জুলাই সনদ

  • সংবিধান সংশোধন ছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়: রিজভী

    সংবিধান সংশোধন ছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়: রিজভী

    বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সংবিধান সংশোধন ছাড়া জুলাই সনদের সব বিষয় বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

    শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর মান্ডা হায়দার আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে বরেণ্য রাজনীতিবিদ মরহুম শামসুল হুদার স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মুগদা থানা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের উদ্যোগে এ স্মরণসভার আয়োজন করা হয়।

    তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। সংবিধানের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে যেসব বিষয়ে সংশোধন প্রয়োজন, সেগুলো জাতীয় সংসদের মাধ্যমেই করতে হবে। কিন্তু বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের পথে না গিয়ে নিজেদের দাবি চাপিয়ে দিতে চাইছে।

    খুলনায় বিরোধী দলের লংমার্চ কর্মসূচির সমালোচনা করে রিজভী বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আপনাদের সংসদে ডাকা হয়েছে। আপনারা আসুন, আমরা একসঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করি। কিন্তু তারা সংবিধান সংশোধন না করেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায়। সংবিধানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে সংশোধনের মাধ্যমেই তা করতে হবে।

    তিনি বলেন, সংবিধান স্বাধীনতার পর প্রণীত হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে এর সংশোধন হয়েছে। জুলাই সনদের যেসব বিষয় সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলো বাস্তবায়নে সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন। আর যেসব বিষয়ে সাধারণ আইন প্রণয়ন করলেই হবে, সেগুলো জাতীয় সংসদে আইন পাশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

    প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে রিজভী বলেন, দেশের অর্থনীতি গতিশীল করতে প্রধানমন্ত্রী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ানোর পাশাপাশি বিদেশ সফরের মাধ্যমে বিনিয়োগ, ঋণ, অনুদান ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন। চীন ও জাপান সফরে বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতার মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

    তিনি আরও বলেন, জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রী টয়োটার প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করেছেন। বাংলাদেশে টয়োটার কারখানা স্থাপন ও গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

    সরকারের ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দরিদ্র পরিবারের হাতে মাসে আড়াই হাজার টাকা পৌঁছালে তারা হাঁস-মুরগি পালনসহ ছোট ছোট আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারবে। এতে দারিদ্র্য কমার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।

    দেশের গ্যাস ও জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়েই জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পড়েছে।

    রিজভী বলেন, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য কি বিএনপি সরকার দায়ী? এর জন্য কি তারেক রহমান দায়ী? বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। তারপরও প্রধানমন্ত্রী বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস ও জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

    তিনি বলেন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে দেশের কলকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানার কার্যক্রম সচল রাখা যায়। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিরও উন্নতি হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

    বিরোধী দলের উদ্দেশে রিজভী বলেন, অপপ্রচার ও রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না। বিএনপি সত্য, ন্যায় ও জনগণের কল্যাণের রাজনীতি করে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ অনুসরণ করেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশ পরিচালনা করছেন।

    স্মরণসভায় মরহুম শামসুল হুদার রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ করে রিজভী বলেন, তিনি ছিলেন একজন আদর্শবান, সাহসী ও সংগ্রামী রাজনীতিবিদ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে দলীয় আদর্শের প্রতি অবিচল ছিলেন। তার মতো নিবেদিতপ্রাণ নেতাদের অবদান বিএনপি সব সময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

    ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক লিটন মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ছিলেন ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় ও সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব।

    অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মুগদা থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নাজমুল হোসেন প্যারট ও মাসুদ হোসেন।

  • সংস্কারের গণভোট বাস্তবায়নের পথ নিয়ে বিএনপি ও বিরোধীদের বিরোধ

    সংস্কারের গণভোট বাস্তবায়নের পথ নিয়ে বিএনপি ও বিরোধীদের বিরোধ

    জাতীয় নাগরিক পার্টি ৩০ অক্টোবরের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী অভিযোগ করেছে, বাংলাদেশের সরকার ফেব্রুয়ারির সংস্কারের গণভোটের রায় প্রত্যাখ্যান করছে। বিএনপি সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের খসড়া করছে। বিরোধীরা চাইছে বাস্তবায়ন আদেশে বর্ণিত সংস্কার পরিষদ।

    সংশোধনী কারা লিখবে এবং কোন অঙ্গীকারগুলো বহাল থাকবে, তা নিয়েই মতভেদ। সরকার বলছে, সংবিধানের অধীনে সংসদকেই কাজ করতে হবে। জামায়াত ও এনসিপি বলছে, গণভোটের রায় অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে আলাদা পরিষদ গঠন করতে হবে।

    জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই জাতীয় সনদে সই করছেন মুহাম্মদ ইউনূস, ১৭ অক্টোবর ২০২৫। ছবি: তথ্য অধিদপ্তর, উইকিমিডিয়া কমন্স।

    সংক্ষেপে

    • ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে বৈধ ভোটের প্রায় ৬৮ শতাংশ জুলাই জাতীয় সনদের সাংবিধানিক প্রস্তাবের পক্ষে পড়ে। একই দিনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়।
    • বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও ১৮০ কার্যদিবসের মেয়াদের কথা ছিল। বিএনপির সংসদ সদস্যরা পরিষদের শপথ নেননি। পরিষদ কখনো বসেনি। মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার যে হিসাব প্রকাশিত হয়েছে, তা নির্ভর করছে মেয়াদ কখন শুরু হয়েছে, সে বিষয়ে বিতর্কিত একটি ব্যাখ্যার ওপর।
    • স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ১২ সদস্যের সংসদীয় সংশোধনী কমিটির সভাপতি। জামায়াত ও এনসিপি এতে যোগ দিতে অস্বীকার করেছে। মন্ত্রী বলেছেন, ডিসেম্বরে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বিল আসতে পারে।
    • কমিটি বিলুপ্তি, পরিষদ গঠন এবং স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এনসিপি ৩০ অক্টোবর ঢাকার শাহবাগে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
    • তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের জন্য গণভোটের সুরক্ষাও বিবেচনা করছে সরকার। কমিটির কাজের মাধ্যমে প্রস্তাবিত এই সুরক্ষা এখনো আইনে পরিণত হয়নি।

    একই দিনে দুটি ভোট

    ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর এই সনদ তৈরি হয়। অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসন শেষ হয়। জাতিসংঘের হিসাবে, সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে সনদ নিয়ে আলোচনা করে। রাজনৈতিক দলগুলো ১৭ অক্টোবর ২০২৫ এতে সই করে। সনদের ৮৪ প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কার। এর মধ্যে রয়েছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা, রাষ্ট্রপতির নিয়োগক্ষমতায় পরিবর্তন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সুরক্ষা।

    ১২ ফেব্রুয়ারি ফল ঘোষিত ২৯৭ সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি জেতে ২০৯টিতে। সংসদে সরাসরি নির্বাচিত ৩০০টি এবং নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৫০টি আসনের বিধান আছে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশোধনীর জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন সরকার ও তার মিত্রদের রয়েছে।

    ভোটাররা গণভোটের প্রস্তাবও সমর্থন করেন। প্রথম গেজেটে প্রায় ৪ কোটি ৮২ লাখ ‘হ্যাঁ’ ও ২ কোটি ২১ লাখ ‘না’ ভোট ছিল। ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখের সংশোধিত গেজেটে, যা নিয়ে পরদিন খবর প্রকাশিত হয়, প্রায় ৪ কোটি ৭২ লাখ ‘হ্যাঁ’ এবং ২ কোটি ২০ লাখ ‘না’ ভোট ছিল। বৈধ ভোটের আনুমানিক দুটি মোটের মধ্যে পার্থক্য প্রায় ১১ লাখ। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও বসবেন, এমন একটি প্রক্রিয়ার পক্ষে রায় দিয়েছিল ওই ভোট।

    সংসদ সদস্যদের শপথের আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি এনসিপি সনদে সই করে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের সংসদ সদস্যরা সংসদ ও পরিষদের দুটি শপথই নেন। বিএনপির সদস্যরা শুধু সংসদের শপথ নেন। দলটির বক্তব্য, পরিষদের দ্বিতীয় শপথের সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।

    পরিষদ ও মেয়াদ শুরুর বিতর্ক

    ৩১ মার্চ সালাহউদ্দিন সংসদে বলেন, বাস্তবায়ন আদেশ শুরু থেকেই অবৈধ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এপ্রিলে প্রতিশ্রুতি দেন, ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে সংসদের মাধ্যমে সনদের “প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি লাইন ও প্রতিটি বিধান” বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের অবস্থান হলো, গণভোট নিজে সংবিধান সংশোধন করেনি; সাংবিধানিক পরিবর্তন সংসদের মাধ্যমেই করতে হবে।

    প্রস্তাবিত ১০০ আসনের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব এবং একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান থাকা নিষিদ্ধ করার বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত জানিয়েছিল। তারেক দুই পদেই আছেন। জাতীয় ভোটের অনুপাতের বদলে সংসদে আসনের শক্তি অনুযায়ী উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন চায় বিএনপি। গণভোটে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব সমর্থন পেলেও দলটির নথিভুক্ত আপত্তি দূর হয়নি।

    নাটশেল টুডের ১৭ অক্টোবরের সম্পাদকীয়তে হিসাব করা হয়, সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার দিন ১২ মার্চ থেকে গণনা করলে পরিষদের ১৮০ কার্যদিবসের মেয়াদ প্রায় ১০ ডিসেম্বর শেষ হবে। সম্পাদকীয়তে বিপরীত ব্যাখ্যাও ছিল: পরিষদ কখনো বসেনি বলে এর সময় গণনাই শুরু হয়নি। সেখানে ১৪২ দিন পার হওয়া ও ৩৮ দিন বাকি থাকার হিসাবটি ১৭ অক্টোবরের গণনা; ২৭ অক্টোবরের চলতি হিসাব নয়।

    ওই সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়, পরিষদ নির্ধারিত সময় পার করলে সংস্কারগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হওয়ার একটি বিধান চূড়ান্ত আদেশে বাদ দেওয়া হয়েছিল। প্রস্তাবিত পরিষদ কখনো বৈঠকে বসেনি।

    কমিটির কাজের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন

    জুলাইয়ে সংসদ সালাহউদ্দিনের সভাপতিত্বে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠন করে। জামায়াত ও এনসিপি এতে অংশ নিতে অস্বীকার করে। সালাহউদ্দিন বিরোধীদের প্রস্তাব আহ্বান করেছেন এবং সেগুলো বিবেচনা করা হবে বলেছেন।

    কমিটির সপ্তম বৈঠক, ১৩ অক্টোবরের আলোচনায়, বিশেষজ্ঞরা সংবিধান সংশোধনে বিচার বিভাগের এখতিয়ার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্প ব্যবস্থা এবং উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে মত দেন। ওই আলোচনা পরবর্তী শনিবার, ২৪ অক্টোবরের বৈঠক থেকে আলাদা।

    কমিটির কাজে নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এনসিপি। দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন ১৭ অক্টোবর বলেন, ইশতেহারভিত্তিক পদক্ষেপের অনুমতি দেওয়া নোটটি ঐকমত্য কমিশনের চূড়ান্ত খসড়ায় ছিল না। তাঁর অভিযোগ, সইয়ের দিন সরকারপক্ষের একজন প্রতিনিধি আলোচনা ছাড়াই সেটি যোগ করেন। সনদের পাঠ প্রস্তুত করা নিয়ে এটি এনসিপির অভিযোগ।

    সালাহউদ্দিন বলেছেন, কমিটি ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে চায় এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বিল আসতে পারে। সুপারিশের ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় বিলের খসড়া করবে। এই সময়সূচি এখনো একটি পরিকল্পনা; সংসদে পাস হওয়া সংশোধনী নয়।

    বিক্ষোভে যাচ্ছে বিরোধীরা

    জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সোমবার তারেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, যে গণভোটে তিনি নিজে ভোট দিয়েছেন, এখন তার ফল প্রত্যাখ্যান করছেন। পরওয়ার বলেন, একই দিনে দুটি ভোট হলেও সরকার একটির ফল মানছে, অন্যটি প্রত্যাখ্যান করছে। তিনি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান।

    এনসিপি ৩০ অক্টোবর বেলা ৩টায় শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিক্ষোভ ঘোষণা করেছে। সংসদীয় কমিটি বিলুপ্ত করে পরিষদ গঠনের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর পদত্যাগ চায় দলটি। মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দাবির কারণ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানির ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ বাড়ার কথা বলছে তারা।

    গণভোটের সুরক্ষার প্রস্তাব

    সালাহউদ্দিন বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের জন্য গণভোটের শর্ত বিবেচনা করছে সরকার। এই ব্যবস্থায় নিরপেক্ষ প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন হয়। প্রস্তাবিত সুরক্ষা ভবিষ্যৎ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার পক্ষে ব্যবস্থাটি বাতিলের ক্ষমতা সীমিত করবে।

    মন্ত্রী আরও বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর বিরুদ্ধে আদালতের রায়ের পর ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোটের বিধান ফিরে এসেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবনা বা অন্য কিছু সুরক্ষিত বিধানে সংশোধনী আনলে রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে গণভোট লাগবে। সরকারের প্রস্তাবিত সংস্কারে এই দাবির প্রয়োগ নির্ভর করবে বিলের প্রকৃত বিধানগুলোর ওপর। এই প্রতিবেদনে বর্ণিত পর্যায়ে এমন কোনো বিল উত্থাপিত হয়নি।

    সরকার সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংশোধনীর প্রস্তুতি নিচ্ছে। জামায়াত ও এনসিপি পরিষদের দাবি বহাল রেখেছে। কমিটির পরিকল্পিত ডিসেম্বরের প্রতিবেদনের আগে এনসিপির পরবর্তী ঘোষিত বিক্ষোভ ৩০ অক্টোবর।

    এরপর কী

    • এনসিপির শাহবাগের বিক্ষোভ ৩০ অক্টোবর বেলা ৩টায় হওয়ার কথা।
    • কমিটি ডিসেম্বরে প্রতিবেদন শেষ করতে চায়। সালাহউদ্দিন বলছেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বিল উত্থাপিত হতে পারে।
    • পরিষদের মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার যেকোনো হিসাবই বিতর্কিত শুরুর তারিখের ওপর নির্ভরশীল। ১৭ অক্টোবরের অনুমিত হিসাব দিয়ে অবিতর্কিত আইনি মেয়াদসীমা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
    • বিলের বিষয়বস্তু ও পরবর্তী কোনো আইনি রায় নির্ধারণ করবে, গণভোট ও সংশোধনীর কোন প্রশ্নগুলো বাস্তবে উঠবে।
  • স্বাধীনতার পর প্রথমবার: সংসদে বিরোধী দলের নেতৃত্বে জামায়াত

    স্বাধীনতার পর প্রথমবার: সংসদে বিরোধী দলের নেতৃত্বে জামায়াত

    ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা। স্বাধীনতার পর দলটির সংসদীয় বিরোধী দলের নেতৃত্বে আসা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।

    তবে বিরোধী দলের নেতৃত্ব পাওয়া আর কার্যকর বিরোধী ভূমিকা পালন করা এক বিষয় নয়। আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয়ের তদারকি, সাংবিধানিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক সংলাপের ক্ষেত্রে জামায়াতের ভূমিকা কতটা কার্যকর হবে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

    জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংসদীয় বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর Role of Opposition in Bangladesh Politics (UPL, 1998) বইটি এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

    এক নজরে
    • ত্রয়োদশ সংসদে প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী।
    • ৫০টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে মাত্র একটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলের হাতে।
    • জুলাই থেকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলের পাঁচটি আসন শূন্য।
    • পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির সভাপতি জামায়াতের সংসদ সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।

    ঐতিহাসিক পটভূমি

    আপনি Role of Opposition in Bangladesh Politics (UPL, 1998) বইটি লিখেছিলেন। জামায়াতে ইসলামী প্রথমবারের মতো বিরোধী দলের নেতৃত্বে থাকা এই সংসদে নতুন কী দেখা যাচ্ছে, আর পুরোনো কোন প্রবণতাগুলো ফিরে আসছে?

    ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর বিরোধী দলের ভূমিকা গ্রহণ বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো দলটি সংসদীয় বিরোধী দলের নেতৃত্বে এসেছে। একে প্রচলিত রাজনৈতিক বিন্যাসের পরিবর্তনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রবণতার ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা যায়। ২০১৩–১৪ সালের পর বিভিন্ন আইনি ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হওয়ায় ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতের সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব ছিল না। ২০২৬ সালে বিরোধী দলের নেতৃত্বে আসা তাই দলটির রাজনৈতিক পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি দৃষ্টান্ত। একই সঙ্গে, রাজনৈতিক জোটের অংশীদার থেকে প্রধান সংসদীয় বিরোধী শক্তিতে রূপান্তরও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি এবং ২০০১ সালে ১৭টি আসন পায়। ২০০১ সালে দলটি বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অংশ হয় এবং দুই নেতা মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৬ সালে বিএনপি ও জামায়াত সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের পৃথক অবস্থানে রয়েছে। তরুণ ও শহুরে ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের সমর্থন বা গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেখা গেলেও এই পরিবর্তনের স্থায়িত্ব বুঝতে আরও নির্বাচন ও নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ প্রয়োজন।

    প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতকে এখন সাংবিধানিক সংস্কার, সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও সংসদীয় নজরদারি নিয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হচ্ছে। জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়নও দলটির প্রধান দাবিগুলোর অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরোনো সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার প্রবণতাও রয়েছে। বিএনপি ও জামায়াত বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনে সহযোগিতা করলেও সময়ের সঙ্গে তাদের স্বার্থ ও কৌশলে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বর্তমান সংসদীয় বিন্যাস সেই সম্পর্কের নতুন পর্যায় নির্দেশ করে।

    সংসদে জামায়াতে ইসলামী

    • ১৯৯১ ১৮টি আসন।
    • ২০০১ ১৭টি আসন; বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অংশ, মন্ত্রিসভায় দুই নেতা।
    • ২০১৪ ও ২০১৮ সংসদে প্রতিনিধিত্ব ছিল না।
    • ২০২৬ প্রধান বিরোধী দলের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী।

    “স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো এ দল সংসদীয় বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করছে, যা দেশের বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোয় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।”

    — অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান

    সংসদে ও রাজপথে বিরোধী রাজনীতি

    বিরোধী দল ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতির ভাষণ এবং ৬ সেপ্টেম্বর দুটি বিল নিয়ে ওয়াকআউট করেছে। জুলাই থেকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলের পাঁচটি আসনও শূন্য রয়েছে। কখন বর্জন বৈধ রাজনৈতিক চাপ, আর কখন তা সংসদকে দুর্বল করে?

    সংসদীয় ওয়াকআউট প্রক্রিয়াগত অন্যায়ের প্রতিবাদে সীমিত সময়ের জন্য ব্যবহৃত হলে কার্যকর রাজনৈতিক চাপ হতে পারে। কিন্তু এটি নিয়মিত বিরোধিতার প্রধান কৌশল হয়ে উঠলে সংসদীয় বিতর্ক ও প্রতিনিধিত্বমূলক ভূমিকা দুর্বল হয়। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় বিরোধী সদস্যদের ওয়াকআউট ছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদের একটি উদাহরণ। জুন মাসে বিল উত্থাপন ও পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপনের সুযোগ নিয়ে আপত্তির পরও বিরোধী সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের সংশোধিত সংস্করণ নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তি আরও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। তাদের দাবি ছিল, সংশোধিত সংস্করণে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দুর্বল হয়েছে। বিরোধী সদস্যরা সংসদ ত্যাগ করার পরও বিল দুটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। ১৩ জুলাই গঠিত বিশেষ সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি আসন রাখা হলেও কমিটির কাঠামো ও কার্যপ্রণালি নিয়ে আপত্তির কারণে জামায়াত ও তার জোটসঙ্গীরা সদস্য মনোনয়ন দেয়নি। এসব ঘটনা দেখায়, ওয়াকআউট জনমনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে; কিন্তু সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে দীর্ঘস্থায়ী অনুপস্থিতি বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা সীমিত করে।

    “বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতি এখনও সংসদীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজপথের রাজনৈতিক আন্দোলনের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।”

    — অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান

    ক্ষমতাসীন দল স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদে রয়েছে এবং ৫০টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে ৪৮টির সভাপতিত্ব করছে। বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত সরকারের বিরোধী দলকে প্রকৃত ভূমিকা দেওয়ার জন্য কী করা উচিত?

    সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার গঠনের অর্থ এই নয় যে সংসদীয় কাঠামোতে বিরোধী দলের ভূমিকা সীমিত থাকবে। ১০ সেপ্টেম্বর ৫০টি স্থায়ী কমিটি গঠনের পর মাত্র একটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলের হাতে ছিল।

    সরকার সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্ব আরও ভারসাম্যপূর্ণভাবে বণ্টন করে বিরোধী দলকে কার্যকর তদারকির সুযোগ দিতে পারে। এর মাধ্যমে বিরোধী সদস্যরা সরকারি নীতি পর্যালোচনা, নির্বাহী কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি এবং নীতিগত দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পারবেন। বিরোধী দলের সঙ্গে মতৈক্য থাকা জরুরি নয়; বরং তাদের প্রশ্ন তোলা ও সরকারি কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ থাকা জরুরি। ক্ষমতা ভাগাভাগির এই ব্যবস্থা নীতিগত কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত না করেও সংসদীয় জবাবদিহি জোরদার করতে পারে।

    আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ও সাংবিধানিক বিরোধ

    ফেব্রুয়ারিতে জামায়াত-জোটের সংসদ সদস্যরা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন, কিন্তু বিএনপি বলেছে পরিষদটি সংবিধানে নেই এবং তারা শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এটি কি নীতিগত বিরোধ, নাকি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব? এর সমাধান কীভাবে হতে পারে?

    ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংসদীয় শপথ নিলেও প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে পৃথক শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান। তাদের যুক্তি ছিল, বিদ্যমান সংবিধানে এ ধরনের পরিষদের স্বীকৃতি নেই। অন্যদিকে, জামায়াত ও তার জোটসঙ্গীরা উভয় শপথ গ্রহণ করেন।

    এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত সংস্কারের ম্যান্ডেটকে কীভাবে বৈধ সাংবিধানিক পরিবর্তনে রূপ দেওয়া হবে। এর সমাধানে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন, যাতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ও সাংবিধানিক বৈধতা পরস্পরের পরিপূরক হয়।

    আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এবং ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দলটির অনুপস্থিতি বিরোধী দলের ধারণা কীভাবে বদলে দেয়? এখন বিরোধী দল কাদের প্রতিনিধিত্ব করে?

    ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইনের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞাটিকে আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়। ফলে দলটি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিএনপি–আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিন্যাসে পরিবর্তন এনেছে। তবে নির্বাচনে অনুপস্থিতি দলটির সামাজিক-রাজনৈতিক ভিত্তি বিলুপ্ত হওয়ার অর্থ নয়। জামায়াত এখন সংসদীয় বিরোধিতার প্রধান সাংগঠনিক শক্তি হলেও সরকারের বিরোধিতাকারী সব নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব করে না। একইভাবে, বিএনপির নির্বাচনী বিজয়ও আওয়ামী লীগের সব সমর্থকের রাজনৈতিক আনুগত্য পরিবর্তনের প্রমাণ নয়। বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক বিরোধিতা সংসদীয় বিরোধী দলের চেয়ে বিস্তৃত।

    “নির্বাচনের ব্যালটে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি তার সামাজিক-রাজনৈতিক ভিত্তির বিলুপ্তি বোঝায় না।”

    — অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান

    সংসদ থেকে রাজপথে: সংঘাত এড়ানোর উপায়

    ১৯ সেপ্টেম্বর বিরোধীদলীয় নেতা সতর্ক করেছিলেন যে আট দফা দাবি এক দফা দাবিতে পরিণত হতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে উভয় পক্ষের কী শিক্ষা নেওয়া উচিত?

    জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের ১৯ সেপ্টেম্বরের সতর্কবার্তা সংসদীয় বিরোধ রাজপথের আন্দোলনে রূপ নেওয়ার আশঙ্কার কথা মনে করিয়ে দেয়। আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, প্রশাসনের দলীয়করণ বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের ১৯৯৬, ২০০৬–০৮ এবং ২০১৩–১৪ সালের রাজনৈতিক সংকট দেখায়, সংসদীয় আলোচনা ব্যাহত হলে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই সরকার ও বিরোধী দলের উচিত সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসন করা। রাজপথের আন্দোলন ও হরতাল-অবরোধ অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। সরকারের উচিত বিরোধের রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখা; বিরোধী দলেরও সংসদীয় প্রক্রিয়া ও শান্তিপূর্ণ সমঝোতার সুযোগ কাজে লাগানো জরুরি।

    সংসদীয় নজরদারি ও জবাবদিহি

    জামায়াতের সংসদ সদস্যরা এখন সরকারি হিসাব-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির (Public Accounts Committee—PAC) সভাপতিত্ব করছেন। এই কমিটি কতটা কার্যকর নজরদারি করতে পারে?

    জামায়াতের সংসদ সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (PAC) চেয়ারম্যান করা হয়েছে। তবে বিরোধী দলের একজন সদস্যের সভাপতিত্বই কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করে না। কমিটিটি সরকারি ব্যয়ের অপচয়, অননুমোদিত ব্যয়, ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়ম এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু কার্যকারিতা নির্ভর করে নিরীক্ষা আপত্তির ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তার ওপর। তথ্যে প্রবেশাধিকার, নিয়মিত বৈঠক, বিশেষজ্ঞ সহায়তা, স্বচ্ছ প্রতিবেদন এবং কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের সদিচ্ছা নিশ্চিত করা জরুরি। দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে নিরীক্ষা-প্রমাণকে অগ্রাধিকার দিলেই নজরদারি অর্থবহ হতে পারে।

    সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে গঠনমূলক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, এবং কোন সংস্কার সংসদকে শক্তিশালী করতে পারে?

    সরকার ও বিরোধী দলের সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করে বিরোধী দলকে নেতৃত্ব, তদন্ত এবং সরকারি কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারির সুযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতাভিত্তিক রাজনীতি, সংসদ বর্জন, নির্বাহী বিভাগের অতিরিক্ত প্রভাব এবং দুর্বল সংসদীয় তদারকি সরকার–বিরোধী সম্পর্ককে জটিল করেছে। বিরোধী দলকে সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে কার্যকর ভূমিকা দিলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য সংসদীয় বিতর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ বাড়তে পারে। গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে বিরোধী দলের সভাপতিত্ব, দলগুলোর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব এবং মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের তলব, নথিপত্র চাওয়া, প্রকাশ্য শুনানি ও প্রতিবেদন প্রকাশের কার্যকর ক্ষমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সাংবিধানিক সংস্কারের পাশাপাশি সংসদীয় কমিটির সংস্কার ও আন্তদলীয় সংলাপও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া সাংবিধানিক পরিবর্তন নতুন বিরোধ তৈরি করতে পারে। তাই বিরোধী দলের আইনগতভাবে সুরক্ষিত নজরদারি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিয়মিত সংলাপ সংসদকে কার্যকর করার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

    আরও পড়ার জন্য

  • ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েও সরকার সরে আসছে’- ডা. শফিকুর রহমান

    ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েও সরকার সরে আসছে’- ডা. শফিকুর রহমান

    “জুলাই সনদের এক বছর: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি” শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র সংস্কার এবং গণভোটের রায় কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েও সরকার তা থেকে সরে আসছে, যা জনগণের প্রত্যাশার পরিপন্থী।

    আজ রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) আয়োজিত এ মুক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি ৫ আগস্ট পর্যন্ত মজলুম ছিল, কিন্তু এরপর তারা দ্রুত অতীতের কথা ভুলে গেছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে।

    তিনি বলেন, বিএনপি বদলে গেলেও আমরা বদলাব না। জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়ন করেই ছাড়ব। এই সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতা পাবার যোগ্য নয়, আজ থেকে সরকারকে নয়, ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করবে বিরোধী দল।

    তিনি আরও বলেন, এই আন্দোলন শুধু ১১ দলের নয়, বরং ফ্যাসিবাদের পথ রুদ্ধ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলন।

    এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়ার সঞ্চালনায় দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু সভায় সভাপতিত্ব করেন।

    বক্তব্যে জনাব মঞ্জু বলেন, সরকারের মুখে অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আশ্বাস শুনতে শুনতে জাতি বিরক্ত হয়ে গেছে। সরকার এত দ্রুত প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবে, আমরা তা কল্পনাও করিনি।

    তিনি বলেন, বিএনপি নিজেরাই দাবি করেছে, জুলাইয়ে তাদের ৮৪৮ জন কর্মী শহীদ হয়েছেন। শহীদদের রক্ত ও জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সরকারের উচিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা। শেখ হাসিনা জাতির সঙ্গে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার পরিণতি ভোগ করেছেন; বিএনপিরও সেই ভুল করা উচিত হবে না।

    বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, সরকারকে বুঝতে হবে জনগণ কী চায়। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন কার্ড বিতরণ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি করে, অথচ নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

    বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদ বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল এবং রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা। রাষ্ট্র সংস্কারে ব্যর্থতার কারণেই ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানে এগিয়ে এসেছিল।

    তিনি বলেন, জুলাই সনদ কার্যকর করতেই হবে; অন্যথায় সংবিধান সংস্কার নিয়ে সংকট আরও গভীর হবে।

    জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং সনদের একাধিক ধারা লঙ্ঘন করেছে।

    তার মতে, সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি ছিল সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য। আর জুলাই সনদবিহীন চলা মানে ফিটনেসবিহীন গাড়িতে ওঠা।

    তার অভিযোগ, সরকার রাষ্ট্রকে জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যবসায়িক স্বার্থের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জুলাই সনদের মৌলিক চেতনা উপেক্ষা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করলে নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

    এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ২০২৪ সালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লিখিত রাজনৈতিক দলিল হলো জুলাই সনদ। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এর মৌলিক উদ্দেশ্য।

    তিনি বলেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষর ও গণভোটের মাধ্যমে সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়েছে; এখন প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে তা বাস্তবায়ন করা। সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুললেই সংবিধানের দোহাই দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। রাজনৈতিক সংকটের সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে এবি পার্টি প্রস্তুত।

    আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান।

    সভায় উপস্থিত ছিলেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, এবিএম খালিদ হাসান, মো. আলতাফ হোসাইন, শাহাদাতুল্লাহ টুটুল, আমিনুল ইসলাম এফসিএ, বরিশাল সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী নাসির, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক কেফায়েত হোসাইন তানভীর, ছাত্রপক্ষের সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্স, ত্রাণ ও পুনর্বাসনবিষয়ক সম্পাদক রাজিয়া সুলতানা, গণপরিবহনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান, সড়ক ও যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী এম শাহেদুল ইসলাম, কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক সফিউল বাশার,সমাজকল্যাণ সম্পাদক অধ্যাপক আবু হেলাল,গাজীপুর মহানগরের আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার আলমগীর হোসাইন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব বারকাজ নাসির আহমদ, ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্যসচিব সামিউল ইসলাম সবুজ, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক ও শাব্বির আহমেদ তামিম, সহকারী দপ্তর সম্পাদক মশিউর রহমান মিলু ও মোহসীনুল হক চৌধুরী, সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক আব্দুর রব জামিল, নারী উন্নয়নবিষয়ক সহসম্পাদক শাহিনুর আক্তার শিলা ও আমেনা বেগম, উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক সুমাইয়া শারমিন ফারহানা,সহ প্রকাশনা সম্পাদক ফিরোজ কবির, গাজীপুর মহানগরের সদস্যসচিব মাসুদ জমাদ্দার রানা এবং প্রবাসীবিষয়ক সহসম্পাদক নুরুন্নবী নয়ন, গাইবান্ধা জেলা আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম, নরসিংদী সমন্বয়ক কাজল মিয়া, রমনা থানার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের মুন্সী, যাত্রাবাড়ী থানার আহ্বায়ক মিয়া সুলতান আরিফসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

  • জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করার পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে: ডা. শফিকুর রহমান

    জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করার পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে: ডা. শফিকুর রহমান

    জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশে এখনো মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গণভোটকে অস্বীকার করা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করার পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করায় জনগণ হতাশ হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জনআস্থা অর্জনে জামায়াত নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

    তিনি গতকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) টঙ্গীর তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায় জামায়াতের গাজীপুর মহানগরের রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।

    সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক মুহা. জামাল উদ্দীনের সভাপতিত্বে দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বক্তৃতা করেন।

    ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার বিচার ও শিক্ষা বিভাগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলীয়করণের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে। এভাবে চলতে থাকলে বর্তমান সরকারের পরিণতিও শেখ হাসিনার সরকারের মতো হবে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এক লুটেরার হাত থেকে অন্য লুটেরার হাতে ক্ষমতা গেছে।

    এ সময় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জানমাল দিয়ে কাজ করে বিজয় নিশ্চিত করতে নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্ষমতাসীন বিএনপির পছন্দের লোক বসানো হচ্ছে। এর ফলে দেশে কার্যত দুই ধরনের সরকারব্যবস্থা চলছে—একটি জনগণের ভোটের ভিত্তিতে, অন্যটি বিএনপির পছন্দের। স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করা হচ্ছে।’

    বরগুনার আহত নেতার পাশে
    সন্ত্রাসী হামলায় আহত বরগুনার জামায়াত নেতা শামীম আহসানকে দেখতে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) যান বিরোধীদলীয় নেতা। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা বিভিন্নভাবে মানুষকে নাজেহাল করছেন। বাড়িঘরে হামলা, দোকানপাটে লুটপাট এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার তালিকা আমাদের কাছে রয়েছে।

    তিনি বলেন, এ ঘটনার পরপরই চিফ হুইপকে ফোন করেছি। সুষ্ঠু তদন্তে দায়ীদের বিচারের আহ্বান জানিয়েছি। দেশে সুস্থ ও সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ চাই।

    হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা
    এর আগে ৫ মাসব্যাপী আয়োজিত ‘হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড ফাইনালে অংশ নেন জামায়াত আমির। রাজধানীর মিরপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে এ আয়োজনে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।

    প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে ওমরাহ পালনের সুযোগ, ল্যাপটপ, সাইকেল ও অর্ধকোটি নগদ অর্থসহ বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

  • জুলাই সনদ যেভাবে সই হয়েছে, সেভাবেই বাস্তবায়ন হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

    জুলাই সনদ যেভাবে সই হয়েছে, সেভাবেই বাস্তবায়ন হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

    জুলাই সনদ যেভাবে সই হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব সংবিধান সংশোধনের বিল আনা হবে। সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে।’

    রোববার সংসদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

    তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদের বাইরেও ইশতেহারে কিছু বিষয় ছিল, সেগুলোও ধারণ করা হবে। একপাক্ষিকভাবে সংবিধান সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই। আজকের আলোচনায় ১৭টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে।’

    বাজেট বরাদ্দের সময় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ভালোভাবে বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক বছরের সময় পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়া হবে। ১ এপ্রিল থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত আর্থিক বছর করার প্রস্তাব দেয়া হবে।’

    তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছিল। অর্থাৎ সংবিধানে যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলো সংশোধন করা হবে।’

    কিছু রাজনৈতিক দল বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছে দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি সংখ্যাধিক্যের কারণে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায় না, এমন কথার কোনো ভিত্তি নেই। যারা এখনো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি, তারাও আলোচনায় থাকতে চাইলে অংশ নিতে পারবে। ডিসেম্বরর মধ্যে আলোচনাসমূহ শেষ করা পরিকল্পনা আছে। এরপরই রিপোর্ট তৈরি করা হবে।’

  • ‘আয়নাঘরে’ যারা দেয়াল টেনেছে তাদের বিচারের আওতায় আনছি: চিফ প্রসিকিউটর

    ‘আয়নাঘরে’ যারা দেয়াল টেনেছে তাদের বিচারের আওতায় আনছি: চিফ প্রসিকিউটর

    আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘আয়নাঘরের’ অনেক আলামত নষ্ট করা হয়েছে, নতুন করে স্থাপনা করা হয়েছে। যারা এসব আলামত নষ্টের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

    শনিবার দুপুরে রাজধানীর উত্তরায় র‍্যাব-১ সদরদপ্তরে অবস্থিত টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল বা গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

    চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্ত সংস্থা যখন কাজ শুরু করে তখন একটা ক্যামোফ্লেক্স তৈরি করা হলো। ভিকটিমদের কথার সঙ্গে বন্দিশালার মিল পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি খুঁজতে গিয়ে তদন্ত সংস্থা দেখল কিছু জায়গায় দেয়াল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। তবে সেই দেয়াল সরিয়ে ফেলার পর সেখানে ২৯টি রুমের দেখা মিলল, যা ভয়াবহ। এছাড়াও সেই রুমগুলোর নিচে একটি ডেথ সেল আছে। সেটাও অনেক ভয়াবহ। এ বিষয়ে তৎকালীন অনেকের দায় আছে, সংশ্লিষ্টদের এর ব্যাখ্যা দিতে হবে। পরবর্তীতে যারা দেয়াল টেনে আয়নাঘর ঢেকে দিয়েছে তাদেরও বিচারের আওতায় আনছি।

    তিনি বলেন, র‍্যাব-১ ‘আয়নাঘর’ নামে যে টর্চার সেল ছিল সেটি পরিদর্শন করেছি। সেখানে ভয়াবহ চিত্র দেখেছি। ছোট বড় মোট ২৯টি কামরা রয়েছে। এখানে ভুক্তভোগীদের অত্যন্ত মানবেতরভাবে রাখা হতো।

    এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর তিন বিচারক, প্রসিকিউটর এবং আসামি পক্ষের আইনজীবীরা এই স্থান পরিদর্শন করেন। ট্রাইব্যাুনালে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ সংক্রান্ত মামলার বিচারিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থলের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহের জন্য এই পরিদর্শনে আসেন তারা।

    চিফ প্রসিকিউটর বলেন, যাদের ধরে নিয়ে আসা হতো তাদের দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর রাখা হতো। কামরাগুলো এতটাই ছোট ছিল যে সেখানে শুয়ে থাকার কোনো ব্যবস্থা ছিল না, বসেই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কাটাতে হতো। এভাবেই তাদের উপর নির্যাতন করা হতো। কাউকে দীর্ঘদিন পর মিথ্যা মামলা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হতো। যা প্রসিকিউশনে দেওয়া ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।

    তিনি বলেন, এই সেলে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, বর্তমান সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমানকেও (মীর আহমদ) রাখা হয়েছিল। গুম হওয়া প্রায় ২৫০ ব্যক্তির সন্ধ্যান এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

    আসামি পক্ষের আইনজীবী মো. তাবারক হোসেন ভূইয়া বলেন, এখানে পরিদর্শন আইন অনুযায়ী হয়েছে। তবে আমরা টিএফআই সেল দেখতে আসিনি। টিএফআই একটি ধারণা, এটি সুনির্দিষ্ট স্থান না।

    পরিদর্শনে মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন, মায়ের ডাকের সমন্বয়ক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি উপস্থিত ছিলেন। এসময় সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, শুধু ভিন্ন মত ও রাজনীতি করার কারণে মানুষকে গুম করে এখানে নির্দয়ভাবে রাখা হতো।

  • জুলাই সনদের আলোকেই আইন সংস্কারের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে: আইনমন্ত্রী

    জুলাই সনদের আলোকেই আইন সংস্কারের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে: আইনমন্ত্রী

    আইন সংস্কার কমিশনের দেওয়া প্রস্তাবনাগুলো ‘জুলাই সনদের’ আলোকেই বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। আজ শুক্রবার সকালে ঝিনাইদহ শহরের পুরাতন ডিসি কোর্ট চত্বরে আয়োজিত এক বৃক্ষমেলার উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

    মন্ত্রী বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আইন সংস্কার কমিশন ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। যার প্রায় সবগুলোই আমরা গ্রহণ করেছি।’

    একই অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত দেশের পর্যটন খাতের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের পর্যটন খাত উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

    অনুষ্ঠানে এনসিপির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যের সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান। তিনি এনসিপির বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত’ বলে অভিহিত করেন।

    রাশেদ খান বলেন, ‘আমরা এনসিপিকে পরামর্শ দেব নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে বাদ দিয়ে তারা দেশের যেখানেই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যাক না কেন, বিএনপি তাদের সার্বিক সহযোগিতা করবে।’

    ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক নোমান হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই বৃক্ষমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা।

  • সরকার দলীয় এমপিরা ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন আদেশ লঙ্ঘন করেছেন: আইনজীবী শিশির

    সরকার দলীয় এমপিরা ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন আদেশ লঙ্ঘন করেছেন: আইনজীবী শিশির

    সরকার দলীয় এমপিরা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ লঙ্ঘন করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি বলেন, বিরোধী দলের এমপিরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিলেও, সরকারি দলের এমপিরা তা নেননি।

    বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট বারের শহীদ শাফিউর রহমান মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। জামায়াতের আইনজীবী সংগঠন ‘বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিল’ আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনের বিষয় ছিল ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি, গণভোট, জুলাই সনদ ও পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায়: বর্তমান বাস্তবতা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ’। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির।

    সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন–ল’ ইয়ার্স কাউন্সিলের সভাপতি অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন এমপি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান তাসমিয়া প্রধান এমপি, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু, ব্যারিস্টার এ. এস. এম. শাহরিয়ারসহ আরও অনেকে।

    সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত।

    শিশির মনির অভিযোগ করেন, সম্প্রতি সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা বর্তমান সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গণভোটের বিধান অনুসারে সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি।

    তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-কে অবৈধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে এবং মানবাধিকার কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে, যদিও সরকার এগুলো সংশোধন করে পুনরায় প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।

    সংবাদ সম্মেলনে আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘গত ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোটে ভোটদানের হার ছিল ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। বিরোধী দলীয় জোটের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দ্বৈত শপথ নিলেও সরকার দলীয় নির্বাচিতরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান। এর মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫-এর বিধান লঙ্ঘন করেন তারা।

    বিগত সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘গুম-খুন, নির্যাতন ও আয়নাঘর ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। এছাড়া একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করতে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী যুক্ত করা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান পুনর্লিখিত হয়। বিলুপ্ত করা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। গণভোটের ব্যবস্থাও বিলুপ্ত করা হয়।’

    তিনি আরও বলেন, ‘বছরের পর বছর ক্ষমতার চরম অপব্যবহারে মানুষের মনে হতাশা ও গভীর ক্ষোভের জন্ম হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বিস্ফোরিত হয় দীর্ঘদিনের সেই চাপা ক্ষোভ। জনতার স্রোতে ভেঙে যায় ১৬ বছর ধরে গড়ে ওঠা একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে পথ চলতে শুরু করে এ সরকার। এর মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন হলেও বিচারপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রসংস্কার এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।’

  • জীবন দেব, তবু ‘চব্বিশকে’ হারিয়ে যেতে দেব না: জামায়াত আমির

    জীবন দেব, তবু ‘চব্বিশকে’ হারিয়ে যেতে দেব না: জামায়াত আমির

    বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আল্লাহর কসম, জীবন দেব কিন্তু ‘২৪’ হারিয়ে যেতে দেব না। আমরা লজ্জিত, কারণ প্রতিবার সাধারণ মানুষ, ছাত্র, তরুণ, যুবক, শ্রমিক জীবন দিয়ে অর্জন এনে দেওয়ার পর কিছু লুটেরা সেই অর্জন ছিনিয়ে নেয়। আজও ২০২৪-এর অর্জন হারিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

    বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে আইডিবির মিলনায়তনে জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে শহীদ আবু সাঈদসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

    জামায়াত আমির বলেন, আজ যে সংসদ ও সরকার গঠিত হয়েছে, সবাই স্বীকার করেন এটি ২০২৪-এর ফসল। অথচ কেউ কেউ বলতে চান, ২০২৪ তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, আগের অংশটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তো কখনো বলিনি আগের অংশ গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেই সময়েই তো আমরা আমাদের ১১ জন শীর্ষ নেতাকে হারিয়েছি। শত শত সহকর্মীকে হারিয়েছি। অসংখ্য মানুষ কারাগারে গেছেন, চাকরি হারিয়েছেন, বাড়িঘরে থাকতে পারেননি। আমরা সেই ত্যাগ অস্বীকার করি না। কিন্তু এটাও সত্য, ২০২৪ না হলে আজ আমি এখানে বক্তৃতা দিতে পারতাম না, বিরোধীদলীয় নেতা হতে পারতাম না, সংসদ সদস্য হতে পারতাম না। একইভাবে তারেক রহমানও প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না।

    জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম দাবি তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, সবচেয়ে বড় দাবি ছিল, ফ্যাসিবাদ যেন আর বাংলাদেশে ফিরে না আসে। এজন্য রাষ্ট্র সংস্কার প্রয়োজন ছিল। নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রয়োজন ছিল। অতীতের পচা রাজনীতিকে বিদায় দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল। কেউ কেউ বলেছেন, গণভোট সংবিধানে নেই। আবার কেউ বলেছেন, চারটি প্রশ্ন এত জটিল ছিল যে বুঝতেই চার ঘণ্টা লাগে। তাহলে জনগণ কীভাবে ভোট দিল? আমি বলি, এই চারটি প্রশ্ন তো আগেই প্রচার করা হয়েছিল, সব গণমাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। তাহলে কি আপনারা বলতে চান, বুদ্ধি শুধু আপনাদের আছে, দেশের ১৮ কোটি মানুষের নেই? এটা জাতিকে অপমান করার শামিল। আমি মূর্খ হতে পারি, কিন্তু আমার জাতি মূর্খ নয়।

    তিনি আরও বলেন, চারটি প্রশ্ন যদি মানুষ বুঝতে না পারে, তাহলে ৩১টি প্রশ্ন কীভাবে বুঝবে? এগুলো সব গোঁজামিল ও ভাওতাবাজি। ইতোমধ্যে একজন বলেছেন, ভোটটা হয়ে যাক, তাই সবকিছু আগে মেনে নিয়েছিলাম। আরেকজন বলেছেন, টোল মওকুফের কথা বলা হয়েছিল ভোট পাওয়ার জন্য। রাজনীতিবিদরা যদি এভাবে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেন, তাহলে দেশের মানুষ যাবে কোথায়? যারা দেশ চালাবেন, আইন করবেন, তাদের ন্যূনতম নৈতিক মানদণ্ড থাকা উচিত।

    বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে সবাই গণভোটের পক্ষে ছিলেন। জনগণের প্রায় ৭০ শতাংশ হ্যাঁ বলেছেন। এখন বলা হচ্ছে, ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করা হয়েছে, তাই ৭০ শতাংশ গণরায় মানা হবে না। আমি জানতে চাই, ৫১ বড়, নাকি ৭০ বড়? ভোট কীভাবে পেয়েছেন, সেই বিতর্ক ইতিহাসে থেকেই যাবে। সাড়ে তিন ঘণ্টা ব্ল্যাকআউট করে কী করা হয়েছে, জনগণ তা জানে। সময়মতো ইতিহাস সবকিছুর বিচার করবে।

    সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়েও প্রশ্ন তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এখন আমাদেরও বলা হচ্ছে, আপনারাও আসুন, এই অগ্রাহ্যের মিছিলে শরিক হোন। সংসদে আমাদের সংবিধান শেখানো হয়। আমি জানতে চাই, সংবিধান সংশোধন কমিটি নামে কোনো কমিটি সংবিধানের কোথাও আছে কি? যদি না থাকে, তাহলে এটি কেন? এটি জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, গণভোটকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

    তিনি বলেন, আমরা পরিষ্কারভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে ওয়াকআউট করেছি। জনগণের রায়কে অপমান করতে চাইলে করুন, জনগণই তার বিচার করবে। আমরা জনগণের সঙ্গে আছি, জনগণের রায়ের পক্ষে আছি। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। আমাদের বিশ্বাস, ইনশাআল্লাহ ৭০ শতাংশ মানুষের গণরায় বৃথা যাবে না, তা বাস্তবায়িত হবেই।

    তিনি বলেন, চিংড়ি মাছ লাফ দিলে পেছনের দিকে যায়। সামনে রাস্তা খুঁজে পায় না। জাতি যদি সবসময় পেছনের দিকেই তাকিয়ে থাকে, তাহলে সামনে এগোবে কীভাবে? আমরা সবসময় বলেছি, আসুন সামনে তাকাই। ২০২৪ এর যে অঙ্গীকার, তা বাস্তবায়ন করি।

    ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অনেকেই প্রতিবেশী দেশ নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। আমরাই একমাত্র দল, যাদের তারা পছন্দ করে না। তারা বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে ভারতের মাটিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, শুধু জামায়াতে ইসলামীর জন্য লাল কার্ড। কিন্তু আমরা সেই লাল কার্ডের পরোয়া করি না। ভারতের মাটিতে আশ্রয় নেওয়ার চিন্তাও আমরা করি না। এই দেশই আমাদের দেশ। আমাদের আশ্রয়ের জায়গা বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের অন্তর।

    বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় আলোচনা সভার সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল।