কৃষি

  • মধুখালীতে আমনের চারা কিনতে হাটে কৃষকের ভিড়

    মধুখালীতে আমনের চারা কিনতে হাটে কৃষকের ভিড়

    ফরিদপুরের মধুখালীর বিভিন্ন হাটে রোপা আমনের চারা সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। অনুকূল আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের কারণে চলতি মৌসুমে উপজেলায় রোপা আমনের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

    উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটি হাট মধুখালী সদর ও কামারখালীতে রোপা আমনের চারা কিনতে কৃষকদের ভিড় দেখা গেছে। সোমবার (৩১ আগস্ট) মধুখালী হাটে প্রতি বোঝা চারা ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা যায়। এ ছাড়া প্রতি বোঝা চারার জন্য ২০ থেকে ৩০ টাকা খাজনা আদায় করা হচ্ছে।

    হাটের চারা বিক্রেতা সামাদ শেখ বলেন, হাটে প্রচুর পরিমাণে ধানের চারা আসছে। কৃষকেরা নিজেদের পছন্দ ও জমির উপযোগিতা অনুযায়ী চারা কিনছেন।

    বাজারের খাজনা আদায়কারী মো. ইমন শেখ বলেন, হাটে চারার আমদানি ভালো। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চারা কেনাবেচা চলছে। ভালো মানের চারার প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বেশি।

    মধুখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহাবুব ইলাহী জানান, রোপা আমনের বিরি-৮৭, বিরি-৩৭, বিরি-৭৫ ও বিনা-৭সহ বিভিন্ন জাতের ধান সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত রোপণ করা হয়। আগাম ভাসমান চারা ও অন্যান্য পদ্ধতিতে আগস্টের শেষ পর্যন্ত উপজেলায় ৮ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের চারা রোপণ করা হয়েছে।

    তিনি জানান, চলতি বছর উপজেলায় ৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মৌসুমে আবাদ হয়েছিল ৮ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে।

    সেপ্টেম্বর মাসজুড়েই চারা রোপণের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে বৃষ্টিপাত হওয়ায় জমিতে প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে চলতি মৌসুমে রোপা আমনের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

  • কৃষকের সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা লুটের আয়োজন

    কৃষকের সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা লুটের আয়োজন

    যশোরের শেখহাটি গ্রামের এসএম কবীর হোসেন এবার দেড় বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করেছেন। এজন্য বর্তমানে তার ৩০ কেজি টিএসপি সার দরকার। কিন্তু এই সার সংগ্রহ করতে গিয়ে তাকে নানামুখী হয়রানের শিকার হতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় জামরুলতলা বাজারের একটি দোকান থেকে ২৫ কেজি সার ম্যানেজ করতে পারলেও এর জন্য তাকে সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।

    এটা শুধু কৃষক কবীর হোসেনের গল্প নয়, যশোরের হাজার হাজার কৃষককে সারের জন্য এখন এমন হয়রানি এবং দ্বিগুণ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।
    তবে প্রকাশ্যে এভাবে দ্বিগুন দরে সরকারি সার বিক্রি হলেও বাস্তবিক অর্থে কার্যকর কোন ব্যবস্থাই এখনো নেওয়া হয়নি। ক্ষেত্রবিশেষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই একটি অভিযান পরিচালনা করা হলেও কার্যত এই অতিরিক্ত দামের প্রকাশ্য তৎপরতাকে এখনো পর্যন্ত স্বীকার করা হয়নি। তাই প্রকাশ্যেই বাঁধাহীনভাবে চলছে সার সিন্ডিকেটের কৃষকের শ্রম লুটের কারবার।
    এসএম কবীর হোসেন অভিযোগ করেন, ‘প্রকাশ্যেই অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু কার্যত কোন ব্যবস্থা তো নেওয়া হচ্ছে না। দোকানদার আমার পরিচিত তাই আমার কাছ থেকে দ্বিগুণের কিছু কম নিয়েছে। কিন্তু আমি থাকতে থাকতেই আরেকজনের কাছে টিএসপি সার ৫২ টাকা কেজি দারে বিক্রি করল।’

    তরিকুল ইসলাম নামে এক সার বিক্রেতা বলেন, ‘সার পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিনই সারের দাম ওঠানামা করছে। আমাদের বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। তাই সরকারি নির্ধারিত দামে সার বিক্রি করতে পারছি না।’
    যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার নারাঙ্গালী গ্রামের কৃষক আবদুল আলিমও সম্প্রতি জানিয়েছেন, চার বিঘা আমন জমির জন্য তিনি খোলাবাজার থেকে ৫২ টাকা কেজি দরে ২০ কেজি টিএসপি কিনেছেন।
    হিসাব বলছে, এভাবে দ্বিগুন দরে সার বিক্রির মাধ্যমে যশোরের সার সিন্ডিকেট কৃষকের কাছ থেকে চলতি আমন মৌসুমেই সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার বেশি লুটে নিচ্ছে।
    তবে দায়িত্বশীল কৃষি কর্মকর্তারা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির বিষয়টি শিকার না করলেও মাঠ পর্যায়ের একাধিক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানিয়েছেন তারা নিজেরাও কৃষকদের তোপের মুখে পড়ছেন।
    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যশোর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব জমির জন্য সারের মোট চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ২৩৭ মেট্রিক টন।

    এর মধ্যে ইউরিয়া সারের চাহিদা ৬৮ হাজার ৯০৩ মেট্রিক টন, টিএসপি ১৭ হাজার ৫৯৮ মেট্রিক টন, ডিএপি ৪৩ হাজার ২২৫ মেট্রিক টন এবং এমওপি ২৫ হাজার ৫১১ মেট্রিক টন।
    কৃষক পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত দামে এই পরিমাণ সারের মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩৭৫ কোটি ৩৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এর মধ্যে ইউরিয়ার মূল্য ১৮৬ কোটি ৩ লাখ ৮১ হাজার টাকা, টিএসপি ৪৭ কোটি ৫১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা, ডিএপি ৯০ কোটি ৭৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং এমওপি ৫১ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার টাকা।
    সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় দ্বিগুণ দামে এসব সার বিক্রি করা হলে কৃষকদের কাছ থেকে মোট অর্থ আদায়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৭৫০ কোটি ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ সরকারি দামের তুলনায় কৃষকদের অতিরিক্ত গুনতে হবে ৩৭৫ কোটি ৩৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা।

    সর্বশেষ পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২৫ আগস্ট পর্যন্ত চলতি মাসের বরাদ্দ থেকে যশোরে ইউরিয়া উত্তোলন করা হয়েছে ৮ হাজার ৫৩৪ মেট্রিক টন ইউরিয়া, টিএসপি ২ হাজার ৮১০ টন, ডিএপি ২ হাজার ১৪০ টন এবং এমওপি ২ হাজার ২৩১ টন।
    একই তারিখে জেলার গুদামগুলোতে মজুত ছিল ইউরিয়া ৩ হাজার ৭৩৫ মেট্রিক টন, টিএসপি ১ হাজার ১৪৮ টন, ডিএপি ১ হাজার ২৯ টন এবং এমওপি ১ হাজার ৪১৩ টন। চার ধরনের সারের গুদামজাত মজুতের পরিমাণ দাঁড়ায় মোট ৭ হাজার ৪২৫ মেট্রিক টন।

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যশোর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন দুই সপ্তাহ আগে দৈনিক রানারকে জানিয়েছিলেন, তাদের কাছে পর্যাপ্ত সার মজুদ আছে। বাড়তি দামে সার বিক্রির সুযোগ নেই। কেউ বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
    তবে বর্তমানে প্রকাশ্যেই প্রায় দ্বিগুন দামে বিক্রি হচ্ছে সার। এব্যাপারে তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পাঠালেও তিনি কোন জবাব দেননি।

  • বীজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঝুঁকিতে কৃষি

    বীজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঝুঁকিতে কৃষি

    একসময় কৃষকের গোলাভরা ধানের পাশে মাটির মটকা, বাঁশের গোলা কিংবা ঘরের চালে যত্ন করে রাখা থাকত পরের মৌসুমের বীজ। ভালো ফসল থেকে বাছাই করা সেই বীজেই শুরু হতো নতুন মৌসুমের চাষ। বীজ ছিল কৃষকের নিজের সম্পদ, নিজের নিরাপত্তা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। কৃষকের ঘরের বীজের জায়গা নিয়েছে বাজারের প্যাকেট। নিজের বীজ হারিয়ে কৃষক ক্রমেই হয়ে পড়ছেন বাজারনির্ভর।

    ঝিনাইদহের মাঠে এখন সেই পরিবর্তনের স্পষ্ট চিত্র দেখা যাচ্ছে। কৃষকের হাতে জমি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই পরবর্তী মৌসুমের বীজের নিয়ন্ত্রণ আর তার হাতে নেই। সরকারি সরবরাহ সীমিত হওয়ায় চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে হচ্ছে বেসরকারি কোম্পানি ও স্থানীয় বাজার থেকে। এতে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে কোনো কারণে বাজারে বীজ সরবরাহ ব্যাহত হলে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন কৃষকেরা। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষির বৈচিত্র্য ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও।
    চড়া দামে বেসরকারি বীজ
    শৈলকুপা উপজেলার হাজরামিনা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক হাশেম হোসেন চলতি মৌসুমে ৩৫ বিঘা জমিতে আমন ধান রোপণ করেছেন। সরকারি বীজ পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অনুমোদিত ডিলারের কাছে ঘুরেও প্রত্যাশিত বীজ পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাজার থেকে চড়া দামে বেসরকারি কোম্পানির প্যাকেটজাত হাইব্রিড বীজ কিনে বীজতলায় দেন। সেই বীজ থেকে উৎপাদিত চারাই এখন তাঁর জমিতে রোপণ করা হয়েছে।
    একই উপজেলার কাঁচেরকোল গ্রামের কৃষক মসলেম উদ্দিনের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। তাঁর হাতে পাওয়া বীজের একটি অংশে অঙ্কুরোদগম হয়নি। তিনি বলেন, ‘একসময় ধান কাটার পর ভালো ধান আলাদা করে বীজ হিসেবে সংরক্ষণ করা হতো। মাটির মটকা কিংবা গোলায় যত্ন করে রাখা সেই বীজ দিয়েই পরের বছর চাষ করা সম্ভব ছিল। এখন সেই নিশ্চয়তা নেই। প্রতি মৌসুমে বীজের জন্য বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।’
    বাড়ছে বেসরকারি নির্ভরতা
    জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ঝিনাইদহে মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩৫ হেক্টর। এর মধ্যে বিএডিসি উফশী বীজের প্রায় ১৯ শতাংশ এবং হাইব্রিড বীজের প্রায় ১ শতাংশ সরবরাহ করে। অর্থাৎ বীজের চাহিদার বড় অংশই পূরণ হচ্ছে বেসরকারি কোম্পানি ও বাজারের মাধ্যমে।
    কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ বছর আগে জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষক নিজেদের উৎপাদিত ফসল থেকে পরবর্তী মৌসুমের বীজ সংরক্ষণ করতেন। বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। অধিকাংশ কৃষকই বিভিন্ন কোম্পানি ও বাজার থেকে বীজ কিনে চাষ করছেন।
    ঝিনাইদহের বীজের বাজারে লাল তীর, এসিআই, বায়ারসহ বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির বীজ রয়েছে। সরকারি সরবরাহ চাহিদার তুলনায় সীমিত হওয়ায় কৃষকদের বড় একটি অংশকে বেসরকারি বাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
    প্রতি মৌসুমে নতুন বীজ
    উচ্চফলনের আশায় কৃষকের মধ্যে হাইব্রিড বীজের ব্যবহারও বাড়ছে। কিন্তু হাইব্রিড বীজের ক্ষেত্রে উৎপাদিত ফসল থেকে পরবর্তী মৌসুমে একই মান ও বৈশিষ্ট্যের বীজ সংরক্ষণ করে ব্যবহার করা যায় না। ফলে প্রতি মৌসুমেই নতুন বীজ কেনার প্রয়োজন হয়।
    এতে কৃষকের বীজের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ আরও কমে যাচ্ছে। কৃষকের হাতে জমি থাকলেও চাষের অন্যতম প্রধান উপকরণ বীজের জন্য তাঁকে নির্ভর করতে হচ্ছে বাজারের ওপর।
    শৈলকুপার দামুকদিয়া গ্রামের কৃষক মাসুদ মোল্লা বলেন, ‘আগে ধান কাটার সময় ভালো ধান আলাদা করে রেখে দিতাম। পরের মৌসুমে ওই ধান থেকেই বীজ তৈরি করে চাষ করতাম। এখন কোম্পানির বীজ কিনতে হয়। নিজের বীজ রাখার অভ্যাসও অনেকটা চলে গেছে।’
    হারিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় জাত
    বীজের বাজারনির্ভরতার পাশাপাশি ঝিনাইদহে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী জাতের বীজ হারিয়ে যাওয়া নিয়ে।
    একসময় বিভিন্ন মৌসুমে ধানের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি, ডালের ২২ থেকে ২৫টি এবং সবজির প্রায় ৩০টি জাতের চাষ হতো। বর্তমানে ধানের জাত বেড়ে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি, ডালের ৩২ থেকে ৩৫টি এবং সবজির জাত ৫৫ থেকে ৬৫টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে জাতের সংখ্যা বাড়লেও অনেক স্থানীয় জাতের চাষ ও সংরক্ষণ কমে গেছে।
    ঝিঙাশাইল, লতিশাইল, কাটারিভোগ, রাজাশাইল, দুধকলম, বাঁশফুল, রূপশাইল, দিঘাসহ বিভিন্ন স্থানীয় ধানের জাত বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায়। একইভাবে দেশি খেসারি, স্থানীয় লাল মুগ, মাষকলাই, মাঘী সরিষা, তিলসহ বিভিন্ন স্থানীয় সবজির জাতও আগের তুলনায় কম চাষ হচ্ছে।

    কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় জাত শুধু ঐতিহ্যের অংশ নয়; এগুলো কৃষকের ঝুঁকি মোকাবিলারও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একাধিক জাতের বীজ কৃষকের হাতে থাকলে কোনো একটি জাত রোগ, পোকামাকড় বা বৈরী আবহাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য জাত দিয়ে উৎপাদন ধরে রাখার সুযোগ থাকে। বিপরীতে সীমিত কয়েকটি বাণিজ্যিক জাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কৃষিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
    মনোহরপুর গ্রামের কৃষক সিজার জিকরুল বলেন, ‘বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির বীজ পাওয়া যায়। বিক্রেতারা ভালো ফলনের কথা বলে বীজ দেন। কিন্তু বীজ ভালো না হলে আমাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। বীজের সঙ্গে সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমের খরচও জড়িয়ে থাকে।’

    কালীগঞ্জের কৃষক বসির আহমেদ বলেন, ‘নিজের ঘরে বীজ মজুদ থাকলে চাষাবাদের খরচ অনেকটা কমে যায়। তাতে কৃষক লাভবান হন। কিন্তু বর্তমানে তা হচ্ছে না। বীজ কিনতে গিয়ে লাভের অংশ কমে যাচ্ছে।’
    বীজ ব্যাংকের প্রয়োজন বাড়ছে
    শৈলকুপার কাঁচেরকোল গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমানের অভিজ্ঞতাতেও সরকারি বীজ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা উঠে এসেছে। তাঁর ভাষ্য, কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী দেখে নতুন জাতের ধান চাষ করে ভালো ফলন পাওয়ার পর পরের বছর সেই জাতের বীজ সংগ্রহ করতে গিয়ে সরকারি বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা শুনতে হয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে বেশি দামে বেসরকারি বীজ কিনতে হয়েছে।
    মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, কৃষক পর্যায়ে মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের উদ্যোগ থাকলেও এর আওতা এখনো সীমিত। ফলে অধিকাংশ কৃষক এ সুবিধার বাইরে রয়েছেন।
    এ অবস্থায় ইউনিয়ন পর্যায়ে বীজ ব্যাংক গড়ে তোলা, কৃষকদের বিজ্ঞানসম্মতভাবে বীজ সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্থানীয় জাতের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং বিএডিসির উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জোরালো হচ্ছে।

    ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কামরুজ্জামান বলেন, ‘কৃষকদের মানসম্মত বীজ ব্যবহারের পাশাপাশি নিজেদের উৎপাদিত ভালো ফসল থেকে বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
    তিনি বলেন, ‘ভালো ও রোগমুক্ত জমি থেকে উপযুক্ত সময়ে বীজ সংগ্রহ করে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে কৃষক পরবর্তী মৌসুমে নিজের বীজ ব্যবহার করতে পারবেন। এতে একদিকে বীজ কেনার খরচ কমবে, অন্যদিকে প্রয়োজনের সময় বাজারের ওপর নির্ভরশীলতাও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।’

    কৃষকদের মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে উন্নত জাতের ফসলের সঙ্গে কৃষকদের পরিচয় করানো হচ্ছে। ভালো ফলন পাওয়া গেলে কৃষকদের নিজেদের জমির উপযোগী বীজ সংরক্ষণে উৎসাহিত করা হচ্ছে।’
    কামরুজ্জামান আরও বলেন, ‘বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু বীজ সংগ্রহ করলেই হবে না, সেটি ভালোভাবে শুকানো, রোগমুক্ত রাখা এবং উপযুক্ত পরিবেশে সংরক্ষণ করতে হবে। কৃষকদের এ বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।’

  • কেঁচো সারে স্বাবলম্বী কুষ্টিয়ার শত নারী

    কেঁচো সারে স্বাবলম্বী কুষ্টিয়ার শত নারী

    কুষ্টিয়ার বিত্তিপাড়া গ্রামের শতাধিক নারী বাড়ির আঙিনায় কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করে আয় করছেন। নিজেদের জমি ও বাড়ির আঙিনায় উৎপাদিত সবজিতে এই সার ব্যবহারের পাশাপাশি বাড়তি সার বিক্রি করছেন তাঁরা। কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতায় একজনের হাত ধরে শুরু হওয়া উদ্যোগটি এখন ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের শতাধিক নারীর মধ্যে।

    কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ধরে জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে বিত্তিপাড়া বাজার। সেখান থেকে পূর্ব দিকে আধা কিলোমিটার গেলেই বিত্তিপাড়া গ্রাম। গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির আঙিনায় সারি করে রাখা সিমেন্টের চাকে তৈরি হচ্ছে ভার্মি কম্পোস্ট। গোবর, সবজির উচ্ছিষ্ট ও কলাগাছের বাকল ব্যবহার করে তৈরি এ সার নিজেদের ফসল উৎপাদনে ব্যবহারের পাশাপাশি বিক্রি করছেন নারীরা।
    বিত্তিপাড়া গ্রামে কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন গৃহবধূ জাহানারা খাতুন। ২০২১ সালে বাড়ির আঙিনায় দুটি সিমেন্টের চাক বসিয়ে তিনি গোবর ও কেঁচো দিয়ে জৈব সার তৈরি শুরু করেন। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহযোগিতাও নেন তিনি।

    এখন তাঁর বাড়ির পেছনের টিনশেডে ৪০টি এবং বাড়ির সামনে আরও ১০টি চাক রয়েছে। নিজের গরুর গোবরের পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে গোবর সংগ্রহ করেন। এর সঙ্গে সবজির উচ্ছিষ্ট ও কলাগাছের বাকল মিশিয়ে তৈরি করেন সার।
    জাহানারা খাতুন বলেন, ‘কেঁচো সারেই আমাদের জীবন বদলে গেছে। কয়েক বছর আগেও বাড়িতে ছাপড়া ছিল। সেখানে দালান তুলেছি। গরু-ছাগল পালছি। সামান্য জমি আছে। সেখানে যা ধান হয়, তা দিয়ে আমাদের চলে যায়। তা ছাড়া বাড়ির আঙিনায় শাকসবজি ফলাই। সরকারি নানা সহযোগিতা পেয়ে এতদূর এসেছি। আমার দেখাদেখি গ্রামের অনেক নারী এখন জৈব সার তৈরি করছেন। তারাও স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।’
    জাহানারা খাতুন জানান, প্রতিটি সিমেন্টের চাক ১০০ থেকে ১৫০ টাকা দিয়ে কেনা হয়। এতে গোবর, সবজির উচ্ছিষ্ট ও কলাগাছের বাকল দেওয়ার পর কেঁচো ছাড়া হয়। ২০ থেকে ২৫ দিন চাক ঢেকে রাখার পর তৈরি হয় জৈব সার। এ সময় মাঝে মাঝে পানি ছিটিয়ে দিতে হয়।

    প্রতিটি চাক থেকে প্রায় ৩০ কেজি সার পাওয়া যায়। বর্তমানে মাসে প্রায় ৪০ মণ সার উৎপাদন করছেন জাহানারা। প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে বিক্রি করলে মাসে প্রায় ২৪ হাজার টাকার সার উৎপাদন হয়। এর মধ্যে দুই থেকে তিন মণ নিজেদের জমিতে ব্যবহার করেন। বাকিটা বিক্রি করেন।
    বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তাঁর বাড়ি থেকে সার কিনে নিয়ে যান।
    বিত্তিপাড়া গ্রামের নারীরা শুধু সার বিক্রি করছেন না, নিজেদের উৎপাদিত সার দিয়ে বাড়ির আঙিনা ও কৃষিজমিতে সবজি চাষও করছেন।
    রিনা পারভীন ও নিলুফা ইয়াসমীন বলেন, ‘বিত্তিপাড়া গ্রামে সবজি ও অন্যান্য ফসলের আবাদ হয়। জৈব সার ব্যবহার করে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের চেষ্টা করছেন নারীরা। প্রথমত নিজেদের ফসলের জমিতে এই সার ব্যবহার করা হয়। বাড়তি সার বিক্রি করে কিছু টাকা আয় হয়। সংসারের কাজে লাগে।’

    মনিরা খাতুন বলেন, গ্রামের বাসিন্দারা আগের তুলনায় কম রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন। জৈব সার দিয়ে বাড়ির আঙিনায় মরিচ, বেগুনসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদনের পাশাপাশি ধান, ভুট্টা ও শসার ক্ষেতেও এই সার ব্যবহার করা হচ্ছে।
    উদ্যোক্তা নারীরা জানান, জৈব সার বিক্রির অর্থ দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া, স্কুলের পোশাকসহ পরিবারের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাচ্ছেন তাঁরা। সার তৈরিতে স্থানীয়ভাবে পাওয়া উপকরণ ব্যবহার হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও তুলনামূলক কম।

    বিত্তিপাড়া ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশরাফ সিদ্দিকী বলেন, ‘পুরুষেরা অনেক সময় বাড়ির বাইরে থাকেন। কিন্তু নারীরা বাড়িতে থেকে নানা কাজ করেন। তাই জৈব সার উৎপাদনের জন্য নারীদের বেছে নেওয়া হয়েছে। আর্থিকভাবে সুবিধা পাওয়ায় নারীরা এখন নিজেরাই জৈব সার উৎপাদন করতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এখন তারা এই সারের উপকারিতা বিষয়ে সচেতন।’
    সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুপালী খাতুন বলেন, ‘আমি একজন নারী। এতে নারীদের সঙ্গে মিশতে সহজ হয়েছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে আমি ও আমার টিমের সদস্যরা নারীদের কী প্রয়োজন, সেটা জেনে মেটানোর চেষ্টা করছি। পাশাপাশি নারীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই গ্রামে একজন থেকে শুরু করে এখন শতাধিক নারী জৈব সার উৎপাদন করছেন। এটাই আমাদের জন্য বড় সাফল্য।’

    তিনি আরও বলেন, ‘প্রণোদনা ও সহযোগিতা দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। প্রায় প্রতি বাড়িতে বস্তায় সবজি উৎপাদনের জন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বস্তা ও বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলের গাছ বিতরণ করা হচ্ছে। নারীরা যাতে জৈব সার ব্যবহার করে নিরাপদ সবজি উৎপাদন করতে পারেন এবং এই সার বিক্রি করে বাড়তি আয় করতে পারেন, সে জন্য আমাদের এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’
    জাহানারা খাতুনের শুরু করা উদ্যোগ এখন বিত্তিপাড়া গ্রামের শতাধিক নারীর বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করেছে। নিজেদের ফসল উৎপাদনে জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত সার বিক্রি করে সংসারে অর্থ যোগ করছেন তাঁরা। কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এ উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

  • খরা ও অতিবৃষ্টি জয় করে আমন চাষে সফলতার উপায়

    খরা ও অতিবৃষ্টি জয় করে আমন চাষে সফলতার উপায়

    আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে আমন চাষে এখন কখনো খরা, আবার কখনো অতিবৃষ্টির মুখে পড়তে হচ্ছে কৃষককে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের সঙ্গে বাড়ছে রোগ-পোকার আক্রমণও। ফলে ভালো ফলনের জন্য শুধু জমি ও বীজ প্রস্তুত করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উপযোগী জাত নির্বাচন, সুষম সার প্রয়োগ, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ। খরা ও অতিবৃষ্টির মতো প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আমনের কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে কৃষকের করণীয় নিয়ে রানার কৃষির নিয়মিত আয়োজনে পরামর্শ দিয়েছেন যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইন।

    দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম শস্যভাণ্ডার যশোর। এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির প্রাণ রোপা আমন ধান। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক খরা, অতিবৃষ্টি, পোকামাকড়ের আক্রমণ ও সুষম সারের অভাবে অনেক কৃষকই কাক্সিক্ষত ফলন পাচ্ছেন না। জলবায়ুর পরিবর্তনকে মাথায় রেখে চলতি মৌসুমে কিছু কৌশল মেনে চললে খরা ও অতিবৃষ্টি দুটোই মোকাবিলা করে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।
    অনাবৃষ্টি ও সম্পূরক সেচ
    আমন ধানের জীবনচক্রে দুটি সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো চারা রোপণের পর গাছের শিকড় স্থাপনের সময়, অন্যটি কাইচ থোড় আসার সময়। এ দুই সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে জমি শুকিয়ে গিয়ে ফলন কমে যেতে পারে।
    এ সময় জমি কোনোভাবেই ফেটে যাওয়া পর্যন্ত শুকাতে দেওয়া যাবে না। বৃষ্টি না হলে দ্রুত হালকা সম্পূরক সেচ দিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ২-৩ ইঞ্চি পানি ধরে রাখা যেতে পারে। অল্প পানিতে বারবার সেচ দিলে পানির অপচয়ও কম হবে।
    মাজরা ও পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ
    ইউরিয়া সার বেশি দিলে ধানগাছ অতিরিক্ত সবুজ ও কোমল হয়ে যায়। এতে মাজরা ও পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ বাড়তে পারে।
    এ ক্ষেত্রে প্রথমেই পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। একে বলা হয় ‘পার্চিং’। প্রতি বিঘা জমিতে ৪-৫টি উঁচু বাঁশের কঞ্চি বা গাছের ডাল পুঁতে দিতে হবে। পাখিরা এসব কঞ্চিতে বসে মাঠের ক্ষতিকর পোকা খাওয়ার সুযোগ পাবে।
    পোকার আক্রমণ বেশি হলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওষুধের সঠিক মাত্রা ও প্রয়োগের সময় মেনে চলা জরুরি। অপ্রয়োজনে কীটনাশক ব্যবহার করা উচিত নয়।
    খোল পচা ও পাতা পোড়া রোগ
    বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে এবং অপরিকল্পিতভাবে ইউরিয়া প্রয়োগ করলে ধানে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। খোল পচা ও পাতা পোড়া রোগের ক্ষেত্রেও সুষম সার ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।
    শুধু ইউরিয়ার ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পটাশ, জিংক ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান দিতে হবে। রোগের লক্ষণ দেখা দিলে রোগ শনাক্ত করে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে।
    উচ্চ ফলনের জন্য সঠিক জাত নির্বাচন
    সময় বদলেছে, তাই জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে হবে। জমির ধরন, পানি ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় আবহাওয়া এবং ফসল কাটার সময় বিবেচনা করে জাত নির্বাচন করা প্রয়োজন।
    উচ্চফলনশীল জাতের মধ্যে ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭৫ ও ব্রি ধান৯০ উল্লেখযোগ্য। খরা ও প্রতিকূলতা সহনশীল জাতের মধ্যে রয়েছে ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান১০৩, বিনাধান-১৭, বিনাধান-২০, বিনাধান-২২ ও বিনাধান-২৩।
    এসব জাতের একটি বড় সুবিধা হলো অনেক জাত তুলনামূলকভাবে দ্রুত পাকে। ফলে আমন কাটার পর দ্রুত সরিষা, শাকসবজিসহ বিভিন্ন রবি ফসল চাষের সুযোগ পাওয়া যায়। একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষ করা গেলে কৃষকের আয়ও বাড়তে পারে।
    সুষম সার ও মাটির স্বাস্থ্য
    শুধু রাসায়নিক সার ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফলন ধরে রাখা সম্ভব নয়। মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
    জমি তৈরির সময় গোবর বা অন্যান্য জৈব সার ব্যবহার করা যেতে পারে। বোরো ধান কাটার পর জমিতে ধৈঞ্চা বুনে ৪৫-৫০ দিন পর তা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া যায়। এটি সবুজ সার হিসেবে মাটির জৈব পদার্থ ও উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করে। এর ফলে রাসায়নিক সারের প্রয়োজনও কমতে পারে।
    শেষ চাষের সময় মাটির পরীক্ষা ও ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও জিংক সালফেট প্রয়োগ করতে হবে।
    ইউরিয়া সার একসঙ্গে প্রয়োগ করা যাবে না। কয়েক কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। সাধারণভাবেÑপ্রথম কিস্তি: চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পর। দ্বিতীয় কিস্তি: কাইচ থোড় আসার ১৫-২০ দিন আগে। তৃতীয় কিস্তি: থোড় বের হওয়ার সময়। তবে জমির উর্বরতা, ধানের জাত ও স্থানীয় কৃষি সুপারিশ অনুযায়ী সারের মাত্রা নির্ধারণ করা উচিত।
    বিজ্ঞানসম্মত পানি ব্যবস্থাপনা
    কাইচ থোড় আসা থেকে দানায় দুধ আসা পর্যন্ত সময়ে ধানগাছের পানির চাহিদা বেশি থাকে। এ সময় জমিতে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি নিশ্চিত করতে হবে।
    তবে জমিতে সবসময় অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা ঠিক নয়। অতিবৃষ্টির সময় দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। জমিতে পানি জমে থাকলে ধানের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে।
    ধান কাটার ১০-১২ দিন আগে জমি থেকে পানি বের করে দেওয়া ভালো। এতে জমি কিছুটা শুকিয়ে আসে, ধান কাটতে সুবিধা হয় এবং ফসল সংগ্রহের সময়ও কমে।
    নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ
    আমন চাষে সফলতার অন্যতম শর্ত হলো নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ। আগাছা, পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে কম খরচে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
    তাই কৃষকদের নিয়মিত জমি দেখতে হবে। পোকামাকড় দেখা দিলেই অযথা কীটনাশক ব্যবহার না করে প্রথমে পোকার ধরন ও আক্রমণের মাত্রা শনাক্ত করতে হবে। প্রয়োজন হলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে হবে।
    সময়মতো আগাছা দমন, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা, পার্চিং, প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ, অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন এবং নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ—এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও আমনের ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।

    কৃষক ভাই ও বোনেরা, আমন ধানের জমিতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত আপনার এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। সমস্যার কথা জানান এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিন।
    সবাই ভালো থাকুন।

  • কিছু দুষ্কৃতকারী সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে: কৃষিমন্ত্রী

    কিছু দুষ্কৃতকারী সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে: কৃষিমন্ত্রী

    কৃষি ও মৎস্য মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই, কিছু দুষ্কৃতকারী সংকট তৈরি করছে। পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কেউ কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। এরকম সারের কৃত্রিম সংকট যারা সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

    আজ শনিবার দুপুরে সদর উপজেলার হলরুমে ফরিদপুরের পেঁয়াজ ও পাটচাষিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

    কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো সার ও কৃষি উপকরণ বিতরণ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার কাজ করছে। এ ছাড়া ফরিদপুর অঞ্চলের মাটির বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত ভালো।’

    তিনি আরও বলেন, ‘এ কারণে অন্যান্য অনেক এলাকার তুলনায় এখানে চাষাবাদে তুলনামূলক কম পরিমাণে সার ব্যবহার করেই ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। আর এসব কারণে এ অঞ্চলে পেঁয়াজ ও পাট চাষাবাদ খুব ভালো হয়। আগামী দিনে পেঁয়াজ এবং পাট বীজ উৎপাদন করে দেশকে স্বাবলম্বী করার সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

    ফরিদপুরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জেলার পেঁয়াজ ও পাটচাষিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম।

    মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, ফরিদপুর সদর-৩ আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ, ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল, ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. মো. ইলিয়াস হোসেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম, জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. আফজাল হোসেন খান পলাশসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

    এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বৃহত্তর ফরিদপুরের পেঁয়াজ ও পাটচাষি, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

  • ডিসির গাছের চারা বিতরণ

    ডিসির গাছের চারা বিতরণ

    নেত্রকোনার মদনে সরকার ঘোষিত পাঁচ বছর মেয়াদী দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের মাঝে গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে। শনিবার সকালে উপজেলা পরিষদ চত্বরে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

    অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের হাতে গাছের চারা তুলে দেন নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মুশফিকুর রহমান।

    প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। নতুন প্রজন্মকে বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে গড়ে তুলতেই শিক্ষার্থীদের মাঝে এই চারা বিতরণ করা হচ্ছে।

    অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাদির হোসেন শামীম, মদন থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন করিম, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরসহ উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা শেষে অতিথিরা উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিভিন্ন ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করেন।

  • কৃষিকে আধুনিক করতে পার্টনার প্রকল্পে অগ্রগতি

    কৃষিকে আধুনিক করতে পার্টনার প্রকল্পে অগ্রগতি

    উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের কৃষিকে আধুনিক, বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে রূপান্তরের লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পার্টনার প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কৃষককে ডিজিটাল সেবার আওতায় আনা, উত্তম কৃষি চর্চা, নিরাপদ খাদ্য, গবেষণা, কৃষিপণ্য রপ্তানি ও জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি বিস্তারে কাজ করছে প্রকল্পটি।

    ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার) প্রকল্পটির নির্ধারিত ফলাফলের বিপরীতে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ৪৭ শতাংশ সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে।

    কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রায় ছয় হাজার ৯১১ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রকল্পে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সাতটি সরকারি সংস্থা যুক্ত রয়েছে। দেশের ১৪টি কৃষি অঞ্চলের ৬৪ জেলা ও ৪৯৫ উপজেলায় প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।

    প্রকল্পের আওতায় ২৮ হাজার ৫৯৭টি মাঠ স্কুল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০টির কার্যক্রম চলছে। কৃষকদের উত্তম কৃষি চর্চা বিষয়ে প্রশিক্ষণের ২০ হাজার ব্যাচের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার হাজার সম্পন্ন হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে ৩০টি প্রশিক্ষণ ব্যাচের মধ্যে ২৭টি শেষ হয়েছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের ১১২টি কর্মশালার মধ্যে ৩১টি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

    প্রকল্পের অন্যতম বড় উদ্যোগ কৃষক কার্ড। চলতি আগস্টে ১০ লাখ এবং এ বছরের মধ্যে ৪৭ লাখ কৃষককে কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে প্রায় ১৪ লাখ কৃষকের তথ্যভাণ্ডার প্রস্তুত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষককে এ কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

    কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকদের ভর্তুকি, ঋণ, প্রণোদনা ও অন্যান্য সরকারি সুবিধা সহজে পৌঁছে দিতে কৃষক কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সোনালী, জনতা ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের আন্তর্জাতিক ডেবিট কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

    এ বিষয়ে পার্টনার প্রকল্পের কোর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদ বলেন, কৃষি খাতের আধুনিকায়ন ও রূপান্তরের লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন পার্টনার প্রকল্পের অগ্রগতি শুধু ব্যয়ের হার দিয়ে মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ভিত্তিতেই এ প্রকল্পের অগ্রগতি বিবেচনা করা হয়। সেই হিসেবে গত জুন পর্যন্ত প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি প্রায় ৪৭ শতাংশ।

    তিনি বলেন, পার্টনার প্রকল্পের অর্থায়ন পদ্ধতি ফলাফলভিত্তিক। বাংলাদেশের কৃষি খাতে এ ধরনের অর্থায়ন পদ্ধতির প্রকল্প আগে বাস্তবায়িত হয়নি। উন্নয়ন সহযোগীদের নির্ধারিত ফলাফল অর্জনের প্রমাণ যাচাইয়ের পরই অর্থ ছাড় করা হয়।

    ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ও ইফাদের ঋণ চুক্তির পরিমাণ ৫৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জীভূত ফলাফলের বিপরীতে ২৫২ দশমিক ৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়ের জন্য দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ চুক্তির মোট অর্থের প্রায় ৪৭ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থের দাবি উত্থাপিত হয়েছে।

    কোর্ডিনেটর আবুল কালাম বলেন, প্রকল্পে মোট ১০টি অর্থ ছাড়ের সংযোগ নির্দেশকের আওতায় ২৪টি ফলাফলভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জনের প্রমাণপত্র প্রকল্প থেকে দাখিল করা হয়। পরে একটি স্বাধীন যাচাইকারী সংস্থা তা যাচাই করে। যাচাই শেষে নির্ধারিত হারে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ ছাড় হয়। তবে কিছু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করা প্রয়োজন।

    এর মধ্যে অন্যতম হলো কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ৫০ লাখ কৃষকের কাছে ডিজিটাল কৃষিসেবা পৌঁছে দেওয়া। এছাড়া উত্তম কৃষিচর্চার আওতায় তিন লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ১০ লাখ কৃষক ও খামারকে সনদের আওতায় আনা, স্বীকৃত পরীক্ষাগার স্থাপন এবং নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে ১০ শতাংশ হারে বাড়ানোর মতো লক্ষ্যমাত্রাও রয়েছে।

    তিনি বলেন, গত ১ থেকে ২৩ জুন বিশ্বব্যাংক ও ইফাদের যৌথ মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনা মিশনে এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে ডিপিপি সংশোধনের পাশাপাশি কিছু লক্ষ্যমাত্রা পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।

    কোর্ডিনেটর জানান, উন্নয়ন সহযোগীদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বাইরে থাকা অন্যান্য কার্যক্রম, বিশেষ করে অবকাঠামো ও ভৌত নির্মাণকাজ, ডিপিপি সংশোধন ছাড়া শুরু করা সম্ভব নয়। সংশোধনের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলছে। সংশোধন ছাড়া প্রকল্পের অর্থ ব্যয় করলে পরবর্তী সময়ে অর্থ ছাড় নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ডিপিপি সংশোধন সম্পন্ন হলে প্রকল্পের অন্যান্য কার্যক্রমও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

  • বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে আনারকলি

    বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে আনারকলি

    এক সময় আনারকলি বিদেশি ফল হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন তা বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করে সফলতা পাওয়ায় এক বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করেছেন হালিম আহম্মেদ বাচ্চু।

    কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার চাঁদগ্রাম ইউনিয়নের কোদালিয়া পাড়া গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা বাচ্চুর বাগানে গিয়ে দেখা যায়, লতানো গাছের সবুজ পাতার মাঝে ঝুলছে সবুজ রঙের আকর্ষণীয় দক্ষিণ আমেরিকার উষ্ণ অঞ্চলের ফল আনারকলি, প্যাশন বা ট্যাংক ফল।তিনি বলেন, ‘চারা লাগানোর আট মাস পর থেকে ফল আসা শুরু করলেও এটি সারাবছর ফল দিতে থাকে। কোনো ধরনের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করে শুধু জৈব সার ব্যবহার করেই এ ফল চাষ করা যায়। জলবায়ু সহনশীল টক-মিষ্টি স্বাদের এ ফল চাষে তুলনামূলক কম খরচ ও রোগবালাই কম হওয়ায় দিনদিন চাষে আগ্রহ বাড়ছে আশপাশের কৃষকদেরও।’

    কৃষি বিভাগ থেকে যদি ক্ষুদ্র কৃষি উদ্যোক্তারা সহযোগিতা পান, তাহলে আমার মতো কৃষকরা আরও এগিয়ে যেতে পারবেন আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

    তিনি আরও বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। বাপ-দাদাও কৃষক ছিলেন। কৃষিই আমার পরিবারের একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম। গতবছর ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুরে স্টালিন ভাইয়ের বাগানে সর্বপ্রথম এ ফলের চাষাবাদ দেখি। সেখান থেকেই চারা সংগ্রহ করে আমার এক বিঘা জমিতে রোপন করি।’

    বাচ্চু আরও বলেন, ‘কিছু দিনের মধ্যেই এসব ডালে নতুন পাতা গজায় এবং তরতর করে গাছগুলো লাউ গাছের মতো বড় হতে থাকে। পরে মাচাং তৈরি করে দেই। মাচাংয়ে বড় হতে হতে মাত্র আট মাসের মধ্যে সুন্দর ফুল ও পরে ফল হতে থাকে। আট মাস আগে লাগানো এসব গাছে এখন ফল পাকতে শুরু করেছে।’

    এক বিঘার আনারকলি বাগান করতে বাচ্চুর এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। বর্তমান ফলন ও বাজারদর ঠিক থাকলে মৌসুম শেষে প্রায় ১০ লাখ টাকার ফল বিক্রির আশা করছেন তিনি।

    বাচ্চুর বাগান দেখতে আসছেন আশপাশের মানুষও। নতুন এ ফলের চাষ ও ফলন দেখে অন্য কৃষকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।ভেড়ামারা উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সদরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফলটি আনারকলি, প্যাশন ফ্রুট বা ট্যাং ফল নামে পরিচিত। ভেড়ামারায় এর চাষ নতুন হলেও চলতি মৌসুমে উপজেলার অনেক জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে।’

  • ইখতেয়ারের খামারে তৈরি হচ্ছে কেঁচো সার

    ইখতেয়ারের খামারে তৈরি হচ্ছে কেঁচো সার

    বিসিএস ক্যাডারে চাকরির সুযোগ, সরকারি কলেজে শিক্ষকতার সম্ভাবনা, একাধিক ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—সবই ছিল ইখতেয়ার উদ্দিন আহমেদ মুন্নার সামনে। চাকরির পাশাপাশি ব্যবসার পথও খোলা ছিল। কিন্তু এসবের কোনোটিই শেষ পর্যন্ত তাকে আটকে রাখতে পারেনি। নিজের এলাকার কৃষি ও মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদে নিরাপদ চাকরি ছেড়ে তিনি নেমেছেন কৃষির মাঠে।

    কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চরটেকী গ্রামে প্রায় দুই বছর আগে গড়ে তোলেন ‘এমএম এগ্রো’ নামে সমন্বিত কৃষি খামার। এখানে একই সঙ্গে চলছে মাছ চাষ, মুরগি পালন, গরু মোটাতাজাকরণ, নেপিয়ার ঘাস ও সবজি চাষ এবং ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন। খামারের একটি প্রকল্পের বর্জ্যই আবার অন্য প্রকল্পের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে কমছে উৎপাদন খরচ, তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান; পাশাপাশি জৈব সার উৎপাদনের মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষারও চেষ্টা চলছে।

    চাকরি থেকে কৃষির মাঠে

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষে ২২তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুযোগ পান ইখতেয়ার। তার পোস্টিং হয়েছিল কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজে। তবে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ না দিয়ে ব্যাংকিং পেশায় যুক্ত হন তিনি।

    ইউসিবিএল, পূবালী ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে কাজ করেছেন। ম্যানেজার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৬ সালে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় যুক্ত হন। ঠিকাদারি, কনস্ট্রাকশন ও গার্মেন্টস ব্যবসাসহ বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে কৃষির সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। সেই ভাবনা থেকেই চরটেকীতে শুরু করেন এমএম এগ্রো।

    ইখতেয়ার বলেন, ‘আমি মূলত কমার্শিয়াল ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ। কৃষিতে আগে থেকে খুব বেশি অভিজ্ঞতা ছিল না। এখানে কাজ করতে গিয়ে অনেক কিছু শিখতে হয়েছে। কোনো কিছু করতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে শিখেছি। এই শেখাটাকেই আমি ভবিষ্যতের বিনিয়োগ মনে করি।’

    এক খামারে অনেক প্রকল্প

    প্রায় ১৮ থেকে ২০ বিঘা জমিকে কেন্দ্র করে চলছে এমএম এগ্রোর কার্যক্রম। রয়েছে চারটি ফিশারি। এসব পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে। আছে প্রায় দুই হাজার ফাওমি মুরগি। চলছে ষাঁড় গরু মোটাতাজাকরণ। গবাদিপশুর খাদ্যের জন্য চাষ করা হচ্ছে নেপিয়ার ঘাস। পাশাপাশি গবাদিপশুর বর্জ্য ও জৈব উপাদান দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার।

    তবে ইখতেয়ারের উদ্যোগের বিশেষত্ব শুধু একসঙ্গে এতগুলো প্রকল্প চালানো নয়। তার পরিকল্পনা হলো, একটি প্রকল্পের উৎপাদিত উপকরণ যেন অন্য প্রকল্পে কাজে লাগে।

    নেপিয়ার ঘাস গরু-ছাগল ও গ্রাস কার্পের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। গবাদিপশুর বর্জ্য ও অন্যান্য জৈব উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরিতে। অর্থাৎ খামারে বর্জ্যও হয়ে উঠছে সম্পদ।

    ইখতেয়ার বলেন, ‘১০ টাকায় কিনে ৯ টাকায় বিক্রি করলে যত ব্যবসাই করেন, কোনো লাভ নেই। তাই কীভাবে উৎপাদন খরচ কমানো যায়, সেটাই বড় বিষয়।’

    তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। তাই কৃষিনির্ভরতা আরও বাড়ানো এবং কৃষিকে আরও উন্নত করা দরকার। আমি মনে করি, এটিই প্রকৃত উন্নয়ন—কৃষিভিত্তিক উন্নয়ন।’

    মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় কেঁচো সার

    এমএম এগ্রোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ভার্মি কম্পোস্ট। গবাদিপশুর বর্জ্য ও বিভিন্ন জৈব উপাদান ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে এই সার। উদ্যোক্তার কাছে এটি শুধু ব্যবসার একটি খাত নয়; কৃষির ভবিষ্যতের সঙ্গেও বিষয়টি জড়িত।

    ইখতেয়ার বলেন, ‘আমাদের মাটিতে জৈব উপাদান কমে যাচ্ছে। মাটির স্বাস্থ্য ঠিক না রেখে কৃষির উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমি চাই, ভার্মি কম্পোস্ট শুধু আমার খামারে নয়, ঘরে ঘরে তৈরি হোক।’বর্তমানে এ প্রকল্পের উৎপাদন বাড়ানোর কাজ চলছে। ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে কেঁচো সার বাজারজাত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

    খামার ঘিরে কর্মসংস্থান

    এমএম এগ্রো এখন স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানেরও জায়গা। খামারের বিভিন্ন প্রকল্পে স্থায়ী ও স্থানীয় মিলিয়ে প্রায় আটজন কাজ করছেন। এর বাইরে ভার্মি কম্পোস্ট প্রকল্পসহ বিভিন্ন কাজে আরও স্থানীয় যুবকের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

    খামার পরিচর্যা কর্মী রবি বলেন, ‘এখানে গরু, মাছ, ভার্মি কম্পোস্ট ও মুরগির প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজে প্রায় আটজন যুক্ত আছি। এর মধ্যে ছয়জন স্থায়ীভাবে কাজ করেন, আর স্থানীয় আরও দুজন রয়েছেন।’

    তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বেতন পাই। প্রয়োজন হলে মাস শেষ হওয়ার আগেও বেতন থেকে অগ্রিম নিতে পারি। ঘাস কাটা, গোবর সংগ্রহ, জৈব সার তৈরির উপকরণ সংগ্রহ, মুরগিকে খাবার ও পানি দেওয়া—এসব কাজ করতে হয়।’

    কর্মী রিপন বলেন, ‘আমি এখানে প্রায় এক বছর ধরে কাজ করছি। এই কাজ করে আমার চার সদস্যের পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারছি। খামারটি যত বড় হবে, তত বেশি মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে।’

    পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাজ

    খামারে শুধু পূর্ণকালীন কর্মীরাই নন, পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষার্থীরাও কাজ করছেন। পাকুন্দিয়া ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী নিলয় তাঁদের একজন।

    নিলয় বলেন, ‘আমার দাদা এখানে কাজ করেন। তাঁর সঙ্গে আমিও কলেজের সময়ের ফাঁকে ফাঁকে এখানে কাজ করি। এখানে আমার মতো আরও চার-পাঁচজন শিক্ষার্থী আছে, তারাও পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে।’তিনি বলেন, ‘এই কাজ থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে আমরা নিজেদের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারি। নিজেরা কিছুটা আয় করে পড়াশোনার খরচ দিতে পারছি—এতে আমরা সত্যিই আনন্দিত।’

    ব্যবস্থাপনায় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য

    খামারের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য বদিউল আলম। ২০১৫ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত হন।

    বদিউল আলম বলেন, ‘কে কী কাজ করছে, কোন জায়গায় কী করতে হবে—সবকিছুর দেখাশোনার দায়িত্ব আমার। এক কথায়, পুরো খামার পরিচালনার দায়িত্ব আমি পালন করছি।’

    কেঁচো সার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা যে সার উৎপাদন করছি, কৃষকরা সেটা ব্যবহার করলে ভালো ফসল উৎপাদন করতে পারবেন।’

    ইখতেয়ারের বড় ভাই ইলিয়াস উদ্দিন চুন্নুর চোখে, চাকরির নিরাপদ ভবিষ্যৎ ছেড়ে কৃষিতে আসার পেছনে তার ভাইয়ের ঝুঁকি নেওয়ার সাহসই সবচেয়ে বড় বিষয়।

    তিনি বলেন, ‘আমার ছোট ভাই বিসিএস ক্যাডার ও ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা ছিল। সেই নিরাপদ জায়গাগুলো ছেড়ে নিজের এলাকার উন্নয়নের জন্য কিছু করার পরিকল্পনা থেকেই কৃষিতে এসেছে।’তবে এখনো কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখেননি তারা। ইলিয়াস উদ্দিন চুন্নু বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা লাভের মুখ দেখছি না। কিন্তু সে বলে, পিছু হটব না। একবার না পারলে শতবার চেষ্টা করব। দেখতে দেখতে একসময় সফলতা আসবে।’

    কৃষি বিভাগের আশাবাদ

    পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরে-ই-আলম বলেন, ‘ইখতেয়ার উদ্দিনের এই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রামের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। তার উদ্যোগের কারণে ইতোমধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ থেকে ৩০ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ভার্মি কম্পোস্ট প্লান্টে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ জন যুবক কাজ করছেন।’

    তিনি বলেন, ‘কৃষির গুণগত পরিবর্তন ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় জৈব উপকরণও এখান থেকে পাওয়া যাচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও স্থানীয় যুবকেরা যুক্ত হয়েছেন। ফলে একদিকে স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে এটি একটি উৎপাদনশীল কৃষি খামার হিসেবেও গড়ে উঠছে।’

    সামনে আরও বড় স্বপ্ন

    এখনো নিজের উদ্যোগকে সফল বলে মনে করছেন না ইখতেয়ার। বরং ধীরে ধীরে খামারের পরিধি বাড়িয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত কৃষি মডেল গড়ে তুলতে চান তিনি। ভবিষ্যতে ডেইরি ও আরও কিছু কৃষিভিত্তিক প্রকল্প যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

    ইখতেয়ার বলেন, ‘অন্যান্য ব্যবসা থাকার পরও কৃষির প্রতি আমার আগ্রহ বেশি। আমি চাই, এটাকে আরও বড় করা যায়। একদিনে কিছু হয়নি। আস্তে আস্তে একটার পর একটা প্রকল্প যুক্ত করেছি। সামনে আরও বড় করার ইচ্ছা আছে।’

    চাকরির নিরাপদ পথ ছেড়ে কৃষিতে আসা ইখতেয়ারের এমএম এগ্রো এখনো সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছায়নি। তবে মাছ, গরু, মুরগি, ঘাস ও কেঁচো সারকে একই উৎপাদনচক্রে যুক্ত করে তিনি যে পথ তৈরি করছেন, তাতে একদিকে কৃষির নতুন সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে স্থানীয় মানুষের কাজের সুযোগ। তাঁর স্বপ্ন—এই ছোট উদ্যোগ একদিন বড় হবে, আর সেই সঙ্গে বড় হবে মাটি ও মানুষের জন্য কিছু করার পরিসর।