কৃষি

  • পাটের ন্যায্যদাম নিয়ে শঙ্কা

    পাটের ন্যায্যদাম নিয়ে শঙ্কা

    যশোরের শার্শার মাঠে এখন পাট কাটার ব্যস্ততা। সবুজ মাঠ জুড়ে কোথাও চলছে আঁটি বাঁধার কাজ, আবার কোথাও কৃষকেরা ব্যস্ত জাগ দেওয়ার প্রস্তুতিতে। অনুকূল আবহাওয়া ও সরকারি প্রণোদনায় চলতি মৌসুমে শার্শায় রেকর্ড পরিমাণ জমিতে পাট চাষ হয়েছে। কৃষকের ঘরে সোনালি আঁশ উঠলেও মুখে হাসি নেই; বাড়ন্ত উৎপাদন খরচের কারণে বাজারে প্রত্যাশিত দাম পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তারা।

    উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে ৫ হাজার ৫০৩ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ৫০৩ হেক্টর বেশি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১৬ মণ পর্যন্ত ফলনের আশা করছেন চাষিরা। তবে ভালো ফলনের আনন্দের চেয়ে কৃষকদের বেশি ভাবাচ্ছ শ্রমিকের অতিরিক্ত মজুরি, জ্বালানি তেল ও পরিবহন খরচ।

    বাগআঁচড়া এলাকার পাটচাষি আবদুল হালিম ও রফিকুল ইসলাম জানান, বীজ বোনা থেকে শুরু করে পাট ধোয়া পর্যন্ত প্রতি ধাপে খরচ বহুগুণ বেড়েছে। দাম না পেলে চাষিরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বেন।
    স্থানীয় ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হোসেন বলেন, সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় মৌসুমের শুরুতে কৃষকেরা কম দামে পাট বিক্রি করতে বাধ্য হন, যার সুযোগ নেয় মধ্যস্বত্বভোগীরা। তবে কিছু কৃষক পাটখড়ি বিক্রি করে লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

    উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা জানান, প্রণোদনা ও পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে কৃষকদের মানসম্মত আঁশ উৎপাদনে সহায় দেওয়া হচ্ছে। আঁশের গুণগত মান ভালো থাকলে বাজারে সঠিক মূল্য পাওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

  • ড্রাগন চাষে বছরে বিক্রি ১২ লাখ টাকা

    ড্রাগন চাষে বছরে বিক্রি ১২ লাখ টাকা

    একসময় আগাছায় ঢাকা পড়ে ছিল জমিটি। চা চাষের উপযোগিতা হারানোয় বছরের পর বছর পড়ে ছিল অনাবাদি। সেই পতিত জমিতেই এখন সারি সারি ড্রাগনগাছ। সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলছে রক্তিম লাল ও গোলাপি ফল। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজের বুকজুড়ে ছড়িয়ে আছে লাল রঙের অসংখ্য প্রদীপ।

    মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার সিরাজনগর চা বাগানের এ দৃশ্য এখন কেবল চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যের নয়, অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও। প্রায় এক হেক্টর চা চাষের অনুপযোগী জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে বাণিজ্যিক ড্রাগন ফলের বাগান। প্রায় ১৪ হাজার গাছের এ বাগানে ফলছে থাই রেড, জাম্বো রেড ও হোয়াইট পিংক জাতের ড্রাগন।

    ২০২৪ সালে প্রায় ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগে শুরু হওয়া এ প্রকল্পে দ্বিতীয় বছর থেকেই ফলন আসতে শুরু করেছে। চলতি মৌসুমেই প্রায় ১২ লাখ টাকার ফল বিক্রি হয়ে গেছে। মৌসুম শেষে বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছে বাগান কর্তৃপক্ষ।

    সরেজমিনে দেখা যায়, সিরাজনগর চা বাগানে ঢুকতেই চোখে পড়ে চায়ের চিরচেনা সবুজ। তবে সেই সবুজের মাঝেই যেন আলাদা গল্প লিখেছে ড্রাগন বাগান। সারি সারি খুঁটির ওপর বেড়ে উঠেছে ড্রাগনগাছ। কোনো গাছে ফুল, কোনো গাছে কাঁচা ফল, আবার কোনো গাছে পেকে ঝুলছে রক্তিম লাল ড্রাগন। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফলের সমারোহে পুরো বাগানজুড়ে তৈরি হয়েছে নান্দনিক দৃশ্য।

    ভোরের আলো কিংবা বিকেলের নরম রোদে বাগানটির সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। আর সেই সৌন্দর্যের আড়ালেই চলছে পুরোদমে বাণিজ্যিক উৎপাদন।বাগান কর্তৃপক্ষ জানায়, চা চাষের অনুপযোগী জমি ফেলে না রেখে বিকল্প কৃষির আওতায় আনার চিন্তা থেকেই ড্রাগন চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালে প্রায় ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে শুরু হয় প্রকল্পটি। প্রথম বছর গাছের পরিচর্যা ও বেড়ে ওঠার পর দ্বিতীয় বছর থেকেই ফলন পাওয়া শুরু হয়। এখন ধীরে ধীরে বাড়ছে উৎপাদন।

    চলতি মৌসুমে ইতোমধ্যে প্রায় ১২ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি হয়েছে। বাগান কর্তৃপক্ষের আশা, মৌসুম শেষ হলে বিক্রির পরিমাণ আরও বাড়বে।

    এ বাগানের আরেকটি বড় সাফল্য শুধু আয় নয়—এটি বদলে দিয়েছে চা শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগও। চা বাগানের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি ড্রাগন বাগানে কাজ করছেন শ্রমিকরা। গাছের পরিচর্যা, ফুলের যত্ন, আগাছা পরিষ্কার ও ফল সংগ্রহ—বিভিন্ন কাজে যুক্ত রয়েছেন তারা। এতে তৈরি হয়েছে বাড়তি কাজ ও আয়ের সুযোগ।

    শুধু তাই নয়, বাগানে উৎপাদিত ড্রাগন ফল শ্রমিকদের বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। ফলে যে ফল অনেক শ্রমিক পরিবারের নিয়মিত বাজার থেকে কেনা সম্ভব নয়, সেটিই এখন তারা কর্মস্থল থেকে ঘরে নিয়ে যেতে পারছেন।

    চা শ্রমিক জোসনা পাশি বলেন, ‘ভালো মানের ড্রাগন ফল এখন বাগান থেকেই বিনামূল্যে নিতে পারছি। এতে পরিবারের সবাই ফল খাচ্ছেন। যেমন আনন্দ লাগছে, তেমনি পুষ্টিরও জোগান হচ্ছে।’

    চা শ্রমিক কাঞ্চন বাউড়ি বলেন, ‘এখানে কাজ করে নিয়মিত আয় হচ্ছে। চা বাগানের পাশাপাশি বাড়তি কাজের সুযোগও মিলছে।’বাগানের শ্রমিকরা জানান, ড্রাগন গাছে ফুল আসার প্রায় ২৫ থেকে ২৬ দিনের মধ্যেই ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়। ফলে একই জমিতে পর্যায়ক্রমে ফল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।

    ড্রাগন প্রকল্পের ম্যানেজার খান মো. আল মিকাত বলেন, ‘চা চাষের অনুপযোগী পরিত্যক্ত জায়গা ব্যবহার করতেই আমরা এ ড্রাগন প্রজেক্টটি শুরু করি। এক বছর পর থেকেই ফল আসতে শুরু করে। এখন ধীরে ধীরে ফসল উৎপাদন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। নান্দনিক এ বাগানে রয়েছে টাটকা ও সুস্বাদু ড্রাগন। তাই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে এ ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বাগানের এই সাফল্য দেখে কুলাউড়া ও আশপাশের এলাকার অনেক তরুণ উদ্যোক্তাও বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। ফলে চা-নির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি পতিত জমিতে বিকল্প ফল চাষের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।’

    সিরাজনগর চা বাগানের ম্যানেজার শামীম ইসলাম বলেন, ‘চা প্লান্টেশনের বাইরে থাকা পতিত ভূমিতে বাগানের শ্রীবৃদ্ধির জন্য ড্রগন বাগান তৈরি করা হয়েছিল। এখন এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।’

    তিনি জানান, বাগানে কোনো ধরনের কীটনাশক বা ক্ষতিকর পেস্টিসাইড ব্যবহার করা হয় না। জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত হওয়ায় ফল নিরাপদ ও মানসম্মত।

    কুলাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জসীম উদ্দিন বলেন, ‘চা চাষের অনুপযোগী পতিত জমি এখন আর পড়ে থাকছে না, এসব জমিকে পরিকল্পিতভাবে উৎপাদনের আওতায় এনে গড়ে উঠছে ড্রাগন ফলের বাগান। এতে চা বাগানগুলোতে বাড়তি আয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি উৎপাদিত ড্রাগন ফল শ্রমিকদের পুষ্টির চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চা বাগানের পতিত জমিতে ড্রাগন চাষ তাই শুধু বিকল্প কৃষি উদ্যোগ নয়, বরং আয়বর্ধক ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার সম্ভাবনাময় এক নতুন দৃষ্টান্ত।’

  • শাহী পেঁপেতে ভাগ্য বদল সাইদুরের

    শাহী পেঁপেতে ভাগ্য বদল সাইদুরের

    কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মানিকগঞ্জের সিংগাইর এলাকার শাহী জাতের পেঁপে চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন কৃষি উদ্যোক্তা সাইদুর রহমান সোনা। মাত্র ৩২ হাজার টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করে এখন পর্যন্ত তিনি ২০ লাখ ৭৫ হাজার টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন। বারোমাসি এ পেঁপে চাষে তার সাফল্য এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

    দৌলতপুর উপজেলার চুয়ামল্লিকপাড়া গ্রামের মৃত মশিউর রহমান মাস্টারের ছেলে সাইদুর রহমান সোনা (৪৭)। একসময় সিঙ্গাপুর প্রবাসী এই তরুণ উদ্যোক্তা বর্তমানে কৃষিকাজে মনোযোগ দিয়েছেন। তার ১০ বিঘা জমির পেঁপে বাগান এখন এলাকার মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। বাগানের প্রতিটি গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে পেঁপে। একটি গাছ থেকে গড়ে প্রায় এক মণ পেঁপে পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

    সাইদুর রহমান জানান, গত বছরের অক্টোবর মাসে মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে শাহী জাতের পাকা পেঁপের ১০ মণ বীজ সংগ্রহ করেন তিনি। প্রতি কেজি ৮০ টাকা দরে বীজ কিনতে তার খরচ হয় ৩২ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে শ্রমিকসহ অন্যান্য খরচ যুক্ত হলেও চলতি সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত পেঁপে বিক্রি করে তার আয় দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

    তিনি বলেন, ‘সবাই যখন প্রচলিত সবজি চাষ করছিল, তখন দৌলতপুর উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তাদের পরামর্শে পেঁপে বাগান করার সিদ্ধান্ত নিই। বীজ কেনা ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে শুরুতে পকেট থেকে ৩২ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। তখন ভাবিনি, এই পেঁপে চাষ এত ভালো ফল দেবে।’

    স্থানীয় কৃষকরা যখন প্রচলিত শাক-সবজি চাষে ব্যস্ত, তখন ভিন্ন চিন্তা থেকে শাহী জাতের পেঁপে চাষে ঝুঁকেন সাইদুর। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে গড়ে তোলেন ১০ বিঘার বাগান। বর্তমানে বাগানজুড়ে গাছে গাছে পেঁপে ধরেছে।

    দৌলতপুর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘দৌলতপুরের মাটি এমনিতেই উর্বর। এর সঙ্গে কৃষকরা সঠিক জাত নির্বাচন করতে পারলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। সাইদুর রহমান সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।’

    দৌলতখালী ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আবু সিদ্দীক বলেন, একবার গাছ লাগিয়ে একাধিকবার ফলন পাওয়া যায় বলে কৃষকদের মধ্যে মানিকগঞ্জের শাহী জাতের পেঁপের চাহিদা বাড়ছে। সাইদুর রহমানের সাফল্য দেখে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকায় এ জাতের পেঁপে চাষ ছড়িয়ে পড়ছে।

    তিনি আরও বলেন, শাহী জাতের পেঁপে উচ্চ ফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। প্রতিটি গাছ থেকে ৩০ থেকে ৪০ কেজির বেশি পেঁপে পাওয়া যায়। একবার গাছ লাগানোর পর একাধিকবার ফলন পাওয়া এ জাতের অন্যতম সুবিধা।

    তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা আবুল বাশার বলেন, ‘সাইদুর রহমানের সাফল্য শুধু তার নিজের নয়, এটি আধুনিক কৃষিরও একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তার দেখানো পথে অনেক বেকার যুবক ও কৃষক কৃষিতে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।’

  • খড়ের সংকটে কচুরিপানাই ভরসা

    খড়ের সংকটে কচুরিপানাই ভরসা

    খাল-বিল, ডোবা আর জলাশয়ে একসময় কচুরিপানা ছিল কৃষকের কাছে নিছক আগাছা। জলাশয় পরিষ্কার করতে গিয়ে তুলে ফেলে দেওয়া হতো। সেই কচুরিপানাই এখন কিশোরগঞ্জের অনেক কৃষক ও খামারির কাছে হয়ে উঠেছে গবাদিপশুর খাবারের অন্যতম ভরসা। সকাল হলেই হাতে দা নিয়ে জলাশয়ে নেমে পড়ছেন তারা। কেউ ভ্যানে, কেউ রিকশায়, আবার কেউ মাথায় করে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন কচুরিপানা।

    এর পেছনে রয়েছে চলতি বছরের ফসলহানি। টানা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফসল। ফলে কমেছে খড়ের জোগান। অন্যদিকে বেড়েছে ভুসি, দানাদার খাবার ও রেডি ফিডের দাম। এতে গবাদিপশু পালন করতে গিয়ে বাড়তি খরচের চাপে পড়েছেন কৃষক ও খামারিরা। তাই বিনা খরচে বা কম খরচে পাওয়া কচুরিপানাকেই বিকল্প খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছেন অনেকে।

    বিশেষ করে গাভি ও গরুর খাবারের জোগান ঠিক রাখতে বাড়ির আশপাশের কলাগাছ কেটে ছোট ছোট টুকরো করেও খাওয়াচ্ছেন কৃষকেরা। কচুরিপানা ও কলাগাছের সঙ্গে খড়, ঘাস, ভুসি কিংবা অন্যান্য খাবার মিশিয়ে গবাদিপশুকে দেওয়া হচ্ছে।

    কিশোরগঞ্জের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গবাদিপশু পালন বহু পরিবারের বাড়তি আয়ের অন্যতম উৎস। কেউ দুধ বিক্রি করে সংসারের খরচ চালান, কেউ গরু মোটাতাজা করে বিক্রি করেন। আবার অনেকের কাছে গবাদিপশু সঞ্চয়ের বিকল্প। প্রয়োজনের সময় গরু বিক্রি করে সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা, বিয়ে কিংবা অন্যান্য পারিবারিক ব্যয় মেটান তারা। ফলে গবাদিপশুর খাদ্যসংকট শুধু খামারেই নয়, এর প্রভাব পড়ে কৃষকের পারিবারিক অর্থনীতিতেও।জেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে খড় প্রতি কেজি প্রায় ২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে প্রতি মণ খড়ের দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার টাকা। ৩৭ কেজির এক বস্তা গমের ভুসি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬৩০ টাকা এবং ৪০ কেজির এক বস্তা ভুট্টার গুঁড়া ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে।

    এর সঙ্গে রয়েছে পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ। অন্যদিকে পর্যাপ্ত কাঁচা ঘাসও মিলছে না। অল্প কিছু উঁচু জমি, রাস্তার পাশ কিংবা বসতবাড়ির আশপাশে ঘাস পাওয়া গেলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোও কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষক ও ছোট খামারিরা।

    খামারিরা বলছেন, গরুর খাবারের দাম যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় গরু বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে একদিকে বাড়ছে খাবারের খরচ, অন্যদিকে কম দামে গরু বিক্রি করলে লোকসানের আশঙ্কা থাকছে। তাই গরু বিক্রি না করে কোনোভাবে লালন-পালন চালিয়ে যেতে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য বিকল্প খাবারের ওপর নির্ভর করছেন তারা।

    জেলার কয়েকটি উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, খাল-বিল, ডোবা ও জলাশয় থেকে কচুরিপানা সংগ্রহে ব্যস্ত কৃষক ও খামারিরা। কেউ বাড়ির পাশের জলাশয় থেকেই কচুরিপানা তুলে আনছেন। আবার কেউ কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে নৌকা কিংবা অন্য কোনো যানবাহনে করে তা সংগ্রহ করছেন। কোনো কোনো খামারি শ্রমিক নিয়োগ করেও কচুরিপানা সংগ্রহ করছেন।

    সকালে জলাশয়ের পানিতে নেমে কচুরিপানা তুলে স্তূপ করছেন কৃষকেরা। পরে ভ্যান, রিকশা কিংবা অন্যান্য যানবাহনে করে সেগুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বাড়িতে। সেখানে পরিষ্কার করে কেটে খড়, ঘাস বা অন্যান্য খাদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে গবাদিপশুকে খাওয়ানো হচ্ছে।

    করিমগঞ্জ উপজেলার রৌহা গ্রামের জেসি এগ্রো ফার্মের ব্যবস্থাপক হোসেন মোহাম্মদ রিয়াদ বলেন, “গরুর জন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ খাবার দরকার, তা জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে জমি থেকে খড় ও ঘাস পাওয়া যেত, এখন সেগুলোর সংকট। তাই বাধ্য হয়ে কলাগাছ কেটে গাভিকে খাওয়াচ্ছি। এর সঙ্গে ভুসি ও অন্যান্য খাবারও দিতে হচ্ছে। গো-খাদ্যের দাম কমানো বা সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে কৃষকদের জন্য অনেক উপকার হতো।”

    কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার চৌদ্দশত ইউনিয়নের দরবারপুর গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন বলেন, “এবার অতিবৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফসলও ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারিনি। এতে মানুষের খাবারের পাশাপাশি গরুর খাদ্যেরও সংকট দেখা দিয়েছে। খাল-বিলে কচুরিপানা না থাকলে গরুগুলো বাঁচিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে যেত।”তিনি বলেন, “আগে কচুরিপানাকে কেউ তেমন গুরুত্ব দিত না। জলাশয়ে বেশি হলে আগাছা মনে করে তুলে ফেলে দেওয়া হতো। এখন গরুর খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এটিই অনেকটা ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে শুধু কচুরিপানা দিয়ে গরুর খাবারের চাহিদা পূরণ করা যায় না। এর সঙ্গে অন্য খাবারও দিতে হয়।”

    সদর উপজেলার বটকিলা গ্রামের বাচু মিয়াকে রৌহা বিল থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ করতে দেখা যায়। তিনি বলেন, “ভুসি, দানাদার খাবার ও রেডি ফিডের দাম অনেক বেড়ে গেছে। এসব কিনে গরুকে ঠিকমতো খাওয়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূর থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ করতে এসেছি।”

    নিজের গরুর কথা বলতে গিয়ে বাচু মিয়া বলেন, “একটি ছোট বাছুর ৪৬ হাজার টাকা দিয়ে কিনে প্রায় চার বছর ধরে লালন-পালন করছি। গরুটি এখন দুধ দেয়। প্রতিদিন প্রায় ছয় লিটার দুধ পাওয়া যায়। এই গরুটি আমাদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই খাবারের সংকট হলেও কোনোভাবে লালন-পালন করে যাচ্ছি।”

    তিনি আরও বলেন, “গরুর পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়। সব খাবার বাজার থেকে কিনে দিলে দুধ বিক্রি করে তেমন লাভ থাকে না। তাই কচুরিপানা, খড় ও অন্যান্য স্থানীয় খাবার সংগ্রহ করে খরচ কমানোর চেষ্টা করছি।”

    সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের সল্প যশোদল নোয়াপাড়া গ্রামের কৃষক রাকিব মিয়া বলেন, “আগে বাড়িতে উৎপাদিত ধানের খড় দিয়েই কয়েক মাস গরু পালন করা যেত। এবার ফসলের ক্ষতির কারণে খড় কম হয়েছে। বাইরে থেকে খড় কিনতে হচ্ছে। তার ওপর ভুসি ও অন্যান্য খাবারের দামও বেশি। সব মিলিয়ে গরু পালন এখন আগের চেয়ে অনেক ব্যয়বহুল।”তিনি বলেন, “কচুরিপানা বিনা খরচে পাওয়া যায়। তাই জলাশয় থেকে তুলে এনে অন্য খাবারের সঙ্গে গরুকে দিচ্ছি। এতে কিছুটা হলেও খরচ কমানো যাচ্ছে। এখন গরু পালন করতে হলে শুধু বাজারের খাবারের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা কঠিন।”

    কৃষক রাকিব বলেন, “বাজারে গরুর মাংস ৮০০ টাকা কেজি ধরে বিক্রি হয়। কিন্তু গরু বিক্রি করতে নিয়ে গেলে অনেক সময় সেই হিসাবে দাম পাওয়া যায় না। খাদ্যের দামও বেশি। ফলে খামারিরা দুই দিক থেকেই চাপে আছেন।”

    তাড়াইল উপজেলার দামিহা ইউনিয়নের কাজলা (বগারবাইদ) গ্রামের খামারি নজরুল ইসলাম বলেন, “একসঙ্গে কয়েকটি গরু পালন করি। প্রতিদিন অনেক খাবারের প্রয়োজন হয়। বাজার থেকে সব খাবার কিনে দিলে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনও ধরে রাখা কঠিন।

    প্রান্তিক খামারিরা বলছেন, খাদ্যের দাম বাড়লেও গরু বিক্রি করে দেওয়া তাদের জন্য সহজ কোনো সমাধান নয়। কারণ এসব গবাদিপশুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের সঞ্চয়, ঋণ, শ্রম ও ভবিষ্যতের আশা। অনেকেই বছরের পর বছর গরু পালন করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিক্রির মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। তাই সাময়িক খাদ্যসংকটের কারণে গরু বিক্রি করে দিলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

    জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জে বর্তমানে গবাদিপশুর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার। এর মধ্যে গরুর সংখ্যা ৯ লাখ ২২ হাজার ৪৪৯টি এবং মহিষ ৭ হাজার ৭৪৫টি। এছাড়া জেলায় বছরে দুধ উৎপাদনের পরিমাণ ৭৫ দশমিক ০৩ লাখ মেট্রিক টন। এত বিপুলসংখ্যক গবাদিপশুর খাদ্যের বড় একটি অংশ স্থানীয় কৃষি উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ফসলের উৎপাদন কমে গেলে একই সঙ্গে কমে যায় খড় ও অন্যান্য কৃষিজাত উপজাতের জোগান। এতে গবাদিপশুর খাদ্যের বাজারে চাপ তৈরি হয় এবং বাড়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ।

    কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল মান্নান বলেন, “কচুরিপানায় পুষ্টিমান বা খাদ্যগুণ খুব বেশি নয়। তবে এটি সবুজ ঘাসের মতো এক ধরনের বাল্ক ফিড হিসেবে গবাদিপশুকে খাওয়ানো হয়। খাদ্যের সংকটের সময় অনেক খামারি কচুরিপানা ব্যবহার করছেন।”

    তিনি বলেন, “পরিমিত পরিমাণে কচুরিপানা খাওয়ালে সাধারণত সমস্যা হয় না। তবে অতিরিক্ত পরিমাণে কোনো খাদ্যই গবাদিপশুর জন্য ভালো নয়। তাই কচুরিপানার পাশাপাশি খড়, ঘাস, ভুসি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্যও গবাদিপশুর খাদ্যতালিকায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

    জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, “চলতি বছরের এপ্রিল মাসে টানা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জে ১১ হাজার ৯৩৩ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৫২ হাজার ৯৮০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ফসল উৎপাদনে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৫৮০ মেট্রিক টন। কৃষি বিভাগের হিসাবে এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭২ কোটি ২৪ লাখ টাকা।”

    তিনি বলেন, “ফসলের পাশাপাশি খড়ও নষ্ট হওয়ায় বর্তমানে গো-খাদ্যের সাময়িক সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এ সংকটও ধীরে ধীরে কেটে যাবে।”

  • ফরিদপুরের চরাঞ্চলে সবজির বাম্পার ফলন

    ফরিদপুরের চরাঞ্চলে সবজির বাম্পার ফলন

    ফরিদপুরের চরাঞ্চলে শীতকালীন সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। শীতের আগেই বিভিন্ন জাতের সবজির চারা বিক্রির ধুম পড়েছে। নতুন চারায় সয়লাব হয়ে উঠেছে চরাঞ্চলের বিভিন্ন বাজার। এ মৌসুমে ২০-২৫ কোটি টাকার চারা বিক্রির আশা করছেন চাষি ও উদ্যোক্তারা।

    চার জেলার চাষি-উদ্যোক্তা, কৃষক, শ্রমিক ও বারোমাসি চাষিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

    সবচেয়ে ফুরফুরে মেজাজে ও আনন্দে আছেন ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ও ডিক্রিচর ইউনিয়নের দুর্গম পদ্মাচরের চাষি-কৃষক ও উদ্যোক্তারা। তারা জানিয়েছেন, চরের আটটি পয়েন্টে এবার বাম্পার সবজি ফলন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে শীতের আগে ও পরে কমপক্ষে ১৭-১৮ কোটি টাকার সবজি বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তারা। পাশাপাশি কৃষক ও সবজি চাষিরা আশা করছেন, উন্নত জাতের বেগুনসহ বিভিন্ন সবজির চারা উৎপাদন তাদের ভাগ্য বদলাবে।

    শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ফরিদপুর অঞ্চলের চার জেলার ২০টি উপজেলার ২০-২৫টি চরে আগাম নতুন শীতকালীন বিভিন্ন জাতের চারা বিক্রি শুরু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে কৃষকের উৎপাদিত উন্নত জাতের বেগুন, টমেটো, কাঁচামরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শালগম, আনাচি কপি, শিমের চারা, লাউগাছ ও পুঁইশাকের চারাসহ কমপক্ষে ১০-১২ জাতের শীতকালীন চারার। বিক্রিতেও ধুম পড়ে গেছে।

    প্রতি বছরই শীত আসার আগে পূজার মধ্যে বাজারে উঠে যায় শীতকালীন আগাম শাকসবজি। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না বলে আশা করছেন কৃষকেরা।

    বিশেষ করে রাজবাড়ীর চরাঞ্চল, মাদারীপুরের শিবচরের চরাঞ্চল, শরীয়তপুরের চরাঞ্চল, ফরিদপুর সদর, সদরপুর ও চরভদ্রাসনের বিশাল বিশাল চরের মধ্যে মাথা উঁচু করে উঁকিঝুঁকি মারছে বহু জাতের শীতকালীন সবজির চারা ও গাছ।

    মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কুতুবপুর, কাঁঠালবাড়ী ঘাট, ডাইয়ারচর, সন্যাসীরচর, মুন্সীরচর ও গাবতলা বাজার চর এলাকায় শীতকালীন নতুন চারার বিক্রিতে বড় বড় হাট বসছে। বিক্রিও হচ্ছে জমজমাটভাবে।শীত আসার আগেই ব্যস্ততা বেড়ে যায় উল্লেখিত বীজতলাগুলোতে। ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর, চরমাদবদিয়া, মাইজামিয়ার ডাঙ্গী, কামারডাঙ্গীসহ দুর্গম চর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাপকহারে বাড়ছে শীতকালীন সবজির চারার কেনাবেচা।

    এ ছাড়া ফরিদপুর সদর উপজেলার ডিক্রিচর ইউনিয়নের চার-পাঁচটি চর ও পদ্মাপাড়েও বসছে সবজি ও সবজির চারা বিক্রির হাট।

    ওই ইউনিয়নের সারি সারি বীজতলায় বেড়ে উঠছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, টমেটো, বেগুন ও মরিচের চারা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব চারা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকদের কাছে। কৃষকদের হিসাবে, তিন থেকে চার মাসের এ মৌসুমে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার চারা বিক্রি হয়।

    ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, উল্লেখিত জেলার উপজেলাগুলোর ৩০টি ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে প্রতিবছর আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন করা হয়।

    উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, বেগুন, মরিচ ও টমেটোসহ বিভিন্ন সবজির চারা উৎপাদন করা হয় এসব এলাকায়। এর মধ্যে চরের বিশেষ সুবিধা হলো, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নৌকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট চর থেকেই সুলভমূল্যে চারা কেনা যায়। এ কারণে ক্রেতারা শহরের বাজারের চেয়ে চরের বীজতলা থেকেই বেশি চারা কিনে নেন।বৃহত্তর ফরিদপুরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে মাদারীপুর, ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর চারার। এসব এলাকার চারা পাশের জেলার সবজি চাষিরা কিনে নেন।

    স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর পাবনা, দাশুড়িয়া, সাভার, মানিকগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, রংপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, ভোলা, ঝালকাঠি, বরগুনা ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা এসব চারা কিনে নেন।

    চারা ব্যবসায়ী আরমান, কাইয়ুম, সোবাহান, মনো ও সুজিতের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ‘ভাল চারা পাওয়া যায় এবং মানে ভাল এমন চারা নিতে দূর হলেও আমাদের কষ্ট হয় না। চারা কিনে যদি ভাল ফলন না পাওয়া যায়, তখন অনেক কষ্ট লাগে।’

    ফরিদপুরের সবজির রাজধানী কানাইপুর, চরভদ্রাসনের প্রত্যন্ত অঞ্চল, সদরপুরের কৃষ্ণপুর, গজারিয়া, যাত্রাবাড়ী, নিজগ্রাম, সদর উপজেলার ডিক্রিচর ও নর্থচ্যানেল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ বীজতলা বাঁশের চাটাই দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

    এই চাটাইয়ের নিচে সারি সারি বীজতলায় বেড়ে উঠছে টমেটো, বেগুন, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি, লাউ, মিষ্টিকুমড়া ও মরিচের চারা। কোথাও চাটাই সরিয়ে চারায় পানি দিচ্ছেন কৃষকেরা। কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ ব্যস্ত নতুন বীজতলা তৈরির কাজে।

    কানাইপুর এলাকার চাষি হাসান ১০০টি মাচা করছেন। তার ভাষ্য, প্রতিটি বীজতলার এক দফার চারা কমপক্ষে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এভাবে দুই-তিন দফায় চারা করেন। সব মিলিয়ে তাদের বীজতলা থেকে প্রতি মৌসুমে ৫০-৬০ লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়।চরভদ্রাসন এমপিডাঙ্গীর নওশের বলেন, ‘আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বীজতলায় চারা উৎপাদন শুরু হয়। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হয় বিক্রির ধুম। তিন থেকে চার দফায় চারা উৎপাদন ও বিক্রি হয় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত।’

    চারার ব্যবসায় বেড়ে ওঠে যেভাবে :

    চারা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কমপক্ষে ২৫ জন কৃষক ও কৃষিশ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাধীনতার আগে থেকেই ফরিদপুর অঞ্চলে শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন ও বিক্রি হয়ে আসছে। আস্তে আস্তে এই ব্যবসায়ের বিস্তার ঘটে। কৃষকেরা খৈল, জৈব সার ও পরিমিত রাসায়নিক সার ব্যবহার করে উন্নত জাতের চারা উৎপাদন শুরু করেন। একপর্যায়ে ফরিদপুর অঞ্চলের চারার সুনাম দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। জেলার বাইরে আরও ১২-১৩ জেলায় এসব চারার চাহিদা তৈরি হয়।

    কৃষকদের দাবি, আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বীজতলায় চারা উৎপাদন শুরু হয়। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হয় বিক্রির ধুম। তিন থেকে চার দফায় চারা উৎপাদন ও বিক্রি চলে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

    ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল এলাকার চারা ব্যবসায়ী আ. হক বলেন, ‘চরের বীজতলায় উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করা হয়।’

  • উপকূলে ছত্রাক প্রভাবে বিপন্ন নারকেল

    উপকূলে ছত্রাক প্রভাবে বিপন্ন নারকেল

    একসময় উপকূলীয় জনপদের বাড়ির উঠান, বাগান, সড়কের পাশ ও মাছের ঘেরের পাড়জুড়ে ছিল সারি সারি নারকেলগাছ। বাগেরহাটের ফকিরহাট ছিল নারকেল উৎপাদনের অন্যতম প্রধান এলাকা। কিন্তু রোগ-পোকা, ছত্রাক, লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়ের অভিঘাতে কমছে গাছের ফলন। একই সঙ্গে কাঁচা ডাব হিসেবে অধিকাংশ নারকেল বিক্রি হয়ে যাওয়ায় পরিপক্ব নারকেলের সংকটও তীব্র হচ্ছে।

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ফকিরহাটে নারকেল উৎপাদন হয়েছিল ৪ হাজার ৬০০ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে ৪ হাজার ৫০ টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার টনে নেমেছে। এক দশকে উৎপাদন কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ। তবে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, গত দুই দশকে অনেক গাছে ফলন কমেছে ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত।
    সম্প্রতি ফকিরহাটের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাড়ির বাগান, মাছের ঘের ও সড়কের পাশে এখনও অসংখ্য নারকেলগাছ রয়েছে। তবে অনেক গাছেই পাতায় কালো দাগ ও সাদা আবরণ দেখা যাচ্ছে। কমে গেছে পাতার সংখ্যাও। ফলে গাছ থাকলেও আগের মতো ফলন হচ্ছে না।

    কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণায় বাগেরহাটে রুগোজ স্পাইরালিং হোয়াইটফ্লাইয়ের ব্যাপক সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২১-২২ সালের এক গবেষণায় জেলার প্রায় ৯৭ শতাংশ নারকেলগাছ এ পোকার আক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য উঠে আসে। পোকাটি পাতায় সাদা আবরণ তৈরি করে এবং পরে কালো ছত্রাকের আস্তরণ তৈরি হতে সহায়তা করে। এতে গাছের সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হয় এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে।
    ফকিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল হোসেন বলেন, একটি সুস্থ নারকেলগাছে সাধারণত প্রায় ৩৬টি পাতা থাকে। অথচ অনেক গাছে এখন মাত্র ১৫-২০টি পাতা রয়েছে।
    কৃষক জিন্নাত শেখ বলেন, ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর থেকেই নারকেলের উৎপাদন কমতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে আইলা, আম্পান ও ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা এবং রোগ-পোকার আক্রমণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

    প্রায় ২০০টি নারকেলগাছ রয়েছে জিন্নাত শেখের। তাঁর ভাষ্য, সাত-আট বছর আগে এসব গাছ থেকে বছরে প্রায় এক লাখ টাকা আয় হতো। এখন আয় কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকায়।
    ফলন কমার প্রভাব পড়েছে ফকিরহাটের ঐতিহ্যবাহী নারকেল বাজারে। স্থানীয় পাইকারদের মতে, একসময় প্রতি রবি ও বুধবার বাজারে লাখ লাখ নারকেল কেনাবেচা হতো। এখন বেচাকেনা সীমিত হয়ে এসেছে মাত্র দুই গলিতে।
    পাইকার নিত্যানন্দ দাস, আলী শেখ ও শেখ হাফিজুল ইসলাম জানান, কয়েক বছর আগেও একজন ব্যবসায়ী দিনে ৮-১০ হাজার নারকেল কিনতেন। এখন তাঁরা কিনছেন মাত্র ১ হাজার থেকে দেড় হাজার।
    দামও বেড়েছে কয়েক গুণ। পাঁচ-ছয় বছর আগে ২৫-৩০ টাকায় বিক্রি হওয়া একটি নারকেলের দাম এখন আকারভেদে ১৩০-১৬০ টাকা।

    নারকেলের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় শিল্পেও। গ্র্যান্ড অটো নারকেল তেল মিলের মালিক স্বপন কুমার বসু বলেন, ২০০৩ সালের দিকে বাগেরহাটে প্রায় ১০৯টি নারকেল তেল মিল ছিল। কাঁচামালের সংকটে এর মধ্যে শতাধিক বন্ধ হয়ে গেছে।

    তাঁর দাবি, উৎপাদিত নারকেলের প্রায় ৯০ শতাংশই এখন কাঁচা ডাব হিসেবে বিক্রি হয়। কোভিড-১৯ মহামারি ও ডেঙ্গুর সময় ডাবের চাহিদা বাড়ায় পরিপক্ব হওয়ার আগেই নারকেল বিক্রির প্রবণতা আরও বেড়েছে।
    নারকেলের সংকট শুধু কৃষি ও বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় এলাকার ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতিতেও।
    গৃহিণী বিশাখা দাস বলেন, আগে নারকেলের দুধ দিয়ে ডিমের কোরমা ও মাছ রান্না করা হতো। কোরানো নারকেল দিয়ে তৈরি হতো চিংড়ির বড়া, পাটুরি, নাড়ু, পুলি ও ভাপা পিঠা। এখন নারকেলের দাম বেশি হওয়ায় উৎসব ছাড়া এসব খাবার তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

    ফকিরহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নারকেলগাছে রোগ-পোকা দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। তবে কৃষি অফিসের লজিস্টিক সহায়তা সীমিত। গত বছর ৩০ জন গাছি প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এ বছর ৮০০ কৃষককে নারকেলের চারা দেওয়া হয়েছে।

    বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মতাহার হোসেন বলেন, গাছের বয়স, সুষম সার ব্যবহারের ঘাটতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও সাদামাছির আক্রমণ নারকেল উৎপাদন কমার অন্যতম কারণ।
    বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মাইনুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে পোকামাকড় ও ছত্রাকজনিত রোগ নারকেল উৎপাদনে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।

  • চুয়াডাঙ্গায় গ্রিন হাউসে ভ্যানিলা চাষ

    চুয়াডাঙ্গায় গ্রিন হাউসে ভ্যানিলা চাষ

    চুয়াডাঙ্গায় প্রথমবারের মতো দামি মসলা ও সুগন্ধি ফসল ভ্যানিলা চাষ করে সাড়া ফেলেছেন কৃষক হুমায়ুন কবীর ফরাজী (৫১)। চার বছর পরিচর্যার পর তার তৈরি গ্রিন হাউসে এখন থোকায় থোকায় ঝুলছে ভ্যানিলা ফল।

    চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর কলোনীপাড়ার বাসিন্দা হুমায়ুন কবীর ১৮ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন ‘নিউ কামাল এগ্রো’ নামে সমন্বিত কৃষি খামার। ফল চাষ ও পশুপালনের পাশাপাশি খামারের বিশেষ আকর্ষণ ১০ কাঠা জমিতে তৈরি কৃত্রিম জলবায়ু নিয়ন্ত্রিত ভ্যানিলা বাগান।

    দীর্ঘদিন ফল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হুমায়ুন ২০২২ সালে প্রতিবেশী দেশ থেকে পেনিফোলিয়া জাতের ভ্যানিলার লতা এনে চাষ শুরু করেন। গ্রিন হাউসে ছায়াযুক্ত ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে প্রায় ৭০০টি পিলারে বেড়ে উঠেছে ভ্যানিলার লতা। সেখানে ৮-১০ ইঞ্চি লম্বা বরবটির মতো ফল ধরেছে।

    হুমায়ুন কবীর বলেন, এ পর্যন্ত ভ্যানিলা বাগানে প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ১২০ কেজি ভ্যানিলা সংগ্রহের আশা করছেন তিনি। বাজারে প্রতি কেজি শুকনো ভ্যানিলার দাম ৩০-৪০ হাজার টাকা। প্রক্রিয়াজাতের পর এ বছর ৭-৮ লাখ টাকা বিক্রির লক্ষ্য রয়েছে তাঁর।

    তাঁর দাবি, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় খোলা জমিতে ভ্যানিলা চাষ কঠিন হলেও গ্রিন হাউসে তাপমাত্রা ১৬-২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রেখে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এ ফসল উৎপাদন সম্ভব।

    চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, হুমায়ুন কবীরের সাফল্য প্রমাণ করে, উপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশে ভ্যানিলা চাষ সম্ভব। এ চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

  • লবণাক্ত জমিতে সবুজের সজীবতা

    লবণাক্ত জমিতে সবুজের সজীবতা

    উপকূলীয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার খুঁটিকাটা গ্রাম। একসময় যেখানে লবণাক্ততার প্রভাবে শীত বা গ্রীষ্মে সবজি চাষ করা ছিল এক দুর্ভেদ্য চ্যালেঞ্জ, সেই গ্রামেই এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে। দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহ আর কৃষকদের ব্যস্ততা নিয়ে খুঁটিকাটা এখন হয়ে উঠেছে এক স্বাবলম্বী জনপদ।

    উপকূলীয় এই এলাকার প্রায় ৪০০ কৃষক এখন নিয়মিত বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করে নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাচ্ছেন। স্থানীয় কৃষক নীলকান্ত ও সুব্রত জানান, অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে চাষাবাদে প্রতিনিয়ত ক্ষতি হওয়ায় অনেকে কৃষিকাজ ছেড়ে দিতে বসেছিলেন। তবে সিনজেনটা কোম্পানির ‘গো-গ্রো’ প্রকল্পের কারিগরি সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও উন্নত মানের উচ্চফলনশীল বীজ ব্যবহারে নতুন আশার আলো দেখতে পান তারা।
    সবজি চাষে সেচের প্রধান বাধা মিষ্টি পানির সংকট মেটাতে এই প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামের বিভিন্ন পয়েন্টে ১৫টি পুকুর খনন করা হয়েছে। বর্ষার পানি ধরে রেখে সে কাজে লাগানোর ফলে বছরজুড়েই এখন বৈচিত্র্যময় সবজি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। কেবল কৃষি উন্নয়নই নয়, পরিবেশ রক্ষা ও সবুজ বেষ্টনী তৈরিতে গ্রামের দুই কিলোমিটার রাস্তার দু’পাশে রোপণ করা হয়েছে লবণসহিষ্ণু কয়েক শ গাছের চারা।

    তবে কৃষকদের নতুন অর্জনের পথে একমাত্র অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে যোগাযোগের দুর্বল অবকাঠামো।
    চাষিরা জানান, গ্রামে প্রায় তিন কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা থাকায় বর্ষা মৌসুমে যাতায়াত অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

    এতে উৎপাদিত ফসল সময়মতো মূল বাজারে নেওয়া সম্ভব হয় না এবং পচনশীল সবজি নষ্ট হয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়। দ্রুত সড়কটি পাকাকরণের দাবি জানান তারা।
    কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিকূল পরিবেশকে জয় করে খুঁটিকাটা গ্রামের কৃষকদের এই ঘুরে দাঁড়ানো উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিসম্ভাবনার এক ইতিবাচক মডেল। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও উপযুক্ত সরকারি পৃষ্ঠোপোষকতা পেলে এই গ্রাম সারা দেশের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে।

  • ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে গেলেন কৃষকেরা,

    ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে গেলেন কৃষকেরা,

    কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় ইউনিয়নে সার বিতরণে দেরি হওয়ায় এক ডিলারের গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা সার নিয়ে গেছেন। আজ সোমবার সকালে বন্দবেড় বাজারের মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের গুদামে এ ঘটনা ঘটে।

    ডিলারের দাবি, গুদাম থেকে এক–দেড় শ বস্তা ইউরিয়া সার নেওয়া হয়েছে। তবে সার নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম বসুনিয়া। তিনি বলেন, সার লুট হয়ে যাওয়ার ভিডিওটি ভুয়া। বন্দবেড় ইউনিয়নে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। রৌমারী উপজেলায় ৪২ হাজার কৃষক আছেন এবং তাঁরা সবাই সঠিকভাবে সার পাচ্ছেন।একই দিন ভূরুঙ্গামারীতে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগে সড়ক অবরোধ করেছেন কৃষকেরা। এ সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে কিছুক্ষণ অবরুদ্ধ করে রাখেন তাঁরা।

    স্থানীয় একাধিক কৃষক বলেন, আজ বন্দবেড় বাজারে সার বিতরণের কথা ছিল। কৃষকেরা রাত দুইটা থেকে গুদামের সামনে এসে লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেন। কিন্তু সকাল হলেও সার বিতরণ শুরু না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। সকাল ৯টা থেকে ১০টার দিকে একপর্যায়ে কয়েকজন কৃষক গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সার নিয়ে যান।

    সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন কৃষক গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে সার বের করছেন। কেউ মাথায় করে, আবার কেউ ভ্যানে করে বস্তা নিয়ে যাচ্ছেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে নিয়ে যাওয়া সার ফেরত পাওয়া যায়নি।গুদামে ৭৫০ বস্তা সার ছিল জানিয়ে মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সকালে প্রায় এক হাজার কৃষক সার নিতে লাইনে দাঁড়ান। কে আগে সার নেবেন, তা নিয়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু হলে পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁরা থানায় ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে যান। এ সুযোগে কৃষকেরা গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে এক থেকে দেড় শ বস্তা সার নিয়ে যান।

    পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় গুদামে থাকা বাকি সার বিতরণ করা হচ্ছে বলে জানান সাইফুল ইসলাম। বিতরণের হিসাব শেষ হলে কত বস্তা সার নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।

    রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাওসার আলী বলেন, সকালে সার বিতরণের সময় পুলিশকে জানানো হয়নি। এ সময় কৃষকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েক বস্তা সার নিয়ে যান বলে কৃষি বিভাগ থেকে জানানো হয়। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।ভূরুঙ্গামারীতে কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ

    আজ সকালে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট এলাকায় সার বিতরণ শুরু হলে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করেন কৃষকেরা। একপর্যায়ে তাঁরা সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেন। খবর পেয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গেলে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা তাঁকে অবরুদ্ধ করেন। পরে পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে।

    ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আজিম উদ্দিন বলেন, উপজেলার কোনো না কোনো ইউনিয়নে প্রতিদিন সার নিয়ে কৃষকেরা বিক্ষোভ করছেন। কোথাও কোথাও সড়ক অবরোধও করছেন তাঁরা। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে প্রতিদিনই যেতে হচ্ছে।

    ওসি বলেন, কৃষি বিভাগে কী পরিমাণ সার মজুত আছে এবং কৃষকদের চাহিদা কত, তা পরিষ্কারভাবে জানানো হলে এ ধরনের সমস্যা কমত। কৃষি বিভাগ পর্যাপ্ত সার থাকার কথা বলছে, অথচ কৃষকেরা সার না পেয়ে সড়ক অবরোধ করছেন। এতে পুলিশের অন্য কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

  • ১৭ সেপ্টেম্বর কার্ড পাবেন এক লাখ কৃষক

    ১৭ সেপ্টেম্বর কার্ড পাবেন এক লাখ কৃষক

    বর্তমান সরকারের একটি বড় উদ্যোগ কৃষক কার্ড। গত ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের দিন প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু হয়। এবার কৃষক কার্ড কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে ১৭ সেপ্টেম্বর। ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন বলে কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।ওইদিন একই সঙ্গে ৫০ জেলায় উদ্বোধনী কর্মসূচি আয়োজন করা হবে। সারাদেশের এক লাখ কৃষককে প্রণোদনার অর্থ দেওয়া হবে। এরই মধ্যে নিবন্ধনের আওতায় আসা ১৬ লাখ ৩০ হাজার কৃষকের মধ্যে এক লাখ কৃষকের ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

    কৃষক কার্ড কৃষকদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র এবং কৃষিসেবা পাওয়ার একটি সমন্বিত মাধ্যম হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।এর আগে প্রি-পাইলটিংয়ে প্রাথমিকভাবে ১০ জেলার ১১টি ব্লকে কার্ড দেওয়া হয়েছিল। শুধু ফসল উৎপাদনকারী কৃষকের নয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদসহ কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে এর আওতায় আনার হচ্ছে।

    এসব পর্যায়ে ফসল উৎপাদক, বর্গাচাষি, ইজারা চাষি, মৎস্যচাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারিরা এই কার্ডের সুবিধা পাবেন। এর মাধ্যমে সার, বীজ ও কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণে ভর্তুকি, কৃষিঋণ, সেচ, কৃষিযন্ত্র, সরকারি প্রণোদনা, কৃষিবিমা, প্রশিক্ষণ, আবহাওয়া ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।এদিকে জানা গেছে, মূল পর্বে কৃষক কার্ডে যুক্ত হচ্ছে কিউআর কোড। কার্ডধারী কৃষকদের শনাক্ত করতে ও তাদের সরকারি সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে কার্ডে কিউআর কোড যুক্ত হচ্ছে। ফলে কার্ড স্ক্যান করলেই কার্ডধারী কৃষককে সহজে শনাক্ত করা যাবে।

    এ পর্যন্ত নিবন্ধনের আওতায় আসা ১৬ লাখ ৩০ হাজার কৃষকের মধ্যে এক লাখের ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। উদ্বোধনের দিন প্রায় এক লাখ কৃষকের হাতে প্রণোদনার অর্থ পৌঁছে যাবে। এছাড়া ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য আরও পাঁচ লাখ কৃষকের তথ্য যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন করা হয়েছে। কার্ডের আওতায় ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ প্রণোদনাসহ অন্যান্য সুবিধা পান।

    কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় কৃষক কার্ডের কার্যক্রম চলছে। বিশ্বব্যাংক, ইফাদ ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রকল্পটি সংক্ষেপে ‘পার্টনার’ প্রকল্প নামে পরিচিত।

    পার্টনার প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১৬ লাখ ৩০ হাজার কৃষক নিবন্ধনের আওতায় এসেছেন। নিবন্ধিত কৃষকদের প্রায় ৯৬ শতাংশ জমিতে ফসল চাষের সঙ্গে যুক্ত। মৎস্য চাষ করেন দেড় শতাংশ এবং গবাদিপশু পালন করেন প্রায় ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। লবণচাষি রয়েছেন মাত্র ১৫৭ জন, যা মোট নিবন্ধিত কৃষকের শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।

    জমির মালিকানার হিসাবে নিবন্ধিত কৃষকদের ৪৩ শতাংশের বেশি ক্ষুদ্র কৃষক। তাদের মালিকানাধীন জমির পরিমাণ ৫০ থেকে ২৪৯ শতক। ৫ থেকে ৪৯ শতক জমির মালিক প্রান্তিক কৃষক রয়েছেন প্রায় ৪০ শতাংশ। শূন্য থেকে ৫ শতক জমির মালিক কৃষক রয়েছেন প্রায় ৮ শতাংশ। ২৫০ থেকে ৭৪৯ শতক জমির মালিক মাঝারি কৃষক রয়েছেন ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। ৭৫০ শতকের বেশি জমির মালিক বড় কৃষক রয়েছেন শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ।

    এছাড়া চলতি অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। পার্টনার প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী, দেশে কৃষকের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ২৭ লাখ। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষকের মধ্যে কৃষক কার্ড বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। পর্যায়ক্রমে বাকি কৃষকদেরও এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।