শিক্ষক তিনজন, শিক্ষার্থী নেই একজনও

বিডি গ্লোবাল ডেস্ক,

শিক্ষক আছেন তিনজন। খাতায় শিক্ষার্থীর নামও আছে ১১ জনের। তবে প্রায় দুই বছর ধরে বিদ্যালয়ে আসে না একজন শিক্ষার্থীও। নেই শ্রেণিপাঠ, পরীক্ষা বা কোলাহল। নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন শিক্ষকরা। ওঠে জাতীয় পতাকা, তবে বাজে না ঘণ্টা। এমনই অবস্থা সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের বওলাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।

১৯৮১ সালে বওলাতলা গ্রামে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে এটি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে পরিচালিত হয়। ২০১৪ সালে দেশের অন্যান্য রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে এটিও সরকারি করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। একপর্যায়ে শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা ও শিক্ষা বিভাগের যথাযথ তদারকির অভাবে বিদ্যালয়টি শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ে। বর্তমানে এলাকার অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় পড়াচ্ছেন।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক সুশীল কুমারসহ তিন শিক্ষকই বিদ্যালয়ে উপস্থিত। অপর দুই শিক্ষক হলেন সহকারী শিক্ষক আল মামুন ও মুনি আক্তার। শিক্ষার্থীদের আনাগোনা না থাকায় বিদ্যালয়ের মাঠে জন্মেছে আগাছা। বড় বড় ঘাসে ঢেকে গেছে মাঠ। দীর্ঘদিন যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের দেয়ালে ময়লা জমেছে, বারান্দার গ্রিলে ধরেছে জং। মলিন হয়ে পড়েছে বিদ্যালয় ভবনটিও।

প্রধান শিক্ষক সুশীল কুমার বলেন, বিদ্যালয়ের খাতায় প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১১ জন শিক্ষার্থীর নাম রয়েছে। তবে প্রায় দুই বছর ধরে তাদের কেউ বিদ্যালয়ে আসে না। ফলে শ্রেণিপাঠদান কিংবা কোনো পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয় না।

তিনি জানান, তার বাড়ি উল্লাপাড়া উপজেলার পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নের বেতকান্দি গ্রামে। শিক্ষার্থী না থাকলেও প্রতিদিন প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে আসেন তিনি। বিদ্যালয়টির আশপাশের এলাকায় মানুষের বসবাসও তুলনামূলক কম। সেখানে প্রায় ৭৫টি পরিবার রয়েছে।

সুশীল কুমার বলেন, ২০২৪ সালের জুনে তারা নতুন নিয়োগ পেয়ে এই বিদ্যালয়ে যোগ দেন। যোগদানের পর তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর অনুরোধ করেছেন। কিন্তু কোনো অভিভাবকই তাদের সন্তানদের এই বিদ্যালয়ে পাঠাননি। এলাকার শিশুরা সলঙ্গা কেজি স্কুল, মোস্তফা কেজি স্কুল, সলঙ্গা বেসরকারি আদর্শ স্কুল ও স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে।

তিনি বলেন, ‘বহু চেষ্টা করেও বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আনতে পারিনি। শ্রেণিপাঠদান না হলেও আমরা বিদ্যালয়ে এসে অফিসের কাজ করি এবং নিয়মিত বেতন পাই।’

শিক্ষার্থী সংগ্রহে ব্যর্থতার কারণে উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এতে তারা বিপাকে পড়েছেন।

উল্লাপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, তিনি কয়েক মাস আগে এই উপজেলায় যোগ দিয়েছেন। উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৭৮টি। এসব বিদ্যালয় তদারকির জন্য ১১টি সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ থাকলেও প্রায় এক বছর ধরে মাত্র একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছিলেন। ফলে এতগুলো বিদ্যালয় একজন কর্মকর্তার পক্ষে যথাযথভাবে তদারকি করা সম্ভব ছিল না।

তিনি বলেন, গত জুলাইয়ে বওলাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি শিক্ষার্থীশূন্য অবস্থার বিষয়টি দেখতে পান। সেদিন বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী ছিল না। শিক্ষার্থী সংগ্রহে ব্যর্থতার কারণে তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় সুধীজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী আনার চেষ্টা চলছে।

স্থানীয় অভিভাবক মনিরা ও আনোয়ারা খাতুন বলেন, একসময় বিদ্যালয়টিতে কিছু শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু ভালো পড়াশোনা না হওয়ায় ধীরে ধীরে বিদ্যালয়টির প্রতি অভিভাবকদের আগ্রহ কমে যায়। পরে তারা সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম। শিক্ষকদেরও আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল। পাশাপাশি এলাকার মানুষও শিক্ষার বিষয়ে খুব একটা সচেতন নন। বিদ্যালয়টি রক্ষায় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সুধীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে পার্শ্ববর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের এখানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।