পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কারাগারে থাকা ইমরানের মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের ইসলামাবাদমুখী লংমার্চের কর্মসূচি শেষ মুহূর্তে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে পিছিয়ে ৪ অক্টোবর করা হয়েছে। এর আগে ইমরানের তিন বোন—আলিমা খান, উজমা খান ও নোরিন নিয়াজিকে আটক করা হয়। একই সময়ে ইসলামাবাদে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা, সড়ক অবরোধ এবং পিটিআই নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনা রাজনৈতিক উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে।
ইমরান খান ২০২৩ সাল থেকে কারাগারে রয়েছেন এবং বিভিন্ন মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে আদিয়ালা কারাগারে আটক আছেন। তার দল ও পরিবার দীর্ঘদিন ধরে তার মুক্তি, উন্নত চিকিৎসা এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ দাবি করে আসছে। সরকার অবশ্য ইমরানের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, একাকী বন্দিত্ব বা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় আগস্টে জানিয়েছিল, ইমরান একজন দণ্ডিত বন্দি হিসেবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন এবং তার সঙ্গে পরিবার, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের বহুবার সাক্ষাৎ হয়েছে।
ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে বিরোধের সর্বশেষ বড় ঘটনা ঘটে আগস্টে। তার পরিবারের পক্ষ থেকে চোখের সমস্যাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ জানানো হলে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ১৮ আগস্ট তাকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া, ব্যক্তিগত চিকিৎসককে চিকিৎসায় যুক্ত করা, নিয়মিত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং দুই ছেলে সুলায়মান ও কাসিমের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। আদালত একটি বহুবিষয়ক চিকিৎসক বোর্ডের মাধ্যমে পরীক্ষা করার কথাও বলে।
তবে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন বিরোধ তৈরি হয়। পাকিস্তান সরকার ইমরানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে না নিয়ে ইসলামাবাদের সরকারি পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিআইএমএস) রাতে চিকিৎসা পরীক্ষা করিয়ে পরদিন ভোরে আবার আদিয়ালা কারাগারে ফেরত পাঠায়। সরকারের বক্তব্য ছিল, নিরাপত্তাজনিত কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরে সরকারি কর্মকর্তারা জানান, চিকিৎসকেরা তাকে পরীক্ষা করে কারাগারে ফেরত পাঠানোর উপযোগী বলে মত দিয়েছেন।
এরই মধ্যে ইমরানের পরিবার ও পিটিআই অভিযোগ করে আসছিল, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের সুযোগ পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট আদিয়ালা কারা কর্তৃপক্ষকে ইমরান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে একাকী বন্দিত্বে না রাখার নির্দেশ দেয়। আদালত পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং ইমরানের ছেলেদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের ব্যবস্থাও করতে বলে।
আগস্টে অবশ্য দীর্ঘ বিরতির পর ইমরান তার বোন নোরিন এবং স্ত্রী বুশরা বিবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবার তার বোনদের সাক্ষাৎ আটকে দেওয়া হয় বলে পরিবার ও পিটিআই অভিযোগ করে। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইমরানের বোনেরা আবারও তাকে দেখতে পারেননি।
ইমরানকে ঘিরে সর্বশেষ বড় উত্তেজনা তৈরি হয় পিটিআইয়ের ইসলামাবাদমুখী লংমার্চকে কেন্দ্র করে। দলটি ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদে বড় ধরনের সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছিল। মূল দাবি ছিল ইমরান খানের মুক্তি। এর আগে সরকার রাজধানীর প্রবেশপথে কনটেইনার বসানো, নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন এবং বিভিন্ন সড়কে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। ইসলামাবাদে অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল এবং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে শত শত পিটিআই কর্মীকে আটক করা হয়।
ইসলামাবাদ হাইকোর্টও পিটিআইয়ের প্রস্তাবিত দীর্ঘমার্চ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। আদালত বলেছে, কোনো রাজনৈতিক দল, নেতা বা প্রাদেশিক সরকার এমনভাবে রাজধানীর সড়ক, মহাসড়ক বা প্রবেশপথ দখল করতে পারে না, যাতে সাধারণ মানুষের চলাচল, চিকিৎসা বা শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।
এই উত্তেজনার মধ্যেই ইমরানের তিন বোনকে আটক করা হয়। প্রথমে আলিমা খানকে লাহোরে আটক করা হয়। এরপর উজমা খান ও নোরিন নিয়াজিকেও আটক করে কর্তৃপক্ষ। তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ‘মেইনটেন্যান্স অব পাবলিক অর্ডার’ আইনের অধীনে ৩০ দিনের আটকাদেশ দেওয়া হয়। পিটিআই ও তাদের আইনজীবীরা আটককে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে আবেদন করেন। লাহোর হাইকোর্ট তাৎক্ষণিকভাবে আটকাদেশ স্থগিত না করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছে।
ইমরানের বোনদের গ্রেপ্তারকে পিটিআই তাদের নেতার ওপর চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার ও নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের অবস্থান হলো, ইসলামাবাদে বড় ধরনের বিক্ষোভের কারণে আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।
২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। পিটিআই ২৫ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করে, ইসলামাবাদমুখী দীর্ঘমার্চ ৪ অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী ও পিটিআই নেতা সোহাইল আফ্রিদি জানান, নতুন নির্ধারিত তারিখে পেশোয়ার থেকে দীর্ঘমার্চ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে রাজধানীমুখী দীর্ঘমার্চের বিরোধিতা অব্যাহত রয়েছে।
মার্চ পিছিয়ে দেওয়ার আগে পিটিআই ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে পর্দার আড়ালে একাধিক যোগাযোগের খবরও এসেছে। গত চার-পাঁচ সপ্তাহে দুই পক্ষের মধ্যে অর্ধডজনের বেশি ব্যাকচ্যানেল বৈঠক হয়েছে। সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয় হিসেবে পিটিআইয়ের কর্মসূচি প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। এসব তথ্য অবশ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয়েছে।
এর আগে আলোচনায় ইমরানের চিকিৎসা ও তার স্ত্রী বুশরা বিবির অবস্থান নিয়েও সম্ভাব্য ছাড়ের কথা উঠেছিল। তবে পিটিআই ও সরকারের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি বড় বাধা হয়ে আছে।
ইমরানের ছেলে কাসিম খানও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির আগে তিনি সমর্থকদের আদিয়ালা কারাগারের কাছে না যাওয়ার আহ্বান জানান। তার আশঙ্কা ছিল, কারাগারের কাছে বড় জমায়েত হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে এবং তার বাবার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইমরান খান নিজে কারাগারে থাকলেও তাকে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত থামেনি। বরং তার স্বাস্থ্য, কারাগারে সুযোগ-সুবিধা, পরিবারের সাক্ষাৎ, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং পিটিআইয়ের রাজনৈতিক কর্মসূচি—সবগুলো বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে।
এখন পিটিআইয়ের সামনে নতুন তারিখ ৪ অক্টোবর। ওই কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত কীভাবে পরিচালিত হবে, সরকার রাজধানীতে কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেবে এবং ইমরানের পরিবার ও দলের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার পথ তৈরি হয় কি না—এসবই আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইমরান খান এখনো আদিয়ালা কারাগারেই আছেন এবং তার মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের আন্দোলনও অব্যাহত রয়েছে।
