ধর্ম ও ইসলাম

  • বিয়ে করে আত্মীয়-স্বজনকে জানানোর বিধান

    বিয়ে করে আত্মীয়-স্বজনকে জানানোর বিধান

    ইসলামে বিবাহ কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়; এটি একটি পবিত্র ইবাদত, দায়িত্ব এবং আমানত। বিশেষ পরিস্থিতিতে একজন মুসলিম পুরুষকে একাধিক বিয়ের অনুমতি দেওয়া হলেও ইসলাম এটিকে কোনো শর্তহীন অধিকার হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং ন্যায়বিচার, আর্থিক সামর্থ্য, দায়িত্বশীলতা এবং আল্লাহভীতিকে একাধিক বিয়ের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ইসলামে বিয়ে গোপন রাখার অনুমোদন নেই। বরং বিয়ের পর তা সমাজে ঘোষণা করা বা প্রচার করা আবশ্যক।

    বিয়ের ঘোষণা (ই’লান): রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, তোমরা বিয়ে প্রকাশ্যে সম্পন্ন করো। বিয়ে যে সম্পন্ন হয়েছে, তা যেন সমাজের মানুষ জানতে পারে, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।সাক্ষী ও অভিভাবক: বিয়ের আকদ বা চুক্তি বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত হলো দুইজন মুসলিম পুরুষ (অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী) সাক্ষী এবং কনের অভিভাবকের (ওয়ালী) উপস্থিতি থাকতে হবে। হাদিসে এসেছে, অভিভাবক ও দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়া বিয়ে হয় না। (সহিহ ইবনে হিব্বান)

    ওলিমা: বিয়ের ঘোষণা দেওয়ার সবচেয়ে উত্তম এবং সুন্নাতসম্মত মাধ্যম হলো ‘ওলিমা’ বা বিয়ের খাবার আয়োজন করা। সামর্থ্য অনুযায়ী আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও অভাবীদের দাওয়াত খাইয়ে বিয়ের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং জানান দেওয়া ওয়াজিব বা মুস্তাহাব পর্যায়ের আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে ওয়ালিমা করেছেন এবং সাহাবিদের করতে বলেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) জয়নব বিনতে জাহাশ (রা.)-কে বিয়ে করার পরদিন ওয়ালিমা করেছিলেন। (বুখারি, হাদিস নম্বর-৫১৭০)। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছাফিয়াহ (রা.)-কে বিয়ের পর তিন দিন যাবৎ ওয়ালিমা খাইয়েছিলেন। (মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস নম্বর-৩৮৩৪)

    ঢোল বাজানো ও আনন্দ করা: ইসলামে বিয়ের ঘোষণা দেওয়ার জন্য মেয়েদের দফ (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে গান গাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যাতে আশেপাশের মানুষ বুঝতে পারে যে বিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা বিয়ের ঘোষণা দেবে এবং তা মসজিদে সম্পন্ন করবে। আর এ উপলক্ষে দফ বাজাবে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১০৮৯)

  • মন্দিরের জমি নিলামে কিনল মুসলিমরা, মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা

    মন্দিরের জমি নিলামে কিনল মুসলিমরা, মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা

    যুক্তরাজ্যের পিটারবরো শহরে স্থানীয় সিটি কাউন্সিল একটি মুসলিম সংস্থার কাছে এক খণ্ড জমি বিক্রি করে দিয়েছে। ইউনাইটেড কিংডম ইসলামিক মিশন নামে ওই মুসলিম সংস্থা সেখানে একটি মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার নির্মাণ করতে চাইছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়। কারণ ওই জমিতে তাদের মন্দির ছিল বলে দাবি করছে তারা।

    তবে যে জমির ওপর মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত, তার মালিক পিটারবোরো সিটি কাউন্সিল। কাউন্সিল দাবি করেছে যে তারা তাদের স্বাভাবিক জমি নিষ্পত্তির নিয়ম অনুসরণ করেছে, তাদের আইনি ক্ষমতার মধ্যে থেকেই কাজ করেছে এবং ধর্মীয় পছন্দেপিটারবরো সিটি কাউন্সিল তাদের প্রায় ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ডের ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যে সম্পত্তিটি উন্মুক্ত বাজারে বিক্রি করে। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মসজিদ গ্রুপকে জায়গাটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

    জমিটি নিয়ে আইনি লড়াই করছে হিন্দু সম্প্রদায়। তবে কাউন্সিলের আইনজীবী ক্যাথরিন রোল্যান্ডস আদালতে বলেন, জমি বিক্রির প্রক্রিয়া ছিল স্বচ্ছ, ন্যায্য ও আইনসম্মত।

    দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারক বিক্রি প্রক্রিয়ার ওপর একটি অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করেছে।

    মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের বর্তমান জায়গা পর্যাপ্ত নয়। তারা নতুন স্থানে একটি মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার গড়ে তুলতে চায়, যেখানে নামাজের স্থান ছাড়াও শ্রেণিকক্ষ ও খেলাধুলার সুবিধা থাকবে।র পরিবর্তে পরিকল্পনা, মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে দরপত্র যাচাই করেছে।

  • কায়েমকোলার ‘জামাদার’ বা ‘বড় মসজিদ’

    কায়েমকোলার ‘জামাদার’ বা ‘বড় মসজিদ’

    একসময় গ্রামের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে যেত খরস্রোতা একটি নদী, যাকে অনেকে ‘গাঙ’ বলেই চিনতেন। সেই নদী আজ মৃতপ্রায়, সময়ের প্রবাহে হারিয়ে গেছে তার স্রোত, কিন্তু রয়ে গেছে স্মৃতি। কায়েমকোলার পশ্চিম পাশের গ্রাম মাগুরা, যার একটি অংশের নাম ‘অমৃতবাজার’ সেখানেই জন্ম নিয়েছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শিশিরকুমার ঘোষ। তিনি ছিলেন বিখ্যাত পত্রিকা ‘অমৃতবাজার’ এর সম্পাদক। ফলে এ অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যেও সমৃদ্ধ।


    বর্তমানে কায়েমকোলা একটি বৃহৎ জনপদ। কয়েক হাজার মানুষের বসবাস এখানে। শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি গ্রামটির সামাজিক অগ্রগতির সাক্ষ্য বহন করে। এখানে রয়েছে একটি হাইস্কুল, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কয়েকটি ফোরকানিয়া মাদ্রাসা এবং একটি বড় বাজার। গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্বাভাবিক ছন্দের পাশাপাশি আধুনিকতার ছোঁয়াও স্পষ্ট।


    তবে কায়েমকোলার প্রকৃত ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে যে স্থাপনাটি, সেটি হলো স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘জামাদার মসজিদ’ বা ‘বড় মসজিদ’। অবস্থানগতভাবে এটি যশোর-কাশীপুর ও ঝিকরগাছা-চৌগাছা সড়কের সংযোগস্থলের কাছেই অবস্থিত। ৫২ দশমিক ৫ ফুট লম্বা ও ২১ ফুট প্রস্থের এ মসজিদের দেয়াল ৪ দশমিক ৫ ফুট পুরু, যা এর প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর দৃঢ়তার প্রমাণ দেয়। পূর্ব পাশে রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ এবং পশ্চিম দেয়ালে একটি মিহরাব। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটির কোনো মিনার নেই, যা একে সুলতানি ও মুঘল আমলের গ্রামীণ মসজিদ স্থাপত্যের সঙ্গে তুলনীয় করে তোলে।


    মসজিদটি ঠিক কবে নির্মিত হয়েছিল, তার নির্ভরযোগ্য দলিল পাওয়া যায়নি। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে, বাংলার নবাব আলীবর্দী খান-এর শাসনামলে ‘আগা বাকর’ নামে এক জমাদার এটি নির্মাণ করেন। এ কারণেই মসজিদটি ‘জামাদার মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়। এই তথ্য অনুযায়ী, এর নির্মাণকাল আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়। তবে কিছু ইতিহাস অনুরাগী ধারণা করেন, এর স্থাপত্যরীতি সুলতানি আমলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
    দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে মসজিদের দেয়ালে লবণাক্ততার ক্ষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, সেই সংস্কারের ফলে স্থাপনাটির কিছু অংশ আগের আদল হারিয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহলের অভিমত। ইতিহাস-ঐতিহ্যের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন সচেতন মহল।
    কায়েমকোলার জামাদার মসজিদ সময়ের সাক্ষ্যবাহী এক ঐতিহাসিক দলিল। সঠিক সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এ মসজিদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অতীতের সমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরতে পারে। ঐতিহ্য রক্ষায় স্থানীয় সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করলেই টিকে থাকবে এই মসজিদ।

  • জুমার দিনের আমল

    জুমার দিনের আমল

    জুমার দিনকে সাপ্তাহিক ঈদের দিন বলা হয়। এ দিনটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন। এই দিনের অনেক গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য রয়েছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, জুমার দিন দিবসসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং তা আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১০৮৪)

    এ দিনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রয়েছে। যেমন- এই দিনে আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়। এই দিনে তাঁকে বেহেশতে প্রবেশ করানো হয়, আবার এই দিনেই বেহেশত থেকে বের করে দেওয়া হয়। একই দিনে তাঁকে দুনিয়ায় পাঠানো হয়, তাঁর তওবা কবুল করা হয়, তাঁর মৃত্যু হয়। এই দিনেই শিঙায় ফুঁক দেওয়া হবে। এই দিনেই কেয়ামত সংঘটিত হবে। এই দিনেই সবাই বেহুঁশ হয়ে যাবে। প্রত্যেক নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা, আকাশ, পৃথিবী, বাতাস, পর্বত ও সমুদ্র এই দিনটিকে ভয় করে।

    শুক্রবার মসজিদে জোহরের চার রাকাতের পরিবের্ত জামায়াতের সঙ্গে যে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা হয়, এটিই জুমার নামাজ। নির্ভরযোগ্য হাদিসের কিতাবগুলোতে এই দিনের ফজিলত ও আমল সম্পর্কে একাধিক হাদিস আছে। এখানে কয়েকটি আমলের উল্লেখ করা হলো—

    আল্লাহ বলেন, হে মুমিনরা, জুমার দিন যখন নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং কেনাবেচা বন্ধ করো। এটা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে। (সুরা জুমা, আয়াত: ১০)

    গোসল করা

    রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে জুমার দিন গোসল করে আতর ব্যবহারের পর ভালো জামা পরে নামাজের উদ্দেশে বের হয়, (মসজিদে গিয়ে একসঙ্গে থাকা) দুজনের মাঝে গিয়ে না বসে মনোযোগের সঙ্গে ইমামের খুতবা শোনে, ওই ব্যক্তির এক জুমা থেকে আরেক জুমা এবং অতিরিক্ত আরও তিন দিনের গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৭)

    উত্তম পোশাক পরিধান

    রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে জুমার দিন গোসল করে উত্তম পোশাক পরে তার কাছে থাকা সুগন্ধি ব্যবহার করে জুমার নামাজে আসে। অন্য মুসল্লিদের গায়ের ওপর দিয়ে টপকে সামনের দিকে না গিয়ে নির্ধারিত নামাজ আদায় করে। এরপর ইমাম খুতবার জন্য বের হওয়ার পর থেকে সালাম পর্যন্ত চুপ থাকে। তাহলে তার এই আমল পূর্ববর্তী জুমার দিন থেকে পরের জুমা পর্যন্ত সব সগিরা গোনাহের জন্য কাফফারা (ক্ষতিপূরণ) হবে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৩)

    সুগন্ধি ব্যবহার

    আবু সাইদ খুদরি (রা.) বলেন, আমি এ মর্মে সাক্ষ্য দিচ্ছি, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিন সুগন্ধি পাওয়া গেলে তা ব্যবহার করবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮০)

    দ্রুত মসজিদে যাওয়া

    জুমার দিন দ্রুত মসজিদে যাওয়া নৈতিক দায়িত্ব। এতে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিন মসজিদের দরজায় ফেরেশতারা অবস্থান করেন এবং ক্রমানুসারে আগে আগমনকারীদের নাম লিখতে থাকেন। যে সবার আগে আসে সে ওই ব্যক্তির মতো যে একটি মোটাতাজা উট কোরবানি করে। এরপর যে আসে সে ওই ব্যক্তির মতো যে একটি গাভি কোরবানি করে। এরপর আগমনকারী ব্যক্তি মুরগি দানকারীর মতো…। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯২৯)

    মনোযোগের সঙ্গে খুতবা শোনা

    জুমার দিন মনোযোগসহকারে খুতবা শোনা গুরুত্বপূর্ণ আমল। এতে আল্লাহর দয়া লাভ করা যায়। আল্লাহ বলেন, যখন কোরআন পড়া হবে, গভীর মনোযোগে শোনো ও চুপ থাকো, যেন তোমাদের ওপর দয়া করা হয়। (সুরা আরাফ, আয়াত: ২০৪)

    গুরুত্বের সঙ্গে জুমার নামাজ আদায়

    কোরআনের একাধিক জায়গায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার নির্দেশনা দিয়েছেন আল্লাহ। জুমার নামাজের বিষয়ে তিনি আলাদা করে তাগিদ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, হে মুমিনগণ, জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য ডাকা হয়, তখন আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও। বেচাকেনা ছেড়ে দাও, এটাই তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে! (সুরা জুমা, আয়াত: ৯)

    সুরা কাহাফ তেলাওয়াত

    রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে জুমার দিন সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করবে, আল্লাহ তাকে সব ধরনের ফেতনা থেকে পুরো সপ্তাহ নিরাপদ রাখবনে। যদি দাজ্জালও বের হয়, তবু আল্লাহ তাকে নিরাপদ রাখবেন। (আল-আহাদিসুল মুখতারা: ৪২৯)

    রাসুল (সা.) বলেছেন, যে জুমার দিন সুরা কাহাফের শেষ ১০ আয়াত পাঠ করবে, দাজ্জাল বের হলে তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। (সহিহ তারগিব, হাদিস: ১৪৭৩

    বেশি বেশি দরুদ পাঠ

    রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা ইমানের অংশ। তার নাম শুনে দরুদ পড়া ওয়াজিব। জীবনে একবার দরুদ পড়া ফরজ। জুমার দিন দরুদ পড়ার বিশেষ সওয়াব আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, জুমার দিন তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পড়ো। কারণ, আমার উম্মতের দরুদ আমার কাছে প্রতি শুক্রবারে পেশ করা হয়। যে আমার বেশি বেশি দরুদ পড়বে, সে কেয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে। (আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস: ৬২০৮)

    দোয়া করা

    রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, জুমার দিনের ১২ ঘণ্টার মধ্যে একটি বিশেষ মুহূর্ত এমন আছে, তখন কোনো মুসলমান আল্লাহর কাছে যে দোয়া করবে আল্লাহ তা কবুল করেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৮)। হাদিস বিশারদরা এ সময়টিকে আসরের পরের সময় বলে উল্লেখ করেছেন।

  • কওমিপন্থি সাত দলের নতুন জোট গঠন নিয়ে নানা আলোচনা

    কওমিপন্থি সাত দলের নতুন জোট গঠন নিয়ে নানা আলোচনা

    কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামি দল নিয়ে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের তৎপরতা শুরু হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর আহ্বানে এ বিষয়ে প্রথম বৈঠকেই ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে দলগুলোর। এখন নতুন জোট গঠনের বিষয়ে রূপরেখা প্রস্তাব করবে সংশ্লিষ্টরা। সে অনুযায়ী শিগগির পরবর্তী প্রক্রিয়া ও পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

    এদিকে কওমিপন্থিদের হঠাৎ নতুন জোট গঠনের এ উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াত জোটে বিভক্ত হওয়া দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বকীয় অবস্থান গড়ার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে থাকা নিয়ে শরিক ইসলামি দলগুলোর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে একসঙ্গে নির্বাচন করলেও আনুষ্ঠানিক জোট না হওয়ায় ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা বা না করা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ইসলামি দলগুলোর তেমন কোনো বাধা দেখছেন না কেউ কেউ।

    সূত্রমতে, গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি জামিয়া ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর আহ্বানে কওমি ঘরানার সাতটি নিবন্ধিত ইসলামি দলের নেতারা জড়ো হন। সেখানে হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ইসলামী আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও নেজামে ইসলাম পার্টির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এসব দলের মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করে অংশ নেয়।অন্যদিকে ইসলামী ঐক্যজোট ছাড়া বাকি পাঁচটি দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক ছিল। তবে নির্বাচনের আগে ইসলামী আন্দোলন ওই ঐক্য থেকে বেরিয়ে যায়। আর অঘোষিতভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় খেলাফত আন্দোলন (নির্বাচনের পর ঐক্য ছাড়ার ঘোষণা দেয়)।

    ওই বৈঠক শেষে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে উপস্থিত সাত দলের নেতারা আগামীতে ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন।

    এ বিষয়ে জানতে চাইলে আজিজুল হক ইসলামাবাদী গতকাল শুক্রবার আমার দেশকে বলেন, জোট গঠনের বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে, তবে এটি বাস্তবে রূপ নিতে সময় লাগবে। হঠাৎ এ উদ্যোগ কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে থেকেই এ ধরনের উদ্যোগ ছিল। তবে দুটি জোটে বিভক্ত হয়ে পড়ায় সেটি সম্ভব হয়নি। এখন ইসলামি দলগুলোর স্বকীয়তা রক্ষা করে আলাদা শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে সাতটি দল ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে অন্য কোনো জোটে থাকা না থাকার বিষয়ে এখনো আলোচনা হয়নি।

    বৈঠকে উপস্থিত আরেক নেতা বলেন, নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের রূপরেখা কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে ৩ আগস্টের মধ্যে প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে। হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমানসহ সাত সদস্যের একটি কমিটি এসব প্রস্তাব নিয়ে পর্যালোচনার জন্য পরবর্তী বৈঠক ডাকবে। দ্রুত এ কাজ করা হবে।

    তিনি আরো বলেন, এ জোটের মূল লক্ষ্য কওমি ঘরানার নিবন্ধিত সাতটি দলকে স্বতন্ত্র ধারায় ঐক্যবদ্ধ করা। তবে এ জোট হলে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর অন্য কোনো জোটে থাকার সুযোগ থাকবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

    নতুন এ উদ্যোগের কারণে ১১ দলীয় ঐক্যে থাকা বা না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ আমার দেশকে বলেন, বৃহস্পতিবারের বৈঠকের উদ্দেশ্য কওমি ধারার দলগুলোর দূরত্ব ঘুচিয়ে কাছাকাছি হওয়া। ভবিষ্যতে একসঙ্গে পথচলার বিষয়েও নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। তবে এই চলার পথ কী হবে, তা সামনে ঠিক হবে। বৈঠকে ১১ দলীয় ঐক্যে থাকা বা না থাকা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানান তিনি।গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত বৈঠকে হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা উবাইদুল্লাহ ফারুক, সহসভাপতি মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল কাদের, খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

  • মসজিদ আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের প্রাণভোমরা

    মসজিদ আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের প্রাণভোমরা

    পবিত্র জুমার দিন কিংবা পাঁচওয়াক্ত নামাজের সময় যখন পাড়ার মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের সুমধুর আজান ভেসে আসে, তখন চারপাশের ব্যস্ত কোলাহল নিমেষেই শান্ত হয়ে যায়। মসজিদে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যখন ধনী-দরিদ্র, মনিব-ভৃত্য কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, তখন এক পরম সাম্যের ছবি ফুটে ওঠে। কিন্তু আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এই চেনা দৃশ্যটির আড়ালে এক বিশাল ঐতিহাসিক ও সামাজিক সত্য লুকিয়ে আছে, যা আমরা আজ প্রায় ভুলতে বসেছি। মসজিদ শুধুই চার দেওয়ালের মাঝে আবদ্ধ কোনো উপাসনালয় নয়; বরং এটি ছিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সমাজব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র, যার পুনরুজ্জীবন বর্তমানের অবক্ষয়িত সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

    মদিনার মসজিদের সোনালি অতীত : ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর প্রথম যে কাজটি করেছিলেন, তা হলো ‘মসজিদে নববী’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। এটি শুধু নামাজ আদায়ের স্থান ছিল না, বরং এটিই ছিল ইসলামের প্রথম রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও বিচারিক সদর দপ্তর। মদিনার সেই সমাজব্যবস্থায় মসজিদ ছিল একাধারে, সংসদ ভবন ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যুদ্ধ-বিগ্রহের কৌশল এবং কূটনৈতিক আলোচনাস্থল, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার আঁতুড়ঘর। মসজিদের এক কোণে গড়ে উঠেছিল ‘আসহাবে সুফফা’, যা ছিল ইসলামের প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। যে কোনো সামাজিক বিরোধের মীমাংসা, অভাবী মানুষের পুনর্বাসন এবং বায়তুল মালের (রাষ্ট্রীয় তহবিল) বণ্টন হতো মসজিদ থেকেই।

    পরবর্তীকালে খোলাফায়ে রাশেদা, উমাইয়া, আব্বাসীয় কিংবা অটোমান-যে কোনো মুসলিম সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগের দিকে তাকালে দেখা যাবে, প্রতিটি নগরের প্রাণকেন্দ্রে থাকত একটি মহিমান্বিত মসজিদ। আর সেই মসজিদকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠত বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার, বাজার, চিকিৎসালয় এবং বিচারালয়। বাগদাদ, কর্ডোভা বা দামেস্কের ঐতিহ্যবাহী সমাজব্যবস্থা ছিল মূলত মসজিদকেন্দ্রিক।

    বাংলার সমাজ ও মসজিদ : আমাদের এই পলল দ্বীপে-বাংলাদেশেও কিন্তু ইসলাম প্রচারের শুরুর দিকে মসজিদকে কেন্দ্র করেই সমাজ গড়ে উঠেছিল। গ্রামীণ সমাজে ‘পঞ্চায়েত’ ব্যবস্থা পরিচালিত হতো মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় মুরুব্বিদের সমন্বয়ে। পাড়ার যে কোনো বিরোধ, পারিবারিক সমস্যা কিংবা উৎসব-আয়োজন, সবকিছুর সিদ্ধান্ত হতো নামাজের পর মসজিদের বারান্দায় বসে। মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি সুশৃঙ্খল ‘পাড়া’ বা ‘মহল্লা’র ধারণা গড়ে উঠেছিল, যেখানে একে অপরের খোঁজ রাখা এবং বিপদে এগিয়ে আসা ছিল বাধ্যতামূলক সামাজিক দায়িত্ব।

    বর্তমানের রূঢ় বাস্তবতা : আজ আমাদের দেশে পাড়ায় পাড়ায় সুদৃশ্য, বহুতল এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মসজিদের অভাব নেই। মার্বেল পাথর আর আধুনিক লাইটিংয়ে মসজিদগুলো চকচক করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই অনুপাতে কি আমাদের সামাজিক বন্ধন উন্নত হয়েছে?

    আজকের বাস্তবতায় মসজিদগুলো যেন শুধু ‘পার্ট-টাইম’ বা খণ্ডকালীন ইবাদতখানায় পরিণত হয়েছে। আজানের পর মানুষ আসে, নামাজ পড়ে এবং মোনাজাত শেষ করেই দ্রুত জুতো জোড়া পায়ে দিয়ে যে যার পথে চলে যায়। নামাজের বাইরে মসজিদের ফটকগুলো সাধারণত তালাই ঝুলানো থাকে।

    ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। সমাজ থেকে মসজিদের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব কমে যাওয়ার কারণে সামাজিক অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করেছে। কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, মাদকাসক্তি, পারিবারিক কলহ, প্রবীণদের একাকিত্ব এবং তরুণ প্রজন্মের ভেতরে চরম নৈতিক অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে। যে তরুণ সমাজকে আলোর পথ দেখানোর কথা ছিল, তারা আজ ভার্চুয়াল জগতের গোলকধাঁধায় কিংবা মাদকের মরণনেশায় বুঁদ হয়ে আছে। কারণ, তাদের হাত ধরে রাখার মতো কোনো প্রাণবন্ত সামাজিক কেন্দ্র আজ আর সচল নেই।

    সময়ের দাবি : বর্তমান যুগের জটিল সামাজিক মনস্তত্ত্ব এবং অবক্ষয় রুখতে হলে মসজিদকে তার পুরোনো রূপে ফিরিয়ে আনা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এটি কোনো পেছনের দিকে হাঁটা নয়, বরং শিকড়ের শক্তিতে ভর করে সামনে এগিয়ে যাওয়া। কেন এটি আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোচনা করলেই স্পষ্ট হয়-

    নৈতিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়তে : আজকের কিশোর ও যুবসমাজকে শুধু আইনের ভয় দেখিয়ে সোজা পথে রাখা সম্ভব নয়। তাদের প্রয়োজন আত্মিক ও নৈতিক পরিশুদ্ধি। মসজিদ যদি শুধু নামাজের স্থান না হয়ে একটি ‘কালচারাল হাব’ বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে, যেখানে প্রতি সপ্তাহে বা মাসে তরুণদের নিয়ে সমসাময়িক বিষয়ে কাউন্সেলিং করা হবে, তবে তারা অপরাধের পথ থেকে ফিরে আসবে।

    মাদক ও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির অবসান : পাড়ার মসজিদ কমিটি যদি মহল্লার প্রতিটি তরুণের খোঁজ রাখে, তাদের সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত করে, তবে কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার সুযোগই থাকবে না। মসজিদে যদি একটি ছোট পাঠাগার থাকে, ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা থাকে (যা শরিয়তসম্মত), তবে তরুণরা অবসর সময়ে সেখানে গিয়ে সুস্থ আড্ডায় মাতবে, মাদকের আড্ডায় নয়।

    সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক নেটওয়ার্ক : একটি মসজিদকেন্দ্রিক সমাজে কেউ না খেয়ে ঘুমাতে পারে না। মহল্লার কার ঘরে চাল নেই, কার সন্তান টাকার অভাবে পরীক্ষা দিতে পারছে না, কার চিকিৎসা আটকে আছে, এই তথ্যগুলো মসজিদের ইমাম বা কমিটির কাছে থাকা উচিত। জুমার খুতবায় পরকালের আলোচনার পাশাপাশি মহল্লার অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বাস্তবমুখী তাগিদ দেওয়া হলে সামাজিক বৈষম্য অনেকটাই কমে আসবে।

    ঘরোয়া সমাধান : আজ সামান্য কারণে মানুষ আদালতে দৌড়াচ্ছে, বছরের পর বছর মামলা লড়ছে এবং সর্বস্বান্ত হচ্ছে। অথচ মসজিদের ইমাম এবং সমাজের বিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি যদি সালিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে পাড়ার ছোটখাটো বিরোধ বা পারিবারিক কলহ মিটিয়ে ফেলে, তবে তা সমাজের শান্তি ফিরিয়ে আনবে এবং আদালতের ওপর চাপ কমাবে।

    রূপরেখা : ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দেশে বেশ কিছু মডেল মসজিদ নির্মিত হয়েছে, যা প্রশংসনীয়। তবে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি আমাদের প্রতিটি সাধারণ মসজিদকেই একেকটি সামাজিক জিয়নকাঠি হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন :

    মসজিদভিত্তিক পাঠাগার : প্রতিটি মসজিদে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি থাকবে, যেখানে ধর্মীয় বইয়ের পাশাপাশি ইতিহাস, বিজ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষার বই থাকবে।

    বিনামূল্যে চিকিৎসাকেন্দ্র ও রক্তদান ব্যাংক : মসজিদের একটা অংশে সপ্তাহে অন্তত একদিন পাড়ার ডাক্তাররা বিনামূল্যে গরিবদের চিকিৎসা দেবেন। একটি ব্লাড ডোনার গ্রুপ থাকবে মসজিদের তত্ত্বাবধানে।

    কর্মসংস্থান ও জাকাত ফান্ড : প্রতিবছর মসজিদের জাকাত ফান্ড দিয়ে মহল্লার অন্তত ৩-৪ জন বেকার যুবককে রিকশা, সেলাই মেশিন বা ছোট দোকান করে দিয়ে স্বাবলম্বী করা যেতে পারে।

    নারীদের অংশগ্রহণ : মদিনার মসজিদে নববীতে নারীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা ছিল। আজ আমাদের সমাজেও নারীদের নৈতিক শিক্ষার জন্য মসজিদে নিরাপদ ও পর্দার সঙ্গে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা উচিত।

    দায়বদ্ধতা : মসজিদকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রধান কারিগর হলেন মসজিদের ইমাম সাহেবরা। তাদের শুধু ‘নামাজ পড়ানোর চাকরিজীবী’ হিসাবে দেখলে চলবে না; তাদের হতে হবে সমাজের পথপ্রদর্শক। ইমামদের সমসাময়িক জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং সামাজিক মনস্তত্ত্বে দক্ষ হতে হবে, যেন তারা তরুণ প্রজন্মের যুক্তির জবাব পরম মমতায় দিতে পারেন। একইসঙ্গে মসজিদ কমিটিতে শুধু সম্পদশালীদের না রেখে সৎ, শিক্ষিত ও উদ্যমী যুবকদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

    মসজিদের মিনার থেকে যে ঐক্যের ডাক আসে, সেই ডাককে শুধু নামাজের কাতারেই নয়, জীবনের প্রতিটি কাতারে ছড়িয়ে দিতে হবে। আসুন, আমাদের মসজিদগুলোকে শুধু পাথরের সৌন্দর্যে নয়, মানবিকতা, শিক্ষা এবং সামাজিক কল্যাণের আলোয় উজ্জ্বল করে তুলি। তবেই গড়ে উঠবে একটি শান্তিময়, অপরাধমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ।

  • তরবারির জোরে নয়, আরব বণিকদের মাধ্যমে ভারতে এসেছিল ইসলাম

    তরবারির জোরে নয়, আরব বণিকদের মাধ্যমে ভারতে এসেছিল ইসলাম

    প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধ আক্রমণের মাধ্যমে ভারতে ইসলামের আগমন ঘটেছিল। একে অনেকে তরবারির শক্তির ওপর ভর করে ইসলামের আগমন বলে মনে করেন। তবে আধুনিক ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেই এই ধারণার সঙ্গে একমত নন।

    তাদের মতে, ভারতে ইসলামের আগমন কোনো একক ঘটনার ফল নয়। এটি কয়েক শতাব্দী ধরে চলা ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার পরিণাম।ভারতে ইসলামের প্রসারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বাণিজ্য। প্রাচীনকাল থেকেই ভারত গোলমরিচের জন্য সারা বিশ্বে পরিচিত ছিল। আরব সাগর শান্ত থাকায় এই সমুদ্রপথে আরব বণিকদের দীর্ঘদিনের প্রভাব ছিল। তারা বর্ষার সময়ে ভারতে আসতেন এবং ব্যবসা শেষে আরবে ফিরে যেতেন।

    বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সৈয়দ সুলেমান নদভীর মতে, ইসলামের আবির্ভাবের পর বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ আরবদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। দীর্ঘদিন যোগাযোগের ফলে দক্ষিণ ভারতে ‘মাপ্পিলা মুসলিম’ নামে এক মুসলিম সম্প্রদায়ের বিকাশ ঘটে।

    রাজনীতিবিদ ও লেখক শশী থারুর প্রায়ই উল্লেখ করেন যে, পরিচিত ও বিশ্বস্ত আরব বণিকদের হাত ধরেই মালাবার উপকূলে ইসলাম এসেছিল। কোনো তলোয়ারের জোরে কেরালায় ইসলাম পৌঁছায়নি। দক্ষিণ ভারতে ইসলামের আগমন সম্পর্কে বেশ কিছু তত্ত্ব প্রচলিত আছে।

    প্রথম তত্ত্ব অনুযায়ী, নবী মোহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই প্রাচীন মুজিরিস বন্দর দিয়ে কেরালায় ইসলাম এসেছিল। ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে মালিক বিন দিনারের উদ্যোগে নির্মিত ‘চেরামন জামা মসজিদ’ এই দাবির পক্ষে বড় প্রমাণ। মসজিদটি প্রতিষ্ঠার পেছনে কেরালার হিন্দু রাজা চেরামন পেরুমলের ইসলাম গ্রহণের গল্পও জড়িয়ে আছে।

    প্রফেসর ইলিয়াসের মতে, আরবরা এখানে মূলত গোলমরিচের ব্যবসা করতে এসেছিলেন। তারা বাণিজ্যের পাশাপাশি হিসাব করার পদ্ধতি, ওজন মাপার কৌশল এবং ভালো নৌকা তৈরির প্রযুক্তিও শিখিয়েছিলেন।

    ঐতিহাসিকদের একাংশ ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধ ও মুলতান দখল এবং পরবর্তীতে দিল্লির সালতানাত প্রতিষ্ঠাকে রাজনৈতিক সম্প্রসারণ হিসেবে দেখেন।

    তবে আধুনিক গবেষকদের মতে, এই জয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা, জোর করে মানুষকে ধর্মান্তরিত করা নয়।

    ভারতে ইসলামের প্রসারে সুফি আন্দোলনও বড় ভূমিকা পালন করেছে। একাদশ শতকের পর চিশতি ও সোহরাওয়ার্দী সিলসিলার সুফি-সন্তরা ভারতের বিভিন্ন অংশে বসতি স্থাপন করেন। তাদের খানকাহ ও দরগাহগুলো আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। আজমেরের খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির দরগাহ এর একটি বড় উদাহরণ, যেখানে সব ধর্মের মানুষ আসেন। ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ন্যায়বিচারের নীতি মানুষকে আকর্ষণ করেছিল।

    ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটনের মতো পণ্ডিতরা আরেকটি নতুন তত্ত্ব দিয়েছেন। তাদের মতে, বাংলা ও পাঞ্জাবের মতো অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার মূলত কৃষি উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। মুসলিম শাসকরা সুফি খানকাহ ও মসজিদগুলোকে অনুর্বর জমি দান করতেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কৃষি বসতি স্থাপন করলে স্থানীয় কৃষকরা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক অগ্রগতির অংশ হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করেন। সব মিলিয়ে, বাণিজ্য, আধ্যাত্মিকতা, রাজনীতি ও সামাজিক সুযোগের এক দীর্ঘ মিশ্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এই অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটেছিল।

  • দুর্গত মানুষের সেবায় আলেমসমাজ

    দুর্গত মানুষের সেবায় আলেমসমাজ

    ইসলামের ইতিহাসে আলেমদের মানবসেবার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ক্ষুধার্তকে খাদ্য দিয়েছেন, এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, অসুস্থদের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং সমাজের দুর্বল মানুষের আশ্রয়স্থল হয়েছেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) গোপনে অসংখ্য দরিদ্র পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিতেন। ইমাম নববি (রহ.) ও অন্যান্য মনীষীও ইলমের পাশাপাশি সমাজকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের জীবন প্রমাণ করে, প্রকৃত আলেম কখনো সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নন; বরং তিনি সমাজের কল্যাণকামী অভিভাবক।

    বাংলাদেশেও আলেমসমাজ দীর্ঘদিন ধরে মানবসেবার অনন্য নজির স্থাপন করে আসছেন। দেশের হাজারো কওমি মাদরাসায় লক্ষাধিক এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থী বিনা খরচে বা অতি স্বল্প ব্যয়ে শিক্ষা, আবাসন এবং খাবারের সুযোগ পাচ্ছে। এটি শুধু শিক্ষাসেবা নয়; বরং একটি বিশাল মানবিক কর্মযজ্ঞ। জাকাত, সদকা, ফিতরা ও মানুষের দানের অর্থে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠান সমাজের অসহায় মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আছে।দুর্যোগকালীন সময়েও আলেম সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড কিংবা শীতপ্রবাহে তারা ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণ, চিকিৎসা সহায়তা, পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান। দেশের বিভিন্ন ইসলামি দাতব্য সংস্থা ও আলেমদের পরিচালিত ফাউন্ডেশনগুলো খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, শীতবস্ত্র এবং নগদ সহায়তা পৌঁছে দিয়ে অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করছে। বর্তমান সময়ে আলেমদের পরিচালিত মানবসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন একটি উল্লেখযোগ্য নাম। শায়খ আহমাদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানটি দাওয়াতি কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যাপক পরিসরে মানবকল্যাণমূলক কাজ পরিচালনা করছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি ত্রাণ, রান্না করা খাবার, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসামগ্রী ও নগদ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়া এতিম প্রতিপালন, অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা, দরিদ্র পরিবারের পুনর্বাসন, ঘর নির্মাণ, নলকূপ স্থাপন, মসজিদ নির্মাণ, কোরবানির মাংস বিতরণ, রমজানে ইফতার ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ এবং শীতবস্ত্র বিতরণসহ নানা মানবিক কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবকের সমন্বয়ে পরিচালিত এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে, আলেমদের নেতৃত্বে আধুনিক ও সুসংগঠিত মানবসেবা কতটা কার্যকর হতে পারে।

    আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের পাশাপাশি দেশের আরো উলামায়ে কেরাম পরিচালিত অনেক প্রতিষ্ঠান নীরবে মানবকল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। যেমন মাওলানা গাজী ইয়াকুব পরিচালিত তাকওয়া চ্যারিটি ফাউন্ডেশন, মাওলানা রজীবুল হক পরিচালিত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) সেবা ফাউন্ডেশন, মাওলানা ইমরান হাবিবি পরিচালিত পিপলস ইমপ্রুভমেন্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশ এবং হাফেজ্জী চ্যারিটি ফাউন্ডেশনসহ অর্ধশতাধিক ইসলামি দাতব্য প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন মাদরাসাকেন্দ্রিক ট্রাস্ট, এতিমখানা, দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র ও ত্রাণসংস্থা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে। প্রচারের আলোয় না এলেও তাদের অবদান বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক সহমর্মিতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।আলেম সমাজের মানবসেবা শুধু ত্রাণ বিতরণেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা নৈতিক অবক্ষয় রোধ, মাদকবিরোধী সচেতনতা, পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি, যুবসমাজকে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের উপদেশ ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ সঠিক পথে ফিরে আসে, যা সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়।

    বর্তমান বিশ্বে মানবসেবাকে আরও কার্যকর করতে আলেম সমাজের উচিত আধুনিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করলে মানবকল্যাণের পরিধি আরো বিস্তৃত হবে। এতে ইসলামের দয়া, ন্যায় ও সহমর্মিতার শিক্ষা মানুষের সামনে আরো উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠবে।

    আলেম সমাজ শুধু ধর্মীয় নেতা নন; তারা সমাজের বিবেক, নৈতিকতার পথপ্রদর্শক এবং মানবকল্যাণের অগ্রদূত। তাদের পরিচালিত মানবসেবামূলক কার্যক্রম ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরে। আজকের সমাজে এমন আলেম ও এমন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন আরো বেশি, যারা মানুষকে শুধু কথায় নয়, কর্মের মাধ্যমেও ইসলামের মহান আদর্শের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেবে। মানবসেবায় নিবেদিত আলেম সমাজই পারে একটি সহমর্মী, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে।

  • দুর্যোগ মোকাবিলায় ইসলামের শিক্ষা

    দুর্যোগ মোকাবিলায় ইসলামের শিক্ষা

    প্রকৃতির নিয়মে পৃথিবীতে নানা ধরনের দুর্যোগ আসে। কখনো বন্যা, কখনো ঘূর্ণিঝড়, কখনো ভূমিকম্প, কখনো অগ্নিকাণ্ড, আবার কখনো অতিবৃষ্টি বা খরায় মানুষের স্বাভাবিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এসব দুর্যোগে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারান, লাখো পরিবার গৃহহীন হয়, কৃষকের ফসল নষ্ট হয়, জীবিকা হারিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন অসংখ্য মানুষ। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে বটে, কিন্তু প্রকৃতির প্রবল শক্তির সামনে মানুষ আজও অসহায়। এমন বাস্তবতায় ইসলাম দুর্যোগকে শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখে না; বরং এটি ঈমান, আত্মসমালোচনা, মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধের আলোকে মূল্যায়ন করে। পাশাপাশি ইসলাম দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য এমন কিছু নীতিমালা প্রদান করেছে, যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পর্যায়েই প্রাসঙ্গিক।

    ১. ইসলাম শিক্ষা দেয়—দুর্যোগের সময় একজন মুমিন আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা রাখবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা আল-বাকারা : ১৫৫) এই আয়াত আমাদের জানিয়ে দেয়, বিপদ-মসিবত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই দুর্যোগে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা একজন মুমিনের প্রথম পরিচয়।২. দুর্যোগের সময় তাওবা, ইস্তিগফার ও দোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। বিপদ মানুষকে তার অসহায়ত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, বেশি বেশি ইস্তিগফার করা, সালাত আদায় করা এবং আন্তরিকভাবে দোয়া করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।’ (সুরা আল-বাকারা : ৪৫) একজন মুমিন জানেন, প্রকৃত সাহায্য একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকেই আসে।

    ৩. ইসলাম শুধু দোয়ার শিক্ষা দেয় না; বরং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণেরও নির্দেশ দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক সাহাবিকে বলেছিলেন, ‘আগে উটটি বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (জামে তিরমিজি) এই হাদিস আমাদের শেখায়, সতর্কতা, পরিকল্পনা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; বরং তারই অংশ। তাই দুর্যোগের পূর্বাভাস মেনে চলা, নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, উদ্ধার-প্রস্তুতি গ্রহণ এবং ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা করা ইসলামি দৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ।

    ৪. দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ঈমানের দাবি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করো।’ (সুরা আল-মায়িদাহ : ২) বন্যার্ত মানুষের জন্য খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, পোশাক ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া—এসবই ইসলামের দৃষ্টিতে মহৎ ইবাদত।

    রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের একটি দুনিয়াবি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’ (মুসলিম : ২৬৯৯) আবার তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ তাঁর বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (মুসলিম) এসব হাদিস প্রমাণ করে, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক কাজ নয়; বরং আখিরাতের সফলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

    ৫. ইসলাম গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়াতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। দুর্যোগের সময় যাচাইহীন তথ্য, অতিরঞ্জিত সংবাদ বা আতঙ্ক সৃষ্টিকারী প্রচারণা মানুষের কষ্ট আরো বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা! যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা আল-হুজুরাত : ৬) বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই নির্দেশনার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে।

    ৬. ইসলাম দুর্যোগকে কেন্দ্র করে অন্যায় লাভের সব পথ বন্ধ করতে চায়। ত্রাণ আত্মসাৎ, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগানো ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। একজন মুসলমান সংকটকে ব্যবসার সুযোগ নয়, বরং সেবার সুযোগ হিসেবে দেখেন।

    ৭. দুর্যোগের সময় ইখলাস বা একনিষ্ঠতার গুরুত্ব অপরিসীম। দান-সদকা কিংবা মানবসেবা মানুষের প্রশংসা অর্জনের জন্য নয়; বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে নষ্ট করো না।’ (সুরা আল-বাকারা : ২৬৪) তাই সাহায্য এমনভাবে করতে হবে, যাতে বিপদগ্রস্ত মানুষের আত্মসম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে।

    ৮. ইসলাম দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ওপরও গুরুত্ব দেয়। শুধু ত্রাণ বিতরণ করেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, জীবিকা ফিরিয়ে আনা, শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা, অসুস্থদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাও ইসলামি দায়িত্বের অংশ। মানবকল্যাণে ধারাবাহিক প্রচেষ্টাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।

    সবশেষে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে ‘এটি আল্লাহর গজব’ বলে ঘোষণা দেওয়া আমাদের কাজ নয়, যদি সে বিষয়ে কোরআন-সুন্নাহতে স্পষ্ট দলিল না থাকে। একজন মুমিনের কাজ হলো বিপদ থেকে শিক্ষা নেওয়া, নিজের আমল পর্যালোচনা করা, তাওবা করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

    আজ আমাদের দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে। এই বাস্তবতায় ইসলামের শিক্ষা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—দুর্যোগ শুধু রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠানের একার দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। ব্যক্তি, পরিবার, মসজিদ, মাদরাসা, সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবক, ব্যবসায়ী এবং রাষ্ট্র—সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় দুর্যোগের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

  • জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়ার গুরুত্ব

    জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়ার গুরুত্ব

    ইসলামে জুমাবারকে মুসলমানদের ঈদের দিন বলা হয়। এই দিনে আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত ও বরকত নাজিল হয়। জুমার দিনে কিছু বিশেষ আমলের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এর মধ্যে অন্যতম হলো সুরা কাহাফ তিলাওয়াত।

    হাদিসে এসেছে, পৃথিবীতে সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উত্তম দিন হলো জুমার দিন। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “সূর্য উদিত হওয়া দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৪)

    আরেক হাদিসে তিনি বলেন, “দিনগুলোর মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দিন হলো জুমার দিন।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১০৮৪)

    ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্য জুমার দিনের এই বিশেষ মর্যাদা নির্ধারিত ছিল না। মহান আল্লাহ শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উম্মতকে এই বিশেষ দিন উপহার হিসেবে দান করেছেন।

    সুরা কাহাফ পাঠের বিশেষ ফজিলত

    পবিত্র কোরআনের ১৮তম সুরা হলো সুরা কাহাফ। এতে মোট ১১০টি আয়াত রয়েছে। হাদিসে জুমার দিনে এই সুরা তিলাওয়াতের অসংখ্য ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে।

    রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত নূর (আলো) বিচ্ছুরিত হবে।”

    (সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকি, হাদিস: ৫৯৯৬; মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ২১৭৫)

    হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করবে, সে আট দিন পর্যন্ত সব ধরনের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে। আর যদি দাজ্জাল বের হয়, তবে সে দাজ্জালের ফিতনা থেকেও নিরাপদ থাকবে।”

    (হাদিসুজ জুহরি, হাদিস: ১২৭; আল-আহাদিসুল মুখতারাহ, হাদিস: ৪৩০)

    দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষার আমল

    হযরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

    “যে ব্যক্তি সুরা কাহাফের প্রথম ১০ আয়াত মুখস্থ করবে, সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে।”

    (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮০৯)

    কিয়ামতের দিন নূরের সুসংবাদ

    হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

    “যে ব্যক্তি সুরা কাহাফ যেভাবে নাজিল হয়েছে সেভাবে তিলাওয়াত করবে, কিয়ামতের দিন তা তার জন্য নূর হবে।”

    (শুআবুল ঈমান, হাদিস: ২২২১)

    কোরআন তিলাওয়াতে নাজিল হয় রহমত

    হযরত বারা ইবনে আজিব (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাতে সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করছিলেন। এ সময় একটি মেঘ এসে তাকে ঢেকে ফেলে এবং তার ঘোড়া অস্থির হয়ে ওঠে। পরদিন তিনি ঘটনাটি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জানালে তিনি বলেন,

    “ওটি ছিল সাকিনা (আল্লাহর রহমত), যা কোরআন তিলাওয়াতের কারণে নাজিল হয়েছিল।”

    (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০১১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৯৫)

    মুমিনের করণীয়

    জুমার দিন শুধু নামাজ আদায় করাই নয়, বরং বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ শরিফ পাঠ, দোয়া, জিকির ও বিশেষভাবে সুরা কাহাফ পাঠ করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। হাদিসে বর্ণিত এই আমলগুলো একজন মুমিনের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, নূর, রহমত এবং নানা ফিতনা থেকে নিরাপত্তার সুসংবাদ বহন করে।