কৃষি

  • ছাদ কৃষির সফলতায় নিয়মিত পরিচর্যা জরুরী

    ছাদ কৃষির সফলতায় নিয়মিত পরিচর্যা জরুরী

    শহর ও গ্রামে বাড়ির ছাদকে কাজে লাগিয়ে নিরাপদ ও বিষমুক্ত শাক-সবজি, ফলমূল, মসলা ও ভেষজ উদ্ভিদ উৎপাদন করা সম্ভব। টব, ড্রাম, বেড, বালতি কিংবা বিভিন্ন পাত্রে পরিকল্পিতভাবে ছাদ কৃষি গড়ে তুললে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাজার খরচ কমানো যায়। পরিবেশ ঠান্ডা রাখা, অক্সিজেন বাড়ানো ও মানসিক প্রশান্তির ক্ষেত্রেও ছাদ কৃষির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ‘রানার কৃষি’র নিয়মিত আয়োজনে এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন যশোর সদর উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম।

    ছাদ কৃষি হলো বাড়ির ছাদে টব, ড্রাম, বেড বা ট্রেতে শাক-সবজি, ফলমূল, মসলা ও ভেষজ উদ্ভিদের চাষ। শহর ও গ্রাম—উভয় এলাকার বাড়ির ছাদেই পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের কৃষি করা যায়।
    ছাদ কৃষির মাধ্যমে বিষমুক্ত ও তাজা শাক-সবজি ও ফলমূল পাওয়া যায়। পাশাপাশি পরিবেশ ঠান্ডা রাখতে, অক্সিজেন বাড়াতে এবং শহরের সবুজায়ন বৃদ্ধি করতে এটি ভূমিকা রাখে। পরিবারের বাজার খরচ কমানোর পাশাপাশি ছাদে গাছের পরিচর্যা মানসিক প্রশান্তিও দিতে পারে। পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও আর্থিক—তিন দিক থেকেই ছাদ কৃষি উপকারী।


    ছাদ প্রস্তুতি ও পাত্র নির্বাচন
    ছাদে বাগান করার আগে সেখানে পানি জমে থাকে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। ছাদে ওয়াটারপ্রুফিং করা থাকলে ভালো। তবে ছাদের ওপর অতিরিক্ত ভার দেওয়া যাবে না। পাত্র ও মাটির ওজনসহ ছাদের ভার বহনক্ষমতা বিবেচনা করে ছাদ কৃষির পরিকল্পনা করতে হবে।
    গাছ লাগানোর জন্য মাটির টব, প্লাস্টিকের পাত্র, ড্রাম, বালতি ও ফোম বক্স ব্যবহার করা যায়। প্রতিটি পাত্রের নিচে অবশ্যই পানি নিষ্কাশনের জন্য ছিদ্র থাকতে হবে। বড় আকারের গাছের জন্য ২০ থেকে ৩০ লিটার ধারণক্ষমতার পাত্র প্রয়োজন হতে পারে।
    মাটি তৈরি
    ছাদ কৃষিতে ভালো ফলনের জন্য উপযোগী মাটির মিশ্রণ তৈরি করতে হবে। আদর্শ মাটির মিশ্রণে ৫০ শতাংশ দোআঁশ মাটি, ৩০ শতাংশ পচা গোবর বা কম্পোস্ট এবং ২০ শতাংশ বালি বা কোকোপিট ব্যবহার করা যেতে পারে।
    মাটি ঝুরঝুরে ও পানি নিষ্কাশন উপযোগী রাখতে হবে। পাত্রের আকার অনুযায়ী মাটির পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে এবং গাছের ধরন অনুযায়ী পাত্র নির্বাচন করতে হবে।
    যেসব ফসল চাষ করা যায়
    ছাদে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি, মসলা, ভেষজ ও ফলমূল চাষ করা যায়। শাকের মধ্যে লালশাক, পালং শাক, ধনেপাতা ও লেটুস; সবজির মধ্যে টমেটো, বেগুন, ঢেঁড়স, বাঁধাকপি, ফুলকপি ও ব্রকলি চাষ করা যেতে পারে।
    মসলাজাতীয় ফসলের মধ্যে মরিচ, এলাচ ও আদা এবং ভেষজ উদ্ভিদের মধ্যে তুলসী, মালটা, কাগুজি লেবু, মেহেদী ও নিম লাগানো যায়। ফলমূলের মধ্যে আম, পেয়ারা, ডালিম ও ড্রাগন ফলসহ বিভিন্ন ফলের গাছ ছাদে উপযোগী পাত্রে চাষ করা সম্ভব।
    সেচ ও সার ব্যবস্থাপনা
    ছাদ কৃষিতে নিয়মিত সেচ দিতে হবে। সাধারণভাবে প্রতিদিন অথবা এক দিন পরপর পানি দেওয়া যেতে পারে। তবে আবহাওয়া, গাছের ধরন ও মাটির আর্দ্রতা বিবেচনা করে সেচ দিতে হবে। সকাল অথবা বিকেলে পানি দেওয়া ভালো। অতিরিক্ত পানি দেওয়া যাবে না। পাত্রে পানি জমে থাকলে গাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
    প্রতি ১৫ দিন পরপর জৈব সার, কম্পোস্ট বা ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রতিটি টবে গাছের ধরন ও পাত্রের আকার অনুযায়ী ১ থেকে ২ কেজি জৈব সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। তরল সার বা জীবাণু সার ব্যবহার করলেও ভালো ফলন পাওয়া যায়।
    পোকা ও রোগ দমন
    ছাদ কৃষিতে পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনে প্রথমে জৈব ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ব্যবহার করা ভালো। নিম তেল ৩ থেকে ৫ মিলিলিটার প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করা যায়। পোকা দমনে রসুন ও মরিচের নির্যাসও ব্যবহার করা যেতে পারে।


    মাইটস, লাল মাকড়সহ ক্ষতিকর পোকা দমনে অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে হবে এবং পণ্যের লেবেলে দেওয়া মাত্রা ও নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা ভালো।


    ছাদ কৃষিতে বাড়ির ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। পাত্র এমনভাবে স্থাপন করতে হবে, যাতে শিশুদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি না থাকে।
    ছাদ কৃষি শুধু অব্যবহৃত জায়গাকে উৎপাদনশীল করে না; এটি পরিবারের নিরাপদ খাদ্যের উৎস তৈরির পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পারিবারিক ব্যয় কমাতে সহায়তা করে। তাই পরিকল্পিতভাবে ছাদ কৃষির সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

  • সমন্বিত খামারে সফল চৌগাছার সবুজ

    সমন্বিত খামারে সফল চৌগাছার সবুজ

    নিজের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার আবুল হাসান সবুজ। মাত্র তিনটি গরু ও ১০টি ছাগল নিয়ে শুরু করা উদ্যোগ এখন ২৯টি গাভী, দুধ উৎপাদন, ঘি, মাছ, ফল, সবজি, হাঁস-মুরগি, জৈব সার ও বায়োগ্যাসের সমন্বিত খামারে রূপ নিয়েছে। এতে নিজের পরিবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে।


    চৌগাছা উপজেলার পাশাপোল ইউনিয়নের হাউলি গ্রামের সন্তান আবুল হাসান সবুজ। কর্মজীবনের শুরুতে দেশের ওষুধ ও প্রাণিসম্পদ খাতের প্রতিষ্ঠান রেনেটা বাংলাদেশে পাঁচ বছর চাকরি করেন। সেখানে ডেইরি ও প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে কৃষিবিজ্ঞানের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে পরে নিজেই ডেইরি খামার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
    বর্তমানে তিনি ঝিকরগাছা শহীদ মশিয়ূর রহমান ডিগ্রি কলেজের কৃষিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজের খামার পরিচালনা করছেন তিনি।
    ছোট পরিসর থেকে বড় খামার
    শুরুতে তিনটি গরু ও বিভিন্ন জাতের ১০টি ছাগল নিয়ে খামার শুরু করেন সবুজ। ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকেন পরিধি। বর্তমানে তার খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৯টি গাভী রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি গাভী থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ কেজি দুধ উৎপাদন হয় বলে জানান তিনি।
    খামারের উৎপাদিত দুধ স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি যশোর শহরের বিসমিল্লাহ ডেইরি, আদি ঘোষ ডেইরি, সাতক্ষীরা ঘোষ ডেইরিসহ বিভিন্ন অর্গানিক সুপার শপে সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া গ্রামের ৩০ থেকে ৩৫টি পরিবারে সরাসরি দুধ বিক্রি করেন সবুজ। খামারের দুধ দিয়ে গাওয়া ঘিও তৈরি করা হয়।
    বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গো-খাদ্য ব্যবস্থাপনা
    খামারে গাভীর খাদ্য ও পরিচর্যায় নির্দিষ্ট রুটিন অনুসরণ করা হয়। সকালে তাজা নেপিয়ার ঘাসের সঙ্গে সুষম খাদ্য, বিকেলে দানাদার খাদ্য এবং রাতে শুকনা খড় দেওয়া হয়।
    গাভীর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত গোসল করানো হয়। সবুজ জানান, প্রতিদিন খামারের গবাদিপশুর খাদ্যের পেছনে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এর মধ্যে দানাদার খাদ্য, ভুসি, খৈল, খড় ও সবুজ ঘাসের খরচ রয়েছে।
    খাদ্য ব্যয় কমাতে এবং সারা বছর সবুজ ঘাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিজের তিন বিঘা জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ করেছেন তিনি।
    গরুর পাশাপাশি মাছ, ফল ও সবজি
    সবুজের উদ্যোগ শুধু ডেইরি খামারে সীমাবদ্ধ নয়। বাড়ির আঙিনা ও আশপাশের জমিতে কলা, ড্রাগন ফল, আম এবং বিভিন্ন মৌসুমি শাক-সবজি চাষ করছেন তিনি। পালন করছেন দেশি মুরগি, হাঁস ও কবুতর। বাড়ির পাশের পুকুরে বিভিন্ন জাতের মাছও চাষ করা হচ্ছে।
    খামারের গোবর ও অন্যান্য বর্জ্যও কাজে লাগানো হচ্ছে। এসব বর্জ্য থেকে জৈব সার, ভার্মি কম্পোস্ট ও বায়োগ্যাস উৎপাদন করা হয়। বায়োগ্যাস পরিবারের রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। উৎপাদিত জৈব সার ও ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করা হচ্ছে ফল, সবজি ও ঘাসের জমিতে।
    খামারে কর্মসংস্থান
    সবুজের এই উদ্যোগে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আরও দুইজন স্থায়ী শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের একজন মিলন হোসেন বলেন, ‘আমি এখানে মাসিক ১২ হাজার টাকা বেতনে কাজ করি। নিয়মিত বেতন পাওয়ায় পরিবার নিয়ে ভালো আছি। এখানকার কাজের পরিবেশও ভালো। মালিক আমাদের নিজের পরিবারের মতো দেখেন।’
    সবুজের বাবা ওয়াজ্জেল হোসেন বলেন, ‘ছেলের কঠোর পরিশ্রমে আজ আমরা গর্বিত। ও চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের মেধা দিয়ে এই খামার তৈরি করেছে। আজ ওর কারণে পরিবার সচ্ছল হয়েছে, এলাকার মানুষও দুধ পাচ্ছে।’
    সবুজের ছোট ভাই ও পশুচিকিৎসক শাহিনুজ্জামান টনি বলেন, ‘কৃষিবিজ্ঞান ও প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনার বৈজ্ঞানিক জ্ঞান খামারে প্রয়োগ করায় ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে। আমি নিয়মিত গরুগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিই।’
    নিয়মিত দুধ ক্রেতা বাড়ীয়ারী গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সবুজ ভাইয়ের খামারের দুধ ভালো। আমরা নিয়মিত এখান থেকে দুধ ও ঘি কিনি।’
    আরও বড় করার পরিকল্পনা
    নিজের উদ্যোগ সম্পর্কে আবুল হাসান সবুজ বলেন, ‘সঠিক পরিকল্পনা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা থাকলে যেকোনো খাত থেকে সফল হওয়া সম্ভব। আমি খামারটি আরও বড় করতে চাই। এতে আরও বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং দেশের পুষ্টির চাহিদা পূরণে কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারব।’
    যশোর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দুগ্ধ উৎপাদনে আবুল হাসান সবুজের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ তরুণরা কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে এভাবে এগিয়ে এলে দেশের ডেইরি ও কৃষি খাত আরও সমৃদ্ধ হবে।’

  • আগাম শিম চাষে কৃষকের মুখে হাঁসি 

    আগাম শিম চাষে কৃষকের মুখে হাঁসি 

    শীত আসার আগেই ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের মাঠজুড়ে শিম ফুল ও কচি শিমে ভরে উঠেছে গাছ। আগাম জাতের শিম চাষ করে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছেন কৃষকরা। মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পাওয়ায় এ আবাদে আগ্রহ বাড়ছে চাষিদের। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২৫৪ হেক্টর জমিতে আগাম গ্রীষ্মকালীন শিমের চাষ হয়েছে।


    কোটচাঁদপুর উপজেলায় পাঁচটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সবজির আবাদ হলেও সবচেয়ে বেশি শিম চাষ হয় সাবদারপুর ইউনিয়নে। কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ২৫৪ হেক্টর জমিতে আগাম শিমের আবাদ হয়েছে, যা প্রায় ১ হাজার ৮৩০ বিঘার সমান।
    সাবদারপুর ইউনিয়নের মানিকদিহি গ্রামের কৃষক আকিমুল ইসলাম বলেন, ‘এটি আগাম শিমের আবাদ। ফলে অন্যদের আগে শিম বাজারে তুলতে পারি। এ সময় বাজারে শিমের চাহিদা ও দাম দুটোই ভালো থাকে। তাই আমরা এ আবাদ করি।’


    তিনি জানান, এক বিঘা জমি থেকে মৌসুমে ১০০ থেকে ১২০ মণ পর্যন্ত শিম উৎপাদন হয়। এতে এক বিঘা জমি থেকে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব হয়। গত বছর দুই বিঘা জমিতে শিম চাষ করেছিলেন তিনি। ভালো ফলন ও দাম পাওয়ায় এবার চার বিঘা জমিতে আবাদ করেছেন।
    লক্ষ্মীকুণ্ড গ্রামের শিমচাষি ছামারুল ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন ও সাইদুর রহমান বলেন, ‘প্রতি বছরের মতো এবারও ১৫ কাঠা জমিতে শিম চাষ করেছি। ইতোমধ্যে গাছে শিম ধরতে শুরু করেছে। কয়েক দিন ধরে বাজারেও বিক্রি করছি।’


    তারা জানান, শিম তোলার প্রথম দিকে প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। পরে কয়েক দিন ধরে প্রতি কেজি ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ দাম ধরে রাখতে পারলে প্রায় এক মাসে ১৫ কাঠা জমি থেকে প্রায় লাখ টাকা আয় করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তারা।
    উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২৫৪ হেক্টর জমিতে আগাম গ্রীষ্মকালীন ইপসা-১ জাতের শিম চাষ হয়েছে। পাঁচটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার মধ্যে সাবদারপুর ইউনিয়নে এ আবাদ সবচেয়ে বেশি।’


    তিনি বলেন, ‘কোটচাঁদপুরের কৃষকরা সাধারণত এপ্রিল বা এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এ শিমের আবাদ করেন। এরপর প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাস পর্যন্ত শিম সংগ্রহ করা যায়। প্রতি বিঘায় ১০০ থেকে ১২০ মণ পর্যন্ত উৎপাদন হয়। আগাম গ্রীষ্মকালীন শিম হওয়ায় বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায়। এতে কৃষকরা বিঘাপ্রতি প্রায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করেন।’


    কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সাবদারপুর ফুল, ফল ও সবজি চাষের জন্য সম্ভাবনাময় এলাকা। এখানে অসময়ে উচ্চমূল্যের বিভিন্ন সবজি চাষ হয়। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এসব সবজি দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে কৃষকরা আয় করছেন। এ কারণে আগামীতে শিমের আবাদ আরও বাড়বে বলে আশা করছি।’

  • আনারস চাষে বাম্পার ফলন

    আনারস চাষে বাম্পার ফলন

    মধুপুর উপজেলা ঘেঁষা ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার নাওগাঁও ও রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের কৃষকদের অর্থনীতির মূল জোগানদাতা হলো আনারস। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে এ উপজেলার কৃষকরা প্রায় ১২৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকার জলডুগি, ক্যালেন্ডার ও হানিকুইন জাতের আনারস বিক্রি করার সম্ভাবনা রয়েছে।ফুলবাড়িয়া উপজেলার কৃষকরা এখন জলডুগি চাষে বেশি ঝুঁকছেন। এর প্রধান কারণ হলো—এই আনারস চাষে সময়, জমি ও উৎপাদন খরচ কম লাগে এবং অধিক লাভ পাওয়া যায়। যেখানে ক্যালেন্ডার ও হানিকুইন আনারসের ফলন পেতে দেড় বছর অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে জলডুগির পূর্ণাঙ্গ ফলন মেলে এক বছরের মধ্যেই। স্বাদ ও গন্ধে অতুলনীয় হওয়ায় বাজারে এর ব্যাপক চাহিদাও রয়েছে।

    উপজেলা কৃষি অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ৭৫০ হেক্টর জমিতে আনারসের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৩১৫ হেক্টরে জলডুগি, ৪২৫ হেক্টরে ক্যালেন্ডার এবং ১০ হেক্টরে হানিকুইন চাষ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় জলডুগির আবাদ ৬৫ হেক্টর বেড়েছে। ৩১৫ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ২ কোটি ৫২ লাখ পিস জলডুগি উৎপাদিত হবে। প্রতিটি ফল গড়ে ২৫ টাকা দরে বিক্রি হলে এর বাজারমূল্য দাঁড়াবে ৬৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ৪২৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদিত ১ কোটি ৫৩ লাখ পিস ক্যালেন্ডার আনারস ৪০ টাকা দরে বিক্রি করে ৬১ কোটি ২০ লাখ টাকা আয় হবে। এ ছাড়া হানিকুইনসহ অন্যান্য জাতের ৩ লাখ ৬০ হাজার আনারস থেকে আসবে ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

    সন্তোষপুর গ্রামের চাষি সোলমান সরকার ৩ একর জমিতে ৬০ হাজার চারা লাগিয়ে ১১ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছেন। এ ক্ষেত্রে প্রতি ফলের দাম আনুমানিক ১৫ থেকে ১৬ টাকা করে পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

    উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নুর মোহাম্মদ জানালেন, চলতি মৌসুমে ৭৫০ হেক্টর জমিতে আবাদ করা আনারস থেকে কৃষকরা ১২৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বেশি আয় করবেন বলে তাঁরা আশাবাদী।

  • আনারকলি ফল চাষে বাজিমাত

    আনারকলি ফল চাষে বাজিমাত

    বিদেশি ফল ‘প্যাশন ফ্রুট’ বাংলাদেশে ‘আনারকলি’ বা ‘ট্যাং ফল’ নামে পনিচিত। এ ফল চাষ করে দারুণ সফলতা পেয়েছেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের চাষি সালেহ আহমদ। জেলার পাহাড়ি অঞ্চলে কয়েক বছর আগেই ফলটির চাষ শুরু হয়। তবে এই প্রথম সমতলে আনারকলির বাণিজ্যিক চাষ শুরু করেছেন তিনি। এ কৃষি উদোক্তা কমলগঞ্জ উপজেলার ৫ নম্বর কমলগঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বাঘমারা গ্রামের বাসিন্দা।

    জানা গেছে, মুদু টক-মিষ্টি স্বাদের আনারকলি ফলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে দিন দিন। প্রতি পিস আনারকলি পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকায়। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ ছাড়াই সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে আনারকলি ফল চাষ করা যায়। যে কারণে এর উৎপাদন খরচও কম। ফলে নেই কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি। স্বাদে-গন্ধে অনন্য এ ফলের আবাদে জেলায় ফল উৎপাদনে দেখা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা।

    উদ্যোক্ত সালেহ আহমদ জানান, দর্ঘিদিন ধরে তিনি ধান চাষের পাশাপাশি নিজের জমিতে গড়ে তুলেছেন লেবু, লটকনসহ দেশি-বিদেশি নানা ফলের ক্ষুদ্রায়তন বাগান। ২০২২ সালে নিজের চার শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে তিনটি চারা রোপণের মাধ্যমে শুরু করেন আনারকলি চাষ। ২০২৪ সালে তার ওই তিনটি গাছের ফল পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করেন ১০ হাজার টাকা। আনারকলি ফল বিক্রির পর চাষে তার উৎসাহ বেড়ে যায়। ওই বছরই আরও বেশ কিছু চারা রোপণ করে বাণিজ্যিকভাবে এ ফলের চাষাবাদে তিনি সফলতা অর্জন করেন। বর্তমানে তার বাগানের গাছগুলোতে যে ফল এসেছে তাতে সালেহ আহমদ চলতি মৌসুমে লক্ষাধিক টাকার ফল বিক্রির প্রত্যাশা করছেন।

    সরেজমিনে সালেহ আহমদের আনারকলি ফলের বাগানের গিয়ে দেখা যায়, মাচাং ও বড় বড় গাছের উপর লতানো আনারকলি, প্যাশন ফ্রন্ট বা ট্যাং ফলের গাছগুলো ভরে গেছে ফুল ও ফলে। আলাপকালে কৃষক সালেহ আহমদ বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। বাপ-দাদাও কৃষক ছিলেন। কৃষিই আমার পরিবারের একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম। ২০২২ সালে কৃষির কাছে একটি খাসিয়া পান পুঞ্জির মন্ত্রীর (পুঞ্জি প্রধান বা হেডম্যান) বাড়িতে প্রথম প্রথম দেখি আনারকলি ফল। ফলটি দেখে পরে ওই মন্ত্রীর কাছে চারা চাইলে তিনি জানান চারা জানবে মেয়ে মাটিতে রোপন করলেই গাছ হবে।

    তার কথামতো তিনটি ভাল কেটে আনি এবং নিতান্তই শখের বসে আমার পরিতাক্ত একটি জমিতে তা রোপন করি। কিছুদিনের মধ্যেই এসব ডালে নতুন পাতা গজায় এবং তরতর করে গাছগুলো লাউ গাছের মতো বড় হতে থাকে। পরে মাচাং তৈরি করে দেই। মাচাংয়ে বড় হতে হতে এক বছরের মধ্যে সুন্দর ফুল ও পরে ফল হতে থাকে। ডাল রোপণের প্রথম বছরই বাড়িতে আমরা অনেকগুলো ফল খাই এবং এলাকার মানুষও ফল চেয়ে নেন। এলাকার এমন কোন বাড়ি নেই যারা আগ্রহভরে আমার কাছ থেকে ফল নেননি। তবে কোনদিনও ভাবতে পারিনি এসব ফল বিক্রি করতে পারবো।

    ২০২৪ সালে আমার এলাকার সায়েদ আলী নামের এক যুবক আমাকে ফল কেনার প্রস্তাব দেয়। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে তার নানা মৌসুমি ফলের দোকান রয়েছে। তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে আমি গাছে ঝুলতে থাকা পাকা ফলগুলো প্রতি পিস ২৫ টাকা দরে তার কাছে বিক্রি করতে থাকি। এলাকায় বণ্ঠন ও আমার পরিবারের চাহিদা মেটানোর পরও মৌসুম শেষে ফল বিক্রির অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ হাজার টাকারও বেশি।

    এতে আগ্রহ বাড়ে, নিজের গাছের কলম ও ফলের বীজ থেকে আরও চারা করি। বর্তমানে আমার বাগানের মাচাংয়ে এবং আশপাশের আম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন গাছে রয়েছে অনেকগুলো আনারকলি ফলের গাছ। যে পরিমাণ ফুল ও ফল এসেছে তাতে ধারণা করছি এ বছর কমপক্ষে লক্ষাধিক টাকার বিক্রি করতে পারব। তবে ফুল ধরার পর মৌমাছির আক্রমণে অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। নতুবা ফলের ও বিক্রির আয়ের সংখ্যা আরও বাড়তো। এখন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ফল ও চারা কিনতে আসছেন।

    বাঘমারা গ্রামের ছদরুল হোসেন বলেন, বকৃষক সালেহ আহমদের আনারকলি ফলের বাগান দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। মাত্র চার শতক জমির বাগানে শতশত ফল ধরে। এই ফলের উৎপাদন

    প্রতিটি গাছের ডগায় প্রচুর ফল ধরে। এ ফল চাষ করতে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না। জৈব পদ্ধতিতে আবাদ করা যায়। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। ভিটামিন-সি, আয়রন, জিংক ও ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ এ ফল। কৃষক সালেহ আহমদ বলেন, বলেন, বিঘাপ্রতি আনারকলি চাষ করলে কয়েক লাখ টাকার ফল বিক্রি করা সম্ভব। এই ফল পিস হিসেবে বিক্রি করা হয়। উৎপাদন খরচ খুবই কম। বর্তমানে ফল উৎপাদনের পাশাপাশি চারা উৎপাদন শুরু অনেক বেশি। আনারকলি ফল খেতেও মজাদার।

  • যশোরে ‘সবুজ সোনা’ চন্দনের বাণিজ্যিক বিপ্লব

    যশোরে ‘সবুজ সোনা’ চন্দনের বাণিজ্যিক বিপ্লব

    যশোরের বাগমারা পাড়া বিসমিল্লাহ গ্যারেজ। শহরের ব্যস্ত পরিবেশের ভেতরেই এক বাড়ির একান্নবর্তী পরিবারের তিনটি ছাদে চোখ জুড়িয়ে যায় অসাধারণ সবুজের সমারোহ দেখে। সেখানে ছোট-বড় গামলা আর বিশেষ মাটিতে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে বিরল প্রজাতির গাছ। সাধারণ দর্শনার্থীদের চোখ আটকে যায় একটি বিশেষ উদ্ভিদের কাছে। এটি আর দশটি বনসাই বা সাধারণ গাছ নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম দামি এবং ভেষজ গুণসম্পন্ন উদ্ভিদ ‘শ্বেতচন্দন’।


    এক ছাদ বাগানেই লালন-পালন করা হচ্ছে প্রায় ৩৫০টি দুষ্প্রাপ্য শ্বেতচন্দন গাছ! এ যেন এক নীরব ভেষজ বিপ্লব, যা যশোরকে ছাড়িয়ে পুরো দেশের অর্থনীতিতেই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
    এই অসাধারণ উদ্যোগের পেছনের কারিগর ৪৫ বছর বয়সী সাজ্জাদ হোসেন। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই বনসাইয়ের প্রতি তার ঝোঁক ছিল। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে প্রবাস জীবন কাটাতে মালয়েশিয়া গিয়ে এক চীনা ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে সাজানো বনসাই দেখে অনুপ্রেরণা পান। ২০১০ সালে দেশে ফিরে কৃষিতে নামলেও প্রথমে সফলতা পাননি।


    তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে ২০১৩ সালে তিনি বট, পাকুড় ও অশ্বত্থের চারা দিয়ে বনসাই তৈরি শুরু করেন। এরপর যশোর বন বিভাগের ঝুমঝুমপুর নার্সারি থেকে মাত্র ১০টি শ্বেতচন্দনের চারা সংগ্রহ করেন তিনি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাবলিক লাইব্রেরির বই-পুস্তক ও ম্যাগাজিন ঘেঁটে নিজেই তৈরি করেন গাছের জন্য উপযুক্ত বিশেষ মাটি।


    গাছের রোগবালাই দূর করতে কেমিক্যাল কীটনাশকের বদলে তিনি ব্যবহার করেন মেহগনি পাতা পচা পানি ও লেবুর রসের পরিবেশবান্ধব মিশ্রণ। সেই ১০টি চারা থেকে আজ তার ছাদ বাগানে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন বয়সের সাড়ে ৩০০ শ্বেতচন্দনের বনসাই এবং নার্সারিতে রয়েছে ২-৩ বছর বয়সী প্রায় ৪,০০০ চারা।


    ধারণা করা হয়, চন্দনের আদি নিবাস ইন্দোনেশিয়ার তিমুর দ্বীপে হলেও ভারতীয় উপমহাদেশে এর ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। রামায়ণ, মহাভারত এবং কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও (খ্রিস্টপূর্ব-২০০) চন্দনের উল্লেখ পাওয়া যায়।


    বিশ্ববাজারে শ্বেতচন্দনকে বলা হয় ‘সবুজ সোনা’। একটি পরিণত শ্বেতচন্দন গাছ (২০ বছর বয়সী) প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কেজি কাঠ দেয়, যার প্রতি কেজির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৫ হাজার টাকা। সমাজ বন বিভাগ যশোরের তথ্যমতে, এক একর জমিতে চন্দন চাষে প্রায় ১ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৫-২০ বছর পর আয় হতে পারে ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত!
    পেনিসিলিন আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে গনোরিয়া রোগের চিকিৎসায় চন্দনের তেল ব্যবহৃত হতো। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, ব্রঙ্কাইটিস, চর্মরোগ, ঘামাচি, বসন্ত এবং হজমের সমস্যায় এর ব্যবহার প্রাচীন। রূপচর্চায় এর জাদুকরী উপকারিতা তো সর্বজনবিদিত।


    এছাড়া সনাতন ধর্মে পূজা-অর্চনা ও শেষকৃত্যে চন্দন কাঠ অপরিহার্য। মুসলিম ঐতিহ্যে সুগন্ধি আতর তৈরিতে চন্দনের তেল অনন্য উপাদান।
    সম্প্রতি যশোর জেলা বন বিভাগ আয়োজিত বৃক্ষমেলায় প্রথমবারের মতো শ্বেতচন্দন নিয়ে হাজির হন সাজ্জাদ হোসেন। মেলার দর্শনার্থীদের মধ্যেও চন্দন কেনা নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায়। মেলায় শ্রেষ্ঠ তরুণ উদ্যোক্তার পুরস্কারও জিতে নেন সাজ্জাদ হোসেন।


    যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ছাত্র সবুজ বৈরাগী জানান, মাত্র ৫০ টাকায় ৪৪ দিন বয়সী চারা কিনে তিনি ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে এটিকে দেখছেন। অন্যদিকে অরনিমা নামের এক দর্শনার্থী স্মৃতি এবং ধর্মীয় ভাবাবেগ থেকে কেনা চারাটি ২০ বছর পর নিজের পূজায় ব্যবহারের আশা ব্যক্ত করেন।


    সাজ্জাদ হোসেন বর্তমানে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে চারা উৎপাদন করছেন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেওয়ার জন্য ১৪ বছর বয়সী ২টি বিশেষ চারাসহ মোট ২,০০০টি চারা প্রস্তুত রেখেছেন। সরকারি ভবনের অব্যবহৃত জায়গায় চন্দন রোপণ ও পরিচর্যার দায়িত্ব নিজ কাঁধে নেওয়ার ইচ্ছাও ব্যক্ত করেছেন এই উদ্যোক্তা।


    বাংলাদেশ চন্দন চাষের জন্য অনুকূল হলেও দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যা ও সুরক্ষার অভাবের কারণে গাছটি দেশে কিছুটা বিলুপ্তপ্রায়। যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর এস.এম আইয়ূব হোসেন এবং সহকারী বন সংরক্ষক অমিতা মন্ডল এই খাতের বেশ কিছু দিক তুলে ধরেন। এরমধ্যে-
    ‘দীর্ঘমেয়াদী ধৈর্য ও ঋণ সহায়তা: চন্দন গাছ থেকে প্রথম ৫-৭ বছর কোনো আর্থিক আয় আসে না। তাই তরুণ উদ্যোক্তাদের টিকে থাকতে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ও সরকারি প্রণোদনা দেওয়া জরুরি’।
    সুরক্ষা ও জাতীয় নীতি: মূল্যবান গাছ হওয়ায় চুরির ঝুঁকি থাকে। তাই উপযুক্ত আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলা প্রয়োজন।


    গবেষণা ও টিস্যু কালচার: জেনেটিক রিসোর্স সংরক্ষণে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চন্দনের ওপর উচ্চতর গবেষণা এবং উন্নত টিস্যু কালচারের সম্প্রসারণ ঘটানো দরকার।
    একটি ছোট্ট চারা-যার আজকের দাম মাত্র ৫০ টাকা, সঠিক পরিচর্যা ও ২০ বছরের ধৈর্য শেষে সেটিই হতে পারে লাখ লাখ টাকার জাতীয় সম্পদ। সাজ্জাদ হোসেনের মতো নিবেদিত প্রাণ উদ্যোক্তারা প্রমাণ করেছেন, সুযোগ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে শ্বেতচন্দনের এই ‘সবুজ সোনা’ বিপ্লব বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতি।

  • জলাবদ্ধতার বুকে সবুজ বিপ্লব

    জলাবদ্ধতার বুকে সবুজ বিপ্লব

    খুলনার বিল ডাকাতিয়াসহ যশোর-খুলনা অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা বছরের অধিকাংশ সময় জলাবদ্ধ থাকে। বর্ষা এলেই মাঠঘাট পানিতে তলিয়ে যায়, দীর্ঘদিন জমিতে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিকভাবে সবজির চারা উৎপাদন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অথচ সময়মতো মানসম্মত চারা না পেলে কৃষকদের মৌসুমি সবজি চাষও ব্যাহত হয়। এমন বাস্তবতায় কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে পলি নেট হাউস প্রযুক্তি।


    একসময় যেখানে জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকদের দূর-দূরান্ত থেকে চারা সংগ্রহ করতে হতো, সেখানে এখন স্থানীয়ভাবেই উৎপাদিত হচ্ছে উন্নতমানের সবজির চারা। শুধু নিজের এলাকার চাহিদা পূরণই নয়, আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের কাছেও নির্ভরযোগ্য চারার উৎস হয়ে উঠছে এসব পলি নেট হাউস। ফলে জলাবদ্ধতাকে সীমাবদ্ধতা নয়, বরং নতুন সম্ভাবনায় রূপ দেওয়ার এক সফল উদাহরণ তৈরি হয়েছে ডুমুরিয়া উপজেলায়।


    কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পলি নেট হাউস হলো মোটা ও টেকসই পলিথিন দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের সুরক্ষিত ঘর। এর ভেতরে লোহার তৈরি ট্রে বা নেটের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন সবজির বীজ বপন করা হয়। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উৎপাদিত হওয়ায় চারা রোগবালাই, অতিবৃষ্টি কিংবা ঝড়ো আবহাওয়ার ক্ষতি থেকে অনেকটাই নিরাপদ থাকে। একই সঙ্গে চারা সমানভাবে বেড়ে ওঠে এবং কৃষকের হাতে পৌঁছায় উন্নতমান নিশ্চিত করে।


    ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, একটি পলি নেট হাউসে একসঙ্গে এক লাখেরও বেশি চারা উৎপাদন করা সম্ভব। সঠিক ব্যবস্থাপনায় বছরে আট থেকে দশ লাখ পর্যন্ত চারা উৎপাদন করা যায়। বর্তমানে উপজেলার খর্ণিয়া ও আটলিয়া ইউনিয়নে কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় ব্যক্তি উদ্যোগে তিনটি পলি নেট হাউস গড়ে উঠেছে। এসব হাউসে প্রধানত বিভিন্ন ধরনের সবজির চারা উৎপাদন করা হচ্ছে।


    তার মতে, জলাবদ্ধ এলাকায় এ প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও মানসম্মত চারা উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি কিংবা জলাবদ্ধতার সময়ও চারা নিরাপদ থাকে। ফলে কৃষক নির্ধারিত সময়েই চারা হাতে পান এবং মৌসুমি সবজি চাষে কোনো বিলম্ব হয় না।
    ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া ইউনিয়নের বরাতিয়া গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা তাপস সরকার এ পরিবর্তনের অন্যতম সফল মুখ। তার প্রতিষ্ঠিত রুদ্রনীল এগ্রি নার্সারি এখন বিল ডাকাতিয়াসহ যশোর-খুলনা অঞ্চলের জলাবদ্ধ এলাকার কৃষকদের কাছে পরিচিত একটি নাম। উন্নতমানের সবজির চারা উৎপাদনের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের কর্মসংস্থানই তৈরি করেননি, স্থানীয় কৃষকদের জন্যও নির্ভরযোগ্য চারার উৎস গড়ে তুলেছেন।


    তাপস সরকার ২০১৭ সাল থেকে সবজির চারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। তবে ২০২১ সালে সরকারি সহযোগিতায় পলি নেট হাউস স্থাপনের পর তার নার্সারির কার্যক্রম নতুন গতি পায়। বর্তমানে তিনি চুইঝাল, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মরিচ, বেগুন, টমেটো, ক্যাপসিকামসহ বিভিন্ন প্রজাতির সবজির উন্নতমানের চারা উৎপাদন করছেন।
    তার নার্সারি থেকে এখন ডুমুরিয়া ছাড়াও যশোরের কেশবপুর, নড়াইল এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক মৌসুমভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী চারা সংগ্রহ করেন। কৃষকদের দাবি, এখান থেকে সংগ্রহ করা চারার গুণগত মান ভালো হওয়ায় মাঠে রোপণের পর ফলনও সন্তোষজনক হচ্ছে।


    তাপস সরকার বলেন, সরকারি সহায়তায় পলি নেট হাউস স্থাপনের ফলে সারা বছর উন্নতমানের চারা উৎপাদন অনেক সহজ হয়েছে। এ কাজে তার স্ত্রী বিজয়া সরকার সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করছেন। পারিবারিক উদ্যোগেই তারা কৃষিভিত্তিক একটি সফল উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
    তিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগের সহায়তা আরও বাড়ানো হলে বিল ডাকাতিয়াসহ জলাবদ্ধ এলাকার কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী আরও বেশি পরিমাণে মানসম্মত চারা উৎপাদন ও সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে কৃষকদের উৎপাদন খরচও কমবে এবং সময়মতো চারা পাওয়ার নিশ্চয়তা বাড়বে।


    স্থানীয় কৃষকদের মতে, জলাবদ্ধ এলাকায় সবজি চাষের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল মানসম্মত চারার সংকট। এখন স্থানীয়ভাবে চারা উৎপাদন হওয়ায় সেই সমস্যা অনেকটাই দূর হয়েছে। সময়মতো চারা পাওয়ায় কৃষিকাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী করা যাচ্ছে এবং ফলনও বাড়ছে।

  • উন্নত মানের আঁশ ও ভালো দামের আশা কৃষকদের

    উন্নত মানের আঁশ ও ভালো দামের আশা কৃষকদের

    একসময় খালটি ছিল মৃতপ্রায়। বছরের পর বছর পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষার পানিও সেখানে আর স্থায়ী হতো না। পানি না থাকায় পাট জাগ দেওয়া নিয়ে প্রতি মৌসুমেই চরম দুর্ভোগে পড়তেন স্থানীয় কৃষকরা। অনেককে কয়েক কিলোমিটার দূরে পুকুর ভাড়া নিয়ে কিংবা অন্যের জলাশয়ে অতিরিক্ত খরচ করে পাট পচাতে হতো। সেই দুর্ভোগ এখন অনেকটাই অতীত। সরকারি উদ্যোগে খাল পুনঃখননের পর এবার বর্ষার পানিতে থইথই করছে খাল। আর সেই পানিতেই দল বেঁধে মনের আনন্দে পাট জাগ দিচ্ছেন কৃষকরা। উন্নতমানের আঁশ ও ভালো দামের প্রত্যাশায় তাদের মুখে এখন স্বস্তির হাসি।


    ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ দক্ষিণপাড়া স্লুইসগেটসংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েক সপ্তাহ আগেও যে খালটি ছিল আগাছা আর পলিতে ভরাট, এখন সেখানে টইটম্বুর পানি। খালের দুই তীরে সারি সারি লাগানো বনজ ও ফলজ গাছের চারা পুরো এলাকাকে দিয়েছে এক মনোরম রূপ। খালের পানিতে সারিবদ্ধভাবে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে পাটের আঁটি। কেউ নতুন করে পাট নামাচ্ছেন, কেউ আবার পচা পাট তুলে আঁশ ছাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন পর এমন দৃশ্য দেখে স্থানীয় প্রবীণরাও সন্তোষ প্রকাশ করছেন।


    বড়ভাগ গ্রামের কৃষক ইমদাদুল শেখ বাড়ির পাশের খালে পাট জাগ দিতে দিতে বলেন, ‘আগে পানির জন্য অনেক কষ্ট করতে হতো। অনেক দূরে নিয়ে গিয়ে পাট পচাতে হতো, এতে খরচও বেশি লাগত। এবার বাড়ির পাশেই খালে পাট জাগ দিতে পারছি। সময়ও বাঁচছে, খরচও কমছে। সরকারের এই উদ্যোগ আমাদের অনেক উপকার করেছে।’


    একই গ্রামের কৃষকরা জানান, আগে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় অনেক সময় পাট ঠিকমতো পচত না। এতে আঁশের মান খারাপ হতো এবং বাজারে কাঙ্ক্ষিত দামও পাওয়া যেত না। এবার সেই সমস্যা অনেকটাই দূর হয়েছে।
    মালা গ্রামের কৃষক কামরুল শেখ বলেন, ‘আমি এবার দেড় একর জমিতে পাট চাষ করেছি। আগে অন্যের পুকুর ভাড়া নিতে হতো। অনেক সময় সেচ দিয়ে পানি তুলে পাট জাগ দিতে হয়েছে। এতে অতিরিক্ত খরচ হতো। এবার খালেই সব কাজ করতে পারছি। এতে উৎপাদন খরচ কমেছে এবং ভালো আঁশ পাওয়ার আশা করছি।’


    স্থানীয়দের মতে, খাল পুনঃখননের সুফল শুধু পাট চাষেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বর্ষার পানি সংরক্ষণ হওয়ায় আগামী মৌসুমে সেচ সুবিধাও বাড়বে। পাশাপাশি মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল তৈরি হবে এবং এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও সমৃদ্ধ হবে।
    টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিয়া আসাদুজ্জামান বলেন, ‘খাল পুনঃখননের কারণে কৃষি ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কৃষকরা সরাসরি এর সুফল পাচ্ছেন। এমন উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে এলাকার কৃষি উৎপাদন আরও বাড়বে।’


    উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সাগর হোসেন সৈকত বলেন, ‘প্রকল্পটি ছোট হলেও বাস্তবায়নে কোনো ধরনের শৈথিল্য ছিল না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শতভাগ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।’


    আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত নূর মৌসুমী বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথভাবে খালটি পুনঃখনন করা হয়েছে। এর সুফল ইতোমধ্যেই কৃষকরা পেতে শুরু করেছেন। এটি শুধু কৃষির উন্নয়নেই নয়, এলাকার জলাধার সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতেও জনস্বার্থ ও কৃষির উন্নয়নে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
    উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে এবং উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সম্প্রতি বড়ভাগ দক্ষিণপাড়া স্লুইসগেট থেকে মিলন মোল্যার বাড়ি পর্যন্ত ৫৭০ মিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ২৫ লাখ ৭৯ হাজার ১৪৮ টাকা।


    সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় কাজের মান, স্বচ্ছতা এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের উপস্থিতি ও কাজের হিসাব-নিকাশ নিয়মিত যাচাই করা হয়। এতে শ্রমিক অনুপস্থিতিজনিত কারণে উদ্বৃত্ত থাকা ৩৭ হাজার ৩৭০ টাকা সরকারি বিধি অনুযায়ী কোষাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

  • কৃষকদের পাশে ’গো এগ্রো’

    কৃষকদের পাশে ’গো এগ্রো’

    জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের দক্ষীণ উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের টেকসই কৃষি ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য ‘গোগ্রো’ প্রকল্পের আওতায় নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেড।

    চলমান গোগ্রো প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকদের ফসলের সঠিকমূল্য নিশ্চিত করতে সিনজেনটা ভ্যালু চেইন পার্টনারশীপ গড়ে তুলেছে। যা একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে কৃষক সরাসরি স্থানীয় ভ্যালু চেইন পার্টনার এর নিকট তাদের উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ করছে। এর ফলে কৃষকেরা ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তির পাশাপাশি বাজারে টেকসই অবস্থান তৈরি করতে পারবেন। বর্তমানে স্বল্প পরিসরে সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকায় অর্থাৎ প্রকল্পের পাশে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যাতে করে কৃষক খুব সহজেই সংযোগ স্থাপন করতে পারে।

    এ প্রসঙ্গে সিনজেনটা বাংলাদেশ এর কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স এ্যান্ড সাসটেইনিবিলিটি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, “কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি উৎপাদিত পণ্যের বাজারসংযোগ নিশ্চিত করাও কৃষকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত। সে লক্ষ্যেই কৃষকদের সক্ষমতা ও আধুনিক ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষির বাস্তবতায় সরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন ও বেসরকারি অংশীজনের সমন্বয়ে ‘গোগ্রো’প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”

    ২০২২ সালে যাত্রা শুরু করা ‘গোগ্রা’ প্রকল্পটি উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, স্থানীয় কৃষকদের আয় ও জীবনমান সমৃদ্ধ এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এই প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ১২০০ কৃষককে বিভিন্ন সময়োপযোগী সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। জলবায়ু-সহনশীল ফসলের চাষ সম্প্রসারণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য পুকুর খনন, খাল পুনঃখনন, রিজেনারেটিভ কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের সমন্বিত চর্চা এবং কৃষকদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে, এসব উদ্যোগের ফলে প্রকল্প এলাকায় কৃষি উৎপাদন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কৃষি অভিবাসন উল্লেখযোগ্যহারে কমেছে।

    প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে এ প্রকল্পের কার্যক্রম আরো সম্প্রসারিত হবে অর্থাৎ প্রায় ৩,৫০০ জন কৃষক এবং ১০০০ একর জমিকে জলবায়ু-সহনশীল ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি তারা উল্ল্যেখ করেন, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে দারিদ্র্য হ্রাস, জলবায়ু কার্যক্রম এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য অংশীদারিত্বের বিষয়ে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখবে।

  • সরকারি গুদামে সার, মাঠে হাহাকার!

    সরকারি গুদামে সার, মাঠে হাহাকার!

    আমন ধান রোপণের ভরা মৌসুম। অথচ যশোরের মাঠে এখন সারের জন্য হাহাকার। সরকারি হিসাব বলছে, গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ডিলার ও সাব-ডিলারদের দোকানে সরকার নির্ধারিত দামে মিলছে না ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার। বাধ্য হয়ে অনুমোদনহীন দোকান থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে সার কিনছেন কৃষকরা। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো জমি প্রস্তুত ও ধান রোপণ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।


    যশোরের চৌগাছা, শার্শা ও সদর উপজেলাসহ জেলার আটটি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, মাঠে আমন চাষ পুরোদমে চললেও কৃষকদের প্রয়োজনীয় সার মিলছে না। সবচেয়ে বেশি সংকট ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারে।


    চৌগাছা উপজেলার পাশাপোল ইউনিয়নের বাড়ীয়ালী গ্রামের কৃষক আলী কদর বলেন, ‘সাব-ডিলারের কাছে ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি সার কিনতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা দিতে পারছে না। অথচ অনুমোদনহীন দোকানে গেলে দুই গুণ বেশি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে।’
    একই ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাব-ডিলার কামরুল ইসলাম জানান, তাঁর এলাকায় ৫৪৫ জন কৃষক রয়েছেন। অথচ তিনি পেয়েছেন মাত্র ১০ বস্তা ডিএপি, ১০ বস্তা এমওপি, ৫৫ বস্তা টিএসপি ও ১০০ বস্তা ইউরিয়া।


    তিনি বলেন, ‘এখন আমন রোপণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কৃষকের প্রয়োজনের তুলনায় যে বরাদ্দ পেয়েছি, তা খুবই অপ্রতুল। কৃষকদের কোনো সমাধান দিতে পারছি না।’
    ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাব-ডিলার কিংকর হালদারও একই অভিযোগ করে বলেন, ‘কৃষক টাকা নিয়েও সার পাচ্ছেন না। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় আমরা বিপাকে পড়েছি।’
    শার্শা উপজেলার ডিহি ইউনিয়নের গোকর্ণ গ্রামের কৃষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ধানের প্রথম চাষে সার না দিলে ভালো ফলন হয় না। কিন্তু এখন ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি, এমওপি—সব সারেরই সংকট। মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে কর্মকর্তাদের বক্তব্যের কোনো মিল নেই।’
    সদর উপজেলার চুরামনকাটি ইউনিয়নের জগহাটি গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত দামে ইউরিয়া ২৫ টাকা, ডিএপি ১৯ টাকা, টিএসপি ২৫ টাকা ও এমওপি ১৮ টাকা কেজি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এমওপি ২৫ থেকে ৩০ টাকা, টিএসপি ৩০ থেকে ৪০ টাকা, ডিএপি ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং ইউরিয়া অনেক জায়গায় ৩০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।’
    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যশোরে বিএডিসির অনুমোদিত ডিলার ও সাব-ডিলার রয়েছেন ১৬২ জন এবং বিসিআইসির অনুমোদিত ডিলার ১৪১ জন।
    বিএডিসি ও কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, জেলার নয়টি গুদামের মোট ধারণক্ষমতা ১৩ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। কিন্তু বর্তমানে সেখানে ধারণক্ষমতার প্রায় প্রায় দ্বিগুন ২৪ হাজার মেট্রিক টন নন-ইউরিয়া সার মজুদ রয়েছে। ইউরিয়ার মজুদও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি রয়েছে।


    গত জুন মাসে ডিলারদের মধ্যে ২ হাজার ১০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ৮০৮ মেট্রিক টন টিএসপি, ১ হাজার ৭৫৬ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ১২৩ মেট্রিক টন এমওপি বিতরণ করা হয়েছে। জুলাই মাসের জন্যও ডিএপি, টিএসপি ও এমওপির উল্লেখযোগ্য মজুদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
    অর্থাৎ সরকারি হিসাবে সারের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের সাব-ডিলারদের দাবি, তারা প্রয়োজনের ২০ শতাংশ সারও পাচ্ছেন না।
    সরকার প্রতি কেজি সারে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যে সার ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি, সেটি কৃষকদের জন্য ২০ থেকে ২৭ টাকায় সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সেই সুবিধা পাচ্ছেন না কৃষকরা।


    কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি ২৭ টাকার ইউরিয়া ৩৫ টাকা, ২১ টাকার ডিএপি ৩০ টাকা, ২০ টাকার এমওপি ৩০ টাকা এবং ২৫ টাকার টিএসপি ৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
    এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা নিয়মিত মাঠে গিয়ে সার ও বালাইনাশকের দোকান মনিটরিং করছি। বর্তমানে সারের কোনো সংকট নেই। চাহিদা অনুযায়ী সার বিতরণ করা হয়েছে। কোথাও সমস্যা থাকলে জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


    তবে কৃষক ও সাব-ডিলারদের দাবি, মনিটরিং কার্যক্রম কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সার পৌঁছাচ্ছে না।
    কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমন ধানের প্রথম চাষ ও চারা রোপণের সময় প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করতে না পারলে ফলন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে। এক বিঘা জমি প্রস্তুতের সময়ই প্রায় ৫০ কেজি সার প্রয়োজন হয়। ফলে বর্তমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।