ধর্ম ও ইসলাম

  • শিশুর প্রতিপালনে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা

    শিশুর প্রতিপালনে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা

    ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে শিশুকে শুধু পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে মা-বাবার কাছে অর্পিত এক পবিত্র আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কোরআনে সন্তানকে পিতা-মাতার জন্য দুনিয়ার শোভা ও পরীক্ষা—উভয়ভাবেই আখ্যায়িত করা হয়েছে। ফলে শিশুর শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক বিকাশের দায়িত্ব শুধু আবেগের বিষয় নয়; বরং একটি ধর্মীয় দায়িত্বও। এই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন স্নেহ, ভালোবাসা, দয়া ও প্রজ্ঞাপূর্ণ শিক্ষা, আবার প্রয়োজন হলে সীমিত ও ন্যায়সংগত শাসনেরও অনুমতি ইসলাম দিয়েছে। এভাবে ইসলামের শিক্ষা একদিকে কোমলতা শেখায়, অন্যদিকে দায়িত্বশীল অভিভাবকত্বেরও দিকনির্দেশনা দেয়।

    মহানবী (সা.) ছিলেন শিশুদের প্রতি সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন, কোলে তুলে নিতেন, মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতেন, হাসিমুখে কথা বলতেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে আচরণ করতেন। পথ চলতে শিশুদের আগে সালাম দেওয়ার ঘটনাও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তিনি নিজের নাতি হাসান-হোসাইনকে চুম্বন করতে দেখে এক সাহাবি বিস্ময় প্রকাশ করলে বলেছিলেন, ‘যার অন্তরে দয়া নেই, তার প্রতিও দয়া দেখানো হয় না।’ এমনকি নামাজরত অবস্থায় নাতনি উম্মে কুলসুমকে কাঁধে নিয়ে সালাত আদায় করার ঘটনাও হাদিসে এসেছে, যা শিশুর প্রতি তার সহনশীলতা ও কোমলতার প্রমাণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (তিরমিজি : ১৯২১)শিশুরা স্বভাবগতভাবেই চঞ্চল ও কৌতূহলী। তারা ভুল করবে, শিখবে এবং ধীরে ধীরে পরিণত হবে—এটাই স্বাভাবিক বিকাশের ধারা। তাই প্রতিটি ভুলের জবাবে কঠোরতা নয়, বরং ধৈর্য, বোঝানো ও উৎসাহ দেওয়াই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা। ইসলামি চিন্তাবিদরা মনে করেন, শিশুর ভুলকে শাস্তির চোখে না দেখে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত, কারণ ভয়ের পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশু আত্মবিশ্বাসহীন ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে থাকে।

    তবে ইসলাম শাসনের প্রয়োজনীয়তাকেও অস্বীকার করে না। সন্তানকে দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সময়মতো শিক্ষা ও সংশোধন অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে নামাজ না পড়লে তাদের শাসন করো।’ (আবু দাউদ : ৪৯৫) এ হাদিসের উদ্দেশ্য কোনোভাবেই নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়া নয়; বরং দীর্ঘদিন শিক্ষা ও উৎসাহ দেওয়ার পরও প্রয়োজন হলে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

    ইসলামি বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, শাসনের ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া উচিত। প্রথমে নরম ভাষায় উপদেশ, এরপর মৃদু তিরস্কার, তারপর প্রয়োজন হলে কঠোর ভাষায় সতর্ক করা। এরপরও সংশোধন না হলে এমন শাসনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে যা কষ্টদায়ক বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিকর নয় এবং যার একমাত্র উদ্দেশ্য সংশোধন। মুখমণ্ডল বা দেহের সংবেদনশীল অংশে আঘাত করা, রাগের বশে প্রহার করা কিংবা প্রকাশ্যে অপমান করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফিকহবিদরা এমনকি শারীরিক শাস্তির ক্ষেত্রে আঘাতের মাত্রা, স্থান ও উদ্দেশ্য নিয়েও সুনির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করেছেন, যাতে তা প্রতিহিংসামূলক না হয়ে শিক্ষামূলক থাকে।

    পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশে শারীরিক শাস্তির বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন সংশোধনমূলক পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন—সাময়িকভাবে খেলাধুলার সুযোগ সীমিত রাখা, শ্রেণিকক্ষে কিছুক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা, অতিরিক্ত অনুশীলনের দায়িত্ব দেওয়া, প্রিয় বিষয় থেকে সাময়িক বিরত রাখা কিংবা শান্ত পরিবেশে বসিয়ে উপদেশমূলক আলোচনা করা। আধুনিক শিশু-মনোবিজ্ঞানও এসব পদ্ধতিকে কার্যকর বলে সমর্থন করে, কারণ এতে শিশুর আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে এবং একই সঙ্গে সংশোধনের সুযোগও সৃষ্টি হয়।

    সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর ওপর জুলুম করা মারাত্মক গুনাহ, কারণ এটি বান্দার হকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আল্লাহতায়ালা নিজের অধিকারের ব্যাপারে ক্ষমাশীল হলেও মানুষের হক নষ্ট করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রাপ্য আদায় বা ক্ষমা ছাড়া মুক্তি পাওয়া কঠিন। তাই অভিভাবক, শিক্ষক কিংবা দায়িত্বশীল যিনিই হোন না কেন, শিশুর প্রতি রাগ, প্রতিশোধ বা অপমানের মনোভাব থেকে কোনো আচরণ করা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং প্রতিটি সিদ্ধান্তের মূলে থাকতে হবে সন্তানের কল্যাণ ও সঠিক পথে পরিচালনার আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা।

    আজকের সমাজে শিশুদের মানসিক সুস্থতা, নৈতিক বিকাশ ও পারিবারিক বন্ধন নিশ্চিত করতে আমাদের প্রয়োজন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শে ফিরে যাওয়া। স্নেহ হবে শিক্ষার ভিত্তি, দয়া হবে সম্পর্কের সৌন্দর্য এবং শাসন হবে প্রজ্ঞা, সংযম ও সংশোধনের মাধ্যম—শাস্তি বা প্রতিশোধের হাতিয়ার নয়। এ ভারসাম্যই একটি শিশুকে আত্মবিশ্বাসী, নৈতিকতাসম্পন্ন ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে এবং তা পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

  • জুমার দিনের করণীয় কী? কোরআন-হাদিসে যা বলা হয়েছে

    জুমার দিনের করণীয় কী? কোরআন-হাদিসে যা বলা হয়েছে

    ইসলামে জুমার দিনকে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ ও বরকতময় দিন হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও জ্ঞানসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম পুরুষের জন্য জামাতের সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করা ফরজ। এদিন নামাজের প্রস্তুতি, মসজিদে আগে পৌঁছানো এবং খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

    পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ! যখন জুমার দিন নামাজের জন্য আহ্বান করা হবে, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। এটিই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।” (সুরা আল-জুমু’আ: ৯)

    হাদিসে জুমার দিনের বেশ কিছু সুন্নত আমলের কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গোসল করা, মিসওয়াক করা, পরিষ্কার ও সুন্দর পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার করা এবং যথাসম্ভব আগে মসজিদে উপস্থিত হওয়া। মসজিদে প্রবেশের পর দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায়, সামনের কাতারে বসার চেষ্টা এবং ইমাম খুতবা শুরু করলে সম্পূর্ণ নীরব থেকে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা সুন্নত।

    আলেমরা বলেন, খুতবা চলাকালে কথা বলা, মোবাইল ফোন ব্যবহার করা কিংবা অন্যকে বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কেউ খুতবার সময় মসজিদে প্রবেশ করলে সংক্ষেপে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করে খুতবা শুনতে বসে পড়বে।

    জুমার নামাজ শেষে করণীয় সম্পর্কেও কোরআনে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর নামাজ শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অনুসন্ধান কর। আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হও।’ (সুরা আল-জুমু’আ: ১০)রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমার নামাজ অবহেলার বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, বিনা কারণে ধারাবাহিকভাবে তিনটি জুমা ত্যাগকারীর অন্তরে আল্লাহ মোহর মেরে দেন এবং সে গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

    ইসলামি শিক্ষায় জুমার দিনকে সাপ্তাহিক ঈদের দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাই এ দিনের সুন্নত আমলগুলো যথাযথভাবে পালন, সময়মতো মসজিদে উপস্থিত হওয়া এবং একাগ্রতার সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।

  • মেসওয়াকের তাৎপর্য ও ফজিলত

    মেসওয়াকের তাৎপর্য ও ফজিলত

    বহু টুথপেস্টে অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যা দাঁত পরিষ্কার ও পলিশ করার কাজে ব্যবহার করা হয়। সম্প্রতি পরিবেশবাদী সংস্থা Environment and Social Development Organization (ESDO) পরিচালিত এক গবেষণায় ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ টুথপেস্টে এই প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি ধরা পড়েছে। এই সংবাদ দেশজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কোনটা রেখে কোন টুথপেস্ট ব্যবহার করবেন জনমনে সেই প্রশ্ন। অথচ আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগেই আমাদের প্রিয়নবী (সা.) মেসওয়াকের মতো একটি চমৎকার সুন্নত শিখিয়ে গেছেন। মেসওয়াক শুধু দাঁত এবং মুখ পরিষ্কারের মাধ্যম নয়; বরং তাতে রয়েছে বহু উপকারিতা। একজন ঈমানদার সেই উপকারগুলো অর্জন করেন নিয়মিত মেসওয়াক করার মাধ্যমে।

    হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের জন্য যদি কষ্টকর মনে না করতাম, তবে তাদের প্রত্যেক নামাজের সময় মেসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।’ (নাসায়ি : ৭) এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, মেসওয়াক একটি সুন্নত হলেও এই সুন্নত আমলটি মূলত ফরজ এবং ওয়াজিব হওয়ার মতো একটি আমল। রাসুল (সা.) শুধু আমাদের দিক বিবেচনা করে তা ফরজ এবং ওয়াজিব হওয়ার নির্দেশ জারি করেননি।মেসওয়াক করার মাধ্যমে অগণিত উপকার লাভ করা যায়। যার মধ্য থেকে কিছু উপকারিতা নিম্নে উল্লেখ করা হলো—

    এক. মেসওয়াক করলে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি হাসিল হয়।

    দুই. মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়, দাঁত মজবুত হয়।

    তিন. মাথার ব্যথা উপশম হয়, কাশি দূর হয়, পাকস্থলী ঠিক থাকে এবং শরীর শক্তিশালী হয়।

    চার. দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পায়, স্মরণশক্তি ও জ্ঞান বাড়ে।

    পাঁচ. অন্তর পবিত্র হয়, সৌন্দর্য বাড়ে।

    ছয়. ফেরেশতারা তার সঙ্গে মুসাফাহা করেন, নামাজের জন্য বের হলে তাকে সম্মান করেন, নামাজ আদায় করে বের হলে আরশ বহনকারী ফেরেশতারা তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন।

    সাত. শয়তান অসন্তুষ্ট হয়, বিজলির মতো পুলসিরাত পার হবে, আমলনামা ডান হাতে পাবে।

    আট. ইবাদতে শক্তি পাবে, মৃত্যুর সময় কালিমা নসিব হবে, তার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হবে, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং পূত-পবিত্র হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে। (মারাকিউল ফালাহ : পৃষ্ঠা : ৫৪)

    এসব ছাড়াও হাদিস শরিফে মেসওয়াকের আরো বহু ফজিলত রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসাবিদরা এ সুন্নাহ থেকে বেশ কিছু তথ্য বের করেছেন। সাধারণত দাঁতের ভয়ংকর কয়েকটি রোগ হয়ে থাকে যেমন : জিঞ্জিভাইটিস (Gingivitis), এ রোগ হলে দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত পড়তে থাকে এবং দাঁতে পচন ধরে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। কেরিস টিথ, এ রোগ হলে দাঁতের ক্ষয় শুরু হয়। পাইয়োরিয়া (Pyorrhoea) এতে দাঁতের মাড়ি ফুলে যায়, রক্ত ঝরে। শুধু মেসওয়াক এই রোগগুলো দূর করতে সক্ষম হয়।

    গাছের ডাল দ্বারা মেসওয়াক করা সুন্নাহ, ব্রাশ দ্বারা নয়। দেখা যায়, পায়োরিয়া হলে দাঁতের মাড়ি ফুলে যায়, তখন ডাক্তাররা পরামর্শ দিয়ে থাকেন, মাড়িতে শক্ত কিছু দিয়ে হালকা হালকা করে চাপ দেওয়ার জন্য। মেসওয়াক এই ক্ষেত্রে অনেক সহায়তা করে, যা ব্রাশে হয় না। তাছাড়া মেসওয়াকের চাপটা একটু শক্ত হওয়ায় দাঁত পরিষ্কার বেশি হয়। তাই আসুন আমরা বেশি বেশি মেসওয়াক করে রাসুলের এ সুন্নাহকে জীবিত করি।

  • সৌদি আরবে চালু হলো নওমুসলিম কার্ড

    সৌদি আরবে চালু হলো নওমুসলিম কার্ড

    সৌদি আরব এবার ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য নওমুসলিম কার্ড সেবা চালু করেছে। ইসলাম, দাওয়াহ ও নির্দেশনা মন্ত্রণালয় কর্তৃক চালু করা এই সেবার মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে এবং সবগুলো ধাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হবে।

    ইসলাম, দাওয়াহ ও নির্দেশনা মন্ত্রী শায়খ ড. আবদুল লতিফ আল শায়খ মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ‘নবমুসলিম’ কার্ড সেবা চালু করেন। তিনি বলেন, সরকারি সেবাগুলোকে আরও ডিজিটাল করার প্রচষ্টোর অংশ হিসেবে এ সেবা চালু করা হলো।

    কার্ডটি তাওয়াক্কালনা (Tawakkalna) অ্যাপের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। আবেদন অনুমোদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কার্ডটি অ্যাপে দেখা যাবে। সোদি ডেটা অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অথরিটি (SDAIA)-এর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা সহজেই কার্ডটি দেখতে ও এর সত্যতা যাচাই করতে পারবেন।

    কার্ডে একটি কিউআর কোডও থাকবে। যার মাধ্যমে কার্ডের সত্যতা নিশ্চিত করা যাবে এবং এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্যু করেছে কি না, তা যাচাই করা যাবে।

    এই উদ্যোগের মাধ্যমে তথ্যের মানও উন্নত হবে এবং পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত সদ্ধিান্ত গ্রহণে সহায়তার জন্য আরো নির্ভুল প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান তৈরি করা সম্ভব হবে।

  • হজের প্রাথমিক নিবন্ধন শুরু

    হজের প্রাথমিক নিবন্ধন শুরু

    আজ ২৭ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে ২০২৭ সালের হজের প্রাথমিক নিবন্ধন। ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে এ নিবন্ধন কার্যক্রম। এ সময়ের মধ্যে আগামী বছর হজে গমনেচ্ছুদের প্রাথমিক নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। তবে প্রাথমিক নিবন্ধনের আগে করতে হবে প্রাক-নিবন্ধন। আর এ বছরই ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।

    সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ঘোষিত হজ কার্যক্রমের রোডম্যাপ অনুযায়ী এই সময়সূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।সাড়ে তিন লাখ টাকা জমা দিয়ে সরকারি ও বেসরকারি যেকোনো মাধ্যমে হজের প্রাথমিক নিবন্ধন করা যাবে। প্রাথমিক নিবন্ধিতদের ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে প্যাকেজ মূল্যের অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধ করে চূড়ান্ত নিবন্ধন করতে হবে। প্রাথমিক নিবন্ধনের আগে হজযাত্রীদের আবশ্যিকভাবে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে প্রাক-নিবন্ধন করতে হবে।

    নিবন্ধন করা যাবে যেখানে

    সরকারি মাধ্যমে ই-হজ সিস্টেমে ইউজার তৈরি করে যে কেউ নিজেই নিবন্ধন করতে পারবে। এছাড়া ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়, জেলা ও উপজেলা মডেল মসজিদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মোকাররম অফিস ও ঢাকা হজ অফিসে হজের নিবন্ধন করা যাবে।

    সরকারি মাধ্যমে হজে গমনেচ্ছুদের সোনালী ব্যাংকের যেকোনো শাখায় ভাউচারের মাধ্যমে টাকা জমা দিয়ে প্রাথমিক নিবন্ধন করতে হবে। তবে, বেসরকারি মাধ্যমের হজযাত্রীদের হজ কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে এজেন্সির নির্ধারিত হিসাবে টাকা জমা দিতে হবে। এজেন্সির ব্যাংক হিসাবের তথ্য হজ পোর্টালে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির প্রোফাইলে পাওয়া যাবে।

    হজে যেতে পারবেন না যারা

    ১৫ বছরের কম বয়সি কেউ হজে যেতে পারবে না। এছাড়া দুরারোগ্য ব্যাধি যেমন-হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, লিভার বা কিডনি রোগ, স্নায়বিক বা মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ও ডিমেনশিয়া রোগী, কেমোথেরাপি বা বায়োলজিক্যাল থেরাপি বা রেডিওথেরাপি নিচ্ছেন এমন ক্যানসার আক্রান্ত রোগী হজে যেতে পারবেন না। এছাড়া জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে এমন সক্রিয় সংক্রামক রোগ যেমন-যক্ষ্মা ও হেমোরেজিক ফিভারে আক্রান্ত ব্যক্তি হজে যেতে পারবেন না। গর্ভাবস্থার শেষ দুই মাস ও ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থায় কোনো নারী হজযাত্রী ফিটনেস সনদ পাবেন না।

    প্রাথমিক নিবন্ধনের সময় হজযাত্রীদের আবশ্যিকভাবে প্রশিক্ষণ ও টিকা গ্রহণের জেলা, হজের ধরন ও হজ প্যাকেজ নির্বাচন করতে হবে। এছাড়া, ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ থাকা পাসপোর্ট প্রয়োজন হবে।

  • ৫০০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পদার্পণ করেন মুসলিমরা, জেনে নিন সেই ইতিহাস

    ৫০০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পদার্পণ করেন মুসলিমরা, জেনে নিন সেই ইতিহাস

    আমেরিকা বা যুক্তরাষ্ট্র প্রজাতন্ত্র হিসেবে গড়ে ওঠার অনেক আগেই দেশটির ইতিহাসের অংশ ছিলেন মুসলমানরা। ১৬০৭ সালে ইংরেজদের জেমিটাউন প্রতিষ্ঠা এবং ১৬২০ সালে পিলগ্রিমদের প্লাইমাউথে পৌঁছানোর কয়েক দশক আগেই ১৫২০ ও ১৫৩০-এর দশকে মরক্কোর এস্তেবান দে দোরান্তেস (এস্তেভানিকো নামে পরিচিত) বর্তমান টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো ও অ্যারিজোনার মরুভূমিতে পা রেখেছিলেন।

    মরক্কোর আটলান্টিক উপকূলের আজেমমুরে জন্মগ্রহণকারী এস্তেভানিকোকে দাস হিসেবে স্পেনে এবং পরে মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়। এক মর্মান্তিক অভিযানে অধিকাংশ মানুষ মারা গেলেও তিনি বেঁচে যান। তিনি বিভিন্ন নেটিভ আমেরিকান ভাষা শেখেন এবং ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল পাড়ি দেওয়া প্রথম প্রাচীন পৃথিবীর অধিবাসীদের একজন হয়ে ওঠেন। তার মরক্কোয় জন্ম ও জীবনীসংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ নিশ্চিত করে যে তিনি একজন মুসলিম ছিলেন।

    অধিকাংশ মুসলিম যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন ক্রীতদাস হিসেবে। তাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাম্বিয়ান ও সাহেলিয়ান অঞ্চলের, যেখানে শতাব্দী ধরে ইসলামিক চর্চা বিদ্যমান ছিল।

    ধারণামতে, তাদের সংখ্যা ছিল ১০ হাজারেরও বেশি। দাস হিসেবে বন্দি হওয়ার আগেই তাদের অনেকে আরবিতে শিক্ষিত এবং কোরআন ও ইসলামী আইনে দক্ষ ছিলেন। দাসত্ব করা ওমর ইবনে সাইদের আত্মজীবনীর মতো কিছু লিখিত রেকর্ডও রেখে গেছেন তারা।

    তাদের গভীর প্রভাব দেখা যায় আমেরিকান সংস্কৃতি ও সংগীতে। গবেষকদের মতে, আমেরিকার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ‘জ্যাজ’ সংগীতের বিকাশে মুসলিম আমেরিকানরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে শ্যিক্ষেতে কাজ করার সময় দাসদের গাওয়া ‘ফিল্ড হলার’ গান জনপ্রিয় আমেরিকান সংগীতের অন্যতম ভিত্তি ছিল।

    অনেক গবেষক এই গানের সুরের মূল খুঁজে পেয়েছেন পশ্চিম আফ্রিকার দাসদের মধ্যে, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা ইসলামি প্রার্থনার ঐতিহ্য ক্ষেতে বয়ে নিয়ে এসেছিলেন। ‘ফিল্ড হলার’, আজান ও কোরআন তিলাওয়াতের সুর ও ভঙ্গির মধ্যে স্পষ্ট মিল পাওয়া যায়। ১৬৪০-এর দশকে মিসিসিপির একটি কাজের গানের সঙ্গে আজানের সুরগত মিলের বিষয়টি ইতিহাসবিদেরা উল্লেখ করেছেন।

    পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও একজন আমেরিকান মুসলিম বড় ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৪ সালে হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন ক্যাসিয়াস ক্লে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে মুহাম্মদ আলি রাখেন। তিন বছর পর ভিয়েতনাম যুদ্ধে যোগ দিতে বলা হলে তিনি ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে তা প্রত্যাখ্যান করেন।

    এর জবাবে তার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের খেতাব কেড়ে নেওয়া হয়, রিংয়ে নামা নিষিদ্ধ করা হয় এবং পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। টানা তিন বছর (২৫ থেকে ২৮ বছর বয়স পর্যন্ত) এই সেরা বক্সারকে রিংয়ে লড়তে দেওয়া হয়নি।

    পরবর্তীকালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হন। ১৯৭১ সালে ‘ক্লে বনাম যুক্তরাষ্ট্র’ মামলায় বিচারকেরা সর্বসম্মতিক্রমে তার সাজা বাতিল করেন। আদালত স্বীকার করে যে, অলির এই সিদ্ধান্ত খাঁটি ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে ছিল। এই রায়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে আমেরিকার সাংবিধানিক ধর্মীয় সুরক্ষা কেবল খ্রিষ্টান বা ইহুদিদের জন্য নয়, বরং সব ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য।

    যুক্তরাষ্ট্র গঠনে মুসলমানদের তৃতীয় অবদান হলো তাদের নাগরিক সম্পৃক্ততা ও দানশীলতা। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম হলো জাকাত, যেখানে নিজের সঞ্চিত সম্পদের ২ দশমিক ৫ শতাংশ দরিদ্রদের দান করার নিয়ম রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে স্বেচ্ছায় দান বা সদকা।

    ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুসলিম ফিলানথ্রপি ইনিশিয়েটিভ’-এর গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ হলেও ২০২০ সালে আমেরিকান মুসলমানরা দানকার্যে প্রায় ৪৩০ কোটি ডলার (৪.৩ বিলিয়ন) দিয়েছেন। গড়ে প্রতি দাতা দান করেছেন প্রায় ৩ হাজার ২০০ ডলার, যা তাদের অমুসলিম প্রতিবেশীদের (১ হাজার ৯০০ ডলার) চেয়ে অনেক বেশি।

    এই অনুদানের প্রায় ৮৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই থাকে। এর বড় অংশ মসজিদ বা মুসলিম প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে দারিদ্র্যবিমোচন, কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যয় হয়। ২০২১ সালে প্রদত্ত প্রায় ১৮০ কোটি ডলারের জাকাতের বড় একটি অংশ আত্মীয় বা উপাসনালয়ের বদলে দাতব্য অলাভজনক সংস্থায় দেওয়া হয়েছে।

    যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের এই সময়ে জানা যায়, মুসলমানরা কেবল অতিথি নন, বরং দেশটির ইতিহাস গড়ার অন্যতম অংশীদার ছিলেন।

  • বিড়ি-সিগারেট বিক্রির আয় নিয়ে যা বললেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

    বিড়ি-সিগারেট বিক্রির আয় নিয়ে যা বললেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

    বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করে অর্জিত অর্থ ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল নাকি হারাম—এমন প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট ইসলামি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেছেন, ইসলাম যে বস্তু খাওয়া, পান করা বা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করেছে, সেই বস্তুর বেচাকেনাও বৈধ নয়।

    সম্প্রতি এক অনুসারীর প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি নিজে ধূমপান না করলেও বা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললেও কেবল এ কারণে বিড়ি-সিগারেট বিক্রির অর্থ হালাল হয়ে যায় না। তার ভাষায়, কেউ নামাজি, হাজি বা দাড়িওয়ালা হলেও যদি বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করেন, তাহলে ওই বিক্রি থেকে অর্জিত আয় বৈধ হবে না।

    তবে তিনি বিষয়টি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, একটি দোকানে যদি হালাল ও হারাম—উভয় ধরনের পণ্য বিক্রি করা হয়, তাহলে পুরো ব্যবসার আয় হারাম হয়ে যায় না। যে পণ্য ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ, সেগুলোর বিক্রি থেকে অর্জিত লাভ হালাল থাকবে। আর যে পণ্যের বেচাকেনা বৈধ নয়, কেবল সেই অংশের আয়ই হারাম হিসেবে গণ্য হবে।

    উদাহরণ দিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, চাল, ডাল বা অন্যান্য বৈধ পণ্য বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ হালাল। তবে প্রতারণা বা ভেজাল মিশিয়ে বিক্রি করলে সেই উপার্জনও বৈধ থাকবে না।

    তিনি বলেন, দেশি ডালের সঙ্গে নিম্নমানের অন্য ডাল মিশিয়ে বিক্রি করা প্রতারণার শামিল। এ ধরনের ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থও ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নয়।

    শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, ইসলামে শুধু পণ্যের বৈধতা নয়, ব্যবসায় সততা ও সঠিক পদ্ধতি অনুসরণও হালাল উপার্জনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

  • খন্দকের যুদ্ধে নেপথ্য নায়ক নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.)

    খন্দকের যুদ্ধে নেপথ্য নায়ক নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.)

    ইতিহাসের পালাবদল কিংবা ভাগ্য-পরিবর্তনকারী প্রত্যেকটি প্রেক্ষাপটে কিছু মহামানবের গল্প থাকে, যারা বরাবরই অপঠিত থেকে যান। ঘটনাগুলো সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল থাকলেও সেই মহান ব্যক্তিদের সম্পর্কে খুব কমসংখ্যক মানুষই অবগত থাকে। তেমনই একজন ব্যক্তির নাম নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.)।

    হিজরি পঞ্চম সাল। খন্দকের যুদ্ধ (Battle of the Trench) শুরু হয়ে গেছে। মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে গাতফান এবং তাদের মিত্র আরব গোত্রগুলোর পাশাপাশি বনু নাজিরের ইহুদিরা সম্মিলিতভাবে মদিনা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে বনু নাজিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাবের চক্রান্তে মদিনার অভ্যন্তরে বসবাসকারী বনু কুরাইজাও মুশরিকদের মিত্রশক্তিতে পরিণত হয়। বনু কুরাইজা মদিনার অভ্যন্তরে অবস্থান করায় এবং মদিনা সনদ অনুযায়ী মুসলিমদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকায় ওই দিকে কোনো পরিখা খনন করা হয়নি। কুরাইজাদের এই গোপন বিশ্বাসঘাতকতার খবর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পৌঁছে যায়। তাদের এই কর্মকাণ্ডের ফলে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে ভীতি ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তাছাড়া কুরাইজাদের অধিকারে ছিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ তলোয়ার, দুই হাজার বর্শা, ৩০০ বর্ম ও ৫০০ ঢাল। তারা পেছন থেকে আক্রমণ করলে যুদ্ধের গতিপথ বদলে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল।এমন সংকটময় মুহূর্তে একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে হেঁটে আসতে দেখা গেল গাতফান গোত্রের নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.)-কে। তিনি এসে বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি; কিন্তু আমার গোত্র এখনো সে খবর জানে না। আপনি অনুমতি দিলে আমি একটি কৌশল বাস্তবায়ন করতে চাই।’

    রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আপনি তো আমাদের মধ্যে একজন মাত্র ব্যক্তি। আপনি যদি কৌশলের মাধ্যমে শত্রুদের দুর্বল করতে পারেন, তবে সেটাই উত্তম। আপনি যান, যা ইচ্ছা করুন। কারণ যুদ্ধ কৌশলেরই নাম।’ (আল-বুখারি : ৩০৩০)

    রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুমতি পেয়ে নুয়াইম (রা.) এক অসাধারণ কৌশল অবলম্বন করে এগিয়ে গেলেন। প্রথমে তিনি বনু কুরাইজার কাছে গিয়ে তাদের অন্য মিত্রদের দুরভিসন্ধি সম্পর্কে সতর্ক করলেন। তিনি বললেন, যদি অবরোধ ব্যর্থ হয়, তাহলে কুরাইশ ও তাদের মিত্ররা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে তোমাদের মুহাম্মদের হাতে ছেড়ে দিতেও দ্বিধা করবে না। তাই তোমাদের উচিত, যুদ্ধ শুরুর আগে কুরাইশদের কয়েকজন নেতাকে জিম্মি হিসেবে নিজেদের কাছে রাখার দাবি করা। নুয়াইমের এ পরামর্শ বনু কুরাইজার মনে গভীর প্রভাব ফেলল। তারা ভাবতে শুরু করল, সত্যিই তো—যদি কুরাইশরা পালিয়ে যায়, তবে তাদের পরিণতি কী হবে? ফলে কুরাইশদের প্রতি তাদের মনে গভীর সন্দেহ সৃষ্টি হলো।

    এরপর নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.) গেলেন মিত্রবাহিনীর নেতা আবু সুফিয়ান ইবন হারবের কাছে। তিনি বললেন, ‘আপনি কি জানেন, বনু কুরাইজা মুহাম্মদের সঙ্গে আবার সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে? আমি জানতে পেরেছি, তারা আপনাদের কয়েকজন নেতাকে জামিন বা জিম্মি হিসেবে নিজেদের কাছে চাইবে। এরপর সুযোগ পেলে তাদের মুহাম্মদের হাতে তুলে দেবে, যাতে তারা তার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। তাই সাবধান! তারা যদি আপনাদের কাছে কাউকে জিম্মি হিসেবে চায়, তাহলে কোনো অবস্থাতেই তাদের হাতে কাউকে তুলে দেবেন না।’

    ফলে কুরাইশ ও গাতফানের নেতারা ইকরিমা ইবনে আবু জাহলসহ একটি প্রতিনিধিদল বনু কুরাইজার কাছে পাঠালেন। তারা জানালেন, অবরোধ দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে; ঘোড়া-উট মারা যাচ্ছে। তাই এখন প্রয়োজন সবাই মিলে একযোগে মুসলিমদের ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ চালানো। বনু কুরাইজা জবাবে বললেন, ‘আজ শনিবার। আমরা এদিন যুদ্ধ করতে পারব না। আর তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কয়েকজন নেতাকে জিম্মি হিসেবে আমাদের কাছে না দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরাও যুদ্ধে অংশ নেব না।’

    প্রতিনিধিদল ফিরে গিয়ে এ কথা আবু সুফিয়ানকে জানালে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘আল্লাহর শপথ! নুয়াইম আমাদের সত্য কথাই বলেছিল।’ অন্যদিকে কুরাইশদের প্রত্যাখ্যানের খবর বনু কুরাইজার কাছে পৌঁছালে তারাও বলল, ‘আল্লাহর শপথ! নুয়াইম আমাদের কাছেও সত্য কথাই বলেছিল।’

    এভাবেই নুয়াইম ইবনু মাসউদের অসাধারণ বিচক্ষণতায় উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি হলো। মিত্রবাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ল, আর তাদের সম্মিলিত শক্তিতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিল। নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.) তার পরিকল্পনায় সম্পূর্ণ সফল হলেন। অথচ তার গোত্র তখনো জানত না, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি কুরাইশ ও বনু কুরাইজার মধ্যে এমন সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছিলেন, যা তাদের সম্মিলিত যুদ্ধপরিকল্পনাকে কার্যত ভেঙে দিয়েছিল।

    এরপর আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের জন্য চূড়ান্ত সাহায্য পাঠালেন। তিনি রণক্ষেত্রে প্রবল ঝঞ্ঝাবায়ু পাঠালেন, যা মুশরিকদের তাঁবু উপড়ে ফেলল, আগুন নিভিয়ে দিল, রান্নার হাঁড়ি উল্টে দিল এবং পুরো যুদ্ধের চিত্রই পাল্টে দিল। আল্লাহর অদৃশ্য সাহায্যে মিত্রবাহিনী পরাজিত ও ছত্রভঙ্গ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হলো।

    এই মহাযুদ্ধে কাফিরদের সম্মিলিত আক্রমণ থেকে মুসলিমদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে অত্যন্ত কৌশলী ভূমিকা পালন করেছিলেন এই মহান সাহাবি। তার অনন্য যুদ্ধকৌশলের ফলে চতুর্মুখী শত্রুর আক্রমণ থেকে মুসলিম উম্মাহ রক্ষা পায়। ইয়াওমুল আহজাব তথা খন্দকের সেই চূড়ান্ত অভিযানে ব্যর্থ হওয়ার পর কুরাইশ ও তাদের মিত্ররা আর কখনো মদিনার বিরুদ্ধে এমন বৃহৎ সম্মিলিত আক্রমণ চালানোর সাহস করেনি। ইসলামের ইতিহাসে নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.)-এর নাম আজও স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে।

  • মতপার্থক্য ও ভিন্নমতের আদব

    মতপার্থক্য ও ভিন্নমতের আদব

    মানুষের চিন্তা, উপলব্ধি ও বিচারশক্তির ভিন্নতার কারণে মতের পার্থক্য হওয়া একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। ইসলাম এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনি; বরং এর জন্য একটি সুন্দর নীতিমালা ও শিষ্টাচার নির্ধারণ করেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন এবং পরবর্তী যুগের মুজতাহিদ ইমামদের মধ্যেও বহু বিষয়ে মতভেদ ছিল। কিন্তু সেই মতভেদ কখনো তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান ও ভ্রাতৃত্বকে বিনষ্ট করেনি। আজকের দিনে যখন সামান্য মতপার্থক্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা জনপরিসরে তীব্র বিতর্ক, বিদ্বেষ ও বিভক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন ইসলামের শেখানো মতভেদের আদব নতুন করে স্মরণ করা জরুরি।

    পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা আলে ইমরান : ১০৩) এই আয়াত আমাদের শেখায়, উম্মাহর ঐক্য রক্ষা করা একটি মৌলিক দায়িত্ব। তবে ঐক্য মানে সব বিষয়ে একই মত পোষণ করা নয়। বরং কোরআন-সুন্নাহর মৌলিক নীতির ওপর ঐক্যবদ্ধ থেকে ইজতিহাদি বিষয়ে মতভেদকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করাই ইসলামের শিক্ষা।মতভিন্নতা স্বাভাবিক বিষয়

    রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেই আমরা মতভেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। বনু কুরাইজার অভিযানের সময় তিনি সাহাবাদের বলেছিলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন বনু কুরাইজায় পৌঁছানোর আগে আসরের সালাত আদায় না করে।’ একদল সাহাবি নির্দেশের আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করে গন্তব্যে পৌঁছে সালাত আদায় করেন। অন্য দল বুঝেছিলেন, রাসুল (সা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত পৌঁছানো; তাই তারা পথেই সময়মতো সালাত আদায় করেন। পরে বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে উপস্থাপন করা হলে তিনি কোনো পক্ষকেই দোষারোপ করেননি। এই ঘটনা প্রমাণ করে, আন্তরিক ইজতিহাদের ভিত্তিতে মতভেদ হলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

    চার মাজহাবের ইমামদের জীবনও মতভেদের আদবের উজ্জ্বল উদাহরণ অনেক। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ.) বহু মাসআলায় ভিন্নমত পোষণ করেছেন। কিন্তু তারা কখনো একে অন্যকে অপমান করেননি বা শত্রু মনে করেননি। বরং তারা পরস্পরের জ্ঞান, তাকওয়া ও আন্তরিকতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর একটি প্রসিদ্ধ উক্তি হলো, ‘আমার মত সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তবে ভুলও হতে পারে; আর অন্যের মত ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তবে সঠিকও হতে পারে।’ এই বক্তব্য একজন আলিমের বিনয়, উদারতা ও সত্যের প্রতি নিষ্ঠার অনন্য দৃষ্টান্ত।সুন্দর ভাষা ও উত্তম আচরণ

    আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ (সুরা আল-বাকারা : ৮৩) মতভেদ থাকলেও কটূক্তি, বিদ্রুপ, অপবাদ বা গালাগাল একজন মুসলিমের চরিত্র হতে পারে না। ইসলামে যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, ব্যক্তিগত আক্রমণ দিয়ে নয়।

    সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতা

    কোনো ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে মতভেদ থাকলেও তাদের প্রতি সুবিচার করতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। ন্যায়বিচার কর; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা আল-মায়িদা : ৮) তাই প্রতিপক্ষের বক্তব্য বিকৃত করা, তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অযথা সন্দেহ করা বা ভালো দিকগুলো গোপন করা ইসলামের শিক্ষা নয়।

    ইলম ও দলিলের অনুসরণ

    কোরআন-সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য আলিমদের ব্যাখ্যার আলোকে মতপ্রকাশ করতে হবে। অল্প জ্ঞান নিয়ে শরয়ি বিষয়ে মন্তব্য করা বা অন্যকে পথভ্রষ্ট বলে ঘোষণা করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশেষ করে, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই ছাড়া মতামত প্রচার করা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।

    আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে, ইসলামের মৌলিক আকিদা ও ফরজ বিধান এক বিষয় আর ইজতিহাদি ফিকহি মতপার্থক্য আরেক বিষয়। এ দুটিকে এক করে দেখলে অযথা বিভেদ সৃষ্টি হয়।

    বর্তমান বিশ্বে মুসলিম উম্মাহ নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক সহযোগিতা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ব। মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতভেদ যেন বিদ্বেষ, অপবাদ বা বিভক্তির কারণ না হয়। বরং তা যেন জ্ঞানের বিকাশ, সত্যের অনুসন্ধান এবং পারস্পরিক শিক্ষালাভের মাধ্যম হয়।

    ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, মতপার্থক্য যদি কোরআন-সুন্নাহর সীমার মধ্য থেকে আদব, ন্যায়বোধ ও তাকওয়ার সঙ্গে পরিচালিত হয়, তবে তা দুর্বলতার নয়; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক সমৃদ্ধির পরিচয়। তাই ব্যক্তি বা দলের অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং দলিলের প্রতি আনুগত্য, বিনয়, সহনশীলতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধের মাধ্যমে মতভেদ পরিচালনা করাই একজন সচেতন মুসলিমের কর্তব্য। এ পথেই উম্মাহর ঐক্য সুদৃঢ় হবে এবং ইসলামের সৌন্দর্য আরো উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পাবে।

  • তাকওয়া ও আত্মসংযমের অনুশীলন

    তাকওয়া ও আত্মসংযমের অনুশীলন

    বান্দার সঙ্গে রবের নৈকট্য লাভের প্রধান মাধ্যম হলো ইবাদত। এর মাধ্যমে বান্দা তার রবের অত্যন্ত কাছে চলে যায়। ইবাদতের মধ্যে রয়েছে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত প্রভৃতি। নামাজ বান্দার জন্য নিত্যদিনের ইবাদত হিসেবে নির্ধারিত, তথা ফরজ। আর রোজার জন্য নির্ধারিত মাস রমজান। নামাজ যেমন ফরজ ব্যতীত সুন্নাহ ও নফল রয়েছে, তেমনি রমজানের ফরজ রোজার পাশাপাশি নফল ও সুন্নাহর বিধান রয়েছে। আর আইয়ামে বিজের রোজা এমনই একটি সুন্নাহ।

    আরবিতে ‘আইয়ামে বিজ’ অর্থ উজ্জ্বল বা শুভ্র দিবস। প্রতি মাসের এই দিনগুলোয় চাঁদ পূর্ণিমার পূর্ণ আলো দেয়, যার কারণে এই দিনগুলোকে আইয়ামে বিজ নামে অবহিত করা হয়। মূলত, হিজরি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখই আইয়ামে বিজ বা উজ্জ্বল দিবস। প্রত্যেক হিজরি (আরবি) চন্দ্র মাসের ১৩‚ ১৪ ও ১৫ তারিখে রাখতে হয় এই রোজা। রাসুল (সা.) এই রোজার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন এবং অসংখ্য ফজিলত বর্ণনা করেছেন। হাদিসে নববিতে উল্লেখ আছে, আবু জর গিফারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তুমি যদি প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখতে চাও, তবে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখো।’ (তিরমিজি : ৭৬১)আইয়ামে বিজের রোজা রাখার নিয়ম

    প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রাখতে হয়। এই রোজার নিয়ম ফরজ রোজার মতোই। রোজার জন্য নিয়ত করা অপরিহার্য। নিয়ত মনে মনে করতে হয়। নিয়ত রাতে বা ফজরের আগে করা উত্তম। (মুসলিম : ১১৫১)

    আইয়ামে বিজের রোজার ফজিলত

    আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসাঈসহ বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী নবী করিম (সা.) আইয়ামে বিজের রোজা রাখতে সাহাবিদের নির্দেশনা করেছেন। হাদিসে এই রোজাকে সারা বছর রোজা রাখার সমতুল্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আবু হুরায়য়া (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখে, তার জন্য তা সারা বছর রোজা রাখার সমতুল্য।’ (বুখারি : ১৯৭৯)

    আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হিফাজত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা রাখে। কেননা রোজা তার প্রবৃত্তিকে দমন করে।’ (বুখারি : ১৫৬৬; মুসলিম : ১৪০০)

    রোজা আমাদের মাঝে তাকওয়া ও আত্মসংযম সৃষ্টি করে। এটি আমাদের চোখ, কান, জিহ্বা এমনকি নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। সব পাপের বিরুদ্ধে ঢালস্বরূপ ভূমিকা রাখে। আমাদের উদ্বুদ্ধ করে নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে, মানুষের প্রতি উদার ও মহানুভব হতে এবং প্রস্তুত করে রবের হুকুম আঁকড়ে ধরতে।

    রোজা এমন ইবাদত, যার প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা দান করবেন। এটি মানুষকে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করে, কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে এবং অন্তরে ঈমানের আলো প্রসারিত করে। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তার ইবাদতে শামিল হওয়ার তৌফিক দিন এবং ফরজের পাশাপাশি নফল ইবাদত করার তৌফিক দান করুক, আমাদের প্রতিটি আমলের বিনিময়ে দান করুন তার নৈকট্য। আমিন।