ক্যাটাগরি পাঠকের মন্তব্য

  • বই কেন পড়বে

    বই কেন পড়বে

    সম্পাদকীয়:

    আমরা জানি, পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য পাঠ্যবই পড়া খুবই জরুরি। কিন্তু শুধু ক্লাসের পাঠ্যবই পড়লেই কি সব শেখা হয়ে যায়? না, যায় না। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, ধর্মীয়, জীবনী কিংবা বিজ্ঞানবিষয়ক বই আমাদের শেখার জগৎকে আরো বড় করে দেয়। এসব বই শুধু তথ্য দেয় না, জীবনকে নতুনভাবে দেখতেও শেখায়। সেই সঙ্গে জীবনের নানা প্রতিকূলতাকে সঠিক পথে সমাধান করার পথ দেখায়।

    গল্পের বই পড়লে আমরা নানা মানুষের জীবন, সুখ-দুঃখ, সাহস, সংগ্রাম আর সাফল্যের কথা জানতে পারি। এতে আমাদের কল্পনাশক্তি বাড়ে আর নতুনভাবে ভাবতে শিখি। কবিতা পড়লে ভাষার সৌন্দর্যটা বুঝতে পারি, নতুন নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচয় হয় আর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করাও সহজ হয়ে যায়। উপন্যাস পড়লে ধৈর্য ধরে পড়ার অভ্যাস হয়, মানুষের মন বুঝতে সাহায্য করে আর বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সেটাও বোঝা যায়। আর ভ্রমণকাহিনি পড়লে ঘরে বসেই দেশ-বিদেশের পাহাড়, নদী, সমুদ্র, বন, মরুভূমি আর নানা সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা যায়।

    বই আসলে আমাদের খুব ভালো একজন বন্ধু। মন খারাপ থাকলে একটি ভালো বই আনন্দ দেয়, একা থাকলে সঙ্গ দেয় আর অবসর সময়টাকে সুন্দরভাবে কাটাতে সাহায্য করে। নিয়মিত বই পড়লে চিন্তাশক্তি বাড়ে, স্মৃতিশক্তি ভালো হয় আর সুন্দরভাবে কথা বলা ও লেখার অভ্যাস তৈরি হয়। পরীক্ষার উত্তর লেখাও তখন সহজ হয়ে আসে, কারণ বই আমাদের ভাষা সমৃদ্ধ করে আর নিজের কথা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে সাহায্য করে।

    যারা বেশি বই পড়ে, তারা সাধারণত বেশি প্রশ্ন করে, নতুন কিছু জানতে চায় আর সমস্যা সমাধানেও ভালো হয়। বই মানুষকে শুধু জ্ঞানীই না, আরো মানবিকও করে তোলে। অন্যের কষ্ট বোঝা, প্রকৃতিকে ভালোবাসা, সত্য কথা বলা, দায়িত্বশীল হওয়া আর দেশকে ভালোবাসার মতো গুণগুলো বই থেকেই আমরা শিখি। অনেক বড় বিজ্ঞানী, লেখক, নেতা আর আবিষ্কারকের জীবনে বইই ছিল সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

    আজকাল মোবাইল, টিভি আর ইন্টারনেটে অনেক কিছু জানা যায় ঠিকই, কিন্তু বই পড়ার যে মজা আর গভীরতা, সেই সঙ্গে জ্ঞানের ভান্ডারের অধিকারী হওয়া, সেটা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। বই আমাদের মনোযোগ বাড়ায়, ধৈর্য শেখায় আর গভীরভাবে চিন্তা করার অভ্যাস গড়ে তোলে। তাই প্রতিদিন অল্প হলেও বই পড়ার অভ্যাস রাখা ভালো। দিনে মাত্র ২০-৩০ মিনিট বই পড়লেও বছরে অনেক বই শেষ করা সম্ভব।

    মনে রেখো, পাঠ্যবই আমাদের পরীক্ষায় ভালো করতে সাহায্য করে আর গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও ভ্রমণকাহিনি আমাদের মানুষ হিসেবে আরো ভালো করে তোলে। তাই শুধু ভালো ছাত্র না, ভালো মানুষ হতে চাইলে বইকে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু বানিয়ে ফেলো।

  • ফেল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোই হতে পারে জীবনের বড় শিক্ষা

    ফেল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোই হতে পারে জীবনের বড় শিক্ষা

    শিক্ষা ডেস্ক:

    চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর গত দুদিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফেল করার হতাশা থেকে বেশ কজন শিক্ষার্থীর আত্মহননের খবর পাওয়া গেছে। শেরপুরের নকলায় চার বিষয়ে ফেল করে আত্মহননের পথ বেছে নেয় চন্দ্রকোনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী দিয়ামনি অন্তি (১৬)। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় বাহাদুরপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানিয়া খাতুন (১৬) অকৃতকার্য হওয়ার পর একই পথে হাঁটে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ইংরেজিতে ফেল করার পর চাকপাড়া আদর্শ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হালিমা খাতুন তরিকা (১৬) সোমবার দুপুরে আত্মহত্যা করে।

    রাজশাহীর বাগমারায় বিদ্যালয়ে ভালো ফল করা হিসেবে পরিচিত বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কারিনা পাল (১৬) ফেল করার পর একই ধরনের ঘটনা ঘটায়। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী অভি বিশ্বাস (১৭) অকৃতকার্য হওয়ার খবরে হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। দেশের আরো কয়েকটি স্থান থেকে একই ধরনের ঘটনার খবর আসছে।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলেন, দেশের বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতিই ফেল করা শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার জন্য অন্যতম দায়ী। ফলে এর দায় সরকার ও সমাজকেও নিতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের দেশে ১০ বছর শিক্ষাজীবনের মূল্যায়ন করা হয় কয়েক ঘণ্টার পরীক্ষার মাধ্যমে; এটা সম্পূর্ণরূপে মান্ধাতা আমলের পদ্ধতি। বিশ্ব অনেক এগিয়ে গেলেও আমরা তা গ্রহণ করছি না।

    ফলে এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতির আমূল পরির্তন আনতে হবে। লার্নিং আউটকাম বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট হয়েছে কি না, তা ক্লাসরুমেই ৬০ শতাংশ মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো বিষয়ে ফেল করলে শিক্ষার্থীরা শুধু ওই বিষয়ে পরীক্ষা দিতে পারবেÑএমন ব্যবস্থা থাকতে হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ফেল মানেই জীবন শেষ নয়। কেননা, বিশ্বের অনেক বিজ্ঞানী কিংবা উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা জীবনে ফেল করেও সাফল্যের শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছেন। তাই শিক্ষার্থীদের হতাশ না হয়ে নিজেদের আত্মসমালোচনা করে ঘুরে দাঁড়াতে হবে।

    চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে গত সোমবার। এবার ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন; ফেল করেছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। এবার ১১ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৬.২ শতাংশ কম এবং গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

    জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরের সহকারী অধ্যাপক ও শিক্ষা অধিকার সংসদের সদস্য সচিব শাহনেওয়াজ খান চন্দন বলেন, দেশের বিদ্যমান শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতিই অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের চরম হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে; তাই পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা জরুরি। তিনি আরো বলেন, ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষাসহ বিকল্প সুযোগ তৈরি করা গেলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় ফেল করা মানে জীবনের সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বিশ্বে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা প্রথমবার প্রবেশিকা পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েও পরবর্তী জীবনে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছেন।

    এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ তাইমুর শাহরিয়ার। স্কুলজীবনে ‘ফার্স্ট বয়’ ও বৃত্তিপ্রাপ্ত এই শিক্ষার্থী ২০০১ সালে এসএসসিতে রসায়নে টানা দুবার অকৃতকার্য হন। হাল না ছেড়ে ২০০৩ সালে জিপিএ ৩.৭৫ নিয়ে পাস করার পর এইচএসসিতে জিপিএ ৪.৮০ পান; এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষে ৩৩তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সারা দেশে প্রথম স্থান অর্জন করেন। আরেক দৃষ্টান্ত সাইফুল ইসলাম সোহেল। তিনি ২০০৭ সালে প্রথমবার এসএসসিতে অকৃতকার্য হয়ে পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে ৪০তম বিসিএসে ট্যাক্স ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।

    শিক্ষাগত ব্যর্থতার পর সৃজনশীল পেশাতেও সাফল্যের নজির আছে। ওয়েব সিরিজ ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এর ‘কাবিলা’ চরিত্রে পরিচিত অভিনেতা জিয়াউল হক পলাশ ২০০৯ সালে এসএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর মিডিয়া অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হন। তার মায়ের ভাষ্য, সে ব্যর্থতাই তার মধ্যে কিছু করে দেখানোর জেদ তৈরি করেছিল।

    বাংলাদেশের বাইরেও পরীক্ষার ফলকে ছাপিয়ে সাফল্যের অসংখ্য উদাহরণ আছে। আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় গণিতে মাত্র এক নম্বর পেয়েছিলেন এবং তিনবার চেষ্টা করেও ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাননি; এমনকি কেএফসির চাকরিতেও প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। অ্যাপলের স্টিভ জবস কলেজ শেষ করেননি, মাইক্রোসফটের বিল গেটস হার্ভার্ড অসমাপ্ত রেখেই গড়েছেন বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা ধীরুভাই আম্বানি স্কুলজীবনে ছিলেন গড়পড়তা ছাত্র, আর ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল স্কুলে বারবার ফেল করেও পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।

    শিক্ষাবিদদের মতে, এসব দৃষ্টান্তই প্রমাণ করে পরীক্ষার নম্বর বা সনদ নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গি, সাহস ও অবিরাম পরিশ্রমই মানুষকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নেয়। যারা এবার কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি, তাদের প্রতি বার্তাÑব্যর্থতা থেকে শেখা ও হাল না ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদে সাফল্যের চাবিকাঠি। একটি পরীক্ষার ফল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে নির্ধারণ করে না, বরং প্রতিটি ব্যর্থতার পর নতুন করে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতাই দীর্ঘমেয়াদে একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় গড়ে তোলে।