কৃষি

  • মালচিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষে সফল মাঈন উদ্দিন

    মালচিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষে সফল মাঈন উদ্দিন

    এক সময় ছিলেন সেলুন ব্যবসায় জড়িত। তবে ছোটবেলা থেকেই বাবাকে কৃষিকাজ করতে দেখে কৃষির প্রতি তার আলাদা ভালো লাগা। প্রায় তিন বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের দায়িত্ব আসে তার কাঁধে। আগের পেশা বদলে কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এরপর থেকে বিভিন্ন রকম সবজি চাষ করে সংসারের হাল ধরেছেন।

    স্বল্প পরিসরে কখনো লাউ, করলা, শিম, বেগুন ও মরিচসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করছেন। চলতি মৌসুমে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ ও বি-স্ট্রং প্রকল্পের আওতায় মালচিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষ করেন। এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে প্রথমবারেরই সফল তিনি।

    বলছি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বিদ্যাকুট ইউনিয়নের বিদ্যাকুট গ্রামের কৃষক মাঈন উদ্দিনের কথা। এমন সাফল্যে তার মধ্যে নতুন করে কৃষির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাকে দেখে গ্রামের আরো অনেকে বেগুন চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

    মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘আমার বাবা কৃষি কাজ করতেন। ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে মাঠে যাওয়া-আসা করতাম। তখন থেকেই কৃষির প্রতি আগ্রহের সৃষ্টি হয়। শুরুতে বিভিন্ন সবজি চাষ করেছি। এবার কৃষি অফিসের পরামর্শে প্রথমবার মালচিং পদ্ধতিতে ‘পার্পল কিং’ জাতের বেগুন চাষ করি।’

    তিনি আরও বলেন, ‘মালচিং দেওয়ার পর জমিতে আগাছা কম হয়েছে, মাটিতে আর্দ্রতাও ভালো থাকছে। গাছের বৃদ্ধি ও ফলনও ভালো হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০-৪৫ কেজি বেগুন তুলতে পারছি। বর্তমানে প্রতি কেজি বেগুন ৭০-৮০ টাকা দরে বিক্রি করা যাচ্ছে। বাজারে দাম ভালো থাকলে কোনো কোনো দিন ১০০ টাকা কেজি দরেও বেগুন বিক্রি করা যাচ্ছে।’সরেজমিনে দেখা যায়, মাঠে যে পরিমাণ বেগুন আছে আরো দুই মাস নিয়মিত বিক্রি করতে পারবেন।

    স্থানীয় কৃষক খোকন মিয়া জানান, ‘কৃষি অফিসের পরামর্শ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে বেগুন চাষে সাফল্য পাওয়া সহজ হয়েছে। বেগুনের বাজার ভালো তাই লাভবান হওয়ার সুযোগ অনেক।’

    বিদ্যাকুট ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সফুরুল্লাহ বলেন, ‘মাঈন উদ্দিন প্রথমবার মালচিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছেন। তার জমি নিয়মিত পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষকের উৎপাদন ও আয় বাড়ানো সম্ভব, আশাকরি সম্পূর্ণ মৌসুম শেষে তিন লক্ষাধিক টাকা আয় করবেন।’

    উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, ‘বি-স্ট্রং প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিতে চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। মাঈন উদ্দিন মালচিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষ করে ভালো ফলন ও বাজারমূল্য পেয়েছেন। নিজের সাফল্যে চলতি মৌসুমে প্রায় ৪ বিঘা জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষের পরিকল্পনা রয়েছে তার।’

    সেলুন ব্যবসায় ছেড়ে কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া মাঈন উদ্দিনের এ সাফল্য এখন এলাকার অন্য কৃষকদেরও আধুনিক প্রযুক্তিতে চাষাবাদে উৎসাহিত করছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করতে নিয়মিত প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণ এবং মাঠ দিবসের আয়োজন করা হচ্ছে।

  • বিদেশি ফল চাষে জীবননগরের তরুণ উদ্যোক্তাদের সাফল্য

    বিদেশি ফল চাষে জীবননগরের তরুণ উদ্যোক্তাদের সাফল্য

    চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় বিদেশি ফল উৎপাদনে পাল্টে দিয়েছে অনেক কৃষকের ভাগ্য। বদলে দিয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র। এক সময় শুধু ইরি-বোরো ও আমন চাষের পাশাপাশি প্রচলিত কিছু শাক-সবজি চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তাদের কৃষিকাজ। কিন্তু এখনআধুনিক পদ্ধতিতে নানা জাতের বিদেশি ফলের আবাদ করে কৃষকরা লাখ লাখ টাকা আয় করছেন।

    ধানের জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফল উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য এখানকার কৃষকদের মুখে হাসি এনে দিয়েছে। কৃষকদের কাছে বিদেশি ফল উৎপাদন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

    দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় বিদেশি ফল চাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।

    উপজেলার কৃষকরা এখন চাষ করছেন অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, লংগান, মাল্টা, ড্রাগন, আনারকলি ও আঙুরের মতো ভিনদেশি ফল। ১৫ বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা এই আবাদ এখন বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। এক সময় মনে করা হতো, বাংলাদেশের মাটিতে আঙুর চাষ প্রায় অসম্ভব। কারণ আঙুর মানেই ছিল বিদেশি ফল, যা আমাদের দেশে শুধু আমদানি করেই পাওয়া যায়। কিন্তু সময় বদলেছে। উন্নত জাত, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং কৃষকদের আগ্রহের কারণে এখন জীবননগর উপজেলায় সফলভাবে আঙুরসহ বিদেশি ফলের চাষ হচ্ছে।স্থানীয় কৃষকদের মতে, উর্বর পলিমাটিতে এই ফলগুলোর চাষে খরচ কম, আবার ফলনও ভালো। ফলে চাহিদা বাড়ছে এবং বাজারেও মিলছে ভালো দাম। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরের ফলের দোকানগুলোতে সরবরাহ হচ্ছে জীবননগরের উৎপাদিত ফল।

    জীবননগরে পরীক্ষামূলকভাবে আনারকলি চাষ করে সফলতা পেয়েছেন অনন্তপুর গ্রামের আকশেদ আলী। গাছে গাছে ঝুলছে ফুল আর কাঁচা-পাকা সবুজ ফল। অল্প খরচে লাভজনক হওয়ায় এ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন অন্য কৃষকরা।

    আকশেদ আলী জানান, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তিনি ড্রাগন ও মাল্টার চাষ করেছেন। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ইউটিউবে ভিডিও দেখে দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ের আদি ফল আনারকলির চারা সিরাজগঞ্জ থেকে সংগ্রহ করেন। জমি প্রস্তুত করে চারাগুলো রোপণ করেন। এরপর জমিতে সেচ, সার, কীটনাশকসহ নিয়মিত পরিচর্যা করতে থাকেন। মাত্র ছয় মাসের মাথায় থোকায় থোকায় ফুল আসতে শুরু করে। ফলগুলোকে সঠিকভাবে ধরে রাখতে এবং পচন থেকে রক্ষা করতে বাঁশের খুঁটি ও তার দিয়ে মাচা তৈরি করে দেওয়া হয়।

    বর্তমানে মাচায় মাচায় ঝুলছে কাঁচা ও পাঁকা আনারকলি ফল। আগস্টের শুরু থেকে পাঁকা ফল তোলা শুরু হয়েছে। এসব ফল ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বাজারজাত করা হচ্ছে।

    জীবননগর উপজেলার রাজাপুর গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সজল আহমেদ ২০১৪ সালে মাত্র ৯ বিঘা পেয়ারা বাগান থেকে শুরু করে বর্তমানে তিনি প্রায় ১৪০ বিঘা জমিতে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির ফলের বাগান গড়ে তুলেছেন। তার বাগানে বর্তমানে মরোক্কো, পাকিস্তান, আফ্রিকা ও ভিয়েতনাম জাতের মাল্টা ৪০ বিঘা, বিভিন্ন প্রজাতির আম ৩৫ বিঘা, এছাড়া ড্রাগন, কমলা, আঙুর, অ্যাভোকাডোসহ ২০০ রকমের দেশি-বিদেশি ফল রয়েছে।

    সজল আহমেদ বলেন, পেয়ারা চাষে কাঙ্ক্ষিত লাভ না পেয়ে তিনি ২০১৪ সালে মাল্টা চাষে মনোনিবেশ করেন। শুরুতে কিছুটা চ্যালেঞ্জ থাকলেও ধীরে ধীরে তার বাগানের পরিধি ও ফলন বাড়তে থাকে।

    বর্তমানে সাধারণ সবুজ মাল্টার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ‘ইয়েলো কিংসহ (হলুদ জাতের মাল্টা) প্রায় ১০ প্রজাতির দেশি-বিদেশি মাল্টা চাষ করে তিনি বাজিমাত করেছেন। তার এই বিশাল কর্মযজ্ঞে ‘বিসমিল্লাহ নার্সারি ও ফলের বাগান’ নামের একটি কৃষি প্রকল্প গড়ে উঠেছে। সজলের এই বাগান দেখতে এবং চাষ পদ্ধতি শিখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থী ও নতুন উদ্যোক্তারা ভিড় করেন।

    উপজেলার উথলী গ্রামের আশরাফুজ্জামান মিলু ২০১০ সাল থেকে ড্রাগন ও মাল্টা চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তার ২২ বিঘা জমিতে ড্রাগন ও ৬ বিঘা জমিতে মাল্টা এবং ১০ বিঘা জমিতে পেয়ারার চাষ রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা প্রাকৃতিকভাবে ফল চাষ করছি। এসব বাগানে ফল বড় করতে কোনো মেসিডিন ব্যবহার করি না। এতে ফলের আকার ছোট হচ্ছে, দামও কম পাচ্ছি।

    একই গ্রামের রাজু আহমেদ দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ফল চাষ করছেন। ২০১০ সালে আপেল কুল চাষের মাধ্যমে তার ফল চাষে হাতেখড়ি। তারপর তিনি থাই পেয়ারা চাষ করেন। এরপর মাল্টা ও ড্রাগন চাষ শুরু করেন।

    তিনি বলেন, এক বিঘা জমিতে থাই পেয়ারা চাষ করলে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়।

    উপজেলার হাসাদাহ গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ করে দারুণ সাফল্য পেয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা দুই ভাই আশরাফুল ইসলাম ও তরিকুল ইসলাম। তারা সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে প্রায় ৭৫০টি পার্পেল ও বাইকুনুর জাতের আঙুর গাছ লাগিয়েছেন। বাগান থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভের মুখ দেখছেন তারা।

    জীবননগর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জীবননগরে ড্রাগন ৬৮৮ হেক্টর, মাল্টা ৩১২ হেক্টর, কমলা ১২০ হেক্টর, শরিফা ১ হেক্টর, আঙুর ৯ হেক্টর, রকমেলন ৬ হেক্টর, আনারকলী ২ হেক্টর, অ্যাভোকাডো ৪ হেক্টর, রাম্বুটান শূন্য দশমিক ১৩ হেক্টর, পেয়ারা ৭৪৮ হেক্টর, আনার শূন্য দশমিক ৫০ হেক্টর ও বারোমাসি কাঁঠাল শূন্য দশমিক ৫০ হেক্টর চাষ হয়েছে।

    সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জীবননগরের এসব ফল বাগানের খবর ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিন আশপাশের গ্রাম থেকে শুরু করে যশোর, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর এমনকি ঢাকা থেকেও মানুষ ভিড় করছেন বাগান দেখতে।

    বাগানে ঘুরতে আসা স্থানীয় দর্শনার্থী হাসান নিলয় বলেন, এমন ফল আগে শুধু টিভি আর ইউটিউবে দেখেছি। এখন গ্রামে কাছ থেকে দেখতে পারছি।

    আরেক দর্শনার্থী হাসিবুল ইসলাম বলেন, এসব বিদেশি ফল খেতেও সুস্বাদু আর দেখতে সুন্দর। আমরাও এমন বাগান করার কথা ভাবছি।

    জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, বিদেশি এই ফলের চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। আমরা প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ দিচ্ছি। এতে কৃষকদের নতুন আয়ের পথ খুলবে। জীবননগর উপজেলায় ধান, পাট আর ভুট্টা চাষের পাশাপাশি বিদেশি ফলের বাণিজ্যিক চাষ কৃষির নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। এতে বাড়বে লাভ আর বদলাবে গ্রামীণ অর্থনীতি।

    তিনি বলেন, জীবননগরের মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে বিদেশি ফলের চাষ সফল হচ্ছে। কৃষকরা লাভবান হওয়ায় এই চাষে আগ্রহ বাড়ছে। এর ফলে আমদানি নির্ভরতা কমবে, কৃষি হবে টেকসই।

  • অতিবৃষ্টির ভোগান্তি, আমন আবাদে ব্যস্ত কৃষকরা

    অতিবৃষ্টির ভোগান্তি, আমন আবাদে ব্যস্ত কৃষকরা

    ভোলার লালমোহন উপজেলায় অতিবৃষ্টিতে জমে থাকা পানি, কোথাও বীজতলার চারা নষ্ট হওয়া, আবার কোথাও অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আমন আবাদে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকরা। যার ফলে এবারের আমান আবাদ কিছুটা দেরিতে হচ্ছে। তবে এ সব বিপত্তি পেরিয়ে বর্তমানে আমন ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। এমনটাই জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহ মো. আরিফুল ইসলাম।

    তিনি বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের কারণে অনেকগুলো কালভার্ট বন্ধ হয়ে গেছে। যার জন্য আমনের মাঠে জমে থাকা বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না। ফসলের মাঠের পানি অপসারণ প্রবাহ কমে যাওয়ায় জমিতে পানি থাকায় আবাদে দেরি হয়েছে। তবে শুরুতেই আমাদের অফিসের পক্ষ থেকে কৃষকদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আমন বীজধান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যার জন্য বৃষ্টিতে কিছু কিছু বীজতলা নষ্ট হলেও কৃষকদের চারার জন্য তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ শেষ হয়েছে। এছাড়া আগামী কিছুদিনের মধ্যেই বাকি জমিগুলোতে ধানের চারা রোপণ শেষ হয়ে যাবে। এজন্য আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে নিয়মিত মাঠে কাজ করছেন।’

    উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, লালমোহন উপজেলায় চলতি মৌসুমে মোট ২৩ হাজার ৮৭০ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে উফশী ও স্বর্ণা জাতসহ বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাতের ধান ২২ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে, স্থানীয় জাতের রোপা আমন ১ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে এবং নতুন হাইব্রিড-৪ জাতের ধান ২০ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

    এদিকে অতিবৃষ্টির কারণে আমন আবাদে শুরুতে কিছুটা বিপাকে পড়লেও এখন মাঠে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এমন দৃশ্য।

    চরভূতা ইউনিয়নের তারাগঞ্জ এলাকার কৃষক মো. বেলাল বলেন, ‘এ বছর প্রায় ১৮৮ শতাংশ জমিতে আমন ধান চাষের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি। এরই মধ্যে কিছু জমিতে চারা রোপণ শুরু করেছি। অতিবৃষ্টির কারণে জমিতে পানি জমে থাকায় কিছুটা দেরি হয়েছে। বৃষ্টিতে প্রথম দফায় বীজতলার চারা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আবার নতুন করে চারা তৈরি করতে হয়েছে। ধানের চারা উৎপাদন থেকে শুরু করে জমিতে রোপণ শেষ করা পর্যন্ত প্রায় ৯০ হাজার টাকা খরচ হবে।’

    ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বালিরটেক এলাকার কৃষক মো. আবু তাহের এবার ৩৬০ শতাংশ জমিতে আমন ধান চাষ করবেন।

    তিনি বলেন, ‘বৃষ্টিতে বীজতলার কিছুটা সমস্যা হয়েছে। তবে আশা করছি তা কাটিয়ে উঠতে পারবো। জমিতে চাষ দেওয়া শেষ করে চারা রোপণের জন্য প্রস্তুত করেছি। বীজতলায় চারা উৎপাদন থেকে শুরু করে জমি প্রস্তুত করতে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আশা করছি আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর আমনের ভালো ফলন পাওয়া যাবে।’

  • জ্বালানি থেকে বাণিজ্য : পাটকাঠিতে কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎস

    জ্বালানি থেকে বাণিজ্য : পাটকাঠিতে কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎস

    একসময় পাটের আঁশ ছাড়ানোর পর অবহেলায় পড়ে থাকত পাটকাঠি। রান্নার জ্বালানি, ঘরের বেড়া কিংবা পানের বরজ তৈরিতে সীমিত ব্যবহারেই ছিল এর কদর। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন পাটকাঠিও হয়ে উঠেছে কৃষকের বাড়তি আয়ের অন্যতম উৎস।

    ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চলছে পাটকাঠির কেনাবেচা। মাঠ থেকে সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীরা তা নিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন মোকাম ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। পাটকাঠির বহুমুখী ব্যবহার বাড়ায় এর চাহিদাও বেড়েছে। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি পানের বরজ, ঘরের বেড়া, কৃষিকাজে মাচা তৈরির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে পাটকাঠি। এছাড়া বিভিন্ন শিল্পকারখানায় পাটকাঠি থেকে চারকোল ও অন্যান্য পণ্য তৈরির কারণে এর বাণিজ্যিক গুরুত্বও বেড়েছে।

    ফরিদপুরের বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, কৃষকেরা পাট কাটার পর আঁশ ছাড়িয়ে পাটকাঠি রোদে শুকিয়ে আঁটি বেঁধে রাখছেন। শুকিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পাইকাররা কৃষকের বাড়ি কিংবা নির্দিষ্ট বাজার থেকে এসব পাটকাঠি কিনে নিচ্ছেন। ফলে পাটের পাশাপাশি পাটকাঠি থেকেও কৃষকের হাতে আসছে বাড়তি টাকা।

    বোয়ালমারী উপজেলার গুনবাহা ইউনিয়নের চন্দনি গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয় পাটচাষি আলিম বলেন, ‘আগে পাটকাঠি তেমন একটা দাম পেতাম না। অনেক সময় জমিতেই পড়ে থাকত। এখন ব্যবসায়ীরা বাড়ি এসে পাটকাঠি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। পাটের সঙ্গে পাটকাঠি বিক্রি করে বাড়তি কিছু টাকা পাওয়া যাচ্ছে, এতে কৃষকের উপকার হচ্ছে।’

    একই ইউনিয়নের আরেক পাটচাষি আবু সেখ বলেন, ‘পাট চাষে খরচ অনেক বেড়েছে। পাটের দাম প্রত্যাশা মতো না পেলেও পাটকাঠি বিক্রি করে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়। তাই এখন আমরা পাটকাঠি ফেলে না রেখে ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করি।’

    শুধু কৃষকই নন, পাটকাঠির বাণিজ্য ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠেছে ব্যবসার নতুন ক্ষেত্র। বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা পাটকাঠি সংগ্রহ করে তা পাইকারি ক্রেতা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করছেন।

    ঝিনাইদহ থেকে আগত পাটকাঠি ব্যবসায়ী মো. হাচান মোল্লা বলেন, ‘আগের তুলনায় এখন পাটকাঠির চাহিদা অনেক বেশি। কৃষকদের কাছ থেকে কিনে আমরা বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করি। চাহিদা থাকায় এ ব্যবসার সঙ্গে অনেকেই যুক্ত হচ্ছেন।’আরেক ব্যবসায়ী রমজান বিশ্বাস বলেন, ‘পাটকাঠির ক্রেতা এখন শুধু স্থানীয় মানুষ নন। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বড় ব্যবসায়ীরাও পাটকাঠি কিনছেন। তাই মৌসুমে আমরা কৃষকদের একশত পাটের আটি ৩০০-৪০০ দরে বিভিন্ন জায়গায় থেকে পাটকাঠি সংগ্রহের চেষ্টা করি।’

    স্থানীয় ক্রেতা ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘পাটকাঠি আগে শুধু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতাম। এখন এর নানা ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ করে শুকনো ও ভালো মানের পাটকাঠির চাহিদা বেশি।’

    ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার ময়না সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কালিপদ চক্রবর্ত্তী বলেন , ‘পাটকাঠির বাজার আরও সম্প্রসারিত হলে কৃষকেরা পাটের পাশাপাশি এর উপজাত থেকেও ভালো আয় করতে পারবেন। এতে পাটচাষে কৃষকদের আগ্রহ যেমন বাড়বে, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তৈরি হবে নতুন সম্ভাবনা।’

    ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার কৃষি অফিসার আলভীর রহমান বলেন, ‘পাটকাঠিকে আর বর্জ্য বা ফেলনা পণ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সঠিক সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও শিল্পে ব্যবহার বাড়ানো গেলে এটি কৃষকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে। ফরিদপুরে ইতোমধ্যে পাটকাঠির বাণিজ্যিক ব্যবহার ও চাহিদা বৃদ্ধির সেই সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে।’

  • নবীনগরে জলাবদ্ধ জমিতে ভাসমান সবজি চাষ

    নবীনগরে জলাবদ্ধ জমিতে ভাসমান সবজি চাষ

    ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে বর্ষাকালে জলাবদ্ধ ও পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে ভাসমান ডালি পদ্ধতিতে সবজি চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বছরের ৪-৫ মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকা জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষাবাদ সম্ভব না হলেও আধুনিক প্রযুক্তি কৃষকদের সামনে খুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। পানিতে ডুবে থাকা জমিকে আর অনাবাদি না রেখে সেখানে উৎপাদনমুখী কৃষির সুযোগ তৈরি হওয়ায় কৃষকদের মধ্যেও বাড়ছে আগ্রহ।

    হাওর ও জলাভূমি অধ্যুষিত নবীনগর উপজেলায় প্রায় ৮ হাজার ৫০০ হেক্টর কৃষি জমি বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধ থাকে। বছরের অন্যান্য সময়ে এ সব জমিতে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হলেও বর্ষাকালে পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। ফলে দীর্ঘদিন যাবত কৃষকদের জন্য এটি ছিল একটি চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জলাবদ্ধ জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনতে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

    উপজেলার ইব্রাহিমপুর, নাটঘর, রছুল্লাবাদ, বড়িকান্দি, সলিমগঞ্জ, নবীনগর পূর্ব ও সাতমোড়া এলাকায় গত দুই বছর ধরে কৃষি বিভাগের পরামর্শে ভাসমান ডালি পদ্ধতিতে সবজি আবাদ হচ্ছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ২০ বিঘা জমিতে এ পদ্ধতিতে সবজি চাষ করা হয়েছে।

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চলমান ফ্রিপ এবং কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের দেওয়া হয়েছে সরকারি সহায়তা। পাশাপাশি দুই শতাধিক কৃষককে ভাসমান ডালি পদ্ধতিতে সবজি চাষের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ পদ্ধতিতে বাঁশের তৈরি কাঠামোর ওপর মাঁচা নির্মাণ করে সেখানে লতা জাতীয় বিভিন্ন সবজি চাষ করা হয়। লাউ, চালকুমড়া, শসা ও করলাসহ বিভিন্ন সবজি এ পদ্ধতিতে ভাল ফলন দেয়। বর্ষাকালে স্বাভাবিক ভাবে যখন বাজারে সবজির সরবরাহ কমে যায়- তখন ভাসমান পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজি বাজারজাত করে কৃষকরা বাড়তি আয় করতে পারেন। বর্ষা শেষ হলে ঐ কাঠামো দিয়ে পুনরায় জমিতে সবজি আবাদ করা যায়, এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় পরবর্তীতে অনেক কমে যায়।

    স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতায়, এ পদ্ধতিতে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম এবং আলাদা করে সেচের প্রয়োজন হয় না। ফলে জলাবদ্ধ ও পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক কম খরচে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভাসমান এ চাষাবাদ পদ্ধতিতে রাসায়নিক সার এবং বালাইনাশকের ব্যবহার কম হওয়াতে খেতেও দারুন সুস্বাদু।

    ইব্রাহিমপুর গ্রামেরর মধ্য পাড়ার কৃষক ইসমাইল মিয়া বলেন, ‘কৃষি বিভাগের পরামর্শে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ দুই বছর ধরে আবাদ করছি, আগে বছরে ২-৩ মাস সবজি আবাদ করার সুযোগ ছিল না। আমাকে দেখে এলাকার আরো অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠছে।’

    ইব্রাহিমপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের প্রবাস ফেরত সুজন গত বছর কৃষি বিভাগের পরামর্শ এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রথমবারের মত ভাসমান ডালি পদ্ধতিতে লাউয়ের আবাদ করেছেন ২৫ শতাংশ জমিতে। প্রথমে ইউটিউবে এ ধরনের আবাদ দেখে তিনি আগ্রহী হয়ে উপজেলা কৃষি অফিসের সাথে যোগাযোগ করেন। কৃষি অফিসের সহযোগিতায় ইতোমধ্যে কলমি শাক, শসা ও লাউচাষ শুরু করেন। এখন পর্যন্ত তিনি প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় করেছেন।

    তিনি বলেন, ‘উৎপাদন ভাল হওয়া এবং রোগবালাই কম থাকায় এ পদ্ধতির প্রতি কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।’

    রছুল্লাবাদ ইউনিয়নের কৃষক এমরান ২০ শতক জমিতে লাউ ও চালকুমড়া চাষ করেছেন। তার নিকট বর্ষাকালে পানিতে ডুবে থাকা জমিতে সবজি উৎপাদন একসময় স্বপ্নের মত মনে হলেও কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় সেটি এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। তিনি ভাসমান ডালি পদ্ধতিতে ১৫ শতাংশ জমিতে লাউয়ের আবাদ করেছেন। ইতিমধ্যে প্রায় ১৫ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছেন।

    আরো দুই মাস লাউ উত্তোলন করতে পারবেন বলে জানান।

    নবীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, ‘নবীনগরে প্রথমবারের মতো ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ শুরু করা হয়েছে। কৃষকদের হাতে-কলমে এ প্রযুক্তিটি শেখাতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রদর্শনী স্থাপন, ভাসমান কাঠামো তৈরি, বীজ ও সার দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে।’

    তিনি আরও বলেন, ‘ভাসমান পদ্ধতিতে চাষ নিরাপদ কৃষি উৎপাদনের একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি। জলাবদ্ধ ও পরিত্যক্ত জমি ব্যবহার করে কম খরচে সবজি উৎপাদন করা সম্ভব। বিশেষ করে লতাজাতীয় সবজির ফলনও এ পদ্ধতিতে ভালো হয়। ভবিষ্যতে নবীনগরের জলাবদ্ধ এলাকা গুলোতে এ প্রযুক্তির ব্যাপক সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। নবীনগরের জলাবদ্ধ জমিতে ভাসমান সবজি চাষ শুধু কৃষকদের বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করছে না, বরং বর্ষাকালে নিরাপদ সবজি উৎপাদন, পতিত জমির সর্বোত্তম ব্যবহার এবং স্থানীয় বাজারে সবজির সরবরাহ বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’

  • খেত খামার

    খেত খামার

    রাজারহাটে পানির অভাবে পাট পচানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষকরা

    রাজারহাট উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ধান, ভুট্টা কিংবা অন্যান্য ফসলের তুলনায় পাট উৎপাদনে পরিশ্রম ও ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে পাট কাটার পর পচানোর জন্য পর্যাপ্ত পানি না থাকলে কৃষকের ভোগান্তি বেড়ে যায়। এতে পাটের মান কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাড়ে উৎপাদন ব্যয়।

    এক সময় গ্রাম অঞ্চলে দেখা যেতো পাটের তৈরি দড়ি, বস্তা, টোপা, বাজারের ব্যাগসহ গ্রামীণ বাড়িঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র । কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। শহর-গ্রাম সব জায়গায় এখন প্লাস্টিকের দাপটে দিনে দিনে কমছে পাটের উৎপাদন। পাটপণ্য পরিবেশবান্ধব হওয়া সত্বেও এতে মানুষের আগ্রহ কমছে। বাড়ছে পরিবেশের ক্ষতিকর প্লাস্টিকের ব্যবহার।

    কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার মোট আবাদি জমির পরিমাণ ১৩,৬৫৩ হেক্টর, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে উৎপাদিত জমির পরিমাণ ৫৬৫ হেক্টর, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৯৩ হেক্টর এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ২২৩ হেক্টর। গত তিন বছরে উৎপাদিত জমির পরিমাণ কমেছে ৩৪২ হেক্টর।

    বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যত্রতত্র প্লাস্টিকের ব্যবহার শুধু পরিবেশের ক্ষতি নয়, এটি মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতি সাধন করছে। বিভিন্ন পরিক্ষায়, মানুষের রক্তে এখন মাইক্রোপ্লাসটিক ধরা পড়ছে। যা ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।

    কৃষি কর্মকর্তা সাথী বেগম‌ বলেন, ‘কৃষকরা দিন দিন পাট উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে এর অন্যতম কারণ, উৎপাদনের তুলনায় লাভ কম হওয়া সেই সঙ্গে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার যা কিনা পরিবেশের মারাত্বক ক্ষতি করছে।’

    পাট চাষী শ্রী সুভাষ চন্দ্র রায়‌ বলেন, ‘পাট চাষের শুরুতেই জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, আগাছা দমন ও পরিচর্যায় খরচ হয়। এরপর পাট কাটতে শ্রমিক, আঁটি বাঁধা, বহন এবং জাগ দেওয়ার জন্য আবার বাড়তি খরচ করতে হয়। অথচ বাজারে পাটের দাম প্রত্যাশা অনুযায়ী না থাকলে পুরো হিসাবই এলোমেলো হয়ে যায়।’

    কৃষক নির্মলেন্দু বাবু বলেন, ‘পাট বিক্রি করতে গিয়ে ঝামেলায় পড়তে হয়। সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রি করা যায় না। মধ্যস্বত্বকারীরা মাঠে এসে কম দামে পাট কিনে নিয়ে যায়। পরবর্তী ধাপে একই পাটের দাম বাড়তে থাকে।’

    পাটপণ্য বিক্রেতা ছবর উদ্দিন বলেন, ‘বাবা আগত মুই পাট দিয়া দড়ি, গরুর টোপা, বস্তা, বাজারের ব্যাগ তৈরি করি বাজারত বিক্রি করছোং, কিন্তু এলা মানুষ এগলা না কিনিয়া প্লাস্টিকের জিনিস কিনে।’

    কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক বিঘা পাট চাষে খরচ হয় ১০-১২ হাজার টাকা। খরচের তুলনায় বাজার না থাকায় কিছুটা আগ্রহ কমছে তাদের।

    উপজেলার অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা হৈমন্তী রানী বলেন, ‘এ বছরে পাট উৎপাদন কম হওয়ার অন্যতম কারণ হলো ঘন ঘন বৃষ্টি। বৃষ্টি আগাম হওয়ায়, অর্থাৎ এপ্রিল মাসে হওয়ায় পাট কাটার পর জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি না থাকায় উৎপাদন কম হওয়ার অন্যতম কারণও হতে পারে।’

  • সার-কীটনাশকের চড়া দাম, কৃষকের মাথায় হাত

    সার-কীটনাশকের চড়া দাম, কৃষকের মাথায় হাত

    মাঠের দিকে তাকালে বুক ভরে যায় শান্তিতে। সবুজ পাতায় হাওয়া খেলছে, ৪৫ দিনের লকলকে আমনখেত যেন সবুজের গালিচা। কিন্তু সেই সবুজ মাঠের ভেতরে নেমেই কৃষকের মুখে ফুটে উঠছে দুশ্চিন্তার ছাপ। কোথাও আগাছা পরিষ্কার করছেন কৃষক, কোথাও সার ছিটাচ্ছেন, আবার কোথাও মাজরা পোকার আক্রমণ ঠেকাতে কীটনাশক প্রয়োগ করছেন।

    পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকলেও উৎপাদন খরচের হিসাব মেলাতে গিয়ে দিশেহারা জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার আমন চাষিরা। সেচ, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে খরচ বাড়লেও ধানের বাজারদর তেমন বাড়েনি। ফলে ধান ঘরে তোলার পর লাভ কতটা থাকবে, তা নিয়েই শঙ্কায় কৃষকেরা।

    উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ক্ষেতলালে ১০ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে, যা গত মৌসুমের তুলনায় ৫ হেক্টর বেশি। ১০-১৫ দিন আগেই শেষ হয়েছে আমনের চারা রোপণ। এখন চলছে খেত পরিচর্যার সময়।

    কৃষকেরা বলছেন, ধান কাটা-মাড়াই পর্যন্ত খরচের এ চাপ আরও বাড়বে।

    কৃষি বিভাগের টাঙানো সরকারি মূল্য তালিকা অনুযায়ী, প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) সারের নির্ধারিত দাম ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকা (কেজিপ্রতি ২৭ টাকা), টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা (কেজিপ্রতি ২৭ টাকা), ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা (কেজিপ্রতি ২১ টাকা) এবং এমওপি ১ হাজার টাকা (কেজিপ্রতি ২০ টাকা)।

    কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে ১৫ কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি টিএসপি, ১০ কেজি এমওপি ও ১ কেজি জিংক ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে কৃষকদের কেউ কেউ বেশি ফলনের আশায় ইউরিয়া প্রায় ২০ কেজি পর্যন্ত ব্যবহার করছেন।

    কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি বিভাগের টাঙানো সরকারি মূল্যতালিকার দামে তারা সবসময় সার কিনতে পারছেন না।

    তাদের দাবি, প্রয়োজনের সময় নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ায় অনেক সময় ডিলার বা খুচরা বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হয়েছে। ফলে সার বাবদ বিঘাপ্রতি তাদের খরচ হচ্ছে প্রায় ১০০০-১৫০০ টাকা। এর সঙ্গে কীটনাশকের খরচও যোগ হচ্ছে।

    কৃষকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমি প্রস্তুত করতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা, চারা ও রোপণে ৫০০ টাকা, সার বাবদ ১০০০-১৫০০ টাকা, কীটনাশকে ১ হাজার টাকা, আগাছা পরিষ্কারে ১০০ টাকা, সেচে ১ হাজার ২০০ টাকা, ধান কাটায় ৪ হাজার টাকা, মাড়াইয়ে ৬০০ টাকা এবং পরিবহনে প্রায় ৪ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। সব মিলিয়ে জমি পত্তনের খরচ বাদে এক বিঘা আমন চাষে কৃষকের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১৩ হাজার ৭০০ থেকে ১৪ হাজার ২০০ টাকা।

    তবে যারা জমি পত্তন নিয়ে আমন চাষ করছেন, তাদের খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে।

    কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন ফসলি জমি এক বছরের জন্য পত্তন নিতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। তিন ফসলের মধ্যে এক ফসলের আনুপাতিক পত্তন খরচ হিসাব করলে আমন মৌসুমে বিঘাপ্রতি প্রায় ১০ হাজার থেকে ১১ হাজার ৬৭০ টাকা জমির পেছনে চলে যায়। ফলে পত্তনের খরচসহ এক বিঘা আমন চাষে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৩ হাজার ৭০০ থেকে ২৫ হাজার ৮৭০ টাকা।

    কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী, বিঘাপ্রতি আমনের ফলন ১৭ মণ হলে এবং প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হলে ধান থেকে আয় হবে ২২ হাজার ৯৫০ টাকা। এর সঙ্গে খড় বিক্রি করে আরও ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পাওয়া গেলে মোট আয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ২৫ হাজার ৯৫০ থেকে ২৬ হাজার ৯৫০ টাকা।

    নিজস্ব জমিতে কৃষকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী ১৩ হাজার ৭০০ থেকে ১৪ হাজার ২০০ টাকা খরচ হলে ধান ও খড় মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার ৯৫০ থেকে ২৬ হাজার ৯৫০ টাকা আয় হতে পারে। সে হিসাবে খড়সহ সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত থাকতে পারে প্রায় ১১ হাজার ৭৫০ থেকে ১৩ হাজার ২৫০ টাকা। তবে এ হিসাবের মধ্যে কৃষকের নিজের শ্রমের মূল্য এবং বাজারদরের ওঠানামা ধরা হয়নি।অন্যদিকে, পত্তন নেওয়া জমিতে একই ফলন ও বাজারদর ধরে হিসাব করলে চিত্রটি অনেকটাই বদলে যায়। পত্তনসহ মোট খরচ ২৩ হাজার ৭০০ থেকে ২৫ হাজার ৮৭০ টাকা হলে ধান ও খড় মিলিয়ে ২৫ হাজার ৯৫০ থেকে ২৬ হাজার ৯৫০ টাকা আয়ের বিপরীতে উদ্বৃত্ত থাকতে পারে মাত্র প্রায় ৮০ টাকা থেকে ৩ হাজার ২৫০ টাকা। এতে কৃষকের নিজের শ্রমের মূল্যসহ অন্যান্য অনির্ধারিত খরচ বাদ দিলে প্রকৃত লাভ আরও কমে যেতে পারে।

    ক্ষেতলালের আমন চাষি আইজুল বলেন, ‘ধানের ফলন ভালো দেখা গেলেও চাষের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সার, ওষুধ, জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ আর ধান কাটার খরচ মিলিয়ে প্রতি বিঘায় প্রায় ২৪ হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। ১৭ মণ ধান পেয়ে বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করলে হাতে খুব একটা লাভ থাকে না। নিজের জমি হলে কিছুটা সাশ্রয় হয়, কিন্তু পত্তন নেওয়া জমিতে চাষ করলে লাভের সুযোগ আরও কমে যায়।’

    আরেক কৃষক সোবাহান বলেন, ‘বাজারে এখন ধানের যে দাম আছে, তা একেবারে খারাপ না। কিন্তু খরচের সঙ্গে মেলালে লাভ খুবই কম। সার ও অন্যান্য জিনিসপত্র সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ধান কাটার সময় আরও খরচ হবে। শেষ পর্যন্ত ধান বিক্রি করে ঘরে কত টাকা তুলতে পারব, সেটাই এখন চিন্তার বিষয়।’

    পত্তন নেওয়া জমিতে আমন চাষ করা কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘এক বছরের জন্য তিন ফসলি জমি পত্তন নিতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা লাগে। হিসাব করলে শুধু আমন ফসলের জন্যই প্রায় ১০ থেকে ১১ হাজার ৬০০ টাকা জমির পেছনে চলে যায়। এরপর সার, ওষুধ, সেচ, পরিচর্যা, ধান কাটা-মাড়াই ও পরিবহনের খরচ তো আছেই। ধানের ভালো দাম না পেলে আমাদের মতো পত্তন নেওয়া কৃষকদের টিকে থাকা কঠিন।’ক্ষেতলালের কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সারের নির্ধারিত সরকারি মূল্য বাস্তবে কার্যকর করা এবং কৃষকের প্রয়োজনের সময় সঠিক দামে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কঠোর তদারকি চান তারা।

    এ বিষয়ে ক্ষেতলাল উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ‘কৃষকেরা মনে করেন, বেশি সার দিলেই বেশি ধান হবে। অথচ অতিরিক্ত সার ব্যবহারে শুধু উৎপাদন খরচই বাড়ে। আমরা মাঠে মাঠে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করার পরামর্শ দিচ্ছি। সরকারি নির্ধারিত দামে সার বিক্রি নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে।’

    তবে কৃষি বিভাগ ও প্রশাসনের আশ্বাসের পরও ক্ষেতলালের মাঠে কৃষকের দুশ্চিন্তা কাটেনি। সবুজে ভরা আমনখেত দেখে ফলনের আশা জাগলেও উৎপাদন খরচের চাপ সেই আশায় ফাটল ধরাচ্ছে। কৃষকের অপেক্ষা এখন একটাই ধান ঘরে তোলার সময় বাজারে ন্যায্য দাম মিলবে কি না।

  • সার মজুতের সরকারি হিসাবে গরমিল

    সার মজুতের সরকারি হিসাবে গরমিল

    দেশে সার মজুতের সরকারি হিসাব নিয়ে গরমিল দেখা দিয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তব মজুতের মিল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত মজুত দেখানো হলেও গুদামে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার নেই। আবার কোথাও মজুতের হিসাব হালনাগাদ না করেই পুরোনো তথ্য দেখানো হচ্ছে। এতে সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি।

    বিশেষ করে বোরো ও আমন মৌসুমে কৃষকের চাহিদা বাড়ার সময়ে এ ধরনের হিসাবের গরমিল সংকটকে আরো প্রকট করে তুলছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকৃত মজুত যাচাই করে দ্রুত হিসাব সমন্বয় না করা হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে ডিলারদের অভিযোগ, কৃষি ও কৃষিকাজের আওতা বাড়লেও সারের বরাদ্দ বাড়েনি।কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছর এ সময় দেশে ইউরিয়ার সরকারি মজুত ছিল ১৪ লাখ ৬ হাজার ৯২৬ টন। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৩ হাজার ৩৯৯ টনে। অর্থাৎ এক বছরে ইউরিয়ার মজুত কমেছে প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার ৫২৭ টন।

    একইভাবে, ডিএপির মজুত গত বছর ছিল ৪৩ হাজার ৩৪৩ টন। বর্তমানে তা কমে হয়েছে ৩৬ হাজার ৪০ টন। তবে টিএসপি ও এমওপি সারের মজুত কিছুটা বেড়েছে। গত বছর টিএসপির মজুত ছিল ২৬ হাজার ১২৩ টন, বর্তমানে তা ৩০ হাজার ২৬৫ টন। এমওপির মজুত ৫১ হাজার ৩৫ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৩ হাজার ৩৮৮ টন।

    এদিকে, সারের মজুতের এই পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দাবি করেছেন, দেশে চাহিদা অনুযায়ী সারের কোনো ঘাটতি নেই। তিনি বলেন, কৃষকদের সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণে এবং নির্ধারিত মূল্যে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে নিবিড় মনিটরিং চলছে। অঞ্চল, জেলা ও গুদামভিত্তিক চাহিদা, বরাদ্দ ও মজুত পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোনো এলাকায় চাহিদার তুলনায় মজুত কমে গেলে অন্য গুদাম বা অঞ্চল থেকে সার সরবরাহ করে ঘাটতি সমন্বয় করা হবে।

    এদিকে, সার সংকটের মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তিন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়েছে সরকার। দেশজুড়ে সার বিতরণ নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিতর্কের মধ্যে মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখা থেকে একজন অতিরিক্ত সচিব ও একজন যুগ্ম সচিবকে সরিয়ে দিয়েছে সরকার। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন সদস্য-পরিচালক (যুগ্ম সচিব) ওসমান ভূঁইয়াকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে।

    তবে সরকারি মজুত কমে যাওয়া, ডিএপির বাড়তি চাহিদা, আগাম মজুতের প্রবণতা এবং খুচরা পর্যায়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, দেশে সত্যিই সারের সংকট নেই, নাকি মাঠপর্যায়ে সংকটের আগেই তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম চাপ?

    এ বিষয়ে রাজশাহীর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে মাঠে সারের প্রকৃত চাহিদা তুলনামূলক কম। আমন ধান রোপণের কাজ প্রায় শেষ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে আসন্ন আলু মৌসুমকে সামনে রেখে কৃষকরা আগাম সার সংগ্রহ করছেন।

    তার ভাষ্যমতে, ইউরিয়ার বিক্রি বর্তমানে তেমন নেই; নন-ইউরিয়া সারের মধ্যে মূলত ডিএপির চাহিদা বেশি। কিছু খুচরা বিক্রেতার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মজুত ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৯ জন ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা করা হয়েছে।

    একই চিত্র কুড়িগ্রামেও। সেখানকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জানান, গত ২৭ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় চার খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি ও অবৈধ মজুতের অভিযোগ ছিল। জেলায় বিসিআইসির ৯৪ জন এবং বিএডিসির ১১৪ জন ডিলার রয়েছেন।

    বর্তমানে সারা দেশে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার ডেটাবেজ হালনাগাদের কাজ চলছে। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনে ৮৫ জন ডিলার, ৩৩০টি পৌরসভায় ৯৯০ জন ডিলার এবং ৪,৫৯২টি ইউনিয়নে নির্ধারিত অনুপাত অনুযায়ী ডিলার নিয়োগের তথ্য গুগল শিটের মাধ্যমে হালনাগাদ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এর আগের হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোট ডিলার ছিল ১০ হাজার ৮১৪ জন এবং খুচরা বিক্রেতা ছিল ৩১ হাজার ৩৮৪ জন।

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল আমার দেশকে বলেন, বাংলাদেশে সারের অভাবে কোনো জমির আবাদ নষ্ট হওয়ার রেকর্ড নেই। তার দাবি, প্রতি বছরই কিছু ডিলার বাড়তি মুনাফার আশায় বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম করেন।

    উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, ডিলারের দোকানে কৃষকের কোনো অস্বাভাবিক ভিড় নেই বলে তিনি জানান।

    তিনি আরো বলেন, গত বছরও যেমন সারের অভাবে আবাদ নষ্ট হওয়ার রেকর্ড নেই, এবারও ঘাটতি নেই। কোনো নতুন জমিও বের হয়নি যে সারের চাহিদা হঠাৎ লাফিয়ে বাড়বে। ডিলাররা অনৈতিকভাবে কিছু বাড়তি পয়সা পকেটে নেওয়ার জন্যই মূলত ভীতি তৈরি করছে।

    তবে মাঠের কৃষকের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি প্রশাসনের বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না। কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরের কোদালকাটি ইউনিয়নের কৃষক শহীদুল ইসলাম বলেন, আমন মৌসুমে ইউরিয়া ও অন্যান্য সারের প্রয়োজন থাকলেও তিনি এখনো সার কেনা শুরু করেননি। তার মতে, সরবরাহ একেবারে বন্ধ নয়, তবে কোথাও কোথাও দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে।

    সব মিলিয়ে, সরকারি মজুত কিছুটা কমলেও মাঠপর্যায়ে সারের জোগান সচল রয়েছে জানান কৃষকরা। তবে অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের অবৈধ মজুতদারি ও মনিটরিংয়ের দুর্বলতার সুযোগে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির যে চেষ্টা চলছে, তা দ্রুত কঠোর হস্তে দমন করতে হবে বলে জানান তারা।

  • সমতলে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষে সফলতা

    সমতলে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষে সফলতা


    সমতল ভূমিতে বাণিজ্যিকভাবে পাহাড়ি ফল আনারস চাষে দারুণ সফলতা পেয়েছেন নাটোরের বড়াইগ্রামের মল্লিকপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম।বর্তমানে তিনি বাগানের পাকা আনারস বাজারে বিক্রি করছেন। মাঝারি আকারের আনারসগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমন মিষ্টি। তার সফলতা দেখে এলাকার অনেক কৃষি উদ্যোক্তা প্রতিদিন তার আনারস বাগান দেখতে ভিড় করছেন।সোমবার (৩১ আগস্ট) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কৃষক রফিকুল ইসলাম মল্লিকপুর বিলে দশ কাঠা জমিতে আনারসের চাষ করেছেন। পুরো জমি জুড়ে সারি সারি গাছে পাকা-আধাপাকা আনারস ঝুলছে।

    এ সময় গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত রফিকুল বলেন, ‘প্রায় তিন বছর আগে বাজারে আনারস কিনতে গিয়ে তার এ ফল চাষের আগ্রহ জাগে।’

    বছর দেড়েক আগে তিনি টাঙ্গাইলের মধুপুর থেকে দেড় হাজার আনারসের চারা নিয়ে আসেন। এর মধ্যে কিছু চারা মরে গেছে। আবার কিছু গাছে এবার ফল ধরেনি। সেগুলো বাদে কমপক্ষে এক হাজার গাছে আনারস ধরেছে এবার।

    ‘ক্যালেন্ডার’ ও ‘জায়েন্ট কিউ’ জাতের আনারস চাষ হচ্ছে তার বাগানে।

    কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, জমিতে আনারসের চারা লাগানোর এক বছর পর ফুল আসতে শুরু করে। এরপর ফল ধরার চার-পাঁচ মাস পর পাকতে শুরু ধরে। এবার তার প্রায় সব গাছে প্রথমবারের মত আনারস ধরেছে। ইতিমধ্যেই আনারস পাকতে শুরু করেছে। বাগানের বেশির ভাগ গাছের আনারস বাজারে বিক্রিও করা করা হয়েছে।

    তিনি জানান, এ ফল চাষে জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ, পানি সেচ ও নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়। আনারস চাষে আনুপাতিক হারে খরচ কম।

    দেড় হাজার গাছের চারা কিনে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসতে তার খরচ পড়েছে ছয় হাজার টাকা। চারবার নিড়ানী দিতে হয়েছে, তাতে খরচ পড়েছে ছয় হাজার টাকা। এছাড়া দেড় হাজার টাকার সার-কীটনাশক এবং সেচ বাবদ আরো ৬০০ টাকা খরচ পড়েছে।

    এ পর্যন্ত তিনি মোট ৫০০ পিস আনারস বিক্রি করেছেন। প্রতি পিস ৫০ টাকা দরে তিনি এ পর্যন্ত ২৫ হাজার টাকার আনারস বিক্রি করেছেন। বাগানে আরো তিন শতাধিক আনারস রয়েছে। এছাড়া রাতের আঁধারে তার বাগান থেকে কে বা কারা আরো শতাধিক পাকা আনারস চুরি করে নিয়ে গেছে।তিনি আরো জানান, আনারসের এক একটি গাছ থেকে কয়েক বছর ধরে ফল পাওয়া যায়। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় আগামীতে তার লাভের পরিমাণ আরো বেশি হবে বলেও জানান তিনি।

    তবে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় মাঝে মাঝে বেকায়দায়ও পড়তে হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গাছগুলো প্রথম দিকে ভালভাবেই বেড়ে উঠছিল। তবে একটা সময় এসে গাছের গোড়া পঁচা রোগ দেখা দেয়। এতে কিছু গাছ মরেও যায়।’

    জেলায় প্রথম আনারস চাষ হওয়ায় সাধারণ মানুষসহ কৃষি উদ্যোক্তারা প্রায়ই তার আনারস বাগান দেখতে আসেন বলে তিনি জানান।

    গোপালপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও ভরতপুর গ্রামের আকবর আলী বলেন, মল্লিকপুর গ্রামের একজন কৃষক তার জমিতে আনারস চাষ করেছেন। আনারসতো পাহাড়ি এলাকায় চাষ হয়। তাই প্রথমে বিশ্বাস না হলেও পরে নিজের চোখে দেখে এসেছি, কিছু আনারস কিনেও এনেছি। আনারসগুলো খেতে বেশ সুস্বাদু।

    উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজীব আল মারুফ বলেন, ‘আমাদের উপজেলার মাটি ও আবহাওয়া আনারস চাষের উপযোগী বলেই মনে হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এ উপজেলায় আনারস চাষে সফলতা পাওয়া গেছে। কৃষকদেরকে আনারস চাষে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’

  • ঐতিহ্যবাহী ধানের চারার হাট, কৃষকদের মিলনমেলা

    ঐতিহ্যবাহী ধানের চারার হাট, কৃষকদের মিলনমেলা

    ধান রোপণের মৌসুমকে ঘিরে জমে উঠেছে হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের ঐতিহ্যবাহী ধানের চারার হাট। স্থানীয় ভাষায় ‘জালা’ নামে পরিচিত ধানের চারা বিক্রি ও কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মুখর হয়ে উঠছে বানিয়াচং-হবিগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের ৩নং দক্ষিণ-পূর্ব ইউনিয়নের ছিলাপাঞ্জা এলাকা। শুধু বানিয়াচং নয়, জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত ধানের চারা নিয়ে ছুটে আসছেন এই হাটে। সকাল হতেই বিভিন্ন জাতের সবুজ ধানের চারা নিয়ে বসে পড়েন বিক্রেতারা। অন্যদিকে জমিতে রোপণের জন্য প্রয়োজনীয় চারা কিনতে ভিড় করেন বিভিন্ন এলাকার কৃষক। ফলে দিনভর ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে সরগরম থাকে ছিলাপাঞ্জা। সরেজমিনে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ধানের চারা। কেউ আঁটি বাঁধছেন, কেউ ক্রেতার পছন্দ অনুযায়ী চারা গুনে দিচ্ছেন। আবার কেউ দরদাম করছেন। চারা বিক্রি ভালো হওয়ায় অনেক কৃষকের মুখেই দেখা গেছে স্বস্তির হাসি। চারা বিক্রেতা কৃষক তাহের মিয়া বলেন, ধানের চারা তৈরি করতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে চারা পরিচর্যা পর্যন্ত শ্রম দিতে হয়। এখন হাটে এসে ভালোভাবে বিক্রি করতে পারছি। এতে কৃষিকাজের পাশাপাশি বাড়তি আয় হচ্ছে। লাখাই থেকে আসা আরেক বিক্রেতা বাদ উললাহ মিয়া বলেন, প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে কৃষকরা চারা কিনতে আসেন। এবার বিক্রি বেশ ভালো। সকালে চারা নিয়ে আসার পর বিকেল হওয়ার আগেই অনেক সময় প্রায় সব চারা বিক্রি হয়ে যায়। চারা কিনতে আসা কৃষক আজিজুর রহমান বলেন, সব কৃষকের পক্ষে নিজের জমিতে চারা তৈরি করা সম্ভব হয় না। আবার সময়মতো চারা তৈরি করতে না পারলেও সমস্যা হয়। এখানে বিভিন্ন জায়গা থেকে কৃষকরা চারা নিয়ে আসেন। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী ভালো চারা বেছে কিনে নেওয়া যায়। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, ধানের চারা বিক্রির এই হাট একদিকে যেমন আমন মৌসুমে চাষিদের চারা সংগ্রহের সংকট দূর করছে, অন্যদিকে চারা উৎপাদনকারী কৃষকদের জন্য সৃষ্টি করছে বাড়তি আয়ের সুযোগ। ফলে মৌসুমি কৃষিভিত্তিক এই বেচাকেনা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। কৃষকরা জানান, ভালো মানের ও রোগমুক্ত চারা উৎপাদন করতে পারলে চাহিদা থাকে বেশি। এ কারণে অনেক কৃষক এখন ধানের চারা উৎপাদনকেও বাড়তি আয়ের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। প্রতিদিনের এই ‘জালার হাট’ যেন গ্রামীণ কৃষিজীবনের এক ব্যতিক্রমী চিত্র। সবুজ ধানের চারা, কৃষকদের ব্যস্ততা আর ক্রেতাদের দরদামে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রাণ ফিরে পায় ছিলাপাঞ্জা এলাকা। ধানের মৌসুমজুড়ে এমন জমজমাট বেচাকেনা চলবে বলে আশা করছেন স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।