শিক্ষা ডেস্ক:
চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর গত দুদিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফেল করার হতাশা থেকে বেশ কজন শিক্ষার্থীর আত্মহননের খবর পাওয়া গেছে। শেরপুরের নকলায় চার বিষয়ে ফেল করে আত্মহননের পথ বেছে নেয় চন্দ্রকোনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী দিয়ামনি অন্তি (১৬)। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় বাহাদুরপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানিয়া খাতুন (১৬) অকৃতকার্য হওয়ার পর একই পথে হাঁটে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ইংরেজিতে ফেল করার পর চাকপাড়া আদর্শ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হালিমা খাতুন তরিকা (১৬) সোমবার দুপুরে আত্মহত্যা করে।
রাজশাহীর বাগমারায় বিদ্যালয়ে ভালো ফল করা হিসেবে পরিচিত বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কারিনা পাল (১৬) ফেল করার পর একই ধরনের ঘটনা ঘটায়। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী অভি বিশ্বাস (১৭) অকৃতকার্য হওয়ার খবরে হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। দেশের আরো কয়েকটি স্থান থেকে একই ধরনের ঘটনার খবর আসছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলেন, দেশের বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতিই ফেল করা শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার জন্য অন্যতম দায়ী। ফলে এর দায় সরকার ও সমাজকেও নিতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের দেশে ১০ বছর শিক্ষাজীবনের মূল্যায়ন করা হয় কয়েক ঘণ্টার পরীক্ষার মাধ্যমে; এটা সম্পূর্ণরূপে মান্ধাতা আমলের পদ্ধতি। বিশ্ব অনেক এগিয়ে গেলেও আমরা তা গ্রহণ করছি না।
ফলে এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতির আমূল পরির্তন আনতে হবে। লার্নিং আউটকাম বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট হয়েছে কি না, তা ক্লাসরুমেই ৬০ শতাংশ মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো বিষয়ে ফেল করলে শিক্ষার্থীরা শুধু ওই বিষয়ে পরীক্ষা দিতে পারবেÑএমন ব্যবস্থা থাকতে হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ফেল মানেই জীবন শেষ নয়। কেননা, বিশ্বের অনেক বিজ্ঞানী কিংবা উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা জীবনে ফেল করেও সাফল্যের শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছেন। তাই শিক্ষার্থীদের হতাশ না হয়ে নিজেদের আত্মসমালোচনা করে ঘুরে দাঁড়াতে হবে।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে গত সোমবার। এবার ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন; ফেল করেছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। এবার ১১ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৬.২ শতাংশ কম এবং গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরের সহকারী অধ্যাপক ও শিক্ষা অধিকার সংসদের সদস্য সচিব শাহনেওয়াজ খান চন্দন বলেন, দেশের বিদ্যমান শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতিই অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের চরম হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে; তাই পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা জরুরি। তিনি আরো বলেন, ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষাসহ বিকল্প সুযোগ তৈরি করা গেলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় ফেল করা মানে জীবনের সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বিশ্বে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা প্রথমবার প্রবেশিকা পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েও পরবর্তী জীবনে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছেন।
এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ তাইমুর শাহরিয়ার। স্কুলজীবনে ‘ফার্স্ট বয়’ ও বৃত্তিপ্রাপ্ত এই শিক্ষার্থী ২০০১ সালে এসএসসিতে রসায়নে টানা দুবার অকৃতকার্য হন। হাল না ছেড়ে ২০০৩ সালে জিপিএ ৩.৭৫ নিয়ে পাস করার পর এইচএসসিতে জিপিএ ৪.৮০ পান; এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষে ৩৩তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সারা দেশে প্রথম স্থান অর্জন করেন। আরেক দৃষ্টান্ত সাইফুল ইসলাম সোহেল। তিনি ২০০৭ সালে প্রথমবার এসএসসিতে অকৃতকার্য হয়ে পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে ৪০তম বিসিএসে ট্যাক্স ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।
শিক্ষাগত ব্যর্থতার পর সৃজনশীল পেশাতেও সাফল্যের নজির আছে। ওয়েব সিরিজ ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এর ‘কাবিলা’ চরিত্রে পরিচিত অভিনেতা জিয়াউল হক পলাশ ২০০৯ সালে এসএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর মিডিয়া অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হন। তার মায়ের ভাষ্য, সে ব্যর্থতাই তার মধ্যে কিছু করে দেখানোর জেদ তৈরি করেছিল।
বাংলাদেশের বাইরেও পরীক্ষার ফলকে ছাপিয়ে সাফল্যের অসংখ্য উদাহরণ আছে। আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় গণিতে মাত্র এক নম্বর পেয়েছিলেন এবং তিনবার চেষ্টা করেও ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাননি; এমনকি কেএফসির চাকরিতেও প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। অ্যাপলের স্টিভ জবস কলেজ শেষ করেননি, মাইক্রোসফটের বিল গেটস হার্ভার্ড অসমাপ্ত রেখেই গড়েছেন বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা ধীরুভাই আম্বানি স্কুলজীবনে ছিলেন গড়পড়তা ছাত্র, আর ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল স্কুলে বারবার ফেল করেও পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, এসব দৃষ্টান্তই প্রমাণ করে পরীক্ষার নম্বর বা সনদ নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গি, সাহস ও অবিরাম পরিশ্রমই মানুষকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নেয়। যারা এবার কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি, তাদের প্রতি বার্তাÑব্যর্থতা থেকে শেখা ও হাল না ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদে সাফল্যের চাবিকাঠি। একটি পরীক্ষার ফল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে নির্ধারণ করে না, বরং প্রতিটি ব্যর্থতার পর নতুন করে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতাই দীর্ঘমেয়াদে একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় গড়ে তোলে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
