কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মার পানি দ্রুত বাড়ায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার ৫০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট ও যোগাযোগপথ। অনেক এলাকায় নৌকা ছাড়া চলাচলের উপায় নেই। পানিতে রোপা আমন, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল তলিয়ে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে ফারাক্কা হয়ে নেমে আসা ঢলের কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মার পানি বাড়ছে। শুক্রবার সকাল ৯টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয় ১৩ দশমিক ০২ মিটার। ওই পয়েন্টে বিপদসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। অর্থাৎ বিপদসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে এ পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১২ দশমিক ৮৮ মিটার। ১৮ ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ১৪ সেন্টিমিটার।
উপজেলার ভাগজত পয়েন্টেও পানি দ্রুত বাড়ছে। শুক্রবার সকাল ৯টায় সেখানে পানির উচ্চতা ছিল ১৪ দশমিক ৯০ মিটার। বিপদসীমা ১৫ দশমিক ৫২ মিটার। পাউবো জানিয়েছে, এ পয়েন্টে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে নিম্নাঞ্চলের পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার ফসলি জমিতে পানি ঢুকে রোপা আমন, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, ‘নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে।’
চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট ও যোগাযোগপথ পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও তার চেয়েও বেশি পানি পেরিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অনেক এলাকার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, নারী ও বয়স্করা।
বসতবাড়ির আশপাশে পানি ঢুকে পড়ায় গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন মানুষ। দেখা দিয়েছে গো-খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের আশঙ্কা।
পানি বৃদ্ধিতে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ১৬টি প্রাথমিক ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ বলেন, ‘পানি বৃদ্ধির কারণে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ কারণে বন্যাকবলিত এলাকার ১৮টি বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে বিদ্যালয় ভবনগুলো খোলা থাকবে, যাতে বন্যায় গৃহহীন মানুষ সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন।’
পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি কয়েকটি এলাকায় নদীভাঙন শুরু হওয়ায় নদীতীরবর্তী মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। চিলমারী ইউনিয়নের উদয়নগরসহ কয়েকটি এলাকায় পদ্মার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, ‘উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পদ্মার পানি বেড়ে ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন। মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।’
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদদৌলা বলেন, ‘উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মার পানি বাড়ছে। তবে আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে বন্যার পানি কমতে শুরু করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, ‘বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতির নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।’ তিনি জানান, পানিবন্দী মানুষের সহযোগিতা ও নিরাপত্তায় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ত্রাণ সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে চিলমারী ইউনিয়নের অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মধ্যে সীমিত পরিসরে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
