বিয়ের পর স্বামীর সংসারে এসে অভাব-অনটনে দিন কাটছিল জোৎস্না রায়ের। স্বামী উত্তম রায় অন্যের জমিতে কৃষি শ্রমিকের কাজ করেন। বাড়তি আয়ের জন্য জোৎস্না অন্যের বাড়িতে কাজ করতে থাকেন। তবুও সংসারে অভাব যাচ্ছিল না। বছর সাতেক আগে বাড়ির পাশে পুকুরে মাছ ও পাড়ঘেঁষে সবজি চাষ শুরু করেন। পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে এসব মাছ-সবজি বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করেন তিনি। এর মাধ্যমে তার সংসারে সচ্ছলতা এসেছে।
সাতবিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা আটটি পুকুরে মাছ চাষের সঙ্গে করা হয়েছে মৌসুমভিত্তিক শাকসবজির চাষ। সমন্বিত-এই পদ্ধতিতে সারা বছর মাছ-সবজি চাষ করে জোৎস্না রায়ের ভাগ্য ফিরেছে। এখন তিনি এই খামারে মাছ ও সবজি চাষ করেন। উত্তম রায় স্থানীয় বাজার ও আড়তে ঘেরের উৎপাদিত মাছ-সবজি বিক্রি করেন।
খুলনার দাকোপ উপজেলার তিলডাঙা গ্রামের এই দম্পতি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ২০ শতাংশ জমিতে তারা মাছ ও সবজি চাষ শুরু করেছিলেন। এখন তারা ২৩১.৪ শতাংশ জমির মালিক। রয়েছে চারটি গাভী ও দুটি বাছুর। তাদের সাফল্যে অন্যরাও সমন্বিত-এই পদ্ধতিতে মাছ ও সবজি চাষে আগ্রহী হয়েছেন। ওই গ্রামের অন্তত ৮-১০ জন এই পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে পরিবারে সচ্ছলতা এনেছে। উপজেলা মৎস্য দপ্তর থেকে তাদের মাছের পোনা-খাদ্য ও সবজি চাষের সার-বীজ প্রণোদনাসহ চাষাবাদে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।জোৎস্না রায় জানান, ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হওয়ার পর স্বামীর সংসারে এসে অভাব-অনটনে দিন কাটছিল। পারিবারিক কাজের ফাঁকে হঠাৎ একদিন বাড়ির পাশে অনুষ্ঠিত একই জমিতে মাছের সঙ্গে সবজি চাষের ওপর প্রশিক্ষণে অংশ নেন। ওই প্রশিক্ষণের ধারণা থেকে স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে স্বল্প পরিসরে মাছ ও সবজি চাষ শুরু করেন। পরে প্রশিক্ষণ দেওয়া ওই বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাঠকর্মী একদিন তার খামার দেখতে আসেন। তাদের কাছ থেকে সবজি চাষের পরামর্শও পান। ওই সংস্থার কর্মীরাই সবজি বীজ দেন। আর নিজ উদ্যোগে পুকুরে পোনামাছ ছাড়েন।
ঘেরের আইলে সবজির ক্ষেত পরিচর্যার ফাঁকে ফাঁকে জোৎস্না জানান, প্রথমে অল্প জমিতে মাছের সঙ্গে লাউ ও মিষ্টিকুমড়া চাষ করেন। পরে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, ঝিঙে, মরিচ, পেঁপে, ঢ্যাঁড়সসহ নানা শাকসবজি চাষ করতে থাকেন। গত বছর ঘেরের আইলে তরমুজের আবাদও করছেন তিনি। এখান থেকে প্রতিবছর তার প্রায় ১০-১২ লাখ টাকা আয় হচ্ছে। ঘেরে সংরক্ষণ করা মিঠা পানিতে কার্প জাতীয় মাছ ও জৈব সার ব্যবহার করে বিষমুক্ত সবজি ফলাচ্ছেন তিনি।
উত্তম রায় জানান, সবজির ক্ষেত পরিচর্যা এবং ঘেরে মাছের খাবার দেওয়ায় স্ত্রীকে সহায়তা করেন তিনি। প্রতিদিন সকালে ঘেরের টাটকা শাকসবজি বাজারে বিক্রি করতে যান। বাড়তি আয়ে সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। তারা এই কাজ করে জমিও কিনেছেন। পরিবারের দৈনন্দিন খরচসহ সন্তানদের পড়াশোনা করাচ্ছেন।
জানতে চাইলে দাকোপ উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুবকর সিদ্দিক কালবেলাকে বলেন, লবণাক্ততার কারণে এক সময় এ অঞ্চলে কার্প জাতীয় মাছসহ সবজি চাষ করা ছিল অনেকটাই প্রতিকূলতা। নিরলস শ্রমের মধ্যদিয়ে সেই প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে দাকোপের চাষিরা একই সঙ্গে মাছ ও সবজি চাষ করে সফল।
তিনি আরও জানান, পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা মেটানোর জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে মৎস্য চাষ প্রযুক্তিসেবা সম্প্রসারণ প্রকল্পের (৩য় পর্যায়) আওতায় উপজেলার ১০ চাষিকে এই প্রদর্শনী দেওয়া হয়। এর মধ্যে সাতজন নারীর অন্যতম জোৎস্না একজন সফলচাষি। মূলত এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে এ অঞ্চলের চাষিদের মাঝে আগ্রহ সৃষ্টি করে পারিবারিক সচ্ছলতা ফিরে আনাই হলো লক্ষ্য।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
