ক্যাটাগরি ফিচার

Feature / ফিচার

  • টাইলস পরিষ্কার ও ঝকঝকে রাখার উপায়

    টাইলস পরিষ্কার ও ঝকঝকে রাখার উপায়

    ফিচার:

    প্রত্যেকেই তার ঘরটি সুন্দর ও ঝকঝকে রাখতে চান। এজন্য অবশ্যই ঘরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঘরের সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। ঝকঝকে সাদা টাইলস ঘরটি করে তোলে আরো বেশি উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয়।টাইলস ও ব্যবহার : বর্তমানে ভবনের অন্দরে-বাইরে থিমভিত্তিক নকশার প্রচলন চলছে। তাই হরেক রকম টাইলসও পাওয়া যাচ্ছে। তবে মার্বেল, কংক্রিট, পোরসেলিন ও সিরামিক টাইলসের ব্যবহার চোখে পড়ছে বেশি। কোনো টাইলস মেঝের তাপ ও চাপ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। আবার কিছু টাইলস দেখতে সুন্দর হলেও ভঙ্গুর প্রকৃতির। কিছু টাইলস আর্দ্রতা সয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শক্তপোক্ত হয়, কিছু আবার আর্দ্রতা পেলে ক্ষয় হতে শুরু করে। তাই মেঝে বা দেয়াল যেখানেই টাইলস ব্যবহার করা হোক, সুবিধা-অসুবিধা আর পরিষ্কার করার উপায় জেনেই দীর্ঘস্থায়ী টাইলস লাগানো উচিত।যা দিয়ে পরিষ্কার করবেন : টাইলসের কঠিন ও জেদি দাগ দূর করতে সাদা ভিনেগার, বেকিং সোডা কিংবা বিশেষ বাণিজ্যিক টাইলস ক্লিনার ব্যবহার করা যায়। নিয়মিত টাইলস পরিষ্কার করার জন্য প্রয়োজন মাইক্রোফাইবার কাপড়, সাধারণ ডিটারজেন্ট বা সোপ, হালকা গরম পানি, নরম ঝাড়ু বা ব্রাশ। টাইলস সহজে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রয়েছে নানারকম নিয়ম। টাইলস ঝকঝকে পরিষ্কার রাখার কিছু টিপস ও পরামর্শ দেওয়া হলো।

    সিরামিক : বাজারে বিভিন্ন আকারের চকচকে রঙবেরঙের সিরামিক টাইলস পাওয়া যায়। আজকাল আনগ্লেজড সিরামিক পাওয়া যায়। এই টাইলসগুলোর চাপ সহ্য করার ক্ষমতা কম, তাই পরিষ্কার করার সময় শক্ত ব্রাশ ব্যবহার না করাই ভালো। ডিশ সোপ বা সাদা ভিনেগার আর হালকা গরম পানি ব্যবহার করে সহজেই এ টাইলসের দাগ পরিষ্কার করা যায়; এতে টাইলসের চকচকে ভাবটাও অটুট থাকে। আর স্পঞ্জের কাপড় ব্যবহার করে টাইলস পরিষ্কার করলে অবশ্যই বারবার ময়লা পানি পরিবর্তন করতে হবে। সেইসঙ্গে পরিষ্কার করে পানি শুকিয়ে যাওয়ার আগে শুকনা সুতি কাপড় দিয়ে মেঝে মুছে ফেলতে হবে। তাহলে টাইলসে পানির ছোপ ছোপ দাগ লেগে থাকবে না।

    পোরসেলিন : কম ভঙ্গুর ও সহজে দাগ পড়ে না বলে মেঝের টাইলস হিসেবে পোরসেলিন বেশ জনপ্রিয়। এতে নানা রকমের নকশা কপি করা যায়। মার্বেল বা কাঠের টেক্সচার—সবই হুবহু কপি করা যায়। পোরসেলিনের টাইলসও তরল সাবান অথবা ভিনেগারের সঙ্গে কুসুম গরম পানি মিশিয়ে পরিষ্কার করা যায়। তবে রান্নাঘর বা বাথরুমের টাইলসের হলদে ভাব কাটানোর জন্য সপ্তাহে একবার অ্যাসিডিক বা ব্লিচ ক্লিনার সল্যুশন ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি স্প্রে বোতলের সাহায্যে নোংরা জায়গায় ক্লিনার সল্যুশন স্প্রে করে কিছুক্ষণ রেখে দিতে হবে। তারপর হাতে গ্লাভস পরে বাথরুমের ব্রাশ দিয়ে

    হালকা করে ঘষে পরিষ্কার করে নিতে পারেন। সরাসরি ক্লিনার সল্যুশন ব্যবহার করার আগে অবশ্যই টাইলসে অল্প করে ফেলে পরীক্ষা করে নেবেন, টাইলসের রঙ পরিবর্তিত হয়ে যায় কি না। অ্যাসিডিক ক্লিনার ব্যবহারে অনেক সময় টাইলস ক্ষয় হয়ে যায় বা বিবর্ণ হয়ে যেতে পারে। তাই এ ধরনের ক্লিনার ব্যবহার করার আগে এর পিএইচ লেভেল দেখে কেনা উচিত।

    টেরাকোটা টাইলস : ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটা টাইলস পরিষ্কার করার আগে প্রথমেই ভ্যাকুয়াম করা বা শুকনা কাপড় দিয়ে ধুলা মুছে নেওয়া উচিত। শক্ত ময়লার জন্য প্রয়োজনে ব্রাশ ব্যবহার করা যেতে পারে। হালকা গরম পানি আর ডিশ ওয়াশার দিয়ে মুছে নিলেই এসব টাইলসের ময়লা ভাব কেটে যায়। অতিরিক্ত ময়লার জন্য অক্সালিক অ্যাসিড আর পানির মিশ্রণ ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যায়। হালকা গরম পানি আর ডিশ ওয়াশার দিয়ে মুছে নিলেই ময়লা ভাব কেটে যায়।

    কুয়েরি টাইলস : অনেকটা টেরাকোটা ধরনের টাইলস, তাই পিএইচ নিরপেক্ষতা বুঝে তেমন ক্লিনার দিয়ে মুছে ফেলাই ভালো। এই টাইলসে অ্যাসিডিক ক্লিনার ব্যবহারে টাইলস ক্ষয়ে যেতে পারে।

    জেল্লিজ টাইলস : এটি মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষত মরক্কোর তৈরি একধরনের পোড়ামাটি টাইলস। মেটে মেটে রঙের জ্যামিতিক নকশায় সাজানো এই টাইলসে ‘হাতে তৈরি’ ভাব থাকায় মিনিমালিস্ট ভক্তদের খুব পছন্দ। এই টাইলস বারান্দায় বা রান্নাঘরের দেয়ালে ব্যবহার করলে দু-চার দিন পরপর শুকনা কাপড় দিয়ে ধুলা পরিষ্কার করে নিতে হবে। অম্লধর্মী ক্লিনারের সাহায্যে এই টাইলস পরিষ্কার না করা ভালো।

    স্লেট টাইলস : সাদা-কালো রঙের বাড়ির জন্য স্লেট টাইলস। তামাটে কয়লা বা রুপালি রঙের মিশ্রণে এই টাইলসগুলা হয়ে থাকে। সাধারণত বাসার বাইরের রান্নাঘর, বারান্দা ও কটেজে ব্যবহারের উপযোগী। এমন টাইলস দু-এক দিন পরপর ভ্যাকুয়াম করে বা শুকনা কাপড়ে মুছে রাখলে দেখতে সুন্দর লাগবে।

    মার্বেল : মার্বেলের টাইলস সহজেই ঘর আলোকিত করে তোলে। গ্রানাইটের চেয়ে কম সহনীয় ও ভঙ্গুর হওয়ায় অন্দরে বেশি ব্যবহার করা হয়। মার্বেলের টাইলস যত্ন নিয়ে ব্যবহার করলে অনেক বছর পর্যন্ত নতুনত্বের ভাব রয়ে যায়। তবে অম্লধর্মী ক্লিনার মার্বেলে ব্যবহার করা যাবে না। মার্বেলের টাইলসে দাগ পড়লে এক চামচ বেকিং সোডা আর পানি মিশিয়ে পেস্ট করে দাগ বা ময়লা জায়গায় লাগাতে হবে। এরপর প্লাস্টিকের র‌্যাপিং দিয়ে মুড়িয়ে কয়েক ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। শেষে সুতি কাপড় দিয়ে মুছে নিলে দাগও পরিষ্কার হবে, সেইসঙ্গে মার্বেলের ঝকঝকে ভাব ফিরে আসবে।

    টাইলস যে ধরনেরই হোক না কেন, সাধারণ কিছু জিনিস মনে রাখা জরুরি।অনেক সময় দাগ বা ময়লা দুই কাটিং টাইলসের মাঝে বেশি লেগে থাকে। অনেকে এসবের জন্য স্টিমিং ক্লিনিংয়ের পরামর্শ দিলেও এটি টাইলসের জন্য ক্ষতিকর। তাই এতে বেকিং সোডা আর পানির পেস্ট তৈরি করে কয়েক ঘণ্টা প্লাস্টিক দিয়ে মুড়িয়ে রাখাই ভালো। অথবা রাতভর এভাবে রেখে সকালে ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে নিলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায় সিলিকন বেজ সিলিং করিয়ে নিলে। এতে ময়লা, আর্দ্রতা বা পানি—কোনোটাই টাইলসের ক্ষয় করতে পারে না।

  • বর্ষার আঁচল ধরে শরতের আগমন

    বর্ষার আঁচল ধরে শরতের আগমন

    প্রকৃতিতে শরৎ এসেছে সেই কবে। ভাদ্রের আকাশে তার নীলচে আভাস, মাঠের কিনারে কাশের সাদা শির, বাতাসে শরতের নরম ছোঁয়া। তবু বর্ষা পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। আকাশের মেজাজে তার রেশ রয়েই গেছে। এক মুহূর্তে রোদে ঝলসে ওঠে চারদিক, পরক্ষণেই কোথা থেকে কালো মেঘ এসে সূর্যের মুখ ঢেকে ফেলে। দূরের দিগন্ত প্রথমে ধূসর হয়, তারপর গাঢ় নীল-কালো। বাতাস ভারী হয়ে আসে। গাছের পাতাগুলো উল্টে গিয়ে রুপালি পিঠ দেখায়। পাখিরা হঠাৎ নিচু হয়ে উড়ে। তারপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আকাশ ভেঙে নামতে থাকে বৃষ্টি।

    ভাদ্র মাসে শরৎ নরম পায়ের মৃদু শব্দে হেঁটে বেড়ায়। ভোরের আলোয় আকাশের নীল একটু একটু করে স্বচ্ছ হয়। সকালের বাতাসে বর্ষার স্যাঁতসেঁতে গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকে অচেনা এক নির্মলতা। মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের সেই চিরচেনা পঙ্‌ক্তি—

    ‘আজি শরততপনে প্রভাতস্বপনে

    কী জানি পরান কী যে চায়।’

    সত্যিই তো, শরতের এই আলোয় মানুষের মনও কি একটু বদলে যায় না? কোনো কারণ ছাড়াই মন কেমন উদাস হয়ে থাকে। মনে হয়, কোথাও যেতে হবে; অথচ কোথায়? তা জানা নেই। কোনো অচেনা সৌন্দর্যের দিকে মন ছুটে যেতে চায়।

    রোদের ফাঁকে কাপড় মেলে দিয়ে ঘরে ফিরতে না ফিরতেই ঝমঝম বৃষ্টিতে ছাদ ভরে যায়। টিনের চালে বৃষ্টির আঘাত একটানা তীব্র হয়ে বেজে ওঠে। আম, কাঁঠাল, শিরীষের পাতায় জল ছিটকে পড়ে। উঠোনের ধুলো মুহূর্তে কাদায় গলে যায়। জানালার ওপারে বৃষ্টির পর্দা নামে। তার ভেতর দিয়ে গাছগুলো আবছা, ঘরগুলো মলিন, পথগুলো যেন হঠাৎ কোথাও হারিয়ে যায়।

    ষ্টি থামলে দৃশ্যটি আবার বদলে যায়। পাতার ডগায় স্বচ্ছ জলবিন্দু কাঁপতে থাকে। কোথাও টুপ করে পড়ে, কোথাও আরেকটি পাতায় গড়িয়ে যায়। ভেজা ঘাসের ওপর নরম আলো পড়ে। দূরের মাঠে জমে থাকা পানিতে আকাশের ছেঁড়া নীল ভেসে থাকে। কাশবনের সাদা ফুলগুলো বাতাসে একসঙ্গে দুলে ওঠে—মনে হয়, মাটির ওপর ছোট ছোট ঢেউ উঠেছে।

    আর তখনই শরৎকে সবচেয়ে কাছের মনে হয়।

    কোথাও শেফালি ফুটেছে কি না, জানি না; তবু মনে হয়, বাতাসের ভেতর তার গন্ধ লুকিয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের গানটি যেন সেই মুহূর্তে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—

    ‘ওই শেফালির শাখে

    কী বলিয়া ডাকে বিহগ বিহগী

    কী যে গায় গো।’

    খোলা মাঠে বসে আকাশ দেখতে ভালো লাগে। বিলের ধারে বসলে আরো ভালো লাগে। বর্ষার পানি এখনো অনেকটা জমে আছে। তার ওপর মেঘের ছায়া ধীরে ধীরে সরে যায়। কোথাও শাপলার পাতা, কোথাও জলের বুক চিরে ওঠা ছোট মাছের বৃত্তাকার ঢেউ। দূরে কোথাও কাদামাটির বাঁধ, তার ওপারে তালগাছের সরু কালো অবয়ব। বাতাস এলে বিলের পানি কেঁপে ওঠে, আর সেই কাঁপুনিতে ভেঙে যায় আকাশের প্রতিবিম্ব।

    সেই মুহূর্তে মনে হয়, প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকা আসলে নিজের মনের ভেতরে তাকিয়ে থাকা। এই মেঘ, এই বৃষ্টি, এই হঠাৎ রোদ—সবকিছুর মধ্যেই মানুষের মনের কোনো না কোনো ছায়া লুকিয়ে থাকে। কখনো মনও তো এমন হয়; একটু আলোয় ভরা, পরক্ষণেই মেঘে ঢাকা। আবার কোনো এক অজানা হাওয়ায় সেই মেঘ সরে যায়, আলো আসে।

    নদীর পাড়ের দৃশ্য আরো বিস্তৃত। স্রোতের ওপর ভাঙা রোদের টুকরো ছুটে বেড়ায়। দূরে একটি নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়; তার পেছনে জলের শরীরে দীর্ঘ দাগ কেটে থাকে। ওপারের চর কুয়াশার মতো আবছা। কোনো অচেনা পাখি ডেকে ওঠে। বাতাসে কাশের গন্ধ, কাদার গন্ধ, জলের সোঁদা গন্ধ মিশে থাকে।

    তখন মনে হয়,

    ‘আজি মধুর বাতাসে হৃদয় উদাসে,

    রহে না আবাসে মন হায়

    কোন কুসুমের আশে কোন ফুলবাসে

    সুনীল আকাশে মন ধায় গো।’

    ভাদ্র-প্রকৃতি এমনই। স্থির নয়, অথচ অপূর্ব; একসঙ্গে বর্ষার বিদায় আর শরতের আগমন বহন করে। রোদ তার শরীরে আগুন জ্বালে, মেঘ এসে সেই আগুন ঢেকে দেয়; বৃষ্টি মাটিকে ভিজিয়ে দেয়, আবার সেই ভেজা মাটির বুকেই জন্ম নেয় নতুন সবুজ।

    শরৎ তাই শুধু নির্মেঘ নীল আকাশের ঋতু নয়। শরৎ কখনো আসে বর্ষার ভেজা হাত ধরে, কখনো কালো মেঘের ফাঁক গলে, কখনো কাশফুলের সাদা দোলায়। ভাদ্রের এই ভেজা-রৌদ্রোজ্জ্বল দিনগুলোতেও সে নিঃশব্দে নিজের আগমন লিখে যায় কাশফুলের সাদা অক্ষরে, শেফালির গন্ধে, ভেজা মাটির ঘ্রাণে, বিলের জলে কেঁপে ওঠা আকাশে।

    আর মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে সেই আগমনের সামনে—কখনো মাঠের ধারে, কখনো নদীর পাড়ে, কখনো জানালার পাশে। কোনো উত্তর খোঁজে না। শুধু দেখে ও শোনে। আর অকারণেই মনে হয়, প্রকৃতি যখন ঋতু বদলায়, মানুষের মনেও যেন অদৃশ্য কারণে ঋতু বদলে যায়।

  • শুভ্র শরৎ

    শুভ্র শরৎ

    ফিচার:

    গাঢ় নীল আকাশ। প্রখর রোদ। প্রচণ্ড গরম। দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে ভেসে যাচ্ছে সাদা মেঘের ভেলা। নদীর ধারে ফুটেছে সাদা সাদা কাশফুল। অনবরত বাতাসে দোল খায় ফুলগুলো। দেখতে কী চমৎকার লাগে! যেন চোখ জুড়িয়ে যায়। সাদা বকেরা ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় নীল আকাশে। বাঁশঝাড়ে বাচ্চা তুলেছে কালো ডাহুক। বড় পুকুরধারে জারুল গাছে বসে মাছ শিকার করে মাছরাঙা। এ ঋতুতে অনেক ধরনের ফুল ফোটে। শিউলি, কামিনী, হাসনাহেনা, দোলনচাঁপা ও বেলি ফুলের গন্ধে বাতাস ম-ম করে। বাতাসে ছোট ছোট ঢেউ ওঠে নদী, খাল, বিল ও ঝিলে। মাঝি পাল তুলে গঞ্জের হাটে ও বন্দরে যায় নৌকা নিয়ে। গায় ভাটিয়ালি গান—‘ও নদীরে রূপ দেইখা তোর হইয়াছি পাগল’ অথবা ‘নদীর কূল নাই কিনার নাইরে…।’ শরতের চাঁদনি রাতে গ্রামের পরিবেশ হয় মোহনীয় ও মায়াবী। উড়ে বেড়ায় জোনাকিরা। শরৎ নিয়ে একটি ছড়া আছে, ছড়াটি এ রকম—‘শাপলা ফোটে বিলের জলে, এখন শরৎকাল, কাশ ফুটেছে নদীর তীরে, ফেলছে জেলে জাল।’

    পানকৌড়ি একটি সুন্দর পাখি। এ পাখিটি ডিম দেয় শরৎকালে। এরা পাঁচ থেকে সাতটি ডিম দেয়। ভাদ্র-আশ্বিন এ দুমাস শরৎ ঋতু। যাযাবর ফুল হিসেবে পরিচিত কচুরিপানাও এ শরতেই ফোটে। শরতের প্রথম অংশ ভাদ্র মাস। বিশেষ কিছু কারণে বিখ্যাত। এ ভাদ্র মাসেই হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী পালন করে। ভাদ্র মাসের শেষ পূর্ণিমা রাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি আধ্যাত্মিক সম্প্রদায় ভেলা ভাসায়। জন্মাষ্টমী ও ভেলা ভাসানো কেন্দ্র করে মেলা বসে বিভিন্ন গ্রামে। সারা রাত চলে মুর্শিদি ও বিভিন্ন ধর্মীয় গান। বাঁশের কঞ্চি কেটে ও কলাগাছের মাধ্যমে ভেলা বানানো হয়। ভেলার মধ্যে রঙিন কাগজের ঘর বানানো হয়। সে ঘরের ভেতরে নানা ধরনের ফল দেওয়া হয়। দেওয়া হয় মিষ্টি, পায়েস ও বাতাসা। ভেলায় বানানো ঘরটি ভাসিয়ে দেওয়া হয় জোয়ার-ভাটার পানিতে। শরৎকালেই কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ফসলের বীজ বপন করে। বাংলার অন্য ঋতুগুলো থেকে শরৎকাল সম্পূর্ণ আলাদা। লালশাক, পালংশাক ও মূলা এ ঋতুতেই উৎপাদিত হয়। ফুল, ফল ও সবজির সমারোহ শরৎকালে।

    আমাদের হাজার বছরের নিজস্ব ঐতিহ্য শরৎ ঋতু। এটি আবহমান বাংলারই একটি রূপ। বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। দুমাস পরপর এ দেশে ঋতু পরিবর্তন হয়। কখনো প্রচণ্ড গরম। আবার প্রচণ্ড ঠান্ডা! খুব বৃষ্টি! কখনো মিষ্টি রোদ। শিশির সকাল! এটা শুধুই বাংলাদেশে সম্ভব। কবির ভাষায় তাই বলতে ইচ্ছা করে—‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি।’

  • ঘড়ির কাঁটা কেন ডানে ঘোরে

    ঘড়ির কাঁটা কেন ডানে ঘোরে

    ফিচার:

    তুমি কি কখনো দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে ভেবেছ, ‘ঘড়ির কাঁটা সবসময় ডান দিকেই কেন ঘোরে?’ যদি একদিন হঠাৎ কাঁটাগুলো উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করে, তাহলে কেমন হতো? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে বহু বছর আগের মানুষের বুদ্ধি আর প্রকৃতির এক মজার নিয়মে।

    অনেক অনেক বছর আগে মানুষের হাতে আজকের মতো ব্যাটারিচালিত বা ডিজিটাল ঘড়ি ছিল না। তখন মানুষ সময় বুঝত সূর্যের ছায়ার সাহায্যে। তারা কোনো খোলা জায়গায় মাটিতে একটি সোজা কাঠি পুঁতে রাখত। লাঠির গায়ে সূর্যের আলো পড়লে সেই কাঠির ছায়া তৈরি হতো। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সূর্য আকাশে এগোতে থাকলে ছায়াটিও ধীরে ধীরে একদিকে সরে যেত।

    পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে, যেখানে প্রাচীন সভ্যতার অনেক কিছুই গড়ে উঠেছিল, সেখানে ছায়ার এই চলার দিক ছিল ডানদিকে ঘুরে যাওয়ার মতো। মানুষ সেই ছায়ার গতিবিধি দেখে সময় মাপতে শিখে। পরে যখন যান্ত্রিক ঘড়ি তৈরি করা হয়, তখন তার কাঁটাকেও সেই পরিচিত দিকেই ঘোরানো হয়। সেই থেকেই ঘড়ির কাঁটা ডানদিকে ঘোরে। এই দিকটিকেই আমরা আজ ‘ঘড়ির কাঁটার দিক’ বলে চিনি।

    মজার বিষয় হলো, পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে সূর্যঘড়ির ছায়ার চলার ধরন কিছুটা ভিন্নভাবে দেখা যায়। তবুও তখন পর্যন্ত ডান দিকে ঘোরা ঘড়ি সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল। তাই সবাই একই নিয়ম অনুসরণ করতে শুরু করে। এতে বিভিন্ন দেশের মানুষের সময় বোঝা সহজ হয়ে যায়।

    ঘড়ির কাঁটা আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। দেখো, সেকেন্ডের কাঁটা এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকে না। মিনিটের কাঁটা ধীরে ধীরে এগোয়, আর ঘণ্টার কাঁটা আরো ধীরগতিতে চলে; কিন্তু তারা কেউ অলসতা করে না। ছোট ছোট মুহূর্ত মিলেই একটি মিনিট, অনেক মিনিট মিলেই একটি ঘণ্টা, আর ঘণ্টা মিলেই একটি সুন্দর দিন তৈরি হয়। তাই ছোট কাজকে কখনো তুচ্ছ ভাবা উচিত নয়।ভাবো তো, যদি তুমি প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট বই পড়ো, কয়েক মাস পরে কত গল্প, কত নতুন তথ্য আর কত জ্ঞান তোমার ঝুলিতে জমে যাবে! ঠিক ঘড়ির কাঁটার মতো ধীরে ধীরে এগোলে বড় লক্ষ্যও একদিন পূরণ হয়। তাই পরেরবার ঘড়ির দিকে তাকালে শুধু সময় দেখবে না। মনে রাখবে, ডানদিকে ঘুরতে থাকা সেই ছোট্ট কাঁটাগুলো আমাদের বলছে—সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। যে নিয়ম মেনে পরিশ্রম করে, সময়কে সম্মান করে এবং প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে যায়—সফলতা একদিন তার দরজায় কড়া নাড়বেই।

  • জলকন্যার বুকে গোলাপি আলপনা

    জলকন্যার বুকে গোলাপি আলপনা

    ফিচার

    জলকন্যার বুকে গোলাপি আলপনাবর্ষার প্রচ্ছদ পেরিয়ে যখন রূপসী বাংলার আকাশে শরতের অমল ধবল মেঘের খেয়া ভেসে বেড়ায়, তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উত্তর-পূব সীমান্তের এক অখ্যাত জলাশয় রূপ নেয় কোনো এক অলৌকিক চিত্রপটে। চোখের সীমানা ছাড়িয়ে যেখানেই দৃষ্টি যায়, শুধুই সবুজের সমারোহ আর তার বুক চিরে উঁকি দেওয়া অজস্র অমলিন পদ্ম। প্রভাত ও গৌধুলীর স্নিগ্ধ রোদ যখন কালচে জলের বুকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন হাজার হাজার গোলাপি ও শ্বেতপদ্ম শিশিরবিন্দু ধারণ করে যেন প্রকৃতির এক অনুপম রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করে।

    আখাউড়ার সীমানা ঘেঁষা ঘাঘুটিয়া ও মিনারকুটের এই জলাভূমি এখন আর কেবল জলের আধার নয়, রূপসী বাংলার এক প্রাণবন্ত কাব্যগ্রন্থ।

    প্রতি শরতেই প্রাকৃতিকভাবেই এই বিলে ফুটে ওঠে শত শত পদ্ম। সাম্প্রতিককালে রূপপিপাসু পথিক ও আলোকচিত্রীদের কল্যাণে এ যেন এক জনাকীর্ণ স্বর্গে পরিণত হয়েছে। ভোর হতে না হতেই বিলের শান্ত জলরাশি জেগে ওঠে গুঞ্জন আর মুগ্ধতার গুঞ্জরণে। পলিমাটির সুবাস, জলজ উদ্ভিদের তীব্র আকুলতা আর পদ্মের মৌ মৌ গন্ধ মিলেমিশে বাতাসকে করে তোলে সুবাসিত। সুদূর দিগন্ত থেকে ভেসে আসা বালিহাঁস, পানকৌড়ি আর গাঙচিলের কিচিরমিচির সেই সৌন্দর্যকে দেয় এক অনন্য ছন্দ ও সুর।

    ভোরের প্রথম আলো থেকে গৌধুলী লগ্ন পর্যন্ত ফুটতেই বিলের ঘাটে বাঁধা ডিঙ্গি নৌকাগুলো রূপসী কূলের পানে ছুটে চলে। মেহগনি বা সাল কাঠের নৌকায় বসে যখন কেউ বিলের বুক চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, তখন মনে হয় যেন তিনি ভেসে যাচ্ছেন সময়ের কোনো অচিন মায়াপুরে। জলের সমতলে মাথা তুলে থাকা এক একটি পদ্মফুল যেন এক একটি রহস্যময় রোমাঞ্চ। কোনোটি সবেমাত্র কলি মেলে হাসছে, কোনোটি আবার পূর্ণাঙ্গ পাপড়ি মেলে সূর্যের প্রথম রশ্মিকে আলিঙ্গন করছে। কাঁচের মতো স্বচ্ছ জলে তরুণ পদ্মের প্রতিবিম্ব দেখে মনে হয়, আকাশের মেঘ আর মাটির জল একাকার হয়ে গেছে এক অলৌকিক মায়াজালে।শহরের যান্ত্রিক কোলাহল, ইট-কাঠের নির্জীব চার দেওয়াল আর ব্যস্ততার আত্মাহুতি থেকে মুক্তি পেতে হাজারো গৃহকাতর মানুষ ছুটে আসেন এই নিভৃত স্বর্গে। তারা জলের ছোঁয়া নেন, পদ্মের পাপড়ির কোমলতায় খুঁজে পান আত্মিক শান্তি। কেউবা নিঃশব্দে অনুভূতির ছবি আঁকেন মনের ক্যানভাসে, কেউবা ক্যামেরার লেন্সে বন্দী করেন ক্ষণিকের অমরত্ব। তরুণদের কোলাহল, প্রবীণদের মুগ্ধ নিঃশ্বাস আর শিশুদের কলকাকলিতে শান্ত জলধি হয়ে ওঠে মুখরিত।

    ঢাকার গুলশান থেকে আসা মো. নুরুজ্জামান নামে একজন বলেন, এখানকার পরিবেশটি খুব কোমল। আমার পরিবারের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ঢাকায় বসবাস করি সেখানে এক ধরনের চিড়িয়াখানার মতো থাকি। এখানে এসে খুব ভালো লাগছে, পদ্মবিলে নৌকা নিয়ে গিয়েছি মনে শান্তি লাগছে।

    ঢাকার বনস্রী থেকে আসা শাহিদা বেগম বলেন, এই পরিবেশে এত মুগ্ধ যা বলে বুঝানো যাবে না৷ তিনি আরও এই পদ্মবিলে জীবনে প্রথমবার আসলাম ঘুরে দেখলাম অনেক ভালো লেগেছে।

    ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা তাসমিয়া আক্তার বলেন, এখানে এত ভালো লেগেছে, বাড়িতে যাওয়ার মন মানছে না। পরিবেশটা মুগ্ধ ছড়িয়ে রেখেছে।

    প্রকৃতির এই রূপবদল শুধু যে কাব্যিক তৃষ্ণা মেটায় তা নয়, স্থানীয় জনজীবনের ক্যানভাসেও এঁকে দেয় এক টুকরো সচ্ছলতার হাসি। যে মাঝিরা বর্ষার জল নেমে গেলে কর্মহীনতায় ভোগেন, এই পদ্ম-মৌসুমে তাদের হাতে ওঠে বৈঠা। মৃদু ঢেউয়ের তালে তালে দর্শনার্থীদের বিলের গহীনে নিয়ে গিয়ে তারা উপার্জন করেন দু-মুঠো অন্ন।

    পদ্মবিলের মাঝি মো. শাহআলম মিয়া বলেন এই পদ্মবিলের কারণে আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো উপার্জন হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ আসে। আমি দৈণিক ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা উপার্জন করতে পারি।

    আরেক মাঝি বিল্লাল হোসেন বলেন, পর্যটক এখন প্রতিদিন আসতেছে নৌকা নিয়ে তাদের পদ্ম ফুলের মাঝে নিয়ে যায় তারা অনেক আনন্দ করে। তাদের এই আনন্দ দেখে অনেক ভালো লাগে। তিনি আরও বলেন, এই পদ্মবিলের কারণে বর্ষার মৌসুমে আমরা বেকার অবস্থায় থাকতাম। এখন আর অবসর থাকতে হচ্ছে না এই বিলের কারণে।

    তবে এই অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে এক আকুল মিনতি। মানুষের অবাধ পদচারণায় অহেতুক ফুল ছিঁড়ে ফেলার উন্মাদনা বিলের স্বকীয়তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। প্রকৃতির এই অবিনাশী সৌন্দর্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন দায়িত্বশীল আচরণ ও সচেতনতা।

    পরিবেশ ও নদী সুরক্ষাবিষয়ক সংগঠন তরী বাংলাদেশের আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, শত শত বছর ধরে প্রকৃতি নিজের নিয়মে এই বিলকে সাজিয়েছে। অযথা ছবি তোলার জন্য বা সাময়িক আনন্দের বশে পদ্মফুল, পদ্মাকাঁট বা ফুলগাছ উপড়ে ফেলবেন না। আপনার ছেঁড়া একটি ফুল বিলের প্রজনন প্রক্রিয়া এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ব্যাহত করে। তিনি আরও বলেন পদ্মবিল অসংখ্য দেশি ও অতিথি পাখির বিচরণক্ষেত্র। শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশ বজায় রাখুন।

    স্থানীয় মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দীপক চৌধুরী এই পদ্মবিল কেন্দ্রিক সম্ভাবনা ও সার্বিক পরিবেশ রক্ষা নিয়ে বলেন আমাদের মনিয়ন্দ ইউনিয়নের এই সীমান্তঘেঁষা বিলটি প্রকৃতি এক অপূর্ব সাজে সাজিয়েছে। শত শত মানুষ প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে এখানে আসছেন, যা আমাদের পুরো এলাকার জন্য আনন্দের ও গর্বের বিষয়। আমরা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে এলাকার পরিবেশ রক্ষা ও দর্শনার্থীদের সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে নজর দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। দর্শনার্থীদের সুরক্ষায় এবং তারা যেন নির্বিঘ্নে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন, সেজন্য স্থানীয়ভাবে আমরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছি।

    আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া বলেন, পদ্মবিলটি আখাউড়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এলাকাটিকে পরিবেশবান্ধব ও পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও বিরল বাস্তুতন্ত্র যেন কোনোভাবেই বিনষ্ট না হয়, সেদিকে আমরা কঠোর নজরদারি রাখছি।সবুজের বুকে গোলাপি পদ্মের এই রূপকথা শুধুই এক নৈসর্গিক দৃশ্য নয়, বরং প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক অস্তিত্বের এক মায়াবী সেতু। স্থানীয় প্রশাসনের সদিচ্ছা, পরিবেশপ্রেমীদের সচেতনতা আর দর্শনার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণ যদি এক সুতোয় গাঁথা যায়, তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই পদ্মবিল কেবল শরতের ক্ষণস্থায়ী স্বর্গ হয়ে থাকবে না—হয়ে উঠবে প্রকৃতির এক চিরন্তন উদ্যান। গোধূলির আলোয় শান্ত জলের বুকে হেলে পড়া পদ্মগুলো যেন নিঃশব্দে বলে যায়, প্রকৃতিকে ভালোবেসে বাঁচিয়ে রাখলেই মানুষ খুঁজে পাবে তার কাঙ্ক্ষিত প্রশান্তি।

  • বারান্দায়ই হোক প্রথম বাগান

    বারান্দায়ই হোক প্রথম বাগান

    ফিচার:

    শহুরে জীবনে যান্ত্রিকতায় সবুজের সান্নিধ্য পাওয়া কঠিন। জীবনের নানারকম ব্যস্ততা আর অফিসের কাজের চাপে আমরা প্রায় ভুলেই যাই প্রকৃতির সান্নিধ্য কতটা জরুরি। তবে ছোট্ট বারান্দাটাই হতে পারে আপনার শখের বাগান। কিন্তু আগের কোনো অভিজ্ঞতা নেই, ভাবনার কিছু নেই; শুধু একটু ইচ্ছাশক্তি আর ধৈর্য থাকলেই চলবে। তাহলে জেনে নেওয়া যাক একটি ভালো বাগান করতে গেলে কী কী বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি।

    শুরুটা যেভাবে করবেন

    জায়গা : প্রথমেই আপনার ব্যালকনির জায়গাটা ভালো করে দেখে নিন। কতটা জায়গা আছে, সূর্যের আলো কতটা পড়ে, বাতাস চলাচল কেমন—এ বিষয়গুলো জানা জরুরি। সাধারণত চার থেকে ছয় ঘণ্টা সূর্যের আলো পেলেই বেশিরভাগ গাছ ভালো থাকে।

    যদি দিনের শুরুতে পূর্ব দিকের রোদ আপনার বারান্দায় পড়ে তাহলে নিশ্চিন্তভাবে ফুলগাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আর যদি পশ্চিমের রোদ ঢোকে সেক্ষেত্রেও ফুলগাছ লাগানো যাবে।

    গাছের টব : বারান্দার বাগানে পাত্র বা গাছের টব ঠিকমতো নির্বাচন করা খুব জরুরি। কারণ গাছের প্রকৃতি অনুযায়ী আলাদা ধরনের টব প্রয়োজন হতে পারে। প্লাস্টিক, টেরাকোটা, সিমেন্ট বা হ্যাংগিং পট—যেকোনো কিছু ব্যবহার করতে পারেন। শুধু খেয়াল রাখতে হবে, পাত্রের নিচে যেন পানি নিষ্কাশনের ছিদ্র থাকে।

    মাটি ও সার : ভালো মানের মাটি আর জৈব সার ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে নার্সারি থেকে প্রস্তুত করা মাটিও কিনতে পারেন।

    গাছ : এবার গাছ নির্বাচন বা পছন্দ করার পালা। বারান্দায় সাধারণত ছোট গাছ বা হার্বস লাগানো ভালো। যেমন টমেটো, মরিচ, ধনিয়া, পুদিনা, তুলসী, অ্যালোভেরা; আবার গাঁদা, গোলাপ, বাগানবিলাসের মতো ফুলের গাছও ভালো হয়। কেউ কেউ ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট, পথোস ও পাতাবাহার-জাতীয় গাছ বেশি পছন্দ করেন। এগুলো মাঝেমধ্যে আপনি ঘরের ভেতরেও রাখতে পারবেন। এছাড়া অর্কিড আপনার ঘরকে একটি প্রিমিয়াম লুক দিতে পারে।

    পানি দেওয়া : গাছের প্রজাতি অনুযায়ী পানির পরিমাণ ঠিক করুন। বেশি পানি দিলে গাছের শেকড় পচে যেতে পারে, আবার কম দিলে শুকিয়ে যাবে। তাই নিয়মিত পানি দিন। তবে আপনার যদি যদি অতিরিক্ত কাজের চাপ থাকে, সেক্ষেত্রে প্রতিদিন পানি না দিলেও চলে, এমন গাছ নির্বাচন করতে পারেন।

    সঠিক পরিচর্যা : গাছের বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত যত্ন নিন। মাঝে মাঝে গাছের ডালপালা ছাঁটুন, পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন। একটু করে মাটি নিড়িয়ে দিন। অনলাইনে বাগান করা কমিউনিটিতে যুক্ত হোন। এতে নতুন ধারণা পাবেন।

    আলো, সার, পানি—সবকিছুই পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া সত্ত্বেও গাছ যদি না বাড়ে, তাহলে কোথাও সমস্যা হচ্ছে কি না দেখা জরুরি। অনেক সময় গাছে পোকা লাগলেও সহজে বাড়তে চায় না।

    আপনার বারান্দায় রোদ ঢুকলে টগর, গোলাপ, অপরাজিতা, জুঁই, দোলনচাঁপা, অর্কিড, বেলি ও হাসনাহেনা ফুলের গাছ লাগাতে পারেন। আর যদি রোদ না ঢোকে তাহলে নানা ধরনের পাতাবাহার গাছ দিয়ে সাজিয়ে তুলতে পারেন আপনার ছোট্ট বারান্দা। এক্ষেত্রে এরিকা পাম ও মানিপ্লান্ট গাছ লাগাতে পারেন।

    প্রতিদিন নিয়ম করে সকালে ও বিকালে গাছে পানি দিতে হবে। তবে খুব কড়া রোদে পানি দেওয়া যাবে না। টবের মাটি ভিজে থাকলেও পানি দেবেন না। পানি দিতে দিতে টবের মাটি যদি শক্ত হয়ে আসে, তাহলে মাটিকে কুপিয়ে আলগা করে নিতে হবে।

    বারান্দার আয়তন বুঝে টবের সংখ্যা নির্বাচন করুন। গাদাগাদি করে গাছ না রাখাই ভালো। শুকনো পাতা জমতে দেবেন না। গাছের গোড়ায় সেগুলো না রেখে ফেলে দিন। এতে গাছ ও বারান্দা দুটিই পরিষ্কার থাকবে। জায়গা কম থাকলে ঝুলন্ত টবও ব্যবহার করতে পারেন। ঝুলন্ত টবে কোন গাছগুলো ভালোভাবে বেড়ে উঠবে এবং দেখতে সুন্দর লাগবে, সেগুলো বেছে নিন।

    তিন মাস অন্তর সার দেবেন গাছের গোড়ায়। পাতাজাতীয় গাছগুলোয় মাঝে মাঝে রোগজীবাণু আক্রমণ করে। ফলে পাতা কুঁকড়ে যায়। পাতা কেটে ফেললে সেক্ষেত্রে নিয়মিত কীটনাশক স্প্রে করতে হবে। এসব নিয়ম মানলেই সবুজে সজ্জিত থাকবে আপনার সাধের বারান্দার সাধের বাগানটি।

  • নিরাপদ মাতৃত্ব ও শিশুর জন্য অপরিহার্য

    নিরাপদ মাতৃত্ব ও শিশুর জন্য অপরিহার্য

    গর্ভধারণ নারীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সময়। এ সময়ে শুধু গর্ভের শিশুরই নয়, মায়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হয়। একটি সুস্থ গর্ভাবস্থা এবং নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান উপায় হলো নিয়মিত গর্ভকালীন চেক-আপ। অনেকেই মনে করেন, শরীরে কোনো সমস্যা না থাকলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু গর্ভাবস্থার অনেক জটিলতা শুরুতে কোনো লক্ষণ ছাড়াই দেখা দিতে পারে। তাই নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা মা ও শিশুর জীবন রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    গর্ভকালীন চেক-আপের মূল উদ্দেশ্য

    * মায়ের সার্বিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা।

    * গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ সম্পর্কে অবগত হওয়া।

    * উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা দ্রুত শনাক্ত করা।

    * গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তস্বল্পতা ও সংক্রমণ শনাক্ত করা।

    * নিরাপদ প্রসবের পরিকল্পনা করা।

    * প্রসব-পরবর্তী মা ও নবজাতকের যত্ন সম্পর্কে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া।

    * মাকে সঠিক পুষ্টি, স্বাস্থ্যবিধি ও জীবনযাপন সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া।

    কখন প্রথম চেক-আপ করা উচিত

    গর্ভধারণ নিশ্চিত হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব আদর্শভাবে প্রথম ১২ সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম গর্ভকালীন চেক-আপ করা উচিত। এতে গর্ভের বয়স নির্ধারণ, সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ (ইডিডি) হিসাব করা এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা যায়।

    গর্ভকালীন চেক-আপের সাধারণ সময়সূচি

    ১-২৮ সপ্তাহ : প্রতি চার সপ্তাহে একবার।

    ২৮–৩৬ সপ্তাহ : প্রতি দুই সপ্তাহে একবার।

    ৩৬ সপ্তাহ থেকে প্রসব পর্যন্ত : প্রতি সপ্তাহে একবার। তবে যাদের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী আরো ঘনঘন ফলো-আপের পরামর্শ দিতে পারেন।

    প্রতিটি চেক-আপে কী কী তথ্য জানা যায়

    রক্তচাপ (BP), ওজন বৃদ্ধি, প্রস্রাব পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, রক্তস্বল্পতা মূল্যায়ন, রক্তের শর্করার মাত্রা, শিশুর হৃৎস্পন্দন, জরায়ুর উচ্চতা, শিশুর অবস্থান ও নড়াচড়া, মায়ের হাত-পা ফুলে যাওয়া আছে কি না এবং প্রয়োজনে আল্ট্রাসনোগ্রাফি।

    গর্ভাবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা

    চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভাবস্থায় সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা (CBC), রক্তের গ্রুপ ও Rh টাইপিং, হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা, রক্তে শর্করা (Blood Sugar) পরীক্ষা, প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা, হেপাটাইটিস বি, এইচআইভি ও সিফিলিস স্ক্রিনিং এবং প্রয়োজনে থাইরয়েড পরীক্ষা করা হতে পারে।

    আল্ট্রাসনোগ্রাফির গুরুত্ব

    আল্ট্রাসনোগ্রাফি গর্ভাবস্থার একটি নিরাপদ ও কার্যকর পরীক্ষা। এর মাধ্যমে গর্ভের বয়স নির্ধারণ, শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, জন্মগত ত্রুটি শনাক্তকরণ ও প্লাসেন্টার অবস্থান জানা যায়। এ ছাড়া অ্যামনিয়োটিক তরলের পরিমাণ, যমজ বা একাধিক সন্তান আছে কি না এবং শিশুর প্রসবপূর্ব অবস্থান জানা যায়।

    পুষ্টির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব

    গর্ভাবস্থায় সুষম খাদ্য গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ডিম, মাছ, চর্বিহীন মাংস, ডাল, শাকসবজি, মৌসুমি ফল এবং সম্পূর্ণ শস্যজাত খাবার রাখা উচিত। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত চিনি ও লবণযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।

    প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও ওষুধ

    চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড, আয়রন ট্যাবলেট, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি (প্রয়োজনে) নিয়মিত গ্রহণ করা উচিত।

    মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নও জরুরি

    গর্ভাবস্থায় হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা বা বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে। তাই পরিবারের সহযোগিতা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ইতিবাচক পরিবেশ এবং প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মায়ের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

    কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে

    গর্ভাবস্থায় যোনিপথ দিয়ে রক্তপাত, পানি ভেঙে যাওয়া, শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া, তীব্র পেটব্যথা, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা, খিঁচুনি, উচ্চ জ্বর, শ্বাসকষ্ট, মুখ, হাত বা পা হঠাৎ ফুলে যাওয়া কিংবা বারবার বমি হওয়ার মতো যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

    পরিবারের দায়িত্ব

    একজন গর্ভবতী মায়ের সুস্থতার জন্য পরিবারের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের উচিত—

    * নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া।

    * পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা।

    * মানসিকভাবে সাহস ও সমর্থন দেওয়া।

    * জরুরি পরিস্থিতির জন্য নিকটস্থ হাসপাতাল ও যাতায়াতের ব্যবস্থা আগে থেকেই ঠিক রাখা।

    * প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ, রক্তদাতা ও প্রয়োজনীয় অর্থের প্রস্তুতি রাখা।

    নিরাপদ মাতৃত্বে সচেতনতার বিকল্প নেই

    বর্তমানে অধিকাংশ গর্ভকালীন জটিলতা সময়মতো শনাক্ত করা গেলে সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। তাই কোনো ধরনের কুসংস্কার, অবহেলা বা অল্পশিক্ষিত ব্যক্তির পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে নিবন্ধিত চিকিৎসক বা দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধানে পুরো গর্ভকাল অতিবাহিত করা উচিত।

    পরিশেষে বলা যায়, গর্ভকালীন নিয়মিত চেক-আপ কেবল একটি স্বাস্থ্যসেবা নয়; এটি মা ও অনাগত শিশুর জীবন রক্ষার অন্যতম কার্যকর বিনিয়োগ। সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সুষম খাদ্য, প্রয়োজনীয় টিকা, মানসিক সুস্থতা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার মাধ্যমে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব। একটি সুস্থ মা-ই একটি সুস্থ প্রজন্মের ভিত্তি। তাই গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই নিয়মিত চেক-আপকেজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

  • ১৪ বছরের কিশোরীর বিদ্যুৎহীন ওয়াশিং মেশিন উদ্ভাবন

    ১৪ বছরের কিশোরীর বিদ্যুৎহীন ওয়াশিং মেশিন উদ্ভাবন

    ভারতের কেরালার ১৪ বছর বয়সি এক কিশোরী ঘরের কাপড় ধোয়ার সময় ও বিদ্যুৎ সংকটের সমস্যা সমাধানে তৈরি করেছে অভিনব ওয়াশিং মেশিন। সাইকেলের প্যাডেল ও চেইন ব্যবহার করে তৈরি এই মেশিন চালাতে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। এটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে প্রায় ২ হাজার ভারতীয় রুপি।

    কিশোরীর নাম রেম্যা জোসে। কেরালার মালাপ্পুরম জেলার কিঝাট্টুরের বাসিন্দা রেম্যা যখন দশম শ্রেণির পরীক্ষার্থী, তখন তার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। একই সময়ে তার বাবা ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ফলে ঘরের বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি কাপড় ধোয়ার দায়িত্ব পড়ে রেম্যা ও তার যমজ বোনের ওপর। এর মধ্যে প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াতেই তাদের প্রায় চার ঘণ্টা সময় লাগত। হাতে কাপড় ধুতে গিয়ে পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছিল না রেম্যা।

    সমস্যার সমাধান হিসেবে রেম্যা নিজেই একটি ওয়াশিং মেশিন তৈরির পরিকল্পনা করে। আগে সে বৈদ্যুতিক ওয়াশিং মেশিন কীভাবে কাজ করে তা পর্যবেক্ষণ করে। এরপর বিদ্যুতের পরিবর্তে সাইকেলের প্যাডেল দিয়ে মেশিন চালানোর নকশা তৈরি করে। তার বাবা সেই নকশা নিয়ে স্থানীয় একটি অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে যান। পরে সেখানে মেশিনটি তৈরি করা হয়।

    মেশিনটিতে সাইকেলের মতো প্যাডেল ও চেইন ব্যবস্থার মাধ্যমে ভেতরের ড্রাম ঘোরানো হয়। কাপড়, পানি ও ডিটারজেন্ট দেওয়ার পর ব্যবহারকারী প্যাডেলে চাপ দিলে ড্রাম ঘুরতে থাকে। কাপড় অন্তত ১০ মিনিট ভিজিয়ে রাখার পর প্রায় তিন থেকে চার মিনিট প্যাডেল করলেই ধোয়ার কাজ হয়। পানি ঝরিয়ে আবার প্যাডেল করলে কাপড়ের অতিরিক্ত পানিও বের হয়ে যায়। জাতীয় উদ্ভাবন ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, এভাবে কাপড় প্রায় ৮০ শতাংশ শুকিয়ে যায়।

    রেম্যার উদ্ভাবন পরে ভারতের ন্যাশনাল ইনোভেশন ফাউন্ডেশনের নজরে আসে। প্রতিষ্ঠানটি এটিকে ‘ওয়াশিং কাম এক্সারসাইজ মেশিন’ হিসেবে নথিভুক্ত করে। উদ্ভাবনটির জন্য রেম্যা জাতীয় পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে এবং এর পেটেন্টও হয়েছে।

    প্রতিদিনের একটি সাধারণ সমস্যা থেকে রেম্যার এই উদ্ভাবন দেখিয়েছে, বড় কোনো প্রযুক্তিগত সুবিধা ছাড়াও প্রয়োজন ও সৃজনশীল চিন্তা থেকে কার্যকর প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব।