বেঁধে রাখা বাবাকে শিশু মেয়ের খাওয়ানোর ভিডিও ভাইরাল, পাশে দাঁড়াল প্রশাসন

বিডি গ্লোবাল ডেস্ক,

বাবার দুই হাত-পা বাঁধা। চারপাশে মানুষের ভিড়। কেউ কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছেন, কেউ মোবাইলফোনে ভিডিও করছেন। এর মধ্যেই ভিড় ঠেলে বাবার কাছে এগিয়ে যায় নয় বছরের তুবা আক্তার তারিন। হাতে রুটি ও চা। বাবার সামনে বসে চায়ে রুটি ভিজিয়ে এক লোকমা করে তার মুখে তুলে দেয়। কখনো খাবারে ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করে, কখনোবা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। চারপাশে যতো মানুষই থাকুক, সেই মুহূর্তে তুবার কাছে মানুষটি শুধু বাবা।

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকার এ দৃশ্যের ভিডিও গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সামনে আসে অনিক সরদারের পরিবারের দীর্ঘদিনের আর্থিক সঙ্কট, তার নেশায় জড়িয়ে পড়ার অতীত, চুরির অভিযোগ, স্থানীয় বিরোধ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষার কথা। কয়েক দিন আগেও যাকে ঘিরে নানা অভিযোগ ছিল, এখন তার বাড়িতে মানুষের আনাগোনা। কেউ খাবার নিয়ে যাচ্ছেন, কেউ আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন, আবার কেউ কাজের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিয়েছেন।

গত শনিবার রাতে বামরাইল এলাকার একটি বাড়িতে চুরির চেষ্টা করার অভিযোগে অনিককে স্থানীয় লোকজন আটক করেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। পরে তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। সে সময়ের ভিডিওতেই তুবাকে বাবার মুখে খাবার তুলে দিতে দেখা যায়।

তবে ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে রয়েছে ভিন্ন বক্তব্য। অনিকের পরিবারের দাবি, চুরির অভিযোগের সাথে তাদের পুরোনো জমি বিরোধের সম্পর্ক রয়েছে। তাদের অভিযোগ, সে বিরোধের জেরেই অনিককে আটক ও মারধর করা হয়েছে।

অনিকের স্ত্রী জান্নাতুল ফিরদাউস জানান, আয়াত খন্দকার, খাইরুল ইসলাম, আরিফ, হানিফ, সাকিব ও সাহিদসহ কয়েকজনের সাথে তাদের জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। তার দাবি, ওই বিরোধের কারণেই চুরির অভিযোগ তোলা হয়েছে।

তবে আয়াত খন্দকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, অনিকের বিরুদ্ধে এর আগেও চুরির অভিযোগ উঠেছিল ও এবার তাকে ধরে মারধর করা হয়েছে। তার দাবি, মেয়ের সামনে অনিককে মারধর করা হয়নি।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও অনিকের বিরুদ্ধে আগে চুরির অভিযোগ ওঠার কথা বলেছেন। কেউ কেউ তাকে নেশাগ্রস্ত বলেও দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অনিকের পরিবারও তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

অনিকের স্ত্রী জানান, তাদের দুই সন্তান—তুবা (৯) ও তুরিন ইসলাম তুনা (৩)। সংসারে নিয়মিত কোনো আয় নেই। অভাবের মধ্যেই সন্তানদের বড় করছেন তারা। এইচএসসি পাস করা জান্নাতুল ফিরদাউস প্রয়োজনে নিজেও কাজ করতে চান।

পরিবারের ভাষ্য, অনিকের বাবা একসময় সচ্ছল ছিলেন। অসুস্থ হওয়ার পর তার চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারের অনেক সম্পদ চলে যায়। একপর্যায়ে অনিক নেশায় জড়িয়ে পড়েন। পরিবারের দাবি, তার এ দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে স্থানীয় একটি মাদকচক্র। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান অনিক। তিনি বলেন, ‘আমি ভালোভাবে জীবনযাপন করতে চাই। কেউ যদি আয়-রোজগারের একটা পথ তৈরি করে দেন, আমি নিজেকে বদলে ফেলব।’

দু’মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে হলেও কাজ করে বাঁচতে চান তিনি। সন্তানদের মানুষ করতে চান।

ভাইরাল ভিডিওটি শুধু মানুষের আবেগ নাড়া দেয়নি, পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগও তৈরি করেছে। ভিডিওটি দেখে বিষয়টি যাচাই করতে ওয়েব ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বরিশাল টিমকে জানানো হয়। পরে সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবকেরা তুবার সাথে দেখা করেন।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তুবা বাবার জন্য একটি কাজের ব্যবস্থা করে দেয়ার অনুরোধ করেছে। গ্রামাঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় অনিক একটি ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান চেয়েছেন। তাকে একটি অটোভ্যান কিনে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি তুবার লেখাপড়ার দায়িত্ব নেয়ারও উদ্যোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে উজিরপুর থানার সাথেও কথা বলা হয়েছে। এসআই (তদন্ত) ফারুক বিষয়টি দেখার ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

উজিরপুর থানার ওসি মো: রাকিবুল ইসলাম জানান, ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে অনিকের স্বজনদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।

রোববার সকালে অনিকের পরিবারের খোঁজ নিতে বাড়িতে যান উজিরপুরের ইউএনও মো: আলী সুজা। তিনি বলেন, ‘বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসার দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অনিক স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইলে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে প্রশাসন।’

পরে ইউএনওর মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে তুবার পরিবারের সাথে দেখা করেন বরিশাল জেলার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এসআই মো: জসীম উদ্দীন। পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে তাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন তিনি।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, অনিকের নেশায় জড়িয়ে পড়ার অতীত ও পরিবারের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে সহযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।

তুবার পরিবারের সদস্যরা বলছেন, অনিক যদি নেশা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসে নিয়মিত কাজের সাথে যুক্ত হতে পারেন, তাহলে সন্তানদের নিয়ে তাদের সংসারও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। এ,আর