ইসরাইলের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধায় দেশটির ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা। তাদের অনেকেরই বিশ্বাস, বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ সীমিত। আবার তারা ভয় পাচ্ছেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে উগ্র ইহুদি সরকার আবার ক্ষমতায় এলে ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন-পীড়ন আরো বাড়বে। তাই রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা থাকলেও অনেকে ভোট দিতে আগ্রহী। তাদের আশা, ভোটের মাধ্যমে নেতানিয়াহুর সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হতে পারে।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচন। দেশটির জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক। এবারের নির্বাচনে তাদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। জনমত জরিপ বলছে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন উগ্র ডানপন্থি জোট কিংবা নিজেদের জায়নবাদী বিরোধী জোট হিসেবে পরিচয় দেওয়া দলগুলো—কোনোটিই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। এ অবস্থায় আরব নেতৃত্বাধীন রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট পার্টির সমর্থন সরকার গঠনে নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। কোনো পক্ষই এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে নতুন নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকারই ক্ষমতায় থাকবে। এটি ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে উগ্র ডানপন্থি সরকার হিসেবে পরিচিত।
প্রথমবার ভোট দেবেন লায়লা
পূর্ব জেরুজালেমের বাইত হানিনা এলাকার বাসিন্দা ১৯ বছর বয়সি লায়লা আতামনেহ এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। ইসরাইলের নির্বাচনের সময় তার মা-বাবার মধ্যে ভোট দেওয়া নিয়ে তর্ক হতো। তার বাবা আরব নেতৃত্বাধীন কোনো নির্বাচনি জোটকে ভোট দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু তার মা বরাবরই ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতেন।
লায়লা বলেন, তার মায়ের ধারণা, ভোট দেওয়া মানে ইসরাইলকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে সহায়তা করা। এতে এমন ধারণা তৈরি হয় যে ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের ইহুদি নাগরিকদের সমান অধিকার ভোগ করেন। অথচ বাস্তবে তাদের চরম অপমানের শিকার হতে হয় এবং পরে তাদের এমন সরকারের মুখোমুখি হতে হয়, যার মধ্যে উগ্রপন্থিদের প্রভাব অত্যন্ত বেশি।
তবু এবার ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন লায়লা। তার মতে, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজার লাখো ফিলিস্তিনির হয়ে কথা বলার দায়িত্বও তার রয়েছে। এসব অঞ্চলের ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের পরবর্তী সরকার নির্বাচনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবেন না। অথচ তার বিশ্বাস, ইসরাইলি দখলদারত্ব, জাতিগত নিধন ও গণহত্যার সবচেয়ে বড় শিকার তারাই।
লায়লা বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাকে এই মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর হতে হবে। একজন মানুষ হয়তো খুব বেশি কিছু করতে পারে না। কিন্তু আমার ভোটে যদি তাদের ১ শতাংশ আশাও তৈরি হয়, তাহলে আমি ভোট দেব।’
তবে আরবি ভাষাভাষী লায়লার জন্য হিব্রু ভাষায় প্রচারিত নির্বাচনি খবর অনুসরণ করা কঠিন। তার মতে, নির্বাচনি আলোচনায় ফিলিস্তিনিদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া তরুণ ফিলিস্তিনিদের উদ্বেগ ও প্রত্যাশার কথাও দলগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছে না।
লায়লার এই দ্বিধা ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের একটি বড় অংশের মনোভাব তুলে ধরে। তারা মনে করেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না। আবার নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে আরেকটি সরকার গঠিত হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
২০২৩ সাল থেকে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন নেতানিয়াহু। তার সরকারের নীতির কারণে ফিলিস্তিনিদের অধিকার, জীবিকা ও ভূমি ক্রমাগত হুমকির মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
দখলদারত্বের ছায়ায় নির্বাচন
হাইফা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আসাদ ঘানেম বলেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে দমনমূলক নীতি আরো কঠোর হওয়ার প্রেক্ষাপটেই এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গাজায় গণহত্যা, পশ্চিম তীরে জাতিগত নিধন এবং ইসরাইলের ভেতরে ফিলিস্তিনিদের প্রতি কঠোর রাষ্ট্রীয় নীতি—সব মিলিয়ে তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গালিলি অঞ্চলের একটি দ্রুজ গ্রামে বসবাসকারী ৩৬ বছর বয়সি ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টান নারী হানানের কাছেও এই হুমকি এখন আরো বাস্তব মনে হচ্ছে। গত মাসে পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতিতে বসবাসকারী ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা গালিলির ফিলিস্তিনি জনপদ মাজদ আল-ক্রুমের কাছে একটি অবৈধ বসতি স্থাপনের চেষ্টা করেন।
এরপর ইসরাইলের উগ্রইহুদি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ এআই দিয়ে তৈরি একটি নির্বাচনী প্রচার ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে পশ্চিম তীরের এক ফিলিস্তিনিকে গালিলিতে বসবাসকারী তার এক আত্মীয়কে আতঙ্কিত কণ্ঠে ফোন করতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘ইহুদিরা আসছে’ এবং ‘তারা আমাদের সঙ্গে যা করেছে, তোমাদের সঙ্গেও তা-ই করবে’।
হানান বলেন, এ ধরনের ঘটনা তাকে আরো আতঙ্কিত করে। তার আশঙ্কা, বসতি স্থাপনকারীরা আরো আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারেন এবং ফিলিস্তিনিদের আরো বেশি জমি দখলের চেষ্টা করতে পারেন। তবে ভয় তাকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখছে না। বরং অন্যদেরও ভোট দিতে উৎসাহিত করতে চান তিনি।
হানান বলেন, ‘প্রতিবার নির্বাচনের আগে নিজেকে বলি, এবার আর ভোট দেব না। কারণ, বাস্তবে মনে হয় না আরব প্রতিনিধিরা খুব বেশি কিছু করতে পারেন। নারী প্রতিনিধিত্বের অভাব এবং নতুন রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরের অনুপস্থিতিও হতাশ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোট দিতে যাই। মনে হয়, হয়তো এবার কিছুটা পরিবর্তন আসবে।’
দল নিষিদ্ধের চেষ্টা ঘিরে ক্ষোভ
গত ২৩ সেপ্টেম্বর ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি আরব নেতৃত্বাধীন রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেয়। জয়েন্ট লিস্ট হলো হাদাশ, বালাদ ও তা’আল দলের জোট। তবে পরে সুপ্রিম কোর্ট ওই সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।
কিন্তু বালাদ নেতা সামি আবু শাহাদেহ নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। কারণ, আদালত ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে অধিকাংশ বিচারপতি তার প্রার্থিতা বাতিলের পক্ষে থাকতে পারেন।
অনেক ফিলিস্তিনি এই ঘটনাকে ইসরাইলের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে তাদের সংশয়ের প্রমাণ হিসেবে দেখেছেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, আরব দলগুলোকে নির্বাচনের বাইরে রাখার চেষ্টা ভোটারদের আরো বেশি সংগঠিত হওয়ার কারণ হতে পারে।
আরব-ইহুদি সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ থাবেত আবু রাস বলেন, ‘আমরা মনে করি, আমাদের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে। এ কারণেই আমরা আরো বেশি হারে ভোট দেব।’
গত পাঁচটি নির্বাচনে ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোট দেওয়ার হার ছিল প্রায় ৪৫ থেকে ৬৫ শতাংশ। ২০২২ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে এই হার ছিল প্রায় ৫৩ শতাংশ।
ফিলিস্তিনি নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি বিভিন্ন জরিপের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রায় ৬২ শতাংশ ভোট দিতে পারেন। তাদের লক্ষ্য এই হার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশে উন্নীত করা। ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে সর্বশেষ প্রায় ৭৫ শতাংশ ফিলিস্তিনি ভোট দিয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নেতানিয়াহুকে হারিয়ে এহুদ বারাককে প্রধানমন্ত্রী হতে সহায়তা করেছিল।
ওই নির্বাচনী প্রচারক বলেন, এবারও তারা ভোটার উপস্থিতি সেই পর্যায়ে নিতে চান। তার মতে, ফিলিস্তিনিদের বেশি ভোট ছোট উগ্রডানপন্থি দল আমচা ইসরাইল ও দ্য রিজার্ভিস্টসকে নির্বাচনী বাধা অতিক্রম করতে না-ও দিতে পারে। ইসরাইলের নির্বাচনে কোনো দলকে পার্লামেন্টে আসন পেতে মোট ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হয়। ছোট দলগুলো এই সীমা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হলে সামগ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে।
ঘানেমের মতে, ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ভোট বর্জনের ধারণা এখন তুলনামূলকভাবে ছোট একটি মত। তিনি বলেন, ‘আমরা সত্যিকারের বিপদের মধ্যে আছি। এই সরকারের মেয়াদ শেষ করতেও আমরা ভূমিকা রাখতে পারি।’
হানানও মনে করেন, ইসরাইলের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আপত্তি থাকলেও বাস্তবতা মেনে নিয়ে ভোট দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, ভোট দেওয়া মানে ইসরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া—এমন মনে হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রটি বাস্তবে বিদ্যমান। তাই শুধু স্বপ্নের মধ্যে থাকা সম্ভব নয়।
নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ওই ব্যক্তি বলেন, ‘ইহুদিদের সঙ্গে সমান হওয়ার অধিকার আমাদের যে একমাত্র দিনটিতে থাকে, সেটি হলো নির্বাচনের দিন।’
সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ, তবু জোটে অনীহা
এবারের নির্বাচনে বড় প্রশ্ন হলো, নেতানিয়াহুবিরোধী ইহুদি দলগুলো আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলবে। জনমত জরিপে ধারাবাহিকভাবে দেখা যাচ্ছে, জায়নবাদী দুই শিবিরের কোনোটিই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাবে না। ফলে রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কাগজে-কলমে এই পরিস্থিতি আরব দলগুলোকে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ধারক অবস্থানে নিয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের সঙ্গে জোট গঠনে অনীহা রয়েছে বিরোধী শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের। বিরোধী নেতা নাফতালি বেনেট বলেছেন, আরব দলগুলো জায়নবাদী নয়। তাই তাদের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন করা হবে না।
সাবেক সেনাপ্রধান ও বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী গাদি আইজেনকোটও আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন। নেতানিয়াহু তাকে আরব দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তা’আল নেতা আহমদ তিবিকে ইঙ্গিত করে ‘তিবি ছাড়া গাদি নেই’—এ ধরনের স্লোগানও নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এ অবস্থায় ফিলিস্তিনি ভোটারদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত। একদিকে নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ ও মূল্যবোধ ধরে রাখা, অন্যদিকে কৌশলগতভাবে এমন দলকে ভোট দেওয়া, যারা নেতানিয়াহুবিরোধী সরকার গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।
লায়লা আতামনেহ প্রথমে রা’আমকে ভোট দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। নেগেভ অঞ্চলের বেদুইন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দলটির সমর্থন রয়েছে। ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল এই দলটি নেতানিয়াহুবিরোধী জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করা হয়। উদারপন্থি জায়নবাদী দল ডেমোক্র্যাটসকেও বিবেচনায় নিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদর্শগত কারণে জয়েন্ট লিস্টকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন লায়লা।
তিনি বলেন, ‘কিছু বিষয়ে ছাড় দিতে পারি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমন কিছু নৈতিকতা ও মূল্যবোধ আছে, যেগুলো এত সহজে ছেড়ে দিতে পারি না। ফিলিস্তিনি হিসেবে আমাদের ফিলিস্তিনিদেরই সমর্থন করতে হবে।’
২০২১ সালে রা’আম ইসরাইলের সরকারে যোগ দিয়ে ইতিহাস তৈরি করেছিল। প্রথম কোনো আরব দল হিসেবে তারা একটি বিস্তৃত জোট সরকারের অংশ হয়। ওই জোট অল্প সময়ের জন্য নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে পেরেছিল।
রা’আমের যুক্তি, সরকারে অংশ নিলে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জন্য বাস্তব সুবিধা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে দলটির এই অবস্থান সবাইকে আশ্বস্ত করতে পারেনি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ঘানেমের অভিযোগ, রা’আমের নেতা মানসুর আব্বাস সামান্য বাজেট বরাদ্দ পাওয়ার জন্যও অনেক ছাড় দেন। কিন্তু তাতে ফিলিস্তিনিদের পরিচয় ও অধিকারসংক্রান্ত মৌলিক সমস্যার সমাধান হয় না।
তবে ধারণা করা হচ্ছে, বেদুইন নাগরিকদের বড় অংশ রা’আমকে সমর্থন করবেন। তাদের প্রত্যাশা, দলটি আবারও সরকার গঠনের জোটে যোগ দিতে পারবে। ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সরকারে অংশ নেওয়ার সময়কার মতো এবারও তারা সুবিধা আদায় করতে পারবে।
থাবেত আবু রাস বলেন, বেদুইনদের রাজনৈতিক বক্তব্য মূলত নাগরিক অধিকারকেন্দ্রিক। তাদের প্রধান উদ্বেগ দৈনন্দিন জীবন টিকিয়ে রাখা। সরকারে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদের স্বীকৃতিহীন গ্রামগুলোর স্বীকৃতি, শিক্ষায় বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে চান।
দখলদারত্ব বন্ধের আগে মানুষকে বাঁচাতে চান
ঘানেমের মতে, ইসরাইলের ভেতরে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল। কারণ, নিজেদের সমাজের মধ্যে তাদের সুসংহত রাজনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠেনি।
তবে তিনি মনে করেন, জয়েন্ট লিস্ট সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ১৯৯৩ সালে ফিলিস্তিনি দলগুলো মন্ত্রিসভার বাইরে থেকে ইয়িৎসহাক রবিনের সরকারকে সমর্থন করেছিল। এবারও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী শিবিরের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
ঘানেম বলেন, নেতানিয়াহুকে সরাতে চাওয়া মানেই সরকার গঠনের জোটে যোগ দিতে হবে, এমন নয়। বরং বর্ণবাদী সরকারকে সরাতে চাওয়া বৃহত্তর রাজনৈতিক শিবিরের অংশ হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
গত সপ্তাহে জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিনও নির্দিষ্ট শর্তে বিরোধী শিবিরকে সমর্থন দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করা এবং ইসরাইলের ফিলিস্তিনি জনপদগুলোতে সংগঠিত অপরাধ ও সহিংসতা মোকাবিলা করা।
থাবেত আবু রাস আশা করছেন, নির্বাচনী প্রচারে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা করা হলেও শেষ পর্যন্ত আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির তাদের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সমঝোতায় আসবে।
তিনি বলেন, ‘আরবরা যদি ১৫, ১৬ বা ১৭ জন নেসেট সদস্য নির্বাচিত করতে পারে, তাহলে সবাই তাদের দরজায় কড়া নাড়বে। প্রকাশ্যে তারা হয়তো তা স্বীকার করতে চাইবে না। কিন্তু নির্বাচনের পর তাদের বক্তব্য বদলে যাবে বলে আমি নিশ্চিত।’
আবু রাস নিজেও ইসরাইলি হামলায় গাজায় তার পরিবারের ৩৮ জন সদস্যকে হারিয়েছেন। তার মতে, নেতানিয়াহুবিরোধী সরকার গঠিত হলেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না। তবে বর্তমান সরকারের অধীনে ফিলিস্তিনিদের ওপর যে নৃশংসতা বাড়ছে, তা অন্তত কিছুটা থামানো সম্ভব হতে পারে।
আবু রাস বলেন, ‘দখলদারত্বের অবসান ঘটানোর আগে আমি আমার মানুষকে বাঁচাতে চাই।’
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে আরেকটি উগ্রইহুদি সরকার গঠিত হওয়ার আশঙ্কায় লায়লা মনে করছেন, তিনি শেষ পর্যন্ত তার মাকেও ভোট দিতে রাজি করাতে পেরেছেন।
লায়লা বলেন, ‘খারাপ পরিস্থিতি আছে, আর আছে অত্যন্ত খারাপ পরিস্থিতি। আমরা অত্যন্ত খারাপের চেয়ে খারাপ পরিস্থিতিকেই বেছে নেব। অন্তত একটি মৃত্যু, একটি বাড়ি ভেঙে ফেলার আদেশ কিংবা এ ধরনের কোনো ঘটনা ঠেকাতে পারলেও সেটি কিছু না করার চেয়ে ভালো।’
তবে কিছুক্ষণ থেমে তিনি আবারও সংশয়ের কথা জানান। তার আশঙ্কা, ভোট দিয়ে হয়তো ইসরাইলকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তি নতুন করে সাজানোর সুযোগ করে দিচ্ছেন তারা। লায়লার ভাষায়, ‘তখন মনে হয়, আমরা যেন একটা বদ্ধ গলিতে এসে দাঁড়িয়েছি।’