ধর্ম ও ইসলাম

  • জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য যে দোয়া পড়বেন

    জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য যে দোয়া পড়বেন

    মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করা। তাই একজন মুমিন প্রতিদিনের জীবনে এমন আমল করার চেষ্টা করেন, যেগুলো তাকে আল্লাহর রহমত ও নাজাতের কাছাকাছি নিয়ে যায়।

    হজরত মুসলিম ইবনুল হারিস আত-তামিমি (রহ.) তাঁর পিতা হারিস ইবনে মুসলিম আত-তামিমি (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে গোপনে বলেন, ‘তুমি যখন মাগরিবের নামাজ শেষ করবে, তখন সাতবার এই দোয়াটি বলবে। তুমি যদি তা বলার পর ওই রাতে মৃত্যুবরণ করো, তাহলে তোমার জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির সুরক্ষা লেখা হবে। আর যখন ফজরের নামাজ শেষ করবে, তখনও অনুরূপ বলবে। তুমি যদি ওই দিন মৃত্যুবরণ করো, তাহলে তোমার জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির সুরক্ষা লেখা হবে।’

    দোয়াটি হলো—

    আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান নার।

    অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।

    (আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৭৯; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৮০৫৪)

    হাদিসে বর্ণিত এই দোয়াটি মাগরিব ও ফজরের নামাজের পর সাতবার পড়ার কথা বলা হয়েছে। তবে শুধু এই আমলকেই জাহান্নাম থেকে মুক্তির একমাত্র মাধ্যম মনে করা উচিত নয়।

    বরং নামাজ, তওবা, ফরজ-ওয়াজিব আদায়, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, নেক আমল এবং আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশার পাশাপাশি এই দোয়াটিও নিয়মিত পড়া উচিত।

  • নবীজীবনচর্চায় নতুন আলো

    নবীজীবনচর্চায় নতুন আলো

    মানবসভ্যতার ইতিহাসে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর জীবন ও কর্ম নিয়ে যত বেশি চর্চা, গবেষণা এবং লেখালেখি হয়েছে, অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন নজির দেখা যায় না। তার জীবন ও কর্ম নিয়ে যত বিস্তৃত গবেষণা, আলোচনা এবং জীবনী রচিত হয়েছে, ইতিহাসে তার কোনো তুলনা নেই। সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই তার সিরাত (জীবনচরিত) ও সুন্নাহ (আদেশ-নিষেধ ও জীবননির্দেশনা) সংরক্ষণ ও লিপিবদ্ধ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন যুগে, নানা পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গিতে সিরাত এবং সুন্নাহচর্চা ক্রমেই বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ হয়েছে।

    মুসলিম সভ্যতার প্রতিটি যুগেই মহানবী (সা.)-এর জীবন নিয়ে গবেষণা ও রচনাকর্ম হয়েছে। কখনো তার সমগ্র জীবনকে ধারাবাহিক ও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে; কখনো বিভিন্ন বর্ণনার সত্যতা যাচাই, সনদ পরীক্ষা এবং ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে; আবার কখনো তার জীবনের কোনো বিশেষ ঘটনা, বৈশিষ্ট্য বা দিককে কেন্দ্র করে আলোচনা করা হয়েছে। তার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিরা যেমন তার জীবনচরিত রচনা করেছেন, তেমনি বিদ্বেষী এবং বিরোধীরাও তাকে নিয়ে লিখেছে। এমনকি নিরপেক্ষ ও ন্যায়নিষ্ঠ গবেষকরাও তার জীবন এবং কর্মকে তাদের গবেষণার বিষয় করেছেন। ফলে মহানবী (সা.)-এর সিরাত যুগে যুগে ভালোবাসা, বিরোধিতা ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান—তিন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষেরই আগ্রহের বিষয় হয়ে থেকেছে।সিরাতচর্চার দুটি ধারা

    মহানবী (সা.)-এর সিরাত নিয়ে প্রচলিত চর্চাকে মূলগতভাবে দুটি প্রধান ধারায় ভাগ করা যায়। প্রথম ধারা হলো ‘ঐতিহাসিক বর্ণনাভিত্তিক সিরাতচর্চা’। এ ধারায় মহানবী (সা.)-এর জন্ম, জন্মের পূর্ববর্তী সময় ও তৎকালীন পরিবেশ থেকে শুরু করে তার ইন্তেকাল এবং ইন্তেকাল-পরবর্তী ঘটনাবলি ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হয়।

    এই ধারার মধ্যেও রয়েছে একাধিক গবেষণাপদ্ধতি। সনদ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন না করেই কেউ আলোচিত সব তথ্য একত্র করেছেন। আবার কেউ তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সনদ নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করেছেন; যেসব বর্ণনা বিশুদ্ধ, সেগুলো গ্রহণ করেছেন এবং যেগুলো প্রমাণিত নয় বা দুর্বল, সেগুলোর ব্যাপারেও পাঠককে সতর্ক করেছেন। এই ধারার আরেকটি প্রবণতা হলো, সিরাতের ঘটনাবলি আলোচনা করে সেখান থেকে শিক্ষা, উপদেশ ও জীবনের নানা দিকনির্দেশনা আহরণ করা। কারো আলোচনায় সাধারণ শিক্ষাগুলো গুরুত্ব পেয়েছে, আবার কেউ বিশেষ কোনো শিক্ষা বা তাৎপর্যের ওপর জোর দিয়েছেন।

    সিরাতচর্চার দ্বিতীয় ধারাটিও প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। এ ধারায় মহানবী (সা.)-এর জীবনের কোনো একটি বিশেষ দিককে বেছে নিয়ে সেটিকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয়। মুসলিম ঐতিহ্যে এর প্রাথমিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় মহানবী (সা.)-এর শামায়েল (বাহ্যিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য) এবং খাসায়েস (বিশেষ বৈশিষ্ট্য) নিয়ে রচিত গ্রন্থগুলোয়। কাজী ইয়াজ, মাকরিজি প্রমুখের রচনায় এ ধরনের চর্চার উদাহরণ রয়েছে।

    আধুনিক যুগে মহানবী (সা.)-এর জীবনের বিশেষ কোনো দিক নিয়ে গবেষণার এই ধারা আরো বিকশিত হয়েছে। সিরাতের নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে অনেক বইপত্র। আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ, খালিদ মুহাম্মদ খালিদ, ইউসুফ আল-কারজাবি, মাহমুদ শিত খাত্তাব ও অন্যরা এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।

    পাশাপাশি পাশ্চাত্য লেখকদের মধ্যেও মহানবী (সা.)-এর জীবন নিয়ে গবেষণা করেছেন। এসব রচনার মধ্যে যেমন ন্যায়নিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি পক্ষপাতদুষ্ট ও বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থিতিরও প্রমাণ পাওয়া যায়।

    সিরাতচর্চার তৃতীয় ও নতুন আরেকটি ধারা

    সিরাতচর্চায় তৃতীয় একটি ধারা রয়েছে, যে ধারায় তেমন বিস্তৃত চর্চা হয়নি। বরং অল্প কয়েকজন লেখক এ পদ্ধতিতে কাজ করেছেন। এই ধারার বিষয় শুধু মহানবী (সা.)-এর জীবনচরিত নয়; বরং যারা লেখক ও গ্রন্থকার হিসেবে নবীজির সিরাত নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের নানা দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সিরাতকে নতুন করে পাঠ করা।

    এ পদ্ধতিকে আমরা বলতে পারি ‘তুলনামূলক সিরাতচর্চা’—অর্থাৎ সিরাতের কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন লেখক কীভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা পাশাপাশি রেখে তুলনামূলক আলোচনা করা। কারণ প্রত্যেক লেখক তার নিজস্ব সংস্কৃতি, সাহিত্যিক পরিমণ্ডল, ভাষাশৈলী এবং মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার আলোকে সিরাতের ঘটনা বিশ্লেষণ করেন। ফলে একই ঘটনা নিয়ে তাদের লেখায় বৈচিত্র্যময় চিন্তা, সৃজনশীলতা ও অন্তর্দৃষ্টির প্রকাশ ঘটে।

    ফিকহের ক্ষেত্রে যেমন তুলনামূলক ফিকহ রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ফকিহের মতামত ও ফিকহি সিদ্ধান্তের তুলনা করা হয়; এসব মতের পেছনের প্রেরণা, কারণ ও যুক্তি বিশ্লেষণ করা হয়; কোনো একটি মতের পেছনে থাকা ফিকহি দর্শন এবং তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিধানগুলোও পর্যালোচনা করা হয়। তাফসির শাস্ত্রেও এই পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা যায়।

    তাই সিরাতের ক্ষেত্রেও যদি এ ধরনের তুলনামূলক পদ্ধতিতে গবেষণা করা হয়, তাহলে মহানবী (সা.)-এর সিরাতচর্চায় নতুন ও স্বতন্ত্র একটি ধারা সৃষ্টি হবে। এর মাধ্যমে সিরাতের অনেক দিক ও তাৎপর্য সামনে আসবে, বিচ্ছিন্নভাবে পাঠ করলে যা হয়তো আমাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়বে না। ফলে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে বোঝার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি সিরাতচর্চাকে আরো সমৃদ্ধ এবং গভীর করে তুলতে পারে।

    বিয়ুমির দৃষ্টান্ত

    ড. মুহাম্মদ রজব আল-বায়ুমি ছাড়া এ ধরনের প্রচেষ্টা আর কারো মধ্যে আমার চোখে পড়েনি। তবে তিনি তুলনামূলক সিরাতচর্চার কোনো স্বতন্ত্র পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এই পদ্ধতিতে লেখেননি; বরং সিরাত রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন মাত্র। তার প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল من روائع السيرة النبوية: الرسول يبكي ولده إبراهيم (সিরাতের অনুপম সৌন্দর্য : সন্তান ইব্রাহিমের জন্য রাসুলের কান্না)। প্রবন্ধটি ‘ফি মিজানিল ইসলাম’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এতে তিনি মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভে জন্ম নেওয়া নবীজি (সা.)-এর ছেলে ইব্রাহিমের অল্প বয়সে ইন্তেকালের ঘটনা আলোচনা করেছেন।

    বায়ুমি সমকালীন সাহিত্যিক ও চিন্তক আব্বাস আল-আক্কাদ, তাহা হুসাইন, আহমদ হাসান আল-জাইয়াত ও মুহাম্মদ হুসাইন হাইকলের সিরাতগ্রন্থে এ ঘটনাটির উপস্থাপন নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেছেন।

    সিরাতের গ্রন্থগুলোতে ঘটনাটি বড়জোর আধা থেকে এক পৃষ্ঠার হলেও, এই চার সাহিত্যিকের কলমে তা অসাধারণ মূল্যবান হয়ে উঠেছে। প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল ভিন্ন। আক্কাদ প্রথমে যুক্তি ও বুদ্ধির মাধ্যমে বিষয়টি দেখেছেন, এরপর আবেগের দিকে গেছেন; তাহা হুসাইন ঠিক বিপরীতভাবে আবেগ দিয়ে শুরু করে যুক্তিতে পৌঁছেছেন। যাইয়াত নিজের সন্তান হারানোর অভিজ্ঞতা থেকে এ ঘটনায় সান্ত্বনা ও শিক্ষা খুঁজে পেয়েছেন। আর হাইকল ঘটনাটিকে প্রবহমান সাহিত্যিক ভাষায় বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করেছেন।

    এই ধারণার পক্ষে আরো কিছু দৃষ্টান্ত

    বায়ুমি যে আঙ্গিকে আলোচনা করেছেন, সেটি ছাড়াও এ ধারার গবেষণা পদ্ধতির পক্ষে অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। দেখা যায়, প্রত্যেক ফকিহ বা সাহিত্যিক মহানবী (সা.)-এর জীবনের কোনো ঘটনা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন। এসব দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে নবুয়তের আরো পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্ট চিত্র আমাদের সামনে বিকশিত হবে।

    এর একটি দৃষ্টান্ত ইউসুফ আল-কারজাবি ও খালিদ মুহাম্মদ খালিদের রচনায় পাওয়া যায়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রথম আঘাতে একটি কাকলাস (টিকটিকি জাতীয় একধরনের সরীসৃপ) হত্যা করবে, তার জন্য একশ নেকি লেখা হবে। দ্বিতীয় আঘাতে এর চেয়ে কম এবং তৃতীয় আঘাতেও এর চেয়ে কম (নেকি পাবে)।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর : ৫৭৪০)

    প্রথম আঘাতের জন্য ১০০ নেকি এবং পরবর্তী আঘাতের জন্য ক্রমহ্রাসমান নেকি কেন, এর ব্যাখ্যায় ইউসুফ কারজাবি একজন আইনজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলেছেন, এটা মূলত সঠিকভাবে লক্ষ্যভেদ করার দক্ষতার পুরস্কার। শত্রুর মোকাবিলায় কাজে লাগাতে মুসলমানের এ ধরনের দক্ষতা থাকা প্রয়োজন।

    অন্যদিকে খালিদ মুহাম্মদ খালিদের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তার মতে, এখানে নেকির পুরস্কারের মধ্য দিয়ে মূলত দয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। যদি কাকলাসকে হত্যা করতেই হয়, তবে যেন দ্রুত হত্যা করা হয়; কারণ বারবার আঘাত করলে প্রাণীটি অযথা কষ্ট পাবে।

    আমরা যে পদ্ধতিকে ‘তুলনামূলক সিরাতচর্চা’ নামে অভিহিত করছি, তা সিরাতের বিস্তৃত ভান্ডারে ছড়িয়ে থাকা অমূল্য রত্নগুলোকে পাঠকের সামনে তুলে আনার একটি কার্যকর পথ হতে পারে। বিশেষত সিরাতের এমন সব পার্শ্বঘটনা ও অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত বিষয় রয়েছে, যেগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষা অনেক সময় বৃহৎ বর্ণনার আড়ালে পড়ে যায়।

    সিরাতের লেখক ও কবিরা সাধারণত মহানবী (সা.)-এর জীবনের বড় ঘটনাগুলোর প্রতিই বেশি মনোযোগ দেন। নবীজির জন্ম, নবুয়তপ্রাপ্তি, হিজরত ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের মতো ঘটনাগুলো তাদের রচনায় প্রাধান্য পায়। অথচ তার জীবনের অনেক ছোট ও আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ঘটনার মধ্যেও নিহিত রয়েছে গভীর তাৎপর্য, মূল্যবান শিক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ঈমানি ও জাগতিক দিকনির্দেশনা। সেই বিস্মৃত বা আড়ালে থাকা রত্নগুলো খুঁজে বের করে বিভিন্ন লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে একত্র করা গেলে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে আরো গভীর, পূর্ণাঙ্গ ও বহুমাত্রিকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।

  • আজ ১২ রবিউল আউয়াল, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

    আজ ১২ রবিউল আউয়াল, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

    বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল আজ। দিনটি মুসলিম বিশ্বের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও যথাযোগ্য মর্যাদায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালন করছেন।

    মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন ইসলামের সর্বশেষ নবী ও রাসুল। তাওহিদের বাণী নিয়ে পৃথিবীতে তাঁর আগমন। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন, ন্যায় ও সত্যের পথে চলা এবং অন্যায়-অবিচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তাঁর শিক্ষা মানুষের মধ্যে শান্তি, ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছে।

    ইসলামি ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, সৌদি আরবের মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে ১২ রবিউল আউয়াল মহানবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। একই তারিখে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর জন্ম ও ওফাতের স্মরণে মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে দিনটি বিশেষ মর্যাদার।

    জাহেলিয়াতের অন্ধকারে আলোর বার্তা

    মহানবী (সা.) এমন এক সময়ে পৃথিবীতে আগমন করেন, যখন তৎকালীন আরব সমাজ নানা কুসংস্কার, পৌত্তলিকতা, গোত্রীয় সংঘাত, অবিচার ও নৈতিক অবক্ষয়ে জর্জরিত ছিল। ইতিহাসে সেই সময়কে আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

    এই পরিবেশে মহানবী (সা.) মানুষকে একত্ববাদের দিকে আহ্বান জানান। তাঁর প্রচারের মাধ্যমে সত্য, ন্যায়, সাম্য, দয়া ও মানবিক মর্যাদার শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামের শান্তি ও কল্যাণের বার্তা ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।মহানবী (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহ এবং মা আমিনা। জন্মের আগেই তিনি পিতাকে হারান। ছয় বছর বয়সে তাঁর মা-ও ইন্তেকাল করেন। এতিম অবস্থায় বেড়ে উঠলেও শৈশব থেকেই তাঁর চরিত্রে সততা, বিশ্বস্ততা, সংযম ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত দেখা যায়। এ কারণেই মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত হিসেবে অভিহিত করত।

    ওহি নাজিল ও নবুওয়াতের সূচনা

    ৪০ বছর বয়সে মক্কার হেরা গুহায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর নবুওয়াতের দায়িত্ব। এরপর তিনি মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে জীবন পরিচালনার আহ্বান জানান।

    তিনি মিথ্যা, জুলুম, শোষণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। একই সঙ্গে দরিদ্র, এতিম, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেন। তাঁর আদর্শে মানুষের মর্যাদা, পারস্পরিক ভালোবাসা, ক্ষমা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

    মক্কায় ইসলাম প্রচারের সময় মহানবী (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের কঠিন নির্যাতন ও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। সেখানে তিনি পারস্পরিক অধিকার, দায়িত্ব, সহাবস্থান ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি সুশৃঙ্খল সমাজ প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

    দীর্ঘ ২৩ বছর নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করে মহানবী (সা.) মানবজাতির কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেন। ৬৩ বছর বয়সে মদিনায় তাঁর ইন্তেকাল হয়। তাঁর ওফাত মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর শোকের ঘটনা হয়ে আছে।

    ইবাদত ও ধর্মীয় কর্মসূচি

    পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দিনটি বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে পালন করছেন। কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ পাঠ, নফল নামাজ, দোয়া-মোনাজাত ও দান-খয়রাতের পাশাপাশি অনেকেই নফল রোজা রাখছেন।

    দেশের বিভিন্ন মসজিদ, ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের উদ্যোগে মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা, ওয়াজ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে মহানবী (সা.)-এর জীবন, কর্ম ও মানবতার জন্য তাঁর শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।

    রাষ্ট্রপতির বাণী

    পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন।

    রাষ্ট্রপতি বলেন, “বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সংঘাত, হিংসা, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায় ও মানবিকতার শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় পরিহারের পাশাপাশি শান্তি, সম্প্রীতি ও সাম্যের সমাজ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।তিনি মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।

    প্রধানমন্ত্রীর বাণী

    এদিকে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, ক্ষমা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

    প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মহানবী (সা.)-এর জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি এতিম, দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।”

    পরিবার, প্রতিবেশী, নারী ও শিশু এবং সমাজের দুর্বল ও পিছিয়ে থাকা মানুষের অধিকার রক্ষায় মহানবী (সা.) যে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা অনুসরণের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর আদর্শ মানুষে মানুষে বিভেদ দূর করে ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধকে শক্তিশালী করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

    ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষকালব্যাপী আয়োজন

    পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে রাজধানীতে পক্ষকালব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব সাহানে গতকাল মঙ্গলবার বাদ মাগরিব এসব কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়।

    আয়োজনের মধ্যে রয়েছে মাহফিল, সম্মেলন, সেমিনার, কবিতা পাঠ, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, প্রকাশনা ও প্রদর্শনী। মহানবী (সা.)-এর জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক নিয়ে এসব অনুষ্ঠানে আলোচনা করা হবে।

    এ ছাড়া জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব ও দক্ষিণ চত্বরে মাসব্যাপী ইসলামি বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ইসলামি বই ও ধর্মীয় সাহিত্য প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে।

    পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মহানবী (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষা স্মরণ করছেন। তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে সত্য, ন্যায়, শান্তি, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাই হোক এ দিনের অন্যতম প্রত্যাশা।

  • শরিয়াহবিরোধী আইন মেনে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না

    শরিয়াহবিরোধী আইন মেনে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না

    কোরআন ও হাদিসবিরোধী কোনো আইন সংবিধানে থাকলে তা এমনিতেই বাতিল। শরিয়াহবিরোধী কোনো আইন মেনে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না—এমন মন্তব্য করেছেন বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আব্দুল মালেক।

    বুধবার সকালে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে আয়োজিত শানে রেসালত সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনী, আদর্শ ও ইসলামি শরিয়াহর বিভিন্ন দিক নিয়ে সম্মেলনে আলোচনা করা হয়।মাওলানা আব্দুল মালেক বলেন, আইন প্রণেতারা পশ্চিমা থেকে আইন ও বিধান গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু দেশীয় ব্যবস্থাপনা আইনকে ইসলামি শরিয়াহর সমতুল্য মনে করার সুযোগ নেই। ভুলবশত এমন কোনো আইন প্রণয়ন ও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকলে, যা কোরআন-হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশনার পরিপন্থি, তা সংশোধন বা বাতিল করতে হবে।

    তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা সংবিধান রক্ষা ও সংরক্ষণের শপথ নেন। কিন্তু সংবিধানের কোনো বিধান যদি কোরআন, হাদিস, আকিদা ও ইসলামী শরিয়াহর মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শরিয়াহবিরোধী আইনের শুধু প্রতিবাদ করলেই হবে না, সেগুলো পরিবর্তন বা বাতিলের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

    কাদিয়ানিদের প্রসঙ্গে মাওলানা আব্দুল মালেক বলেন, তারা নিজেদের মুসলমান দাবি করে নামাজ ও জাকাত আদায়ের কথা বলে। তাদের উপাসনালয়েও ইসলামি নানা নিদর্শন দেখা যায়। কিন্তু তাদের আকিদা ও বিশ্বাসের সঙ্গে মূলধারার ইসলামি আকিদার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

    তিনি বলেন, পৃথিবীতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ রয়েছেন। তারা নিজেদের নিজ নিজ ধর্মের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু কাদিয়ানিদের নিয়ে মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিন ধরে আকিদাগত বিতর্ক রয়েছে। তারা প্রতারক বেইমান দাজ্জাল।

    সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলাম কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা শাব্বির আহমাদ রশিদ। এতে হেফাজতে ইসলামের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী, আলেম-ওলামা ও বিপুলসংখ্যক মুসল্লি উপস্থিত ছিলেন।

    বক্তারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ, ইসলামি মূল্যবোধ সমুন্নত রাখা এবং ধর্মীয় বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সম্মেলন ঘিরে সকাল থেকেই কটিয়াদী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

  • ২০২৭ সালের রমজান ও ঈদের সম্ভাব্য তারিখ প্রকাশ

    ২০২৭ সালের রমজান ও ঈদের সম্ভাব্য তারিখ প্রকাশ

    নতুন বছর শুরু হতে এখনও প্রায় চার মাস বাকি। তবে এরই মধ্যে ২০২৭ সালের ক্যালেন্ডার ঘিরে আগ্রহ বাড়ছে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের মধ্যে। বিশেষ করে, পবিত্র রমজান কবে শুরু হতে পারে এবং ঈদুল ফিতর কোন দিনে পালিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—তা নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।

    জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গাণিতিক হিসাবের ভিত্তিতে ১৪৪৮ হিজরি সনের পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য তারিখ প্রকাশ করেছে জর্ডান নিউজ। তবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করায় রমজান ও ঈদুল ফিতরের চূড়ান্ত তারিখে একদিন এদিক-সেদিক হতে পারে।

    মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব রাজ্যের হিজরি ক্যালেন্ডারের ওয়েবসাইট স্পষ্ট করেছে যে, ১৪৪৮ হিজরির রমজান মাস ২০২৭ সালের প্রথম তৃতীয়াংশের মধ্যে পড়বে এবং আগামী বছর রমজান শুরুর সম্ভাব্য দিনটি হতে পারে ৮ ফেব্রুয়ারি। ক্যালেন্ডারে দিনটি সোমবার পড়েছে।

    প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের পবিত্র রমজানের নতুন চাঁদ দেখা যাবে শনিবার, যা ১৪৪৮ সালের শাবান মাসের ২৯ তারিখের সঙ্গে মিলে যায়।এর ফলে হিজরি বর্ষের অষ্টম মাসটি (৩০ দিন) পূর্ণ হবে এবং ৭ ফেব্রুয়ারি (রোববার) তা শেষ হবে। আর এর পরদিন ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পবিত্র রমজান মাস শুরু হবে।

    এ ছাড়া ২০২৭ সালের পবিত্র ঈদুল ফিতরের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪৪৮ হিজরি সনের রমজান মাস ২৯ দিন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যা আগামী বছরের ৮ মার্চ (সোমবার) শেষ হতে পারে।

  • ৯৮ বছর ধরে কবরের পাশে টানা কোরআন তেলাওয়াত

    ৯৮ বছর ধরে কবরের পাশে টানা কোরআন তেলাওয়াত

    ‘কবরের পাশে কোরআন তেলাওয়াত করলে কবরে আজাব কম হবে’— বলেছিলেন এক পীর। পীরের এমন নির্দেশনা থেকে ৯৮ বছর ধরে ধরে ২৪ ঘণ্টা কোরআন তেলাওয়াত চলছে কবরের পাশে। ঘটনাটি টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার ৭০০ বছরের পুরোনো নওয়াব শাহি জামে মসজিদের সামনে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর কবরের।

    মসজিদের দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে রয়েছে নওয়াব পরিবারের সবার কবর। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় ব্যতীত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়েও থেমে থাকেনি কোরআন তেলাওয়াত। চারজন হাফেজ পালাক্রমে চালিয়ে যাচ্ছেন এ কার্যক্রম।

    পীরের নির্দেশনায় কবরের আজাব থেকে মুক্তি পেতে ১৯২৭ সালে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এ মসজিদে সার্বক্ষণিক কোরআন তেলাওয়াত করার ব্যবস্থা করেন। ১৯২৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী।

    মসজিদের একপাশে মিনারের মধ্যে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। তার মৃত্যুর পরও কবরের পাশেই চলমান রয়েছে কোরআন তেলাওয়াত। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হচ্ছে, নামাজের সময় ছাড়া এক মিনিটের জন্যও বন্ধ হয় না কোরআন তেলাওয়াত।

    মসজিদের পাশেই রয়েছে শান বাঁধানো ঘাট ও কবরস্থান। ওয়াক্ফকৃত সম্পদের আয় দিয়ে মসজিদ, পার্শ্ববর্তী মাদরাসা ও ঈদগাহ পরিচালিত হয়। প্রতিদিনই দূরদূরান্ত দর্শনার্থীরা ভিড় জমায় মসজিদ ও কোরআন তেলাওয়াত দেখতে।

    হাফেজ ফারুক আহম্মেদ বলেন, ‘ওস্তাদের নির্দেশনায় কবরের আজাব থেকে মুক্তি পেতে ১৯২৭ সালে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এ মসজিদে সার্বক্ষণিক কোরআন তেলাওয়াত করার ব্যবস্থা করেন। গত ৯৮ বছরে এক মিনিটের জন্যও বন্ধ হয়নি কোরআন তেলাওয়াত।’

  • মিলাদুন্নবী ও উম্মতের করণীয়

    মিলাদুন্নবী ও উম্মতের করণীয়

    নবীজি (সা.)-এর আগমন পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে আনন্দের বিষয়। কেননা তিনি এসেছিলেন বিশ্বজগতের জন্য করুণা হয়ে। হাদিসের আলোকে হাতির বছর, অর্থাৎ যে বছর আবরাহা হাতি নিয়ে কাবাঘর ধ্বংসের জন্য মক্কা আক্রমণ করেছিল, সে বছর নবীজি (সা.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সাহাবি কায়েস ইবনে মাখরামা (রা.) বলেন, আমি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) দুজনেই ‘হাতির বছরে’ জন্মগ্রহণ করেছি। (তিরমিজি : ৩৬১৯)

    আর তাঁর জন্মবারটি ছিল সোমবার। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন, সোমবারে নবুয়ত লাভ করেন, সোমবারে ইন্তেকাল করেন, সোমবারে মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনার পথে রওনা করেন, সোমবারে মদিনায় পৌঁছান এবং সোমবারেই তিনি হাজরে আসওয়াদ উত্তোলন করেন। (মুসনাদে আহমাদ : ২৫০৬)নবুয়ত প্রাপ্তির পর এই দিন তিনি রোজা রাখতেন। সাহাবি আবু কাতাদাহ (রা.) বলেন, এ রোজা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমি নবুয়ত লাভ করেছি।’ (মুসলিম ১১৬২)

    তিনি এসেছিলেন আমাদের জন্য রহমত বা করুণাস্বরূপ। আর আমাদের জন্য করুণা হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন আল্লাহর শরিয়ত বা ইসলামি জীবনবিধান। তাই আমাদের কর্তব্য, তাঁর আগমনের শুকরিয়া হিসেবে জীবনব্যাপী তাঁর আনীত শরিয়ত প্রতিপালন করা। ওপরের হাদিসটিতে আমরা দেখেছি, তিনি তাঁর জন্মের দিন, অর্থাৎ সোমবারে রোজা রাখতেন। উম্মত তাঁর অনুসরণে সাপ্তাহিকভাবে সোমবারে রোজা রেখে তাঁর আগমনে শুকরিয়া আদায় ও আনন্দ প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু এ দিনটিকে বার্ষিক ঈদ বানানোর কোনো শিক্ষা তাঁর আনীত শরিয়তে নেই, বরং এর বিপরীত শিক্ষাই হাদিসে রয়েছে।

    প্রথমত, তিনি তাঁর জন্মদিন হিসেবে সাপ্তাহিক সোমবারকে চিহ্নিত করেছেন, বার্ষিক কোনো তারিখকে নয়। দ্বিতীয়ত, জন্মদিনে তিনি রোজা রাখতেন। আর তাঁর শিক্ষায় রোজা ঈদের বিপরীত বিষয়। হাদিস শরিফে এসেছে, উম্মে সালমা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) শনিবার ও রোববারে সপ্তাহের অন্য দিনের তুলনায় বেশি রোজা রাখতেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলতেন, এ দুটি দিন মুশরিকদের ঈদ-আনন্দের দিন। তাই এভাবে আমি তাদের বিরোধিতা করতে চাই। (সহিহ ইবনে হিব্বান : ৩৬১৬)

    আমাদের কর্তব্য তাঁর নির্দেশনার আলোকে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সমাজ-প্রচলনের ওপর তাঁর শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া। এটাই তাঁকে ভালোবাসার দাবি।

  • সিরাতচর্চায় পরিশীলিত জীবন

    সিরাতচর্চায় পরিশীলিত জীবন

    একটি জীবন কতদূর বিস্তৃত হতে পারে, কতটুকু দীপ্তি ছড়াতে পারে এবং সমাজ সংস্কারে কতখানি প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরোলেও অদ্যাবধি গতিশীল? যাপিত জীবনের প্রতিটি পর্যায় কতটুকু পরিশীলিত হতে পারে এবং কতখানি আদর্শিক হতে পারে? এমন জীবনের অনুকরণ করা কি আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক নয়, যে জীবনের প্রতিটি ধাপে আছে মহান রবের আনুগত্য আর পরম দয়া? সেই জীবন আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর। জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে অনুসরণের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ তাঁর জীবনী তথা সিরাত। পরিশীলিত জীবন গঠনের সূতিকাগার হিসেবে সিরাতচর্চা এক অদ্বিতীয় মাধ্যম।

    পরিশীলিত জীবন বলতে কী বোঝায়, সিরাত কী, সিরাতচর্চার উদ্দেশ্য কী, কেন সিরাতচর্চা অপরিহার্য, জীবনের প্রতিটি স্তরে সিরাত কেন প্রাসঙ্গিক এবং সিরাত অনুসরণ কেন গুরুত্বপূর্ণ—এসব বিষয়ে আমরা জানার চেষ্টা করব, বি-ইজনিল্লাহ।সময়ের সদ্ব্যবহার, কথাবার্তায় সংযম, আচার-আচরণে সৌন্দর্য, দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা, পরিচ্ছন্নতা ও মানুষের প্রতি উত্তম ব্যবহারের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মার্জিত ও আদর্শিক জীবনই পরিশীলিত জীবন।

    সিরাত আরবি ‘সিরাহ’ শব্দ থেকে এসেছে। আভিধানিক অর্থ জীবনচরিত, জীবনপদ্ধতি বা জীবনবৃত্তান্ত। ইসলামি পরিভাষায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম থেকে ওফাত পর্যন্ত তাঁর সামগ্রিক জীবন, কর্ম, চরিত্র, আচরণ, দাওয়াত, সংগ্রাম ও নেতৃত্বের ধারাবাহিক বিবরণকে সিরাতুন্নবী বলা হয়। অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর সার্বিক জীবনচরিতকে বোঝানো হয়েছে, যা মহান রব মানবজাতির শ্রেষ্ঠতম আদর্শ হিসেবে মনোনীত করেছেন। পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আল-আহজাব: ২১)

    নবীজির জীবনী আমাদের চলার পথকে মহান রবের সন্তুষ্টির সেই সরল পথে পরিচালিত করে, যার চূড়ান্ত গন্তব্য জান্নাত। সিরাতচর্চা কেবল সাহিত্যের আকারে রাসুলের জীবনী পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাঁর জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে তা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করাই এর মূল উদ্দেশ্য। নবীজির বাণীর মশাল দিয়ে আবারও সমগ্র বিশ্ববাসীকে আলোকিত করতে হবে, যাতে মানবসমাজ বর্তমান যুগের অন্ধকারের মাঝে ঠিক তেমনই মুক্তির পথের সন্ধান পায়, যেমনটি পেয়েছিল খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর সংকট উত্তরণের সময়ে। সুতরাং সিরাতচর্চার উদ্দেশ্য শুধু রাসুলের জীবনেতিহাস জানা নয়; বরং তাঁর জীবনী থেকে পরিশীলিত জীবনযাপনের আদর্শ গ্রহণ করে তদনুসারে নিজেদের জীবনকে গড়ে তোলা।

    ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, কিংবা রাষ্ট্রীয়—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন এক অনন্য আদর্শ ও বাস্তব দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে। সিরাতের চর্চা আমাদের সেই আদর্শের বাস্তব রূপ তুলে ধরে। তিনি কীভাবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন পরিচালনা করতেন, তাঁর সময় ব্যবস্থাপনা ও সদ্ব্যবহার করতেন, পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও আত্মসংযমে কেমন ছিলেন, ইবাদত, পোশাক-পরিচ্ছদ ও খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিল—এসবের পাশাপাশি সামাজিক জীবনে আচরণ কিংবা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তাঁর গৃহীত পদক্ষেপেরও বাস্তব প্রতিফলন সিরাতে পাওয়া যায়। ফলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র পরিশীলিত ও আদর্শমণ্ডিতভাবে গড়ে তুলতে রাসুলের সিরাতচর্চার অপরিহার্যতা আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

    মহান আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসা পেতে হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ অত্যন্ত জরুরি। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে—‘(হে নবী!) আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ তো অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আলে ইমরান: ৩১)। ইবাদত কবুলের জন্য ইখলাসের পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণও অপরিহার্য। অর্থাৎ নিয়তের একনিষ্ঠতা ও রাসুল (সা.)-এর নির্দেশিত পদ্ধতি।

    মহানবী (সা.) ছিলেন পবিত্র কোরআনের বাস্তব ও জীবন্ত রূপ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে হজরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘তাঁর চরিত্র ছিল আল-কোরআন।’ এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, ‘আর নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত।’ (সুরা আল-কলম: ৪)। পবিত্র কোরআনকে নিখুঁতভাবে ধারণ ও হৃদয়ঙ্গম করতে হলে রাসুলের সিরাতচর্চার পাশাপাশি সেটির অনুসরণের বিকল্প নেই।

    রাসুলের সিরাত আমাদের সরল পথ চলতে সহায়তা করে, জীবনকে আলোকিত করে, রবের প্রিয়ভাজন বান্দা করে তোলে। তাই আমাদের প্রত্যয় হোক—সিরাতচর্চার মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে পরিশীলিত ও আদর্শিকভাবে গড়ে তোলা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করা। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সেই তাওফিক দান করুন, আমিন।

  • দেহে কৃত্রিম পরিবর্তন নিষিদ্ধ

    দেহে কৃত্রিম পরিবর্তন নিষিদ্ধ

    আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেন, ‘অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে।’ (সুরা তিন: ৪)। এমনইভাবে আল্লাহ পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টিকে সুনিপুণভাবে তার যথাযথ আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। মানুষও এর ব্যতিক্রম নয়। বস্তু ও প্রাণিজগতের আকার-আকৃতি, চলন-বলন ও অঙ্গভঙ্গি—সবকিছুই উৎকৃষ্টতার বিচারে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। এ বিষয়গুলো মানুষের সাধারণ বিচার-বিবেচনা ও গবেষণার আয়ত্তের বাইরে থাকায় অনেকেই আল্লাহর এই অসীম ক্ষমতার সমালোচনা করে এবং তাঁর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মানব ও পশুদেহে বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটায়। যেকোনো মানুষের ক্ষেত্রেই অযৌক্তিক দৈহিক পরিবর্তন অস্বস্তি ও রোগব্যাধি ছাড়া ভালো কিছু বয়ে আনে না।

    সুরা নিসার ১১৯ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, শয়তান আল্লাহ তায়ালাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সে মানুষকে প্ররোচিত করে আল্লাহর সৃষ্টির বিকৃতি ঘটাবে। বর্তমান বিশ্বে এর বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়। অনেকেই শরীরে ট্যাটু আঁকা, প্লাস্টিক সার্জারি ও ট্র্যান্সহিউম্যানিজমসহ নানাভাবে দৈহিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে স্পষ্ট নিষিদ্ধ ও গর্হিত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) শরীরে উলকি বা ট্যাটু আঁকতে নিষেধ করেছেন। (সহিহ বুখারি, ৫৪০৮)সাধারণ মুসলিমদের একটি অংশ এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় অজান্তেই এমন কাজে লিপ্ত হচ্ছেন। ফ্যাশনের নামে চেহারা ও শরীরের স্বাভাবিক গঠনকে পরিবর্তন করছেন। আল্লাহ প্রদত্ত সুন্দর মানবদেহে এ ধরনের কৃত্রিম পরিবর্তন শুধু আল্লাহর সৃষ্টির অবমাননাই নয়, বরং তাঁর কর্তৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার শামিল।

    আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও পার্থিব প্রতিযোগিতার মুখে মানবজাতি আজ সৃষ্টির স্বাভাবিক রূপ পরিবর্তন করছে। এগুলোর মধ্যে ট্রান্সহিউম্যানিজমের অন্যতম উদ্দেশ্যই হচ্ছে মানুষকে অমর করা এবং মানুষের মস্তিষ্কের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন করা, যা কেবলই একমাত্র আল্লাহর ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। মূলত আল্লাহর সৃষ্টি ও সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তুষ্টি থেকেই মানুষ এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা একজন মুসলিমের জন্য স্পষ্ট নাফরমানি। আল্লাহ তায়ালা সুরা আল-ইমরানের ৬ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘তিনিই মাতৃগর্ভে তোমাদের আকৃতি দান করেন যেভাবে তিনি চান।’ অর্থাৎ, আমাদের দেহের আকৃতি, রঙ ও উচ্চতা—সবকিছুই আল্লাহর প্রজ্ঞা ও সিদ্ধান্তের বহিঃপ্রকাশ। এতে অন্যায়ভাবে পরিবর্তন আনা আল্লাহর সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার শামিল।

    পৃথিবীতে আমাদের পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য হলো একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করা। কিন্তু মানুষ তার অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে এসব অবাস্তব প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। বাহ্যিক সৌন্দর্যের মোহে মগ্ন হয়ে ভুলে যাচ্ছে সৃষ্টিকর্তার অর্পিত দায়িত্ব ও জান্নাতের অনুগ্রহের কথা। পরিশেষে, চিকিৎসাজনিত জরুরি ও যৌক্তিক কারণ ছাড়া কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্দেশ্যে মানবদেহে যেকোনো পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

  • সামরিক শক্তি অর্জনে নবীজির অনুপ্রেরণা

    সামরিক শক্তি অর্জনে নবীজির অনুপ্রেরণা

    ইসলামের মূল লক্ষ্য শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা। তবে শান্তি ও ন্যায়বিচার রক্ষার জন্য কখনো কখনো শক্তি ও প্রতিরোধক্ষমতার প্রয়োজন হয়। তাই অনেক সময় দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব পরিহার করে আত্মরক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং নির্যাতিত মানুষের সুরক্ষার জন্য যথাসাধ্য শক্তি অর্জনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই শক্তি শুধু অস্ত্রশস্ত্র বা সামরিক বাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, কৌশলগত দক্ষতা ও নৈতিক নেতৃত্বও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামের আলোকে মুসলিম উম্মাহর সামরিক শক্তি অর্জনের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করা হলো।আত্মরক্ষা ও শত্রুর আগ্রাসন প্রতিরোধ

    ইসলাম মুসলমানদের আত্মরক্ষা ও শত্রুর আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য যথাসাধ্য শক্তি অর্জন এবং প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধোপকরণ সংগ্রহ, অস্ত্রশস্ত্র ও যানবাহনের ব্যবস্থা, শরীরচর্চা এবং সামরিক প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। কোরআনে নির্দিষ্ট কোনো অস্ত্রের নাম উল্লেখ না করে শক্তি অর্জনের কথা বলা হয়েছে, যা যুগ ও সময়ভেদে পরিবর্তিত সামরিক সক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করে। অতীতে তীর-তলোয়ার ও বর্শা ছিল যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র; পরে বন্দুক ও কামানের যুগ এসেছে আর বর্তমান যুগে রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধব্যবস্থা প্রচলিত।

    সুতরাং সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সামরিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৌশল আয়ত্ত করা ইসলামি নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক বিশ্বে সামরিক শক্তি শুধু অস্ত্রভান্ডারের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, শিক্ষা, গোয়েন্দা দক্ষতা এবং জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাও এর অপরিহার্য অংশ। এ কারণেই মুসলিম উম্মাহর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামগ্রিক শক্তি অর্জন অপরিহার্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা তাদের মোকাবিলার জন্য যথাসাধ্য প্রস্তুত রাখ শক্তি ও অশ্ববাহিনী, তা দিয়ে তোমরা ভীত-সন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শক্রকে, তোমাদের শক্রকে এবং এরা ছাড়া অন্যদের যাদের তোমরা জানো না, আল্লাহ তাদের জানেন। আর আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদের দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।’ (সুরা আল-আনফাল : ৬০)

    নিপীড়িত মানুষের সুরক্ষা

    ইসলামে সামরিক শক্তি অর্জনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলোÑ অত্যাচারিত ও নিপীড়িত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা। যদি দুর্বলদের রক্ষা করা না হয়, তাহলে পৃথিবীতে শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করবে এবং সমাজে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো তাদের যারা আক্রান্ত হয়েছে; কারণ তারা অত্যাচারিত। আর নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাহায্য করতে সম্যক সক্ষম। তাদের তাদের ঘরবাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত করা হয়েছে শুধু এ কারণে যে, তারা বলে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ।’ আল্লাহ যদি মানবজাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত খ্রিষ্টান সংসার-বিরাগীদের উপাসনা স্থান, গির্জা, ইহুদিদের উপাসনালয় এবং মসজিদগুলো; যাতে অধিক স্মরণ করা হয় আল্লাহর নাম। আর আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে (তাঁর ধর্মকে) সাহায্য করে। আল্লাহ নিশ্চয়ই মহাশক্তিমান, চরম পরাক্রমশালী।’ (সুরা আল-হজ : ৩৯-৪০)

    এই আয়াত প্রমাণ করে, সামরিক শক্তি শুধু মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়; বরং মানবসমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

    মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা

    রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর জাতীয় নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে মুসলিম এবং অমুসলিমদের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘মদিনা সনদ’ প্রণয়ন করেন। এতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নাগরিকদের অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। ইসলাম শান্তিপ্রিয় অমুসলিমদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচারের নির্দেশ দেয়। তবে যখন কোনো শক্তি ইসলাম, মুসলমান বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের সঙ্গে মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-মুমতাহিনা : ৮)

    সামরিক শক্তি অর্জনে নবীজির অনুপ্রেরণা

    নবী (সা.) মুসলমানদের যুদ্ধোপকরণ প্রস্তুত করা, তীরন্দাজি শেখা, ঘোড়সওয়ারি অনুশীলন করা এবং সামরিক দক্ষতা অর্জনে উৎসাহিত করেছেন। তিনি এসব কাজকে শুধু সামরিক প্রস্তুতি নয়, বরং ইবাদত ও সওয়াবের কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনু আবদুর রহমান ইবনু আবু হোসাইন (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা একটি তিরের উসিলায় তিনজন লোককে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তীর নির্মাতা যে নির্মাণকালে কল্যাণের আশা করেছে, (জিহাদে) এই তীর নিক্ষেপকারী এবং তা নিক্ষেপে সাহায্যকারী।’ তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা তীরন্দাজি করো ও ঘোড়দৌড় শিক্ষা করো। তবে তোমাদের ঘোড়দৌড় শেখার তুলনায় তীরন্দাজি শিক্ষা করা আমার কাছে বেশি পছন্দনীয়। মুসলিম ব্যক্তির সব ক্রীড়া-কৌতুকই বৃথা। তবে তীর নিক্ষেপ, ঘোড়ার প্রশিক্ষণ এবং নিজ স্ত্রীর সঙ্গে ক্রীড়া-কৌতুক বৃথা নয়। (কারণ) এগুলো হলো উপকারী ও বিধিসম্মত। (তিরমিজি : ১৬৩৭)

    বোঝা যায়, মুসলিম সমাজকে সর্বদা দক্ষ, সক্ষম ও প্রস্তুত থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

    পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের দৃষ্টিতে সামরিক শক্তি অর্জন কোনো আগ্রাসী মনোভাবের প্রতীক নয়; বরং আত্মরক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নিপীড়িত মানুষের সুরক্ষার একটি অপরিহার্য উপায়। মুসলিম উম্মাহর জন্য সামরিক শক্তি অর্জনের পাশাপাশি জ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, চরিত্রগঠন ও নৈতিক নেতৃত্বে সমৃদ্ধ হওয়াও সমানভাবে জরুরি। তখনই একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।