অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে দেশের সাত জেলার ৫৮টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। এতে এখন পর্যন্ত ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার। এ দুর্যোগে ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৩৯ জন।
রোববার (১২ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জানান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এসব জেলার ৩৮৬টি ইউনিয়ন ও ১১টি পৌরসভা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজার জেলায়। সেখানে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৫ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। এ ছাড়া জেলায় ২৪ জন আহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৯ জন স্থানীয় এবং পাঁচ জন রোহিঙ্গা। নিখোঁজ রয়েছেন একজন।
চট্টগ্রামে বন্যায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১২ জন। বান্দরবানে ছয় জন নিহত ও দুই জন আহত হয়েছেন। রাঙামাটিতে তিন জন এবং মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যু হয়েছে। খাগড়াছড়িতে একজন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। হবিগঞ্জে এখন পর্যন্ত হতাহতের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জেলাটিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৫ লাখ ৯৫ হাজার এবং পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০টি।
এ ছাড়া কক্সবাজারে ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন, খাগড়াছড়িতে ৩৪ হাজার ৪১৭ জন, হবিগঞ্জে ২৮ হাজার ১৪০ জন, মৌলভীবাজারে ২৬ হাজার ৫৪৪ জন, বান্দরবানে ৮ হাজার ৩৫০ জন এবং রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৫২৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
আশ্রয়কেন্দ্রে ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ
বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের নিরাপদ আশ্রয় দিতে সাত জেলায় ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ২১ হাজার ৯০০ জন অবস্থান করছেন। বান্দরবানের ২২০টি কেন্দ্রে ৬ হাজার ২৫০ জন, রাঙামাটির ৫০টি কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬৩৭ জন এবং খাগড়াছড়ির ১৫০টি কেন্দ্রে ২ হাজার ৮৮৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
এ ছাড়া মৌলভীবাজারের ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ১৭২ জন এবং কক্সবাজারের ২৭টি কেন্দ্রে ১ হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। হবিগঞ্জে দুটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও সেখানে আশ্রিত মানুষের সংখ্যা জানানো হয়নি।
সাত জেলায় বরাদ্দ ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ও চাল
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৭ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত বন্যাকবলিত সাত জেলার জন্য মোট ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে চট্টগ্রামের জন্য ৬৫ লাখ টাকা ও ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন চাল, কক্সবাজারের জন্য ৩০ লাখ টাকা ও ৪৫০ মেট্রিক টন চাল, রাঙামাটির জন্য ২৫ লাখ টাকা ও ৫০০ মেট্রিক টন চাল এবং খাগড়াছড়ির জন্য ২০ লাখ টাকা ও ৪০০ মেট্রিক টন চাল দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বান্দরবানের জন্য ২০ লাখ টাকা ও ৪০০ মেট্রিক টন চাল, মৌলভীবাজারের জন্য ১০ লাখ টাকা ও ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং হবিগঞ্জের জন্য ৫ লাখ টাকা ও ১০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে।
একই সময়ে দেশের ৬৪ জেলার জন্য সাধারণ ও দুর্যোগকালীন সহায়তা হিসেবে ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল ছাড় করেছে মন্ত্রণালয়।
চলছে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ৭১০ মেট্রিক টন চাল, ৬০ লাখ টাকা, ৩৯ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১৫ হাজার ১০০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
বান্দরবানে ৬৮ মেট্রিক টন চাল, ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ২৩৫ প্যাকেট শিশুখাদ্য এবং ২ হাজার ৯৫৩ প্যাকেট রান্না করা ও শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে আরও ১ হাজার ৮৪৫ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
মৌলভীবাজারে ১ হাজার ৭৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ১১০ মেট্রিক টন চাল ও ৫ লাখ টাকা এবং হবিগঞ্জে ১০ মেট্রিক টন চাল, ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ও ১ হাজার ৪১৭ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে উদ্ধার, আশ্রয় ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হবে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
