইমসের সঙ্গে।

    প্রশ্ন ১. আপনি স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন, যা ২০২৫ সালের এপ্রিলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। পেছনে তাকালে কমিশনের কোন সুপারিশগুলো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর কোনগুলো গ্রহণ করা হয়েছে বলে মনে হয়?

    উত্তর: বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ২০২৫ ছিল স্থানীয় সরকার সংস্কারের সুপারিশ করার জন্য গঠিত অষ্টম জাতীয় পর্যায়ের কমিশন। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারকে একটি শক্তিশালী, স্বশাসিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ সুপারিশ করা ছিল কমিশনের দায়িত্ব।

    বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল, আগে গঠিত কমিশনের সুপারিশ, সাত বিভাগে অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং ৬৪ জেলার ৪৬ হাজার ৮০ জন মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে কমিশন স্থানীয় সরকার সংস্কারে ৫১টি মূল সুপারিশ দেয়। এখন পর্যন্ত বর্তমান সরকার এর মধ্যে মাত্র একটি সুপারিশ গ্রহণ করেছে।

    স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের (২০২৫) অন্যতম মূল সুপারিশ ছিল দলনিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার নির্বাচন ফিরিয়ে আনা, যা ২০১৫ সালের আগে প্রচলিত ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৫ সালে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করে দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচন চালু করে, ফলে প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ পান। এই বিধান স্থানীয় নির্বাচনকে চরম সহিংস করে তোলে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব দুর্বল করে, সামাজিক বন্ধন নষ্ট করে এবং স্থানীয় শাসনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। একটি স্বাগত জানানোর মতো অগ্রগতি হলো, ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল বর্তমান সংসদ প্রচলিত আইন থেকে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধান বাতিল করেছে। এই সিদ্ধান্ত শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক স্থানীয় নির্বাচনের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

    তবে কমিশনের বহু সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী ও আরও কার্যকর করতে তিনটি বড় ক্ষেত্রের সুপারিশ জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা উচিত। সেগুলো হলো:

    কাঠামোগত সংস্কার:

    বর্তমান স্থানীয় সরকারব্যবস্থা খণ্ডিত, কাঠামোগতভাবে অসংগতিপূর্ণ এবং এর সমন্বয় দুর্বল। শহর ও গ্রাম মিলিয়ে এতে পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের তিন স্তরে তিনটি প্রতিষ্ঠান: জেলা পর্যায়ে জেলা পরিষদ, উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে দুটি স্থানীয় সংস্থা রয়েছে: বড় শহরে সিটি করপোরেশন এবং ছোট শহরে পৌরসভা।

    গ্রাম পর্যায়ে শুধু ইউনিয়ন পরিষদেই সরাসরি নির্বাচন হয়। উপজেলা পরিষদে আংশিক সরাসরি পদ্ধতি চালু আছে: শুধু চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা স্থানীয় জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন, আর উপজেলার ভেতরের নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করেন, যদিও এর পরিচালনায় তাঁদের সরাসরি ম্যান্ডেট নেই। জেলা পরিষদ গঠিত হয় পরোক্ষ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়। জেলার ভেতরের নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা এর সদস্য হিসেবে কাজ করেন, অথচ জেলা পরিষদের ওপর তাঁদের সরাসরি প্রতিনিধিত্বমূলক ম্যান্ডেট নেই। এই ব্যবস্থা কাঠামো ও জবাবদিহিতে ফাঁক তৈরি করে, যা জেলা পরিষদের কার্যকর কাজে বাধা দেয়। অন্যদিকে শহর পর্যায়ে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা দুটিই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সংস্থা।

    কমিশনের সুপারিশ হলো, পাঁচটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানেরই (জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন) একই নকশার কাঠামো থাকা উচিত, বিশেষ করে প্রতিটি স্তরে যৌক্তিক ওয়ার্ডব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন, যাতে সবগুলো একইভাবে কাজ করতে পারে।

    এর পাশাপাশি কমিশন সুপারিশ করেছে, দক্ষভাবে কাজ করার জন্য গ্রাম ও শহরের পাঁচটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানেই একই সাংগঠনিক কাঠামো থাকা উচিত। জাতীয় পর্যায়ের সংসদীয় সরকারব্যবস্থার আদলে কমিশন প্রস্তাব করেছে, প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দুটি আলাদা অংশ থাকবে: আইনসভা অংশ ও নির্বাহী অংশ। আইনসভা অংশে থাকবেন চেয়ারম্যান (গ্রামীণ স্থানীয় সংস্থার প্রধান) বা মেয়র (শহুরে স্থানীয় সংস্থার প্রধান) এবং স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ সব নির্বাচিত সদস্য। অন্যদিকে নির্বাহী অংশে থাকবেন চেয়ারম্যান এবং পাঁচ থেকে ছয়জন পূর্ণকালীন সদস্যের একটি নির্বাহী পরিষদ, যাঁরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন প্রশাসনের দায়িত্বে থাকবেন। নির্বাচিত সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিষদের সদস্যদের নির্বাচন করবেন। গ্রাম ও শহরের স্থানীয় শাসনের জন্য একই ধরনের সাংবিধানিক কাঠামো ভারতে ১৯৯২ সালে সংবিধানের ৭৩তম ও ৭৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে চালু হয়, যা ১৯৯৩ সালে কার্যকর হয়।

    এই ব্যবস্থা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান বা মেয়রের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাতে সাহায্য করবে এবং নির্বাচিত সদস্যদের কর্তৃত্ব প্রয়োগের সুযোগ দেবে। এটি ক্ষমতার ভাগাভাগি বাড়াবে, গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী করবে এবং স্থানীয় শাসনে জবাবদিহি বাড়াবে।

    নির্বাচনী সংস্কার:

    বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারের জরুরি একটি সংস্কার হলো নির্বাচনী সংস্কার, যা আগে বলা কাঠামোগত সংস্কারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভিন্ন আইন ও পদ্ধতিতে হয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান করতে প্রথমেই প্রতিটি স্তরে জনসংখ্যার আকার অনুযায়ী যৌক্তিকসংখ্যক ওয়ার্ড থাকা উচিত।

    বর্তমানে বাংলাদেশের ইউনিয়ন পরিষদগুলোর আয়তন ও জনসংখ্যায় বড় পার্থক্য রয়েছে। কিছু ইউনিয়ন বড়, কিছু তুলনামূলক ছোট; আয়তন প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটার থেকে ১ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত। যেমন, সব ইউনিয়ন পরিষদে ৯টি ওয়ার্ড থাকলেও ইউনিয়নের জনসংখ্যা ৪ হাজার থেকে ৪ লাখ পর্যন্ত। এত বড় পার্থক্য সত্ত্বেও সব ইউনিয়ন পরিষদ নয়টি ওয়ার্ডে ভাগ করা, ফলে সম্পদের বণ্টন অসম এবং প্রায়ই অদক্ষ হয়। কমিশন প্রস্তাব করেছে, একেকটি ইউনিয়নে ৯ থেকে ৩৯টি ওয়ার্ড থাকতে পারে, প্রতিটি ওয়ার্ডে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ জন মানুষ।

    অন্যদিকে উপজেলা ও জেলা পরিষদে কোনো ওয়ার্ড নেই। ইউনিয়ন পরিষদের মতো উপজেলা ও জেলা পরিষদকেও স্পষ্টভাবে নির্ধারিত নির্বাচনী ওয়ার্ডে পুনর্গঠন করা যায়। যেমন, উপজেলা পরিষদের ভেতরে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদকে তিনটি ওয়ার্ড হিসেবে ধরা যায়; তাহলে পাঁচ ইউনিয়নের একটি উপজেলায় মোট ১৫টি নির্বাচনী ওয়ার্ড হবে। একইভাবে জেলা পরিষদের ভেতরে প্রতিটি উপজেলাকে তিন থেকে পাঁচটি ওয়ার্ড হিসেবে ধরা যায়। এই ওয়ার্ডগুলো শুধু নির্বাচনের উদ্দেশ্যে তৈরি হবে, যাতে প্রতিনিধিত্ব শক্তিশালী হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি বাড়ে।

    জাতীয় পর্যায়ে প্রচলিত সংসদীয় সরকারব্যবস্থার সঙ্গে মিল রেখে কমিশন চেয়ারম্যান (গ্রামীণ স্থানীয় সংস্থার নেতা) বা মেয়রের (শহুরে স্থানীয় সংস্থার নেতা) সরাসরি নির্বাচনের বিধান বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছে। এর বদলে সদস্য (গ্রামীণ স্থানীয় সংস্থা) বা কাউন্সিলররা (শহুরে স্থানীয় সংস্থা) জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন এবং পরে নিজেদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচন করবেন। কমিশন দেখেছে, বর্তমান ব্যবস্থায় চেয়ারম্যান বা মেয়রের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো “এক ব্যক্তির শাসনে” পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্বাচিত সদস্যদের অর্থবহ ভূমিকা প্রায় থাকে না বা একেবারেই থাকে না। ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে কমিশন এই ব্যবস্থার সুপারিশ করেছে, যার মাধ্যমে কর্তৃত্বের ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

    আইনি সংস্কার:

    পাঁচটি স্থানীয় সংস্থা একই সময়ে গঠিত না হওয়ায় বর্তমানে স্থানীয় সরকার চলে পাঁচটি আলাদা আইন ও শত শত বিধিমালার অধীনে। এর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে জারি করা বিপুলসংখ্যক পরিপত্র ও গেজেট রয়েছে। আইন ও বিধির এই আধিক্য স্থানীয় সরকারের কাজে বিভ্রান্তি ও দ্বৈততা তৈরি করে, যার ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি হয়, স্থানীয় সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয় এবং সবচেয়ে বড় কথা, স্থানীয় পর্যায়ে সেবা প্রদান ব্যাহত হয়। তা ছাড়া নির্বাহী আদেশে সময়ে সময়ে গেজেট ও পরিপত্র জারির বিদ্যমান বিধান রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।

    শওকত আলী কমিশন ২০০৮-এর সুপারিশ অনুসরণ করে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ২০২৫ও স্থানীয় সংস্থাগুলোকে দক্ষভাবে পরিচালনার জন্য একটি ছাতা আইনের সুপারিশ করেছে। কমিশন গ্রাম ও শহরের স্থানীয় সংস্থার জন্য দুটি আলাদা ছাতা আইনের পরামর্শ দিয়েছে।

    প্রশ্ন ২. ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভাগুলো মূলত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বদলে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকেরা চালাচ্ছেন। সেবা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে এর অর্থ কী দাঁড়িয়েছে?

    উত্তর: প্রশাসকেরা স্থানীয় সংস্থার ব্যবস্থাপনা হাতে নিলে কার্যত তাঁরাই হয়ে ওঠেন “স্থানীয় কর্তৃপক্ষ”, যাঁরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মতো একইভাবে সেবা দিতে কম সক্ষম হতে পারেন। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর অনেক নির্বাচিত স্থানীয় সরকার নেতা পদ শূন্য রেখে পালিয়ে যান। সেসব স্থানীয় সরকার সংস্থার কাজ চালু রাখতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসক নিয়োগ দেয়।

    স্থানীয় সংস্থায় নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকেরা সাধারণত শুধু রুটিন কাজ করেন এবং স্থানীয় চাহিদার প্রতি সীমিত সাড়া দিয়ে সেবা দেন। অন্যদিকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে জবাবদিহি করেন, তাই কার্যকরভাবে সেবা দেওয়ার জন্য তাঁদের তাগিদ বেশি থাকে। তা ছাড়া এলাকার মানুষ প্রশাসকদের চেয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বেশি কাছের মনে করেন। এই দ্বিমুখী সম্পর্ক সেবা প্রদানে সাড়া ও জবাবদিহি শক্তিশালী করে। প্রশাসকেরা নেতৃত্বে থাকলে স্থানীয় সংস্থাগুলোতে এটির অভাব থাকে।

    প্রশ্ন ৩. নির্বাচন কমিশন নভেম্বরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা স্থগিত করেছে এবং এখন আগামী বছরের প্রথমার্ধে, ৬ জুনের আগে শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছে। কী হলে স্থানীয় নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হবে, আর তা দলীয় প্রতীকে হওয়া উচিত নাকি প্রতীক ছাড়া?

    উত্তর: হ্যাঁ, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং আমরা আশাবাদী যে তা বিশ্বাসযোগ্য হবে।

    এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই নির্বাচন কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য স্থানীয় নির্বাচন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। তা ছাড়া স্থানীয় সরকার কমিশন ২০২৫-এর সুপারিশ অনুযায়ী দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় নির্বাচন করার সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নির্বাচনী সহিংসতা কমাতে এবং অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি সরকার স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বিবেচনা করতে পারে, যাতে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

    প্রশ্ন ৪. কমিশন সুপারিশ করেছে, চেয়ারম্যান ও মেয়র সরাসরি নির্বাচিত না হয়ে নির্বাচিত সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবেন। এতে ভোটার ও পরিষদের জন্য কী বদলাবে?

    উত্তর: আগেই বলেছি, বর্তমান ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে, যেখানে চেয়ারম্যান বা মেয়র সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসম ক্ষমতা প্রয়োগ করেন এবং অন্য নির্বাচিত সদস্যদের অর্থবহ ভূমিকা সামান্যই থাকে। নির্বাচন যদি শুধু সদস্য বা কাউন্সিলর পদে হয় এবং তাঁরা পরে নিজেদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচন করেন, তাহলে সদস্যরা ক্ষমতায়িত হবেন এবং চেয়ারম্যান বা মেয়রকে তাঁদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে। এই পারস্পরিক নির্ভরতা এক ব্যক্তির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাতে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চর্চা শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে, যা পরে সেবা প্রদানকে দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে ভূমিকা রাখবে।

    প্রশ্ন ৫. পরিষদগুলো কেন্দ্রের অনুদানের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণের জন্য অর্থ ও কর্তৃত্বের দিক থেকে কী প্রয়োজন?

    উত্তর: আর্থিক ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকারের একটি বিকেন্দ্রীকৃত উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর থাকা উচিত।

    বর্তমানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন ছাড়া সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নিজেদের কর্মীদের বেতন দিতে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভর করে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন স্তরের জন্য আলাদা আর্থিক বরাদ্দ বা অনুদান দেওয়া হয়। উন্নয়ন সহযোগীরাও নানা ধরনের উল্লম্ব প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, প্রায়ই নিজেদের মধ্যে ও স্থানীয় সংস্থার সঙ্গে কম সমন্বয়ে। ফলে স্থানীয় সংস্থাগুলো নিজেদের বাজেট পরিচালনা এবং স্থানীয় অগ্রাধিকার অনুযায়ী উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে খুব সামান্য বা কোনো স্বায়ত্তশাসনই পায় না।

    আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ এগিয়ে নিতে ২০২৫ সালের কমিশন একটি পূর্ণাঙ্গ বিকেন্দ্রীকৃত “জেলা পরিকল্পনা” প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে জেলা এবং এর অন্তর্ভুক্ত উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন পরিকল্পনা একত্র করা হবে। এনজিও ও উন্নয়ন সহযোগীদের নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পও এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। জেলার জন্য বরাদ্দ অর্থ বণ্টন এবং স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষমতা জেলাকে দেওয়া উচিত। এই পদ্ধতি স্থানীয় আর্থিক স্বায়ত্তশাসন বাড়াবে, উন্নয়ন উদ্যোগগুলোর মধ্যে সমন্বয় উন্নত করবে এবং সরকারি সম্পদ স্থানীয়ভাবে চিহ্নিত অগ্রাধিকারের দিকে যাওয়া নিশ্চিত করবে।

    বাংলাদেশের সংবিধান সরকারকে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছে। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি প্রশাসনিক একাংশে স্থানীয় জনগণের নির্বাচিত একটি স্থানীয় সরকার সংস্থা থাকবে। স্থানীয় সংস্থার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রণালয়গুলোরও স্থানীয় পর্যায়ে কার্যালয় আছে, যেগুলোকে একই ধরনের, পরস্পর জড়িয়ে যাওয়া দায়িত্ব দেওয়া আছে; এতে কাজের দ্বৈততা ও সম্পদের অপচয় হয়। সরকার ইতিমধ্যে ৯টি বিভাগ ইউনিয়ন পর্যায়ে এবং ১৬টি বিভাগ উপজেলা পর্যায়ে হস্তান্তর করেছে। তবে এসব হস্তান্তর এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, কারণ এসব বিভাগের সংশ্লিষ্ট তহবিল, কর্মী ও অর্থ সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তর করা হয়নি।

    প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণকে দক্ষ ও কার্যকর করতে স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি বিভাগগুলোর দায়িত্বের সঙ্গে তাদের তহবিল ও কর্মীদেরও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তর করা উচিত। এতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে পারবে, প্রশাসনিক দ্বৈততা কমবে এবং সমন্বয় ও সেবা প্রদান উন্নত হবে।

    প্রশ্ন ৬. সংসদ সদস্যদের কি স্থানীয় পরিষদে কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা থাকা উচিত, নাকি দুটিকে আলাদা রাখা উচিত?

    উত্তর: ভৌগোলিকভাবে সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানের নির্বাচনী এলাকা এক হলেও তিনটি প্রধান কারণে স্থানীয় সরকার সংস্থায় সংসদ সদস্যদের কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা থাকা উচিত নয়:

    প্রথমত, সংসদ সদস্যরা আইনপ্রণেতা; তাঁদের দায়িত্ব আইন প্রণয়ন এবং সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা। তাই তাঁদের প্রধান মনোযোগ হওয়া উচিত জনগণের উদ্বেগ তুলে ধরা এবং জাতীয় নীতির পর্যায়ে তাঁদের কণ্ঠস্বর যেন শোনা যায়, তা নিশ্চিত করা।

    দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের নির্বাহী বিভাগের অংশ। আইনপ্রণেতা সংসদ সদস্যদের এসব প্রতিষ্ঠানে কোনো আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব প্রয়োগের সুযোগ দিলে ক্ষমতা পৃথক্‌করণের নীতি দুর্বল হতে পারে।

    তৃতীয়ত, সংসদ সদস্যদের জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাব যেন উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সরকারের (অর্থাৎ উপজেলা পরিষদের) নেতৃত্ব দিতে নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যানদের কর্তৃত্বকে ছাপিয়ে না যায়, সে জন্য তাঁদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা রাখা উচিত। তা না হলে সংসদ সদস্যরা স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে আধিপত্য করবেন, যা উপজেলা পরিষদের স্বায়ত্তশাসন ও গুরুত্ব ক্ষুণ্ন করবে।

    প্রশ্ন ৭. স্থানীয় পরিষদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন আছে। এসব আসনের কি প্রকৃত ক্ষমতা আছে, আর কী হলে তা বদলাবে?

    উত্তর: স্থানীয় পর্যায়ে এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই বিধান কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। ইউনিয়ন পরিষদ আইন ১৯৯৭ ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে নারীদের তিনটি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিধান চালু করে। এই ব্যবস্থায় প্রত্যেক নির্বাচিত নারী সদস্য তিনটি ওয়ার্ডের প্রতিনিধিত্ব করেন, যার প্রতিটিতে একজন নির্বাচিত পুরুষ সদস্যও আছেন। ফলে পুরুষ ও নারী সদস্যদের এখতিয়ারে প্রায়ই সংঘাত ও দ্বৈততা দেখা দেয়, যেখানে পুরুষ সদস্যরাই প্রায়ই সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা রাখেন। এভাবে বর্তমান ব্যবস্থা স্থানীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

    নারীর অংশগ্রহণ আরও কার্যকর করতে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ৩০ শতাংশ ওয়ার্ড নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা যায়, যা পরপর নির্বাচনী চক্রে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে পূরণ হবে। যেমন, বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ কাঠামোয় পরপর তিনটি নির্বাচনে নয়টি ওয়ার্ডেই নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে। প্রথম নির্বাচনে নারীরা সরাসরি তিনটি ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, পাঁচ বছর পরের নির্বাচনে পরের তিনটি ওয়ার্ডে, এবং তার পরের নির্বাচনেও এভাবে চলবে।

    প্রশ্ন ৮. কোন একটি সংস্কার জেলা ও গ্রামের মানুষের কাছে রাষ্ট্রের পৌঁছানোর পথ সবচেয়ে বেশি উন্নত করবে?

    উত্তর: রাষ্ট্রকে তৃণমূলের মানুষের কাছাকাছি আনতে পারে, এমন একক কোনো সংস্কার চিহ্নিত করা কঠিন। তবে বৃহত্তর অর্থে এর জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ নীতির মাধ্যমে সরকারি সেবা প্রদানের উন্নতি, যা প্রশাসনিক ও আর্থিক দুই ধরনের বিকেন্দ্রীকরণই নিশ্চিত করবে। স্থানীয় সংস্থাগুলোর নিজেদের উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি এবং স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণে স্বায়ত্তশাসন থাকা উচিত। স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা স্থানীয়ভাবে, জেলা পর্যায়ে প্রণয়ন করা উচিত। এ জন্য কমিশনের সুপারিশ করা জেলা পরিকল্পনার ধারণাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

  • স্মার্টফোন ও শৈশব: ঘুম, মনোযোগ ও বন্ধুত্বে কী প্রভাব পড়ছে

    স্মার্টফোন ও শৈশব: ঘুম, মনোযোগ ও বন্ধুত্বে কী প্রভাব পড়ছে

    রাত ক্রমেই গভীর হচ্ছে। চারদিকে নীরবতা, কিন্তু স্মার্টফোনের স্ক্রিন তখনো জ্বলছে। একটি ভিডিও শেষ হতে না হতেই শুরু হচ্ছে আরেকটি। রিলের ফাঁকে আসছে মেসেজ ও নোটিফিকেশন। ‘আরেকটু দেখেই ঘুমাব’—ভাবতে ভাবতে কখন যে রাত গড়িয়ে যায়, টের পাওয়া যায় না।

    পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হয়। ক্লাসে মন বসে না, সারাদিন ক্লান্তি ও খিটখিটে মেজাজ থাকে। পড়াশোনা বা অন্য কাজে মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন অভিজ্ঞতা অনেক পরিবারের কাছেই পরিচিত।

    স্মার্টফোন এখন শিশু-কিশোরদের পড়াশোনা, বিনোদন ও বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রযুক্তি শেখা, সৃজনশীলতা প্রকাশ এবং দূরে থাকা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ঘুম, মনোযোগ ও সামাজিক সম্পর্ককে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

    বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আইসিটি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল–জুন সময়ে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ৫৯.২ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন। আগের বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৫৫ শতাংশ। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে প্রকাশিত এই পরিসংখ্যান শিশুদের আলাদাভাবে দেখায় না, তবে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তার সম্পর্কে ধারণা দেয়।

    যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের জরিপে দেখা যায়, ৪০ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে উৎপাদনশীলতায় এবং ২২ শতাংশ পড়াশোনার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলেছেন। তবে এগুলো অংশগ্রহণকারীদের নিজস্ব মূল্যায়ন; এসব তথ্য একা প্রমাণ করে না যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই সমস্যাগুলোর কারণ।

    সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব

    স্মার্টফোনের মাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং নিজেদের আগ্রহের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা সহজ হয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের একই জরিপে ৭৪ শতাংশ মার্কিন কিশোর-কিশোরী বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাঁদের বন্ধুদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, ৩১ শতাংশ জানিয়েছেন, এসব প্ল্যাটফর্মে তাঁরা কখনো কখনো বন্ধুদের কাছ থেকে বাদ পড়ার অনুভূতি পান। অর্থাৎ, অনলাইন যোগাযোগে সংযোগ ও চাপ—দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই থাকতে পারে।

    বাংলাদেশেও অনলাইনে নেতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের ২০২৫ সালের ইউ-রিপোর্ট জরিপে প্রায় ২৯ হাজার শিশু ও তরুণ-তরুণী অংশ নেন। তাঁদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ভুয়া খবর ও ভুল তথ্যকে মানসিক চাপের বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রায় এক-সপ্তমাংশ বুলিং ও নেতিবাচক মন্তব্যের কথা বলেন। আরও ১৪ শতাংশ ক্ষতিকর বা মন খারাপ করা কনটেন্টকে মানসিক চাপের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

    শিশু মনোবিজ্ঞানী ও প্লে থেরাপিস্ট মোস্তাক আহমেদ ইমরান দ্য ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনে বলেন, ছোট শিশুদের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে স্ক্রিন যদি মানুষের সঙ্গে সাড়া-প্রতিক্রিয়ামূলক যোগাযোগের জায়গা নিয়ে নেয়, তাহলে কথা বলার বিকাশে বিলম্ব ও সামাজিকভাবে গুটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে সব স্ক্রিন ব্যবহারকারী শিশুর এমন সমস্যা হয় না। ঝুঁকি বাড়তে পারে যখন ডিভাইস সরাসরি যোগাযোগ, খেলাধুলা ও পারিবারিক মেলামেশার বিকল্প হয়ে ওঠে।

    অভিভাবকদের অভিজ্ঞতাতেও বিষয়টি উঠে এসেছে। দুই সন্তানের মা ফাতেমা আক্তার সুইটি একই প্রতিবেদনে জানান, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের পর তাঁর বড় ছেলের বাইরে খেলতে যাওয়ার আগ্রহ কমে যায়। তিনি বলেন, বাইরে নিয়ে যেতে চাইলে ছেলে নানা অজুহাত দেখায়। অন্যদিকে, ভিডিও দেখে সে রঙের নামও শিখেছে। তাই তিনি স্ক্রিন ব্যবহারের সময় ও কনটেন্টের ওপর নজর রাখেন। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রযুক্তির ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই ধরনের প্রভাবই থাকতে পারে।

    ঘুম

    ঘুমের সময় স্মার্টফোন ব্যবহার দৈনন্দিন রুটিনকে প্রভাবিত করতে পারে। শোয়ার আগে ভিডিও দেখা বা মেসেজের উত্তর দিতে গিয়ে ঘুমানোর সময় পিছিয়ে গেলে পরদিন ক্লান্তি ও মনোযোগের সমস্যা দেখা দিতে পারে। রাতের নোটিফিকেশন এবং একের পর এক ভিডিও দেখার অভ্যাসও সময়মতো ঘুমাতে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

    পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের জরিপে ৪৫ শতাংশ মার্কিন কিশোর-কিশোরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নিজেদের ঘুমের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

    যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের প্রতিদিন ৯–১২ ঘণ্টা এবং ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম শেখা, মনোযোগ, আচরণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

    ঘুমের অভ্যাস উন্নত করতে সিডিসি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও ঘুম থেকে ওঠার মতো অভ্যাসের পরামর্শ দেয়। পাশাপাশি, আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের পরামর্শে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করা এবং রাতে ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস শোবার ঘরের বাইরে রাখার কথা বলা হয়েছে।

    ঘুমানোর নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা, রাতে ফোন বিছানা থেকে দূরে রাখা এবং পরিবারের সবার জন্য একই ধরনের নিয়ম চালু করা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

    মনোযোগ

    পড়াশোনার মাঝখানে বারবার নোটিফিকেশন দেখা বা নতুন ভিডিও খুলে ফেলা মনোযোগের ধারাবাহিকতায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। কিছুক্ষণ ফোন দেখার পর বইয়ে ফিরে এলেও আগের কাজে মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে সময় লাগতে পারে। ফলে পড়াশোনা, খেলাধুলা ও অন্যান্য কাজে সময় ভাগ করে নেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

    যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিস অব সায়েন্সেস, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেডিসিনের ২০২৪ সালের Social Media and Adolescent Health প্রতিবেদন বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভ্রান্তিকর বৈশিষ্ট্য কিশোরদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে এর প্রভাব কতটা, তা নির্ধারণ করা কঠিন। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম, ব্যবহারের ধরন এবং ব্যক্তিভেদে অভিজ্ঞতার পার্থক্যও বিবেচনায় নিতে হয়।

    তাই স্মার্টফোন ব্যবহার মস্তিষ্কের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা স্থায়ীভাবে নষ্ট করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। বরং দেখতে হবে, ফোন ব্যবহারের কারণে শিশু নিয়মিত পড়াশোনা, ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কি না।

    বয়স অনুযায়ী ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ, পড়ার সময় অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা এবং নির্দিষ্ট সময় পর বিরতি নেওয়া মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি বই পড়া, ছবি আঁকা, খেলাধুলা ও হাতে-কলমে কাজের সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

    অতিরিক্ত ব্যবহার

    কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করা হচ্ছে, শুধু তা দিয়ে সমস্যার মাত্রা বোঝা যায় না। ফোন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, এর কারণে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হওয়া এবং অন্য কার্যক্রমের জায়গা ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে আসাও বিবেচনায় নিতে হয়।

    পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের জরিপে ৪৫ শতাংশ মার্কিন কিশোর-কিশোরী বলেছেন, তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করেন। একই জরিপে ৪৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার কমিয়েছেন। সমান সংখ্যক কিশোর-কিশোরী স্মার্টফোনের ব্যবহার কমানোর কথাও বলেছেন। অর্থাৎ, অনেকে নিজেদের ব্যবহারের ধরন নিয়ে ভাবছেন এবং পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন।

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপীয় অঞ্চলের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে ইউরোপ, মধ্য এশিয়া ও কানাডার ৪৪টি দেশ ও অঞ্চলের ১১, ১৩ ও ১৫ বছর বয়সী প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কিশোর-কিশোরীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের লক্ষণ থাকা কিশোর-কিশোরীর হার ২০১৮ সালের ৭ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ১১ শতাংশে ওঠে।

    প্রতিবেদনে সমস্যাজনক ব্যবহারের লক্ষণ হিসেবে ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো, অন্য কাজের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। এটি ইউরোপ, মধ্য এশিয়া ও কানাডার তথ্য।

    সামাজিক মনোবিজ্ঞানী জোনাথন হাইট তাঁর The Anxious Generation বইয়ে স্বাধীনভাবে খেলাধুলা ও সরাসরি মেলামেশার সুযোগ কমে যাওয়া এবং ফোনকেন্দ্রিক শৈশবের বিস্তার নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা, ঘুমের ঘাটতি ও মনোযোগে বারবার ব্যাঘাত শিশু-কিশোরদের সুস্থতার জন্য উদ্বেগের বিষয়।

    তবে গবেষকদের মধ্যে এ বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিসের ২০২৪ সালের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বিদ্যমান গবেষণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কিশোরদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যগত পরিবর্তনের একক কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে না। কিছু কিশোর অনলাইনে ক্ষতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেও অন্যরা বন্ধুত্ব, সৃজনশীলতা ও সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ—সবকিছু বিবেচনা করা জরুরি।

    অভিভাবকেরা কী করতে পারেন?

    বিডি গ্লোবাল টাইমসের সঙ্গে আলাপকালে ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে (McMaster University) স্বাস্থ্য গবেষণা পদ্ধতিবিদ্যায় (Health Research Methodology) পিএইচডি গবেষণারত তাসলিমা চৌধুরী সুন্না বলেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ঝুঁকি কমাতে শিশুদের খেলাধুলা ও বাইরের পরিবেশে সময় কাটানোর পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

    তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। সন্তান কী ধরনের গেম খেলছে, ইন্টারনেটে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, সেদিকে সতর্ক নজর রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তাদের অনলাইন অভিজ্ঞতা বোঝা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

    স্মার্টফোনের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। অনলাইন ক্লাস, শিক্ষামূলক ভিডিও, তথ্য সংগ্রহ, সৃজনশীল কাজ এবং দূরে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগে প্রযুক্তি কাজে আসে। তাই শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা বাস্তবসম্মত নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বাস্থ্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা।

    অভিভাবকেরা কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারেন:

    • শিশুর বয়স, পড়াশোনা ও দৈনন্দিন রুটিন অনুযায়ী ফোন ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারণ করুন।
    • ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
    • পড়াশোনা, পারিবারিক খাবার ও একসঙ্গে সময় কাটানোর সময় ফোন দূরে রাখুন।
    • বাইরে খেলাধুলা, বই পড়া, ছবি আঁকা ও বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশার সুযোগ বাড়ান।
    • অনলাইনে শিশু কী দেখছে ও কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, তা নিয়ে দোষারোপ না করে খোলামেলা আলোচনা করুন।
    • কোনো ক্ষতিকর অভিজ্ঞতা বা অনলাইন হয়রানির শিকার হলে যেন শিশু নির্ভয়ে জানাতে পারে, এমন পরিবেশ তৈরি করুন।
    • পরিবারের বড়রাও নিজেদের ফোন ব্যবহারের অভ্যাসে ভারসাম্য রাখুন।

    পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসেও যদি যার যার ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে শিশুদের কাছে ভিন্ন আচরণ আশা করা কঠিন। তাই পরিবারের খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা, নিয়মিত একসঙ্গে সময় কাটানো এবং শিশুদের অনলাইন অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলা ছোট হলেও কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।

    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। বয়সোপযোগী ডিজিটাল শিক্ষা, নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ এবং হয়রানি বা ক্ষতিকর কনটেন্টের ক্ষেত্রে সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

    স্মার্টফোন এখন জীবনের অংশ, আর ভবিষ্যতে প্রযুক্তির সঙ্গে শিশু-কিশোরদের সম্পর্ক আরও গভীর হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিকে বাদ দেওয়া নয়, বরং এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে ঘুম, পড়াশোনা, খেলাধুলা, বন্ধুত্ব ও পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়ের ভারসাম্য বজায় থাকে।

    —

  • কানাডায় উচ্চশিক্ষা: খরচ বাড়ছে, কমছে স্টাডি পারমিট, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কঠিন হিসাব

    কানাডায় উচ্চশিক্ষা: খরচ বাড়ছে, কমছে স্টাডি পারমিট, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কঠিন হিসাব

    কানাডায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর স্টাডি পারমিট এক বছরে কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ, খরচ দেখানোর শর্ত বেড়েছে ১৩.৬ শতাংশ; বৃত্তিতেও টানাটানি, ডিগ্রির পর চাকরির অনিশ্চয়তা।

    ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে কানাডায় পাড়ি জমান এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। স্নাতকোত্তর শেষ করে ভর্তি হন পিএইচডি প্রোগ্রামে। দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট কাটাতে একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যদেরও কানাডায় নিয়ে আসেন। কিন্তু পরিবার আসার পরই বদলে যায় তাঁর আর্থিক হিসাব। বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তির অর্থে একা চলতে পারলেও পরিবারের সবার খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষণার চাপ, সংসারের ব্যয় ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা একসময় প্রভাব ফেলে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যেও। নিউফাউন্ডল্যান্ডে বসবাসরত এই পিএইচডি শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ করতে না চাওয়ায় তাঁর অনুরোধে নাম গোপন রাখা হয়েছে।

    উন্নত শিক্ষা, গবেষণা ও কর্মজীবনের সম্ভাবনা নিয়ে কানাডায় আসা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অনেকেই এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। কানাডার অভিবাসন বিভাগ ইমিগ্রেশন, রিফিউজিস অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডার (IRCC) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৬ হাজার ৫০৫ জন বাংলাদেশি স্টাডি পারমিট পেলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৫৩৫ জনে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্টাডি পারমিট আবেদনে জীবনযাত্রার ব্যয়ের জন্য দেখাতে হওয়া ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতার শর্ত ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।

    বাংলাদেশিদের স্টাডি পারমিট ২০২৫ সালে ১৫% কমেছে: ২০২৪ সালে ৬,৫০৫, ২০২৫ সালে ৫,৫৩৫ (সূত্র: IRCC)
    গ্রাফিক: বিডি গ্লোবাল টাইমস

    কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বৃত্তি, গবেষণা সহকারী (Research Assistant) ও শিক্ষক সহকারী (Teaching Assistant) হিসেবে কাজের সুযোগ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে। আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষকদের সঙ্গে কাজের সুযোগ এবং গবেষণা অনুদানও দেশটির উচ্চশিক্ষার অন্যতম আকর্ষণ। তবে এসব সুযোগের পাশাপাশি উচ্চ টিউশন ফি, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয়, চাকরির প্রতিযোগিতা এবং অভিবাসননীতির পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

    IRCC-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩ হাজার ৫০০ জন বাংলাদেশি নাগরিক স্টাডি পারমিট পেয়েছেন। তবে এটি আট মাসের হিসাব হওয়ায় আগের দুই বছরের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যায় না।

    পরিবার নিয়ে আর্থিক সংকটে পড়া ওই পিএইচডি শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাই, তা দিয়ে একা চলা সম্ভব হলেও পরিবার নিয়ে চলা অত্যন্ত কঠিন। আবার পরিবারকে বাংলাদেশে রেখে দীর্ঘদিন একা থাকাও মানসিকভাবে কষ্টকর। একদিকে পরিবারের দায়িত্ব, অন্যদিকে গবেষণার চাপ সব মিলিয়ে অনেক কঠিন সময় পার করতে হয়েছে।’

    পূর্ণকালীন গবেষণার কারণে অতিরিক্ত কাজ করার পর্যাপ্ত সময়ও তাঁর ছিল না। দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা গবেষণার কাজেও প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ কমাতে বৃত্তি ও গবেষণা তহবিল বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে ওই শিক্ষার্থী জানান, অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাধ্যমে তিনি নিয়মিত কাউন্সেলিং সেবা পেয়েছেন এবং সেবার মান নিয়েও সন্তুষ্ট। তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অ্যাকাডেমিক ও ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ সব সময় পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন তিনি।

    অন্যদিকে, কানাডার সাসকাটুনে বসবাসরত এক বাংলাদেশি স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা তুলনামূলক ইতিবাচক। ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ করতে না চাওয়ায় তাঁর নামও গোপন রাখা হয়েছে। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি থেকে টিউশন ফি পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থে তাঁর আবাসনসহ প্রয়োজনীয় খরচ মিটে যায়। ফলে আপাতত বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়তে হয়নি তাঁকে।

    তাঁর মতে, কানাডার উন্নত গবেষণার পরিবেশ, আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ গবেষণাগার এবং আন্তর্জাতিক গবেষকদের সঙ্গে কাজের সুযোগ শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করে। গবেষণার প্রয়োজনে বিভিন্ন সম্মেলন ও প্রেজেন্টেশনে অংশ নেওয়ার খরচও ক্ষেত্রবিশেষে বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক বহন করেন।

    তবে এসব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পড়াশোনা শেষে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি। সাম্প্রতিক অভিবাসননীতির পরিবর্তন তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

    নিজ খরচে কানাডায় পড়তে আসা আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জানান, তাঁর বার্ষিক টিউশন ফি ১৮ হাজার কানাডীয় ডলার। এর বাইরে বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াতসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খরচ রয়েছে।

    IRCC-এর নিয়ম অনুযায়ী, যোগ্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিক্ষাকালীন সময়ে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা ক্যাম্পাসের বাইরে কাজ করতে পারেন। তবে এই আয়ে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার সব খরচ মেটানো অনেকের জন্য কঠিন।

    ওই শিক্ষার্থী জানান, গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে পূর্ণকালীন কাজ করে কিছু অর্থ সঞ্চয়ের চেষ্টা করেন তিনি। ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট ও পরীক্ষার পাশাপাশি নিজের খরচ চালানোর চিন্তা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

    আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আর্থিক সক্ষমতার শর্তও বেড়েছে। IRCC-এর আর্থিক সক্ষমতাসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কুইবেক ছাড়া অন্যান্য প্রদেশে একজন শিক্ষার্থীর জীবনযাত্রার ব্যয়ের জন্য ন্যূনতম ২০ হাজার ৬৩৫ কানাডীয় ডলার দেখানোর শর্ত ছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয় ২২ হাজার ৮৯৫ ডলার। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে নির্ধারিত হয় ২৩ হাজার ৪৪৮ ডলার। অর্থাৎ, ২০২৪ সালের তুলনায় বৃদ্ধির হার প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

    দুই সদস্যের পরিবারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত অর্থের পরিমাণ ২৯ হাজার ১৯২ কানাডীয় ডলার। এর সঙ্গে টিউশন ফি ও যাতায়াতের খরচ আলাদাভাবে হিসাব করতে হয়।

    স্টাডি পারমিটে ন্যূনতম দেখাতে হওয়া অর্থ ২০২৪ সালের ২০,৬৩৫ থেকে বেড়ে ২৩,৪৪৮ কানাডীয় ডলার (সূত্র: IRCC)
    গ্রাফিক: বিডি গ্লোবাল টাইমস

    তবে IRCC নির্ধারিত অর্থ শিক্ষার্থীদের প্রকৃত গড় জীবনযাত্রার ব্যয় নয়; এটি স্টাডি পারমিট আবেদনের জন্য ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতার শর্ত। শহরভেদে বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের ব্যয় আলাদা হওয়ায় প্রকৃত খরচও ভিন্ন হয়।

    ইউনিভার্সিটি অব সাসকাচোয়ানে সার্টিফিকেট ইন বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ সাকিব মারুফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোর্সভিত্তিক মাস্টার্স প্রোগ্রামে অর্থায়নের সুযোগ তুলনামূলক সীমিত। অন্যদিকে, থিসিসভিত্তিক মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে, বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) বিষয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতা সহকারী হিসেবে অর্থায়নের সুযোগ তুলনামূলক বেশি।

    তাঁর মতে, মাস্টার্স বা পিএইচডি পর্যায়ে বছরে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার কানাডীয় ডলারের ফান্ডিং পাওয়া গেলেও সেই অর্থের বড় অংশ টিউশন ফি পরিশোধে ব্যয় হতে পারে। ফলে শিক্ষার্থীর হাতে দৈনন্দিন খরচ চালানোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থ না-ও থাকতে পারে।

    মারুফ বলেন, শুধু ফান্ডিংয়ের মোট অঙ্ক বিবেচনা না করে টিউশন ফি বাদ দেওয়ার পর কত অর্থ অবশিষ্ট থাকবে এবং তা দিয়ে সংশ্লিষ্ট শহরে বসবাস সম্ভব কি না, আগে থেকেই হিসাব করা জরুরি।

    থম্পসন রিভার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজি বিভাগের শিক্ষক ড. সালাহ উদ্দিন খান একসময় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে কানাডায় এসেছিলেন। পড়াশোনা ও গবেষণার বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

    আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আর্থিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কানাডায় উচ্চশিক্ষার আর্থিক বাস্তবতা বুঝতে হলে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট এবং মাস্টার্স-পিএইচডি শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে দেখতে হবে। আমার অভিজ্ঞতায়, আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। তাঁদের জন্য উল্লেখযোগ্য স্কলারশিপের সুযোগ সীমিত। বিশেষ করে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার সম্পূর্ণ খরচ বহন করতে পারে, এমন স্কলারশিপ অত্যন্ত বিরল।’

    ‘কানাডায় উচ্চশিক্ষার আর্থিক বাস্তবতা বুঝতে হলে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট এবং মাস্টার্স-পিএইচডি শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে দেখতে হবে। আমার অভিজ্ঞতায়, আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। তাঁদের জন্য উল্লেখযোগ্য স্কলারশিপের সুযোগ সীমিত। বিশেষ করে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার সম্পূর্ণ খরচ বহন করতে পারে, এমন স্কলারশিপ অত্যন্ত বিরল।’

    স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার টিউশন ফিসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে আন্তর্জাতিক স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গড় বার্ষিক টিউশন ফি প্রায় ৪১ হাজার ৭০০ কানাডীয় ডলার। এর বাইরে রয়েছে আবাসন, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ।

    কানাডায় স্নাতকের প্রথম বছরে লাগতে পারে প্রায় ৬৫,১৯৪ কানাডীয় ডলার: গড় টিউশন আর জীবনযাত্রার ন্যূনতম তহবিল
    গ্রাফিক: বিডি গ্লোবাল টাইমস

    ড. খান বলেন, ‘কানাডায় এসেই চাকরি পাওয়া সহজ নয়। বিশেষ করে ছোট শহরগুলোতে কাজের সুযোগ সীমিত। স্থানীয় অভিজ্ঞতা, ভাষাগত দক্ষতা ও যোগাযোগের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী প্রথম চাকরি পেতে সমস্যায় পড়েন। ফলে শুধু পার্ট টাইম কাজ করে টিউশন ফি ও অন্যান্য খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব।’

    তাঁর মতে, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ল্যাব, অ্যাসাইনমেন্ট ও গবেষণার চাপ থাকায় পড়াশোনা ও কাজের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন। কেউ কেউ শিক্ষকতা বা গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজের সুযোগ পেলেও তা সীমিত। অন্যদিকে, গবেষণাভিত্তিক মাস্টার্স ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের অর্থায়নের সুযোগ তুলনামূলক বেশি হলেও পরিবার বা সন্তান থাকলে ব্যয় সামলানো কঠিন হতে পারে।

    কানাডা সরকারের ডক্টরাল বৃত্তি কানাডা গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ স্কলারশিপ–ডক্টরাল (CGRS-D)-এ বছরে ৪০ হাজার কানাডীয় ডলার করে সর্বোচ্চ তিন বছর অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। কানাডার কোনো ডক্টরাল প্রোগ্রামে ভর্তি থাকা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরাও আবেদন করতে পারেন; মোট বৃত্তির সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ তাঁদের জন্য। তবে এসব বৃত্তি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক।

    ড. খানের ভাষায়, ‘আমার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া আর পড়াশোনার খরচ বহনের সামর্থ্য থাকা দুটি আলাদা বিষয়। তাই কানাডায় আসার আগে ফান্ডিং, সম্ভাব্য ব্যয় এবং নিজের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা জরুরি।’

    কানাডায় আসার আগে যে হিসাব করবেন

    • ফান্ডিংয়ের মোট অঙ্ক নয়, টিউশন ফি বাদ দিয়ে হাতে কত থাকবে তা দেখুন।
    • যে শহরে পড়বেন, সেখানকার বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের খরচ আলাদা করে হিসাব করুন; IRCC-এর ন্যূনতম অঙ্ক প্রকৃত খরচ নয়।
    • পরিবার সঙ্গে আনলে খরচ কত বাড়বে, আগেই হিসাব করুন; দুজনের জন্য IRCC-এর ন্যূনতম অঙ্ক ২৯ হাজার ১৯২ ডলার।
    • শুধু পার্টটাইম কাজের আয়ে টিউশন ও খরচ চালানোর পরিকল্পনা করবেন না।
    • পড়াশোনা শেষে ওয়ার্ক পারমিট (PGWP) সর্বোচ্চ তিন বছর; সবাই পূর্ণ মেয়াদ পান না।

    আর্থিক অনিশ্চয়তা, পড়াশোনার চাপ এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে।

    ড. সালাহ উদ্দিন খান বলেন, ‘কানাডায় মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যেও।’

    তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক চাপকে বিদেশজীবনের স্বাভাবিক অংশ মনে করেন। কেউ কেউ কাউন্সেলিং নেওয়াকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেন।

    এ ছাড়া বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে কানাডার গবেষণানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় মানিয়ে নেওয়াও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। স্বাধীন চিন্তা, গবেষণার প্রশ্ন তৈরি, বৈজ্ঞানিক সাহিত্য বিশ্লেষণ এবং যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতার ওপর এখানে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

    কানাডায় উচ্চশিক্ষা শেষ করলেই যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি নিশ্চিত হয় না। স্থানীয় কাজের অভিজ্ঞতা, পেশাগত যোগাযোগ, নিয়োগদাতার চাহিদা এবং চাকরির বাজারের প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েটদের কর্মজীবনে প্রবেশকে কঠিন করে তুলতে পারে।

    স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০ সালে পড়াশোনা শেষ করা এবং কানাডায় অবস্থানরত আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েটদের ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশ ২০২৩ সালে কর্মরত ছিলেন। একই সময়ে কানাডীয় গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানের হার ছিল ৯১ দশমিক ০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েটদের গড় আয়ও কানাডীয় গ্র্যাজুয়েটদের তুলনায় ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ কম ছিল। স্নাতক ডিগ্রিধারী আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েটদের মাত্র ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ তাঁদের চাকরিকে পড়াশোনার বিষয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত বলে জানিয়েছেন, যেখানে কানাডীয় গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে এই পরিসংখ্যান ২০২০ সালের গ্র্যাজুয়েটদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি; এটি ২০২৬ সালের বর্তমান কর্মসংস্থানের হার নয়।

    নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েট জানান, পড়াশোনা শেষ করার পর প্রায় দুই বছর পার হতে চললেও এখনো নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাননি। ফলে মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে সময় কাটছে তাঁর।

    কানাডায় পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিটের (PGWP) মেয়াদ শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত হতে পারে। তবে সব গ্র্যাজুয়েট তিন বছরের অনুমতি পান না।

    ওই শিক্ষার্থীর আশঙ্কা, অবশিষ্ট সময়ের মধ্যে উপযুক্ত চাকরি কিংবা কানাডায় থাকার অন্য কোনো বৈধ সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারলে তাঁকে দেশ ছাড়ার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

  • পরিবারকে সময় দিতে পদ ছাড়লেন মাইক্রোসফটের শীর্ষ কর্মকর্তা

    পরিবারকে সময় দিতে পদ ছাড়লেন মাইক্রোসফটের শীর্ষ কর্মকর্তা

    বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টের (এসভিপি) লোভনীয় পদ ও ২৩ বছরের দীর্ঘ বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের ইতি টেনে ভারতে ফিরে আসছেন কেশবন শানমুগম। ভারতে থাকা বয়স্ক বাবা-মায়ের পাশে সময় কাটাতে তিনি চাকরি থেকে অবসরের এই ব্যতিক্রমী ও আবেগঘন ঘোষণা দিয়েছেন।

    মাইক্রোসফটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উদ্ভাবন ও উন্নয়ন কার্যক্রমে অন্যতম নীতি-নির্ধারণী ভূমিকায় ছিলেন কেশবন। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের বহুল আলোচিত ‘এক্সেল কো-পাইলট’ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ‘এজেন্টিক এআই’ প্রযুক্তি চালুর ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল নেতৃত্বস্থানীয়। সিলিকন ভ্যালিসহ বিশ্বজুড়ে যখন এআই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে, ঠিক সেই শীর্ষ মুহূর্তে তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রযুক্তিবিশ্বে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

    তবে তুখোড় পেশাগত সাফল্য ও বৈশ্বিক খ্যাতির চেয়ে বয়োবৃদ্ধ বাবা-মা এবং পরিবারকেই জীবনের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি।

    সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লিঙ্কডইনে দেওয়া এক আবেগাপ্লুত পোস্টে নিজের অবসরের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে কেশবন শানমুগম লেখেন, “মাইক্রোসফটে চমৎকার ২৩টি বছর কাটালাম। ভারতে বসবাসকারী আমার বয়স্ক বাবা-মায়ের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটানোর উদ্দেশ্যেই আমি চাকরি থেকে অবসর নিচ্ছি।”তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘এক্সেল কো-পাইলট’-এর মতো রোমাঞ্চকর কাজ এবং দারুণ সব মেধাবী সহকর্মীদের ছেড়ে আসা মোটেও সহজ ছিল না। তবে জীবনের এই পর্যায়ে এসে কাজ ও ক্যারিয়ারের চেয়ে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের পাশে থাকাকেই তিনি সবচেয়ে সঠিক ও অর্থপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন।

  • শাপলা কলি

    শাপলা কলি

    দুপাশে কলাগাছের সারি। তার মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে একটা রাস্তা। রাস্তাটি এ বছর পিচঢালাই করা হয়েছে। রাস্তার দুপাশে মাঝে মাঝে খেজুরগাছও আছে। অনেকটা ছবির মতো দেখা যায় রাস্তাটি। গ্রামবাংলার অকৃত্রিম একটা নান্দনিক ছবি। দেখে মন ভরে যায়। রাস্তা ধরে কিছু দূর এগিয়ে গেলে বাঁ দিক দিয়ে একটা কর্দমাক্ত বাইপাস রাস্তা চলে গেছে। রাস্তার শুরুতেই একটা মাঝারি আকারের কদবেল গাছ আছে। কদবেল গাছের অনেকগুলো ডাল চতুর্দিকে চলে যাওয়ায় দূর থেকে বটগাছের মতো মনে হয়। অনেক কদবেল ধরেছে গাছে। মনে হয় গাছে ছোট ছোট সাদা রঙের বল ঝুলে আছে।

    কাদা ঠেলে আর একটু এগিয়ে গেলে একটি অনেক পুরোনো বটগাছ। অনেক ইতিহাসের সাক্ষী এই বটগাছটা। মাঠের কৃষকেরা বটগাছের ছায়ায় এসে বিশ্রাম নেয়, নানা সুখ-দুঃখের গল্প করে। এখান থেকে সামান্য একটু এগুলেই বর্ষা মৌসুমে পানি জমে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সাগরের মতো হয়ে যায়। এটাকে এলাকার লোকে ‘কানাবিল’ বলে থাকে। কথিত আছে, একজন কানা ভদ্রলোক এই বিল থেকে প্রকাণ্ড এক রুই মাছ ধরেছিলেন। তার এই কৃতিত্ব হিসেবে বিলের নামকরণ করা হয়েছে কানাবিল। এই বিলে প্রচুর শাপলা ফোটে বর্ষাকালে। পুরো বিল সাদা শাপলায় ভরে যায়। দূর থেকে দেখে মনে হয় সাদা রঙের কার্পেট বিছানো এলাকা। কাছে এলে মনে হয় সাদা-সবুজের মিশ্রণে কানাবিলটি সেজেছে অপূর্ব সাজে। কিশোর-কিশোরীরা শাপলা তুলে আনে ভেলায় করে। এগুলো হাটে নিয়ে বিক্রি করে। শাপলা ফুলের নিচের অংশ লম্বা নলের মতো নরম-কোমল। এই অংশকে নাইল বলে। নাইল তরকারি হিসেবে খাওয়া যায়। শাপলার নাইল পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। বিল থেকে অনেক লোকই নাইল তুলে জীবিকা নির্বাহ করে। শাপলার পাতাগুলো পানির উপর ভাসতে থাকে। ঢেউ এলে সেসব পাতা পানিতে দোল খায়। পাতা, ফুল আর পানি একত্রে যখন দোল দেয়, তখন দর্শনার্থীদের মনের মধ্যে বয়ে যায় খুশির হিল্লোল।কানাবিল কোনো নামকরা বিল নয়—পত্র-পত্রিকা, ফেসবুক বা কোনো মিডিয়ায় স্থান নেই। তবে বর্ষার দিনে শাপলা ফুটে প্রকৃতিতে এক অনবদ্য রূপে রূপায়িত করে—যা আমরা যারা দরিদ্র মানুষ আছি, দূরে কোথাও গিয়ে প্রকৃতির অপরূপ সুধা পান করতে পারি না, তাদের কাছে কানাবিলই সৌন্দর্যের আধার। এটি আমাদের সৌন্দর্যপিপাসু মনকে প্রকৃতির রূপ, রস ও গন্ধ দিয়ে সামান্য হলেও মাতিয়ে রাখে।

  • আঙুল ফোটালে হাড় ক্ষয় হয়?

    আঙুল ফোটালে হাড় ক্ষয় হয়?

    ‘আঙুল ফুটিও না, হাড় ক্ষয় হয়ে যাবে!’ ছোটবেলা থেকে আমরা প্রায় সবাই এই সতর্কবাণী শুনে বড় হয়েছি। কেউ বলেন, জয়েন্টে ‘পানি’ কমে যাওয়ায় এই শব্দ হয়। কেউ বলেন, হাড় একে অপরের সঙ্গে ঘষা লাগার কারণেই এই আওয়াজ। আবার অনেকে মনে করেন, বারবার আঙুল ফোটালে ভবিষ্যতে আর্থ্রাইটিস হবে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? আসুন, জেনে নেওয়া যাক জয়েন্টের এই রহস্যময় শব্দের আসল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

    জয়েন্টের ভেতরে কী থাকে

    আমাদের শরীরের প্রতিটি সচল জয়েন্ট একটি বিশেষ ক্যাপসুল দ্বারা আবৃত থাকে। এর ভেতরে থাকে সাইনোভিয়াল ফ্লুইড, যা এক ধরনের স্বচ্ছ ও পিচ্ছিল তরল। এই তরল জয়েন্টকে সহজে নড়াচড়া করতে সাহায্য করে এবং হাড়ের ঘর্ষণ কমায়। এই তরলের মধ্যে অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্যাস দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে।

    ‘ফট’ শব্দটি আসে কোথা থেকে

    যখন আমরা আঙুল বা অন্য কোনো জয়েন্ট টেনে হঠাৎ প্রসারিত করি, তখন জয়েন্টের ভেতরের চাপ দ্রুত কমে যায়। চাপ কমে যাওয়ার ফলে সাইনোভিয়াল তরলে দ্রবীভূত গ্যাস মুহূর্তের মধ্যে একটি ছোট গ্যাস বুদবুদ (বাবল) তৈরি করে। এই বুদবুদ তৈরির ঘটনাকেই ট্রাইবোনিউক্লিয়েশন বলা হয়। এই আকস্মিক বুদবুদ সৃষ্টির সময়ই ‘ফট’ বা ‘কট’ ধরনের শব্দ শোনা যায়। আগে মনে করা হতো, শব্দটি গ্যাস বুদবুদ ফেটে যাওয়ার কারণে হয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, শব্দটি বুদবুদ ফেটে যাওয়ার কারণে নয়, বরং বুদবুদ তৈরি হওয়ার মুহূর্তেই হয়। অর্থাৎ, শব্দটি হাড়ের ঘর্ষণ থেকে নয়, বরং জয়েন্টের ভেতরে গ্যাসের বুদবুদ তৈরি হওয়ার ফল।

    কেন সঙ্গে সঙ্গে আবার ফোটানো যায় না

    অনেকে লক্ষ করেছেন, একবার আঙুল ফোটানোর পর সঙ্গে সঙ্গে আবার শব্দ হয় না। এর কারণ তৈরি হওয়া গ্যাস বুদবুদটি আবার ধীরে ধীরে সাইনোভিয়াল তরলে মিশে যেতে কিছুটা সময় লাগে। সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ মিনিট পর আবার একই জয়েন্টে শব্দ করা সম্ভব হয়।

    সব জয়েন্টের শব্দ কি একই কারণে হয়

    না। জয়েন্টের শব্দ মূলত দুধরনের হতে পারে। প্রথমটি স্বাভাবিক শব্দ (ফিজিওলজিকাল)। ব্যথা নেই, ফোলা নেই, নড়াচড়ায় সমস্যা নেই; মাঝে মাঝে ‘ফট’ বা ‘কট’ শব্দ হয়। এটি সাধারণত ক্ষতিকর নয়। দ্বিতীয়টি রোগজনিত শব্দ (প্যাথলজিকাল)। যদি শব্দের সঙ্গে থাকে—ব্যথা, ফোলা, জয়েন্ট আটকে যাওয়া, নড়াচড়ায় সীমাবদ্ধতা ও আঘাতের ইতিহাস, তাহলে এটি কার্টিলেজ ক্ষয়, লিগামেন্ট ইনজুরি, মেনিস্কাস ছিঁড়ে যাওয়া, টেনডন স্ন্যাপিং বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের লক্ষণ হতে পারে।আঙুল

    ফোটালে কি আর্থ্রাইটিস হয়

    বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আঙুল ফোটানোর সঙ্গে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের সরাসরি সম্পর্ক আছে বলে প্রমাণিত হয়নি।

    তবে অতিরিক্ত জোরে বা অভ্যাসবশত বারবার জয়েন্ট টানাটানি করলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে লিগামেন্ট বা নরম টিস্যুতে সামান্য আঘাত লাগতে পারে, হাতের গ্রিপ শক্তি কমে যেতে পারে বা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাই অকারণে বারবার জয়েন্ট ফোটানোর অভ্যাস না করাই ভালো।

    কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

    নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। শব্দের সঙ্গে ব্যথা, জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, হাঁটতে বা কাজ করতে সমস্যা, জয়েন্ট বারবার লক হয়ে যাওয়া, আঘাতের পর নতুন করে শব্দ শুরু হওয়া, কিংবা শব্দের সঙ্গে অস্থিরতা বা দুর্বলতা অনুভব করা।

    শেষকথা, জয়েন্টের ‘ফট’ শব্দ মানেই রোগ নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি জয়েন্টের ভেতরে সাইনোভিয়াল তরলে থাকা গ্যাসের বুদবুদ তৈরির একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ঘটনা। তবে যদি এই শব্দের সঙ্গে ব্যথা, ফোলা বা চলাফেরায় অসুবিধা থাকে, তাহলে সেটিকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ তখন এটি কোনো অর্থোপেডিক রোগের প্রাথমিক লক্ষণও হতে পারে। মনে রাখবেন, শব্দ নয়, শব্দের সঙ্গে থাকা উপসর্গই চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

    লেখক : সহকারী অধ্যাপক (স্পাইন সার্জারি), জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, নিটোর, ঢাকা

  • জীবনভর সুস্থ ফুসফুসের অঙ্গীকার

    জীবনভর সুস্থ ফুসফুসের অঙ্গীকার

    প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমরা বাঁচি, কিন্তু সেই নিঃশ্বাসের উৎস ফুসফুসের কথা আমরা কতটুকু ভাবি? বিশ্ব ফুসফুস দিবস আমাদের সেই ভাবনাটাই মনে করিয়ে দিতে প্রতিবছর ফিরে আসে। প্রতিবছর ২৫ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব ফুসফুস দিবস। এর উদ্যোক্তা হলো Forum of International Respiratory Societies (FIRS)। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘A Lifetime of Lung Health’—জীবনভর ফুসফুসের সুস্থতা। এই প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। FIRS বলছে, ফুসফুসের স্বাস্থ্য এক দিনের বিষয় নয়, এটি সারা জীবনের যাত্রা।

    দিবসটি উপলক্ষে দেশের বক্ষব্যাধির সংগঠনগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন বিভিন্ন সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, যেমন সেমিনার, টিভি টকশো ও বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রোগ্রামের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করেছে। এ ব্যাপারে বিএমআরসি পরিচালক ও বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সচিব ডা. কাজী সাইফুদ্দিন বেননূর বলেন, ‘সুস্থ ফুসফুস মানেই প্রাণবন্ত জীবন। প্রতি নিঃশ্বাস আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অমূল্য উপহার। একটি সচেতন সিদ্ধান্ত আপনার ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যকে বদলে দিতে পারে। যদি ধূমপান করেন, আজই ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিন।’

    এদিকে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ও বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের ট্রেজারার অধ্যাপক ডা. আব্দুস শাকুর খান বলেন, ‘সুস্থ ফুসফুসের জন্য শুধু রোগমুক্ত থাকাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালো অভ্যাসই পারে আমাদের ফুসফুসকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করুন ও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সক্রিয় থাকুন। ফাঁকা ব্যায়াম বা খেলাধুলার মতো অভ্যাস দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলুন। পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণ করুন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের প্রতিও গুরুত্ব দিন।’

    ফাউন্ডেশনের মহাসচিব ডা. আসিফ মুজতবা মাহমুদ বলেন, ‘পরিষ্কার বাতাস আমাদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন। কিন্তু বায়ুদূষণ আজ আমাদের ফুসফুসের জন্য একটি বড় হুমকি। ধোঁয়া, ধুলা ও ক্ষতিকর বায়ুকণা প্রতিদিন আমাদের শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করছে। এর ফলে শিশু থেকে বড় সবার ওপরই প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ফুসফুস এখনো বিকাশমান। তাই তাদের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী সবাই মাস্ক পরিধান করবেন। ধূমপান বর্জন করুন। যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া কমানোসহ পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে উৎসাহিত করুন। বেশি বেশি করে গাছ লাগিয়ে সবুজ পরিবেশ তৈরি করাও আমাদের দায়িত্ব।’

    বিশ্ব ফুসফুস দিবস উপলক্ষে দেশের অন্য একটি বক্ষব্যাধি সংগঠনের সভাপতি ও ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, “বিশ্ব ফুসফুস দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন ফুসফুসের স্বাস্থ্য এবং ফুসফুসকে ভালো রাখার বিভিন্ন উপায় নিয়ে সেমিনার করছে। চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন সেই ধারাবাহিকতায় চারটি সেমিনার এবং একটি র‍্যালি করেছে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘A healthy lung of lifetime’—মানে সারাজীবন ফুসফুসকে সুস্থ রাখুন। এ জন্য আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, ধূমপান বর্জন করতে হবে, ধূমপানকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। পরিবেশকে রক্ষা করতে হবে, বায়ুদূষণ রোধ করতে হবে, পরিবেশদূষণ রোধ করতে হবে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল হ্যাজার্ড—সেখানে গাড়ির ধোঁয়া, কলকারখানার ধোঁয়া, ইটভাটার ধোঁয়া—সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া আমাদের সমন্বিতভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য জনগণকে এ বিষয়গুলো জানাতে হবে। রাজনৈতিক কমিটমেন্টের মধ্যে এগুলোর বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন বর্তমান সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন করেছে, এটার বাস্তবায়ন করতে হবে। বায়ুদূষণের জন্য আমাদের সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা হলো—যানবাহন, ইটভাটার ধোঁয়াসহ বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এ সরকার পরিবেশ রক্ষা করার জন্য ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। আমাদের সবাইকে এই গাছ লাগানোর কর্মসূচিতে অংশ নিতে হবে। সবাইকে দুটি গাছ লাগাতে হবে এবং সেটিকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে আমাদের পরিবেশ রক্ষা পাবে। এছাড়া আমরা ফুসফুসের রোগ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য ভালো খাবার খেতে হবে। আমাদের ব্যায়াম করতে হবে। পরিবেশ যাতে সুন্দর থাকে, পরিবেশ যাতে নির্মল থাকে, এর জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।”

    জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট হাসপাতালের পরিচালক ডা. গোলাম সারোয়ার বিদ্যুৎ বলেন, ‘সারা বছর হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা দিন দিন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তাই ফুসফুস দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়কে সামনে রেখে সারা জীবন সুস্থ ফুসফুস নিয়ে বাঁচতে হলে আজই নিজেকে সচেতন করুন। তাহলেই লাইফটাইম হেলদি লাং নিয়ে আমাদের বাঁচা সম্ভব।’

    এছাড়া বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের সভাপতি প্রফেসর আলী হোসেন বলেন, ‘আমাদের ফুসফুস জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে নীরবে আমাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে আমাদের শরীরে পৌঁছে দেয় প্রয়োজনীয় অক্সিজেন। তাই ফুসফুসের সুস্থতা মানেই স্বাভাবিক জীবনের ভিত্তি। কিন্তু বায়ুদূষণ, ধূমপান, পরোক্ষ ধূমপান ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ফুসফুসের জন্য বড় ঝুঁকি। ফুসফুসের যত্ন শুরু করতে হবে আজ থেকেই। ধূমপান থেকে বিরত থাকুন এবং অন্য কেউ ধূমপানমুক্ত থাকতে উৎসাহিত করুন। ধুলা, ধোঁয়া ও বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখুন। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করুন ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন। দীর্ঘদিনের কাশি, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গকে অবহেলা করবেন না। প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।’

    আসুন, বিশ্ব ফুসফুস দিবস ২০২৬-এ অঙ্গীকার করি—প্রতিটি নিঃশ্বাস হবে বিশুদ্ধ, প্রতিটি ফুসফুস পাবে সারাজীবন যত্ন।

    লেখক : বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

  • আরামদায়ক ঘুমের জন্য খুঁজে নিন সঠিক বালিশ

    আরামদায়ক ঘুমের জন্য খুঁজে নিন সঠিক বালিশ

    ঘুমের সময় ঘাড়, কাঁধ বা পিঠে ব্যথা হলে অনেকেই বিছানা বা গদির দিকে নজর দেন। কিন্তু সমস্যার কারণ হতে পারে বালিশও। ঘুমের ধরন, কাঁধের প্রস্থ, গদির নরম-শক্তভাব—এসব বিবেচনা করেই নিজের জন্য উপযুক্ত বালিশ বেছে নেওয়া উচিত বলে জানিয়েছেন ম্যানচেস্টার স্কুল অব ফিজিওথেরাপির সহযোগী অধ্যাপক ও ফিজিওথেরাপিস্ট ড. ক্রিস ম্যাকার্থি।

    বিবিসির ‘Sliced Bread’ পডকাস্টে তিনি বলেন, সাধারণত মানুষ তিন ধরনের ভঙ্গিতে ঘুমান—কাত হয়ে, চিৎ হয়ে এবং উপুড় হয়ে। তবে উপুড় হয়ে ঘুমানোকে তিনি নিরুৎসাহিত করেন। কারণ এ অবস্থায় দীর্ঘ সময় ঘাড় একদিকে ঘোরানো থাকে, ফলে ঘাড়ের কোনো পেশি বা লিগামেন্টে টান পড়ে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।

    চিৎ হয়ে ঘুমানো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঘাড়ের স্বাভাবিক বাঁক বিবেচনা করা জরুরি। বয়স বাড়ার সঙ্গে মেরুদণ্ডের ওপরের অংশের বাঁক অনেকেরই কিছুটা বাড়ে। যাদের এই বাঁক বেশি, তাদের তুলনামূলক মোটা বালিশ প্রয়োজন হতে পারে।

    অন্যদিকে, কাত হয়ে ঘুমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কাঁধের প্রস্থ। কাঁধ যত চওড়া, সাধারণত বালিশও তত মোটা হওয়া দরকার। তবে এখানে গদির নরম-শক্তভাবও বড় ভূমিকা রাখে। শক্ত গদিতে কাঁধ কম ডোবে, তাই মোটা বালিশ প্রয়োজন হতে পারে। নরম গদিতে কাঁধ বেশি ডুবে যাওয়ায় তুলনামূলক পাতলা বালিশই যথেষ্ট।

    বালিশ খুব পাতলা মনে হলে ম্যাকার্থির সহজ একটি কৌশল রয়েছে—বালিশের নিচে ভাঁজ করা তোয়ালে রাখা। কতটা উঁচু বালিশ প্রয়োজন, তা বুঝতে তোয়ালের ভাঁজের সংখ্যা বাড়ানো-কমানো যায়। একইভাবে তোয়ালে গুটিয়ে বালিশের নিচে রাখলে কাত হয়ে ঘুমানোর সময় ঘাড়ের নিচের অংশে বাড়তি সমর্থন প্রয়োজন কি না, সেটিও পরীক্ষা করা যায়।

    ‘কনট্যুরড’, ‘এরগোনমিক’ বা ‘অর্থোপেডিক’ বালিশের কার্যকারিতা নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত প্রমাণ নেই বলেও জানান ম্যাকার্থি। তবে কাত হয়ে ঘুমানোর ক্ষেত্রে বালিশের সামনের অংশ সামান্য উঁচু হলে কিছু মানুষের উপকার হতে পারে।

    বালিশের উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ। পালক ও ডাউন ভরা বালিশ ঘাড় ও মাথাকে তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা রাখতে পারে, তবে রাতে নড়াচড়া করলে বালিশগুলোর আকার বদলে গিয়ে একদিকে জমাট বাঁধতে পারে। এতে বালিশটি ঢালু হয়ে ঘাড় বেঁকে যেতে পারে। হোলো ফাইবার ও মাইক্রোফাইবার সাধারণত আকৃতি ভালোভাবে ধরে রাখে, যদিও এগুলো তাপ সরাতে পারে কম।

    ম্যাকার্থির নিজের পছন্দ ফোমের বালিশ। প্রায় পাঁচ বছর আগে তিনি প্রায় ৫০ পাউন্ড দিয়ে এমন একটি বালিশ কিনেছেন, যাতে বাতাস চলাচলের জন্য বিশেষ ফাঁকা জায়গা রয়েছে। কাত হয়ে ঘুমানোর কারণে তিনিও নিচে ভাঁজ করা তোয়ালে ব্যবহার করে উচ্চতা সামঞ্জস্য করেন। তাঁর মতে, সবার জন্য একই ধরনের বালিশ উপযুক্ত নয়। তাই বালিশ কেনার সময় সুযোগ থাকলে ট্রায়াল পিরিয়ড ব্যবহার করে নিজের ঘুমের ভঙ্গি ও আরামের সঙ্গে মানানসই বালিশ বেছে নেওয়াই ভালো।

  • শিশুদের রোদে রাখা কতটা বিজ্ঞানসম্মত

    শিশুদের রোদে রাখা কতটা বিজ্ঞানসম্মত

    শিশুদের রোদে রাখা নিয়ে আমাদের সমাজে নানা ধরনের প্রচলিত ধারণা রয়েছে। নবজাতককে কি প্রতিদিন রোদে দিতে হবে? রোদে না দিলে কি জন্ডিস হয়? জন্ডিস হলে কি রোদে দেওয়া জরুরি? বড় শিশুরা দিনের কোন সময় এবং কতক্ষণ রোদে থাকবে?-এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে প্রায়ই দ্বিধা দেখা যায়। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরে শিশুদের রোদে রাখাকে ঘিরে নানা পরামর্শও দেওয়া হয়। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণার চেয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দেশনাই হওয়া উচিত আমাদের পথনির্দেশক।

    নবজাতককে কি রোদে দেওয়া উচিত

    নবজাতকসহ ৬ মাসের কম বয়সি শিশুকে সরাসরি সূর্যের আলোতে রাখা উচিত নয়। নবজাতকের ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তুলনায় তাদের ত্বক অনেক বেশি পাতলা এবং অপরিণত। ফলে ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থাও তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকে।

    সূর্যের আলোতে অতিবেগুনি বা আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি থাকে। খালি গায়ে বা সরাসরি সূর্যের আলোতে নবজাতককে রাখলে এ রশ্মির কারণে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অতিরিক্ত গরমে শিশুর শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে, পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে এবং সানবার্নও হতে পারে।

    তাহলে ভিটামিন ডি-এর কি হবে ভিটামিন ডি তৈরিতে সূর্যের আলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এ জন্য নবজাতককে সরাসরি রোদে রাখার প্রয়োজন নেই। জীবনের প্রথম বছর শিশুকে নিয়মিত ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট দেওয়া যেতে পারে।

    বড় শিশুরা কতক্ষণ রোদে থাকবে

    বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর ত্বকের সহনশীলতাও বাড়ে। ভিটামিন ডি তৈরির জন্য শিশুদের কিছু সময় সূর্যালোকের সংস্পর্শে থাকা প্রয়োজন হতে পারে। বয়স, ত্বকের রং, ভৌগোলিক অবস্থান, ঋতু, দিনের সময় এবং শরীরের কতটুকু অংশ সূর্যের আলো পাচ্ছে-এসব বিষয়ের ওপর প্রয়োজনীয় সময় নির্ভর করে।

    সাধারণভাবে বলা হয়, ১ বছরের কম বয়সি শিশুর ক্ষেত্রে সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন প্রায় ১৭ থেকে ৩০ মিনিট এবং ১ বছরের বেশি বয়সি শিশুর ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সূর্যালোকের সংস্পর্শ উপকারী হতে পারে।

    ভিটামিন ডি তৈরির জন্য দিনের কোন সময় সূর্যালোক বেশি কার্যকর, তা ভৌগোলিক অবস্থান ও ঋতুভেদে পরিবর্তিত হয়। সাধারণভাবে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ৩টার মধ্যে রোদে দেওয়াটা বেশি ফলদায়ক।

    শিশুকে রোদে নেওয়ার জন্য তাকে সম্পূর্ণ কাপড় খুলে দেওয়ারও কোনো প্রয়োজন নেই। শরীরের কিছু অংশ-যেমন মুখমণ্ডল, হাত বা পায়ের অংশ-সূর্যালোকের সংস্পর্শে এলেই ভিটামিন ডি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

    শরীরের কতটুকু অংশ সূর্যের আলো পাবে? আনুমানিক ১৫-৪০% Body Surface Area (BSA)।

    ১৫-৪০% BSA কীভাবে বুঝবেন, আনুমানিকভাবে-

    • মুখ : ৭-১০%
    • হাতের কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত : ৮%
    • হাতের তালু : ৪%
    • পায়ের হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত : ৮-১২%
    • পায়ের গোড়ালি থেকে বাকি অংশ : ৮%

    সানস্ক্রিন ব্যবহার করা যাবে কি

    শিশুদের ক্ষেত্রে সানস্ক্রিন ব্যবহারের নিয়ম বয়সভেদে ভিন্ন হতে পারে। কিছু গাইডলাইনে ৬ মাসের কম বয়সি শিশুকে সরাসরি রোদ থেকে দূরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার বড় শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘসময় বাইরে থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।

    রোদ এবং জন্ডিস : প্রচলিত ধারণা কতটা সঠিক

    নবজাতককে রোদে না দিলে জন্ডিস হয়-এটি একটি ভুল ধারণা। একইভাবে, জন্ডিস হলে অবশ্যই রোদে দিতে হবে-এ কথাটিও বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। নবজাতকের জন্ডিসের কারণ এবং চিকিৎসা আলাদা বিষয়। জন্ডিসের মাত্রা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ আলোর সাহায্যে ফটোথেরাপির প্রয়োজন হয়। ফটোথেরাপি আর সূর্যের আলো এক জিনিস নয়। তাই জন্ডিসের চিকিৎসা হিসাবে শিশুকে সরাসরি রোদে রাখা উচিত নয়।

    প্রকৃতির সঙ্গেই বেড়ে উঠুক শিশু

    শিশুকে জন্মের পর থেকেই খালি গায়ে রোদে রেখে দেওয়া যেমন সমীচীন নয়, তেমনি বড় শিশুকে সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে আটকে রাখাও ঠিক নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর প্রয়োজন হয় খেলাধুলা, খোলা পরিবেশ এবং প্রকৃতির সংস্পর্শ।

    তাই শিশুকে বাইরে যেতে দিন। মাঠে খেলতে দিন। প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে দিন। তবে সবকিছুই হোক বয়স, আবহাওয়া এবং নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে।

    রোদ শিশুদের জন্য শত্রু নয়, আবার অন্ধভাবে ব্যবহার করার মতো কোনো ওষুধও নয়। প্রয়োজন সচেতনতা, বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং নিরাপদ অভ্যাস।

  • বাঁশশিল্পে ৪০ হাজার নারীর জীবন-জীবিকা

    বাঁশশিল্পে ৪০ হাজার নারীর জীবন-জীবিকা

    ফিচার:

    সুপ্রাচীনকাল থেকেই এ দেশে নারীদের তৈজসপত্র বা হস্তশিল্প তৈরিতে সুনাম রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের নারীদের নিজস্ব সংস্কৃতির একটি শিল্প হলো বাঁশশিল্প। গ্রামীণ নারীদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ছাড়াও ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর জীবনাচরণ এবং অনুভূতির প্রতীক এই শিল্প। নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত নারী কারিগররা বাঁশশিল্পের শৌখিন সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের জীবনে আজও শৌখিনতার ছোঁয়া লাগেনি।

    ব্যাসকাঠির বাঁশশিল্প : সুকলা মজুমদারের কাছে তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কম দামের এক টুকরো কাপড় আর দুমুঠো খাবারেই গুজরান নিত্যদিনের সম্বল।’ প্লাস্টিক পণ্যসামগ্রীই ওদের সুখের জায়গা দখল করে নিয়েছে। কথোপকথনের একপর্যায়ে অশ্রুসিক্ত জল আর দীর্ঘশ্বাস যেন বলে দেয়, ‘ওদের কাছে বেঁচে থাকা মানেই ভালো থাকা।’ আধুনিকায়নে এই হস্তশিল্প অনেকটা ম্লান হয়ে যাওয়ায় বাঁশশিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কমে গেছে। স্বরূপকাঠি বিসিক শিল্পনগরীর সুবিধাবঞ্চিত দুটি বাঁশশিল্প বন্ধ হয়ে গেছে আরো ৯ বছর আগে। বিংশ শতাব্দীর শেষদিকেও নেছারাবাদ উপজেলায় (স্বরূপকাঠি) ১৩৭টি গ্রামে ৪৬টি বাঁশশিল্প ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে ২৬টি বিলুপ্তি হয়ে গেলেও ২০টি শিল্প এখনো টিকে আছে।সারেংকাঠির বাঁশশিল্প : মালিক শিলা হালাদার বলেন, ‘বাপ-দাদার এ পেশায় এখনো আছি আর কয়দিন টিকে থাকতে পারব, তা জানি না।’ বাঁশের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, প্লাস্টিকের তৈরি জিনিসপত্রের বাজার দখল, বাঁশের অপ্রতুলতা, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও পরিকল্পিত উদ্যোগ না থাকায় বিলুপ্ত হতে চলছে নেছারাবাদের গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প। প্রায় পাঁচ যুগ আগেও গৃহস্থালি ব্যবহারে বাঁশের তৈরি বহুমাত্রিক পণ্যের ব্যবহার ছিল পল্লির ঘরে ঘরে।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অর্ধশত বছর আগেও নেছারাবাদ উপজেলায় প্রায় ৪০ হাজার বাঁশশিল্পী নারী উদ্যোক্তা বাণিজ্যের কথা চিন্তা করে পৈতৃক পেশায় জড়িত থেকে ৩০-৪০ প্রকারের শৌখিন সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পৃষ্ঠপোষকতার অভাব আর প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে বাঁশ হস্তশিল্প বিলুপ্ত হতে চলছে। গ্রামীণ নারীদের উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান ও সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি (গ্রামউকসক) সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের যে কয়টি প্রাকৃতিক উপাদান লোকজীবনের সঙ্গে মিশে আছে, তার মধ্যে গ্রামীণ নারীদের বাঁশশিল্প একটি বড় সংস্কৃতি।

    নেছারাবাদ উপজেলায় পৈতৃক সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে করফা, সারেংকাঠি, গয়েসকাঠি, ভরতকাঠি, কাটাপিটানিয়া, জিরবাড়ি, খেজুরবাড়ি, লেবুবাড়ি, চিলতলা, রাজাবাড়ি, দেবদাসকাঠি, ব্যসকাঠিসহ ২০টি গ্রামে পাঁচ শতাধিক নারীপ্রধান পরিবারের প্রায় ৭ হাজার নারীশ্রমিক বাঁশশিল্পকে উপার্জনের প্রধান উৎস হিসেবে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছেন। এসব গ্রামের প্রত্যেকটি বসতবাড়ি এখনো যেন একেকটি বাঁশশিল্প প্রতিষ্ঠান। বিকাল ৩টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে বসে বুনছেন বাঁশের পণ্য এবং হাজারো নারী স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। নারীপ্রধান পরিবারগুলোর ছেলেমেয়েরাও পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে মাকে সহযোগিতা করছে এ কাজে।

    চিলতলা গ্রামের বৈরাগী সেতু শিকদার বলেন, ‘১৩ বছর আগে স্বামী মারা গেছেন। চারটি ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার। বাঁশের চটি, বেতি বানিয়ে ওদের তিনজনের লেখাপড়া ও সংসার চালাতে হয়।’ জিরবাড়ির বাঁশশিল্পের কারিগর তালাকপ্রাপ্ত সবিতা ডালী বলেন, ‘স্বামীর সংসার অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। দুই সন্তান নিয়ে এ মাছ ধরা খলই তৈরি করে যা পাই, তা দিয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছি।’

    ভরতকাঠির কবিতা হালদার বলেন, ‘বিকাল ৩টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বাঁশ দিয়ে আউড়া তৈরি করি। স্বামী বিভিন্ন এলাকার বাঁশশিল্পের পণ্য দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকারি বিক্রি করে যে আয় করতেন, তা দিয়ে তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে ভালোই চলত। কিন্তু বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্য মোগো ভাত কেড়ে নিয়েছে। তার পরও পৈতৃক পেশা টিকিয়ে আছি।’বাঁশ দিয়ে কীভাবে গৃহস্থালি ব্যবহারের পণ্য তৈরি করা হয়, তা জানতে চাইলে গয়েসকাঠির বাঁশশিল্পের মালিক পুষ্প রানি বলেন, ‘প্রথমে পণ্য অনুযায়ী বাঁশ তিন দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। এরপর বাঁশ চিরে ফানা, কণসি, বাঁশের চটি, বেতি, আউড়া, মাড়াই ও পণ্য তৈরির মাপে চারপাশ বাঁধাই করার জন্য বাঁশের সুতি প্রস্তুত করে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা হয়।’ এসব কাঁচা উপাদান দিয়ে পল্লির নারীদের নিপুণ হাতের শৈল্পিক ছোঁয়ায় ঝুড়ি, চাটাই, ডালি, হাতপাখা, কুলা, চালুন, ঝাড়ু, খুঁচি, ভাত-তরকারি রাখার ঝাঁপা, মাছের খাঁচা, মাছ ধরার খলই, পশুর হাত থেকে গাছ রক্ষার খাঁচা, মুরগির বাচ্চা রাখার খলই, পুরা, খাড়াই, ঝাড়ঝড়ি, ঢাকনা, বইপত্র রাখার র‌্যাক, ধান-চাল রাখার মোড়াসহ প্রায় ২০-২২ ধরনের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতীক তৈরি করা হয়।

    কয়েকটি এলাকা সরেজমিন ঘুরে বাঁশের অনেক শৌখিন পণ্য তৈরির দৃশ্য দেখা যায়। এ সময় কথা হয় দেবদাসকাঠির ৭০ বছর বয়সি বর্ষীয়ান বাঁশশিল্পের কারিগর হরিমন বিবির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘২২ বছর আগে স্বামী মারা গেছেন। ছেলেমেয়েরাও খোঁজখবর নেয় না। বৃদ্ধ বয়সে বাঁশের আশ বানিয়ে যা পাই, তা দিয়ে কোনো রকমে আছি। রোগবালাইয়ের শেষ নেই। ওষুধ কিনতে জান ফুরিয়ে যায়। আগের মতো এখন আর কাজ করতে পারি না। কাজ বন্ধ হয়ে গেলে কী খাইয়া যে বাচুম, হেয়া মুই জানি না রে বাজান!’

    সচেতন মহল মনে করে, এ শিল্পটি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের অন্তর্ভুক্ত হলেও সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো সংস্থাই এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার ভূমিকায় এগিয়ে আসছে না। এ শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরিভাবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা, পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।এ ব্যাপারে স্বরূপকাঠির ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প (বিসিক) ম্যানেজার মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, বাঁশশিল্পকে ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্তকরণের বাস্তবায়নে মাঝারি শিল্প খাতের দ্রুত বিকাশ ও উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারিশিল্পে নারী উদ্যোক্তারা যাতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, সেজন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানানো হবে।

  • হাড়ের ক্যানসারে ঝুঁকির কারণ

    হাড়ের ক্যানসারে ঝুঁকির কারণ

    হাড়ের ক্যানসার বলতে সাধারণভাবে হাড়ের কোষ থেকে উদ্ভূত ক্যানসারকে বোঝানো হয়। এ ধরনের ক্যানসারকে একত্রে বোন সারকোমা নামে ডাকা হয়। সাধারণত নারীদের তুলনায় পুরুষদের কিছুটা বেশি হয়ে থাকে, যার অনুপাত ১:১.৬। এটি কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। অস্টিওসারকোমা, উইংস সারকোমা, কন্ড্রোসারকোমা, অস্টিওসারকোমা ও উইংস সারকোমা। সাধারণত ১০-২০ বছর এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সি যারা তাদের মধ্যে এটি বেশি হয়। কন্ড্রোসারকোমা মধ্যবয়সি ও বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। সাধারণত হাত ও পায়ের লম্বা হাড়গুলোয় হয়ে থাকে। তবে কিছু ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডের হাড়েও হতে পারে।

    উচ্চ ঝুঁকির কারণ

    ১. জেনেটিক কারণ : ফ্যামিলিয়াল রেটিনোব্লাস্টোমা যাদের রয়েছে, তাদের অস্টিওসারকোমার ঝুঁকি ৪০০ গুণ বেশি।

    ২. রেডিয়েশন থেরাপি : শরীরের কোনো অংশে (হাতে বা পায়ে) রেডিওথেরাপি দেওয়ার প্রয়োজন পড়লে তার প্রায় তিন বছরের অধিক সময় পর সেখানে অস্টিওসারকোমা হতে পারে।

    ৩. ট্রমা : এটা সারকোমার কারণ নয়। তবে অনেক সময় দেখা যায়, শরীরের কোনো হাড় ভেঙে যাওয়ার পর অপারেশন করতে গিয়ে হাড়ের ক্যানসার শনাক্ত হয়।

    ৪. অর্থোপেডিক ইমপ্ল্যান্ট : কিছু ক্ষেত্রে মেটালিক প্রস্থেটিক ডিভাইসের স্থানে সারকোমা হতে পারে।

    শনাক্তকরণের উপায়

    বায়োপসি পরীক্ষা : কেটে অথবা নিডলের সাহায্যে বায়োপসি করা যায়। বায়োপসি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে রোগ শনাক্ত করা যায়। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া অন্যান্য পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে—

    এছাড়া কিছু সাধারণ উপসর্গ থাকতে পারে। যেমন জ্বর, শরীর ম্যাজম্যাজ করা, ওজন কমে যাওয়া প্রভৃতি উইংস সারকোমার ক্ষেত্রে প্রকাশ পেতে পারে।

    • এক্স-রে

    • সিটি স্ক্যান

    • এমআরআই

    • বোন স্ক্যান

    • পেট সিটি স্ক্যান

    চিকিৎসা

    চিকিৎসার ক্ষেত্রে সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি এবং ইমিউনোথেরাপি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

    প্রতিরোধের উপায়

    ১. যাদের মধ্যে উচ্চ ঝুঁকির কারণ রয়েছে, তারা ডাক্তারের কাছে গিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা—অন্তত একটা এক্স-রে পরীক্ষা করে ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন।

    ২. আক্রান্ত হয়ে গেলে অতি দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

    ৩. নিয়মিত ও যথাসময়ে চিকিৎসা গ্রহণ করলে বোন ক্যানসার থেকেও মুক্তি সম্ভব।

    লেখক : টিউমার ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞ টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ, বগুড়া

  • টাইলস পরিষ্কার ও ঝকঝকে রাখার উপায়

    টাইলস পরিষ্কার ও ঝকঝকে রাখার উপায়

    ফিচার:

    প্রত্যেকেই তার ঘরটি সুন্দর ও ঝকঝকে রাখতে চান। এজন্য অবশ্যই ঘরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঘরের সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। ঝকঝকে সাদা টাইলস ঘরটি করে তোলে আরো বেশি উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয়।টাইলস ও ব্যবহার : বর্তমানে ভবনের অন্দরে-বাইরে থিমভিত্তিক নকশার প্রচলন চলছে। তাই হরেক রকম টাইলসও পাওয়া যাচ্ছে। তবে মার্বেল, কংক্রিট, পোরসেলিন ও সিরামিক টাইলসের ব্যবহার চোখে পড়ছে বেশি। কোনো টাইলস মেঝের তাপ ও চাপ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। আবার কিছু টাইলস দেখতে সুন্দর হলেও ভঙ্গুর প্রকৃতির। কিছু টাইলস আর্দ্রতা সয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শক্তপোক্ত হয়, কিছু আবার আর্দ্রতা পেলে ক্ষয় হতে শুরু করে। তাই মেঝে বা দেয়াল যেখানেই টাইলস ব্যবহার করা হোক, সুবিধা-অসুবিধা আর পরিষ্কার করার উপায় জেনেই দীর্ঘস্থায়ী টাইলস লাগানো উচিত।যা দিয়ে পরিষ্কার করবেন : টাইলসের কঠিন ও জেদি দাগ দূর করতে সাদা ভিনেগার, বেকিং সোডা কিংবা বিশেষ বাণিজ্যিক টাইলস ক্লিনার ব্যবহার করা যায়। নিয়মিত টাইলস পরিষ্কার করার জন্য প্রয়োজন মাইক্রোফাইবার কাপড়, সাধারণ ডিটারজেন্ট বা সোপ, হালকা গরম পানি, নরম ঝাড়ু বা ব্রাশ। টাইলস সহজে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রয়েছে নানারকম নিয়ম। টাইলস ঝকঝকে পরিষ্কার রাখার কিছু টিপস ও পরামর্শ দেওয়া হলো।

    সিরামিক : বাজারে বিভিন্ন আকারের চকচকে রঙবেরঙের সিরামিক টাইলস পাওয়া যায়। আজকাল আনগ্লেজড সিরামিক পাওয়া যায়। এই টাইলসগুলোর চাপ সহ্য করার ক্ষমতা কম, তাই পরিষ্কার করার সময় শক্ত ব্রাশ ব্যবহার না করাই ভালো। ডিশ সোপ বা সাদা ভিনেগার আর হালকা গরম পানি ব্যবহার করে সহজেই এ টাইলসের দাগ পরিষ্কার করা যায়; এতে টাইলসের চকচকে ভাবটাও অটুট থাকে। আর স্পঞ্জের কাপড় ব্যবহার করে টাইলস পরিষ্কার করলে অবশ্যই বারবার ময়লা পানি পরিবর্তন করতে হবে। সেইসঙ্গে পরিষ্কার করে পানি শুকিয়ে যাওয়ার আগে শুকনা সুতি কাপড় দিয়ে মেঝে মুছে ফেলতে হবে। তাহলে টাইলসে পানির ছোপ ছোপ দাগ লেগে থাকবে না।

    পোরসেলিন : কম ভঙ্গুর ও সহজে দাগ পড়ে না বলে মেঝের টাইলস হিসেবে পোরসেলিন বেশ জনপ্রিয়। এতে নানা রকমের নকশা কপি করা যায়। মার্বেল বা কাঠের টেক্সচার—সবই হুবহু কপি করা যায়। পোরসেলিনের টাইলসও তরল সাবান অথবা ভিনেগারের সঙ্গে কুসুম গরম পানি মিশিয়ে পরিষ্কার করা যায়। তবে রান্নাঘর বা বাথরুমের টাইলসের হলদে ভাব কাটানোর জন্য সপ্তাহে একবার অ্যাসিডিক বা ব্লিচ ক্লিনার সল্যুশন ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি স্প্রে বোতলের সাহায্যে নোংরা জায়গায় ক্লিনার সল্যুশন স্প্রে করে কিছুক্ষণ রেখে দিতে হবে। তারপর হাতে গ্লাভস পরে বাথরুমের ব্রাশ দিয়ে

    হালকা করে ঘষে পরিষ্কার করে নিতে পারেন। সরাসরি ক্লিনার সল্যুশন ব্যবহার করার আগে অবশ্যই টাইলসে অল্প করে ফেলে পরীক্ষা করে নেবেন, টাইলসের রঙ পরিবর্তিত হয়ে যায় কি না। অ্যাসিডিক ক্লিনার ব্যবহারে অনেক সময় টাইলস ক্ষয় হয়ে যায় বা বিবর্ণ হয়ে যেতে পারে। তাই এ ধরনের ক্লিনার ব্যবহার করার আগে এর পিএইচ লেভেল দেখে কেনা উচিত।

    টেরাকোটা টাইলস : ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটা টাইলস পরিষ্কার করার আগে প্রথমেই ভ্যাকুয়াম করা বা শুকনা কাপড় দিয়ে ধুলা মুছে নেওয়া উচিত। শক্ত ময়লার জন্য প্রয়োজনে ব্রাশ ব্যবহার করা যেতে পারে। হালকা গরম পানি আর ডিশ ওয়াশার দিয়ে মুছে নিলেই এসব টাইলসের ময়লা ভাব কেটে যায়। অতিরিক্ত ময়লার জন্য অক্সালিক অ্যাসিড আর পানির মিশ্রণ ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যায়। হালকা গরম পানি আর ডিশ ওয়াশার দিয়ে মুছে নিলেই ময়লা ভাব কেটে যায়।

    কুয়েরি টাইলস : অনেকটা টেরাকোটা ধরনের টাইলস, তাই পিএইচ নিরপেক্ষতা বুঝে তেমন ক্লিনার দিয়ে মুছে ফেলাই ভালো। এই টাইলসে অ্যাসিডিক ক্লিনার ব্যবহারে টাইলস ক্ষয়ে যেতে পারে।

    জেল্লিজ টাইলস : এটি মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষত মরক্কোর তৈরি একধরনের পোড়ামাটি টাইলস। মেটে মেটে রঙের জ্যামিতিক নকশায় সাজানো এই টাইলসে ‘হাতে তৈরি’ ভাব থাকায় মিনিমালিস্ট ভক্তদের খুব পছন্দ। এই টাইলস বারান্দায় বা রান্নাঘরের দেয়ালে ব্যবহার করলে দু-চার দিন পরপর শুকনা কাপড় দিয়ে ধুলা পরিষ্কার করে নিতে হবে। অম্লধর্মী ক্লিনারের সাহায্যে এই টাইলস পরিষ্কার না করা ভালো।

    স্লেট টাইলস : সাদা-কালো রঙের বাড়ির জন্য স্লেট টাইলস। তামাটে কয়লা বা রুপালি রঙের মিশ্রণে এই টাইলসগুলা হয়ে থাকে। সাধারণত বাসার বাইরের রান্নাঘর, বারান্দা ও কটেজে ব্যবহারের উপযোগী। এমন টাইলস দু-এক দিন পরপর ভ্যাকুয়াম করে বা শুকনা কাপড়ে মুছে রাখলে দেখতে সুন্দর লাগবে।

    মার্বেল : মার্বেলের টাইলস সহজেই ঘর আলোকিত করে তোলে। গ্রানাইটের চেয়ে কম সহনীয় ও ভঙ্গুর হওয়ায় অন্দরে বেশি ব্যবহার করা হয়। মার্বেলের টাইলস যত্ন নিয়ে ব্যবহার করলে অনেক বছর পর্যন্ত নতুনত্বের ভাব রয়ে যায়। তবে অম্লধর্মী ক্লিনার মার্বেলে ব্যবহার করা যাবে না। মার্বেলের টাইলসে দাগ পড়লে এক চামচ বেকিং সোডা আর পানি মিশিয়ে পেস্ট করে দাগ বা ময়লা জায়গায় লাগাতে হবে। এরপর প্লাস্টিকের র‌্যাপিং দিয়ে মুড়িয়ে কয়েক ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। শেষে সুতি কাপড় দিয়ে মুছে নিলে দাগও পরিষ্কার হবে, সেইসঙ্গে মার্বেলের ঝকঝকে ভাব ফিরে আসবে।

    টাইলস যে ধরনেরই হোক না কেন, সাধারণ কিছু জিনিস মনে রাখা জরুরি।অনেক সময় দাগ বা ময়লা দুই কাটিং টাইলসের মাঝে বেশি লেগে থাকে। অনেকে এসবের জন্য স্টিমিং ক্লিনিংয়ের পরামর্শ দিলেও এটি টাইলসের জন্য ক্ষতিকর। তাই এতে বেকিং সোডা আর পানির পেস্ট তৈরি করে কয়েক ঘণ্টা প্লাস্টিক দিয়ে মুড়িয়ে রাখাই ভালো। অথবা রাতভর এভাবে রেখে সকালে ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে নিলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায় সিলিকন বেজ সিলিং করিয়ে নিলে। এতে ময়লা, আর্দ্রতা বা পানি—কোনোটাই টাইলসের ক্ষয় করতে পারে না।

  • বর্ষার আঁচল ধরে শরতের আগমন

    বর্ষার আঁচল ধরে শরতের আগমন

    প্রকৃতিতে শরৎ এসেছে সেই কবে। ভাদ্রের আকাশে তার নীলচে আভাস, মাঠের কিনারে কাশের সাদা শির, বাতাসে শরতের নরম ছোঁয়া। তবু বর্ষা পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। আকাশের মেজাজে তার রেশ রয়েই গেছে। এক মুহূর্তে রোদে ঝলসে ওঠে চারদিক, পরক্ষণেই কোথা থেকে কালো মেঘ এসে সূর্যের মুখ ঢেকে ফেলে। দূরের দিগন্ত প্রথমে ধূসর হয়, তারপর গাঢ় নীল-কালো। বাতাস ভারী হয়ে আসে। গাছের পাতাগুলো উল্টে গিয়ে রুপালি পিঠ দেখায়। পাখিরা হঠাৎ নিচু হয়ে উড়ে। তারপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আকাশ ভেঙে নামতে থাকে বৃষ্টি।

    ভাদ্র মাসে শরৎ নরম পায়ের মৃদু শব্দে হেঁটে বেড়ায়। ভোরের আলোয় আকাশের নীল একটু একটু করে স্বচ্ছ হয়। সকালের বাতাসে বর্ষার স্যাঁতসেঁতে গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকে অচেনা এক নির্মলতা। মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের সেই চিরচেনা পঙ্‌ক্তি—

    ‘আজি শরততপনে প্রভাতস্বপনে

    কী জানি পরান কী যে চায়।’

    সত্যিই তো, শরতের এই আলোয় মানুষের মনও কি একটু বদলে যায় না? কোনো কারণ ছাড়াই মন কেমন উদাস হয়ে থাকে। মনে হয়, কোথাও যেতে হবে; অথচ কোথায়? তা জানা নেই। কোনো অচেনা সৌন্দর্যের দিকে মন ছুটে যেতে চায়।

    রোদের ফাঁকে কাপড় মেলে দিয়ে ঘরে ফিরতে না ফিরতেই ঝমঝম বৃষ্টিতে ছাদ ভরে যায়। টিনের চালে বৃষ্টির আঘাত একটানা তীব্র হয়ে বেজে ওঠে। আম, কাঁঠাল, শিরীষের পাতায় জল ছিটকে পড়ে। উঠোনের ধুলো মুহূর্তে কাদায় গলে যায়। জানালার ওপারে বৃষ্টির পর্দা নামে। তার ভেতর দিয়ে গাছগুলো আবছা, ঘরগুলো মলিন, পথগুলো যেন হঠাৎ কোথাও হারিয়ে যায়।

    ষ্টি থামলে দৃশ্যটি আবার বদলে যায়। পাতার ডগায় স্বচ্ছ জলবিন্দু কাঁপতে থাকে। কোথাও টুপ করে পড়ে, কোথাও আরেকটি পাতায় গড়িয়ে যায়। ভেজা ঘাসের ওপর নরম আলো পড়ে। দূরের মাঠে জমে থাকা পানিতে আকাশের ছেঁড়া নীল ভেসে থাকে। কাশবনের সাদা ফুলগুলো বাতাসে একসঙ্গে দুলে ওঠে—মনে হয়, মাটির ওপর ছোট ছোট ঢেউ উঠেছে।

    আর তখনই শরৎকে সবচেয়ে কাছের মনে হয়।

    কোথাও শেফালি ফুটেছে কি না, জানি না; তবু মনে হয়, বাতাসের ভেতর তার গন্ধ লুকিয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের গানটি যেন সেই মুহূর্তে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—

    ‘ওই শেফালির শাখে

    কী বলিয়া ডাকে বিহগ বিহগী

    কী যে গায় গো।’

    খোলা মাঠে বসে আকাশ দেখতে ভালো লাগে। বিলের ধারে বসলে আরো ভালো লাগে। বর্ষার পানি এখনো অনেকটা জমে আছে। তার ওপর মেঘের ছায়া ধীরে ধীরে সরে যায়। কোথাও শাপলার পাতা, কোথাও জলের বুক চিরে ওঠা ছোট মাছের বৃত্তাকার ঢেউ। দূরে কোথাও কাদামাটির বাঁধ, তার ওপারে তালগাছের সরু কালো অবয়ব। বাতাস এলে বিলের পানি কেঁপে ওঠে, আর সেই কাঁপুনিতে ভেঙে যায় আকাশের প্রতিবিম্ব।

    সেই মুহূর্তে মনে হয়, প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকা আসলে নিজের মনের ভেতরে তাকিয়ে থাকা। এই মেঘ, এই বৃষ্টি, এই হঠাৎ রোদ—সবকিছুর মধ্যেই মানুষের মনের কোনো না কোনো ছায়া লুকিয়ে থাকে। কখনো মনও তো এমন হয়; একটু আলোয় ভরা, পরক্ষণেই মেঘে ঢাকা। আবার কোনো এক অজানা হাওয়ায় সেই মেঘ সরে যায়, আলো আসে।

    নদীর পাড়ের দৃশ্য আরো বিস্তৃত। স্রোতের ওপর ভাঙা রোদের টুকরো ছুটে বেড়ায়। দূরে একটি নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়; তার পেছনে জলের শরীরে দীর্ঘ দাগ কেটে থাকে। ওপারের চর কুয়াশার মতো আবছা। কোনো অচেনা পাখি ডেকে ওঠে। বাতাসে কাশের গন্ধ, কাদার গন্ধ, জলের সোঁদা গন্ধ মিশে থাকে।

    তখন মনে হয়,

    ‘আজি মধুর বাতাসে হৃদয় উদাসে,

    রহে না আবাসে মন হায়

    কোন কুসুমের আশে কোন ফুলবাসে

    সুনীল আকাশে মন ধায় গো।’

    ভাদ্র-প্রকৃতি এমনই। স্থির নয়, অথচ অপূর্ব; একসঙ্গে বর্ষার বিদায় আর শরতের আগমন বহন করে। রোদ তার শরীরে আগুন জ্বালে, মেঘ এসে সেই আগুন ঢেকে দেয়; বৃষ্টি মাটিকে ভিজিয়ে দেয়, আবার সেই ভেজা মাটির বুকেই জন্ম নেয় নতুন সবুজ।

    শরৎ তাই শুধু নির্মেঘ নীল আকাশের ঋতু নয়। শরৎ কখনো আসে বর্ষার ভেজা হাত ধরে, কখনো কালো মেঘের ফাঁক গলে, কখনো কাশফুলের সাদা দোলায়। ভাদ্রের এই ভেজা-রৌদ্রোজ্জ্বল দিনগুলোতেও সে নিঃশব্দে নিজের আগমন লিখে যায় কাশফুলের সাদা অক্ষরে, শেফালির গন্ধে, ভেজা মাটির ঘ্রাণে, বিলের জলে কেঁপে ওঠা আকাশে।

    আর মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে সেই আগমনের সামনে—কখনো মাঠের ধারে, কখনো নদীর পাড়ে, কখনো জানালার পাশে। কোনো উত্তর খোঁজে না। শুধু দেখে ও শোনে। আর অকারণেই মনে হয়, প্রকৃতি যখন ঋতু বদলায়, মানুষের মনেও যেন অদৃশ্য কারণে ঋতু বদলে যায়।

  • শুভ্র শরৎ

    শুভ্র শরৎ

    ফিচার:

    গাঢ় নীল আকাশ। প্রখর রোদ। প্রচণ্ড গরম। দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে ভেসে যাচ্ছে সাদা মেঘের ভেলা। নদীর ধারে ফুটেছে সাদা সাদা কাশফুল। অনবরত বাতাসে দোল খায় ফুলগুলো। দেখতে কী চমৎকার লাগে! যেন চোখ জুড়িয়ে যায়। সাদা বকেরা ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় নীল আকাশে। বাঁশঝাড়ে বাচ্চা তুলেছে কালো ডাহুক। বড় পুকুরধারে জারুল গাছে বসে মাছ শিকার করে মাছরাঙা। এ ঋতুতে অনেক ধরনের ফুল ফোটে। শিউলি, কামিনী, হাসনাহেনা, দোলনচাঁপা ও বেলি ফুলের গন্ধে বাতাস ম-ম করে। বাতাসে ছোট ছোট ঢেউ ওঠে নদী, খাল, বিল ও ঝিলে। মাঝি পাল তুলে গঞ্জের হাটে ও বন্দরে যায় নৌকা নিয়ে। গায় ভাটিয়ালি গান—‘ও নদীরে রূপ দেইখা তোর হইয়াছি পাগল’ অথবা ‘নদীর কূল নাই কিনার নাইরে…।’ শরতের চাঁদনি রাতে গ্রামের পরিবেশ হয় মোহনীয় ও মায়াবী। উড়ে বেড়ায় জোনাকিরা। শরৎ নিয়ে একটি ছড়া আছে, ছড়াটি এ রকম—‘শাপলা ফোটে বিলের জলে, এখন শরৎকাল, কাশ ফুটেছে নদীর তীরে, ফেলছে জেলে জাল।’

    পানকৌড়ি একটি সুন্দর পাখি। এ পাখিটি ডিম দেয় শরৎকালে। এরা পাঁচ থেকে সাতটি ডিম দেয়। ভাদ্র-আশ্বিন এ দুমাস শরৎ ঋতু। যাযাবর ফুল হিসেবে পরিচিত কচুরিপানাও এ শরতেই ফোটে। শরতের প্রথম অংশ ভাদ্র মাস। বিশেষ কিছু কারণে বিখ্যাত। এ ভাদ্র মাসেই হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী পালন করে। ভাদ্র মাসের শেষ পূর্ণিমা রাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি আধ্যাত্মিক সম্প্রদায় ভেলা ভাসায়। জন্মাষ্টমী ও ভেলা ভাসানো কেন্দ্র করে মেলা বসে বিভিন্ন গ্রামে। সারা রাত চলে মুর্শিদি ও বিভিন্ন ধর্মীয় গান। বাঁশের কঞ্চি কেটে ও কলাগাছের মাধ্যমে ভেলা বানানো হয়। ভেলার মধ্যে রঙিন কাগজের ঘর বানানো হয়। সে ঘরের ভেতরে নানা ধরনের ফল দেওয়া হয়। দেওয়া হয় মিষ্টি, পায়েস ও বাতাসা। ভেলায় বানানো ঘরটি ভাসিয়ে দেওয়া হয় জোয়ার-ভাটার পানিতে। শরৎকালেই কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ফসলের বীজ বপন করে। বাংলার অন্য ঋতুগুলো থেকে শরৎকাল সম্পূর্ণ আলাদা। লালশাক, পালংশাক ও মূলা এ ঋতুতেই উৎপাদিত হয়। ফুল, ফল ও সবজির সমারোহ শরৎকালে।

    আমাদের হাজার বছরের নিজস্ব ঐতিহ্য শরৎ ঋতু। এটি আবহমান বাংলারই একটি রূপ। বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। দুমাস পরপর এ দেশে ঋতু পরিবর্তন হয়। কখনো প্রচণ্ড গরম। আবার প্রচণ্ড ঠান্ডা! খুব বৃষ্টি! কখনো মিষ্টি রোদ। শিশির সকাল! এটা শুধুই বাংলাদেশে সম্ভব। কবির ভাষায় তাই বলতে ইচ্ছা করে—‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি।’

  • ঘড়ির কাঁটা কেন ডানে ঘোরে

    ঘড়ির কাঁটা কেন ডানে ঘোরে

    ফিচার:

    তুমি কি কখনো দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে ভেবেছ, ‘ঘড়ির কাঁটা সবসময় ডান দিকেই কেন ঘোরে?’ যদি একদিন হঠাৎ কাঁটাগুলো উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করে, তাহলে কেমন হতো? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে বহু বছর আগের মানুষের বুদ্ধি আর প্রকৃতির এক মজার নিয়মে।

    অনেক অনেক বছর আগে মানুষের হাতে আজকের মতো ব্যাটারিচালিত বা ডিজিটাল ঘড়ি ছিল না। তখন মানুষ সময় বুঝত সূর্যের ছায়ার সাহায্যে। তারা কোনো খোলা জায়গায় মাটিতে একটি সোজা কাঠি পুঁতে রাখত। লাঠির গায়ে সূর্যের আলো পড়লে সেই কাঠির ছায়া তৈরি হতো। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সূর্য আকাশে এগোতে থাকলে ছায়াটিও ধীরে ধীরে একদিকে সরে যেত।

    পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে, যেখানে প্রাচীন সভ্যতার অনেক কিছুই গড়ে উঠেছিল, সেখানে ছায়ার এই চলার দিক ছিল ডানদিকে ঘুরে যাওয়ার মতো। মানুষ সেই ছায়ার গতিবিধি দেখে সময় মাপতে শিখে। পরে যখন যান্ত্রিক ঘড়ি তৈরি করা হয়, তখন তার কাঁটাকেও সেই পরিচিত দিকেই ঘোরানো হয়। সেই থেকেই ঘড়ির কাঁটা ডানদিকে ঘোরে। এই দিকটিকেই আমরা আজ ‘ঘড়ির কাঁটার দিক’ বলে চিনি।

    মজার বিষয় হলো, পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে সূর্যঘড়ির ছায়ার চলার ধরন কিছুটা ভিন্নভাবে দেখা যায়। তবুও তখন পর্যন্ত ডান দিকে ঘোরা ঘড়ি সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল। তাই সবাই একই নিয়ম অনুসরণ করতে শুরু করে। এতে বিভিন্ন দেশের মানুষের সময় বোঝা সহজ হয়ে যায়।

    ঘড়ির কাঁটা আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। দেখো, সেকেন্ডের কাঁটা এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকে না। মিনিটের কাঁটা ধীরে ধীরে এগোয়, আর ঘণ্টার কাঁটা আরো ধীরগতিতে চলে; কিন্তু তারা কেউ অলসতা করে না। ছোট ছোট মুহূর্ত মিলেই একটি মিনিট, অনেক মিনিট মিলেই একটি ঘণ্টা, আর ঘণ্টা মিলেই একটি সুন্দর দিন তৈরি হয়। তাই ছোট কাজকে কখনো তুচ্ছ ভাবা উচিত নয়।ভাবো তো, যদি তুমি প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট বই পড়ো, কয়েক মাস পরে কত গল্প, কত নতুন তথ্য আর কত জ্ঞান তোমার ঝুলিতে জমে যাবে! ঠিক ঘড়ির কাঁটার মতো ধীরে ধীরে এগোলে বড় লক্ষ্যও একদিন পূরণ হয়। তাই পরেরবার ঘড়ির দিকে তাকালে শুধু সময় দেখবে না। মনে রাখবে, ডানদিকে ঘুরতে থাকা সেই ছোট্ট কাঁটাগুলো আমাদের বলছে—সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। যে নিয়ম মেনে পরিশ্রম করে, সময়কে সম্মান করে এবং প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে যায়—সফলতা একদিন তার দরজায় কড়া নাড়বেই।

  • জলকন্যার বুকে গোলাপি আলপনা

    জলকন্যার বুকে গোলাপি আলপনা

    ফিচার

    জলকন্যার বুকে গোলাপি আলপনাবর্ষার প্রচ্ছদ পেরিয়ে যখন রূপসী বাংলার আকাশে শরতের অমল ধবল মেঘের খেয়া ভেসে বেড়ায়, তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উত্তর-পূব সীমান্তের এক অখ্যাত জলাশয় রূপ নেয় কোনো এক অলৌকিক চিত্রপটে। চোখের সীমানা ছাড়িয়ে যেখানেই দৃষ্টি যায়, শুধুই সবুজের সমারোহ আর তার বুক চিরে উঁকি দেওয়া অজস্র অমলিন পদ্ম। প্রভাত ও গৌধুলীর স্নিগ্ধ রোদ যখন কালচে জলের বুকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন হাজার হাজার গোলাপি ও শ্বেতপদ্ম শিশিরবিন্দু ধারণ করে যেন প্রকৃতির এক অনুপম রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করে।

    আখাউড়ার সীমানা ঘেঁষা ঘাঘুটিয়া ও মিনারকুটের এই জলাভূমি এখন আর কেবল জলের আধার নয়, রূপসী বাংলার এক প্রাণবন্ত কাব্যগ্রন্থ।

    প্রতি শরতেই প্রাকৃতিকভাবেই এই বিলে ফুটে ওঠে শত শত পদ্ম। সাম্প্রতিককালে রূপপিপাসু পথিক ও আলোকচিত্রীদের কল্যাণে এ যেন এক জনাকীর্ণ স্বর্গে পরিণত হয়েছে। ভোর হতে না হতেই বিলের শান্ত জলরাশি জেগে ওঠে গুঞ্জন আর মুগ্ধতার গুঞ্জরণে। পলিমাটির সুবাস, জলজ উদ্ভিদের তীব্র আকুলতা আর পদ্মের মৌ মৌ গন্ধ মিলেমিশে বাতাসকে করে তোলে সুবাসিত। সুদূর দিগন্ত থেকে ভেসে আসা বালিহাঁস, পানকৌড়ি আর গাঙচিলের কিচিরমিচির সেই সৌন্দর্যকে দেয় এক অনন্য ছন্দ ও সুর।

    ভোরের প্রথম আলো থেকে গৌধুলী লগ্ন পর্যন্ত ফুটতেই বিলের ঘাটে বাঁধা ডিঙ্গি নৌকাগুলো রূপসী কূলের পানে ছুটে চলে। মেহগনি বা সাল কাঠের নৌকায় বসে যখন কেউ বিলের বুক চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, তখন মনে হয় যেন তিনি ভেসে যাচ্ছেন সময়ের কোনো অচিন মায়াপুরে। জলের সমতলে মাথা তুলে থাকা এক একটি পদ্মফুল যেন এক একটি রহস্যময় রোমাঞ্চ। কোনোটি সবেমাত্র কলি মেলে হাসছে, কোনোটি আবার পূর্ণাঙ্গ পাপড়ি মেলে সূর্যের প্রথম রশ্মিকে আলিঙ্গন করছে। কাঁচের মতো স্বচ্ছ জলে তরুণ পদ্মের প্রতিবিম্ব দেখে মনে হয়, আকাশের মেঘ আর মাটির জল একাকার হয়ে গেছে এক অলৌকিক মায়াজালে।শহরের যান্ত্রিক কোলাহল, ইট-কাঠের নির্জীব চার দেওয়াল আর ব্যস্ততার আত্মাহুতি থেকে মুক্তি পেতে হাজারো গৃহকাতর মানুষ ছুটে আসেন এই নিভৃত স্বর্গে। তারা জলের ছোঁয়া নেন, পদ্মের পাপড়ির কোমলতায় খুঁজে পান আত্মিক শান্তি। কেউবা নিঃশব্দে অনুভূতির ছবি আঁকেন মনের ক্যানভাসে, কেউবা ক্যামেরার লেন্সে বন্দী করেন ক্ষণিকের অমরত্ব। তরুণদের কোলাহল, প্রবীণদের মুগ্ধ নিঃশ্বাস আর শিশুদের কলকাকলিতে শান্ত জলধি হয়ে ওঠে মুখরিত।

    ঢাকার গুলশান থেকে আসা মো. নুরুজ্জামান নামে একজন বলেন, এখানকার পরিবেশটি খুব কোমল। আমার পরিবারের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ঢাকায় বসবাস করি সেখানে এক ধরনের চিড়িয়াখানার মতো থাকি। এখানে এসে খুব ভালো লাগছে, পদ্মবিলে নৌকা নিয়ে গিয়েছি মনে শান্তি লাগছে।

    ঢাকার বনস্রী থেকে আসা শাহিদা বেগম বলেন, এই পরিবেশে এত মুগ্ধ যা বলে বুঝানো যাবে না৷ তিনি আরও এই পদ্মবিলে জীবনে প্রথমবার আসলাম ঘুরে দেখলাম অনেক ভালো লেগেছে।

    ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা তাসমিয়া আক্তার বলেন, এখানে এত ভালো লেগেছে, বাড়িতে যাওয়ার মন মানছে না। পরিবেশটা মুগ্ধ ছড়িয়ে রেখেছে।

    প্রকৃতির এই রূপবদল শুধু যে কাব্যিক তৃষ্ণা মেটায় তা নয়, স্থানীয় জনজীবনের ক্যানভাসেও এঁকে দেয় এক টুকরো সচ্ছলতার হাসি। যে মাঝিরা বর্ষার জল নেমে গেলে কর্মহীনতায় ভোগেন, এই পদ্ম-মৌসুমে তাদের হাতে ওঠে বৈঠা। মৃদু ঢেউয়ের তালে তালে দর্শনার্থীদের বিলের গহীনে নিয়ে গিয়ে তারা উপার্জন করেন দু-মুঠো অন্ন।

    পদ্মবিলের মাঝি মো. শাহআলম মিয়া বলেন এই পদ্মবিলের কারণে আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো উপার্জন হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ আসে। আমি দৈণিক ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা উপার্জন করতে পারি।

    আরেক মাঝি বিল্লাল হোসেন বলেন, পর্যটক এখন প্রতিদিন আসতেছে নৌকা নিয়ে তাদের পদ্ম ফুলের মাঝে নিয়ে যায় তারা অনেক আনন্দ করে। তাদের এই আনন্দ দেখে অনেক ভালো লাগে। তিনি আরও বলেন, এই পদ্মবিলের কারণে বর্ষার মৌসুমে আমরা বেকার অবস্থায় থাকতাম। এখন আর অবসর থাকতে হচ্ছে না এই বিলের কারণে।

    তবে এই অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে এক আকুল মিনতি। মানুষের অবাধ পদচারণায় অহেতুক ফুল ছিঁড়ে ফেলার উন্মাদনা বিলের স্বকীয়তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। প্রকৃতির এই অবিনাশী সৌন্দর্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন দায়িত্বশীল আচরণ ও সচেতনতা।

    পরিবেশ ও নদী সুরক্ষাবিষয়ক সংগঠন তরী বাংলাদেশের আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, শত শত বছর ধরে প্রকৃতি নিজের নিয়মে এই বিলকে সাজিয়েছে। অযথা ছবি তোলার জন্য বা সাময়িক আনন্দের বশে পদ্মফুল, পদ্মাকাঁট বা ফুলগাছ উপড়ে ফেলবেন না। আপনার ছেঁড়া একটি ফুল বিলের প্রজনন প্রক্রিয়া এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ব্যাহত করে। তিনি আরও বলেন পদ্মবিল অসংখ্য দেশি ও অতিথি পাখির বিচরণক্ষেত্র। শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশ বজায় রাখুন।

    স্থানীয় মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দীপক চৌধুরী এই পদ্মবিল কেন্দ্রিক সম্ভাবনা ও সার্বিক পরিবেশ রক্ষা নিয়ে বলেন আমাদের মনিয়ন্দ ইউনিয়নের এই সীমান্তঘেঁষা বিলটি প্রকৃতি এক অপূর্ব সাজে সাজিয়েছে। শত শত মানুষ প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে এখানে আসছেন, যা আমাদের পুরো এলাকার জন্য আনন্দের ও গর্বের বিষয়। আমরা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে এলাকার পরিবেশ রক্ষা ও দর্শনার্থীদের সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে নজর দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। দর্শনার্থীদের সুরক্ষায় এবং তারা যেন নির্বিঘ্নে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন, সেজন্য স্থানীয়ভাবে আমরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছি।

    আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া বলেন, পদ্মবিলটি আখাউড়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এলাকাটিকে পরিবেশবান্ধব ও পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও বিরল বাস্তুতন্ত্র যেন কোনোভাবেই বিনষ্ট না হয়, সেদিকে আমরা কঠোর নজরদারি রাখছি।সবুজের বুকে গোলাপি পদ্মের এই রূপকথা শুধুই এক নৈসর্গিক দৃশ্য নয়, বরং প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক অস্তিত্বের এক মায়াবী সেতু। স্থানীয় প্রশাসনের সদিচ্ছা, পরিবেশপ্রেমীদের সচেতনতা আর দর্শনার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণ যদি এক সুতোয় গাঁথা যায়, তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই পদ্মবিল কেবল শরতের ক্ষণস্থায়ী স্বর্গ হয়ে থাকবে না—হয়ে উঠবে প্রকৃতির এক চিরন্তন উদ্যান। গোধূলির আলোয় শান্ত জলের বুকে হেলে পড়া পদ্মগুলো যেন নিঃশব্দে বলে যায়, প্রকৃতিকে ভালোবেসে বাঁচিয়ে রাখলেই মানুষ খুঁজে পাবে তার কাঙ্ক্ষিত প্রশান্তি।

  • বারান্দায়ই হোক প্রথম বাগান

    বারান্দায়ই হোক প্রথম বাগান

    ফিচার:

    শহুরে জীবনে যান্ত্রিকতায় সবুজের সান্নিধ্য পাওয়া কঠিন। জীবনের নানারকম ব্যস্ততা আর অফিসের কাজের চাপে আমরা প্রায় ভুলেই যাই প্রকৃতির সান্নিধ্য কতটা জরুরি। তবে ছোট্ট বারান্দাটাই হতে পারে আপনার শখের বাগান। কিন্তু আগের কোনো অভিজ্ঞতা নেই, ভাবনার কিছু নেই; শুধু একটু ইচ্ছাশক্তি আর ধৈর্য থাকলেই চলবে। তাহলে জেনে নেওয়া যাক একটি ভালো বাগান করতে গেলে কী কী বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি।

    শুরুটা যেভাবে করবেন

    জায়গা : প্রথমেই আপনার ব্যালকনির জায়গাটা ভালো করে দেখে নিন। কতটা জায়গা আছে, সূর্যের আলো কতটা পড়ে, বাতাস চলাচল কেমন—এ বিষয়গুলো জানা জরুরি। সাধারণত চার থেকে ছয় ঘণ্টা সূর্যের আলো পেলেই বেশিরভাগ গাছ ভালো থাকে।

    যদি দিনের শুরুতে পূর্ব দিকের রোদ আপনার বারান্দায় পড়ে তাহলে নিশ্চিন্তভাবে ফুলগাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আর যদি পশ্চিমের রোদ ঢোকে সেক্ষেত্রেও ফুলগাছ লাগানো যাবে।

    গাছের টব : বারান্দার বাগানে পাত্র বা গাছের টব ঠিকমতো নির্বাচন করা খুব জরুরি। কারণ গাছের প্রকৃতি অনুযায়ী আলাদা ধরনের টব প্রয়োজন হতে পারে। প্লাস্টিক, টেরাকোটা, সিমেন্ট বা হ্যাংগিং পট—যেকোনো কিছু ব্যবহার করতে পারেন। শুধু খেয়াল রাখতে হবে, পাত্রের নিচে যেন পানি নিষ্কাশনের ছিদ্র থাকে।

    মাটি ও সার : ভালো মানের মাটি আর জৈব সার ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে নার্সারি থেকে প্রস্তুত করা মাটিও কিনতে পারেন।

    গাছ : এবার গাছ নির্বাচন বা পছন্দ করার পালা। বারান্দায় সাধারণত ছোট গাছ বা হার্বস লাগানো ভালো। যেমন টমেটো, মরিচ, ধনিয়া, পুদিনা, তুলসী, অ্যালোভেরা; আবার গাঁদা, গোলাপ, বাগানবিলাসের মতো ফুলের গাছও ভালো হয়। কেউ কেউ ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট, পথোস ও পাতাবাহার-জাতীয় গাছ বেশি পছন্দ করেন। এগুলো মাঝেমধ্যে আপনি ঘরের ভেতরেও রাখতে পারবেন। এছাড়া অর্কিড আপনার ঘরকে একটি প্রিমিয়াম লুক দিতে পারে।

    পানি দেওয়া : গাছের প্রজাতি অনুযায়ী পানির পরিমাণ ঠিক করুন। বেশি পানি দিলে গাছের শেকড় পচে যেতে পারে, আবার কম দিলে শুকিয়ে যাবে। তাই নিয়মিত পানি দিন। তবে আপনার যদি যদি অতিরিক্ত কাজের চাপ থাকে, সেক্ষেত্রে প্রতিদিন পানি না দিলেও চলে, এমন গাছ নির্বাচন করতে পারেন।

    সঠিক পরিচর্যা : গাছের বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত যত্ন নিন। মাঝে মাঝে গাছের ডালপালা ছাঁটুন, পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন। একটু করে মাটি নিড়িয়ে দিন। অনলাইনে বাগান করা কমিউনিটিতে যুক্ত হোন। এতে নতুন ধারণা পাবেন।

    আলো, সার, পানি—সবকিছুই পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া সত্ত্বেও গাছ যদি না বাড়ে, তাহলে কোথাও সমস্যা হচ্ছে কি না দেখা জরুরি। অনেক সময় গাছে পোকা লাগলেও সহজে বাড়তে চায় না।

    আপনার বারান্দায় রোদ ঢুকলে টগর, গোলাপ, অপরাজিতা, জুঁই, দোলনচাঁপা, অর্কিড, বেলি ও হাসনাহেনা ফুলের গাছ লাগাতে পারেন। আর যদি রোদ না ঢোকে তাহলে নানা ধরনের পাতাবাহার গাছ দিয়ে সাজিয়ে তুলতে পারেন আপনার ছোট্ট বারান্দা। এক্ষেত্রে এরিকা পাম ও মানিপ্লান্ট গাছ লাগাতে পারেন।

    প্রতিদিন নিয়ম করে সকালে ও বিকালে গাছে পানি দিতে হবে। তবে খুব কড়া রোদে পানি দেওয়া যাবে না। টবের মাটি ভিজে থাকলেও পানি দেবেন না। পানি দিতে দিতে টবের মাটি যদি শক্ত হয়ে আসে, তাহলে মাটিকে কুপিয়ে আলগা করে নিতে হবে।

    বারান্দার আয়তন বুঝে টবের সংখ্যা নির্বাচন করুন। গাদাগাদি করে গাছ না রাখাই ভালো। শুকনো পাতা জমতে দেবেন না। গাছের গোড়ায় সেগুলো না রেখে ফেলে দিন। এতে গাছ ও বারান্দা দুটিই পরিষ্কার থাকবে। জায়গা কম থাকলে ঝুলন্ত টবও ব্যবহার করতে পারেন। ঝুলন্ত টবে কোন গাছগুলো ভালোভাবে বেড়ে উঠবে এবং দেখতে সুন্দর লাগবে, সেগুলো বেছে নিন।

    তিন মাস অন্তর সার দেবেন গাছের গোড়ায়। পাতাজাতীয় গাছগুলোয় মাঝে মাঝে রোগজীবাণু আক্রমণ করে। ফলে পাতা কুঁকড়ে যায়। পাতা কেটে ফেললে সেক্ষেত্রে নিয়মিত কীটনাশক স্প্রে করতে হবে। এসব নিয়ম মানলেই সবুজে সজ্জিত থাকবে আপনার সাধের বারান্দার সাধের বাগানটি।

  • নিরাপদ মাতৃত্ব ও শিশুর জন্য অপরিহার্য

    নিরাপদ মাতৃত্ব ও শিশুর জন্য অপরিহার্য

    গর্ভধারণ নারীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সময়। এ সময়ে শুধু গর্ভের শিশুরই নয়, মায়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হয়। একটি সুস্থ গর্ভাবস্থা এবং নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান উপায় হলো নিয়মিত গর্ভকালীন চেক-আপ। অনেকেই মনে করেন, শরীরে কোনো সমস্যা না থাকলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু গর্ভাবস্থার অনেক জটিলতা শুরুতে কোনো লক্ষণ ছাড়াই দেখা দিতে পারে। তাই নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা মা ও শিশুর জীবন রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    গর্ভকালীন চেক-আপের মূল উদ্দেশ্য

    * মায়ের সার্বিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা।

    * গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ সম্পর্কে অবগত হওয়া।

    * উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা দ্রুত শনাক্ত করা।

    * গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তস্বল্পতা ও সংক্রমণ শনাক্ত করা।

    * নিরাপদ প্রসবের পরিকল্পনা করা।

    * প্রসব-পরবর্তী মা ও নবজাতকের যত্ন সম্পর্কে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া।

    * মাকে সঠিক পুষ্টি, স্বাস্থ্যবিধি ও জীবনযাপন সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া।

    কখন প্রথম চেক-আপ করা উচিত

    গর্ভধারণ নিশ্চিত হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব আদর্শভাবে প্রথম ১২ সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম গর্ভকালীন চেক-আপ করা উচিত। এতে গর্ভের বয়স নির্ধারণ, সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ (ইডিডি) হিসাব করা এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা যায়।

    গর্ভকালীন চেক-আপের সাধারণ সময়সূচি

    ১-২৮ সপ্তাহ : প্রতি চার সপ্তাহে একবার।

    ২৮–৩৬ সপ্তাহ : প্রতি দুই সপ্তাহে একবার।

    ৩৬ সপ্তাহ থেকে প্রসব পর্যন্ত : প্রতি সপ্তাহে একবার। তবে যাদের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী আরো ঘনঘন ফলো-আপের পরামর্শ দিতে পারেন।

    প্রতিটি চেক-আপে কী কী তথ্য জানা যায়

    রক্তচাপ (BP), ওজন বৃদ্ধি, প্রস্রাব পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, রক্তস্বল্পতা মূল্যায়ন, রক্তের শর্করার মাত্রা, শিশুর হৃৎস্পন্দন, জরায়ুর উচ্চতা, শিশুর অবস্থান ও নড়াচড়া, মায়ের হাত-পা ফুলে যাওয়া আছে কি না এবং প্রয়োজনে আল্ট্রাসনোগ্রাফি।

    গর্ভাবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা

    চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভাবস্থায় সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা (CBC), রক্তের গ্রুপ ও Rh টাইপিং, হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা, রক্তে শর্করা (Blood Sugar) পরীক্ষা, প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা, হেপাটাইটিস বি, এইচআইভি ও সিফিলিস স্ক্রিনিং এবং প্রয়োজনে থাইরয়েড পরীক্ষা করা হতে পারে।

    আল্ট্রাসনোগ্রাফির গুরুত্ব

    আল্ট্রাসনোগ্রাফি গর্ভাবস্থার একটি নিরাপদ ও কার্যকর পরীক্ষা। এর মাধ্যমে গর্ভের বয়স নির্ধারণ, শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, জন্মগত ত্রুটি শনাক্তকরণ ও প্লাসেন্টার অবস্থান জানা যায়। এ ছাড়া অ্যামনিয়োটিক তরলের পরিমাণ, যমজ বা একাধিক সন্তান আছে কি না এবং শিশুর প্রসবপূর্ব অবস্থান জানা যায়।

    পুষ্টির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব

    গর্ভাবস্থায় সুষম খাদ্য গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ডিম, মাছ, চর্বিহীন মাংস, ডাল, শাকসবজি, মৌসুমি ফল এবং সম্পূর্ণ শস্যজাত খাবার রাখা উচিত। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত চিনি ও লবণযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।

    প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও ওষুধ

    চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড, আয়রন ট্যাবলেট, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি (প্রয়োজনে) নিয়মিত গ্রহণ করা উচিত।

    মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নও জরুরি

    গর্ভাবস্থায় হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা বা বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে। তাই পরিবারের সহযোগিতা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ইতিবাচক পরিবেশ এবং প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মায়ের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

    কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে

    গর্ভাবস্থায় যোনিপথ দিয়ে রক্তপাত, পানি ভেঙে যাওয়া, শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া, তীব্র পেটব্যথা, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা, খিঁচুনি, উচ্চ জ্বর, শ্বাসকষ্ট, মুখ, হাত বা পা হঠাৎ ফুলে যাওয়া কিংবা বারবার বমি হওয়ার মতো যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

    পরিবারের দায়িত্ব

    একজন গর্ভবতী মায়ের সুস্থতার জন্য পরিবারের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের উচিত—

    * নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া।

    * পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা।

    * মানসিকভাবে সাহস ও সমর্থন দেওয়া।

    * জরুরি পরিস্থিতির জন্য নিকটস্থ হাসপাতাল ও যাতায়াতের ব্যবস্থা আগে থেকেই ঠিক রাখা।

    * প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ, রক্তদাতা ও প্রয়োজনীয় অর্থের প্রস্তুতি রাখা।

    নিরাপদ মাতৃত্বে সচেতনতার বিকল্প নেই

    বর্তমানে অধিকাংশ গর্ভকালীন জটিলতা সময়মতো শনাক্ত করা গেলে সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। তাই কোনো ধরনের কুসংস্কার, অবহেলা বা অল্পশিক্ষিত ব্যক্তির পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে নিবন্ধিত চিকিৎসক বা দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধানে পুরো গর্ভকাল অতিবাহিত করা উচিত।

    পরিশেষে বলা যায়, গর্ভকালীন নিয়মিত চেক-আপ কেবল একটি স্বাস্থ্যসেবা নয়; এটি মা ও অনাগত শিশুর জীবন রক্ষার অন্যতম কার্যকর বিনিয়োগ। সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সুষম খাদ্য, প্রয়োজনীয় টিকা, মানসিক সুস্থতা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার মাধ্যমে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব। একটি সুস্থ মা-ই একটি সুস্থ প্রজন্মের ভিত্তি। তাই গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই নিয়মিত চেক-আপকেজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

  • ১৪ বছরের কিশোরীর বিদ্যুৎহীন ওয়াশিং মেশিন উদ্ভাবন

    ১৪ বছরের কিশোরীর বিদ্যুৎহীন ওয়াশিং মেশিন উদ্ভাবন

    ভারতের কেরালার ১৪ বছর বয়সি এক কিশোরী ঘরের কাপড় ধোয়ার সময় ও বিদ্যুৎ সংকটের সমস্যা সমাধানে তৈরি করেছে অভিনব ওয়াশিং মেশিন। সাইকেলের প্যাডেল ও চেইন ব্যবহার করে তৈরি এই মেশিন চালাতে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। এটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে প্রায় ২ হাজার ভারতীয় রুপি।

    কিশোরীর নাম রেম্যা জোসে। কেরালার মালাপ্পুরম জেলার কিঝাট্টুরের বাসিন্দা রেম্যা যখন দশম শ্রেণির পরীক্ষার্থী, তখন তার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। একই সময়ে তার বাবা ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ফলে ঘরের বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি কাপড় ধোয়ার দায়িত্ব পড়ে রেম্যা ও তার যমজ বোনের ওপর। এর মধ্যে প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াতেই তাদের প্রায় চার ঘণ্টা সময় লাগত। হাতে কাপড় ধুতে গিয়ে পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছিল না রেম্যা।

    সমস্যার সমাধান হিসেবে রেম্যা নিজেই একটি ওয়াশিং মেশিন তৈরির পরিকল্পনা করে। আগে সে বৈদ্যুতিক ওয়াশিং মেশিন কীভাবে কাজ করে তা পর্যবেক্ষণ করে। এরপর বিদ্যুতের পরিবর্তে সাইকেলের প্যাডেল দিয়ে মেশিন চালানোর নকশা তৈরি করে। তার বাবা সেই নকশা নিয়ে স্থানীয় একটি অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে যান। পরে সেখানে মেশিনটি তৈরি করা হয়।

    মেশিনটিতে সাইকেলের মতো প্যাডেল ও চেইন ব্যবস্থার মাধ্যমে ভেতরের ড্রাম ঘোরানো হয়। কাপড়, পানি ও ডিটারজেন্ট দেওয়ার পর ব্যবহারকারী প্যাডেলে চাপ দিলে ড্রাম ঘুরতে থাকে। কাপড় অন্তত ১০ মিনিট ভিজিয়ে রাখার পর প্রায় তিন থেকে চার মিনিট প্যাডেল করলেই ধোয়ার কাজ হয়। পানি ঝরিয়ে আবার প্যাডেল করলে কাপড়ের অতিরিক্ত পানিও বের হয়ে যায়। জাতীয় উদ্ভাবন ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, এভাবে কাপড় প্রায় ৮০ শতাংশ শুকিয়ে যায়।

    রেম্যার উদ্ভাবন পরে ভারতের ন্যাশনাল ইনোভেশন ফাউন্ডেশনের নজরে আসে। প্রতিষ্ঠানটি এটিকে ‘ওয়াশিং কাম এক্সারসাইজ মেশিন’ হিসেবে নথিভুক্ত করে। উদ্ভাবনটির জন্য রেম্যা জাতীয় পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে এবং এর পেটেন্টও হয়েছে।

    প্রতিদিনের একটি সাধারণ সমস্যা থেকে রেম্যার এই উদ্ভাবন দেখিয়েছে, বড় কোনো প্রযুক্তিগত সুবিধা ছাড়াও প্রয়োজন ও সৃজনশীল চিন্তা থেকে কার্যকর প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব।