রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নামে দুজনকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। রোববার ভোর পর্যন্ত নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তারা একই এলাকার বাসিন্দা। হত্যাকাণ্ডের পর ওই বাড়িতেই ইয়াবা সেবনের আলামতও পেয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ১২ বছর বয়সি আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকে হত্যার কারণও উদ্ঘাটন করা হয়েছে। সিদ্ধার্থের ছোট ভাই অপূর্বের সঙ্গে প্রিয়মের বন্ধুত্ব ছিল। তারা একসঙ্গে খেলাধুলা করত। প্রিয়ম অভিযুক্তদের চিনত বলেই তাকে বাঁচিয়ে রাখলে পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা করেছিল খুনিরা।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ প্রিয়মকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ দুজন মিলে শিশুটির ওপর হামলা চালায়। গলায় কাপড় পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। পরে বালিশ চাপা দেওয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডের পরও ওই বাড়িতে অবস্থান করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। তারা বাড়ির বাথরুমে গোসল করে, ডাইনিং টেবিলে রাখা খেজুর ও শসা খায় এবং সেখানেই আবার ইয়াবা সেবন করে। পরে সুযোগ বুঝে পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে সরে যায়। এর আগে তারা বাড়িতেই চেয়ারে বসে কিছু সময় বিশ্রাম নেয়।
পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এর আগে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ সীমান্ত নামে এক ব্যক্তির বাসায় বসে ইয়াবা সেবন করে। সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে তারা পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যায়।
মুগ্ধ সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে কাজ করে। পুলিশ জানিয়েছে, খুশি ওরফে প্রশান্ত নামে এক মাদক কারবারির কাছ থেকে তারা প্রতি পিস ৩৫০ টাকা দরে ইয়াবা কিনেছিল।
পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তী একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তার পরিবারের সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ ছিল না। পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে গেলে তাদের আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। নিজেদের পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কায় তারা তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে।
ডিআইজি জানান, গণপতি চক্রবর্তীর বাঁচার চেষ্টা ও চিৎকারের শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সিঁড়িতে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে তাদের ২৫ বছর বয়সী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী এগিয়ে এলে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তাকে হত্যা করতে চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগে। একপর্যায়ে আসামিরা রশি দিয়ে তার গলা ও মুখ পেঁচিয়ে জোরে টান দেয়। এতে তার চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখ বেরিয়ে আসে।
এরপর নিচতলায় গিয়ে শিশু প্রিয়মকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে বালিশ চাপা দিয়েও তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। শিশুটির বয়স নিজের সন্তানের সমান হওয়ায় ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে পুলিশ কমিশনার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
পুলিশ জানায়, হত্যার পর স্বর্ণালংকার নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় অভিযুক্তরা। হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করা হয়। পরে মন্দিরের পেছনে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে স্বর্ণালংকারগুলো লুকিয়ে রাখা হয়। তাদের দেখানো জায়গা থেকে এসব আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
রংপুর কোতোয়ালি থানার ওসি নাজমুল জানান, চারজনের হত্যার খবর পাওয়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান শুরু করে। একপর্যায়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে একজন পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুতবাগানে লুকিয়ে ছিলেন। পরে পাশের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।
এর আগে শনিবার রাতে মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত অন্যরা হলেন—গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী (২৪) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।
রংপুর সিআইডি কার্যালয়ের ইনচার্জ সুমিত চক্রবর্তী জানান, হত্যাকাণ্ডটি দুই থেকে তিন দিন আগে ঘটে থাকতে পারে। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। আসবাবপত্রের ড্রয়ার ও স্বর্ণালংকার রাখার স্থানগুলোও ভাঙা পাওয়া যায়। প্রথমদিকে ডাকাতির বিষয়টি সামনে এলেও প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
রংপুর মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপকমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী জানান, প্রাথমিকভাবে তাদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাড়ি তছনছ করার ধরন দেখে মূল্যবান জিনিসপত্র লুটের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে প্রকৃত আসামিদের বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
