তারেক রহমান সরকারের আট মাস: চালের দাম থেকে জুলাই সনদ, কী বদলাল, কী বদলায়নি

আট মাসে ফ্যামিলি কার্ড, ১৫ টাকার চাল ও কৃষিঋণ মওকুফের মতো উদ্যোগ নিয়েছে তারেক রহমানের সরকার; তবু মূল্যস্ফীতি, লোডশেডিং ও জুলাই সনদ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

টাঙ্গাইলের পৌর উদ্যানে কৃষি মেলার একটি স্টল ঘুরে দেখছেন লাল-সবুজ টুপি পরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রতিবেদন:

·

,

প্রতি মাসে ৫৫ লাখ পরিবার ১৫ টাকা কেজি দরে চাল পাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে দেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। তারেক রহমানের সরকারের আট মাসের হিসাব এই দুই সংখ্যার মাঝখানে।

৫৫ লাখ পরিবার ১৫ টাকা কেজিতে চাল পায়, তবু সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮.৩৪ শতাংশ (সূত্র: খাদ্য মন্ত্রণালয়, বিবিএস)
গ্রাফিক: বিডি গ্লোবাল টাইমস

নির্বাচন কমিশনের গেজেট অনুযায়ী, ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন সরকার। অন্যদিকে, ৬৮টি আসন নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছয়টি আসনে জয়লাভ করে সংসদে প্রবেশ করে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আসন: বিএনপি ২০৯, জামায়াতে ইসলামী ৬৮, স্বতন্ত্র ৭, অন্যান্য ৭, এনসিপি ৬, গেজেটের বাইরে ৩ (সূত্র: নির্বাচন কমিশনের গেজেট)
গ্রাফিক: বিডি গ্লোবাল টাইমস

গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচিত এই সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল সংস্কার, অর্থনৈতিক স্বস্তি ও কর্মসংস্থান।

কিন্তু আট মাস পর প্রশ্ন উঠছে, জনগণের এই প্রত্যাশা পূরণে সরকার কতটা এগোতে পেরেছে? সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ কি সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারছে, নাকি প্রত্যাশার চাপই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে?

সামাজিক নিরাপত্তা ও কৃষিতে নতুন উদ্যোগ

সরকারের প্রথম দিকের উদ্যোগের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড অন্যতম। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নিম্নআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্বাচিত পরিবারগুলোর জন্য মাসিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।

অন্যদিকে, কৃষক কার্ডের লক্ষ্য কৃষকদের সরকারি ভর্তুকি, কৃষি উপকরণ, ঋণ, ফসলবিমা ও অন্যান্য কৃষিসেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা। মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকের কাছে সরাসরি সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

ইশতেহারের ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড: দুটিই পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে
গ্রাফিক: বিডি গ্লোবাল টাইমস

এ ছাড়া প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সরকার। কৃষকদের ঋণের বোঝা কমিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সুযোগ তৈরি করাই এর লক্ষ্য।

কৃষি ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিভিন্ন অঞ্চলে খাল পুনঃখননের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সেচসুবিধা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সরকারি ব্যয় কমানো ও জবাবদিহির প্রশ্ন

সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগও সরকারের প্রথম কয়েক মাসের আলোচিত পদক্ষেপগুলোর একটি। সরকারি সফরে প্রতিনিধিদলের আকার ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর চেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আপ্যায়ন ব্যয় সংকোচন এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে জাঁকজমক কমানোর উদ্যোগকে সরকারি অর্থের সাশ্রয়ের প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর দুপুরের খাবার ও বিকেলের নাশতার বরাদ্দ ১৫০ টাকায় নামিয়ে আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বাজেট-পরবর্তী সংসদের বার্ষিক নৈশভোজ বাতিল করে প্রায় ৫০ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে।

খাদ্যনিরাপত্তা ও জনসেবায় অগ্রগতি

নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্পমূল্যে চাল বিতরণের কর্মসূচি চালু রেখেছে সরকার। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৪৯৫টি উপজেলার প্রায় ৫৫ লাখ পরিবার বছরে ছয় মাস (আগস্ট থেকে নভেম্বর এবং মার্চ-এপ্রিল) প্রতি মাসে ১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি চাল পাচ্ছে।

শিক্ষাখাতেও কয়েকটি উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুনর্ভর্তি ফি আদায় করলে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা, বিভিন্ন পর্যায়ের বৃত্তির অর্থ দ্বিগুণ করা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গ্যারান্টর ছাড়া সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ এর মধ্যে রয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে ৮০ শতাংশ নারী নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জরুরি টিকাদান কার্যক্রমও পরিচালনা করেছে সরকার।

সামাজিক অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসেবে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য মেট্রোরেল ও ট্রেনের ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড় দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এ ধরনের সুবিধা বাস্তবায়িত হলে নিয়মিত যাতায়াতের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি গণপরিবহন ব্যবহারে তাঁদের সুযোগ বাড়তে পারে।

কর্মসংস্থান ও বিদেশে শ্রমবাজার

তরুণদের কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চার লাখ ৬৮ হাজারের বেশি শূন্য পদ রয়েছে (২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হিসাব)। এসব পদ পূরণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।

বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা ও সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা এবং ইউরোপসহ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। দক্ষ ও আধা দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, প্রতারণা এবং শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। নতুন শ্রমবাজার তৈরি হওয়ার পাশাপাশি কর্মীরা নিরাপদ ও ন্যায্য শর্তে কাজ করতে পারছেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, আমদানি অব্যাহত রাখা এবং সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এ ছাড়া বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদ শনাক্ত করার উদ্যোগও সরকারের আলোচনায় এসেছে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২১ এপ্রিল সংসদে জানান, আদালতের আদেশে এস আলম গ্রুপের চার হাজার ২৬৪ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। তবে সম্পদ জব্দ করা এবং পাচার হওয়া অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে আনা এক বিষয় নয়। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অর্থ পুনরুদ্ধার, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে অর্থ পাচার প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।

সরকারের কার্যক্রম ও সামগ্রিক মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি এম এ রাকিব বিডি গ্লোবাল টাইমসকে বলেন, “বিগত ১৭ বছরের দুর্নীতি ও অনিয়মের ফলে রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। কৃষিকার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা এবং ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।”

দ্রব্যমূল্য: সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ

সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ রয়ে গেছে। নিম্নআয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্যও মাসিক আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছে। চাল, মুরগি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য পারিবারিক বাজেটে চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ০২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন: সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিতরণের মতো উদ্যোগের সুফল কি বাজারের উচ্চমূল্যের চাপ সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট? নিম্নআয়ের পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি বাজার তদারকি, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অসাধু মজুতদারি ও কারসাজি নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে জনজীবন

বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিদ্যুৎ ঘাটতি নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শহরাঞ্চলের বিভিন্ন শিল্পকারখানার উৎপাদনও বিদ্যুৎ সমস্যায় ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

৮ অক্টোবর ৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ ছিল এবং লোডশেডিং প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি ও গ্যাসের ঘাটতি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস সরবরাহের সংকট। বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের অভাবে রান্নাবান্নায় সমস্যার অভিযোগ রয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা পরিবহন খাতেও প্রভাব ফেলছে।

আইনশৃঙ্খলা ও দলীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকা

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনাও রয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলদারি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সরকারদলীয় কিছু নেতাকর্মী এবং ছাত্রদল ও যুবদলের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দলীয়ভাবে অনেক নেতাকর্মীকে বহিষ্কারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বহিষ্কারই সমস্যার সমাধান নয়। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতা

সরকারের সমালোচনা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তি বা আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে কয়েকজনকে আটক ও গ্রেপ্তারের ঘটনা আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

কুষ্টিয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মন্তব্যের অভিযোগে এক শিক্ষককে আটকের পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী নিজেই দিয়েছিলেন বলে তাঁর কার্যালয় জানিয়েছে।

ঘটনাটি একদিকে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, অন্যদিকে প্রশ্ন তোলে মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে কেন ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হবে? কোনো বক্তব্য আইন লঙ্ঘন করেছে কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়াই হওয়া উচিত প্রধান ভিত্তি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের সমালোচনা করার অধিকার গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হুমকি, সহিংসতায় উসকানি বা আইনত দণ্ডনীয় কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও আইনানুগ ব্যবস্থা প্রয়োজন। এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা বজায় রাখাই সরকারের দায়িত্ব।

জুলাই সনদ ও গণভোটের রায়

গণভোটের রায় এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রস্তাবিত সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়া হয়।

সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ছিল ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠনের মাধ্যমে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদব্যবস্থা চালু, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা নির্ধারণ, নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি এবং বিচার বিভাগ ও সংসদের জবাবদিহি শক্তিশালী করা। নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনি ফলাফল অনুযায়ী, গণভোটে ৬০ শতাংশ ভোটার অংশ নেন এবং ৬৮ দশমিক ২৬ শতাংশ ভোটার সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন।

যে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করেছে, একই নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে বিলম্ব বা অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তা রাজনৈতিক প্রশ্নের জন্ম দেওয়াই স্বাভাবিক। বিরোধী দল ও সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের সামনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে: গণভোটের রায়ের প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গীকার বজায় রাখা এবং সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণকে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া। কোন সংস্কার কখন, কীভাবে এবং কোন আইনি প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকলে অনিশ্চয়তা কমবে।

রাজনীতি বিশ্লেষক সর্দার আব্বাস রানা বিডি গ্লোবাল টাইমসকে বলেন, “বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করে অধস্তন আদালত স্বাধীন ও সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয়কে আরও শক্তিশালী করার কথা বলেছিল, কিন্তু সরকার গঠন করেই ড. ইউনূসের সময় গঠিত সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় বিলুপ্ত করে দেয়। ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কারের কথা বলেছে, কিন্তু এখন সংবিধান সংশোধনের চেষ্টা করছে এবং দাবি করছে, সংশোধনকেই নাকি সংস্কার বলা যাবে। গুম প্রতিরোধের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন (আইসিপিপিইডি) অনুসরণ করার কথা ইশতেহারে বলা হয়েছে, কিন্তু বিএনপির প্রস্তাবিত আইনের খসড়া সেটি অনুসরণ করে না।”

নিয়োগে নিরপেক্ষতার প্রশ্ন

সরকারের বিভিন্ন নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দেশের সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রশাসক হিসেবে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এসব নিয়োগের মাধ্যমে বিএনপির নেতাকর্মীদের স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত বা দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া ব্যক্তিদেরও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

একই ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ নিয়েও। বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় সমালোচনা হয়েছে। তাঁদের কারও কারও অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হলে নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়লে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, গবেষণা ও অভিজ্ঞতা বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।

অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: কতটা ধারাবাহিক হবে?

দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া কিছু পদক্ষেপও আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে ঘিরে সৃষ্ট ঘটনায় সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়লে প্রধানমন্ত্রী ১৮ অক্টোবর তাঁকে ডেকে পদত্যাগ করতে বলেন; পরদিন ১৯ অক্টোবর তিনি পদত্যাগ করেন।

অন্যদিকে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও দখলের চেষ্টার ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম আলোচনায় আসে। এ ঘটনায় তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে বিবিসি বাংলাকে জানান প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী। ১ অক্টোবর তিনি পদত্যাগ করেন। বিবিসি বাংলা জানায়, মিষ্টি শুরু থেকেই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

ঘটনাটি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের অবস্থান মূল্যায়নের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে। তবে বিচ্ছিন্ন ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি চাঁদাবাজি, দখলদারি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগের ক্ষেত্রেও ধারাবাহিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।

প্রত্যাশা পূরণের আসল পরীক্ষা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারের উদ্যোগের মূল্যায়ন কেবল ঘোষণার সংখ্যা দিয়ে করা যাবে না। ফ্যামিলি কার্ড কতটি পরিবারকে বাস্তব সহায়তা দিচ্ছে, কৃষক কার্ড কতটা কার্যকর হচ্ছে, শূন্য পদ পূরণে কতজন চাকরি পাচ্ছেন, জ্বালানি সংকট কতটা কমছে এবং অনিয়মের অভিযোগে কতটা নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তরই সরকারের প্রকৃত অগ্রগতি তুলে ধরবে।

শেষ পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সাফল্য নির্ধারিত হবে কতগুলো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে, তা দিয়ে নয়; বরং সাধারণ মানুষের জীবন কতটা সহজ হয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা নিরপেক্ষ হয়েছে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা দিয়ে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণের প্রকৃত পরীক্ষা এখন সেখানেই।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ