পাবনার চাটমোহর উপজেলায় সার সিন্ডিকেটের হাতে সাধারণ কৃষক জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়, কিছু অসাধু সার ব্যবসায়ী বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা করছেন। অনেক ডিলার সারের মূল্যতালিকা না টাঙিয়ে ইচ্ছেমতো দাম নেন। রোপা আমন মৌসুমের শুরু থেকেই কতিপয় অসাধু ডিলার সার মজুত করে বেশি দামে বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে সামনের রবিশস্য মৌসুমে সারের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার চাটমোহর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় বিএনপি নেতৃবৃন্দসহ অন্যরা এসব অভিযোগ করেন।
অভিযোগে বলা হয়, সার মজুত করে কতিপয় ডিলার কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছেন। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সাধারণ কৃষক সার পাচ্ছেন না। এ কারণে অনেকে জমি পতিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার অনেকেই কালোবাজারে সার বিক্রি করে দিচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, কৃষকের প্রয়োজন নেই এমন সার না নিলে প্রয়োজনীয় সার দেওয়া হচ্ছে না। বক্তারা এর প্রতিকার দাবি করেন।
সারের অনিয়ম ও সিন্ডিকেট নিয়ে সভায় বক্তব্য দেন বিএনপি নেতা রবিউল করিম তারেক, শাহাদত হোসেন, মজনুর রহমান, অধ্যক্ষ আব্দুর রহিম কালু, জামায়াতে ইসলামীর নেতা আসাদুজ্জামান মিঞা, ছাত্রদলের উপজেলা আহ্বায়ক ফুলচাঁদ হোসেন শামীম প্রমুখ।
অভিযোগে জানা গেছে, উপজেলার নিমাইচড়ার মির্জাপুর, মূলগ্রামের রেলবাজার, ডিবিগ্রামের বামনগ্রাম বাজার ও ফৈলজানার শরৎগঞ্জ বাজারের ডিলাররা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এবং গোডাউনে সার মজুত রেখে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন। কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার বাজারে না দিয়ে গুদামে মজুত রাখার অভিযোগ রয়েছে ডিলারদের বিরুদ্ধে। তবে বেশি দাম দিলেই সার মিলছে।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন চাটমোহর রেলবাজার এলাকার বিসিআইসি ডিলার আব্দুস সালাম সরকার, ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের বামনগ্রাম বাজারের মাসুদ ও মোহাম্মদ আলী, শরৎগঞ্জ বাজারের ইউনুস আলী এবং মির্জাপুরের একজন ডিলার। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব বিক্রেতা একাধিক গুদামে শত শত বস্তা ডিএপি, পটাশ, এমওপি ও ইউরিয়া সার মজুত করে এলাকায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছেন।
সরকারি মূল্য অনুযায়ী ইউরিয়া সারের বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা ও পটাশ ১ হাজার টাকা। চাটমোহর উপজেলায় বিসিআইসির ডিলার ১২ জন, বিএডিসির ডিলার ১৭ জন এবং খুচরা সার বিক্রেতা ৬৯ জন। অভিযোগ রয়েছে, এঁদের অধিকাংশই সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। এতে কৃষকের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চাটমোহরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ৭৬০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৭ হাজার ৭৭৫ হেক্টর। চলতি অক্টোবর মাসে উপজেলায় ইউরিয়া ৪৬৫ মেট্রিক টন, ডিএপি ৫৪০ মেট্রিক টন, টিএসপি ১৫০ মেট্রিক টন এবং পটাশ ২৮৫ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একাধিক সূত্র জানায়, সরকারি বরাদ্দের সার ছাড়াও ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে কালোবাজারে সার কিনে গুদামজাত করছেন।
তাঁরা কৃষকদের কাছে সরবরাহ কমিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন খুচরা সার বিক্রেতা জানান, ডিলাররা সরকারি দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন। ফলে বিভিন্ন বাজারের খুচরা বিক্রেতারা সার পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে চাটমোহর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ কুন্তলা ঘোষ বলেন, বেশি দামে সার বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে এবং অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের সার বিক্রির বিষয়টি উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের দিয়ে মনিটরিং করা হচ্ছে।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপজেলার নবাগত নির্বাহী অফিসার খালিদ হাসান বলেন, প্রতিটি সার বিক্রেতাকে মূল্যতালিকা টাঙাতেই হবে। সারের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুষম বণ্টনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মনিটরিং জোরদার করা হবে এবং অভিযোগ পেলেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
