সম্পাদকীয়

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া সেই ভাষণে জিন্নাহ যা বলেছিলেন

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া সেই ভাষণে জিন্নাহ যা বলেছিলেন

    ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও ভারত ভাগের মাত্র সাত মাস পর ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় পা রাখেন পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পূর্ব পাকিস্তানে সেটিই ছিল তার প্রথম এবং শেষ সফর। যক্ষ্মাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন জিন্নাহ। ঢাকায় আসার ছয় মাসের মধ্যেই তিনি মারা যান।

    দশ দিনের ওই সফরে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ঢাকাসহ চট্টগ্রামে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এ সময় তিনি একাধিক স্থানে বক্তব্যও দেন। এর মধ্যে ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্য বিশেষভাবে আলোচিত। এসব অনুষ্ঠানে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়েন জিন্নাহ।

    জিন্নাহর সেই ভাষণের বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো-

    ভদ্র মহোদয় ও মহোদয়াগণ আপনাদের উপাচার্য মহাশয় যখন আমাকে এসে অনুরোধ করলেন সমাবর্তন একটা বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। আমি তাকে স্পষ্ট বলে দিলাম আমার নানা ব্যস্ততার কারণে সমাবর্তনের জন্য একটা আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা প্রস্তুত করা হয়তো সম্ভব হবে না; যা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহান বিষয়াদি যেমন শিল্প ইতিহাস দর্শন বিজ্ঞান আইন প্রকৃতির সঙ্গে মানসম্মত হয়। যাইহোক- আমি অবশ্য প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, সমাবর্তন উপলক্ষে ছাত্রদের সামনে দুটো কথা বলব এবং এখন যে কথাগুলো বলব তা এই প্রতিজ্ঞা পূরণই বলা যায়। প্রথমেই উপাচার্য মহাশয়কে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করব বিভিন্ন গাল ভরা বিশেষণে আমাকে বিশেষায়িত করার জন্য।

    জনাব উপাচার্য। আমি এখন যা করছি কিংবা যতটা করতে সক্ষম হয়েছি মোটামুটি সবই ছিল আমার দায়িত্ব পালন। একজন মুসলমান হিসেবে সততা এবং নিঃস্বার্থতার সঙ্গে দেশের মানুষের সেবা করাটা দায়িত্ব হিসেবে বর্তায়। আপনাদেরকে যখন আমি কথাগুলো বলছি, তা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নয় বরং এমন একজন বন্ধু হিসেবে বলছি, যে সার্বক্ষণিক আপনাদের মমতায় বেঁধে রাখে। অনেকেই আজকে তাদের ডিপ্লোমা এবং ডিগ্রি অর্জন করেছেন। আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। আপনারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করার জন্য জয় মাল্য ছিনিয়ে নিয়েছেন।

    বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত পরিসরে যেখানে আপনারা প্রবেশ করতে যাচ্ছেন সেখানেও আপনাদের সফলতা কামনা করছি। অনেকেই আপনাদের শিক্ষা জীবনের শেষ প্রান্তে এবং জীবনের চরম চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। আপনারা ভাগ্যবান যে একান্ত নিজেদের একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যেতে পারছেন যা আপনাদের পূর্বপুরুষরা পারেননি। পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্মের কারণে যে যুগান্তকারী পরিবর্তনগুলো সূচিত হয়েছে তা আপনাদের এবং পরবর্তী ছাত্রদের বুঝতে পারাটা অত্যন্ত জরুরি। পরাধীনতার শিকল আমরা ভেঙেছি এখন আমরা মুক্ত মানুষ। আমাদের দেশ আমাদের একান্ত নিজেদের।

    আমাদের সরকার একান্ত নিজেদের। জনগণের জন্য জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছি। যাই হোক, স্বাধীনতা মানে কিন্তু লাইসেন্স পাওয়া নয়, এর মানে এই নয় যে তোমরা যা ইচ্ছা তাই করবে। রাষ্ট্রের কে কি মনে করল সেসব না ভেবে যেমন ভালো লাগে তেমন আচরণ করবে। আপনাদের উপর অনেক দায়িত্ব। বলতে গেলে অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি। আমাদের একতাবদ্ধ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জাতি হিসেবে কাজ করতে হবে। স্বাধীনতা অর্জনের সময় যে সামরিক শক্তির প্রয়োজন ছিল তার চেয়ে এখন বেশি দরকার উন্নয়নমূলক শক্তির জন্য। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সামরিক শক্তির প্রয়োগের চেয়ে কঠিন হচ্ছে তাকে গড়ে তোলাটা। জেলে যাওয়া কিংবা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা সরকার পরিচালনার চেয়ে সহজতর। বরঞ্চ যেসব বিপদ আমরা কাটিয়ে উঠেছি এবং যেসব কতিপয় ঝামেলা সামনে আসছে সেসব সম্পর্কে আপনাদের দুটি কথা বলি। পাকিস্তানের জন্ম ঠেকাতে না পারার অতৃপ্ত বাসনা মেটানোর জন্য শত্রুরা এখন নজর দিয়েছে আমাদের দুর্বল এবং ধ্বংস করার পথ খুঁজতে। এ কারণেই সরকার ক্ষমতায় আসতে না আসতেই পাঞ্জাব এবং দিল্লির ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হলো। হাজার হাজার পুরুষ, নারী এবং শিশুকে জবাই করা হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ ঘর ছাড়া হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই এমন ৫০ লাখ মানুষ পাঞ্জাবে এসে হাজির হয়েছে।দেহ এবং মন উভয় ক্ষেত্রেই বিপর্যস্ত এই দুর্ভাগা অভিবাষীদের পরিচর্যা এবং পুনর্বাসন করতে যেসব সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে তা যেন কোন বৃহৎ রাষ্ট্রকেও পথে নামাতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানের জন্মকে আতুর ঘরেই যারা মেরে দিতে চেয়েছিল তারা হতাশ হয়েছে। পাকিস্তান সেই বিপর্যয় কেবল কাটিয়েই ওঠেনি। বরঞ্চ আরও শক্তিশালী, মার্জিত এবং পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশিভাবে সজ্জিত। এর সঙ্গে শাড়ি বেঁধে আরও কিছু সমস্যা উদ্ভূত হয়েছে যেমন, ভারত কর্তৃক আমাদের উদ্বৃত্ত এবং সামরিক যন্ত্রপাতির প্রতিহিংসামূলক আচরণ এবং অতি সম্প্রতি আপনাদের এই প্রদেশের সঙ্গে পুরোপুরি অর্থনৈতিক অবরোধ স্থাপন। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, ভারতীয় প্রদেশের সুচিন্তার মানুষগুলো এসব ঘটনাকে সমর্থন করেন না এবং যারা এসব ঘটাচ্ছেন তাদেরও মন মানসিকতার পরিবর্তন হবে।

    তারপরেও এসব বিষয়ে আপনাদের ধারণা থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের অংশের উপর কড়া নজর রাখার উপর তারা জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে সম্প্রতি আপনাদের প্রদেশের উপর আক্রমণের ঘটনা রহস্যময় রূপ নিয়েছে। অতি দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমাদের শত্রুদের মধ্যে কিছু মুসলমানও রয়েছে। যারা প্রাদেশিকতার জোর প্রচারণা চালাচ্ছে যাতে পাকিস্তান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আগের মতো ভারতীয় আধিপত্যের সঙ্গে একাত্ম হয়। যারা এইসব ভাবছে তারা বোকার স্বর্গে বসবাস করছে যদিও তা তাদের চেষ্টা থেকে নিরস্ত রাখছে না। প্রতিটা দিন একগাদা মিথ্যা-বানোয়াট ইস্যু তৈরি করা হচ্ছে যাতে দেখানো যায় যে, মুসলমানদের মধ্যে সৌহার্দ্য নেই এবং তাদেরকে আইন বিরোধী কাজকর্মে উদ্বুদ্ধ করা যায়। সাম্প্রতিককালের ভাষা বিষয়ক বিতর্কের কথাই ধরুন; আমি অতীব দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি আপনাদের অনেকেই প্রাদেশিকতাবাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন।

    আপনাদের মনে কি এটা কখনোই জাগে না, যে প্রদেশের পত্রিকাগুলোর কাছে পাকিস্তান কেবল একটি অভিশাপের নাম- তারাই ভাষার ব্যাপারে আপনাদের অধিকার শেখাতে আসছে? এটা কি মনে হয় না যে, অতীতে যে মুসলমানদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে কিংবা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। হুট করে ভাষার বিষয়ে সে এখন আপনাদের দাতা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। আপনাদের অধিকার সচেতন হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখাচ্ছে। এই ফিফথ কলামিস্টদের থেকে সাবধান হন।

    পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার বিষয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি আরেকটি বার ব্যাখ্যা করছি। এই প্রদেশের অফিশিয়াল ব্যবহারের জন্য এই প্রদেশের লোকজন যেমনটা চায় তেমন এক ভাষা তারা পছন্দ করতে পারে। এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই।

    দেশের লোকজন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে নিজেদের পছন্দমত ভাষা পছন্দ করে নেবে। যাই হোক, লিঙ্গুয়া-ফ্রাঙ্কা অর্থাৎ বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে অন্তর যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত ভাষা অবশ্যই উর্দু হবে অন্য কিছু নয়। সুতরাং রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং অবশ্যই উর্দু, যা এমন একটি ভাষা যা উপমহাদেশের লাখ লাখ মুসলমানদের নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে উঠেছে পাকিস্তানের প্রতিটি কোনায় কোনায়। যে ভাষা অন্য যেকোনো প্রাদেশিক ভাষার চেয়ে লোকে ভালো বুঝতে পারে। মুসলমানদের কৃষ্টি এবং সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং অন্যান্য ইসলামী রাষ্ট্রের ভাষাগুলোর মোটামুটি কাছাকাছি। ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে উর্দুর বিতরণ এমনকি অফিসিয়াল ব্যবহার থেকে উর্দুকে বাদ রাখা বিনা কারণে ঘটেনি। ভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে যারা পানি খোলা করতে চাইছে ব্যাপারটা তাদের অজানা নয়। এ ঝামেলা স্বীকার না করে উপায় নেই। যদিও তারা স্বীকার করবে না।

    কেননা তা তাদের মনোবাসনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের ভাষা-বিতর্ক সৃষ্টির একমাত্র কারণ মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন তৈরি এবং অবাঙালি মুসলমানদের প্রতি ঘৃণার প্ররোচনা প্রদান। অবশ্য ভাষা বিতর্কে আপনাদের প্রধানমন্ত্রী করাচি থেকে ফিরে যে স্পষ্ট বয়ান দিয়েছেন যে বাঙালিরা ইচ্ছে করলে বাংলাকে অফিশিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ বানাতে পারেন। শুনে তারা তাদের কর্মপরিকল্পনা পরিবর্তন করেছে। এখন তারা চাচ্ছে বাংলাকে পুরো পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বানাতে এবং আরেকটি মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর দাবিকে তারা অগ্রাহ্য করছে। তারা বলছে, বাংলা এবং উর্দু দুটিকেই রাষ্ট্রভাষা করতে। এ বিষয়ে আপনাদের ভুল করা উচিত নয়। রাষ্ট্রের একাত্মতার স্বার্থে কেবল একটাই রাষ্ট্রভাষা থাকতে পারে এবং আমার মতে তা উর্দু। এ বিষয়ে অনেক আলোচনা করেছি আমাদের শত্রুদের এবং কিছু সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের ব্যাপারে। তাই আপনাদের সতর্ক করছি।

    আপনারা যারা জীবনের বিস্তীর্ণ পথে হাঁটতে যাচ্ছেন তারা নিজেদেরকে এইসব মানুষ থেকে দূরে রাখবেন। যারা আরও কিছুদিন পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন তারা নিজেদের স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদের

    বলির পাঠা হতে দেবেন না। আগের দিন যেমনটা বলেছিলাম আমাদের নিজেদের জন্য পিতা-মাতার জন্য রাষ্ট্রের জন্য আপনারা পুরো দোস্তর পড়াশোনায় মনোনিবেশ করুন। একমাত্র এই পথেই ভবিষ্যতের জীবনযুদ্ধের জন্য আপনারা নিজেদেরকে সজ্জিত করতে পারবেন। একমাত্র এভাবেই আপনি নিজেকে দেশের সম্পদ, শক্তি এবং অহংকার রূপে গড়ে তুলতে পারবেন।

    একমাত্র এভাবেই সামনের নানাবিধ সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে দেশকে বিশ্বের মধ্যে উন্নত ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন। নবীন বন্ধুরা, এ কারণে আমি কিছু ব্যাপারের প্রতি আলোকপাত করব যা সম্পর্কে আপনাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে। প্রথমত আমাদের অন্তর্বর্তী ফিফথ কলামিস্টদের ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব স্বার্থপর ব্যক্তিদের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা ধারণ করতে হবে এবং তাদের মূলোৎপাটন করতে হবে। কেননা তারা তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আপনাকে কাজে লাগাতে চাইবে। তৃতীয়ত, প্রকৃত সৎ এবং পরোপকারী সরকারি কর্মচারী যারা তাদের সবটুকু দিয়ে জনগণের জন্য কাজ করতে চায় তাদেরকে চিনতে হবে এবং সমর্থন করতে হবে। চতুর্থত, মুসলিম লীগকে আরও দৃঢ়ভাবে গড়ে তুলতে হবে কারণ তারা প্রকৃত অর্থেই এক মহান পাকিস্তান গড়ে তুলবে। পঞ্চমত এই মুসলিম লীগই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এখন পাকিস্তানকে গড়ে তোলার সে পবিত্র দায়িত্বের রক্ষক হিসেবে একটা মুসলিম লীগেরই দায়িত্ব। ষষ্ঠত, এমন অনেকেই রয়েছেন যারা আমাদের সংগ্রামের সময় আমাদের বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করেননি এমনকি আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন এবং খোলামেলা ভাবেই আমাদের মহান সংগ্রামের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছেন এবং এই শত্রুপক্ষের সহযোগিতাকারীদের সংখ্যা মোটেই অপ্রতুল নয়।

    তারা হয়তো এখন তাদের চটকদার স্লোগান, বাধা বলি, আদর্শ আর কর্মসূচি নিয়ে আমাদের সামনে গিয়ে আসতে পারে। কিন্তু তাদের অবশ্যই বিশ্বস্ততা কিংবা তাদের অন্তর্নিহিত চিন্তাধারার যে প্রকৃত পরিবর্তন ঘটেছে তার প্রমাণ দিতে হবে। আর এর সত্যতা পাওয়া যাবে এই ভয়ংকর সন্ধিক্ষণে যারা তাদের ব্যাঙের ছাতার মত দল গঠন না করে আমাদের মত ও বিশ্বাস নিয়ে মুসলিম লীগে যোগদান করে এবং এই দলকে সমর্থন করে। এমন একটা সময় যখন আমরা নানাবিধ বহির্মুখী এবং অন্তর্মুখী বিপদের সম্মুখীন হচ্ছি যার সঙ্গে সাত কোটি মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে রয়েছে এজন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ সংহতি ঐক্য আর শৃঙ্খলা একটা ব্যাপারে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে একতায় উত্থান বিভেদে পতন এরকম আরও একটা ব্যাপার আছে যার প্রতি আমি আলোকপাত করতে চাই।

    নবীন বন্ধুরা এখন পর্যন্ত আপনারা প্রচলিত গদ বাধার রীতি অনুসরণ করে আসছেন। যখন আপনারা আপনাদের ডিগ্রি নিয়ে হাজার হাজার ইউনিভার্সিটি থেকে বের হন তখন আপনাদের একটাই চিন্তা আর আকাঙ্ক্ষা থাকে। আর তা হলো সরকারি চাকরি। আপনাদের উপাচার্য যথার্থই বলেছেন অদ্যবদি শিক্ষাদীক্ষার পুরনো আর প্রচলিত রীতি হলো সুপ্রশিক্ষিত সুসজ্জিত কেরানি তৈরি করা। অবশ্য তাদের মধ্যে কেউ কেউ উচ্চ পর্যায়ে অধিষ্ঠিত হয়েছিল কিন্তু পুরো সিস্টেমটাই ছিল সুদক্ষ কেরানি তৈরি করার জন্য সিভিল সার্ভিসে মূলত ব্রিটিশ কর্মীরাই নিযুক্ত হতেন পরে ভারতীয়রা এতে যোগদান শুরু করেন এবং এই ধারা বাড়তেই থাকে এর সামগ্রিক উদ্দেশ্য ছিল এমন একটা মানসিকতা তৈরি করা যে একজন সাধারণ মানুষ বিএ অথবা এমএ পাশ করেই একটি সরকারি চাকরি খুঁজতে থাকবে যদি সে এটা পেয়ে যেত তবে ভাবতো সে তার র্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছে গেছে আমরা সবাই জানি যে এর প্রকৃত ফলাফল কি ছিল? আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি একজন এমএ পাশ ব্যক্তি একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারের থেকেও কম আয় করেন এবং তথাকথিত অধিকাংশ সরকারি চাকরিজীবী সচ্ছল পরিবারে নিযুক্ত বৃত্তের থেকেও দুর্দশায় জীবন অতিবাহিত করেন। এখন আমি চাই আপনারা সে প্রচলিত রীতি আর মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসুন। কারণ আমরা এখন মুক্ত পাকিস্তানের বাসিন্দা। সরকার হাজারে হাজারে চাকরি দিতে পারবে না এটা অসম্ভব। কিন্তু সরকারি চাকুরির এই প্রতিযোগিতায় আপনাদের মধ্যে অধিকাংশই নোবলহীন হয়ে পড়েন। সরকার কেবল সীমিত জনকে চাকরি দিতে পারে এবং যারা বাকি থাকে তারা কোন কিছুতেই স্থির হতে পারে না। আর এই হতাশ মানুষগুলো সহজেই স্বার্থান্বেষী নিষিধের শিকারে পরিণত হন। আমি চাই আপনারা আপনাদের মন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এমন পথে পরিচালিত করুন। সেসব ক্ষেত্রে যেসব ক্ষেত্রে আপনার জন্য উন্মুক্ত এবং ভবিষ্যতে আরও উন্মুক্ত হবে। কায়িক পরিশ্রম করার মধ্যে কোনো লজ্জা নেই। কারিগরি শিক্ষায়ও প্রচুর সুযোগ রয়েছে কারণ কারিগরি জ্ঞানের দক্ষ লোকজনের ভীষণ প্রয়োজন আমাদের। আপনারা অর্থ ও ব্যাংকিং, বাণিজ্য, আইন প্রভৃতি সম্পর্কে জানতে পারেন যা বর্তমানে অপরিসীম সুযোগ সৃষ্টি করছে। ইতোমধ্যে আপনারা জানেন নতুন নতুন কারখানা, ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, বাণিজ্যিক ফার্ম প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এবং সেগুলো সময়ের সঙ্গে বাড়তেই এই পথগুলোই আপনাদের জন্য অপারিত। এগুলো সম্পর্কে ভাবুন এবং আপনার মনোযোগকে এদিকে পরিচালিত করুন। বিশ্বাস করুন এভাবে আপনি সরকারি চাকরির তুলনায় অনেক বেশি লাভবান হবেন। অনেক বেশি খুশি থাকবেন। কারণ অনেক বেশি সুযোগের মাধ্যমে আপনি অনেক বেশি উন্নতি করতে পারবেন যদি আপনি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আর কারখানাগুলোয় যোগদান করেন। আর এভাবে আপনি আপনার নিজের পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও সহযোগিতা করতে পারবেন।

    আমি আপনাদের একটি উদাহরণ দিতে পারি। আমি একজন তরুণকে চিনি যিনি সরকারি চাকরিতে ছিলেন। চার বছর আগে ২০০ রুপিতে তিনি একটি ব্যাংকিং করপোরেশনে যোগদান করেন। কারণ তিনি ব্যাংকিং বিষয়ে পড়েছিলেন। আজ তিনি ওই করপোরেশনের একটি ফার্মের ব্যবস্থাপক এবং মাত্র চার বছরের মাথায় তিনি এখন মাসিক ১৫০০ রুপি আয় করছেন। এই সুযোগগুলোর সৎ ব্যবহার করতে হবে এবং আমি সত্যিই আপনাদের উপর খুশি হব যদি আপনারা বিষয়গুলো নিয়ে ভাবেন।

    পরিশেষে আমি আচার্যকে ধন্যবাদ জানাই। আর বিশেষত ধন্যবাদ জানাই উপাচার্যকে। আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জ্ঞাপন আর ওইসব প্রশংসাসূচক বাক্যবর্ষণের জন্য। আমার আশা নয় বরং দীর্ঘ প্রত্যয় পূর্ব বাংলার তরুণেরা আমাকে আশাহত করবে না।

  • নতুন বাংলাদেশ ও শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক পুনর্গঠন

    নতুন বাংলাদেশ ও শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক পুনর্গঠন

    শিক্ষা ডেস্ক:

    ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় এনে দিয়েছে। রাজপথের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের মাধ্যমে তরুণ সমাজ শুধু এক ফ্যাসিস্ট শাসনের শিকড় উপড়ে ফেলেনি, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের আমূল রূপান্তরের ঐতিহাসিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। তবে যে তরুণদের রক্তের বিনিময়ে এই নতুন বন্দোবস্তের সুযোগ তৈরি হলো, তাদের সেই স্বপ্নের ভিত্তি মজবুত করতে হলে হাত দিতে হবে জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত—শিক্ষাব্যবস্থায়। রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার যদি বিপ্লবের প্রথম পর্ব হয়, তবে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক পুনর্গঠনই হলো রাষ্ট্র টেকসই করার দ্বিতীয় ও প্রধানতম লড়াই।

    বিগত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের শিক্ষা খাত এক গভীর কাঠামোগত পঙ্গুত্বের মধ্য দিয়ে গেছে। আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা পরিণত হয়েছিল শুধু সনদ সর্বস্ব, মুখস্থনির্ভর এবং বৈশ্বিক কর্মবাজার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক প্রক্রিয়ায়। ইউনেসকোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের অন্তত ৬ শতাংশ অথবা জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা উচিত। অথচ বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের শিক্ষা বাজেট বছরের পর বছর ধরে জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৪ শতাংশের ঘরে আটকে রয়েছে। যদিও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ২ শতাংশে উন্নীত করে। তবু দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেসকোর ‘গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট’-এ বারবার এই বাজেট সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। এই বরাদ্দের বড় অংশই আবার চলে যায় অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যয়ে, যা উদ্ভাবন বা গবেষণায় কোনো অবদান রাখে না।

    শিক্ষা খাতের এই গুণগত দেউলিয়াত্বের ফল দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশে সামগ্রিক বেকারত্বের তুলনায় উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ডিগ্রিধারীদের এক বিরাট অংশই স্নাতকোত্তর শেষ করার পর দীর্ঘকাল উপযুক্ত কর্মসংস্থান পান না। এর মূল কারণ শিল্প খাতের বাস্তব চাহিদা এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের মধ্যকার পর্বতসম ব্যবধান। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিকস ও বিশ্বমানের দক্ষতার যুগে আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো এখনো দুই দশক আগের সিলেবাস আঁকড়ে ধরে আছে।

    শিক্ষার এই নিম্নমানের প্রতিফলন ঘটছে বৈশ্বিক মূল্যায়নেও। কোয়াকুয়ারেলি সিমনডস বা টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ে বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ বা ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুপস্থিতি এখন নিয়মিত চিত্র। গবেষণার অভাব এবং তার চেয়েও বড় কথা—শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধার পরিবর্তে নগ্ন রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়াই এই পতনের মূল কারণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিণত করা হয়েছিল শাসকদলের পেশিশক্তি চর্চার আখড়ায়। দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির তাণ্ডবে ছাত্র সংসদগুলো অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তা ও স্বাভাবিক নেতৃত্ব বিকাশকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলে।

    এর পাশাপাশি আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বুনিয়াদও চরম হোঁচট খেয়েছে। বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন, অপরিকল্পিত পরীক্ষা পদ্ধতি চালু এবং পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক তৈরির ঘাটতির কারণে শিক্ষার মৌলিক মানই ধ্বংস হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে শেখার চেয়ে কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়েছে, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে এক ধরনের চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করেছে। গ্রামের সাধারণ প্রান্তিক পরিবারের সন্তানটি আজ শহরের ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শুরুতেই পিছিয়ে পড়ছে।

    এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তরুণ প্রজন্মের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো—মেধাকেন্দ্রিক এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র পরিচালনা। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই তরুণরা কোনো খণ্ডিত সমাধান চায় না; তারা চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং যোগ্যতার সঠিক মর্যাদা। পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ রাষ্ট্রের সর্বস্তরে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং দলীয় পরিচয়ভিত্তিক স্বজনপ্রীতি চিরতরে বন্ধ করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।

    দ্বিতীয়ত, তরুণ সমাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেজুড়বৃত্তিক দলীয় রাজনীতির অবসান চায়। তবে এর অর্থ রাজনীতিবিমুখতা নয়; বরং তারা চায় সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত বিরতিতে ছাত্র সংসদ (যেমন—ডাকসু, জাকসু, রাকসু ইত্যাদি) নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাডারভিত্তিক গণরুম, গেস্টরুমের নামে দখলদারিত্বের বদলে ছাত্র সংসদই হবে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়, মুক্তচিন্তার চর্চা এবং ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির একমাত্র স্বীকৃত প্ল্যাটফর্ম।

    একইভাবে ব্রেন ড্রেন বা মেধা পাচার রোধ করাও আজকের দিনে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর হাজার হাজার মেধাবী তরুণ উচ্চশিক্ষা ও উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছাড়ছে এবং তারা আর ফিরছে না। এর একমাত্র কারণÑদেশে তাদের মেধার মূল্যায়ন নেই, নেই গবেষণার পর্যাপ্ত পরিবেশ। এই মেধাবীদের দেশে ধরে রাখতে না পারলে ২০৪১ সালের উন্নত বা স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন শুধু কাগজ-কলমেই থেকে যাবে।

    শিক্ষাব্যবস্থার টেকসই পুনর্গঠনে এখন কয়েকটি জরুরি নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্যÑ

    * পাঠ্যক্রম সংস্কার ও কারিগরি শিক্ষা : সাধারণ তত্ত্বনির্ভর শিক্ষার বাইরে মাধ্যমিক স্তর থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি, কোডিং, প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা-দক্ষতা ও প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে প্রতি তিন বছর পরপর সিলেবাস হালনাগাদ করা আবশ্যক।

    * স্বাধীন জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন : শিক্ষক নিয়োগে দলীয় প্রভাব ও আর্থিক দুর্নীতি বন্ধে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ বা ‘শিক্ষক নিয়োগ কমিশন’ গঠন করা যেতে পারে, যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শুধু মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেবে।

    * গবেষণায় বাজেট ও ইনকিউবেশন : শিক্ষায় জিডিপির অন্তত ৩-৪ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল গঠনের পাশাপাশি তরুণদের উদ্যোক্তা বানাতে স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টার এবং জামানতহীন সহজ শর্তে ঋণের আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে।

    * প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বৈষম্য দূরীকরণ : কোচিংনির্ভরতা কমাতে শ্রেণিকক্ষেই পড়াশোনা নিশ্চিত করতে হবে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি স্কুলগুলোতে যোগ্য ও উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ত্বরান্বিত করতে হবে।শিক্ষা কোনো অনুদান নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। একটি মেরুদণ্ডহীন ও দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে কোনো শক্তিশালী বাংলাদেশ গঠন সম্ভব নয়। ২০২৪-এর তরুণ প্রজন্ম তাদের দায়িত্ব পালন করেছে—তারা পরিবর্তনের নতুন পথ খুলে দিয়েছে। এখন রাষ্ট্র ও নীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের দায়িত্ব হলো তরুণদের এই আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা। যে শিক্ষা তরুণকে দাসত্ব নয়, বরং স্বাধীন চিন্তা, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমের প্রেরণা জোগায়Ñসেই শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াপত্তনই হোক নতুন বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার।

  • পাঠ্যপুস্তক: রাজনৈতিক দলিল নয়, জাতি গঠনের নকশা

    পাঠ্যপুস্তক: রাজনৈতিক দলিল নয়, জাতি গঠনের নকশা

    উপসম্পাদকীয়

    একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার অনেকখানি নির্ধারিত হয় সেই জাতির শ্রেণিকক্ষের ভেতরে। আর শ্রেণিকক্ষের সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষক হলো পাঠ্যপুস্তক। পাঠ্যপুস্তক যদি শিশুকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, তাহলে একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি গড়ে ওঠে। আর যদি সেখানে বৈষম্য, সংকীর্ণতা কিংবা অযৌক্তিক সামাজিক ধারণার প্রতিফলন ঘটে, তবে সেই ক্ষতি বহু বছর ধরে সমাজকে বহন করতে হয়।

    একটি শিশুর কাছে পাঠ্যপুস্তকে যা লেখা থাকে, সেটিই অনেক সময় চূড়ান্ত সত্য। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাবোধের ভিত্তি তৈরি হয় শৈশবেই। বিশ্বব্যাপী গবেষণাগুলো দেখিয়েছে, বিদ্যালয়ের পাঠ্যবস্তু, শিক্ষক এবং পরিবার—এই তিনটি উৎসই শিশুদের আত্মবিশ্বাস গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে পাঠ্যপুস্তক শুধু তথ্য নয়; এটি একটি মানসিক ও সামাজিক নির্মাণের উপকরণ।

    আজও আমাদের সমাজে রান্না, গৃহপরিচর্যা কিংবা পারিবারিক দায়িত্বকে অনেকেই নারীর একক কাজ হিসেবে ভাবেন। অথচ উন্নত বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থায় এগুলোকে লাইফ স্কিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন ছেলে যেমন রান্না শিখবে, তেমনি একজন মেয়েও আর্থিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি বা নেতৃত্ব শিখবে। শিক্ষা যদি সমাজকে পরিবর্তন না করে, তবে সেই শিক্ষা শুধু পরীক্ষার খাতা পূরণের জন্যই রয়ে যায়।

    আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট পাঠ্যবই নয়, প্রণয়ন পদ্ধতিতে। আমাদের দেশে পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের আলোচনা প্রায়ই শুরু হয় বই ছাপার পর। অথচ প্রশ্ন হওয়া উচিত—বই লেখার আগেই কি পর্যাপ্ত গবেষণা হয়েছিল? বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জাতীয় পর্যায়ে কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতামতের মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ থাকে। মাঠপর্যায়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা গবেষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক সময় নীতিনির্ধারণ পর্যন্ত পৌঁছায় না। ফলে যে কারিকুলাম সচিবালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নিখুঁত বলে মনে হয়, সেটি প্রত্যন্ত গ্রামের একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে গিয়ে বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক কোনো অফিসকক্ষে বসে তৈরি হয় না; এটি তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষণার সম্মিলিত অভিজ্ঞতা থেকে।

    তাহলে কীভাবে হওয়া উচিত কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন? বাংলাদেশে পাঠ্যক্রম তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। প্রথমেই যে শ্রেণির জন্য বই তৈরি হবে, সেই শ্রেণিতে পাঠদান করেন—এমন শহর ও গ্রামের অন্তত দুটি করে মডেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মতামত সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে ওই বয়সের শিশুর মানসিক বিকাশ, ভাষাগত সক্ষমতা ও শেখার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেছেন—এমন শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, ভাষাবিজ্ঞানী, বিষয়বিশেষজ্ঞ এবং কারিকুলাম গবেষকদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

    এরপর খসড়া পাঠ্যক্রম তৈরি করে সেটি বিভিন্ন গণমাধ্যম, শিক্ষা-সংক্রান্ত ওয়েবসাইট এবং উন্মুক্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করতে হবে, যাতে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং সাধারণ নাগরিক যুক্তিসংগত মতামত দেওয়ার সুযোগ পান।

    প্রথমে অন্তত এক বছরের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে নতুন কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক পাঠ্য করা উচিত। এ উদ্দেশ্যে জাতীয় অনলাইন কারিকুলাম ফিডব্যাক প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেতে পারে, যেখানে নিবন্ধিত শিক্ষকরা নির্ধারিত ফরম্যাটে মতামত, সমস্যা ও সমাধানের প্রস্তাব জমা দেবেন। সেই মতামত বিশ্লেষণ করবেন গবেষক ও কারিকুলাম বিশেষজ্ঞরা। এরপর প্রয়োজনীয় সংশোধন করে চূড়ান্ত পাঠ্যক্রম অনুমোদন দেওয়া হবে।

    বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাগুলো দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—কারিকুলাম কখনো একদিনে তৈরি হয় না।

    ফিনল্যান্ডে জাতীয় মূল কাঠামো তৈরির পর স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যালয়গুলো নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ্যক্রম অভিযোজিত করে। শিক্ষকরা শুধু বাস্তবায়নকারী নন; তারা কারিকুলাম উন্নয়নেরও অংশীদার।

    সিঙ্গাপুরে নতুন পাঠ্যক্রম চালুর আগে বহু বছর ধরে গবেষণা, পাইলটিং, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক এবং বিদ্যালয় একসঙ্গে কাজ করে।

    অস্ট্রেলিয়ান কারিকুলাম প্রণয়নের সময় খসড়া জনমতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। হাজার হাজার শিক্ষক, গবেষক, অভিভাবক ও নাগরিকের মতামত বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সংস্করণ প্রকাশ করা হয়।

    যুক্তরাজ্যেও জাতীয় কারিকুলাম সংশোধনের সময় ব্যাপক পরামর্শ, গবেষণা ও জনমত গ্রহণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

    এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—শিক্ষাব্যবস্থার স্থায়িত্ব আসে অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে, ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ থেকে নয়।একটি দেশের সরকার বদলাতে পারে। রাজনৈতিক দর্শনও পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু পাঠ্যপুস্তক এমন হওয়া উচিত নয়, যা প্রতি কয়েক বছর পরপর নতুন আদর্শের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীর প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান এবং নিরপেক্ষ ইতিহাস। কারণ শিক্ষা কোনো মন্ত্রণালয়ের একক সম্পদ নয়; শিক্ষা একটি জাতির সম্মিলিত বিবেক। আর সেই বিবেকের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হওয়া উচিত আমাদের পাঠ্যপুস্তক।

  • বিরোধী দল সংসদীয় গণতন্ত্রের অলংকার

    বিরোধী দল সংসদীয় গণতন্ত্রের অলংকার

    উপসম্পাদকীয়:

    গণতন্ত্র একটি প্রাচীন ধারণা হলেও সংসদীয় গণতন্ত্র তুলনামূলকভাবে এক নবীন পরিশীলিত ব্যবস্থা। গ্রিক নগররাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া ‘ডেমোক্রেসি’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ জনগণের শাসন। আব্রাহাম লিংকন একে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন অমর বাক্যে—‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন’ (Government of the people, by the people, for the people)। এই বিমূর্ত ধারণাকে বাস্তবের কাঠামোয় রূপ দিতে গিয়ে মানবসভ্যতা যে প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ করেছে, তার নাম সংসদ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ওয়াল্টার ব্যাজহট তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The English Constitution’-এ পার্লামেন্টকে বলেছেন রাষ্ট্রের ‘মর্যাদাপূর্ণ’ ও ‘কার্যকর’ অংশের সংযোগসেতু। সংসদই সেই মঞ্চ, যেখানে জনগণের প্রতিনিধিরা যুক্তি ও পাল্টা-যুক্তির মধ্য দিয়ে জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করেন। ‘Parliament’ শব্দটির উৎপত্তি ফরাসি ‘parler’ থেকে, যার অর্থ কথা বলা। অর্থাৎ সংসদ মূলত কথা বলার জায়গা—কিন্তু সে কথা হবে যুক্তির, বিতর্কের, সহনশীলতার; কলহ ও হট্টগোলের নয়।

    সংসদীয় গণতন্ত্রের দুটি প্রধান মডেল পৃথিবী সমাদৃত—একটি ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতি, অন্যটি মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা। ব্রিটেন সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার। তারা কোনো লিখিত সংবিধান রচনা করেনি, বরং শত শত বছরের রীতি, প্রথা ও দৃষ্টান্তকে সংবিধানের মর্যাদা দিয়েছে। সেখানে রাজা রাজত্ব করেন কিন্তু শাসন করেন না। প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী, যিনি সংসদের কাছে দায়বদ্ধ। ব্রিটিশ সংসদের সবচেয়ে উজ্জ্বল অলংকার হলো তার বিরোধী দল। তারা বিরোধী দলকে বলে ‘রাজকীয় অনুগত বিরোধী দল’ (His Majesty’s Loyal Opposition)। এই অভিধাটি তাৎপর্যপূর্ণ; বিরোধিতা মানে রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থেকেই সরকারের নীতির গঠনমূলক সমালোচনা। সেখানে রয়েছে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা শ্যাডো কেবিনেট, যেখানে বিরোধী দলের প্রতিটি সদস্য সরকারের এক-একজন মন্ত্রীর প্রতিপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিকল্প নীতির খসড়া প্রস্তুত রাখেন। প্রধানমন্ত্রীকে প্রতি সপ্তাহে ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে’ বিরোধী দলের তীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণের মুখোমুখি হতে হয়। এই জবাবদিহিতাই ব্রিটিশ গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা।

    অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভিন্ন পথ বেছে নেন। মন্তেস্কুর ‘ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ’ তত্ত্বকে তারা সংবিধানের মেরুদণ্ড করেন। আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ—তিনটি অঙ্গকে পৃথক রেখে তারা ‘পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের’ এক অভিনব ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। কংগ্রেসের দুই কক্ষ—সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদÑপ্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে সংযত রাখে। প্রেসিডেন্ট যত ক্ষমতাধরই হোন, বাজেট পাস থেকে যুদ্ধ ঘোষণা পর্যন্ত তাকে কংগ্রেসের সম্মতি নিতে হয়। মার্কিন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এই যে, সেখানে প্রেসিডেন্টের নিজ দলই মাঝেমধ্যে তার নীতির বিরোধিতা করে; দলীয় আনুগত্যের চেয়ে বিবেক ও নির্বাচনি এলাকার স্বার্থ সেখানে অগ্রগণ্য। এ দুই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত শিক্ষা এক ও অভিন্ন—ক্ষমতা যেখানে নিরঙ্কুশ, সেখানে স্বৈরাচার অনিবার্য। লর্ড অ্যাক্টনের সেই অমোঘ উক্তি স্মরণীয়—‘ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কলুষিত করে নিরঙ্কুশভাবে’ ।

    আমরা যেহেতু ২০০ বছর ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিলাম, উত্তরাধিকার সূত্রে সংসদীয় শাসনব্যবস্থাই আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাদেশ ওয়েস্টমিনস্টার আদলে সংসদীয় গণতন্ত্র গ্রহণ করে। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, প্রতিষ্ঠানটি আমরা আমদানি করলেও তার আত্মা আমরা আত্মস্থ করতে পারিনি। সংসদীয় গণতন্ত্রের খোলস আমাদের ছিল, কিন্তু মজ্জা ছিল অনুপস্থিত। বিশেষত বিগত দেড় দশকের আওয়ামী শাসনামলে জাতীয় সংসদ পরিণত হয়েছিল এক নিষ্প্রাণ, নিরর্থক প্রদর্শনীর মঞ্চে। সংবিধানের প্রথম পঙ্‌ক্তিতে লেখা ছিল ‘জনগণই সকল ক্ষমতার মালিক’, অথচ বাস্তবে ক্ষমতাই হয়ে উঠেছিল সব রাজনীতির উৎস। ব্যাজহট যাকে বলেছিলেন সরকারের কার্যকর অংশ, সেই সংসদকে পরিণত করা হয়েছিল আলংকারিক শোভায়।

    আওয়ামী আমলের সংসদীয় ইতিহাস প্রকৃত অর্থে নামমাত্র গণতন্ত্রের ইতিহাস। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তামাশার নির্বাচনগুলোর মধ্য দিয়ে গঠিত সংসদে বিরোধী দল বলে কিছু ছিল না। ২০১৪ সালে দেড় শতাধিক আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি; ভোটের আগেই ফল নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। জাতীয় পার্টিকে একই সঙ্গে সরকারে ও বিরোধী আসনে বসিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এক নজিরবিহীন কৌতুক। জনগণ তাকে যথার্থই নাম দিয়েছিল ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’। যে বিরোধী দল সরকারের অনুগ্রহে টিকে থাকে, যে বিরোধিতা সরকারের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হয়, তা বিরোধিতা নয়—তা প্রহসন। সেই সংসদ হয়ে উঠেছিল একজন ব্যক্তির প্রশস্তি-গাথার আসর, ‘জি হুজুর’ আর করতালির সমবেত মহড়া। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘রাবার-স্ট্যাম্প সংসদ’, যার একমাত্র কাজ নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তে বিনা প্রশ্নে সিলমোহর বসানো। আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ—তিনটি অঙ্গ যখন একটি কর্তৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন যাকে বলা হয় স্বৈরতন্ত্র, তারই প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল ‘গণতন্ত্রের’ মোড়কে। এ ছিল কাঠামোগত প্রতারণা—সংসদীয় গণতন্ত্রের মোড়কে এক আইনি ও বেআইনি বাকশাল। জনগণ সে সংসদের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ হারিয়েছিল, কারণ যে প্রতিষ্ঠান জনগণের কণ্ঠস্বর বহন করে না, তার প্রতি জনগণের আস্থা থাকবে কেন?

    এই দীর্ঘ অন্ধকারের পর চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাতিকে এক নতুন প্রভাত উপহার দিয়েছে। ফ্যাসিবাদের পতনের পর যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে, তাতে প্রকৃত অর্থে একটি সক্রিয়, সোচ্চার বিরোধী দল রয়েছে। সাম্প্রতিক সংসদ অধিবেশনে আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে উত্তেজনা, বিরোধী দলের হট্টগোল, ওয়াকআউট, স্পিকারের উদ্বেগ—তা যতই অপ্রীতিকর মনে হোক, এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর ইতিবাচক ইঙ্গিত। যেখানে প্রশ্ন আছে, প্রতিবাদ আছে, বিরোধিতা আছেÑসেখানেই গণতন্ত্রের প্রাণস্পন্দন। গত দেড় দশকে যে সংসদে টুঁ শব্দটি করার সাহস কারো ছিল না, সেই সংসদে আজ তরুণ সদস্যরা পরিসংখ্যান হাতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারকে কোণঠাসা করছেন। এটাই স্বাভাবিক গণতন্ত্রের চিত্র। ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সেও তীব্র বাদানুবাদ হয়, টেবিল চাপড়ানো হয়, অর্ডার! অর্ডার! ধ্বনিতে স্পিকারকে শৃঙ্খলা ফেরাতে হয়। বিতর্ক গণতন্ত্রের দুর্বলতা নয়, শক্তি।

    তবে বিতর্ক আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ফারাক রয়েছে। যুক্তির স্থান যখন কণ্ঠের উচ্চগ্রাম দখল করে, পরস্পরকে বলার সুযোগ না দেওয়ার প্রবণতা যখন প্রবল হয়, তখন সংসদ প্রাণবন্ত না হয়ে হয়ে ওঠে অকার্যকর। এখানেই সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয়ের সংযম কাম্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একজন প্রবীণ ও বিচক্ষণ পার্লামেন্টারিয়ান; তরুণ সদস্যদের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের বদলে পিতৃসুলভ সহনশীলতাই তার কাছে প্রত্যাশিত। তিনি যে বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, তাতে তার বিজ্ঞতাই প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলকেও মনে রাখতে হবে, ওয়াকআউট ও প্রতিবাদ গণতন্ত্রের অস্ত্র বটে, কিন্তু তা সংযমের সঙ্গে প্রয়োগ করাই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচায়ক। স্পিকার দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন।

    দেশ এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, আইনশৃঙ্খলার অস্থিরতা—এসবের মধ্যেও জনগণ ধৈর্য ধরে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের অপেক্ষায় আছে। এই মুহূর্তে জাতির সামনে যে সুযোগ এসেছে, তা ঐতিহাসিক। বিগত অর্ধশতাব্দীতে বাংলাদেশ যে প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাদ পায়নি, আজ তা প্রতিষ্ঠার এক বিরল সন্ধিক্ষণ উপস্থিত। এই সুযোগকে যদি আমরা কলহ ও অসহিষ্ণুতায় নষ্ট করি, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। সংসদীয় গণতন্ত্র কোনো একদিনের অর্জন নয়; ব্রিটেন সাতশ বছরে যা গড়েছে, তা ধৈর্য, সহনশীলতা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধার ফসল। আমাদের সংসদ যেন যুক্তি-তর্কের প্রাণবন্ত কেন্দ্র হয়, প্রশ্ন ও জবাবদিহিতার নির্ভীক মঞ্চ হয়, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। সরকারি দল ও বিরোধী দল যদি পরস্পরকে শত্রু নয়, বরং একই গণতান্ত্রিক যাত্রার সহযাত্রী মনে করে, তবেই এই সংসদ হয়ে উঠবে প্রকৃত অর্থে জনগণের সংসদ। সেটিই হবে জুলাই শহীদদের রক্তের প্রতি যথার্থ সম্মান।

  • মক্কা প্যাক্টে যোগদান বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব বিষয়:ডা. শফিকুর রহমান

    মক্কা প্যাক্টে যোগদান বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব বিষয়:ডা. শফিকুর রহমান

    জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘মক্কা প্যাক্টে যোগদান বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব বিষয়। দেশ ও জাতির প্রয়োজন এবং স্বার্থে বাংলাদেশ কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তাতে অন্য কারও শ্বাসকষ্টে ভোগার প্রয়োজন নেই।’

    বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ফেসবুক পেইজে দেয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।

    সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিতে পারে—এমন আলোচনা চলছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে পক্ষে-বিপক্ষে নাো মত প্রকাশ করা হচ্ছে।

    গত ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটি দেশ সামরিক হামলার শিকার হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

  • অকৃতকার্যই শেষ কথা নয়, শিখতে হবে ব্যর্থতাকে জয় করা

    অকৃতকার্যই শেষ কথা নয়, শিখতে হবে ব্যর্থতাকে জয় করা

    শিক্ষা ডেস্ক:

    প্রবাদ আছে ‘অকৃতকার্য কৃতকার্যের চাবিকাঠি’। তারপরও অনেক কোমলমতি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়া মেনে নিতে পারে না। পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনটি যেকোনো শিক্ষার্থীর জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করার কথা। অথচ সে দিনটিতেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের হালিমা খাতুন তরিকা, রাজশাহীর কারিনা পাল আর কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার তানিয়া খাতুনের পরিবারসহ বেশকিছু পরিবারে নিয়ে এলো চিরঅন্ধকারের বার্তা। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর যেখানে দেশের লাখো ঘরে উদযাপনের আলো জ্বলছিল, সেখানে নিমিষে নিভে গেল তিনটি তাজা প্রাণ। এছাড়া দেশের আরো কয়েক জায়গায় পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে ঝরে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।

    রাজশাহীর বাগমারায় বিজ্ঞান বিভাগে দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে চরম বিষাদে আত্মহননের পথ বেছে নেন কারিনা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে অন্যান্য বিষয়ে সফল হলেও কেবল ইংরেজিতে অকৃতকার্য হওয়ার তীব্র কষ্ট সহ্য করতে না পেরে বিষপান করে হালিমা। আর কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় একই হতাশায় তানিয়া খাতুন বেছে নেয় আত্মহননের পথ। এ তিনটি অকাল প্রস্থান সমস্বরে আমাদের এক নির্মম সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় যে, একটি পরীক্ষার ফল কি জীবনের চেয়েও বড়? কখনই তা হতে পারে না। বরং জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্যই পড়ালেখা বা এত আয়োজন। তাই একবার অকৃতকার্য হওয়া মানে হেরে যাওয়া কিংবা শেষ কথা নয়; বরং কঠিন অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বারবার চেষ্টা করতে হবে। একবার না পারলে হতাশ হওয়া যাবে না, দৃঢ় মনোবল নিয়ে পড়ালেখায় মনোনিবেশ করতে হবে।

    তানিয়া কুচিয়ামোড়া গ্রামের প্রবাসী আক্তারুল ও কবিতা খাতুন দম্পতির কন্যা। সে বাহাদুরপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের এসএসসি শিক্ষার্থী ছিল। পরীক্ষায় গত বছরও অকৃতকার্য হয়েছিল সে।

    স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার চলতি সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলে সে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়। পরে রাত ১০টার দিকে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে তানিয়া।

    আমাদের সামাজিক ও শিক্ষাব্যবস্থায় এসএসসি পরীক্ষাকে শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন হিসেবেই দেখা হয় না; কোনো কোনো সময় এটিকে বানিয়ে ফেলা হয় সন্তানের যোগ্যতা, মর্যাদা ও সামাজিক সম্মানের চূড়ান্ত মাপকাঠিও। ফল প্রকাশের দিন সকাল থেকেই চারপাশে শুরু হয় ‘জিপিএ-৫ পেয়েছ তো?’, ‘অমুকের সন্তান তো এত পেয়েছে, তোমার কম কেন?’ এ জাতীয় এক প্রতিযোগিতার মহোৎসব। কৈশোরের কোমল ও সংবেদনশীল মন এই তুলনামূলক আলোচনা ও সামাজিক লজ্জাকে সহ্য করতে পারে না। তাদের কাছে সাময়িক একাডেমিক পিছিয়ে পড়াকে জীবনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা বলে মনে হতে শুরু করে। ফলে পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার অদৃশ্য চাপে পিষ্ট হয়ে অনেক সময় তারা হারিয়ে ফেলে বেঁচে থাকার মৌলিক ইচ্ছাটুকু। অথচ ভালো রেজাল্টের চেয়ে ভালো মানসিকতা ও মানবিক মানুষ হওয়া জরুরি।

    একটি পাবলিক পরীক্ষায় খারাপ করা বা অকৃতকার্য হওয়া মানেই শেষ গন্তব্য নয়। শিক্ষাব্যবস্থায় মানোন্নয়ন পরীক্ষা, পুনঃনিরীক্ষণ বা পুনরায় অংশ নেওয়ার মতো একাধিক বৈধ পথ খোলা থাকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার নির্দিষ্ট কোনো ধাপে থমকে যাওয়া বহু মানুষ পরবর্তী সময়ে মেধা ও পরিচর্যায় সমাজের শীর্ষে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু সেই ভুল শুধরে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য জীবনটা টিকিয়ে রাখা তো প্রথম ও প্রধান শর্ত।

    পরীক্ষায় অকৃতকার্য বা ফল খারাপ হওয়া কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি সন্তানের জন্য সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্ত। এমন সময়ে বকাঝকা, শাসন বা প্রতিবেশীর সন্তানের সঙ্গে তুলনা না করে পরিবারকে হতে হবে প্রধান আশ্রয়স্থল। ‘কত পেয়েছ’Ñএই কঠিন প্রশ্নের আগে অভিভাবকের মুখ থেকে আসা উচিত সহজ একটি বাক্যÑ‘আমরা তোমার পাশেই আছি। যা হয়েছে, তা নিয়ে হতাশ না হয়ে আগামীতে ভালো করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত কর।’

    সন্তান যখন চরম হতাশা প্রকাশ করে বা নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়, সেটিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। তাকে এক মুহূর্তের জন্যও একাকী না রেখে মানসিকভাবে বিশ্বস্ততা তৈরি করতে হবে এবং প্রয়োজনে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে। ফলাফলের দিন কেবল কৃতকার্যদের নিয়ে উদযাপনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে যারা কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি, তাদের কাউন্সেলিং ও পরবর্তী সহজ পথের দিশা দেওয়া জরুরি।

    কারিনা, হালিমা ও তানিয়ার মৃত্যু কেবল তিনটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের গল্পই নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য এক তীব্র অনুশোচনা ও সতর্কবার্তা। আমাদের সন্তানদের শুধু জয়ী হতে শেখালে চলবে না, ব্যর্থতার পর ধুলো ঝেড়ে কীভাবে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়, সেই শিক্ষা দিতে হবে। কারণ পরীক্ষার ফল আবার সংশোধন করা যায়, একটি বছর পিছিয়ে গেলে তা পুনরুদ্ধারও করা সম্ভব; কিন্তু ঝরে যাওয়া একটি অমূল্য জীবন কোনোদিন আর ফিরিয়ে আনা যায় না।

  • জুলাই ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

    জুলাই ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

    জাতীয়তাবাদ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক ধারণা। রাষ্ট্রের জন্ম, তার বৈধতা, জনগণের রাজনৈতিক আনুগত্য এবং জাতীয় পরিচয়—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জাতীয়তাবাদ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতিকে ব্যাখ্যা করেছেন একটি ‘কল্পিত রাজনৈতিক সম্প্রদায়’ হিসেবে, যেখানে সদস্যরা একে অপরকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও অভিন্ন পরিচয়ের ভিত্তিতে একই সম্প্রদায়ের অংশ মনে করেন। আর্নেস্ট গেলনার একে যুক্ত করেছেন আধুনিক সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে, আর অ্যান্থনি ডি. স্মিথ গুরুত্ব দিয়েছেন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির ওপর। বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের বিকাশও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়, তবে আমাদের পথচলা ছিল আরো রক্তক্ষয়ী ও জটিল।২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি পুরোনো প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে—রাষ্ট্রের পরিচয় কী? আমরা কি কেবল ভাষাভিত্তিক একটি জাতি, নাকি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক/জাতি? পৃথিবীর ইতিহাস আমাদের শেখায়, কেবল মানচিত্রে জন্ম নিলেই একটি রাষ্ট্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিপক্ব জাতিতে পরিণত হয় না। এক দিনে মানচিত্র আঁকা যায়, কিন্তু জাতীয় পরিচয়, নাগরিক আস্থা ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য গড়ে ওঠে প্রজন্মের পর প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক-সামাজিক চুক্তির মধ্য দিয়ে।

    আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের প্রথম বিকাশ ঘটে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত মূল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনুঘটক, যা একটি জাতিকে উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—যুদ্ধবিধ্বস্ত এই রাষ্ট্রের পরিচয়ের ভিত্তি কী হবে? একটি সার্বভৌম ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব ধর্ম, গোষ্ঠী ও নৃগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক পরিচয় গড়ে তোলাই হয়ে দাঁড়ায় নবজাত রাষ্ট্রের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

    ১৯৭৫ সাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ, যা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে আজও ভিন্নমত রয়েছে—কেউ একে দেখেন রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে, কেউ গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। এরপর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রদর্শন হিসেবে সামনে আসে, যেখানে ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব, সংবিধান ও

    নাগরিকত্বকে পরিচয়ের কেন্দ্রে আনা হয়। এই সময় বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৃষি ও বহুমুখী কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, যদিও এই কালপর্ব নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে প্রায়ই পরস্পরবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু ইতিহাসের গভীর বিশ্লেষণ ভিন্ন চিত্র দেখায়—বাঙালি জাতীয়তাবাদ আমাদের দিয়েছে স্বাধীনতার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি; আর বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ দিয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার নাগরিক ও সার্বভৌম কাঠামো। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে এই দুই উত্তরাধিকারকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পরিপূরক হিসেবে দেখাই যুক্তিসংগত।

    ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের ওপর ছররা গুলি বর্ষণ কেবল একটি গণআন্দোলনকে একদফায় রূপ দেয়নি; বরং তরুণ প্রজন্মের এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক জাগরণ ঘটায়। দেশের গড় বয়স মাত্র ২৬ বছরের কিছু বেশি এবং প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ ৩৫ বছরের নিচে—এই বাস্তবতায় রাজপথের জাগরণ প্রমাণ করে, পুরোনো আদর্শিক বিভাজন দিয়ে এই ডিজিটাল প্রজন্মের নাগরিক চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কেবল সরকার পরিবর্তন নয়; রাষ্ট্র সম্পর্কে নাগরিকের প্রত্যাশার পরিবর্তন।কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সূচিত এই গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি, কারণ ও তাৎপর্য নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণ রয়েছে—কেউ একে দেখেছেন গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলন হিসেবে, কেউ রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি হিসেবে, আবার কেউ নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক জাগরণ হিসেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে, তরুণ প্রজন্ম কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, চায় জবাবদিহিতামূলক প্রতিষ্ঠান, ন্যায়বিচার ও সুযোগের সমতা।

    জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে প্রণীত হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় গণভোটে এই সনদ ও সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়ে। একদল বিশ্লেষকের মতে, এটি ত্রুটিপূর্ণ রাজনৈতিক-সাংবিধানিক কাঠামো সংশোধনের ঐতিহাসিক সুযোগ; আবার অন্যরা মনে করেন, তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক আবেগনির্ভর এই সংস্কার-প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য পর্যাপ্ত পরীক্ষিত কি না, তা নিয়ে আরো সতর্ক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এ বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে সারা দেশে পালিত জুলাই শহীদ দিবস প্রমাণ করে, ১৯৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন এবং ২০২৪-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন একই ধারাবাহিকতার অংশ হয়ে উঠেছে।

    জাতীয় পরিচয়ের পুনর্নির্মাণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৮৭১ সালে অটো ভন বিসমার্ক শুধু সামরিক শক্তিতে নয়, বিশ্বের প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করে জার্মান জাতির আনুগত্য সুদৃঢ় করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাত্রা শুরু করা সিঙ্গাপুরকে লি কুয়ান ইউ গড়ে তুলেছিলেন শূন্য-সহনশীল দুর্নীতি ও মেধাভিত্তিক শাসনের ওপর ভর করে। তুরস্কের মুস্তফা কামাল আতাতুর্কও অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর গড়ে তুলেছিলেন নাগরিক অধিকারভিত্তিক আধুনিক প্রজাতন্ত্র। বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার বিবর্তনও এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।

    জাতীয়তাবাদের বিতর্ক আজ কেবল রাজনৈতিক মঞ্চে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রতিফলন দেখা যায় অর্থনীতিতেও। বাংলাদেশ আজ প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের উদীয়মান অর্থনীতি। স্বাধীনতার সময় ৮০ শতাংশের ওপরে থাকা দারিদ্র্যের হার নাটকীয়ভাবে নেমে এসেছে পাঁচ শতাংশের ঘরে। তৈরি পোশাক খাতের বিপুল রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং কৃষির সাফল্য অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ। তবু মানবসম্পদ সূচকে নিম্ন স্কোর, দুর্নীতির ধারণা সূচকে পিছিয়ে থাকা এবং বিপুলসংখ্যক তরুণের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাইরে থাকা কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয়—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন এক বিষয় নয়।

    রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটনের ভাষায়, রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব কেবল রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ওপর নয়, বরং সেই অংশগ্রহণকে সুসংগঠিত রাখার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। আর ম্যাক্স ভেবারের ভাষায়, রাষ্ট্র তখনই দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীল হয়, যখন জনগণ তার প্রতিষ্ঠান, আইন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আস্থা রাখে। যদি রাষ্ট্র তার চাকমা, সাঁওতাল, বাঙালি, হিন্দু, মুসলিম কিংবা প্রবাসী—প্রতিটি নাগরিককে সমঅধিকার ও নিরাপত্তা দিতে না পারে, তবে জাতীয়তাবাদ কেবল একটি ফাঁকা রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়।বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার টানাটানির মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের নতুন রূপ হওয়া উচিত ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’—কোনো একক পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে ভারসাম্য বজায় রাখা। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য জাতীয় স্বার্থ রক্ষা হলেও তার অর্থ বিচ্ছিন্ন থাকা নয়; বরং ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করা।

    জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদকে একটি আধুনিক ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক দর্শনে রূপ দিতে হলে তা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে পাঁচটি স্তম্ভের ওপর—প্রথমত, ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্ব ও নাগরিক বহুত্ববাদ, ধর্ম, ভাষা বা জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাংবিধানিক সম-অধিকার নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ও গণতান্ত্রিক চেতনা—১৯৫২, ১৯৭১ ও ২০২৪-এর গণতান্ত্রিক চেতনাকে একত্রিত করে অভিন্ন রাষ্ট্রীয় গৌরবগাথা নির্মাণ। তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা—ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির বদলে প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্র গড়ে তোলা। চতুর্থত, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি ও মানবসম্পদ—প্রবৃদ্ধির সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। পঞ্চমত, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও পররাষ্ট্রনীতি—জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখে মর্যাদাশীল বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনা।

    সমালোচকেরা বলতে পারেন, জাতীয়তাবাদ নিয়ে নতুন বিতর্ক ঐক্যের বদলে বিভক্তি তৈরি করতে পারে। এটি যৌক্তিক শঙ্কা। তবে প্রকৃত প্রশ্ন জাতীয়তাবাদ থাকবে কি না, তা নয়; বরং এটি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নাগরিকবান্ধব হবে। বিভাজন তৈরি হয় যখন জাতীয়তাবাদকে দলীয়করণের হাতিয়ার করা হয়; কিন্তু যখন তা সুশাসন, আইনের শাসন ও সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দেয়, তখন তা ঐক্যের সেতু তৈরি করে।

    বাংলাদেশের সামনে এখন প্রয়োজন একটি নতুন সামাজিক চুক্তি, যার ভিত্তি হতে পারে তিনটি বিষয়—শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, যেখানে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চেয়ে আইন গুরুত্বপূর্ণ হবে; অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, যেখানে প্রতিটি নাগরিক উন্নয়নের সুযোগ পাবে; এবং জাতীয় ঐক্য, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সবাই অভিন্ন স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। জুলাই সনদ ও সাংবিধানিক সংস্কার-প্রক্রিয়াকে এই সামাজিক চুক্তি পুনর্গঠনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস হিসেবে দেখা যেতে পারে, যদিও এর প্রকৃত সফলতা প্রমাণিত হবে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে

    শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় তার জনগণের জীবনমান দিয়ে। একটি পতাকা, একটি ভূখণ্ড ও একটি রাজনৈতিক দর্শন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা সাধারণ মানুষের জীবনে আশা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে আসে। ইতিহাস প্রমাণ করে, এ দেশের মানুষ বারবার সংকট থেকে নতুন পথ বের করেছে। ১৯৫২ আমাদের ভাষা শিখিয়েছে, ১৯৭১ স্বাধীনতা দিয়েছে, আর ২০২৪ আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি বন্দুকের নল থেকে নয়, নাগরিকের বিশ্বাস থেকে আসে। আগামী বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা হবে সেই বিশ্বাস রক্ষার সক্ষমতার ওপর।

  • জুলাইয়ে অপেক্ষা করতাম, কখন জবির মিছিল আসবে: নাহিদ ইসলাম

    জুলাইয়ে অপেক্ষা করতাম, কখন জবির মিছিল আসবে: নাহিদ ইসলাম

    জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের ভূমিকা স্মরণ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, আমরা যখন জুলাই আন্দোলন করতাম, তখন অপেক্ষা করতাম কখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিছিল আসবে।

    সোমবার (২৮ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: স্ফুলিঙ্গ থেকে চলমান বিপ্লব’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

    জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় ছাত্রশক্তি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

    জুলাই আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকার প্রশংসা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ আছেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়া গর্বের। আমরা জুলাইয়ের সকল শহীদ এবং যাদের সামান্য আত্মত্যাগও রয়েছে, তাদের সবাইকে স্মরণ করছি।

    জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রায় সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। অথচ প্রতিষ্ঠানটি অনেক ক্ষেত্রেই তাদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনেও তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন দেশ গঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে অবদান রেখেছে, তেমনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানও ইতিহাসে সমানভাবে স্মরণীয়।

    তিনি বলেন, বাংলাদেশের সমস্ত আন্দোলনের সামনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের। সকলের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে সুনজর দিতে।

    জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও উন্নত ও আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনার সুযোগ পান। তাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

    আলোচনা সভায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

    সভায় জুলাইয়ের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র নিহত শহীদ ইকরামুল হক সাজিদের মা আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, আমি আমার সাজিদের গেঞ্জি নিয়ে এখনো ঘুমাই। আমি এখনো জিন্দা লাশের মতো বেঁচে আছি। আমি শহীদের মা হিসেবে এখানে এসেছি।

    জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জকসু) ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসেনা ও শহীদদের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে সাহস জুগিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি সমাজ প্রত্যাশা করি, যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না।

    জবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. ইমরানুল হক বলেন, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ কখনো ভুলে যাওয়া যাবে না। জুলাই যেন বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া এবং বৈষম্য দূর করার প্রেরণা হয়ে থাকে। তিনি বলেন, সাজিদের মতো মৃত্যু কারও ভাগ্যে যেন না জোটে। জগন্নাথ থেকে আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমরা কখনো দ্বিতীয় হব না, আমরা প্রথম হব।

    জবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. নাসির উদ্দিন বলেন, জগন্নাথবাসী নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগকে ফিরতে দেবে না। তিনি শিক্ষাঙ্গনে সহিংস রাজনীতির পুনরাবৃত্তি না হওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

    জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ যোদ্ধা মাহাদী আমিনের বাবা আল-আমিন আন্দোলনের সময়কার স্মৃতিচারণ করে বলেন, যাত্রাবাড়ীতে তার একটি ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল। আন্দোলনের সময় তিনি আন্দোলনকারীদের পানি দিয়ে সহযোগিতা করতেন। পরে তার ছেলে মাহাদীর মাথায় গুলি লাগার পর পরিবারের জীবন আমূল বদলে যায়।

    জাতীয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, স্বৈরাচারের পতন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং বেকারত্ব দূর করা ছিল আন্দোলনের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা। তিনি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও সমালোচনা করেন।

    জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান বলেন, জুলাইয়ের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বৈষম্য দূর করা। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও বক্তব্য দেন।

    অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল-আমিন। তিনি বলেন, অতীতে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে কেউ অন্যায় বা জুলুম করতে চাইলে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

    জবি ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক ফয়সাল মুরাদ বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথম দিক থেকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তবে বিভিন্ন কারণে সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়টির অবদান পর্যাপ্ত গণমাধ্যম কাভারেজ পায়নি বলেও তিনি দাবি করেন।

    আলোচনা সভাই বক্তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠন, শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক নিপীড়ন বন্ধ এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

  • শিক্ষার মানোন্নয়ন কেন জরুরি

    শিক্ষার মানোন্নয়ন কেন জরুরি

    বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা উদ্বেগজনক সংকটের আবর্তে নিপতিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষত বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনসমূহ আমাদের চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিতেছে এক রূঢ় ও অপ্রিয় সত্য। তাহাদের মতে, বাংলাদেশে শিক্ষার হার কাগজে কলমে বৃদ্ধি পাইলেও গুণমানের দিক হইতে পশ্চাৎপদ। ইহা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, একজন উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর লব্ধ জ্ঞান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মাত্র সপ্তম শ্রেণির সমতুল্য বলিয়া বিবেচিত হইতেছে। এই যে বিশাল ‘শিক্ষণ ঘাটতি’, ইহাতে জাতির মেরুদণ্ড ভাঙিয়া পড়িবার উপক্রম বলিলে কি অত্যুক্তি হইবে?

    শিক্ষার মানে এই অধোগতির মূলে রহিয়াছে বহুবিধ কারণ। প্রথমত, মানসম্মত শিক্ষার প্রধান অন্তরায় হইল দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকের অভাব। ইউনেস্কোর এক তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় মাধ্যমিক স্তরে দক্ষ শিক্ষকের হারে বাংলাদেশ অবস্থান করিতেছে সর্বনিম্নে। কারণ এই স্তরে ৫৫ শতাংশ শিক্ষক পূরণ করিতে পারিতেছেন না ন্যূনতম দক্ষতার মান। তাহা ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এই সংকটকে করিয়াছে আরও ঘনীভূত। দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আজ কেবল ‘সার্টিফিকেট’-সর্বস্ব হইয়া পড়িয়াছে। পরীক্ষার জন্য পড়া নাকি পড়ার জন্য পরীক্ষা-ইহাই হইয়া উঠিয়াছে বড় প্রশ্ন। একমুখী শিক্ষার অভাবে তৈরি হইয়াছে বিশৃঙ্খলা। বেসরকারিকরণের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অনুধাবন করিতে না পারিবার কারণে বৃদ্ধি পাইয়াছে ইহার বাণিজ্যিকীকরণ। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় তৈরি হইয়াছে অব্যবস্থাপনা। বেসিক শিক্ষা বলিতে গেলে আজ খুবই অবহেলিত। আগের মতো শিক্ষকদের শিখানোর প্রতি আগ্রহ ও আন্তরিকতা তেমন নাই। বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের উপর চাপ ক্রমবর্ধমান। কোচিং, প্রাইভেট টিউটর দিয়াও কুলানো যায় না; কিন্তু কেন, সেই প্রশ্ন কি কেহ করিতেছেন? শিক্ষাবাণিজ্যের কদর্য রূপ লক্ষণীয়। আদর্শ শিক্ষকের সংকট সর্বত্র। ইহা ছাড়া জীবনমুখী ও বাস্তবধর্মী শিক্ষা অনেকটাই অনুপস্থিত। শিক্ষার্থীরা ঘুরপাক খাইতেছে জিপিএ-৫ লাভের গোলকধাঁধায়। ফলে উচ্চশিক্ষিত বেকারগোষ্ঠী গড়িয়া উঠিলেও কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি হইতেছে না দক্ষ জনশক্তি।

    শিক্ষাব্যবস্থার এই কাঠামোগত ও দৃষ্টিভঙ্গিগত ব্যর্থতা হইতে উত্তরণ আজ সময়ের দাবি। প্রথমত, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করিয়া মেধা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হইবে। নিশ্চিত করিতে হইবে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। শিক্ষাব্যবস্থাকে একমুখী ও ৯০ শতাংশ সরকারি করা উচিত। মাত্র ১০ শতাংশ থাকিতে পারে বেসরকারি ও দাতব্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমরা মনে করি, শিক্ষকের মানোন্নয়নই শিক্ষার মানোন্নয়নের সর্বশ্রেষ্ঠ পথ। তাই তাহাদের মানসম্মত বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থাকে রাজনীতির সংকীর্ণ গণ্ডি হইতে মুক্ত করিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষানীতির অধীনে আনিতে হইবে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যেন শিক্ষানীতি বা পাঠ্যসূচির আমূল পরিবর্তন না ঘটে, তাহা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্যদক্ষতার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করিতে হইবে।

    চতুর্থত, শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে একটি সুদৃঢ় সংযোগ স্থাপন করিতে হইবে। তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানো এখন অনিবার্য হইয়া পড়িয়াছে। গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মান তদারকির মাধ্যমে বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে আমাদের অবস্থান সুসংহত করিতে হইবে।সত্যি বলিতে কি-বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়া আছে। কেবল পাশের হারের ‘সস্তা পরিসংখ্যান’ দিয়া জাতির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নহে। আমাদের এই কথা অনুধাবন করিতে হইবে যে, একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে গুণগত শিক্ষার কোনো বিকল্প নাই। মূলত আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা হইতে হইবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সংগত ও জীবনব্যাপী শেখার সুযোগ প্রদানকারী। কারিকুলামকে আউটকাম ও কমপিটেন্সি বেজড করিয়া শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা অর্জনে সহায়ক করিয়া তুলিতে হইবে।

  • দিবস আসে শ্রমিকদের ভাগ্য খোলে না

    দিবস আসে শ্রমিকদের ভাগ্য খোলে না

    ফিচার ডেস্ক:

    রমজানের ঈদের ঠিক ১০ দিন পর কুড়িগ্রামে যাই। সকালে অনেকের কথাবার্তায় ঘুম ভাঙে। উঠে দেখি পাশের ফ্ল্যাটে কাজ চলছে—নতুন ভবন তৈরি হবে। একই সঙ্গে কয়েকজন নারী ও পুরুষ কাজ করছেন। আমি এগিয়ে গিয়ে কাজ ও মজুরি সম্পর্কে জানতে চাই। দু-তিনজনকে জিজ্ঞেস করলেও তারা এড়িয়ে যান। একজন তো ইশারায় পাশের এক পুরুষকে দেখান। বুঝতে পারি, কথা বললে সমস্যা হতে পারে। আমিও সুযোগের অপেক্ষায় থাকি।

    অতঃপর মাথায় বোঝা নিয়েই একজন নারী চুপিচুপি বললেন, তাদের (নারীদের) দৈনিক মজুরি ৪০০ টাকা আর পুরুষদের ৫০০। তিনি আবার ইশারা করে বোঝালেন, কথা বললে তিনি বিষয়টি জানিয়ে দেবেন। ভাবলাম, পার্থক্যটা মাত্র ১০০ টাকা। অনেক জায়গায় নারীদের আরো কম মজুরি দেওয়া হয়। তাদের ধারণা, নারীরা কম কাজ করেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে নারীদের কাজের পরিমাণ পুরুষদের চেয়েও বেশি।খালেদা একজন সেবিকা (নার্স)। তিনি কয়েকটি হাসপাতালে ধারাবাহিকভাবে সেবিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করায় তার দুই সন্তান তার কাছেই থাকে। কিছুদিন সন্তানরা গ্রামে নানাবাড়িতে থাকলেও পড়াশোনার কথা চিন্তা করে তিনি তাদের শহরে নিয়ে আসেন।

    খালেদা বর্তমানে একজন সিনিয়র সেবিকা। তিনি একটি নতুন ও নামকরা হাসপাতালে কর্মরত। নতুন হাসপাতাল হওয়ায় সেখানে অনেক সেবিকা নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে নামকরা হাসপাতাল থেকে আসা সেবিকাদের বেতন তার বেতনের চেয়ে দ্বিগুণ। অথচ খালেদার অভিজ্ঞতাও আছে এবং তিনি সিনিয়র।

    অন্যদের বেতনের পরিমাণ শুনে তিনি অবাক হন। এ বিষয়ে অফিসে কথা বললে তাকে বেতন বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হয়। দুই মাস পর তার বেতন বাড়ানো হলেও, সেই নামকরা হাসপাতাল থেকে আসা সেবিকাদের বেতন আরো দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি করা হয়।

    পরে অফিসে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে খালেদা নিজের চাকরি হারান। খালেদার অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের কাছে অনেকের সিভি রয়েছে; তাকে যে বেতন দেওয়া হয়, সেই বেতনে তারা নতুন দুজন কর্মী নিয়োগ দিতে পারবে।

    নন-এমপিওভুক্ত একটি স্কুলে চার বছর ধরে চাকরি করেন দিলারা। এরই মধ্যে তার বিয়ে হয়। সন্তান জন্মের সময় ঘনিয়ে এলে তিনি দুশ্চিন্তায় পড়েন—ছুটিতে গেলে চাকরিটি থাকবে তো? পরে তিনি জানতে পারেন, স্কুল থেকে তিনি তিন মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন। তবে ছুটি শেষে কাজে যোগ দিতে পারলেও সেই সময়ের কোনো বেতন পাবেন না; আগের বেতনে চাকরি চালিয়ে যেতে হবে।

    সব দিক বিবেচনা করে তিনি ভাবলেন, খারাপের মধ্যেও কিছুটা ভালো আছে। সেই অনুযায়ী তিনি ছুটিতে যান এবং তিন মাস পর আবার কাজে যোগ দেন। ঘরে মা থাকায় সন্তানের দেখাশোনার দায়িত্ব মায়ের ওপর দিয়ে তিনি চাকরিতে ফিরতে সক্ষম হন।

    তবে দিলারার মতো সুযোগ তামান্না পাননি। তিন মাসের সন্তান রেখে কাজে ফেরার মতো পরিস্থিতি তার ছিল না। ফলে তিনি চাকরিতে ফিরতে পারেননি। পরে দুই বছর পর নতুন বেতনে (অর্থাৎ, শুরুতে যে বেতন দেওয়া হয়) তিনি একই স্কুলে আবার যোগ দেন।

    একজন নিয়োগদাতার অধীনে যারা শ্রম দেন, তারা শ্রম আইনের আওতাভুক্ত। অথচ আমাদের দেশে বেশির ভাগ নিয়োগদাতাই এই শ্রম আইনের অনেক কিছুই মানেন না। শ্রমিকদের একটি বড় অংশও তাদের শ্রম ও মজুরি-সংক্রান্ত অধিকার সম্পর্কে অবগত নন।

    বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘শ্রমিক নিয়োগ, মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক, সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ, মজুরি পরিশোধ, কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত কারণে শ্রমিকের আঘাতের জন্য ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শিল্পবিরোধ সৃষ্টি ও নিষ্পত্তি, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কল্যাণ, চাকরির পরিবেশ এবং শিক্ষানবিসসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়—সবই শ্রম আইনের অন্তর্ভুক্ত।’

    প্রতিবছর মে দিবস পালিত হয়। তিনশ পঁয়ষট্টি-ছেষট্টি দিনের মধ্যে মাত্র এক দিনই মে দিবস, কিন্তু যাদের দাবি আদায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলতে এই দিবস পালিত হয়, তারা প্রতিদিনই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। কারখানার মালিক, বিলাসবহুল কোম্পানির শিল্পপতি এবং রাজনৈতিক নেতারা মে দিবসে সমাবেশে দীর্ঘ ভাষণ দিয়ে শ্রমিকদের দাবি পূরণের কথা বলে হাততালি পান; কিন্তু সারা বছর শ্রমিকদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য দিতে গিয়ে তারা নানা অজুহাত তুলে ধরেন।

    আইন থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শ্রমিকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। ১৮০০ শতকে বিশ্বে একটি বড় পরিবর্তন ঘটে। সে সময়ের আগে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের দিয়ে নামমাত্র পারিশ্রমিকে দৈনিক ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা কাজ করাত। এতে শ্রমিকরা প্রতিবাদ করলে মালিকরা বিদ্রোহী শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার ও নিপীড়ন শুরু করে। এই শ্রমিক আন্দোলনে অনেক শ্রমিক প্রাণ হারান। তাদের মূল দাবি ছিল—একজন শ্রমিক দিনে সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা কাজ করবেন। মালিকরা এই দাবি উপেক্ষা করায় ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকায় শ্রমজীবী মানুষ ধর্মঘটের ডাক দেয়, যার প্রাণকেন্দ্র ছিল শিকাগো শহর।

    ১৮৮৪-৮৫ সালের দিকে মন্দাভাবের কারণে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেলে অসংখ্য শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন। শিকাগো শহরের আন্দোলনে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ শ্রমিক যোগ দেন। ৩ মে আন্দোলনটি আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। সে সময় পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়, এতে ছয়জন শ্রমিক নিহত হন।

    শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে ৪ মে বিশাল সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। ওইদিন শিকাগো শহরে আরো চার শ্রমিক নিহত হন এবং ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই বছরের ৯ অক্টোবর আরো ছয়জনকে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ফলে শ্রমিকদের আন্দোলন আরো তীব্র হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে মালিক পক্ষ নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়।

    ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত হয়, শিকাগোর আন্দোলনে প্রাণ দেওয়া শ্রমিকদের স্মরণে প্রতিবছর ১ মে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে। এরপর থেকেই দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে।

    শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন শ্রম আইন প্রণয়ন করা হলেও, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে; বাস্তবে শ্রমিকদের ভাগ্যের চাকা তেমনভাবে ঘোরে না।

  • ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা: মাঝখানে কেন ‘ইকবাল’?

    ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা: মাঝখানে কেন ‘ইকবাল’?

    ইরানের মূল সমস্যাটা ঠিক কোথায়? দেশটি এখন রীতিমতো ‘ফেরাউনি’ তর্জন-গর্জনের মুখে দাঁড়িয়ে। হুমকি দেওয়া হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা না করলে ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে। কিন্তু ইরানি নেতৃত্ব ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো হুমকিকেই তোয়াক্কা করছে না। ইরানিরা না মরণকে ভয় পায়, না হার মানাকে। ইরানের সাফ কথা—আগে হরমুজ প্রণালীর অবরোধ তুলে নাও, তারপর আলোচনা; আর তা না হলে আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।

    ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এ অনমনীয় অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তা আনতে পাকিস্তান অনেক চেষ্টা করেছে। লক্ষ্য ছিল দুই পক্ষকে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় মুখোমুখি বসানো। কিন্তু নৌ-অবরোধ বহাল রেখে মার্কিনিদের সঙ্গে বসতে অস্বীকার করেছে তেহরান। ফলে মার্কিন প্রতিনিধি দলের পাকিস্তান সফর পিছিয়ে গেছে। মার্কিনিরা অবাক—একটি সুপারপাওয়ারের সঙ্গে লড়তে ইরান কেন এতটা মরিয়া?

    গত রাতে এক মার্কিন সাংবাদিক এক ইরানি সাংবাদিককে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তোমাদের সমস্যাটা আসলে কী?’ ইরানি সাংবাদিক মুচকি হেসে জবাব দিলেন, ‘আমাদের সমস্যা হলো ইকবাল!’ এ উত্তর মার্কিন সাংবাদিকের মাথার ওপর দিয়ে গেল। তিনি অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘এই ইকবাল আবার কে?’ উত্তর এল, ‘ইকবাল পাকিস্তানের জাতীয় কবি।’ মার্কিন সাংবাদিকের বিস্ময় কাটে না, ‘ইকবাল কি তোমাদের মার্কিন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করেছেন? দুই সপ্তাহ আগে যখন ইসলামাবাদে আলোচনা হলো, তখন ইকবাল কোথায় ছিলেন?’

    ইরানি সাংবাদিক আর কথা না বাড়িয়ে ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কৌতূহলী মার্কিন সাংবাদিক খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, পাকিস্তানে তিনি ‘আল্লামা ইকবাল’ আর ইরানে ‘ইকবাল লাহোরি’ নামে বিখ্যাত। এরপর সেই সাংবাদিক আমার (কলামিস্টের) কাছে এসে হাজির। আমি তাকে গুগলে সার্চ করতে বললাম। তিনি ল্যাপটপ খুলে দেখালেন যে, অনেক খুঁজেও তিনি মেলাতে পারছেন না—যে মানুষ ১৯৩৮ সালে মারা গেছেন, তার কারণে ২০২৬ সালে এসে ইরানিরা আমেরিকার সঙ্গে লড়তে চাইছে কেন?

    আমি তাকে বললাম, মার্কিন প্রতিনিধি দল যখন আসবে তখন বুঝিয়ে দেব। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। তিনি এখন ইরান ও ইকবালের সম্পর্কের ওপর স্টোরি লিখতে চান। বাধ্য হয়ে তাকে পাঁচ মিনিট সময় দিলাম। তাকে জানালাম, কদিন আগেই লাহোরে ইকবালের মৃত্যুবার্ষিকীতে এক বিশাল সমাবেশ হয়েছে। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন লাহোরে নিযুক্ত ইরানের কনসাল জেনারেল মেহরান মোয়াহেদ ফার। তিনি তার বক্তৃতায় স্পষ্ট বলেছেন, ‘ইকবাল ইরানিদের যে সাহস ও প্রেরণা দিয়েছেন, তা দিয়েই আমরা আমেরিকাকে পরাজিত করেছি।’

    মার্কিন সাংবাদিক নোট নিচ্ছিলেন। আমি তাকে আরও বললাম, ‘আপনি হয়তো জানেন না, এমনকি ট্রাম্পও জানেন না, কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বহু বছর আগে আল্লামা ইকবালের ওপর একটি আস্ত বই লিখেছিলেন। ইরানের বিপ্লবে ইকবালের কবিতা জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল।’

    সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, ‘ইকবাল যদি পাকিস্তানি ও ইরানিদের যৌথ নায়ক হন, তবে পাকিস্তান কীভাবে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হবে?’ আমি হেসে বললাম, ‘ইকবাল সাধারণ পাকিস্তানিদের নায়ক, কিন্তু সেই শাসকগোষ্ঠীর নয় যারা মরণকে ভয় পায়।’

    আসলে ট্রাম্পকে কে বোঝাবে যে, ইকবাল ফারসিতে লিখেছিলেন:

    ‘আল্লাহ ছাড়া মুসলমান অন্য কারও দাস নয়,

    কোনো ফেরাউনের সামনে তার মাথা নত হয় না।’

    ট্রাম্পকে ‘ফেরাউনি’ ভঙ্গি ছাড়তে হবে, হুমকি বন্ধ করতে হবে। ইরানি হোক বা পাকিস্তানি—খাঁটি মুসলমানদের জন্য দাম্ভিক শাসকের আনুগত্য করা কঠিন। এমনকি ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ লিও-ও এখন ইরানের অবস্থানের সমর্থন দিতে শুরু করেছেন। হয়তো তিনিও ইকবালের দর্শনে প্রভাবিত!

    আসল কথা হলো, ইরানিরা ইকবালের চিন্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত। আর ইকবালের চিন্তা মানেই ফেরাউন ও ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ট্রাম্পের পক্ষে এটা বোঝা কঠিন যে— ‘প্রকৃতপক্ষে হোসেনের (রা.) শাহাদাতই হলো ইয়াজিদের মৃত্যু।’ ইয়াজিদ জিতেও আসলে চিরকাল হেরে যায়।

  • বিশ্বমঞ্চে ভারতকে ধরাশায়ী করছে পাকিস্তান

    বিশ্বমঞ্চে ভারতকে ধরাশায়ী করছে পাকিস্তান

    বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের খেলায় কেবল অর্থনৈতিক শক্তি বা সামরিক সক্ষমতাই শেষ কথা নয়; বরং কোন রাষ্ট্র নিজেকে কতটা “অপরিহার্য” করে তুলতে পারে, সেটিই নির্ধারণ করে তার প্রকৃত কৌশলগত অবস্থান। এই বাস্তবতায় পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করে আসছে—যেখানে সীমাবদ্ধতাকেই সম্পদে রূপান্তর করা হয়। বিপরীতে ভারত, বৃহৎ অর্থনীতি ও বৈশ্বিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও, অনেক ক্ষেত্রে সেই অপরিহার্যতা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক ঘটনাগুলো এই বৈপরীত্যকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

    ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরব-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এই ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বহু দশকের নীরব সামরিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই চুক্তি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় অবস্থানকেও নিশ্চিত করে। এই অঞ্চলে ভারতের বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থ—প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিটেন্স, জ্বালানি নির্ভরতা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক—থাকা সত্ত্বেও, নয়াদিল্লি কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি, স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি বা যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। ফলে অর্থনৈতিক প্রভাব থাকলেও নিরাপত্তা স্থাপত্যে ভারত প্রান্তিকই থেকে গেছে।

    এই কৌশলগত অবস্থানের সরাসরি প্রতিফলন দেখা যায় চলমান পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-এর মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন ভূমিকা সাধারণত সেই রাষ্ট্রগুলিই পায়, যাদের ছাড়া সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিকল্প কম থাকে। পাকিস্তান সেই অবস্থান তৈরি করেছে তার সামরিক যোগাযোগ, আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বহুমুখী সম্পর্কের মাধ্যমে—যেখানে একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখা হয়।

    ঐতিহাসিকভাবে এই ধারা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে হেনরি কিসিঞ্জার-এর গোপন চীন সফরের পেছনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাই ছিল মূল চালিকা শক্তি, যার মাধ্যমে রিচার্ড নিক্সন প্রশাসন চীন-এর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথ পায়। ১৯৮০-এর দশকে আফগান যুদ্ধে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সমর্থন আফগান মুজাহিদদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। এমনকি ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধেও পাকিস্তান একসঙ্গে সহযোগী ও চ্যালেঞ্জ—দুই ভূমিকাতেই থেকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিজের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখে। এই ধারাবাহিকতা দেখায়, পাকিস্তানের কৌশল কোনো একক সরকারের নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি।

    পাকিস্তানের এই অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে তার পারমাণবিক সক্ষমতা। ১৯৯৮ সালে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য আমূল বদলে যায়। ভারতের প্রচলিত সামরিক আধিপত্য কার্যত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, কারণ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝুঁকি উভয় পক্ষের জন্যই বিপর্যয়কর হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের ভারতের সাথে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়, যেখানে পাকিস্তান সামরিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েও সংঘাতকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ফলে পারমাণবিক প্রতিরোধ শুধু নিরাপত্তা নয়, কূটনৈতিক দরকষাকষিরও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

    সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তির একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্ভাব্য “পারমাণবিক ছাতা”। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ প্রথমে এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিলেও দ্রুত তা প্রত্যাহার করেন। তবে এই ঘটনাই দেখায়, পাকিস্তান ইচ্ছাকৃতভাবে একটি কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রাখছে—যেখানে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি না দিয়েও সম্ভাব্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ইঙ্গিত রাখা হয়। এই ধরনের অস্পষ্টতা সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রগুলোর কাছে পাকিস্তানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে, বিশেষত এমন সময়ে যখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশ অনিশ্চিত।

    ভৌগোলিক অবস্থান পাকিস্তানের এই কৌশলকে আরও শক্তিশালী করে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং চীন-এর সংযোগস্থলে অবস্থান করায় এটি একটি প্রাকৃতিক করিডোরে পরিণত হয়েছে। চীনের জন্য এটি অর্থনৈতিক করিডোরের শেষ প্রান্ত, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঐতিহাসিক নিরাপত্তা অংশীদার, আর সৌদি আরবের জন্য নির্ভরযোগ্য সামরিক সহযোগী। ফলে বিভিন্ন শক্তির স্বার্থ এক জায়গায় এসে মিলে যায়—আর সেই কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পাকিস্তান।

    অন্যদিকে ভারতের শক্তিই অনেক ক্ষেত্রে তার সীমাবদ্ধতায় পরিণত হয়েছে। বৃহৎ অর্থনীতি, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং “কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন”-এর নীতি ভারতকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিলেও, তা তাকে ঝুঁকিপূর্ণ বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নিরাপত্তা ভূমিকায় যেতে নিরুৎসাহিত করে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-এর নেতৃত্বে ভারত বিশ্বজুড়ে সম্পর্ক বিস্তার করলেও, সেই সম্পর্কগুলোকে নিরাপত্তা নির্ভরতায় রূপান্তর করতে পারেনি। ফলে ভারত অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, কিন্তু অপরিহার্য নয়।

    সবশেষে দেখা যায়, পাকিস্তান তার অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, নিরাপত্তা নির্ভরতা এবং ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত সম্পদে পরিণত করেছে। অন্যদিকে ভারত তার শক্তির কারণে অপেক্ষাকৃত সতর্ক ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায়, যেখানে আঞ্চলিক সংঘাত, শক্তির প্রতিযোগিতা এবং জোট রাজনীতি নতুনভাবে গড়ে উঠছে, পাকিস্তান সেই শূন্যস্থানগুলো কাজে লাগিয়ে নিজেকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তাকে উপেক্ষা করা যায় না—এবং সেখানেই কৌশলগতভাবে ভারতকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।

  • ইরান: নতুন পরাশক্তি ?

    ইরান: নতুন পরাশক্তি ?

    বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে মোকাবিলা করেছে, সবচেয়ে ধুরন্ধর গোয়েন্দা সংস্থার ষড়যন্ত্র সামাল দিয়েছে; রক্তাক্ত হয়েছে, হারিয়েছে বেশিরভাগ শীর্ষ নেতৃত্বকে- তবু ভেঙে পড়েনি। দিনের পর দিন বীরের মতো মাথা উচু করে লড়েছে, শেষ পর্যন্ত শত্রুপক্ষকে বাধ্য করেছে আলোচনার টেবিলে আসতে। ৪০ দিন আগেও যা পুরোপুরি অসম্ভব মনে হচ্ছিল, আজ সেটাই বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অহং মাটিতে মিশিয়ে কার্যত যুদ্ধজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইরান। ফলে চারদিকে আজ একটাই প্রশ্ন- বিশ্বের বুকে কি নতুন পরাশক্তির উত্থান ঘটেছে?

    রাজনীতি, জোট বা প্রোপাগান্ডা—সব কিছু সরিয়ে রেখে যদি কেবল বাস্তবতার দিকে তাকানো হয়, তবে একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই: ইরান এমন একটি দেশ যা মাথা নত করতে রাজি নয়। একে কেউ হয়তো কৌশল বলবেন, কেউ বলবেন টিকে থাকার লড়াই, কিংবা একরোখা জেদ—তবে একে উপেক্ষা করা অসম্ভব।

    ইরান কোনো ছোটোখাটো শক্তির বিরুদ্ধে লড়েনি, তারা সরাসরি টক্কর দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, যারা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে অন্য যে কোনো দেশ পিছিয়ে আসতো বা চুপচাপ আপস করে নিতো। কিন্তু ইরান তা করেনি। তারা সরাসরি সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত টিকে থেকেছে।

    এরপর আসে ইসরায়েলের কথা—যাদের কাছে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক প্রযুক্তি এবং গোয়েন্দা ব্যবস্থা। কিন্তু ইরান অনবরত তাদের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে, চাপ সহ্য করছে এবং পাল্টা জবাব দিচ্ছে। এটি কেবল লোকদেখানো প্রতিরোধ নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম অশান্ত একটি অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সক্রিয় লড়াই।

    সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ইরানের পেছনে শক্ত কোনো ‘নিরাপত্তা ঢাল’ নেই। এই মুহূর্তে চীন বা রাশিয়ার মতো বড় শক্তিগুলোর কাছ থেকে কোনো সরাসরি সামরিক সহায়তা বা গ্যারান্টি ছাড়াই তারা এগিয়েছে। এটি কেবল একটি সুচিন্তিত ঝুঁকি এবং সেই ঝুঁকি নেওয়ার অসীম সাহস মাত্র।

    হামলা, ক্ষয়ক্ষতি বা শীর্ষ নেতাদের হারানো—এসব ইরানের জন্য কোনো কল্পনা নয়, বরং বাস্তবতা। ইরান বড় বড় ধাক্কা খেয়েছে, তাদের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবুও দেশটির প্রশাসনিক বা সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি। তারা প্রতিবার নিজেকে সামলে নিয়েছে এবং লড়াই চালিয়ে গেছে। এই ধরনের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা সহজে আসে না।

    রাজনীতি বা যুদ্ধের শেষ পরিণতি নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু কেউ যদি একটু দূর থেকে নিরপেক্ষভাবে দেখে, তবে একটি বিষয় পরিষ্কার: সাম্প্রতিক ইতিহাসে খুব কম দেশই এত চাপের মুখে এমন অটুট মনোবল দেখাতে পেরেছে। ফলে, ইরান এখনই পরাশক্তি—এমন দাবি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে দেশটির ভূমিকা দ্রুত বাড়ছে, এ বিষয়ে অনেকেই একমত।

  • রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ করতে হবে

    রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ করতে হবে

    রাষ্ট্রীয় সম্পদ বলতে আমরা সচরাচর যেটা বুঝি তা হলো সরকার কর্তৃক সরাসরি নিয়ন্ত্রিত এবং মালিকানাধীন সম্পদ। যেমন বিভিন্ন সরকারি অফিস, রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ব্রিজ, নদী, খাল, জলাশয়, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রতিরক্ষাবাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, কোর্ট-কাচারীসহ এ ধরনের প্রতিষ্ঠান এবং তাদের স্থাপনাসমূহ।

    একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কাজ সম্পাদন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ কর নেয়া হয়, যা তাদের আয়ের ওপর নির্ভর করে। সেই করের অর্থ দেশের উন্নয়নের জন্যই সরকার বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ প্রদান করেন। কিন্তু সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হওয়ার ফলে উন্নয়ন প্রতিনিয়তই বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক সময় দেখা যায় বিভিন্ন সরকারি উন্নয়নমূলক কাজে বিপুল পরিমাণ অপচয় হয়।

    প্রতিটি দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন ও যথাযথ ব্যবহারের ওপর। তাই রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা দেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কেননা এটি মানুষের কাছে আমানত স্বরূপ। প্রতিটি নাগরিকের এ আমানত রক্ষা করা উচিৎ। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ভিতর সবথেকে বেশি অপচয় হয় বিদ্যুৎ। লোডশেডিংয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে বিদ্যুতের অপচয়। বিশেষ করে অতিমাত্রায় বিদ্যুতের অপচয় লক্ষ্য করা যায় বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে। যেখানে অযথা লাইট, ফ্যান, এসিসহ বিভিন্ন ভারী বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার হয়ে থাকে।

    বর্তমানে দেখা যায় বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে জাঁকজমকপূর্ণভাবে বিভিন্ন আলোকসজ্জা করা হয়, যেটা অতিমাত্রায় বিদ্যুৎ অপচয়ের জন্য দায়ী। তাছাড়া অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগের কারণে প্রতিবছর সরকার কোটিকোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। বিদ্যুতের পরেই আসে গ্যাসের অপচয়। শহর এলকার একশ্রেণির মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় চুলা জ্বালিয়ে রাখে, এতে করে গ্যাসের অনেক বড়ো একটি অংশ অপচয় হয়ে যায়।

    রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রাষ্ট্র যেমন নাগরিক হিসেবে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়, তেমনি নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রাষ্ট্রের সম্পদের সুরক্ষা করা। সরকারের একার পক্ষে জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই জাতীয় সম্পদ ব্যবহারে প্রত্যেকের সচেতন হতে হবে। সবাইকে পাওয়ার সেভিং বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, দিনের বেলায় লাইট, ফ্যান কিংবা এসি কম ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনের অধিক জ্বালানি গ্যাস ব্যবহার করা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যাবহারে সবাইকে মিতব্যয়ী হতে হবে। যার যার অবস্থান থেকে সবার দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর তাহলেই জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে।

  • ইসলামী সংস্কৃতি ও আলোকিত মানুষ

    ইসলামী সংস্কৃতি ও আলোকিত মানুষ

    সংস্কৃতি সাধারণত তাহজিব, তমদ্দুন বা ইংরেজি কালচারের প্রতিশব্দ রূপে ব্যবহৃত হয়। এ সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করা। এ হচ্ছে একটি ব্যাপক জীবনব্যবস্থা যা মানুষের চিন্তা-কল্পনা, স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার, পারিবারিক কাজকর্ম, সামাজিক ক্রিয়াকলাপ, রাজনৈতিক কর্মধারা, সভ্যতা ও সামাজিকতা সবকিছুর ওপরই পরিব্যাপ্ত। এ সংস্কৃতি কোন জাতীয়, বংশীয় বা গোত্রীয় সংস্কৃতি নয়। বরং সঠিক অর্থে এটি হচ্ছে মানবীয় সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতি এক বিশ্বব্যাপী উদার- গোত্র, ভাষা নির্বিশেষে সকল মানুষই প্রবেশ করতে পারে। পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে এ সংস্কৃতি এক নির্ভুল সমাজব্যবস্থা কায়েম করতে এবং এক সৎ ও পবিত্র জনসমাজ গড়ে তুলতে চায়। ইসলামী সংস্কৃতির ব্যবস্থাপনা একটি রাজ্যের ব্যবস্থাপনার মতো। এতে আল্লাহর মর্যাদা সাধারণ ধর্মীয় মত অনুসারে নিছক একজন উপাস্যের মত নয়। বরং দুনিয়াবি মত অনুযায়ী তিনি সর্বোচ্চ শাসক ও রাসূল সা. তার প্রতিনিধি। কুরআন তাঁর আইনগ্রন্থ। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তার এই শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা বজায় রাখা ও এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য তার প্রয়োজন সংস্কৃতি। সংস্কৃতি মানুষের আছে, অন্য জীবের সংস্কৃতি বলে কিছুই নেই। মানুষ হিসেবে মানুষের আসল পরিচয়ই তার সংস্কৃতি। জীবন ধারণের জন্য মানুষ খাবার খেয়ে থাকে, এই খাবার ভাত-রুটি হতে পারে, আবার মাছ-গোশতও হতে পারে। এই খাবার খেয়েই মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়; কিন্তু এই ভাত-রুটি বা মাছ-গোশত খাওয়াটাই সংস্কৃতি নয়, সংস্কৃতি হচ্ছে খাবারের পদ্ধতি। আমরা যে পদ্ধতিতে খাবার গ্রহণ করব, সে পদ্ধতিটাই হচ্ছে সংস্কৃতি। অর্থাৎ সংস্কৃতি হচ্ছে জীবন পরিচালনার পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার নাম।

    সংস্কৃতির সংজ্ঞা

    এক কথায় সংস্কৃতির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রদান সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন বিশ্লেষণের। সংস্কৃতি সম্পর্কিত এমন কতকগুলো উদ্ধৃতি পেশ করা হলো যাতে সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি সুষ্ঠু ধারণা অর্জন সহজ হতে পারে। আবুল মনসুর আহমেদ বলেন: “ইংরেজিতে যাকে বলা হয় (Culture/Refinement), আরবিতে যাকে তাহজিব বলা হয়, সংস্কৃতি শব্দটা সেই অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে।” আবুল ফজল বলেন: “ Culture শব্দের ধাতুগত অর্থ কর্ষণ অর্থাৎ সোজা কথায় চাষ করা। জমি রীতিমতো কর্ষিত না হলে যত ভালো বীজই বপন করা হোক না কেন তাতে ভালো ফসল কিছুতেই আশা করা যায় না। মন জিনিসটাও প্রায় জমির মতই। মনের ফসল পেতে হলে তার রীতিমত কর্ষণের প্রয়োজন।” ওয়াকিল আহমেদের ভাষায়: “জীবন ছাড়া সংস্কৃতি নেই।” বদরুদ্দীন উমর বলেন: “জীবন চর্চারই অন্য নাম সংস্কৃতি।” প্রচলিত অর্থে আমরা যাকে সংস্কৃতি বলে থাকি তারও লক্ষ্য মন আর চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন। মহত্ত্ব ও সৌন্দর্য সাধনার উপর, এক কথায় মনুষ্যত্বের উপর যে সংস্কৃতির ভিত্তি, একমাত্র সে সংস্কৃতিই মানবজীবনে বিকিরণ করতে পারে আলো। যে আলোর নেই কোনো দেশ, কোনো কাল ও জাত। তাই সংক্ষেপে বলা যায় যে, মানুষের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে চরিত্র আর চরিত্রের বহিঃপ্রকাশই হচ্ছে সংস্কৃতি।

    সংস্কৃতির ভুল ধারণা

    আমরা সাধারণ গান, সিনেমা, নাটক, বাদ্যযন্ত্র, শিল্প, সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়কে সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য করে থাকি। আসলে এইগুলো ঠিক সংস্কৃতি নয়; বরং সংস্কৃতির বাহন মাত্র। সংস্কৃতি বিকাশের জন্য এগুলো ব্যবহার করা হয় উপকরণ বা বাহন হিসাবে। তাই আমরা ভুলবশত তা অজ্ঞতার কারণে এ উপকরণ বা বাহনকে সংস্কৃতি বলে থাকি। সংস্কৃতিকে শুধু রীতিনীতি কিংবা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। মানব মনের অন্তর্নিহিত শক্তি, কৌতূহল ও প্রতিভা স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ লাভ করে সংস্কৃতির মাধ্যমে। এ জন্যই সংস্কৃতির মাধ্যমে মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটতে পারে। খণ্ড খণ্ড কিংবা আংশিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কখনও মানুষকে তার মনুষ্যত্ব বিকাশের সহায়তা করতে পারে না।

    অপসংস্কৃতি

    অপসংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্বভাবের বিপরীত অথবা সাংস্কৃতিক আদর্শের বিরুদ্ধে যা মানুষের সুস্থ ও সুপ্ত প্রতিভাকে বিকৃতি ও বিধবস্ত করে তাই হচ্ছে অপসংস্কৃতি। বর্তমান সমাজে অপসংস্কৃতি বলে থাকে চিহ্নিত করতে পারি তা নিম্নবরূপ:

    ১. বিদেশি প্রাচুর্য থেকে সৃষ্ট এক ধরনের অশ্লীল নৃত্যগীত, নাটক ও সিনেমা ইত্যাদি।

    ২. বিদেশি মিডিয়ার কু-প্রভাব।

    ৩. ডিশ এন্টিনার বদৌলতে প্রাইম, স্টার টিভি, জিটিভি, এমটিভি আগ্রাসন।

    ৪. যৌন উত্তেজনামূলক সাহিত্য, পত্রিকা, ম্যাগাজিন, কমিক বই ইত্যাদির মাধ্যমে চরিত্র হরণ করা।

    ৫. ছায়াছবির মাধ্যমে ভায়োলেন্সের চিত্র প্রদর্শন।

    ৬. বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ক্লাবের নামে মাদকের ছড়াছড়ি।

    ৭. পুরুষ ও মহিলাদের বিকৃত রুচির পোশাক পরিধান।

    ৮. অতি আধুনিকতার নামে বিদেশী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ও অনুশীলন।

    ১০. বিকৃত রুচি ও যৌন সুড়সুড়িমূলক বিজ্ঞাপন, পোস্টার, ফেস্টুন আলোকচিত্র ইত্যাদির ব্যাপক প্রচলন।

    ১১. ধর্মের নামে মাজার পূজা, কবর পূজা, শিরক ও বিদাতের ব্যাপক সয়লাব।

    সুতরাং অপসংস্কৃতি চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে একটি জাতি বা দেশের ঐতিহ্যকে বিবেচনার আয়ত্তে আনতেই হবে।

    সংস্কৃতি ও ধর্ম

    ধর্ম হচ্ছে সংস্কৃতির একটি উপাদান। ধর্মবিশ্বাসের কারণে সাংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা লক্ষ্য করছি যে, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রেরণা সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিষ্টান সকলের ক্ষেত্রেই ধর্মবিশ্বাসটি জীবনের প্রেরণার উৎস। এ দেশের বিভিন্ন উৎসবের উৎস অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে, সেগুলোর প্রায় সব কয়টিই ধর্মভিত্তিক। ধর্মভিত্তিক হয়েও সকল উৎসব আয়োজনের মধ্যে একটি উদারতা, সহনশীলতা এবং সকল শ্রেণির এক সঙ্গে গ্রহণ করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আর এ কথা বলাই বাহুল্য যে, কোন জিনিস ব্যবহারের ব্যাপারে তার ¯্রষ্টা যে পদ্ধতি নির্দেশ করেন, সেই জিনিস ব্যবহারের সেটাই সর্বোত্তম ও নির্ভুল পন্থা। শুদ্ধ সংস্কৃতি পেতে হলে আমাদের যেতে হবে খোদায়ী দর্শনের কাছে। যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, জীবন দিয়েছেন, আহার জোগাচ্ছেন এবং একদিন তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।

    ইসলাম ও সংস্কৃতি

    ইসলাম পৃথিবীতে নিছক রাজনৈতিক তা অর্থনৈতিক বিপ্লব সাধনের জন্য আসেনি। ইসলাম এসেছে মানুষের চিন্তা ও কর্মকে পরিশুদ্ধ করার জন্য। মানুষের চিন্তা ও কর্মের এ পরিশুদ্ধির প্রচেষ্টাকেই বলা হয় সামগ্রিক অর্থে সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ইসলাম একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। ফলে ইসলাম ছাড়া জীবন পরিচালনা মানেই হচ্ছে, অপূর্ণাঙ্গ বিধান দ্বারা পরিচালিত হওয়া। আর অপূর্ণাঙ্গ বিধান দ্বারা জীবন পরিচালনার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে অসঙ্গতি ও ত্রুটিপূর্ণ জীবন যাপন করা। স্বাভাবিকভাবেই এ জীবন অসংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতি শিকার হতে বাধ্য। এ জন্যই বলা যায়, পরিপূর্ণ মুসলমান হওয়া ছাড়া পরিপূর্ণ সংস্কৃতিবান হওয়া সম্ভব নয়। তাই হযরত মোহাম্মদ সা.-এর জীবনে ও বাণীতে, যে সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটেছে তাই ইসলামী বা মুসলিম সংস্কৃতি বলে পরিচিত।

    নীরব ঘাতক সাংস্কৃতিক আগ্রাসন

    মুসলমানদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ বিনষ্ট করার লক্ষ্যে বাতিল শক্তি তার সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। তারা মনে করে দৃশ্যমান এ পৃথিবীর বাইরে আর কোনো জগৎ নেই, নেই কোনো জবাবদিহিতার অবকাশ। তাদের ভোগবাদী দৃষ্টির বিস্তার ঘটিয়ে মুসলমানদের চিরায়ত মূল্যবোধ বিনষ্ট করে দিচ্ছে তাদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। এর মাধ্যমে অন্যান্য মূল্যবোধের সাথে বিনষ্ট হচ্ছে:

    ১. আখেরাতের চেতনা। যে চেতনা মানুষকে পাপ ও অশ্লীলতা থেকে মুক্ত করে সমাজে পূত পবিত্রতার বিস্তার ঘটায়।

    ২. নেতৃত্বের চেতনা। যে চেতনা সামাজিক বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখে।

    ৩. তাওহিদের চেতনা। মানুষ একমাত্র আল্লাহর বান্দা এবং পরস্পর ভাই এ ধারণার বিলুপ্তি ঘটার ফলে সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়। এর ফলে ¯্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্ব, মানুষের মর্যাদা, মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব ও কর্তব্য এসব ধারণার অবলুপ্তি ঘটে এবং মানুষ পশুর স্তরে নেমে আসে। বস্তুত এর ফলে একজন মুসলমান তার ঈমানী চেতনা হারিয়ে ফেলে এবং সে এমন সব কাজ করতে থাকে যা একজন মুসলমান তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন না থাকার কারণে করে বসে। আর এ অবস্থা সৃষ্টি হলে মাথা গুনতিতে সে মুসলিম দলভুক্ত হলেও কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে সে আর মুসলিম থাকে না। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা হামলার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে মুসলমানদেরকে সত্যের পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। তার মধ্যে শয়তানি গুণ সৃষ্টি করা এবং জীবনকে ব্যর্থ করে দেয়া। যুগে যুগে মুসলমানরা বাতিলের যত রকম হামলার শিকার হচ্ছে তার মধ্যে এ সাংস্কৃতিক হামলাই সর্বাপেক্ষা মারাত্মক ও ক্ষতিকারক।

    সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পরিণতি

    বাতিলের সর্বগ্রাসী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে মুসলমানরা যে একটি মর্যাদাবান জাতি, তাদের রয়েছে আলাদা কৃষ্টি-কালচার, ইতিহাস-ঐতিহ্য, বিশ্ব মানবতার নেতৃত্বদানের জন্য এবং মহত্ত্ব ও মানবতার বিজয় ঘোষণার জন্য তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, এ কথা অধিকাংশ মুসলমান আজ বিস্মৃত। অপসংস্কৃতির সয়লাবে আজ মুসলমান দ্বিধা-বিভক্ত। পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং অনৈক্য দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আধুনিকতার নামে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে চলছে। শিক্ষার নামে কু-শিক্ষা, সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি বিনোদনের নামে বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা এবং সর্বনাশা মাদক মুসলিম সমাজকে তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে দিকে ধাবিত করছে। অন্যদিকে ধর্মীয় উন্মাদনার মাধ্যমে মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ককে পারস্পরিক কাদা ছুড়াছুড়িতে ব্যস্ত রেখেছে। যা বাতিলের তীক্ষè দূরদৃষ্টি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। বাতিলের সাংস্কৃতিক ঘুমপাড়ানি গান মুসলমানদের এতটা আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, তাদের ঘরজুড়ে দাউ দাউ আগুন দেখেও সে আগুন নেভাতে যে তাদের উঠে দাঁড়াতে হবে সে কথা বুঝতে পারছে না মুসলিম। এটাই মুসলমানের দুর্ভাগ্য। বাতিলের সাংস্কৃতিক হামলার কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মুসলিম তার মুসলমানিত্ব হারাচ্ছে মৃত্যু ঘটেছে তাদের ঈমানী চেতনার। দুনিয়ার আদম শুমারিতে তাদেরকে মুসলিম হিসাবে উল্লেখ করা হলেও আল্লাহর খাঁটি বান্দা হওয়ার সৌভাগ্য হারাচ্ছে তারা। হালাল হারামের কোন নিয়ম তাদেরকে পরিচালিত করতে পারে না। পাপ পুণ্যের ধার ধারে না বাস্তব কর্মজীবনে এ সকল মুসলমান। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বারবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন: “হে ঈমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণ মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। অথচ সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার ঈমানদারদের মৃত্যু ঘটে মুসলমানিত্বহীন অবস্থায়।

    সংস্কৃতি চর্চার গুরুত্ব

    আধুনিক বিশ্বে মুসলিম মিল্লাতের অনগ্রসর তার মূল কারণ ইমলামী সংস্কৃতির চর্চার অভাব। ইসলামের যে মূল দাবি মানুষের চিন্তা ও কর্মের সংস্কার ও পরিশুদ্ধি, সে সংস্কার ও পরিশুদ্ধি ছাড়া প্রকৃত অর্থে মুসলমান হওয়া যায় না, সংস্কৃতিবানও হওয়া যায় না। তাই সংস্কৃতিবান হতে হবে প্রথম মুসলিম হতে হবে আর মুসলিম হতে হলে সংস্কৃতিবান হতে হবে। কারণ সংস্কৃতির নিজস্ব কোনো আদর্শ নেই। সংস্কৃতি হচ্ছে জীবনের আচরিত কর্মপ্রবাহের নাম। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো আদর্শের ভিত্তিতে এ কর্মধারা পরিচালিত হলে তা হবে সংকীর্ণ ও অসম্পূর্ণ। তাই ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য সংস্কৃতি চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। এক কথায় বলা যায়, ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামী সংস্কৃতির লালন ও চর্চা অপরিহার্য।

    ইসলামী সংস্কৃতির মূল ভিত্তি

    ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার মূল ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। যে বিশ্বাস ও আচরণ ইসলাম একজন মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে তার সাথে সাংঘর্ষিত হতে পারে এমন কোন কিছুই ইসলামী সংস্কৃতির মধ্যে শামিল হতে পারে না। এ সীমারেখাকে অবহেলা করে বা কৌশলের নামে তাকে অবজ্ঞা করে যা করা হবে তা আর যাই হোক ইসলামী সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ইসলামী সংস্কৃতির প্রাসাদ নির্মিত হয়। বিষয়গুলো হচ্ছে: (১) তাওহিদ, (২) রিসালাত, (৩) আখেরাত ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার ভিত্তি হচ্ছে এ তাওহিদ, রিসালাত, আখেরাত। যে সকল কর্মকাণ্ড মানুষকে এ মৌলিক চেতনার স্মরণ থেকে ফিরিয়ে রাখে তাই অনৈসলামিক সংস্কৃতি, আর যে সব তৎপরতার মধ্য দিয়ে এ সকল চেতনা জাগ্রত, শাণিত ও মজবুত হয় তাই ইসলামী সংস্কৃতি।

    ১. তাওহিদ : তাওহিদ হচ্ছে ঈমানের বুনিয়াদ। আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এটুকু বিশ্বাস করাই তাওহিদের জন্য যথেষ্ট হতে পারে না। রাসূলের জামানায় তৎকালীন আরব মুশরিক এবং কাফেররাও এটুকু বিশ্বাস করতো। তাওহিদের বিশ্বাসের অর্থ হচ্ছে আল্লাহই একমাত্র সর্বভৌম ক্ষমতার মালিক, তিনিই মানুষের রিজিকদাতা, পালনকর্তা এবং একমাত্র অভিভাবক। মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তিনি তারই ইবাদতের জন্য আর দুনিয়ার সবকিছু সৃষ্টি করেছেন মানুষের জন্য। ভয় একমাত্র তাকেই করতে হবে সাহায্য চাইতে হবে তারই কাছে। মানুষের ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ সব তার হাতে। ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে মানুষের মনে এ তাওহিদ বিশ্বাসকে দৃঢ় করতে হবে।

    ২. রিসালাত : মানবজাতির পথ প্রদর্শদনের জন্য আল্লাহ রাসূলকে সত্য দ্বীন ও হিদায়াতসহ পাঠিয়েছেন। ইসলামী সংস্কৃতির কাজ হলো মানুষের মনে রাসূলের নেতৃত্বের বিপরীত পৃথিবীর জন্য পাঠিয়েছেন। ইসলামী সংস্কৃতির কাজ হলো মানুষের মনে রাসূলের নেতৃত্বের বিপরীত পৃথিবীর জন্য কোনো নেতৃত্বের প্রতি যেন কারো মোহ সৃষ্টি না হয় মানুষের মনকে সেই উপলব্ধিতে উজ্জীবিত রাখা।

    ৩. আখিরাত : মানুষকে এ দুনিয়ায় আল্লাহ পাঠিয়েছেন তার ইবাদত করার জন্য। একদিন এ দুনিয়ার জিন্দেগি শেষ হয়ে যাবে। মানুষকে পুনরায় ফিরে যেতে হবে আল্লাহর দরবারে। যিনি আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করবে না তার জন্য রয়েছে অনন্ত আজাব। জীবনের প্রতিটি কাজে মানুষকে তাই ভাবতে হবে যে কাজটি আমি করছি তা কি পরকালে আমার নাজাতের উসিলা হবে, নাকি তা আমার জন্য বয়ে আনবে জাহান্নামের কঠিন আজাব। ইসলামী সংস্কৃতির কাজ হচ্ছে মানুষের দিলকে সর্বদা আখিরাতমুখী করা। সংস্কৃতির বিভিন্ন তৎপরতার মধ্যে দিয়ে বারবার আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেই কেবল একটি কল্যাণময় ইসলামী সমাজের আশা করা যেতে পারে।

    ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ, প্রচার, প্রসার ও

    লালন অপরিহার্য

    ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ এর প্রচার, প্রচার ও লালন করা ঈমানের দাবি। ঈমানের বিষয়ে কোন দুর্বলতা থাকলে যেমন পুরোপুরি ঈমানদার হওয়া যায় না। তেমনি ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ ও পালন না করে পুরোপুরি মুসলিম হওয়া যায় না। কারণ বিজাতীয় সাংস্কৃতির গোলামির শিকল একবার কোন জাতির গলায় আটকে গেলে তা ছিন্ন করা যেমন দুঃসাধ্য তেমনি ছিন্ন করতে না পারলে তার পরিণামও ভয়াবহ। তাই সাংস্কৃতিক বিকাশ ও লালনের জন্য করণীয় বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো-

    (ক) পরিবার প্রথা : পরিবার মানব সভ্যতার মৌল ভিত্তি, সমাজের শান্তি-শৃংখলা, স্থিতিশীলতা, অগ্রগতি ইত্যাদি পারিবারিক সুস্থতা ও দৃঢ়তার ওপরই বহুলাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু পাশ্চাত্যের দর্শন শিক্ষা ও অপসংস্কৃতি এই পরিবার প্রথার উপর আঘাত হেনে সভ্যতার মূল ভিত্তিকেই বির্পযস্ত করে তুলছে। তাই এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য ইসলাম পরিবারকে সংস্কৃতি চর্চার নিয়ামকে পরিণত করে অতুলনীয় বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলছে তার কোনো বিকল্প নেই। পারিবারিক ক্ষেত্রে যদি আমরা ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ সাধন ও লালন করতে না পারি তাহলে পাশ্চাত্যের অবাধ ব্যক্তিস্বাধীনতা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছছে যে, সেখানকার নারী পুরুষ এখন “লিভটুগেদার সিস্টেমে” জীবন নির্বাহ করতেই ক্রমাগত অভ্যস্ত হচ্ছে। ফলে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে প্রতিনিয়ত। তাই এই প্রেক্ষিতে মানবসমাজে পরিবার প্রথা, পারিবারিক শিক্ষা, জীবন ধারার প্রচলন ও কল্যাণকর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলার জন্য এই পরিবারপদ্ধতি সব সময়ই অতিশয় কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে।

    (খ) মসজিদভিত্তিক সংস্কৃতি চর্চা : ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার দ্বিতীয় প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে মসজিদ। মসজিদকে আমরা শুধুমাত্র নামাজের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছি। অথচ রাসূলের সময় থেকে শুরু করে খোলাফায়ে রাশেদার যুগে মসজিদকে ইসলামী সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। মসজিদ যেমন ইসলামী সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শিল্প চর্চার কেন্দ্রবিন্দু, তেমনি মসজিদ মুসলমানদের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার কেন্দ্রভূমি। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা যে অভিন্ন সাংস্কৃতিক বোধে উজ্জীবিত হয় মুসলমানদের জীবনধারা যে বোধের দ্বারাই পরিচালিত হয়। আমাদের সমাজে মসজিদকে এখনো যথার্থ মর্যাদায় ব্যবহার করার মানসিকতা তৈরি হয়নি। এ মানসিকতায় পরিবর্তন ঘটাতে হবে। মসজিদকে ব্যবহার করতে হবে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার কেন্দ্র রূপে। এ জন্য যথাযথ উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

    ১. ইসলামী সংস্কৃতির সুষ্ঠু আঞ্জামের জন্য মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জিনের বেতনভাতা বৃদ্ধি করে এ কাজে ফুলটাইম নিয়োজিত করতে হবে।

    ২. নিয়মিত কুরআন হাদিসের পাঠ ও আলোচনা করা।

    ৩. বিভিন্ন জাতীয় ও ইসলামী দিবসের ওপর আলোচনা করা।

    ৪. শিশু-কিশোর, যুবক ও বয়স্কদের জন্য পৃথক পাঠ ও প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা।

    ৫. বিশেষ বিশেষ সময় বা উপলক্ষে হামদ, নাত, ইসলামী সংগীত, দেশাত্মবোধক গান, আযান, কেরাত এর প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা।

    ৬. পাঠাগার ও ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার চালু করা এবং পাঠ প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা।

    ৭. মাঝে মাঝে বই, চিত্র ও শিল্পকলার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা।

    ৮. প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু করা।

    ৯. আত্মকল্যাণমূলক কাজের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

    ১০. রমাদাান মাসকে সাংস্কৃতিক মাস হিসেবে উদযাপন করা।

    ১১. ইসলামী দিবসে বিশেষ প্রীতিভোজ, প্রীতি …… ব্যবস্থা করা।

    ১২. সামাজিক ও পারিবারিক বিভিন্ন সম্পদ পারস্পরিক দ্বন্দ্ব কলহ, মামলা-মোকদ্দমা ইত্যাদির মীমাংসা করা।

    ১৩. বাৎসরিক সম্মেলন ও তাফসির মাহফিলের ব্যবস্থা করা।

    ১৪. সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য সনদ ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করা।

    ১৫. নামাজ পড়া সহ প্রতিটি কর্মকাণ্ডে মহিলাদের সম্পৃক্ত করার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা।

    ১৬. বয়স্কদের জন্য নৈশ পাঠ/ নৈশ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করা।

    ১৭. ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি বা ব্যক্তির দ্বারা প্রতিদিন বাড়ি/বাসায় বই সরবরাহের ব্যবস্থা করা।

    ১৮. সকল কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে বাৎসরিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা।

    এভাবে উপরোক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু, কিশোর, যুবক ও বয়স্কদেরকে ব্যাপকভাবে মসজিদমুখী করার উদ্যোগ নিতে হবে। মসজিদ কেবল নামাজ পড়ার জায়গা হিসেবে নয়, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে মানুষের অবসর, সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ও বিনোদনের কেন্দ্র রূপেও মসজিদকে গড়ে তুলতে পারলে ইসলামী সংস্কৃতি বিকশিত হবে।

    (গ) সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় করে তোলা: আমাদের দেশের সরকারি ও বেসরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোকে অধিকতর সক্রিয় করে তুলতে হবে। বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ সাংস্কৃতিক মন্ত্রালয়ের অর্থানুকূল্যে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎপরতা অব্যশই এ দেশের অধিকাংশ জনগণের বিশ্বাস ও চেতনার সপক্ষে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এসব প্রতিষ্ঠান ভিনদেশী সংস্কৃতি নিয়ে যতটা সক্রিয় ইসলামী সংস্কৃতি বিষয়ে ততটা উদাসীন। জনগণের অর্থানুকূল্যে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানকে জনকল্যাণমুখী ও ইসলামী সাংস্কৃতিক বিষয়কে লালন করার জন্য ভূমিকা পালন করতে হবে।

    (ঘ) মিডিয়ার ভূমিকা পালন : ইসলামী সংস্কৃতি বিকাশের জন্য মিডিয়া একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম। ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়া ছাড়া সংস্কৃতি বিকশিত হওয়া সম্ভব নয়। সরকারি মিডিয়া বিশেষ করে রেডিও, টিভি, পত্র-পত্রিকার পাশাপাশি বেসরকারি মিডিয়া গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক বিশ্বে মিডিয়া সুবাদে অপসংস্কৃতি যে ভাবে মুসলমানদের ঈমান আকিদাকে ধ্বংস করছে তার মোকাবেলায় ইসলামী অনুষ্ঠান মানা অর্থাৎ সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে বেসরকারি চ্যানেলের কোনো বিকল্প নেই।

    (ঙ) চলচ্চিত্র নির্মাণ : চলচ্চিত্র দেশের একটি উল্লেখযোগ্য গণমাধ্যম। এ মাধ্যমটি বর্তমানে এতটা অশ্লীলতা ও বেহায়াপনায় ভরপুর যার নাম শুনলে মানুষ মনে করে ইসলামে আবার সিনেমা তা কি করে সম্ভব। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, সিনেমা বা ফিল্মে মূলত ও স্বতঃই কোনো দোষ বা খারাবি নেই। তা কি কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে কি উদ্দেশ্য সাধন করতে চাওয়া হচ্ছে সেটাই আসল প্রশ্ন। এ কারণে কতিপয় শর্তসমূহ সহকারে কাজে লাগালে তা খুবই ভালো, উত্তম ও কল্যাণকর হতে পারে।

    ১. শিরক থাকতে পারবে না।

    ২. নগ্নতা ও অশ্লীলতা থাকতে পারবে না।

    ৩. শিক্ষামূলক ও জ্ঞানমূলক হতে হবে।

    ৪. দেশ ও জাতি বিদ্বেষী হতে পারবে না।

    ৫. মৌলিক উভয় ক্ষেত্রে (অভিনয় ও দর্শক) নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা করা যাবে না।

    উপরোক্ত শর্তের আলোকে সিনেমা নির্মাণ করা হলে সংস্কৃতি ও ইসলামের বাণী পৌঁছানোর জন্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমটি অধিক ফলপ্রসূ হবে। তাই ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে ছবি নির্মাণের জন্য প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীদের প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ব্যবসায়িক মনোভাব ও ইসলামের স্বার্থে মুসলিম ব্যবসায়ীদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। এখানে উদ্যোক্তা তৈরির জন্য ইসলামী ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ প্রধানে এগিয়ে আসলে এ খাত দ্রুত বিকশিত হবে। এবং নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। ফলে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের কাজ অধিকতর বেগবান হবে।

    (চ) নাটক তৈরি করা : নাটক আরেকটি জনপ্রিয় গণমাধ্যম। নাটকের মাধ্যমেও সংস্কৃতি জনপ্রিয় করা সম্ভব। প্রধানত উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা এর দর্শক। সমাজ পরিবর্তনের মুখ্য নিয়ামক শক্তি মধ্যবিত্ত সমাজ, তাদের মানসিক পরিবর্তনের জন্য নাটক খুবই জরুরি, এ জন্য ইসলামী সমাজ নির্মাণের স্বপ্নে যারা বিভোর নাটকের বিষয়টিও তাদের গুরুত্বসহ বিবেচনা করতে হবে। তাই ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশে নাটক রচনা ও সঞ্চায়নের ব্যাপারেও তাদের উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে।

    (ছ) সঙ্গীতচর্চা : মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক বোধ জাগাতে ও সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সঙ্গীতের ভূমিকা তাই অনস্বীকার্য। হাম্দ, নাত, দেশাত্মবোধক ও ইসলামী সঙ্গীতের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং অডিও, ভিডিও, সিডি, ক্যাসেট এ ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে। তাই যারা ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের কাজে নিয়োজিত ইসলামী সঙ্গীতের প্রসারেও তাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

    (জ) চারু ও কারুকলার বিস্তার : মানুষ স্বভাবতই সৌন্দর্যপ্রিয়। মানুষের এই শিল্প চেতনা যেন কল্যাণের পথে অগ্রসর হয় সে জন্যই ইসলামী চারু ও কারুকলার বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন। একজন মানুষের ঘরে প্রবেশ করলে বুঝা যায় লোকটি কোন প্রকৃতির। কেউ বা মূর্তি দিয়ে, আবার কেউবা সাজায় ফুল শোভায় বা ক্যালিগ্রাফিতে। এ জন্য চারু ও কারুকলা শিল্পে ইসলামের ছোঁয়া থাকলে মানুষ অশ্লীলতা থেকে এবং এমনকি প্রচ্ছন্ন শিরক থেকে রক্ষা পেতে পারে। সামাজিকভাবে ইসলামী আবহ সৃষ্টির জন্য। তাই চারু ও কারু শিল্পের ব্যাপক চর্চা হওয়া প্রয়োজন।

    (ঝ) সাহিত্য রচনা করা : আধুনিক বিশ্বে মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক বোধ সৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে যে মাধ্যমটি তা হচ্ছে সাহিত্য, গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, ছড়া, এসব নান রকম ফর্মে সাহিত্যচর্চা চলে। শিক্ষিত মানুষ মাত্রই সাহিত্যের কোনো না কোনো ফর্মের প্রতি আগ্রহ পোষণ করবে এবং সাহিত্য পড়বে এটাই স্বাভাবিক। এভাবে পড়ার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান দ্বারাই তার জীবনবোধ গড়ে ওঠে। ফলে ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হলে ইসলামী সাহিত্যের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা করতে হবে। ইসলামী সাহিত্যের চাহিদা যত বাড়বে ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টিতে লেখকরা ততবেশি আগ্রহী ও সচেষ্ট হবে। তাই আমাদের মাসিক বাজেটে চাল-ডালের মত বই ক্রয়েরও একটি পরিকল্পনা করা সকলের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ চাল-ডাল আমাদের দেহের ক্ষুধা মেটায় আর বই মেটায় আমাদের মনের ক্ষুধা।

    (ঞ) গান ও বাদ্যযন্ত্র : যে কাজে সাধারণত মানুষের মন আকৃষ্ট হয় ও অন্তর পরিতৃপ্তি ও প্রশান্তি লাভ করে এবং কর্ণকুহরে মধু বর্ষিত হয় তা হচ্ছে। নির্লজ্জতা, কুৎসিত-অশ্লীল ভাষা কিংবা পাপ কাজে উৎসাহ উত্তেজনা দানের সংমিশ্রণ না থাকলে তা মুবাহ্। উপরন্তু যৌন আবেগ উত্তেজনাকর বাদ্য সংমিশ্রণ না হলে সেই সাথে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারেরও কোন দোষ নেই। এ জন্য শরিয়তের দৃষ্টিতে কতিপয় শর্ত অপরিহার্য।

    ১. গানের কথা শিরকমুক্ত হতে হবে।

    ২. নগ্নতা ও অশ্লীলতা থাকতে পারবে না।

    ৩. যৌন আবেগ ও উত্তেজনাকর বাদ্য সংমিশ্রণ থাকতে পারবে না।

    ৪. শিক্ষা ও গঠনমূলক হতে হবে।

    ৫. গান ও বাদ্য মানুষের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হতে হবে।

    উল্লিখিত শর্তসাপেক্ষে আনন্দ উৎসবের ক্ষেত্রে খুশি ও সন্তোষ প্রকাশের জন্য এসব জিনিস শুধু জায়েজই নয়, পছন্দনীয়ও বটে। যেমন: ঈদ, বিয়ে, শুভসংবাদ, ওয়ালিমা, ইসলামী বিশেষ দিবস উদযাপন, আকিকা অনুষ্ঠান ও সন্তান জন্ম হওয়া কালে এসব ব্যবহার করা যেতে পারে দ্বিধাহীনচিত্তে। হযরত আয়িশা রা. বলেছেন, আনসার বংশের এক ব্যক্তির সাথে একটি মেয়ের বিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। তখন নবী করীম সা. বললেন: হে আয়িশা! ওদের সঙ্গে আনন্দ ফুর্তির ব্যবস্থা কিছু নেই? কেননা আনসাররা তো এগুলো বেশ পছন্দ করে। (বুখারি) তাই ইসলামী সংস্কৃতির বাহন হিসেবে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে সার্বজনীন করার জন্য ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের কাজে যারা নিয়োজিত তাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

    (ট) ক্রীড়া, আনন্দ ও প্রতিযোগিতা : ইসলাম বাস্তববাদী জীবনবিধান। তা মানুষকে অবাস্তব কল্পনা বিলাস ও নানা চিন্তা ভাবনার কুঞ্ঝটিকার পরিবেষ্টনে আবদ্ধ করে রাখতে ইচ্ছুক নয়। বরং এ বাস্তবতার পৃথিবীতে ঘটনাপ্রবাহের আবর্তনের মধ্যে সুষ্ঠু রূপে বসবাস করার রীতি ও পদ্ধতিই ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দেয়। তা মানুষকে নভোমণ্ডলে বিচরণকারী ফেরেশতা মনে করে কর্মবিধান তৈরি করেনি। খাদ্য-পানীয় গ্রহণকারী ও হাটে বাজারে বিচরণকারী মানুষ মনে করেই তার জন্য বিধান দেওয়া হয়েছে। ইসলাম মানুষকে প্রকৃতি ও স্বভাবগত ভাবধারার উপর পুরো মাত্রায় লক্ষ্য নিবদ্ধ রেখেছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এভাবে যে, পানাহার যেমন তার প্রকৃতির চাহিদা তেমনি আনন্দ-স্ফূর্তি ও সন্তুষ্টি-উৎফুল্লচিত্ত হয়ে থাকা এবং হাসি-তামাশা-খেলা ইত্যাদিও তার প্রকৃতিগত ভাবধারা হয়ে রয়েছে। এ সত্য কোনোক্রমেই অস্বীকার করা যায় না। আনন্দ-স্ফূর্তি ও ক্রীড়ার বহু প্রকার ধরন ও পদ্ধতি এমন রয়েছে যা নবী করীম সা. মুসলমানদের জন্য জায়েজ করেছেন। মুসলমানরা এ গুলোর সাহায্যে মনের বোঝা হালকা করতে পারে, স্ফূর্তি লাভ করতে পারে। এসব ক্রীড়া মানুষকে ইবাদত ও কর্তব্য পালনে- এসব কাজে তৎপরতা সহকারে অংশ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। এসব শরীর চর্চামূলক ক্রীড়ার সাহায্যে শক্তিবর্ধক ট্রেনিং লাভ করতে পারে। তার দরুন মানুষ জিহাদে অংশগ্রহণের জন্যও প্রস্তুত হতে পারে। খেলাধুলা বিষয়ে শরিয়তের কতিপয় শর্ত রয়েছে তা নিম্নে তুলে ধরা হলো:

    ১. খেলাধুলার কারণে নামাজ থেকে বিরত হওয়া বা বিলম্ব করা যাবে না।

    ২. তাতে জুয়া মদ্যপান ও অশ্লীলতা থাকতে পারবে না।

    ৩. খেলার সময় খেলোয়াড় ও দর্শক নিজেদের মুখকে গালাগাল, কুৎসিত-অশ্লীল কথাবার্তা থেকে মুক্ত ও পবিত্র রাখবে।

    ৪. পোশাক পরিচ্ছদ শালীন ও শরিয়াহ্ সীমারেখার মধ্যে হতে হবে।

    ৫. খেলাকে কেন্দ্র করে ঝগড়া-বিবাদ, অশ্লীল নৃত্য ও দেহের বিশেষ অঙ্গভঙ্গি প্রকাশ করা যাবে না।

    ৬. পুরুষ ও মহিলা একত্রে খেলা করা যাবে না।

    ৭. খেলা শরীর চর্চামূলক, গঠনমূলক, শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক হতে হবে।

    সুতরাং উল্লিখিত শর্ত পরিপালন করে খেলাধুলা করতে বিধিনিষেধ নেই। তবে এসব শর্ত লংঘিত হলে কিংবা তার অংশবিশেষও ভঙ্গ করা হলে সে খেলা হারাম হয়ে যাবে যা কাম্য হওয়া উচিত নয়।

    (ঠ) সাংস্কৃতিক কর্মী/শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান : ইসলামী সংস্কৃতির গুরুত্ব এত বেশি যে, ইসলামী বিপ্লবের জন্য সাংস্কৃতিক বিপ্লব অপরিহার্য। কোনো জনপদে যদি কখনও জনমতের কারণে ইসলাম বিজয় লাভ করে আর সেখানে যদি পূর্ব থেকে সাংস্কৃতিক চর্চা না থাকে তবে সে জনপদে ইসলাম বিজয়ী হিসেবে বেশিদিন টেকসই হবে না। কারণ সংস্কৃতি মানুষের মনের লালিত স্বপ্নকে বিকশিত করে। আর বিকশিত যখন সঠিকভাবে হবে না তখন মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে বিপথে ধাবিত হবে। এজন্য কবি সাহিত্যিক ও শিল্পীরা হচ্ছেন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কারিগর। তারা হচ্ছেন সমাজদেহের চক্ষু এবং সভ্যতার বাগান। আর সমাজ পরিচালকরা হচ্ছেন সে বাগানের মালী। তারা যত বেশি এ বাগানের পরিচর্যা করবে সমাজে তত বেশি হৃদয়ের পুষ্প ফুটবে। যে জনগোষ্ঠী এ বাগানের পরিচর্যায় অমনোযোগী হবে তারা বঞ্চিত হবে মানবতার পুষ্প সৌরভ থেকে। সে একটি কল্যাণকর ইসলামী সমাজ যাদের কাম্য তাদের উচিত কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীদের উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা দান করা। এ পৃষ্ঠ-পোষকতা তারা যতবেশি দিতে পারবে ততই বৈচিত্র্যের বিকাশ ঘটবে। তাই শিল্পীদের সার্বিক সহায়তা দানের জন্য ব্যাপকভিত্তিক কিছু সৃস্পষ্ট ও সুষম পরিকল্পনা দরকার যা নি¤েœ আলোচনা করা হলো:

    ১. ইসলামী সংগঠনের উচিত তাদের পরিকল্পনায় সাংস্কৃতিক বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া।

    ২. সাংগঠনিক সকল কার্যক্রমে বেশি বেশি সাংস্কৃতিক চর্চা করা।

    ৩. সাংস্কৃতিক বিষয়ে জনমত সৃষ্টি করা।

    ৪. সাংগঠনিক প্রতিটি স্তরে পৃথক সাংস্কৃতিক বিভাগ চালু করা।

    ৫. সাংস্কৃতিক বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা।

    ৬. অসহায় শিল্পীদের আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখা।

    ৭. তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা।

    ৮. সাংস্কৃতিক চর্চা ও গবেষণার জন্য উপযুক্ত পরিবেশের ব্যবস্থা করা।

    ৯. বছরে একবার সারা দেশের সাংস্কৃতিমনা শিল্পীদের নিয়ে সম্মিলন বা পারস্পরিক মত বিনিময়ের ব্যবস্থা করা।

    ১০. বছরের শুরুতে এ খাতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা।

    ১১. এ খাতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এগিয়ে আসার জন্য ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করণ ও আগ্রহ সৃষ্টি করা।

    ১২. এ খাতকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার জন্য জনমত গঠন এবং প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা করা।

    পৃথিবীর প্রতিটি মানস পরিবর্তনে এ সত্যটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, মুখ্যত পরিবর্তন ঘটিয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিন্তু তার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে সংস্কৃতি কর্মীরা। সাংস্কৃতিক কর্মীরা হচ্ছে যুগের মুয়াজ্জিন আর রাজনৈতিক নেতা হচ্ছেন ইমাম। তাই আধুনিক যুগে ইসলামী বিপ্লব সাধনের জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক কর্মীদের ময়দানে নামাতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত লাব্বাইক লাব্বাইক বলে ঘর থেকে ছুটে আসবে না জনগণ। জনগণ কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়াবে না কোনো নেতার পিছনে ইসলামী বিপ্লব সাধনের জন্য এ জন্যই সাংস্কৃতিক কর্মীদের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে ব্যাপকভাবে ইসলামী বিপ্লবের উপযোগী পরিবেশ ও জনমত সৃষ্টির জন্য ময়দানে নামানো আজ সময়ের দাবি।

    সাংস্কৃতিক বিষয়টি মুসলমানদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, এ জন্য প্রতিটি সচেতন মুসলমানের উচিত নিয়মিত সাংস্কৃতিক তৎপরতা বৃদ্ধি ব্যাপারে উৎসাহী ভূমিকা পালন করা। এ ভূমিকা অব্যাহত না থাকলে অপসংস্কৃতি ইসলামী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করবে। এ ধ্বংস মুসলমান তো দূরের কথা ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতাও কর্মীর কাছে সুস্পষ্ট নয়। তাই এ জন্য ইসলামী আন্দোলনে সংস্কৃতির চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতা না করলে তা জাতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ও ক্ষতি ডেকে আনবে। এই ভয়াবহ ক্ষতির থেকে মুক্তির জন্য ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ, প্রচার, প্রসার করা সময় ও ঈমানের দাবি।

    লেখক : কলামিস্ট ও ব্যাংকার

    রফিকুল ইসলাম

  • ফসলি জমির মাটি কাটা বন্ধ করুন

    ফসলি জমির মাটি কাটা বন্ধ করুন

    অবৈধভাবে ফসলি জমির মাটি কাটা একটি দেশের জন্য চরম ক্ষতিকর। জমির মাটি কাটার ফলে একদিকে যেমন গভীর খাদ ও গর্তের সৃষ্টি করে, তেমনি অপরদিকে চাষযোগ্য জমিগুলোর হ্রাস ঘটে। দিনদিন চাষযোগ্য জমি হ্রাস পেতে থাকলে খাদ্যের সংকট বেড়ে যাবে। চাষাবাদের জন্য মাটির উপরিভাগ হল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা ‘টপ সয়েল’ নামে পরিচিত। এটা নষ্ট হয় কেবল মাটি খননের ফলে। এই স্তরটি পুনরায় গঠিত হতে প্রায় ২০-২৫ বছর সময় লাগে। সুতরাং মাটি খনন অত্যন্ত ক্ষতিকর। অপরদিকে মাটির স্তরের ভারসাম্যও দূর্বল হতে শুরু করে। এভাবে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি হতে থাকে। অবৈধ মাটি খননকারীরা দেশের গঠন-কাঠামোর ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাছাড়া এ কাজে বাধা দিতে আসলে স্থানীয়দের পড়তে হয় হুমকির মুখে। অতএব, অবৈধ মাটি কাটা সিন্ডিকেট প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।

  • মামদানির বিজয়: গাজায় নীরবতার বিরুদ্ধে সত্যের জয়

    মামদানির বিজয়: গাজায় নীরবতার বিরুদ্ধে সত্যের জয়

    নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় লিখেছে। এই জয় কেবল একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং ‘গাজায় নীরবতার উপর সত্যের বিজয়’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

    ইসরাইলি নীতির সমালোচনা করায় তাকে ইহুদি-বিরোধী বলে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। ভোটাররা বুঝেছেন, গাজার গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কোনো বিদ্বেষ নয়, বরং ন্যায়বিচারের আহ্বান। মামদানি বলেছেন, “ন্যায়বিচার কখনো নির্বাচনী হতে পারে না।”

    এর বিপরীতে, তার প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ড্রু কুওমো ইসরাইলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখিয়েছেন। এমনকি তিনি বলেছেন, যদি গণহত্যার অভিযোগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে বিচার করা হয়, তবে তিনি তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবেন। তার এই অবস্থান যে নৈতিক অন্ধত্বকে প্রকাশ করছে, নাগরিকরা তা বুঝতে পেরেছেন।

    হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক জিয়াদ মোতালা আল জাজিরায় এক মন্তব্যে বলেন, “মামদানিকে বেছে নিয়ে ভোটাররা, দাতাদের আনুগত্যের উপর জনস্বার্থ এবং গাজায় নীরবতার উপর সত্যকে সমর্থন করেছেন।”

    মামদানি তার প্রচারণায় সাহসিকতার সঙ্গে প্রচলিত রাজনীতির দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছেন। তিনি শহরের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মৌলিক প্রশ্নগুলোর সমাধান দিতে চেয়েছেন। কে এই শহরে টিকে থাকতে পারবে? এই প্রশ্নের জবাবে তার নীতিনিষ্ঠ স্পষ্টতা ফুটে উঠেছে। তিনি জনসাধারণের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, ভাড়াটেদের অধিকার, সর্বজনীন শিশু যত্ন ও বিনামূল্যে গণপরিবহন পাশাপাশি, ধনীদের ন্যায্য কর প্রদানের প্রতিশ্রুতি ও জনস্বার্থে মুদি দোকানের সরকারি মালিকানা প্রস্তাব করেছেন।

    মামদানির বিরোধীরা তাকে ‘সমাজতান্ত্রিক’ বলে আক্রমণ করলেও, ভোটাররা এই পুরনো ভয় দেখানোর কৌশল প্রত্যাখ্যান করেছেন। মামদানি ট্রাম্পের মতো বিভাজনের রাজনীতির নয়, বরং জনসাধারণের কল্যাণকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

    নিউইয়র্কের তরুণ ভোটাররা এবার একটু অন্যরকম ছিলেন। তারা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে গাজার বাস্তব চিত্র দেখেছেন। আর তাই ‘ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতন্ত্র’ এই তত্ত্বকে তারা গ্রহণ করেননি। এমনকি অনেকেই প্রকাশ্যে ইসরাইলকে ‘বর্ণবাদী রাষ্ট্র’ বলতেও ভয় পাননি।

    অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের নীরবতাও ভোটারদেরকে চরম হতাশ করেছে। সিনেটর চাক শুমার ও প্রতিনিধি হাকিম জেফ্রিস শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের সমর্থন দেননি। বিশ্লেষকদের মতে, তাদের এই দ্বিধা-দ্বন্দ ‍ছিল দাতা শ্রেণীর প্রতি নির্ভরতার প্রতিফলন।

    জোহরান মামদানির বিজয় আজ এক প্রজন্মের ক্ষোভ ও আশার প্রতীক। তরুণরা আর ‘ব্যবস্থা অসম্পূর্ণ হলেও মেনে নিতে হবে’ এই তত্ত্বে বিশ্বাসী নয়। তারা এমন রাজনীতি চায় যা সত্য বলে এবং তার ওপর কাজ করে।

  • এত এত বৈঠকের পরও হয়নি ঐকমত্য, আলোচনা কি গড়াবে মাঠেই?

    এত এত বৈঠকের পরও হয়নি ঐকমত্য, আলোচনা কি গড়াবে মাঠেই?

    Despite repeated meetings and discussions, differences of opinion remain between the parties on some fundamental issues of reform.

    Even some religiously-based political parties have now called for simultaneous programs on the streets to address the issue of implementation.

    Finally, the commission’s term is being extended again.

    So is the issue now on the negotiating table or on the streets? Where is the solution?

    Tanha Tasnim’s report…