চরভদ্রাসনে হাসপাতালে যাওয়ার পথে ট্রলারেই নারীর মৃত্যু

প্রতিবেদন:

·

, , , , ,

বিডি গ্লোবাল ডেস্ক,

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বাসিন্দারা। এরই মধ্যে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত এক নারীকে চিকিৎসার জন্য চরহাজীগঞ্জ বাজারে নেয়ার পথে ট্রলারের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় চরাঞ্চলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অন্তত ২০ থেকে ৩০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সমাজসেবকরা। পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণস্থানে সেতু নির্মাণেরও দাবি উঠেছে।

মৃত নারী চর হরিরামপুর ইউনিয়নের চর সালেপুর এলাকার বাসিন্দা। তার স্বামী হাশেম মোল্লা মনির খানের বাজার এলাকার বাসিন্দা। তিনি তিন মেয়ে ও দুই ছেলে সন্তানের জননী ছিলেন।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ওই নারীকে চিকিৎসার জন্য ট্রলারে করে চরহাজীগঞ্জ বাজারে নেয়া হচ্ছিল। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ট্রলারের মধ্যে তার মৃত্যু হয়। স্ত্রীকে বাঁচানোর আশায় চিকিৎসার জন্য যাত্রা শুরু করেও শেষ পর্যন্ত তাকে হারাতে হয় স্বামীকে। পরে স্ত্রীর লাশ নিয়ে দাফনের উদ্দেশ্যে ফিরতি ট্রলারে চরের দিকে রওনা দেন তিনি। ঘটনাটি চরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে শোকের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

মৃত নারীর স্বামী হাশেম মোল্লা বলেন, ‘আমার স্ত্রী শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। তাকে চিকিৎসার জন্য চরহাজীগঞ্জ বাজারে নিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই ট্রলারের মধ্যে আমার স্ত্রী মারা যান। আমি অনেক অসহায় অবস্থায় পড়েছি। স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচাতে পারিনি। আমাদের চরাঞ্চলে কাছাকাছি ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ হতো। আমি চাই, আর কোনো স্বামীকে যেন আমার মতো এভাবে স্ত্রীকে হারিয়ে অসহায় হতে না হয়। আমাদের চরে অন্তত ২০ থেকে ৩০ শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণ করা হোক।’

স্থানীয় সমাজসেবক ফয়সাল হোসেন শাওন বলেন, ‘হরিরামপুর ইউনিয়নের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করা জরুরি। এখানকার অধিকাংশ রাস্তাঘাট ভঙ্গুর। এ ছাড়া হাজার বিঘা ও চর সালেপুরের মধ্যবর্তী সালেপুর মরা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ করা হলে চরাঞ্চলের মানুষের চলাচল অনেক সহজ হবে। পাশাপাশি চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এখানে কমপক্ষে ২০ শয্যার একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি।’

স্থানীয় সমাজসেবক মোস্তফা কবির বলেন, ‘চরভদ্রাসনের চরাঞ্চলের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একজন অসুস্থ নারীকে চিকিৎসার জন্য নেয়ার পথে ট্রলারের মধ্যে মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। চরাঞ্চলের মানুষকে জরুরি চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, প্রসবকালীন জটিলতা ও অন্যান্য জরুরি অসুস্থতায় দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত অন্তত ২০ থেকে ৩০ শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানাই।’

চর হরিরামপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘চর হরিরামপুর ইউনিয়নের চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে জরুরি রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসার জন্য যাওয়ার পথে একজন নারীর মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। চরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এখানে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করা প্রয়োজন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।’

চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য যাওয়ার পথে ট্রলারে এক নারীর মৃত্যুর বিষয়টি আমাকে কেউ আগে জানাননি। আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। আমি এ বিষয়ে খোঁজখবর নেব এবং ঘাটের ইজারাদারদের সঙ্গে কথা বলব। হঠাৎ অসুস্থ কোনো রোগী ঘাটে এলে যেন দ্রুত পারাপারের ব্যবস্থা করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করব। জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে যাতে সময় নষ্ট না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।’

চরাঞ্চলের মানুষের অভিযোগ, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, ভঙ্গুর রাস্তাঘাট এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসাসুবিধার অভাবে জরুরি মুহূর্তে রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নদীপথনির্ভর যাতায়াতের কারণে সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

এ অবস্থায় চরাঞ্চলে অন্তত ২০ থেকে ৩০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল বা পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন, সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও জরুরি সেবার ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি রোগী পরিবহনের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট সংস্কার ও সালেপুর মরা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করা গেলে মানুষের যাতায়াত এবং চিকিৎসাসেবা গ্রহণ আরো সহজ হতে পারে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, একজন নারীর মৃত্যুর ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের নজরে আসবে। চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের চিকিৎসাসংকট নিরসনে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে নিরাপদ ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। এ,আর