উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রচলিত ফসলের বাইরে প্রায় ২৫০ হেক্টর জমিতে মাল্টা, স্ট্রবেরি, আঙুর, কমলা, বারোমাসি আম, মিষ্টি আমড়া, তুলা, উচ্চমূল্যের সবজি ও পলিনেট পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনের মতো উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। চারঘাটের ফতেহপুর গ্রামের হানিফ মণ্ডলের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। উচ্চশিক্ষা শেষে চাকরির পেছনে না ছুটে ২০১৯ সালে প্রায় ১৬ বিঘা জমিতে মাল্টাসহ বিভিন্ন ফলের বাগান গড়ে তোলেন তিনি। তার প্রতিষ্ঠিত হানিফ এগ্রোফার্ম ও নার্সারিতে মাল্টার পাশাপাশি কমলা, আঙুর, আতা, আনার ও আম চাষ হচ্ছে। ফল বিক্রির পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের গাছের চারা বিক্রি করেও আয় করছেন তিনি। তার উদ্যোগ দেখে অন্য তরুণরাও ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এদিকে চারঘাটে বাণিজ্যিকভাবে আনার চাষেও সাফল্য আসছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আল মামুন হাসান বলেন, কৃষিকে লাভজনক করতে সঠিক ফসল নির্বাচন, উৎপাদন খরচ ব্যবস্থাপনা ও বাজার সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। চারঘাটের মাটি ও আবহাওয়া বিকল্প ফসল চাষের উপযোগী। এসব ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ডুমুরিয়া খুলনা সবুজ পাতার ভেতর হলুদ,কোথাও পিংক-বেগুনি আবার কোথাও নীল রঙ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, ফুটে আছে সুন্দর কোন ফুল। তবে এটা ফুল নয়, শীতকালীন সবজি ফুলকপি এবং বাঁধাকপির ক্ষেত। মনোরম এই দৃশ্য চোখে পড়বে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে।
রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে ওই গ্রামে ক্ষেত ঘুরে দেখা যায়- চাষ করা হলুদ, গোলাপি ও হালকা লাল রঙের বাহারি ফুলকপি এখন শোভা পাচ্ছে তার জমিতে। যা শুধু দৃশ্যমান সৌন্দর্যই ডুমুরিয়া বাজারে এনেছে বিপুল ক্রেতার সাড়া।
কৃষি বিভাগের পাশাপাশি বিভিন্ন সকারি উদ্যোগে খুলনার বেশ কয়েকটি উপজেলায় বিস্তীর্ণ ক্ষেতজুড়ে রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপির চাষ হচ্ছে। পোকা দমনেব্যবহার করা হচ্ছে জৈব বালাইনাশক ফরোমন ফাঁদ ও হলুদ ট্যাপ। ফলনও হচ্ছে বেশ ভালো। বাজারে ব্যাপক চাহিদা হওয়ায় ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষকরা।জানা গেছে, চলতি মৌসুমে অন্যান্য সবজি চাষ করে যে লোকসান হয়েছে, সেই লোকসান পুষিয়ে নিতে পারছেন কৃষকরা। পাইকাররা এসে ক্ষেত থেকেই নিয়ে যাচ্ছেন ফুলকপি। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি রঙিন ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। ফলে রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপির সাফল্যে খুশি কৃষকরা।
ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া ইউনিয়নের রঙিন বাঁধাকপি ফুলকপি চাষিরা বলছেন, সাদা কপি ১০ টাকায় বিক্রি হলেও এ কপি এখনও বাজারে প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা উপজেলার খর্নিয়া ইউনিয়নের খর্নিয়া গ্রামের সবজি চাষি আবু হানিফ মোড়ল ২০ শতাংশ জমিতে চাষ করেছেন রঙিন ফুলকপি। তিনি পরীক্ষামূলকভাবে ১০০০/চারা প্রথমবারের মতো রঙিন বাঁধা চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন। চারা ছাড়াও বাধা চাষের জন্য প্রয়োজনীয় জৈব সার, কীটনাশক ও পরামর্শ দিয়ে তাকে সহযোগিতা করেছে উপজেলা কৃষি অফিস।
আবু হানিফ মোড়লের মতো মৃতূ্ন্যজয় আরও চারজন রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষীদের এনে দিয়েছে সাফল্য। সাদা ফুলকপি যেখানে বিক্রি হয় প্রতি পিস ১০ থেকে ১৫টাকায়, সেখানে তার চাষ করা রঙিন বাঁধাকপি ও্ ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। ইতোমধ্যেই ৭ হাজার টাকার ফুলকপি বিক্রি করেছেন ৫০ হাজার টাকা বিক্রি করেছে। তিনি আশা করছেন, বাকি ফসল থেকে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় করবেন। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে চাষ করার পরিকল্পনাও রয়েছে তার।
কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী আবু হানিফ মোড়ল ও মৃত্যুঞ্জয় জৈব পদ্ধতিতে চাষ করেছেন এই রঙিন ফুলকপি। পোকামাকড় দমনের জন্য ব্যবহার করেছেন হলুদ ফাঁদ, যা কপিগুলোকে করেছে স্বাস্থ্যকর এবং বিষমুক্ত।
বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আব্দুল জলিল বলেন, ‘এ কপির পুষ্টি এবং গুণাগুণ অনেক ভালো। রঙিন ফুলকপি বাজারে আসা মাত্রই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। দামও মিলছে আশানুরূপ।
স্থানীয় ক্রেতা আকিরুল জানান, ২৫ টাকা দরে রঙিন ফুলকপি কিনেছেন তিনি। দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, খেতেও তেমনি সুস্বাদু। এর আগে দুইবার খেয়েছেন। তাই আবারও নিলেন।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ নাজমুল হুদা বলেন, ‘এই রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষে কৃষকরা আশানুরূপ ফলন ও বাজারমূল্য পেয়েছেন। রঙিন বাঁধাকপি ও ফুলকপির পুষ্টিগুণ সাদা ফুলকপির তুলনায় অনেক বেশি এবং এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এ বছর ডুমুরিয়া উপজেলায় ১১০ হেক্টর জমিতে ফুলকপি চাষ হয়েছে এবং এর মধ্যে ২৫ একর জমিতে রঙিন ফুলকপি চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাজারে এর উচ্চ চাহিদা থাকায় আগামী বছর আরও বেশি কৃষক এই চাষে যুক্ত হবেন।’
ডুমুরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ ক্ষেত জুড়ে ব্যতিক্রমী শীতকালীন সবজি রঙিন বাঁধাকপি ,ফুলকপি চাষ করেছেন কৃষকরা। কোনোটি হলুদ, কোনোটি পিংক-বেগুনি। আর এসব ফুলকপি কোনও প্রকার কীটনাশক ছাড়াই জৈব বালাইনাশক ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারেই এই ফুলকপি করা হচ্ছে।
কৃষক রাশেদুল ইসলাম বলেন ইউনাইটেড সিড কোম্পানির বীজ পেয়ে তিনি ১০শতক জমিতে এই রঙিন ফুলকপির চাষ করেছি। শুধুমাত্র জৈব বালাইনাশক ও ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারেই চাষ করেছি এই ফুলকপি। বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় পাইকারি ব্যবসায়ীরা ক্ষেত থেকেই ফুলকপি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। দামও ভালো।’
কৃষক ইমতিয়াজ বলেন, ‘প্রথমবারের মতো রঙিন ফুলকপির চাষ করেছি। ফলন বেশ ভালো হয়েছে। চাষে পোকা দমনে ফরোমন ফাঁদ ও হলুদ ট্যাপ ব্যবহার করে ২২ শতক জমিতে প্রায় দেড় হাজার কপি হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে মাত্র ১২ হাজার টাকা। বাজারে প্রতিটি কপি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি করছি। এ পর্যন্ত ৩০ হাজার টাকার কপি বিক্রি করেছি। আরও আছে। লোকজন রঙিন জাতের কপি কিনতে বেশ আগ্রহী। অল্প টাকা খরচ করে আমি বেশ লাভ পেয়েছি। আগামীতে আরও বেশি জমিতে এ জাতের কপির চাষ করব।’
উপজেলার বরাতিয়া গ্রামের তাপস সরকার বলেন, ‘বাড়ির অদূরে জমিতে সাদা, গোলাপি, সবুজ, হলুদ- চার প্রকারের ফুলকপি এবং ব্রকলি, চায়নিজ ক্যাবেজ, রেড ক্যাবেজ, সাধারণ বাঁধাকপিসহ মোট ৫হাজার চারা লাগিয়েছি। ফলনও ভালো হয়েছে। বাজারজাত করে দামও ভালো পেয়েছি। কিন্তু অন্যান্য শীতকালীন সবজি চাষে আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় অনেক আফসোস। তবে রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপিতে লোকসান পুষিয়ে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি।’
ছামিদুল আরও বলেন, এ বছরের জন্য বর্গা নিয়েছি ৬০ হাজার টাকায়। জমিতে বিভিন্ন জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, আলু, রসুন, টমেটো লাগিয়েছি। এর মধ্যে ৪ হাজার রঙিন ফুলকপি-বাঁধাকপির চারা স্থানীয় এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিনামূল্যে পেয়েছি। অবশিষ্ট চারাগুলো কিনতে হয়েছে প্রতি পিস ১ টাকা ৮০ পয়সা দরে। এর পর জমি প্রস্তুত, সার, কীটনাশক, শ্রমিকবাবদ খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকা।’
খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তের উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গত দুই বছর ধরে জেলায় রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ হচ্ছে। চাষ করে সফলতা পেয়েছেন অনেক কৃষক। বাজারে ভাল চাহিদা থাকায় আগামীতে বাণিজ্যিকভাবে রঙিন জাতের এই ফুলকপির চাষ বাড়বে। অন্য কৃষকরাও এ জাতের রঙিন ফুলকপি চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’
ক্ষেতে কোনো প্রকার কীটনাশক ও সার প্রয়োগ না করে কেবল জৈব পদ্ধতিতে বালাইনাশক ফরোমন ফাঁদ ও হলুদ ট্যাপ ব্যবহার। ফলনও বেশ ভালো। রঙিন ফুলকপি ভেষজগুণ সম্পন্ন একটি সবজি। স্বাদেও ভালো। সাধারণ ফুলকপির তুলনায় রঙিন ফুলকপিতে ২৫ শতাংশের বেশি ক্যারোটিন রয়েছে। যা ত্বক ও চোখকে ভালো রাখে। এটি কোলাজেন ধ্বংস করে। যা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। এর মধ্যে ভিটামিন এ, সি এবং ক’সহ বিভিন্ন ধরণের ভিটামিন রয়েছে। এতে রয়েছে মিনারেলস, পটাসিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজ। সেই সাথে এ ফুলকপিতে প্রচুর পরিমাণে বেটা ক্যারোটিন যা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।’
খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় ২-৪টি সজনে গাছ রয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে বেড়ে উঠেছে অসংখ্য সজনে গাছ। তাছাড়া ইদানীং অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে সজনের চাষ শুরু করেছেন। কোনো প্রকার বালাইনাশক প্রয়োগ এবং পরিচর্যা ছাড়া চাষ হয় বলে সজনের কোন উৎপাদন খরচ নেই। বাড়ির পাশে বা জমিতে ডাল পুঁতে রাখলেই ধীরে ধীরে শিকড় গজিয়ে উপযুক্ত গাছে পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে সজনে দেয়।
বাড়িতে তরকারীর চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উৎপাদনকারীরা এসব সজনে বাজারে বিক্রি করে বাড়তি উপার্জন করে থাকেন। মৌসুমজুড়ে এসব সজনে ৫০-১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এ সবজি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হয়।
উপজেলার ডুমুরিয়া , খর্নিয়া,চুকনগর, আঠারো মাইল, টিপনা নতুন রাস্তাবাজার,সরাফপুর , বানিয়া খালি হাট থেকে এসব সজনে ব্যাপারীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে বিক্রি করেন।
তরুণ উদ্যোক্তা গনি গাজী জানান, তিনি সজনের চাষ করেছেন। সজনে বিক্রির পাশাপাশি সজনের পাতা থেকে ভেষজ ওষুধ তৈরিই তার লক্ষ্য।
তিনি জানান, সজনে গাছের বয়স ১০-১২ মাস হলেই তাতে সজনে ধরতে শুরু করে। একটি পরিণত গাছে ৮-১০ মণ পর্যন্ত সজনে ধরে। উৎপাদন খরচ একেবারেই কম বলে এ ফসল চাষ বেশ লাভজনক বলে তিনি জানান।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ইউ এস আই ডাঃ কাজল মল্লিক বলেন, সজিনা পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি সবজি। ভিটামিন এ এর অভাব দূরীকরণে সজিনা অত্যন্ত উপযোগী একটি খাবার। এটি প্যারালাইসিস রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে থাকে। সজিনার মধ্যে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, জিংক ও সি আছে। এটি মানব দেহের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। সজিনা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের অনেক উপকারী। তাছাড়া সজিনার একদিকে যেমন উপকারী, অন্যদিকে এ পাতা শাক হিসেবে খাওয়া যায়।
ডুমুরিয়া উপজেলার এস এ পিপিও আলি হাসান বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এ বছর সজনের সর্বোচ্চ ফলন হয়েছে। প্রতিটি বাড়িতেই প্রায় সজনে গাছ আছে। কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের পরিকল্পিতভাবে সজনে ক্ষেত গড়ে তোলার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোঃ নাজমুল হুদা জানান, পরিবেশবান্ধব ও অর্থকরী আঁশজাতীয় সবজি সজিনাকে বলা হয় ‘মিরাকল ট্রি’। এ গাছের পাতা, ফুল, ফল সবই খাওয়া যায়। সজিনা এন্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি বাড়ির পাশে অনাবাদী ও পতিত জমিতে চাষ করা যায়। তাছাড়া ঠাণ্ডা-গরম, খরা সহিষ্ণু হওয়ায় এ গাছ বাংলাদেশের সর্বত্রই জন্ম নেয়। সজিনা গাছের তেমন কোন রোগবালাই নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি
তিনি জানান, আবহাওয়া অনুকূল থাকলে এবার উপজেলায় কমপক্ষে দুশ মেট্রিক টন সজনে উৎপাদিত হবে, বাজার দর হিসাবে যার মূল্য সর্বনিম্ন এক কোটি টাকা।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোঃ নজরুল ইসলাম জানান, দেশে সজনে সচারাচর দু’ধরনের হয়ে থাকে। মৌসুমী এবং বারমাসী। খুলনায় বারমাসী জাতের সজনের আবাদ কম হলেও এখন তা বেড়েছে। সজনে গাছের জন্য কোনো চাষাবাদ কিংবা রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয় না। তাই কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের মাঝে সজনের চারা বিতরণ করে সজনে চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
খুলনা জেলার ডুমুরিয়ায় সজনে গাছের ডালগুলোতে সজিনায় ভরে গেছে। কৃষকরা সজিনার বাম্পার ফলনের আশা করছেন। অনাদরে-অবহেলায় রাস্তার ধারে, বসত-বাড়ির আঙ্গিনায়, মাঠে-ঘাটে বেড়ে উঠা হাজার হাজার সজনে গাছের ডালগুলো সজিনায় ভরে উঠেছে। এ বছর ডুমুরিয়া সুস্বাদু সবজি হিসাবে সমাদৃত আর ঔষধি গুণের কারণে ‘সুপার ফুড’ হিসাবে খ্যাত সজনের বাম্পার ফলনে খুশি সংশ্লিষ্টরা।
খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় ২-৪টি সজনে গাছ রয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে বেড়ে উঠেছে অসংখ্য সজনে গাছ। তাছাড়া ইদানীং অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে সজনের চাষ শুরু করেছেন। কোনো প্রকার বালাইনাশক প্রয়োগ এবং পরিচর্যা ছাড়া চাষ হয় বলে সজনের কোন উৎপাদন খরচ নেই। বাড়ির পাশে বা জমিতে ডাল পুঁতে রাখলেই ধীরে ধীরে শিকড় গজিয়ে উপযুক্ত গাছে পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে সজনে দেয়।
বাড়িতে তরকারীর চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উৎপাদনকারীরা এসব সজনে বাজারে বিক্রি করে বাড়তি উপার্জন করে থাকেন। মৌসুমজুড়ে এসব সজনে ৫০-১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এ সবজি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হয়।
উপজেলার ডুমুরিয়া , খর্নিয়া,চুকনগর, আঠারো মাইল, টিপনা নতুন রাস্তাবাজার,সরাফপুর , বানিয়া খালি হাট থেকে এসব সজনে ব্যাপারীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে বিক্রি করেন।
তরুণ উদ্যোক্তা গনি গাজী জানান, তিনি সজনের চাষ করেছেন। সজনে বিক্রির পাশাপাশি সজনের পাতা থেকে ভেষজ ওষুধ তৈরিই তার লক্ষ্য।
তিনি জানান, সজনে গাছের বয়স ১০-১২ মাস হলেই তাতে সজনে ধরতে শুরু করে। একটি পরিণত গাছে ৮-১০ মণ পর্যন্ত সজনে ধরে। উৎপাদন খরচ একেবারেই কম বলে এ ফসল চাষ বেশ লাভজনক বলে তিনি জানান।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ইউ এস আই ডাঃ কাজল মল্লিক বলেন, সজিনা পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি সবজি। ভিটামিন এ এর অভাব দূরীকরণে সজিনা অত্যন্ত উপযোগী একটি খাবার। এটি প্যারালাইসিস রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে থাকে। সজিনার মধ্যে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, জিংক ও সি আছে। এটি মানব দেহের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। সজিনা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের অনেক উপকারী। তাছাড়া সজিনার একদিকে যেমন উপকারী, অন্যদিকে এ পাতা শাক হিসেবে খাওয়া যায়।
ডুমুরিয়া উপজেলার এস এ পিপিও আলি হাসান বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এ বছর সজনের সর্বোচ্চ ফলন হয়েছে। প্রতিটি বাড়িতেই প্রায় সজনে গাছ আছে। কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের পরিকল্পিতভাবে সজনে ক্ষেত গড়ে তোলার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোঃ নাজমুল হুদা জানান, পরিবেশবান্ধব ও অর্থকরী আঁশজাতীয় সবজি সজিনাকে বলা হয় ‘মিরাকল ট্রি’। এ গাছের পাতা, ফুল, ফল সবই খাওয়া যায়। সজিনা এন্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি বাড়ির পাশে অনাবাদী ও পতিত জমিতে চাষ করা যায়। তাছাড়া ঠাণ্ডা-গরম, খরা সহিষ্ণু হওয়ায় এ গাছ বাংলাদেশের সর্বত্রই জন্ম নেয়। সজিনা গাছের তেমন কোন রোগবালাই নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোঃ নজরুল ইসলাম জানান, দেশে সজনে সচারাচর দু’ধরনের হয়ে থাকে। মৌসুমী এবং বারমাসী। খুলনায় বারমাসী জাতের সজনের আবাদ কম হলেও এখন তা বেড়েছে। সজনে গাছের জন্য কোনো চাষাবাদ কিংবা রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয় না। তাই কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের মাঝে সজনের চারা বিতরণ করে সজনে চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
পাবনার চাটমোহর উপজেলায় সার সিন্ডিকেটের হাতে সাধারণ কৃষক জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়, কিছু অসাধু সার ব্যবসায়ী বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা করছেন। অনেক ডিলার সারের মূল্যতালিকা না টাঙিয়ে ইচ্ছেমতো দাম নেন। রোপা আমন মৌসুমের শুরু থেকেই কতিপয় অসাধু ডিলার সার মজুত করে বেশি দামে বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে সামনের রবিশস্য মৌসুমে সারের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার চাটমোহর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় বিএনপি নেতৃবৃন্দসহ অন্যরা এসব অভিযোগ করেন।
অভিযোগে বলা হয়, সার মজুত করে কতিপয় ডিলার কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছেন। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সাধারণ কৃষক সার পাচ্ছেন না। এ কারণে অনেকে জমি পতিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার অনেকেই কালোবাজারে সার বিক্রি করে দিচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, কৃষকের প্রয়োজন নেই এমন সার না নিলে প্রয়োজনীয় সার দেওয়া হচ্ছে না। বক্তারা এর প্রতিকার দাবি করেন।
সারের অনিয়ম ও সিন্ডিকেট নিয়ে সভায় বক্তব্য দেন বিএনপি নেতা রবিউল করিম তারেক, শাহাদত হোসেন, মজনুর রহমান, অধ্যক্ষ আব্দুর রহিম কালু, জামায়াতে ইসলামীর নেতা আসাদুজ্জামান মিঞা, ছাত্রদলের উপজেলা আহ্বায়ক ফুলচাঁদ হোসেন শামীম প্রমুখ।
অভিযোগে জানা গেছে, উপজেলার নিমাইচড়ার মির্জাপুর, মূলগ্রামের রেলবাজার, ডিবিগ্রামের বামনগ্রাম বাজার ও ফৈলজানার শরৎগঞ্জ বাজারের ডিলাররা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এবং গোডাউনে সার মজুত রেখে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন। কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার বাজারে না দিয়ে গুদামে মজুত রাখার অভিযোগ রয়েছে ডিলারদের বিরুদ্ধে। তবে বেশি দাম দিলেই সার মিলছে।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন চাটমোহর রেলবাজার এলাকার বিসিআইসি ডিলার আব্দুস সালাম সরকার, ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের বামনগ্রাম বাজারের মাসুদ ও মোহাম্মদ আলী, শরৎগঞ্জ বাজারের ইউনুস আলী এবং মির্জাপুরের একজন ডিলার। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব বিক্রেতা একাধিক গুদামে শত শত বস্তা ডিএপি, পটাশ, এমওপি ও ইউরিয়া সার মজুত করে এলাকায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছেন।
সরকারি মূল্য অনুযায়ী ইউরিয়া সারের বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা ও পটাশ ১ হাজার টাকা। চাটমোহর উপজেলায় বিসিআইসির ডিলার ১২ জন, বিএডিসির ডিলার ১৭ জন এবং খুচরা সার বিক্রেতা ৬৯ জন। অভিযোগ রয়েছে, এঁদের অধিকাংশই সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। এতে কৃষকের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চাটমোহরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ৭৬০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৭ হাজার ৭৭৫ হেক্টর। চলতি অক্টোবর মাসে উপজেলায় ইউরিয়া ৪৬৫ মেট্রিক টন, ডিএপি ৫৪০ মেট্রিক টন, টিএসপি ১৫০ মেট্রিক টন এবং পটাশ ২৮৫ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একাধিক সূত্র জানায়, সরকারি বরাদ্দের সার ছাড়াও ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে কালোবাজারে সার কিনে গুদামজাত করছেন।
তাঁরা কৃষকদের কাছে সরবরাহ কমিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন খুচরা সার বিক্রেতা জানান, ডিলাররা সরকারি দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন। ফলে বিভিন্ন বাজারের খুচরা বিক্রেতারা সার পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে চাটমোহর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ কুন্তলা ঘোষ বলেন, বেশি দামে সার বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে এবং অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের সার বিক্রির বিষয়টি উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের দিয়ে মনিটরিং করা হচ্ছে।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপজেলার নবাগত নির্বাহী অফিসার খালিদ হাসান বলেন, প্রতিটি সার বিক্রেতাকে মূল্যতালিকা টাঙাতেই হবে। সারের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুষম বণ্টনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মনিটরিং জোরদার করা হবে এবং অভিযোগ পেলেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
পুজোর আগে একটানা বৃষ্টিতে কার্যত নাজেহাল হয়ে ওঠে বঙ্গবাসী। প্রবল বৃষ্টির জেরে একাধিক জেলায় রীতিমতো বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর ফলে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় কৃষকদের। জমিতে জল দাঁড়িয়ে বিঘার পর বিঘায় নষ্ট হয়েছে ফসল। যদিও মাঝের কয়েকদিনের কাঠফাটা রোদ্দুরে কিছুটা হলেও শুকিয়েছে মাঠ। কিন্তু নতুন করে অর্ণবের প্রভাবে বৃষ্টির পূর্বাভাসে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে হুগলির কৃষকদের। সামনেই মাঠের ধান তোলা হবে। রয়েছে আলুর সিজল। নতুন করে বৃষ্টি শুরু হলে চাষের ব্যাপক ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা কৃষকদের।আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া গভীর নিম্নচাপটি সোমবার সকালেই পরিণত হয়েছে ঘূর্ণিঝড়ে ‘অর্ণবে’। আবহাওয়াবিদদের কথায়, আগামী দু’দিনে তা আরও শক্তিবৃদ্ধি করে বুধবার, ২৮ অক্টোবর সকালে আছড়ে পড়তে চলেছে অন্ধ্র ও ওড়িশা উপকূলে। তবে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা এখনও খুব একটা স্পষ্ট নয়। তবে সাইক্লোন ‘অর্ণবে’র প্রভাবে মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টি হতে পারে রাজ্যের উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে। সেইসঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে পূর্বাভাস, কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টি হবে। তবে সবটাই নির্ভর করছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণবে’র গতিবিধির উপর। সেদিকে নজর রেখেছেন আবহবিদরা।
তবে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে হুগলি জেলার সিঙ্গুর, ধনেখালি, আরামবাগ-সহ বিভিন্ন চাষ প্রধান এলাকার কৃষকদের মধ্যে। আমন ও আউশ ধানের ক্ষতির পাশাপাশি আলু চাষের প্রস্তুতিও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় এমনিতেই সমস্যায় পড়েছেন কৃষকরা। কখনও জলসংকট, কখনও অতিবৃষ্টি প্রভাব ফেলেছে। আর এবার ‘অর্ণব’। ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কায় ফসলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁদের। বর্তমানে সিঙ্গুর, হরিপাল, ধনেখালি, আরামবাগের বিভিন্ন এলাকায় মাঠে রয়েছে আমন ও আউশ ধান। অনেক জমিতে এখনও আমন ধানের শিষ বের হয়নি, আবার কোথাও শিষ বের হওয়া ও ফুল আসার প্রক্রিয়া চলছে। এই অবস্থায় ভারী বৃষ্টি হলে ও ঝড়ো হাওয়া বইলে ধানগাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকছে। তাতে ফলন ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে বলে তাঁদের উদ্বেগ। এমনকী ধান বাঁচানো নিয়েও দেখা দিয়েছে আশঙ্কা।
স্থানীয় এক কৃষকের কথায়, নতুন করে বৃষ্টি হলে মাঠে থাকা সমস্ত ধান নষ্ট হয়ে যাবে। বাড়তে পারে শোষক পোকার আক্রমণও। এই পরিস্থিতিতে ধান কেটে ঘরে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে বলেই আশঙ্কা কৃষকদের। তিনি আরও জানান, জমি তৈরি করে জ্যোতি আলু-সহ বিভিন্ন প্রজাতির আলুর লাগানোর প্রস্তুতি চলছিল।কিন্তু টানা বৃষ্টি হলে জমিতে জল জমে মাটি কাদায় পরিণত হতে পারে। তাতে আলু রোপণের উপযুক্ত পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি চাষের কাজও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কৃষকদের। এহেন পরিস্থিতিতে আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির দিকেই এখন নজর কৃষকদের।
যশোরের চৌগাছায় সিংহঝুলি আলিম মাদ্রাসার প্রধান গেটের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করা হয়েছে।
বুধবার সকালে এ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইউনুস আলী দফাদার।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা আসাদুল্লাহ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত মহিলা এমপি সাবিরা সুলতানা মুন্নীর প্রতিনিধি আফিল উদ্দিন দফাদার, মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক মাওলানা নুরুজ্জামান আল মামুন, সহকারী অধ্যাপক ওহিদুল ইসলাম বকুল, মাওলানা মুখতার হুসাইন, মাওলানা হাফিজুর রহমান, সহকারী শিক্ষক ওয়াজেদ আলী, বিশিষ্ট সমাজ সেবক আনোয়ার হোসেন দেওয়ান, শফিউদ্দিন দেওয়ান, আজিম উদ্দিন দেওয়ান,সামছুল হুদা দফাদার প্রমুখ।
মাদ্রাসার এই প্রধান গেটটির নির্মাণ কাজ শেষ করতে প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয় হবে। সিংহঝুলি গ্রামের দুই জন বিশিষ্ট ব্যাক্তি শফিউদ্দিন দেওয়ান ও আনোয়ার হোসেন দেওয়ান এই নির্মাণ কাজের সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করছেন । উল্লেখ্য তাদের পূর্বপুরুষরা এই মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠা করতে ভুমিকা রেখেছিলেন।
পড়াশোনা করেছেন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। নিয়ম অনুযায়ী তার ব্যস্ত থাকার কথা ছিল ফাইবার, সুতা, কাপড় কিংবা তৈরি পোশাক প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। কিন্তু প্রথাগত চাকুরির পেছনে না ছুটে তিনি বেছে নিয়েছেন এক ব্যতিক্রমী পথ। কাজ করছেন গরু, দুধ, ঘাস, গোবর, বায়ুগ্যাস, দই ও ঘি নিয়ে। আর এই ভিন্নধর্মী পেশায় গিয়ে অর্জনে যোগ করেছেন অভূতপূর্ব সাফল্য। তিনি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা ও সফল খামারি মো. ইয়াছিন আরাফাত। বর্তমানে তিনি বসবাস করছেন বন্দরনগরী ভৈরব বাজারের শহীদ আশুরঞ্জন সড়ক এলাকায়।
তবে এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে তার পিতা, এলাকার প্রখ্যাত শিল্পপতি, বিশিষ্ট দানবীর ও জনহিতৈষী ব্যক্তিত্ব মো. ফজলুর রহমানের মেধা, শ্রম ও অনুপ্রেরণা। যাকে সবাই ভালোবেসে এবং শ্রদ্ধা করে ডাকেন ‘বস্ ফজলু ভাই’ নামে। পিতা ও পুত্রের এই যুগলবন্দী উদ্যোগে কুলিয়ারচর ও ভৈরব অঞ্চলে সূচিত হয়েছে এক নতুন কৃষি-শিল্প বিপ্লব।জাতীয় বস্ত্রপ্রকৌশল ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (এনআইটিইআর) থেকে বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করার পর নিজ জন্মভূমি কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর গ্রামে পিতা ফজলুর রহমানের অনুপ্রেরণায় নিজেদের ৩ একর জমির ওপর ২০১৮ সালে মাত্র ৪টি গাভী নিয়ে ‘বস্ এগ্রো ফার্ম’ নামের একটি ডেইরি খামার গড়ে তোলেন ইয়াছিন আরাফাত। তার সততা ও নিরলস পরিশ্রমে সেই ছোট্ট খামারটি আধুনিক উপায়ে ৪টি বিশাল শেডে আজ দেশি-বিদেশি জাতের দেড় শতাধিক গরুর এক বিশাল এগ্রো ফার্মে রূপ নিয়েছে।
বর্তমানে খামারের প্রায় ৭০ শতাংশ গরুই নিজস্ব প্রজননের মাধ্যমে উৎপাদিত। এর মধ্যে ৩০-৩৫টি দুগ্ধজাত গাভী রয়েছে, যা থেকে প্রতিদিন ৫০০-৫৫০ লিটার দুধ সংগ্রহ করা হচ্ছে।শুরুতে খামারের উৎপাদিত দুধ বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে পাইকারি দরে বিক্রি করা হতো। পরবর্তী ইয়াছিন আরাফাত ভৈরবের জগন্নাথপুর এলাকায় একটি আধুনিক দই ও ঘি তৈরির কারখানা গড়ে তোলেন। বিএসটিআইসহ সরকারি সকল প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিয়ে বাজারজাত শুরু হয় “বস” দই ও ঘি। গুণগত মানের কারণে খুব অল্প সময়েই ভৈরবসহ পার্শ্ববর্তী জেলা-উপজেলা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সাড়া ফেলেছে এই ব্র্যান্ড।
এছাড়াও প্রতি বছর কোরবানির ঈদ উপলক্ষে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও দেশীয় খাদ্যের মাধ্যমে শতাধিক পশু মোটাতাজাকরণ করা হয়। শতভাগ স্বাস্থ্যসম্মত হওয়ায় স্থানীয় ক্রেতারা খামার থেকেই পছন্দমতো পশু কিনে নেন, যা থেকে অর্জিত হয় মোটা অঙ্কের মুনাফা।এদিকে তার এই খামার এবং কারখানায় দক্ষ-অদক্ষ প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তারা খামারের যত্ন-পরিচর্যা ছাড়াও দই, ঘি তৈরি ও প্যাকেজিং কাজ করে থাকেন।
ইয়াছিন আরাফাতের এই সমন্বিত খামারে রয়েছে বহুমুখী আয়ের উৎস। খামারের ভিতর দেড় একর জায়গায় দৃষ্টিনন্দন দুটি পুকুরে মিশ্র মাছের চাষের পাশাপাশি হাঁস এবং আঙিনায় দেশীয় মুরগী পালন করা হচ্ছে। এসব মাছ ও মুরগিসহ খামারের চারপাশে রোপণ করা কলা, মরিচ, লেবু, আম ও জামগাছ থেকে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে ফলমূল, মাছ ও হাঁস-মুরগি বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় আসছে। খামারের গোবর থেকে তৈরি জৈব সার ব্যবহার করছেন তাদের নিজস্ব ১০ একর ধান ও ঘাসের জমিতে। খামারের গোবর ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়েছে একটি বায়ুগ্যাস প্ল্যান্ট। বর্তমানে ৪টি চুলার পারিবারিক রান্না শেষে উদ্বৃত্ত গ্যাস ছেড়ে দিতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে বড় জেনারেটর বসিয়ে খামারের শতভাগ বিদ্যুতের চাহিদা এই প্ল্যান্ট থেকে মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার।মারের পশুগুলোর প্রতি ইয়াছিন আরাফাতের ভালোবাসা এতই গভীর যে প্রতিদিন তিনি খামারে এসে প্রতিটি পশুকে নিজ হাতে আদর-যত্ন করেন। খাবার খাওয়ান। চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা দেন। খামারকে ঘিরে গড়ে তুলা হয়েছে একটি আলিশান প্রাসাদ ও দৃষ্টিনন্দন পুকুর ঘাট।
জানা যায়, কুলিয়ারচরের পশ্চিম ও দক্ষিণ কর্ণারের শেষ প্রান্তে ফরিদপুর গ্রামের মরহুম মো. শহিদ মিয়ার ছেলে মো. ফজলুর রহমান বেশি দূর লেখাপড়া করতে না পারলেও স্বাবলম্বী হওয়ার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে জীবনের শুরু থেকেই একের পর এক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। বন্দরনগরী ভৈরবে ছেলে আরাফাতের নামে গড়ে তুলেছেন ‘আরাফাত কেমিক্যাল ওয়ার্কস’ (বস্ মশার কয়েল) প্রাইভেট লিমিটেড, যার চেয়ারম্যান তিনি। কেমিক্যাল, কয়েল ও বিভিন্ন ফুড প্রডাক্টের ব্যবসা সফলভাবে পরিচালনা করে ইতোমধ্যে তিনি দেশজুড়ে সুনাম কুড়িয়েছেন।তিনি শুধু একজন সফল ব্যবসায়ীই নন, অত্যন্ত অমায়িক ও বিনয়ী একজন মানুষ। নিজের প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতেও তার কোনো দ্বিধা নেই। এলাকার দরিদ্র, অসহায় মানুষ, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ ও কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাদের অকাতরে দান ও সহযোগিতা করে তিনি লাভ করেছেন সর্বজনীন শ্রদ্ধা।
তরুণ উদ্যোক্তা মো. ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘সফলতার জন্য শুধু অভিজ্ঞতা নয়, পরম দক্ষতা এবং কাজের প্রতি মায়া ও ভালোবাসা প্রয়োজন। যারা এই খাতে আসবেন, তাদের আবেগ ও মমতা নিয়ে আসতে হবে।’
কুলিয়ারচর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন বস্ এগ্রো ফার্মের কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, ‘বস্ এগ্রো ফার্ম আমাদের নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান এবং তাদের বর্তমান উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এই অর্জিত সাফল্য আমাদের সবাইকে মিলে ধরে রাখতে হবে।’
কুলিয়ারচরসহ আশেপাশের এলাকায় পুষ্টির চাহিদা পূরণে ফার্মটির ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি আরও জানান, কুলিয়ারচর ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে দুধ, মাংস ও প্রোটিনের ঘাটতি পূরণে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে তাদের নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
এছাড়া কুলিয়ারচরের অন্যান্য ডেইরি ফার্মের তুলনায় বস্ এগ্রো ফার্মের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ডেইরি পণ্যের পাশাপাশি মিষ্টি, দই ও ঘির মতো বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনেও প্রতিষ্ঠানটি অনন্য ভূমিকা পালন করছে।’
ভৈরব উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মো. শাহীনুল হক জানান, একজন উচ্চশিক্ষিত টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার খামার সেক্টরে এসে যে চমৎকার সাফল্য দেখিয়েছেন, তা অনন্য। শিক্ষিত তরুণরা এভাবে এগিয়ে এলে দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে বড় পরিবর্তন আসবে। আমাদের দপ্তর থেকে তাদের সব ধরণের সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
ভৈরব সরকারি মহিলা কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মনোয়ারা পারভীন বলেন, ‘স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন আমিষ ও পুষ্টিকর খাবার। প্রকৌশলী হয়েও ইয়াছিন আরাফাত চিরাচরিত ধারার বাইরে গিয়ে নিরাপদ দুধ, দই, ঘি ও মাছ সরবরাহ করে জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছেন।’
পিতা ও পুত্রের এমন অনন্য উদ্যোগ কিশোরগঞ্জ জেলা ছাপিয়ে এখন সারাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য এক মহা অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার নির্মইল ইউনিয়নের জামালপুর গ্রামের কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন আবাসন উদ্যোগ একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
জানা গেছে, ২৬ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক ফোরামে এই উদ্যোগটি ‘কালেক্টিভ হাউজিং অ্যাওয়ার্ড’ (Collective Housing Award)-এ ভূষিত হয়। ‘প্ল্যাটফর্ম অব কমিউনিটি অ্যাকশন অ্যান্ড আর্কিটেকচার’ (POCAA)-এর মাধ্যমে এই উদ্যোগের অভিজ্ঞতা পুরস্কারের জন্য জমা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে এটি ‘কালেক্টিভ ইনিশিয়েটিভস অব দ্য কমিউনিটি’ (Collective Initiatives of the Community) ক্যাটাগরিতে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়।
একদল ভূমিহীন মানুষের আবাসন সংকট মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠা, সঞ্চয়, যৌথ সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে ৪৯টি ভূমিহীন পরিবার খাস জমিতে নিজেদের ঘর নির্মাণ করে।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে থাইল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী অধ্যাপক ড. ইয়োসানান ওয়ংসাওয়াত এবং ইউএন-হ্যাবিটাটের নির্বাহী পরিচালক আনাক্লাউদিয়া রসবাখ উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ’-এর স্থানীয় প্রতিনিধি আসির উদ্দিন বলেন, ‘একদল ভূমিহীন মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলেই আজ এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে।’
পত্নীতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা জানান, ‘জামালপুর গ্রামের মানুষের এই অর্জন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশসহ পুরো দেশের জন্য অত্যন্ত গর্বের। এটি প্রমাণ করে যে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব, সম্মিলিত উদ্যোগ ও নিজস্ব সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অনন্য দৃষ্টান্ত গড়ে তোলা সম্ভব।’
সুন্দরবনের গাছপালার গঠন বদলে যাচ্ছে। মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে একসময় প্রভাবশালী সুন্দরী গাছের বিস্তার সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, লবণসহিষ্ণু গেওয়া ও গরানের উপস্থিতি বাড়ছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ সময়ে সুন্দরবনের ৫২ দশমিক ৮৯ শতাংশ চারা মারা গেছে। তবে টিকে থাকা চারাগুলোর বৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য। গবেষণার এ চিত্র সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম ও পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
Ecological Influences on Regeneration Dynamics in the Sundarbans, Bangladesh: Exploring Biotic and Abiotic Factors Across Time and Space শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ম্যানগ্রোভ সিলভিকালচার বিভাগের গবেষকেরা সুন্দরবনের বিভিন্ন লবণাক্ততা অঞ্চলে গাছের চারা, কিশলয় ও পূর্ণবয়স্ক গাছের অবস্থা বিশ্লেষণ করেন। গবেষণায় দেখা যায়, লবণাক্ততার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে চারার মৃত্যুহারও বেড়েছে।
লবণাক্ত এলাকায় চারার মৃত্যুহার ৮২ শতাংশের বেশি গবেষণায় সুন্দরবনের লবণাক্ততাকে চারার টিকে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কম লবণাক্ত এলাকায় চারার মৃত্যুহার ছিল ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। মাঝারি লবণাক্ত এলাকায় তা বেড়ে ৩৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং উচ্চ লবণাক্ত এলাকায় ৮২ দশমিক ৮৪ শতাংশে পৌঁছায়।
গবেষণায় গরান চারার মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি, ২২ দশমিক ৬৩ শতাংশ পাওয়া গেছে। সুন্দরীর ক্ষেত্রে এ হার ১৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অন্যদিকে, কাঁকড়া ও গেওয়া চারার মৃত্যুহার ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ১২ ও ১ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ সব প্রজাতি একইভাবে লবণাক্ততার প্রভাব মোকাবিলা করতে পারছে না। তবে টিকে থাকা চারাগাছের বৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এসব চারার বৃদ্ধির হার ছিল ২৩০ দশমিক ৩১ শতাংশ। কম লবণাক্ত এলাকায় কিশলয়ের বৃদ্ধি ৩০১ দশমিক ১ শতাংশ, মাঝারি লবণাক্ত এলাকায় ৯৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং উচ্চ লবণাক্ত এলাকায় ২৩২ শতাংশ পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, চারার মৃত্যু ও টিকে থাকা গাছের বৃদ্ধির তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেই বনের পুনর্জন্মের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে হবে।
চাঁদপাইয়ে সুন্দরী-গেওয়ার বিস্তার কমেছে সুন্দরবনের গাছের প্রজাতিগত পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে আরেকটি গবেষণায়। উবঃবপঃরড়হ ড়ভ কধহশৎধ ঞৎবব ঊীঢ়ধহংরড়হ রহ ঃযব ঘড়ৎঃযবৎহ ঝঁহফধৎনধহং শীর্ষক এ গবেষণায় স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে ১৯৮৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত খুলনা রেঞ্জের চাঁদপাই এলাকায় গাছের বিস্তারের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালে চাঁদপাই রেঞ্জে সুন্দরী ও গেওয়াপ্রধান এলাকার আয়তন ছিল ১৭ হাজার ৩২ হেক্টর। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১২ হাজার ২২ হেক্টরে। একই সময়ে ঘন কাঁকড়াগাছের বিস্তৃত এলাকা ১২১ হেক্টর থেকে বেড়ে ২ হাজার ১৬ হেক্টরে পৌঁছায়।
ঘনত্বের ভিত্তিতে বিশ্লেষণেও কাঁকড়ার বিস্তার বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া গেছে। উচ্চ ঘনত্বের এলাকায় কাঁকড়ার অংশ ১৯৮৮ সালের শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশে দাঁড়ায়। মাঝারি ঘনত্বের এলাকায় এ হার ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়। এ শ্রেণির কাঁকড়াপ্রধান এলাকার আয়তন ৫৩৯ হেক্টর থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৪১৮ হেক্টরে পৌঁছায়।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এই পরিবর্তন পুরো সুন্দরবনের চিত্র নয়। বাংলাদেশ স্পেস রিসার্চ অ্যান্ড রিমোট সেন্সিং অর্গানাইজেশনের (স্পারসো) মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি মূলত চাঁদপাই রেঞ্জের নির্দিষ্ট এলাকার পরিবর্তন তুলে ধরেছে। প্রায় ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনের মধ্যে চাঁদপাই রেঞ্জের আয়তন ২৭২ বর্গকিলোমিটার। ফলে একটি এলাকার তথ্য দিয়ে পুরো বনের প্রজাতিগত পরিবর্তন নির্ধারণ করা যাবে না।
মিঠাপানির প্রবাহ কমায় বাড়ছে ঝুঁকি বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ম্যানগ্রোভ সিলভিকালচার বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মোমিনুল ইসলাম নাহিদের মতে, সুন্দরবনে গেওয়া প্রায় সব এলাকাতেই কিছুটা বেড়েছে। লবণাক্ত এলাকায় গরান ও গেওয়ার উপস্থিতি বেশি হলেও সুন্দরী এখনো কম লবণাক্ত এলাকায় প্রধান প্রজাতি হিসেবে রয়েছে। তিনি বলেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছের টিকে থাকার পরিবেশ বদলে যাচ্ছে। উজান থেকে মিঠাপানি বনে পৌঁছাতে না পারলে লবণাক্ত পানি আরও ভেতরে প্রবেশ করে। এতে লবণসহিষ্ণু গাছ সুবিধাজনক পরিবেশ পায়, আর কম লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভরশীল প্রজাতি সংকটে পড়ে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, স্যাটেলাইটের তথ্যেও কাঁকড়ার বিস্তার বৃদ্ধি এবং সুন্দরীর দীর্ঘমেয়াদি পতনের চিত্র দেখা গেছে। সুন্দরী গাছের আগা শুকিয়ে যাওয়ার রোগও এ প্রজাতির ক্ষতির একটি কারণ। তাঁর মতে, ফারাক্কা বাঁধের পর মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, ছত্রাকের আক্রমণ এবং গাছের অনুপযোগী হয়ে ওঠা পরিবেশ—সবই সুন্দরীর সংকটে ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি জানান, সুন্দরীর আগামরা রোগে আক্রান্ত গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ১৯৯৮-৯৯ সালের দিকে। সে সময় আক্রান্ত গাছের পাশাপাশি সুস্থ গাছও কাটা পড়েছিল। বর্তমানে সংরক্ষণনীতির কারণে গাছ কাটা নিষিদ্ধ থাকলেও সুন্দরী পুনরুদ্ধারে পুনরায় রোপণ ও আবাসস্থল পুনর্বাসনের সম্ভাবনা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের চাপ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট—দুই ধরনের প্রক্রিয়ায় সুন্দরবনের লবণাক্ততা বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, হিমবাহ ও বরফ গলে যাওয়া, উজানে বাঁধ ও ব্যারাজের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা তৈরি হওয়ায় মিঠাপানির প্রবাহ কমছে। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়াও পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
তাঁর মতে, মিঠাপানির ওপর নির্ভরশীল গাছের প্রজাতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে তেলবাহী ট্যাংকার ও কয়লাবাহী জাহাজডুবির মতো দুর্ঘটনা সুন্দরবনের ওপর মানুষের সৃষ্ট চাপ আরও বাড়িয়েছে।
সুন্দরবন রক্ষায় প্রয়োজন পানির স্বাভাবিক প্রবাহ গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে স্পষ্ট, সুন্দরবনের পরিবর্তন শুধু গাছের প্রজাতি বদলে যাওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পানির প্রবাহ, লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের কর্মকাণ্ড। সুন্দরী কমে যাওয়ার বিপরীতে গেওয়া ও গরানের বিস্তার বৃদ্ধি বনের অভিযোজনের একটি দিক হলেও একে সামগ্রিক পরিবেশগত সুস্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।
স্পারসোর গবেষক মাহমুদুর রহমানের মতে, সুন্দরবনের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রকে নিজের মতো চলতে দেওয়া এবং আগের মতো পানির প্রবাহ বজায় রাখা জরুরি। বনকে কৃত্রিমভাবে পরিচালনার চেষ্টা না করে উজান থেকে মিঠাপানি আসছে কি না, নদীর প্রবাহে কী পরিবর্তন ঘটছে এবং অন্য কোন কোন কারণে গাছের প্রজাতিগত ভারসাম্য বদলাচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় বিস্তৃত, যার আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, পশুর, ধুন্দল, বাইন, কাঁকড়া ও কেওড়াসহ নানা প্রজাতির গাছ এই বনের জীববৈচিত্র্য গড়ে তুলেছে। এসব প্রজাতির টিকে থাকা নির্ভর করছে তাদের উপযোগী পরিবেশ কতটা বজায় থাকছে, তার ওপর।
বগুড়ার ধুনট উপজেলার মাদক মামলায় চার বছরের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মাসুদ মিয়াকে (৫৫) দীর্ঘ ২০ বছর পর গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গতকাল শনিবার (২৪ অক্টোবর) গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ধুনট থানা-পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। আজ রোববার বেলা ১১টার দিকে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে বগুড়া জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার মাসুদ মিয়া ধুনট উপজেলার নিমগাছি ইউনিয়নের বেড়েরবাড়ি বুড়িভিটা গ্রামের বুলু মিয়ার ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালে মাদকদ্রব্য বিক্রির সময় তৎকালীন শাহজাহানপুর থানা-পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন মাসুদ মিয়া। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে জননিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে বগুড়ার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আদালত ২০০৬ সালে উক্ত মামলায় মাসুদ মিয়াকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।
তবে রায় ঘোষণার আগেই মাসুদ মিয়া উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে আত্মগোপনে চলে যান। এর পর থেকে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তিনি ছদ্মবেশে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় পলাতক ছিলেন।
ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে সাজা এড়িয়ে পলাতক থাকা আসামি মাসুদ মিয়াকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আজ আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে বগুড়া জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।