জলবায়ুর ঝুঁকি বদলাচ্ছে পূর্বাঞ্চলের কৃষি

প্রতিবেদন:

·

, , , ,

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ, আকস্মিক বন্যা ও কৃষি উৎপাদনের ঝুঁকি মোকাবিলায় পূর্বাঞ্চলের কৃষিকে আরও সক্ষম ও সহনশীল করে গড়ে তুলতে বাস্তবায়িত হচ্ছে বাংলাদেশ সাস্টেইনেবল রিকভারি, ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড রেসপন্স (বি-স্ট্রং) প্রকল্প। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ও বাংলাদেশ সরকারের ম্যাচিং গ্রান্টে পরিচালিত এ প্রকল্পের আওতায় বন্যাদুর্গত এলাকার কৃষি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত বীজ উৎপাদন ও পানি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর ৪০টি উপজেলায় প্রকল্পটির কার্যক্রম চলছে। প্রায় ৬৫ হাজার কৃষককে প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে ৬ হাজার ৭৪০টি প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে আরও ১০ হাজার প্রদর্শনী বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

একই সঙ্গে কৃষকের বাড়ির আঙিনা, অনাবাদি জমি, পুকুরপাড়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জায়গা ও রাস্তার পাশের পরিত্যক্ত জমি উৎপাদনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের আশা, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে দুর্যোগের পর কৃষি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে কৃষকের ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং উৎপাদনব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে।

মালচিং পদ্ধতিতে মরিচ চাষে সুফল
কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার মন্তলী গ্রামের কৃষক হাসান এবার প্রথমবারের মতো মালচিং পদ্ধতিতে মরিচ চাষ করেছেন। আগে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও জমিতে পানি জমে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি মরিচ চাষের কথা ভাবতেন না। বি-স্ট্রং প্রকল্পের সহায়তায় এবার সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন।
হাসান জানান, কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে জমিতে বেড তৈরি করে মালচিং শিট বিছিয়ে চারা রোপণ করেন। এতে জমির অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন সহজ হয়েছে, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা গেছে এবং আগাছার সমস্যাও কমেছে।
পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে তিনি ফেরোমন ফাঁদ ও হলুদ আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করেছেন। কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত জমি পরিদর্শন করে সার প্রয়োগ, সেচ, রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনে পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর দাবি, বর্ষার মধ্যেও গাছ ভালো রয়েছে এবং কয়েক দফায় মরিচ সংগ্রহ করতে পেরেছেন।

হাসানের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ জমি থেকে প্রথম দফায় ২০০ কেজি এবং দ্বিতীয় দফায় ২৯০ কেজি—মোট ৪৯০ কেজি মরিচ বিক্রি করেছেন। প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৪০ টাকা দরে বিক্রির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত তাঁর আয় হয়েছে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। মোট খরচ হয়েছে প্রায় ২৪ হাজার টাকা। গাছে এখনো মরিচ রয়েছে। সব মিলিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মরিচ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

হাসানের অভিজ্ঞতা বলছে, উপযুক্ত প্রযুক্তি ও পরিচর্যার মাধ্যমে প্রতিকূল মৌসুমেও সবজি চাষের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ পদ্ধতির প্রকৃত লাভ নির্ধারণে উৎপাদন খরচ, ফলন ও বিক্রির হিসাব যাচাই করা জরুরি।
দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধারই একমাত্র লক্ষ্য নয়

বি-স্ট্রং প্রকল্পের পরিচালক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, দুর্যোগের পর কৃষি ব্যবস্থা দ্রুত পুনরুদ্ধার করাই শুধু প্রকল্পের লক্ষ্য নয়; ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্যোগে কৃষকের ক্ষতি কমানোর সক্ষমতা তৈরি করাও অন্যতম উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালে দেশের পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে ফেনী ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যায় কৃষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ওই ক্ষতি কাটিয়ে কৃষি পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় কৃষকদের প্রস্তুত করার প্রয়োজন থেকেই প্রকল্পটির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৫ সালের জুলাইয়ে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রকল্পের প্রধান বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সহ-প্রধান সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়নসংশ্লিষ্ট সংস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনসহ একাধিক সরকারি সংস্থা যুক্ত রয়েছে।

উৎপাদন বাড়াতে প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকীকরণ
প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কমানো। একই সঙ্গে কৃষিতে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পে ৩০ শতাংশ নারী এবং ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ২০ শতাংশ তরুণকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
‘বি-স্ট্রং’ প্রকল্পের পরিচালকসাবিনা ইয়াসমিন বলেন, প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কম পানি, কম সময় ও কম খরচে বেশি উৎপাদনের জন্য কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
দুর্যোগের পর কৃষকের অন্যতম বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায় মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা। এ সমস্যা মোকাবিলায় ধান, গম, ডাল, তেলবীজ ও মসলাজাতীয় ফসলের উন্নত প্রযুক্তি এবং কৃষক পর্যায়ে বীজ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বীজ সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো, বিএডিসির গুদামজাতকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে দুর্যোগের পর দূরবর্তী এলাকা থেকে বীজ সংগ্রহে সময়ক্ষেপণ ও সরবরাহসংকট কমবে বলে আশা করছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

ডাল-তেলবীজ থেকে পেঁয়াজ-মরিচ
এলাকার মাটি ও পরিবেশ উপযোগী করে খেসারি, মাষকলাই, মসুর, সরিষা, সূর্যমুখী ও সয়াবিনের মতো ফসলের চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি গমের উন্নত জাতের প্রদর্শনী চলছে। নোয়াখালীতে পরীক্ষামূলকভাবে পেঁয়াজ চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মরিচসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনেও কৃষকদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।
বর্ষাকালে উদ্যান ফসল চাষের ঝুঁকি কমাতে মালচিং প্রযুক্তি এবং উঁচু বেডে চাষের প্রদর্শনী করা হচ্ছে। টমেটো, মরিচ ও করলার মতো ফসলের ক্ষেত্রে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং গাছের গোড়া উঁচু রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বসতবাড়ির আশপাশের খালি জায়গা কাজে লাগাতে কৃষকদের মধ্যে ৫০ হাজার জিও ব্যাগ বিতরণ করা হয়েছে। এসব ব্যাগে আদা ও মরিচ চাষের মাধ্যমে স্বল্প জায়গায় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘কৃষকের বাড়ির আশপাশে পড়ে থাকা জায়গাটুকুও যদি উৎপাদনে আনা যায়, তাহলে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয়ও সম্ভব।’

আমন কাটার আগেই সরিষা চাষ
জমি চাষের খরচ, সময় ও পানি সাশ্রয়ে প্রকল্পের আওতায় জিরো টিলেজ বা চাষ ছাড়াই সরিষা উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে আমন ধান কাটার প্রায় ১০ দিন আগে জমিতে সরিষার বীজ ছিটিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ধান কাটার পর সরিষা চাষের জন্য নতুন করে জমি প্রস্তুতের প্রয়োজন কমে যায়।
একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ না করে স্বল্পমেয়াদি সরিষা বা খেসারির মতো ফসল অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা ধরে রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পানি সাশ্রয়ে বিকল্প সেচব্যবস্থা
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে ধান চাষে অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (এডব্লিউডি) পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে জমিতে সব সময় পানি জমিয়ে না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়া হয়। পাশাপাশি কৃষকদের বিনামূল্যে লো লিফট পাম্প সরবরাহ এবং সেচ চ্যানেল নির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ফলবাগানে সৌরশক্তিচালিত ড্রিপ ইরিগেশন বা ফোঁটা সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে কম পানি ব্যবহার করে গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

অনাবাদি জমিতে কমিউনিটি গার্ডেন
পতিত জমি ও অব্যবহৃত জায়গাকে উৎপাদনের আওতায় আনতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুকুরপাড় ও পতিত জমিতে মাচা তৈরি করে ফসল উৎপাদন, রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত জমিতে তিনজন কৃষকের যৌথ উদ্যোগে কমিউনিটি গার্ডেন এবং স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার অব্যবহৃত জায়গায় চাষাবাদ করা হচ্ছে।

মাটির গুণাগুণ রক্ষায় ভার্মি কম্পোস্ট ও ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদনেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ট্রাইকো কম্পোস্ট মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি ছত্রাকজনিত রোগ ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানোর উদ্যোগ রয়েছে।
উৎপাদন খরচ কমাতে শেড ছাড়াই গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষের প্রদর্শনী করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কৃষক নির্বাচন ও কারিগরি প্রস্তুতি নিশ্চিত করে পলিশেড প্রযুক্তি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, প্রকল্পের পুরো দল গত কয়েক মাস ধরে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত কাজ করছে। শুরু থেকেই মাঠ পরিদর্শনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, শুধু কাগজে-কলমে পরিকল্পনা করলে প্রকল্পের বাস্তব চিত্র বোঝা যায় না; কৃষকের জমিতে কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রকল্প তৈরির শুরু থেকেই তিনি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাই উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা ও মাঠপর্যায়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁর ধারণা রয়েছে। এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে কৃষকের কাছে সুফল পৌঁছে দেওয়াই প্রধান লক্ষ্য।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ