কৃষি

  • শত পরিবারে অনিশ্চয়তা

    শত পরিবারে অনিশ্চয়তা

    এক রাতের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য থেমে যায় ঘেরের এয়ারেটর। আর তাতেই কমতে থাকে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা। ভোরে ঘেরে গিয়ে খামারিরা দেখেন, পানির ওপর ভেসে উঠেছে হাজার হাজার মরা মাছ। শার্শার রায়পুর-বাহাদুরপুর ইউনিয়নের সোনামুখো বিলে এই ঘটনায় খামার মালিকদের দাবি, তাঁদের প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।


    ভুক্তভোগীরা জানান, শুক্রবার রাত আনুমানিক ১টার পর থেকে ঘের এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় যান্ত্রিক এয়ারেটরের মাধ্যমে পানিতে কৃত্রিম অক্সিজেন সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পানিতে স্বাভাবিক অক্সিজেনের মাত্রাও দ্রুত কমতে থাকে। রাত পেরিয়ে ভোর হওয়ার আগেই মাছ মরতে শুরু করে।


    সোনামুখো বিলের ‘এ এফ মৎস্য খামার’ যৌথভাবে গড়ে তুলেছেন উদ্যোক্তা আলফাজুল হক ও ফারুক হোসেন। তাঁদের দাবি, খামারে উৎপাদিত পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বাজারজাতের উপযোগী হয়ে উঠেছিল। হঠাৎ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে সেই মাছের বড় অংশ মারা যাওয়ায় এক রাতেই তাঁদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।


    আলফাজুল হক জানান, বাজারে বিক্রির উপযোগী মাছের খাদ্য কিনতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা বাকিতে নেওয়া হয়েছিল। মাছ বিক্রি করে সেই টাকা পরিশোধের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু হঠাৎ বিপর্যয়ে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।


    তিনি বলেন, ‘বাজারে বিক্রির উপযোগী এসব মাছের খাদ্য কিনতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা বাকিতে নেওয়া হয়েছিল। এখন এক রাতের ঘটনায় এত বড় ক্ষতি হয়েছে। এই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করব, তা নিয়ে আমরা দিশেহারা।’
    আরেক খামারি ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমাদের এই খামারের আয়ের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় একশ পরিবার নির্ভরশীল। রাত ১টার পর থেকে বিদ্যুৎ না থাকায় অক্সিজেনের সংকট তৈরি হয়। এক রাতেই আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে।’


    খামার-সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ খামারে উৎপাদিত মানসম্মত পাবদা মাছের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের মাধ্যমে ভারতে রপ্তানি করা হতো। ফলে খামারের উৎপাদনের সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিষয়টিও জড়িত ছিল।


    কিন্তু হঠাৎ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যাওয়ায় সেই সরবরাহ ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।


    ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, মাছ মারা যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেননি।
    খামারিদের দাবি, দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির সরকারি হিসাব তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান, ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা এবং সহজ শর্তে পুনর্বাসন ঋণের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

  • সার সংকটে দিশেহারা রাজশাহীর আমন চাষিরা

    সার সংকটে দিশেহারা রাজশাহীর আমন চাষিরা

    আমন মৌসুমে ধানের চারা রোপণ ও পরিচর্যার ব্যস্ত সময়ে রাজশাহীর কৃষকদের নতুন দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে সার। এক ডিলারের দোকানে সার না পেয়ে অন্য ডিলারের কাছে ছুটছেন কৃষকেরা। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও চাহিদার তুলনায় সামান্য সার মিলছে, আবার কোথাও ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। এ সুযোগ নিয়ে সরকারি দামের চেয়ে ৫০০-৭০০ টাকা বেশি দরে সার বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।

    গোদাগাড়ীর দেওপাড়া ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার নজরুল ইসলামের দোকানে সারের জন্য দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। দেওপাড়া গ্রামের কৃষক আল্লাম জানান, সকাল থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কাজীহাটা গ্রামের কৃষক বাবলু ১০ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। নিজের এলাকার ডিলারের কাছে ইউরিয়া না পেয়ে দেওপাড়ায় এলেও মাত্র ২০ কেজি সার দেওয়ার কথা শুনে তিনি সার না নিয়েই বাড়ি ফেরেন।

    পবার ভিমের ডাইং গ্রামের কৃষক হারুন অর রশিদ ডিএপি না পাওয়ার কথা জানান। গোদাগাড়ীর কদমশহরের কৃষক রাশিদুল ইসলামও নিজের এলাকার ডিলারের কাছে সার না পেয়ে অন্য এলাকায় ছুটেছেন। তিনি বলেন, ‘শুধু ইউরিয়া দিলে ধানের ফলন ঠিক রাখা কঠিন।’ একই এলাকার আকবর আলী দুই বস্তা ইউরিয়া পেলেও ডিএপি পাননি।

    চারঘাটেও একই চিত্র। ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের আকাশ এন্টারপ্রাইজে টিএসপির জন্য কৃষকদের ভিড় দেখা যায়। কেউ

    এক বস্তার বদলে ২৫ কেজি, আবার কেউ দুই বস্তার চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১৫ কেজি সার পেয়েছেন।

    ডিলারের কর্মচারীর দাবি, ১০ মেট্রিক টন টিএসপি পাওয়ার পর অবশিষ্ট ছিল মাত্র ২৯ বস্তা। তাই সবাইকে অল্প অল্প করে দেওয়া হচ্ছে।

    সারের সংকটের পাশাপাশি বেশি দামে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। গোদাগাড়ীর রাজাবাড়ীহাটে এক কৃষক ৫০ কেজির এক বস্তা ডিএপি ১ হাজার ৭৫০ টাকায় কিনেছেন, যেখানে সরকারি মূল্য ১ হাজার ৫০ টাকা। একই দোকানে ইউরিয়া বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকায়, সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ডিএপি ৩৪ টাকা কেজি দরে বিক্রির কথা স্বীকার করেছেন।

    জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে রাজশাহীতে ইউরিয়ার বরাদ্দ ৭ হাজার ৫৭৪ মেট্রিক টনের বিপরীতে পাওয়া গেছে ৪ হাজার ৭২৪ টন। ডিএপির ২ হাজার ৬৪৭ টনের বিপরীতে এসেছে ২ হাজার ১৮২ টন। টিএসপির ১ হাজার ৫১১ টনের মধ্যে পাওয়া গেছে ১ হাজার ২৪০ টন এবং এমওপির ১ হাজার ৭৬০ টনের বিপরীতে এসেছে ১ হাজার ৪৯৬ টন।চলতি আমন মৌসুমে রাজশাহীতে ৮৩ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। এর বাইরে জেলার প্রায় ১৭ হাজার ৭৭৪ হেক্টর পুকুরে মাছ চাষেও সার ব্যবহৃত হয়। ফলে কৃষিজমির বরাদ্দের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

    রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কিছুটা কম। বেশি দামে সার বিক্রি বা অবৈধ মজুদের অভিযোগ পেলে অভিযান চালানো হচ্ছে।’

    জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলামের দাবি, রাজশাহীতে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। কোথাও বেশি দামে বিক্রি বা পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

    মাঠে সার না পাওয়ার তথ্য পেলেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

    গত কয়েক দিনে পবা, পুঠিয়া, দুর্গাপুর ও চারঘাটে অভিযান চালিয়ে সার বাইরে বিক্রি ও অবৈধ মজুদের অভিযোগে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে।

  • তরমুজ চাষে সফল কলাপাড়ার সেলিম

    তরমুজ চাষে সফল কলাপাড়ার সেলিম

    দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কুয়াকাটায় সমুদ্রতীরবর্তী উপকূলীয় জনপদ পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় বেড়েছে ছাদ কৃষি ও সেই সাথে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে তরমুজের চাষ। আবহাওয়া ও পরিবেশ তরমুজ চাষের বেশ উপযোগী। আর সেখানে অসময়ে ব্ল্যাক বেবি জাতের কালো রঙের তরমুজ চাষ করে সফল হয়েছেন ধুলাসার ইউনিয়নে নতুনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কৃষক মো: সেলিম গাজী।অসময়ে থোকায় থোকায় মাচায় মাচায় ঝুলছে কালো রঙয়ের তরমুজ। ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি তরমুজকে জাল দিয়ে ঝোলানো হয়েছে। শখের বশে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন সেলিম। সেই তরমুজ দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছে উৎসুক জনতা। তার সাফল্য দেখে আগ্রহ দেখাচ্ছেন অন্যরাও।কথা হয় কৃষক সেলিম গাজীর সাথে। তার তরমুজ চাষ নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাড়ির ছাদে বস্তায় মাটি ও গরুর গোবর দিয়ে সার তৈরি করে তা দিয়ে প্রথমে পলিথিনে তরমুজে বীজ চারা করি। এরকম ৫০টি থানা চারা ছাদে রোপন করি। প্রথম দিকে বৃষ্টিতে চারা নষ্ট হয়ে যায়। ২৫টি থানা চারা ভাল ছিল। তাতেই ৪০ পিছ তরমুজ হয়েছে।’

    তরমুজ বিক্রির টাকা তার পরিবারে কিছুটা স্বস্তি এনেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই পদ্ধতিটি তৈরিতে শুরুতে একসাথে কিছুটা খরচ বেশি হলেও পরবর্তী সময়ে খরচ হয় খুবই কম। এ ছাড়া আগাছা হয় না বলে পরিষ্কারের কোনো ঝামেলা নেই। দফায় দফায় সার দেয়ার ঝামেলাও নেই।’

    কৃষক সেলিম গাজীর ভাষ্য মতে, অনলাইনের মাধ্যমে বীজ ক্রয় করে জৈষ্ঠ মাসের প্রথম দিকে তিনি চারা রোপন করেন। ইউটিউবের মাধ্যমে তরমুজ চাষের বিস্তারিত এবং সার ও ওষুধ দেয়ার ব্যাপারে পরামর্শ পান। এরপর প্রায় সাত হাজার টাকা বিনিয়োগ করে তরমুজ, শসা, করলা, লাউ ছাদে চাষ করেন। বীজের চারা গজালে বাঁশ ও সুতা দিয়ে মাচা তৈরি করেন। বাঁশের খুঁটি দিয়ে মাচায় চারা তুলে দেন। এভাবেই তিনি খেত প্রস্তুত করেন।

    বর্তমান তরমুজ শেষ হলে সামনে ৫০ থানা জিওব্যাগের মাধ্যমে আরো বড় আকারে তরমুজ চাষ করবেন বলে তিনি জানান।

    ধুলাসার ইউনিয়নে নতুনপাড়া গ্রামে তার বাড়িতে ছাদে গিয়ে দেখা যায়, পরিবেশবান্ধব মালচিং পদ্ধতিতে একটি ছাদে চার আকৃতির মাচার ওপরে সবুজ পাতার নিচে ঝুলছে কালো রঙের তরমুজ। মাচায় ঝুলে থাকা তরমুজের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি তরমুজকে জাল দিয়ে ঝোলানো হয়েছে। সবুজ কচি লতাপাতার মাঝে প্রায় ২৫ থানা গাছে ঝুলছে কালো রঙের তরমুজ।

    স্থানীয় বাসিন্দা ইদ্রিস গাজী বলেন, ‘সেলিম গাজী একজন আদর্শ কৃষক। তিনি অত্যন্ত পরিশ্রমী মানুষ। এলাকায় বিষমুক্ত সবজি, নানা রকম ফসল ফলিয়ে নিজেদের চাহিদা মিটিয়েছেন।’

    কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: আরাফাত হোসেন বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে মালচিং পদ্ধতি তরমুজ চাষাবাদ করা ভালো। আর তরমুজ একটি লাভজনক ফসল।’

  • আগাম শিম চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা

    আগাম শিম চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা

    কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চণ্ডিপাশা ইউনিয়নের চণ্ডিপাশা চরপাড়া গ্রামের কৃষকদের কাছে আগাম শিম এখন শুধু একটি সবজি নয়, বাড়তি আয়ের অন্যতম পথ। অল্প জমিতে তুলনামূলক কম খরচে চাষ করে কয়েক গুণ বেশি আয় করার সুযোগ থাকায় দিন দিন বাড়ছে এ চাষ।

    স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আট থেকে দশ বছর আগে এ গ্রামে আগাম জাতের শিম চাষ শুরু হয়। প্রথম দিকে কয়েকজন কৃষক পাবনা থেকে বীজ এনে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন। ফলন ও লাভ ভালো হওয়ায় তাঁদের সাফল্য দেখে অন্যরাও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এখন গ্রামের অনেক কৃষকই আগাম শিম চাষ করছেন। কেউ কেউ নিজেরাই বীজ সংরক্ষণ করে পরের বছর জমিতে ব্যবহার করছেন।কৃষক গিয়াস উদ্দিন জানান, এবার ২০ শতক জমিতে আগাম শিম চাষ করেছেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, চাষে খরচ হয়েছে প্রায় ছয় হাজার টাকা। ইতিমধ্যে ৩০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করেছেন। জমিতে আরও প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করতে পারবেন বলে তাঁর আশা।

    ২০ শতক জমি থেকে তাঁর মোট বিক্রি হতে পারে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিলে লাভের পরিমাণও দাঁড়াবে উল্লেখযোগ্য অঙ্কে। গিয়াস উদ্দিন বলেন, গত সাত বছর ধরে তিনি আগাম জাতের শিম চাষ করছেন। প্রতিবছরই ভালো ফলন ও দাম পাওয়া যায়। এ কারণে এখন তিনি নিয়মিত এ জাতের শিম চাষ করেন। গিয়াস উদ্দিনের পাশের জমিতেই আগাম শিম চাষ করেছেন ফারুক মিয়া। ৩৫ শতক জমিতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ১৫-১৬ হাজার টাকা। এরই মধ্যে তিনি ৩০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করেছেন। জমিতে আরও প্রায় দুই লাখ টাকার শিম বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

    ফারুক মিয়া বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি আগাম শিম চাষ করছেন। আগাম শিম বাজারে তুলতে পারলে দাম ভালো পাওয়া যায়। তাই অন্য ফসলের তুলনায় এ চাষে লাভের সম্ভাবনা বেশি

    শুধু গিয়াস উদ্দিন ও ফারুক মিয়া নন, একই গ্রামের কৃষক ফয়সাল মিয়াও ২৬ শতক জমিতে আগাম শিম চাষ করে কয়েকগুণ লাভের স্বপ্ন দেখছেন। তাঁদের সাফল্য দেখে গ্রামের আরও অনেক কৃষক এ চাষে যুক্ত হয়েছেন।

    আগাম শিম চাষের শুরুটাও ছিল একেবারে স্থানীয় কৃষকদের উদ্যোগে। প্রথম দিকে পাবনা থেকে বীজ এনে চাষ করতেন তাঁরা। পরে চাষের অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের জমির ভালো শিম থেকে বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ শুরু করেন।

    উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চণ্ডিপাশা এলাকার মাটি গ্রীষ্মকালীন আগাম শিম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে সবজি প্রণোদনা, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে কিভাবে ফসলকে রক্ষা করবে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

  • কাঠবিড়ালির আক্রমণে অস্তিত্ব সংকটে সবজি ও ফল-ফলাদি

    কাঠবিড়ালির আক্রমণে অস্তিত্ব সংকটে সবজি ও ফল-ফলাদি

    কুমিল্লা দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তর লাকসামের নাঙ্গলকোট, লালমাই ও মনোহরগঞ্জ উপজেলার সর্বত্র ক্ষুদে হিংস্র প্রাণি কাঠবিড়ালীর ভয়াবহ আক্রমণে অস্তিত্ব সংকটে পড়তে যাচ্ছে সবজি ও ফল-ফলাদি বাগান।

    প্রতি মিনিট সময়ে প্রায় ১০০/১৫০ ফুট লাফিয়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এবং এক গাছ থেকে অন্য গাছে বেড়ানো কাঠবিড়ালী [গ্রামীণ নাম ছলা হিসাবে পরিচিত] এখন শুধু এ সম্পদগুলোই খাচ্ছে না বরং প্রতিনিয়ত খেয়ে যাচ্ছে এ অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষের স্বপ্নের প্রত্যাশাকে।

    জেলা দক্ষিণাঞ্চল উপজেলাগুলোর একাধিক লোকজন জানায়, এ অঞ্চলে গ্রামীণ ফলজ নারিকেল, ডাব, পেয়ারা, বরই, আমড়া, আতা ও আনার ফল-ফলাদি থেকে শুরু করে সীম, লাউ, কুমড়া ও শসা সহ নানান ধরনের সবজি ও ফল-ফলাদি খেয়ে নষ্ট করে ফেলছে।

    ওদের প্রতিরোধে কোন ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন বাগান মালিকরা। প্রাথমিক ভাবে সাধারণ মানুষ হিং¯্র কাঠ বিড়ালীর বেপরোয়া অত্যাচার থেকে বাগানের ফসল রক্ষার্থে টিন দিয়ে শব্দ বাজানোর মতো ফাঁদ তৈরি করেও কোন প্রতিকার পাচ্ছে না।

  • ভুল আগাছানাশকে ১৫ শতক জমির ধান নষ্ট

    ভুল আগাছানাশকে ১৫ শতক জমির ধান নষ্ট

    গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ধানক্ষেতে আগাছা দমনের জন্য কীটনাশকের দোকান থেকে ওষুধ কিনে প্রয়োগের পর কৃষক মো. কামরুজ্জামানের ১৫ শতক জমির ধান নষ্ট হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি।

    ভুক্তভোগী কৃষক কামরুজ্জামান উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের পশ্চিম বেলকা গ্রামের আব্দুর জব্বার সরকারের ছেলে। অভিযুক্ত কীটনাশক বিক্রেতা মো. মাহবুর মিয়া একই ইউনিয়নের বেলকা নবাবগঞ্জ গ্রামের মো. নয়া মিয়ার ছেলে।

    কৃষক কামরুজ্জামানের অভিযোগ, ধানক্ষেতে আগাছা দেখা দেওয়ার পর কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু কর্মকর্তাকে না পেয়ে মাহবুর মিয়ার কীটনাশকের দোকানে গিয়ে ধানক্ষেতের আগাছা দমনের জন্য ওষুধ চান। তখন দোকানদার তাকে ‘এরাক্সন ২০০ এসএল’ নামের ১০০ মিলিলিটারের একটি ওষুধ দেন। পরে দোকানদারের পরামর্শ অনুযায়ী গত ১৩ আগস্ট সেটি ধানক্ষেতে প্রয়োগ করেন তিনি।

    কৃষকের দাবি, ওষুধ প্রয়োগের পরদিন থেকেই ধানের চারা মরে যেতে শুরু করে। পরে কৃষি কর্মকর্তাকে জানালে ক্ষতিগ্রস্ত জমি পরিদর্শন করা হয়।

    কামরুজ্জামান বলেন, “আমি ধানক্ষেতের আগাছা দমনের জন্য ওষুধ চেয়েছিলাম। দোকানদারের পরামর্শে ওষুধ কিনে জমিতে দিয়েছি। পরদিন দেখি ধানের চারা মরে যাচ্ছে। এখন আমার ১৫ শতক জমির প্রায় সব ধানই নষ্ট হয়ে গেছে।”তবে কীটনাশক বিক্রেতা মাহবুর মিয়া বলেন, “আমি ওষুধ দিতে ভুল করিনি। কারণ, সে আমার কাছ থেকে খাওনা বাড়ির (ফাঁকা জমি) ঘাস মারার কথা বলে ওষুধ নিয়েছিল।”

    সংশ্লিষ্ট এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. এরশাদ মিয়া বলেন, “বিষয়টি জানার পর ধানক্ষেত পরিদর্শন করেছি। সব ধানের চারা মারা গেছে। এ নিয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলেছি।”

    সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওষুধটি ও এর প্রয়োগ পদ্ধতি সঠিক ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। লাইসেন্স ছাড়া এ ধরনের ওষুধ বিক্রি করা যায় না। ওই বিক্রেতার লাইসেন্স আছে কি না, সেটিও যাচাই করা হবে “

    উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, “অভিযোগ এখনো তার কাছে আসেনি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

  • ছাদ বাগানে সবুজের হাতছানি

    ছাদ বাগানে সবুজের হাতছানি

    ইট-পাথরের শহরে সবুজের ছোঁয়া এনে অনন্য এক ছাদ বাগান গড়ে তুলেছেন জামালপুরের মাদারগঞ্জ পৌর শহরের বালিজুড়ী বাজারের ব্যবসায়ী ও পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ হাসান। শখের বশে গড়ে তোলা তার এই বাগানে এখন শতাধিক দেশি-বিদেশি ফলদ গাছ শোভা পাচ্ছে।

    ২০২৪ সালের শেষ দিকে শুরু করা বাগানটিতে রয়েছে জামরুল, আপেল, সফেদাসহ নানা জাতের ফলদ গাছ। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেলে ব্যতিক্রমী এই ছাদ বাগানটি পরিদর্শন করেন মাদারগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান।

    সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে ছিলেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। তারা বাগানের বিভিন্ন গাছ ঘুরে দেখেন এবং গাছের পরিচর্যা, রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনসহ প্রয়োজনীয় বিষয়ে বৈজ্ঞানিক পরামর্শ দেন।

    কৃষি কর্মকর্তারা জানান, ছাদ বাগানের টবের মাটিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ধরে রাখতে নিয়মিত জৈব সার ব্যবহার করা জরুরি। পাশাপাশি বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে পোকামাকড় ও ছত্রাকের আক্রমণ থেকে গাছ রক্ষায় প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সময়ে বালাইনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দেন তাঁরা।

    উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ব্যস্ত নাগরিক জীবনে ছাদ বাগান মানুষের জন্য একদিকে যেমন প্রশান্তির জায়গা তৈরি করছে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখছে। শহরের প্রতিটি অব্যবহৃত ছাদ এভাবে সবুজে রূপান্তর করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

    খালিদ হাসানের এই ছাদ বাগানটি এখন স্থানীয়দের কাছেও অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে। ইট-পাথরের শহরের মধ্যে গড়ে ওঠা এই সবুজ বাগান প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের জন্য তৈরি করেছে এক টুকরো প্রশান্তির আবহ।

  • পতিত জমিতে পেয়ারা চাষে সফল ইমামুল

    পতিত জমিতে পেয়ারা চাষে সফল ইমামুল

    মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় পতিত ও পরিত্যক্ত জমিতে পেয়ারা চাষে অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের চম্পকলতা গ্রামে পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে পেয়ারা চাষে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন কৃষক ইমামুল ইসলাম। তার এ সাফল্যে এলাকার অন্য কৃষকরাও এখন বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

    পেয়ারা আমাদের দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সহজলভ্য একটি ফল। পুষ্টিবিদদের মতে, পেয়ারা ভিটামিন-সি, আঁশ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ও হজম প্রক্রিয়ায় দারুণ কার্যকর। বিশেষ করে ‘গোল্ডেন এইট’ ও ‘গোল্ডেন টেন’ জাতের পেয়ারাগুলো অত্যন্ত সুস্বাদু, রসালো এবং উচ্চ ফলনশীল। এ জাতের গাছগুলো আকারে ছোট ও ঘন হওয়ায় উচ্চ ঘনত্বের চাষাবাদের জন্য বেশ উপযোগী। বছরে দুইবার ফলন পাওয়ায় কৃষকদের কাছে এসব জাতের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

    চাষি ইমামুল ইসলাম জানান, সিলেট অঞ্চলে কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর সহযোগিতায় তিনি আধুনিক পদ্ধতিতে পেয়ারা চাষ শুরু করেন। দুই বিঘা জমিতে ‘গোল্ডেন এইট’ ও ‘গোল্ডেন টেন’ জাতের ৬৭টি চারা রোপণ করে মাত্র এক বছরের মধ্যেই বাম্পার ফলন পেয়েছেন। তার বাগানে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হলেও ইতোমধ্যে ২ লাখ টাকারও বেশি পেয়ারা বিক্রি করেছেন। বর্তমান বাজারদরে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১৮-২০ হাজার টাকার পেয়ারা বিক্রি করছেন।

    গাছের অবশিষ্ট ফল বিক্রি করে ব্যয়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ লাভের আশা করছেন ইমামুল।

    ইমামুল ইসলামের বাগানের সুস্বাদু পেয়ারা কিনতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছেন। এ ছাড়া বাগান দেখতে দর্শনার্থীদের আনাগোনাও চোখে পড়ার মতো। ইমামুলের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে চম্পকলতা গ্রামের আরও অনেকে পতিত জমিতে পেয়ারা বাগান তৈরির পরিকল্পনা করছেন।

    জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম খান দৈনিক বলেন, ‘ইমামুল ইসলামের সাফল্য প্রমাণ করে সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ থাকলে পতিত জমিকেও আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত করা সম্ভব। পেয়ারা চাষের জন্য বেলে ও দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী, যা আমাদের উপজেলায় প্রচুর রয়েছে। আমরা কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করছি।’

    কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে অল্প সময়ে ও কম খরচে অধিক ফলন নিশ্চিত করে জুড়ীর কৃষি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা সম্ভব।

  • কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা

    কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা

    কৃষি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগের অর্থবছরের ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সঙ্গে প্রান্তিক ও প্রকৃত কৃষকের হাতে ঋণ পৌঁছানো এবং ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে কঠোরভাবে নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

    সোমবার (১৭ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ঘোষণা অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর কারণ ও নতুন নীতিমালার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

    নতুন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর জন্য ২০ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য ৩৯ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ কৃষি খাতে ঋণ বিতরণে এখন বিশেষায়িত ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের অংশগ্রহণও আরো বাড়ানো হচ্ছে।

    ড. হাবিবুর রহমান বলেন, জাতীয় আয়ে কৃষির অবদান বিবেচনায় কৃষি খাতে ঋণের অংশ বর্তমানে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কৃষি ঋণের অংশকে মোট ঋণের আড়াই শতাংশ থেকে এবার চার শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ অংশ আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।কৃষির অবদানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ বিতরণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোই এর লক্ষ্য।

    তিনি বলেন, কৃষিকে স্বনির্ভর এবং কৃষককে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করাই কৃষি ঋণ বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্য। কৃষক যেন ঋণ মওকুফের আশায় না থেকে নিয়মিত ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে স্বনির্ভর হতে পারেন, উৎপাদন বাড়াতে পারেন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন—সে লক্ষ্যেই কৃষি ঋণের পরিমাণ ও আওতা বাড়ানো হচ্ছে।

    কৃষি ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে ডেপুটি গভর্নর বলেন, কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সঠিক সময়ে এবং প্রকৃত কৃষকের হাতে ঋণ পৌঁছে দেওয়া। কোনো ব্যক্তি প্রকৃত কৃষক না হয়েও কৃষি ঋণ পেলে সেখানে ঋণের অর্থ ভিন্ন খাতে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ধরনের অর্থের অপব্যবহারকে অর্থপাচারের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা যেতে পারে

    তিনি বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষক কার্ডধারীদের ঋণ দেওয়া তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। তবে কৃষক কার্ড না থাকলে ব্যাংককে নিশ্চিত হতে হবে, যাকে ঋণ দেওয়া হচ্ছে তিনি সত্যিই কৃষক কি না। প্রকৃত কৃষক যাচাই না করে ঋণ দিলে এর দায়ভার ব্যাংককেই বহন করতে হবে।

    অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. হাবিবুর রহমান স্বীকার করেন, কৃষি ঋণ বিতরণে মধ্যস্বত্বভোগী ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রকৃত কৃষকের হাতে ঋণ পৌঁছাচ্ছে কি না এবং ঋণের অর্থ যথাযথ কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ধরনের জরিপ ও পর্যবেক্ষণ করে। এ ক্ষেত্রে আরো নজরদারি বাড়ানোর আশ্বাস দেন তিনি।

    কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ বিতরণে পুরোনো ঋণ সমন্বয় করে নতুন করে ঋণ দেওয়ার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ বিষয়ে ড. হাবিবুর রহমান বলেন, সব ক্ষেত্রে বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। একজন কৃষকের আগের ঋণ পরিশোধের পর তার প্রয়োজন ও সক্ষমতা অনুযায়ী ঋণের পরিমাণ বাড়ানো হলে সেটিকে নতুন ঋণের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত প্রয়োজন যাচাই না করে একই ঋণ বারবার নবায়ন করা হলে তা নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন।

    তিনি বলেন, ঋণ দেওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেই অর্থ সঠিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না। ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করে কৃষক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা অর্জন করেছেন কি না, সেটিও ব্যাংককে দেখতে হবে। ঋণ বিতরণের শুরু থেকেই এর ব্যবহার ও পরিশোধ সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

    নতুন নীতিমালায় অঞ্চলভেদে কৃষির ধরন ও চাহিদা বিবেচনায় ঋণ বিতরণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ জন্য ‘এরিয়া অ্যাপ্রোচ’ পদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কৃষি ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ সরকারের ক্রপ জোনিং, ‘খামারি’ অ্যাপস এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য ব্যবহার করতে পারবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের ক্রপ জোনিংয়ের তথ্য ব্যবহার করে অঞ্চলভিত্তিক কৃষি উৎপাদন ও ঋণের চাহিদা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

    ড. হাবিবুর রহমান বলেন, কোনো এলাকায় ধান, কোথাও আলু, কোথাও মাছ বা অন্য কোনো কৃষিপণ্য বেশি উৎপাদিত হলে সে অনুযায়ী ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ, জমির পরিমাণ, সার, বীজ, শ্রমিক ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বিবেচনা করেই ঋণের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাজারদরের সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণের সীমা বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ থাকবে।

    নতুন নীতিমালায় নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য জামানতবিহীন ঋণসহ বিকল্প জামানত ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও ঋণ বিতরণ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ আবেদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু চার্জ ডকুমেন্ট ছাড়া অন্য কোনো চার্জ ডকুমেন্ট গ্রহণ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ বিতরণে প্রচলিত জমি বা স্থাবর সম্পত্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও দলগত জামানত ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

    নীতিমালায় কৃষি ঋণের অর্থ যেন নির্ধারিত খাতেই ব্যবহার হয়, সে বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাংকগুলো একক বা দলবদ্ধ কৃষক ও খামারির অনুকূলে ঋণ দিতে পারবে। হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন, হ্যাচারি, মাছের পোনা উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতকে ঋণের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা, চুক্তিভিত্তিক কৃষি, বিভিন্ন নতুন ফসলের উৎপাদন এবং কৃষিপণ্যের সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনাকেও নীতিমালায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

    এ ছাড়া ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল-সংক্রান্ত নীতিমালার সারসংক্ষেপও নতুন কর্মসূচিতে যুক্ত করা হয়েছে। ক্ষুদ্র মূলধনের কৃষক, নতুন উদ্যোক্তা এবং নির্দিষ্ট উৎপাদন খাতকে ঋণের আওতায় আনতে বিভিন্ন সুযোগ সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে।

    অনুষ্ঠানে ডেপুটি গভর্নর বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ২১ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে কৃষি ও পল্লী ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ানো নয়; বরং প্রকৃত কৃষকের কাছে ঋণ পৌঁছানো এবং উৎপাদনশীল কাজে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা। কৃষক যেন ঋণ নিয়ে উৎপাদন বাড়াতে পারেন এবং সময়মতো ঋণ পরিশোধ করে পরবর্তী সময়ে আরো বড় ঋণ পাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন, সে বিষয়টিই এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

    তিনি আরো বলেন, কৃষি ঋণ বিতরণে কোনো ব্যত্যয় যেন না ঘটে, সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব টিমও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবে। প্রকৃত কৃষক শনাক্তকরণ, ঋণের সঠিক ব্যবহার এবং সময়মতো ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি আরো জোরদার করা হবে।

  • কোটি টাকার সেচপাম্প আট বছর বিকল

    কোটি টাকার সেচপাম্প আট বছর বিকল

    নড়াইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোটি টাকার সেচ প্রকল্প কৃষকের কোন কাজে আসছে না। এটি এখন শুধুই স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ আট বছর ধরে দুটি শক্তিশালী সেচপাম্প বিকল থাকায় সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এক হাজার হেক্টরের বেশি আবাদি জমি।
    এছাড়া, প্রকল্পের খালগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় চিত্রা নদীর পানি আর জমিতে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে চড়া মূল্যে ডিজেল কিনে শ্যালোমেশিন চালাতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে কৃষকের।
    পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসম্পদ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় ১৯৮৫ সালে নড়াইল সদর উপজেলার কমলাপুর ও গন্ধব্যখালী গ্রামে দুটি সেচ পাম্প বসানো হয়েছিল। এই প্রকল্পের আওতায় কমলাপুর এলাকায় সাড়ে আট কিলোমিটার দীর্ঘ সেচখাল খনন করা হয়।
    এছাড়া গন্ধব্যখালী এলাকায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সেচখাল খনন করা হয়। খাল দুটি দিয়ে পানিপ্রবাহ সরাসরি কৃষকদের জমিতে পৌঁছায়। পাঁচ কোটি ১২ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে পরিচালিত প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল এক হাজার ৩৭ হেক্টর জমিতে কম খরচে কৃষকরা তাদের জমিতে সেচ সুবিধা পাবেন। কিন্তু ২০১৮ সালে সেচ পাম্প দুটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০১৯ সালে সেচপাম্প মেরামতের জন্য ৩৫ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে সেটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।
    কমলাপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেচ প্রকল্পটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফটক নষ্ট, অফিস কক্ষে তালা এবং পুরো এলাকা মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত গেট অপারেটর ইয়ামিন তরফদার জানান, পাম্প বন্ধ থাকায় কর্মকর্তারা আসেন না, একা থাকার সুযোগে মাদকসেবীরা সেখানে ভিড় করে। আমাদের বাধা দেবার সাহস নেই।
    স্থানীয় কৃষকরা জানান, বর্তমানে ডিজেলচালিত শ্যালোমেশিনে এক কানি (৪০ শতাংশ) জমিতে সেচ দিতে ১০০ টাকা খরচ হচ্ছে। তবে এই সেচ প্রকল্পটি যখন চালু ছিল, তখন কম খরচে ধান, পাট, গমের জমিতে পানি দেওয়া যেত। এখন শ্যালোমেশিন দিয়ে পানি দিতে অনেক টাকা খরচ হচ্ছে তাদের।
    কৃষক সৌমেন কুমার জানান, সেচপাম্প দুটি ছিল কম খরচে তাদের জন্য সহজ পানির উৎস। চিত্রা নদী থেকে সরাসরি জমিতে পানি সরবরাহ করা হতো এ সেচপাম্পের মাধ্যমে। ফলে তারা কম খরচে তিনটি ফসল উৎপাদন করার সুযোগ পেতেন। কিন্তু টানা আট বছর ধরে সেচ পাম্প দুটি বন্ধ রয়েছে। ফলে জমিতে সেচের জন্য এখন ডিজেল চালিত শ্যালো মেশিনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের।
    কমলাপুর গ্রামের মিলন ঘোষ বলেন, একসময় সেচপাম্প থেকে জমিতে বিনামূল্যে সেচ সুবিধা পেতাম। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড সমিতি চালু করে। এরপর বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার অজুহাতে টাকা নেওয়া শুরু করে। তখন বিদ্যুৎ বিল বাবদ তিন শতক জমিতে ৯ টাকা দিতাম। পরে জানতে পারলাম বিদ্যুৎ বিল হাজার হাজার টাকা বাকি পড়ে গেছে। তারপর থেকে সেচ দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এখন শুনছি পাম্প নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
    এক একর জমিতে এ বছর ধানের আবাদ করেছেন সদর উপজেলার আউড়িয়া ইউনিয়নের নাকশি গ্রামের মাসুম খন্দকার। ডিজেলচালিত শ্যালোমেশিন চালিয়ে নিজ জমিতে সেচ দিচ্ছিলেন তিনি। তিনি বলেন, সেচপাম্প চালু থাকায় তিন গ্রামের কৃষক কম খরচে ধান, পাট, গম ও অন্যান্য ফসলের জন্য জমিতে সেচ দিতে পারতেন। পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিন গ্রামের কৃষকের উৎপাদন খরচ ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে।
    এ বিষয়ে নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, প্রকল্পটির অধীনে দুইটি সেচ পাম্প ছিল। সেচ পাম্প দুটি বিকল হয়ে যাওয়ায় তা মেরামতের জন্য ২০১৮ সালে ঢাকায় প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।
    তিনি বলেন, প্রকল্পটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। এটি পুনরায় চালু করতে পারলে ওই এলাকার কৃষি জমিতে কৃষকরা কম খরচে সেচ সুবিধা পাবে। অকেজো হয়ে পড়ে থাকা সেচপাম্প দুটি নতুন করে সংস্কারের জন্য পুনরায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চাহিদা পাঠানো হয়েছে।