কৃষি

  • ঘিওরে আগাম সবজি চাষে স্বপ্ন বুনছেন কৃষকরা

    ঘিওরে আগাম সবজি চাষে স্বপ্ন বুনছেন কৃষকরা

    শীতের আমেজ পুরোপুরি শুরু না হলেও মানিকগঞ্জের ঘিওরে মাঠজুড়ে শুরু হয়ে গেছে শীতকালীন আগাম সবজি চাষের তুমুল ব্যস্ততা। মৌসুমের শুরুতেই বাজারে সবজি তুলে চড়া দামে বিক্রি করে বাড়তি মুনাফা পাওয়ার আশায় দিনরাত পরিশ্রম করছেন স্থানীয় কৃষকরা।

    উপজেলার বড়টিয়া, পয়লা, সিংজুরী, বানিয়াজুরী ও বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের কৃষি মাঠগুলো ঘুরে দেখা যায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমে উঠেছে জমি প্রস্তুতকরণ, চারা রোপণ ও নিবিড় পরিচর্যার কাজ। ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, উচ্ছে, করলা ও শিমের মতো চড়া চাহিদার সবজিতে ভরে উঠছে একের পর এক ক্ষেত। ইতোমধ্যে অনেক ক্ষেতেই ফুল ও ফল আসতে শুরু করেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী এক থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যেই এসব আগাম সবজি স্থানীয় ও রাজধানীর বাজারে সরবরাহ শুরু হবে।

    উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ঘিওর উপজেলায় ৩ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

    উপজেলার বৈলট গ্রামের কৃষক করিম বলেন, “এ বছর জমিতে বন্যার পানি না ওঠায় নির্ধারিত সময়ের বেশ আগেই বেগুনের আবাদ করতে পেরেছি। সঠিক সময়ে ফসল বাজারে তুলতে পারলে ভালো লাভের মুখ দেখতে পাবো।”

    তবে আশার পাশাপাশি দুশ্চিন্তাও পিছু ছাড়ছে না চাষিদের। বালিয়াখোড়া গ্রামের কৃষক বারেক, ময়নাল ও মজনু জানান, আগাম সবজি চাষে লাভের বড় সুযোগ থাকলেও ঝুঁকি অনেক বেশি। আকস্মিক অতিবৃষ্টি কিংবা রোগবালাইয়ের হানা নিমেষেই স্বপ্ন ধ্বংস করে দিতে পারে। তা ছাড়া সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার উৎপাদন খরচ অনেক বেশি পড়ছে। আবার একই সময়ে বাজারে হঠাৎ সরবরাহ বেড়ে গেলে ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে সঠিক সময়ে কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারি কঠোর নজরদারির জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

    ঘিওর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তহমিনা খাতুন বলেন, “পরিবেশ অনুকূলে থাকলে এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে এবার অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। চাষিদের মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে আমরা নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।”

  • মাচায় ঝুলছে অফ-সিজনের তরমুজ

    মাচায় ঝুলছে অফ-সিজনের তরমুজ

    রাজশাহীর বরেন্দ্রভূমির তানোর ও মোহনপুরে ধান, আলু ও আমের পাশাপাশি মাচায় তরমুজ চাষে সাফল্য পাচ্ছেন কৃষকেরা। সেচ সংকটসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যে গতানুগতিক ফসলের বাইরে নতুন এ চাষে ভালো ফলন ও বাজারদাম পাওয়ায় আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।

    মোহনপুর উপজেলার বাকশিমইল গ্রামের কৃষক শাফিউল ইসলাম ১৬ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে মাচায় তরমুজ চাষ করেছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামরুল ইসলামের পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতায় তিনি এ উদ্যোগ নেন।

    শাফিউল জানান, তরমুজ চাষে তার প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০০টি তরমুজে নেট বেঁধেছেন। প্রতিটির ওজন গড়ে দুই কেজি। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি তরমুজ ৮০-১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে ৫০-৬০ হাজার টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।

    অন্যদিকে তানোর উপজেলার কামারগাঁ ইউনিয়নের পাড়িশো গ্রামের কৃষক খাইরুল ও জাকির ২৫ শতক জমিতে প্রথমবারের মতো মাচায় অফ-সিজনের তরমুজ চাষ করেছেন। উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে গত জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে বিভিন্ন জাতের বীজ বপন করেন তারা। বর্তমানে মাচায় ঝুলছে রঙ্গীলা, আম্বার সুইট, হলুদ মধুমালা ও ডোরাকাটা জাতের তরমুজ।

    কৃষক জাকির বলেন, ‘মৌসুমের বাইরে তরমুজের চাহিদা ভালো থাকায় বাজারেও দাম পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয়সহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে তরমুজ কিনেছেন। ফলে পরীক্ষামূলক এ চাষে লাভবান হচ্ছি।’

    মোহনপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বরেন্দ্রভূমিতে মাচায় তরমুজের ফলন প্রত্যাশার চেয়েও ভালো হচ্ছে। এ কারণে কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে। নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করে কৃষকদের পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছি। প্রতি হেক্টরে প্রায় ৫০ মেট্রিক টন ফলন পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।’

  • মরুর ফল সাম্মাম চাষে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন কামরুজ্জামানের

    মরুর ফল সাম্মাম চাষে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন কামরুজ্জামানের

    একসময় যে জমি পড়ে থাকত, সেই জমিতেই এখন ঝুলছে সারি সারি বিদেশি ফল। সবুজ-হলুদ রঙের ফলগুলো দেখতে অনেকটা তরমুজের মতো। তবে নাম সাম্মাম পরিচিত ‘রক মেলন’ নামেও। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় বর্গা নেওয়া জমিতে এ ফলের চাষ করে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন কৃষি উদ্যোক্তা মো. কামরুজ্জামান খান।

    উপজেলার সূর্যনারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা কামরুজ্জামান তরগাঁও ইউনিয়নের উত্তর খামার এলাকায় জমি নিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে সাম্মাম চাষ করেছেন। মালচিং ফিল্ম ব্যবহার করে গাছের পরিচর্যা করছেন তিনি। এরই মধ্যে বাগান থেকে প্রথম দফায় প্রায় ৫০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন। তার প্রত্যাশা, সব ফল বিক্রি হলে মোট বিক্রি ৬-৭ লাখ টাকা ছাড়াতে পারে।

    তবে এ প্রত্যাশার বিপরীতে এখন পর্যন্ত তার বিনিয়োগও কম নয়। কৃষকের হিসাবে, জমি, চারা, শ্রমিক, সার, সেচ, মালচিং ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

    সম্প্রতি তরগাঁওয়ের উত্তর খামার এলাকায় কামরুজ্জামানের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, জমির ওপর মালচিং ফিল্ম বিছানো। তার ওপর নির্দিষ্ট দূরত্বে লাগানো হয়েছে সাম্মামের চারা। লতাগুলো মাচায় উঠছে। কোনো গাছে ছোট ফল, আবার কোনো গাছে পরিপক্ব হওয়ার পথে বড় আকারের ফল ঝুলছে।

    বাগানে শ্রমিকদের ব্যস্ততাও চোখে পড়ার মতো। কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ গাছে পানি দিচ্ছেন, আবার কেউ ফল ও লতার পরিচর্যা করছেন।

    কৃষক কামরুজ্জামান খান বলেন, ‘এ পর্যন্ত প্রায় চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে। প্রথম দফায় ৫০ হাজার টাকার মতো সাম্মাম বিক্রি করেছি। ফল পুরোপুরি বিক্রি হলে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা বিক্রির আশা করছি।’

    তিনি জানান, বাগানের উৎপাদিত ফল স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকার আড়তে পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে পাইকারের কাছে প্রতি কেজি প্রায় ৮০-১০০ টাকা দরে সাম্মাম বিক্রি করছেন।

    কামরুজ্জামান খান কাপাসিয়া কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেছেন। চাকরি বা প্রচলিত পেশার বাইরে কৃষিকে আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। তার দাবি, এ উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের পরিবারের পাঁচ সদস্যের সংসার চালানোর পাশাপাশি কয়েকজন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।কামরুজ্জামান বলেন, ‘কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করছি। এখন পর্যন্ত লোকসান হয় নি। সামনে আরও বড় পরিসরে বিদেশি ফলের বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

    তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারি থেকে বিদেশি ফলের আবাদ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

    কাপাসিয়া উপজেলা কৃষি অফিসের অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সৈয়দ শাকিল আহম্মেদ বলেন, ‘রক মেলন বা সাম্মাম চাষে সাধারণত ৭৫-৯০ দিন সময় লাগে। সঠিক পরিচর্যা ও বাজারদর পাওয়া গেলে প্রতি বিঘায় ২-৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদন খরচ হতে পারে প্রায় ৩০ হাজার টাকা, তবে বাস্তবে জমির ধরণ, শ্রম, উপকরণ ও ব্যবস্থাপনার ওপর খরচ কমবেশি হতে পারে।’

    তিনি বলেন, ‘সাম্মামে বেটা-ক্যারোটিন, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ফলিক অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম রয়েছে। তবে এ ফসলের ক্ষেত্রে নিয়মিত পরিচর্যা, পানি ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ জরুরি।’

    কৃষি কর্মকর্তা জানান, কাপাসিয়ার তরগাঁও, টোক, বারিষাব ও সনমানিয়া এলাকার পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদীর অববাহিকার দোআশ মাটি সাম্মাম চাষের জন্য উপযোগী হতে পারে।

    সাম্মাম চাষে ফলন পাওয়ার পাশাপাশি কৃষকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে বাজার। বর্তমানে কামরুজ্জামান তার উৎপাদিত ফল ঢাকার আড়তে পাঠাচ্ছেন। সেখানে প্রতি কেজি ৮০-১০০ টাকা পাওয়া গেলেও মৌসুমের শেষ পর্যন্ত একই দাম থাকবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

    কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন কোনো ফলের বাণিজ্যিক চাষে উৎপাদন সফল হওয়ার পর বাজারজাত করণই বড় চ্যালেঞ্জ। ফল দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকায় সংগ্রহের পর দ্রুত পরিবহন ও বিক্রির ব্যবস্থা করতে হয়। একই সময়ে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমার সম্ভাবনাও থাকে।

    ফলে কামরুজ্জামানের বাগানে উৎপাদিত সাম্মামের প্রকৃত আর্থিক সাফল্য নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কত কেজি ফল উৎপাদন হলো, কত দামে বিক্রি হলো এবং মোট ব্যয়ের পর হাতে কত টাকা থাকল তার ওপর।

    নতুন এ ফলের বাগান দেখতে আশপাশের কৃষকেরাও আসছেন। কেউ জানতে চাইছেন চারা কোথা থেকে পাওয়া যায়, কেউ জানতে চাইছেন এক বিঘায় কত খরচ হয়। আবার অনেকে জানতে চাইছেন, কত দিনে ফল আসে এবং বাজারে কী দামে বিক্রি করা যায়।

    কামরুজ্জামানের উদ্যোগ তাই শুধু একটি বাগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও প্রচলিত ফসলের বাইরে নতুন ও উচ্চমূল্যের ফল চাষের বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।

    কৃষি বিভাগের পরামর্শ, বাজার বিশ্লেষণ এবং উৎপাদন খরচের হিসাব করে সাম্মাম চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কাপাসিয়ায় এ ফলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এক মৌসুমের ফলন ও বিক্রির হিসাব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ধারণের সুযোগ নেই।

    বাগানে এখনো পরিপক্ব হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে অনেক ফল। সেগুলো বাজারে যাওয়ার পরই পরিষ্কার হবে। কাপাসিয়ার মাটিতে নতুন এ বিদেশি ফল কৃষকের জন্য শুধু নতুনত্ব, নাকি সত্যিই নতুন আয়ের পথ।

  • কমলগঞ্জে গ্রাফটিং চারা ঘিরে কোটি টাকার বাজার

    কমলগঞ্জে গ্রাফটিং চারা ঘিরে কোটি টাকার বাজার

    জংলি বনবেগুনের শক্ত শিকড়ের সঙ্গে উন্নত জাতের টমেটোর ডাল জুড়ে তৈরি হচ্ছে বিশেষ ধরনের ‘গ্রাফটিং’ চারা। ব্লেডের নিখুঁত কাটে তৈরি এই চারা ঘিরে বদলে যাচ্ছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কৃষি অর্থনীতির চিত্র। কুমিল্লা থেকে কক্সবাজার, ময়মনসিংহ থেকে পটুয়াখালী—দেশের অন্তত ১০টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে কমলগঞ্জের রোগ প্রতিরোধী ও উচ্চফলনশীল টমেটোর চারার চাহিদা।

    উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মৌসুমে কমলগঞ্জে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ গ্রাফটিং চারা উৎপাদন হচ্ছে। এসব চারা ঘিরে মাত্র কয়েক মাসেই স্থানীয়ভাবে প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে।

    কমলগঞ্জের আদমপুর, জালালপুর, বনগাঁও, কান্দিগাঁও, মধ্যগাঁও ও নাজাতকোনাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নার্সারিগুলোতে চলছে ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ। সারি সারি চারার পাশে বসে শ্রমিকেরা ব্লেড দিয়ে বনবেগুনের গোড়া কেটে সেখানে জুড়ে দিচ্ছেন টমেটোর কাণ্ড।উদ্যোক্তারা জানান, বনবেগুনের বীজতলা তৈরি হতে প্রায় ৩৫ দিন এবং টমেটোর চারা প্রস্তুত হতে ২৫ দিন সময় লাগে। এরপর নির্দিষ্ট অংশ কেটে দুই ধরনের চারা জোড়া লাগিয়ে পলিথিন দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যে দুটি অংশ একসঙ্গে জোড়া লেগে যায়। পরে আরও ১০ থেকে ১২ দিন নিবিড় পরিচর্যাকক্ষে রাখার পর এগুলো বিক্রির উপযোগী হয়। বর্তমানে প্রতিটি গ্রাফটিং চারা ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

    উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, সাধারণ টমেটো গাছ সামান্য বৃষ্টিতেই ঢলে পড়া কিংবা গোড়া পচে মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। তবে বনবেগুনের শিকড় অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় গ্রাফটিং করা টমেটো গাছে এ ধরনের সমস্যা তুলনামূলক কম হয়।স্থানীয় কৃষক ও সফল চারা উৎপাদনকারী এম এ করিম বলেন, বনবেগুন টমেটোর একটি জংলি জাত। এর সঙ্গে টমেটোর চারা জোড়া দিলে গাছ সহজে মারা যায় না এবং ফলনও বেশি হয়। সাধারণ একটি গাছে যেখানে ৫ থেকে ১০ কেজি টমেটো পাওয়া যায়, সেখানে গ্রাফটিং করা গাছে ২০ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। চাহিদা বেশি থাকায় সিলেট, কুমিল্লা, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ ও পটুয়াখালীসহ ৮-১০টি জেলা থেকে মৌসুম শুরুর আগেই অগ্রিম বায়না আসে।

    গ্রাফটিং চারা উৎপাদনকে কেন্দ্র করে কমলগঞ্জের গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। একজন দক্ষ শ্রমিক দিনে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০টি চারা জোড়া দিতে পারেন। এতে শ্রমিকদেরও ভালো আয় হচ্ছে।স্থানীয়দের মতে, এই প্রযুক্তি শুধু কৃষকের মাঠে ফলন বাড়াচ্ছে না, ধীরে ধীরে এটি একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ নিচ্ছে। নার্সারিগুলোতে কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে শত শত নারী ও পুরুষের।

    কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, “চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ করছেন অন্তত ৪৮০ জন কৃষক। কমলগঞ্জের চাষিদের উৎপাদিত ৬৫ থেকে ৭০ লাখ গ্রাফটিং চারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। এ খাত থেকে এক মৌসুমে গড়ে ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে, যা স্থানীয় কৃষির জন্য বড় অর্জন।”

    স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, “কমলগঞ্জের কৃষি অর্থনীতিতে গ্রাফটিং চারা নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। সরকারি সহায়তা, মানসম্মত বীজ ও প্রযুক্তিগত সুবিধা আরও বাড়ানো গেলে এ খাত থেকে কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থান কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।”

  • শ্রীপুরে ২৮৮ বস্তা অবৈধ সার জব্দ

    শ্রীপুরে ২৮৮ বস্তা অবৈধ সার জব্দ

    মাগুরার শ্রীপুরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে অবৈধভাবে মজুদ রাখা ২৮৮ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে জামিরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলার টিকারবিলা বাজারের একটি দোকানে অভিযান চালিয়ে এ অবৈধ সার জব্দ করা হয়৷ এ সময় জামিরুল ইসলামকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা ও ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

    স্থানীয় ও কৃষি অফিসের তথ্যমতে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শ্রীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসমাউল হুসনা পিংকী উপজেলার টিকারবিলা বাজারে জামিরুল ইসলামের দোকানে অবৈধভাবে সার মজুদ রাখার অভিযোগে অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ হুমায়ুন কবির ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সেলিনা ইয়াসমিন। অভিযানে অবৈধভাবে মজুদ রাখা ১৩৯ বস্তা টিএসপি ও ১৪৯ বস্তা ডিএপি সার জব্দ করা হয়৷ এ ঘটনায় জামিরুল ইসলামকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা সেই সাথে ৭ দিনের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

    উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ হুমায়ুন কবির জানান, অসৎ উদ্দেশ্যে তিনি সারগুলো মজুদ করেছিলেন। তিনি কোন ব্যবসায়ী নন। আমরা ডিলার, সাব-ডিলার, খুচরা ব্যাবসীসহ বাজার মনিটরিং করছি। এর মধ্যে আমরা বেশ কয়েকটি অভিযানে সার জব্দ, জরিমানা ও মামলা করেছি। এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে।

    সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসমাউল হুসনা পিংকী বলেন, অভিযানে অবৈধভাবে মজুদ রাখা ২৮৮ বস্তা সার জব্দ ও জামিরুল ইসলামকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা ও ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে।

  • হলদে তরমুজ চাষে খোর্শেদের বাজিমাত

    হলদে তরমুজ চাষে খোর্শেদের বাজিমাত

    এক সময় যে জমিতে বছরে একবার ধান চাষ হতো, বছরের বাকি সময় থাকত পতিত। সেই জমিতেই এখন সারি সারি হলুদ তরমুজ। মাটির ওপর বিছিয়ে থাকা সবুজ লতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে হলুদ রঙের বাহারি ফল। ব্যতিক্রমী এ তরমুজবাগান দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ কিনে নিচ্ছেন পরিবারের জন্য। এ পরিবর্তনের নেপথ্যে জুড়ী উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা খোর্শেদ আলম।

    প্রায় পাঁচ বছর আগে ইউটিউবে হলুদ তরমুজ চাষের ভিডিও দেখেই তার মনে হয়–একবার চেষ্টা করে দেখা যাক। সেই চেষ্টা শুরু হয়েছিল মাত্র ছয় শতাংশ জমিতে। পরীক্ষামূলক চাষে সাফল্য পাওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এখন প্রায় তিন বিঘা জমিতে চাষ করছেন বিভিন্ন জাতের হলুদ তরমুজ। চলতি মৌসুমে তার প্রত্যাশা ৮-৯ লাখ টাকার ফল বিক্রি হবে। খরচ বাদে সম্ভাব্য মুনাফা প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।

    মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের ডোমাবাড়ি গ্রামের খোর্শেদ আলম পেশায় পরিবেশ ও সংবাদকর্মী। কৃষিতে তার আনুষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ছিল না বললেই চলে। ইউটিউবের ভিডিও দেখেই শুরু হয়েছিল আগ্রহ। ২০২২ সালে পরিবারের চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে ছয় শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে হলুদ তরমুজ চাষ করেন। ফলন ভালো হওয়া এবং বাজারে চাহিদা থাকায় শখের সেই চাষই পরে পরিণত হয় বাণিজ্যিক উদ্যোগে।

    খোর্শেদ আলম বলেন, ‘ইউটিউবে হলুদ তরমুজ চাষ দেখে শখ জাগে। ভাবলাম একবার পরীক্ষা করে দেখি। ছয় শতাংশ জমিতে বীজ বপন করলাম। ফলন ভালো হওয়ার পর দেখলাম এর চাহিদাও বেশ। তখন থেকেই বাণিজ্যিকভাবে চাষের চিন্তা করি।’

    তার সেই ছোট্ট পরীক্ষাই এখন রূপ নিয়েছে বড় উদ্যোগে। চলতি মৌসুমে নিজের প্রায় তিন বিঘা জমিতে ল্যানফাই, সূর্যডিম, সানগোল্ড, লিয়োনা, রবি, সাম্মাম মার্লিন ও হ্যানিডিউ মেলন জাতের তরমুজ চাষ করেছেন খোর্শেদ। এর মধ্যে ল্যানফাই জাতের হলুদ তরমুজই বেশি নজর কেড়েছে দর্শনার্থীদের।

    গত বছরের ১৮ নভেম্বর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জুড়ীর সহযোগিতায় ডোমাবাড়ি কচুরগুল ব্লকের ৩৩ শতাংশ জমিতে বাণিজ্যিকভাবে এ চাষ শুরু করেন তিনি।

    খোর্শেদের তরমুজ বাগান এখন শুধু আয়ের উৎস নয়, স্থানীয়দের কাছেও এক ধরনের আকর্ষণের জায়গা হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে দর্শনার্থীর সংখ্যা।

    বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থী সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানের ছবি দেখে লোভ সামলাতে পারিনি। তরুণ বয়সে খোর্শেদের এমন উদ্যোগ সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো।’

    বাগানে আসা অনেকের কাছেই হলুদ তরমুজ দেখা কিংবা খাওয়ার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম। কেউ শুধু বাগান ঘুরে দেখছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ পছন্দের তরমুজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। কয়েকজন ক্রেতা একসঙ্গে ৪-১৫টি পর্যন্ত তরমুজও কিনছেন।

    উদ্যোক্তা খোর্শেদ জানান, হলুদ তরমুজ শীত মৌসুমের ফসল। চাষের প্রায় তিন মাসের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায়। চলতি মৌসুমে তার প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ফলন ও বাজারদর ভালো থাকলে আট থেকে নয় লাখ টাকার তরমুজ বিক্রির আশা করছেন তিনি। গত মৌসুমের অভিজ্ঞতা আরও আশাবাদী করেছে তাকে। প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে তরমুজ চাষ করে প্রায় আট লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছিলেন। অর্থাৎ তিন মাসের ফসল থেকে খরচ বাদে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আয় হয়েছিল। খোর্শেদ বলেন, ‘জুড়ীর আবহাওয়া হলুদ তরমুজ চাষের জন্য খুবই উপযোগী। মাত্র তিন মাসে ফলন পাওয়া যায়। আমি মনে করি, এ এলাকায় আরও বড় পরিসরে চাষের সুযোগ রয়েছে।’

    নিজের সাফল্যের পাশাপাশি এলাকার পতিত জমিকে কৃষির আওতায় আনার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন খোর্শেদ। তার ভাষ্য, জুড়ীতে এখনো বিভিন্ন কারণে হাজার হাজার বিঘা জমি বছরের বড় একটি সময় পতিত পড়ে থাকে। এসব জমিতে স্বল্পমেয়াদি ও লাভজনক ফসল আবাদ করা গেলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে।

    তিনি বলেন, ‘জুড়ীতে অনেক জমি পতিত পড়ে আছে। শিক্ষিত বেকার যুবকেরা চাইলে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারেন। একটু সাহস করে শুরু করলে কৃষি থেকেই স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব।’

    স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে খোর্শেদ বলেন, ‘আগামী বছর আরও জমিতে চাষ বাড়াব। পাশাপাশি অন্য নতুন ফসলও যুক্ত করতে চাই। আমার লক্ষ্য জুড়ীকে কৃষিসমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা।’

    জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম বলেন, ‘ল্যানফাই জাতের হলুদ তরমুজ চাষ জুড়ী উপজেলায় ইতেমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। খোর্শেদের উদ্যোগ ইতেমধ্যে আশপাশের কৃষকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। তার বাগান দেখে অনেকেই হলুদ তরমুজ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় পরিচিতিও বাড়ছে দ্রুত। প্রতিদিন শত শত কৃষক ও দর্শনার্থী বাগানটি দেখতে আসছেন।’

    কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ল্যানফাই জাতের হলুদ তরমুজ একটি উচ্চমূল্যের হাইব্রিড জাত। উৎপাদন পদ্ধতি অনেকটা দেশি তরমুজের মতো। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন এ ও সি রয়েছে এবং ফলটি বেশ মিষ্টি। জুড়ীর মাটি ও আবহাওয়া এ জাতের তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী।’

    কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের সহযোগিতাকে এ উদ্যোগের অন্যতম সহায়ক হিসেবে উল্লেখ করে মাহমুদুল আলম বলেন, ‘কেউ আগ্রহী হলে কৃষি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা প্রদান করা হবে।’

  • গ্রামেই দিনে ৩০০ মণ করলার বেচাকেনা

    গ্রামেই দিনে ৩০০ মণ করলার বেচাকেনা

    বিকেল হলেই জমি থেকে সদ্য তোলা করলা নিয়ে আসেন কৃষকেরা। কেউ ব্যাগে, কেউ প্লাস্টিকের ক্যারেটে করে গ্রামের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে আসেন এসব সবজি। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত চলে দরদাম ও বেচাকেনা। পরদিন সকালে পিকআপে করে সেই করলা চলে যায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারে।

    অবাক করার মতো বিষয় হলো, এটি কোনো সরকারি ইজারাভুক্ত হাট নয়। গ্রামের ভেতরের একটি সাধারণ জায়গায় প্রায় ১৫ বছর ধরে গড়ে উঠেছে করলার এই পাইকারি কেনাবেচার কেন্দ্র।

    জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার বাখেরা কোমলগাড়ী গ্রামের মসজিদের সামনের ফাঁকা জায়গাটি এখন আশপাশের গ্রামের করলা চাষিদের কাছে পরিচিত পাইকারি বিক্রিকেন্দ্র হিসেবে।

    স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে এখানে করলার বেচাকেনা শুরু হয়েছে মৌসুম শুরুর প্রায় ১৫ দিন আগে থেকেই। বর্তমানে পাঁচ থেকে ছয়জন মহাজন নিয়মিত করলা কিনছেন। প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ মণ করলা আসে এই কেন্দ্রে। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। পরদিন সকাল থেকে বিকেলের মধ্যে পিকআপে করে এসব করলা পাঠিয়ে দেওয়া হয় দেশের বিভিন্ন বাজারে।

    সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের মসজিদের সামনে অস্থায়ী ত্রিপলশেডের নিচে ব্যাগ ও প্লাস্টিকের ক্যারেটে করলা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এক পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে করলাভর্তি ব্যাগ ও ক্যারেট। পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকটি পিকআপ। আগের সন্ধ্যায় করলা বিক্রি করা দুই কৃষক মহাজনের কাছ থেকে তাঁদের পাওনা টাকা নিচ্ছিলেন।কৃষকেরা জানান, এখানে করলা বিক্রি করায় তাঁদের বাড়তি ঝামেলা কম। জমি থেকে করলা তুলে সরাসরি বিক্রিকেন্দ্রে নিয়ে এলেই হয়। অন্য কোনো হাটে নিতে হয় না। ফলে পরিবহন খরচ, টোল কিংবা ধলতার মতো বাড়তি খরচও দিতে হয় না। আবার স্থানীয় হাটের তুলনায় অনেক সময় ভালো দাম পাওয়া যায়। এসব কারণে আশপাশের গ্রামের অনেক কৃষক এখন এখানেই করলা বিক্রি করছেন।

    স্থানীয় কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এক মণ করলা ২ হাজার ৪০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। কয়েক দিন আগে দাম কম ছিল। হাটের চেয়ে এখানে ভালো দাম পাওয়া যায়। তাই এলাকার কৃষকেরা এখানে করলা বিক্রি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।’

    করলা বিক্রির পর তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে এই গ্রামকে ঘিরে। মহাজনেরা কৃষকদের কাছ থেকে করলা সংগ্রহ করে বাছাই ও প্যাকেটজাত করেন। পরে পিকআপে করে সেগুলো বিভিন্ন বাজারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

    মহাজন বাবু মণ্ডল বলেন, ‘প্রতিদিন আড়াই শ থেকে ৩০০ মণ করলা এখানে আসে। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত কেনাবেচা চলে। পরদিন সকাল থেকে বিকেলের মধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়।’

    স্থানীয় বাসিন্দা মুরশিদুল ইসলাম জানান, আশপাশের মাঠগুলোতে করলার আবাদ বেশি হওয়ায় প্রায় ১৫ বছর আগে কয়েকজন মহাজন এখানে কৃষকদের কাছ থেকে করলা কেনা শুরু করেন। ধীরে ধীরে কৃষকের সংখ্যা ও করলার পরিমাণ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে জায়গাটি করলার পাইকারি কেনাবেচার পরিচিত কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

    কৃষকেরা বলেন, মাঠের কাছাকাছি এই বিক্রিকেন্দ্র হওয়ায় তাঁদের সময় ও পরিবহন খরচ—দুটিই কমছে। বিশেষ করে বিকেলে জমি থেকে করলা তুলে এনে রাতের মধ্যেই বিক্রি করে দিতে পারছেন তাঁরা। এতে পরদিন আবার জমিতে কাজ করার সুযোগ থাকছে।ক্ষেতলাল উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৬০ হেক্টর জমিতে করলার আবাদ হয়েছে। চাহিদা ও সরবরাহের ওপর করলার দাম ওঠানামা করে। কৃষকেরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগ তাঁদের পরামর্শ দিচ্ছে।

    ধান ও আলুর জন্য পরিচিত ক্ষেতলালের কৃষিতে এখন বিভিন্ন সবজির আবাদও বাড়ছে। উঁচু জমিতে করলা, পটল, বেগুন, চিচিঙ্গা, লাউ ও শসার মতো সবজি চাষ করছেন কৃষকেরা। এর মধ্যে করলাকে ঘিরে বাখেরা কোমলগাড়ী গ্রামের এই পাইকারি কেন্দ্রটি কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বাজারে পৌঁছে দেওয়ার একটি স্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।

    কোনো সাইনবোর্ড নেই, নেই ইজারার আওতায় থাকা আনুষ্ঠানিক হাটের অবকাঠামোও। তবু প্রতিদিন শত শত মণ করলার বেচাকেনায় জমে ওঠে গ্রামের এই জায়গাটি। বিকেলে কৃষকেরা নিয়ে আসেন মাঠের ফসল, রাতে চলে দরদাম, আর সকালে সেই করলাই পিকআপে চড়ে পাড়ি দেয় দূরের বাজারের পথে। এভাবেই প্রায় দেড় দশক ধরে গ্রামের একটি সাধারণ জায়গা করলা চাষিদের কাছে হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ পাইকারি বিক্রিকেন্দ্র।

  • আগ্রহ বাড়ছে হলুদ চাষে

    আগ্রহ বাড়ছে হলুদ চাষে

    যশোরের কেশবপুর উপজেলায় চলতি বছর মশলা জাতীয় ফসল হলুদের ব্যাপক চাষ হয়েছে। বাজার মূল্য বেশি থাকায় চাষিদের মধ্যে এ মশলা জাতীয় হলুদ চাষে আগ্রহ বেড়েছে। তারা হলুদ চাষ করে সোনালি স্বপ্ন বুনছেন।

    উপজেলার বন্যামুক্ত উঁচু এলাকা মজিদপুর ইউনিয়নের বাগদহা, মির্জাপুর, শ্রীফলা, প্রতাপপুর, বায়সা, পাঁজিয় ইউনিয়নের কমলাপুর, গড়ভাঙ্গা, বেলকাটি, সাগরদত্তকাটি, মঙ্গলকোট ইউনিয়নের মঙ্গলকোট, বসুন্তিয়া ও কেদারপুর, হাসানপুর ইউনিয়নের মোমিনপুর, কাবিলপুর, হাসানপুর, ত্রিমোহিনি ইউনিয়নের চাদড়া, মির্জানগর, বরনডালি, গোপালপুর এবং সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের জাহানপুর, ভালুকঘর, বেগমপুর এলাকায় জমিতে এ মশলাজাতীয় কৃষিজাত পণ্য হলুদের চাষ হয়েছে ব্যাপক।উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, হলুদ রোপণে খরচ একেবারে সীমিত। বীজভেদে কাঠাপ্রতি খরচ হয় মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। বীজ হলুদ ৭-৮ কেজি মূল্য ৫০০ টাকা। উৎপাদন হয়ে থাকে কাঠাপ্রতি ৫-৭ মন। কাঁচা হলুদ প্রকারভেদে বিক্রয় হয়ে থাকে ১৫০০-১৬০০ টাকা মন দরে। বর্তমান বাজারে প্রতি কাঠায় সর্বনিম্ন লাভ হয় ২৪০০-৪০০০ টাকা। হলুদ চাষের সময় কাল ৯ মাস। হলুদ ক্যান্সার রোধক, হজম ভালো করে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে, ত্বক মসৃন হয়, ব্যাড কোলেস্টেরল নষ্ট করে, ফ্যাটিলিভার ভালো হয়। রূপচর্চায় কার্যকরি ভূমিকা রাখে।

    গড়ভাঙ্গা গ্রামের কৃষক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘হলুদ চাষে বেশি লাভবান হওয়া যায়। হলুদ বিভিন্ন রোগ নিরাময় করে। কৃষকের হলুদ বাগান সবুজ গাছে মাঠ পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’

    এলাকার কৃষকরা জানান, হলুদ চাষে পোকা থেকে মুক্ত থাকতে পারলে অনেক লাভ হয়, যার কারণে এ উপজেলায় হলুদ চাষের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। তবে এ সময় হলুদে বিভিন্ন রোগ আক্রমণ করে থেকে। বিশেষ করে পরিকল্পনা অনুযায়ী হলুদ পচা রোগ, শ্বাসনালী বা কচিডগা পোকার আক্রমণের জন্য নিয়মিত ওষুধ দিতে হবে। পানি যাতে জমে না থাকে, তার জন্য পানি সরানো নালা করতে হবে। রোগের ওষুধ হিসেবে দানা কোস্টার ও তরল টিল্ট ব্যবহার করলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে।

    কেশবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘গত বছর কেশবপুর উপজেলায় হলুদ চাষ হয়েছিল মাত্র ৬৭০ বিঘা জমিতে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১২০ বিঘা, যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। উপজেলার কৃষকের মশলাজাতীয় ফসলের চাষের আগ্রহ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এ বিষয়ে কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’

  • রাজশাহীতে সার সংকট ঠেকাতে ডিজিটাল সেবা চালু

    রাজশাহীতে সার সংকট ঠেকাতে ডিজিটাল সেবা চালু

    কৃষকদের মধ্যে সারের সুষম বণ্টন নিশ্চিত ও কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে রাজশাহীর পবা উপজেলায় ‘পবা সার ডটকম’ নামে একটি ডিজিটাল ওয়েবসাইট সেবা চালু করা হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উপজেলার বিভিন্ন ডিলারের কাছে সারের মজুত, বিক্রি ও অবশিষ্টের তথ্য অনলাইনে দেখা যাবে।

    মঙ্গলবার দুপুরে পবা উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এই সেবার উদ্বোধন করেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলী।

    বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম।অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইবনুল আবেদীন। সঞ্চালনা করেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম এ মান্নান।

    ইউএনও মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, সরকার কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার বরাদ্দ দিচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে তদারকি করতে গিয়ে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকার পরও সারের সুষম বণ্টন না হওয়ায় অনেক কৃষক তাঁর ন্যায্য পরিমাণ সার পাচ্ছেন না।আবার কোনো কোনো কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার নেওয়ায় অন্য কৃষক তাঁর প্রাপ্য সার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

    ইউএনও বলেন, এসব সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে ‘পবা সার ডটকম’ চালু করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় কৃষককে নতুন কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে না। তাঁরা আগের মতোই ডিলারের কাছ থেকে সার কিনবেন।শুধু ডিলারদের তাঁদের মজুত ও বিক্রির তথ্য ওয়েবসাইটে হালনাগাদ করতে হবে। এর মাধ্যমে প্রশাসন অনলাইনে জানতে পারবে, কোন ডিলারের কাছে কত পরিমাণ সার মজুত রয়েছে।

    পবা উপজেলার প্রায় ২৫ জন ডিলারের মজুতের তথ্য ওয়েবসাইটের ড্যাশবোর্ডে দেখা যাবে জানিয়ে ইউএনও বলেন, কোনো এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় অস্বাভাবিক পরিমাণ সার বিক্রি হলে ওয়েবসাইটে সতর্কতামূলক বার্তা আসবে। তখন সংশ্লিষ্ট এলাকায় তদন্তকারী কর্মকর্তা পাঠিয়ে বিষয়টি যাচাই করা হবে।

    সারের বিতরণব্যবস্থা তদারকির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সার পাওয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবেন। তাঁদের পরিদর্শন জিপিএস লোকেশনের মাধ্যমে নথিভুক্ত হবে। এরপর উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের ১০ জন ট্যাগ কর্মকর্তা তাঁদের কার্যক্রম তদারকি করবেন। উপজেলা প্রশাসনও পুরো ব্যবস্থাটি পর্যবেক্ষণ করবে।

    ইউএনও জানান, ‘পবা সার ডটকম’ মূলত একটি প্রগ্রেসিভ ওয়েব অ্যাপ। এটি ওয়েবসাইট হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি মোবাইল ফোনে অ্যাপের মতো যুক্ত করা যাবে। বর্তমানে এটি পাইলট ভিত্তিতে চালু করা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের মতামতের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে এতে পরিবর্তন ও নতুন সুবিধা যুক্ত করা হবে।

    জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রান্তিক কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে সার পৌঁছে দেওয়া প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরও কখনো কখনো কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করা হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তা ঠেকানোর পাশাপাশি কৃষকের কাছে সার পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। বর্তমানে পবায় পাইলট ভিত্তিতে এটি চালু করা হয়েছে। সফল হলে পর্যায়ক্রমে রাজশাহী জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও এই ব্যবস্থা চালু করা হবে।

    বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলী বলেন, কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণগুলোর একটি সার। ফসলের বৃদ্ধি, ফুল ও ফল ধারণের জন্য সারের প্রয়োজন রয়েছে। তাই সারের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, শুধু ডিলারদের কাছে কী পরিমাণ সার মজুত আছে, সেই তথ্য থাকলেই হবে না। কোন এলাকায় কতজন কৃষক আছেন, তাঁদের কতটুকু চাষযোগ্য জমি রয়েছে, কোন মৌসুমে তাঁরা কী ফসল চাষ করছেন এবং ওই ফসলের জন্য কী পরিমাণ সার প্রয়োজন- এসব তথ্যও ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত করা প্রয়োজন।

    বিভাগীয় কমিশনার বলেন, আমন মৌসুমে কোন ব্লকে কতজন কৃষক কতটুকু জমিতে চাষ করছেন, তা জানা থাকলে ওই এলাকার সম্ভাব্য সারের চাহিদা আগে থেকেই নির্ধারণ করা সম্ভব। ফসলভেদে ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি ও টিএসপির চাহিদাও নির্ধারণ করা যাবে। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ব্লকের কৃষকদের তালিকা ও তাঁদের সারের চাহিদার তথ্যের পাশাপাশি নির্দিষ্ট ডিলার নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে। তাহলে কোন কৃষক কোন ডিলারের কাছ থেকে সার নেবেন, সেটি আগে থেকেই জানা থাকবে। এতে সার নিয়ে কৃষকদের বিভ্রান্তি কমবে এবং বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে। বর্তমানে সারের মজুত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, সরকারি পর্যায়ে বাফার গুদাম ও বিসিআইসি-বিএডিসির গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। তবে ডিলারদের গুদামে থাকা মজুতের ওপরও নজরদারি প্রয়োজন। কোনো কৃষক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার নিয়ে বাড়িতে মজুত করছেন কি না, সেটিও মাঠপর্যায়ে তদারকি করা হচ্ছে। অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

    ‘পবা সার’ প্রকল্পটির নকশা, পরিচালনা ও কারিগরি উন্নয়ন করেছে সিল্কোরা কনসালটেন্সি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই ডিজিটাল ব্যবস্থায় সার বরাদ্দ, মজুত, বিক্রি ও বিতরণের তথ্য একই প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে। এতে কৃষক, ডিলার ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে দেখতে পারবেন। অনিয়ম শনাক্ত করা এবং সঠিক সময়ে সঠিক কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোও সহজ হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সারের ডিলার, কৃষক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

  • ফরিদপুরে পাটকাঠিতে সম্ভাবনা, বাড়তি আয় কৃষকের

    ফরিদপুরে পাটকাঠিতে সম্ভাবনা, বাড়তি আয় কৃষকের

    ‘সোনালি আঁশে ভরপুর, ভালোবাসি ফরিদপুর’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে পাটের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন ফরিদপুরের কৃষকরা। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রতিবছরই চাষ হচ্ছে উৎকৃষ্ট মানের পাট। পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটকাঠি বিক্রি করেও এখন বাড়তি আয় করছেন কৃষকরা।

    একসময় অবহেলিত ও মূলত জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত পাটকাঠি বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফরিদপুরের বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, মধুখালী, সালথা, নগরকান্দাসহ বিভিন্ন উপজেলায় ব্যাপক পাট চাষ হয়। পাট কাটার পর আঁশ সংগ্রহের পাশাপাশি পাটকাঠিও সংরক্ষণ করছেন কৃষকরা। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষকের বাড়ি ও মাঠ থেকে পাটকাঠি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। মান ও শুকনো অবস্থাভেদে বর্তমানে প্রতি মণ পাটকাঠি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

    কৃষকরা জানান, আগে পাটকাঠিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না। জমির পাশে, পুকুরপাড়ে কিংবা বাড়ির আঙিনায় ফেলে রাখা হতো। অনেকে রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতেন। এ ছাড়া ঘরের মাচা, সবজির মাচা ও বেড়াসহ বিভিন্ন কাজে পাটকাঠি ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে এর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পাটের পাশাপাশি পাটকাঠি বিক্রি করেও অতিরিক্ত আয় করতে পারছেন তারা।

    পার্শ্ববর্তী জেলাতেও যাচ্ছে পাটকাঠি

    ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা পাটকাঠি শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ব্যবসায়ীরা এগুলো মাগুরা, রাজবাড়ী, ঝিনাইদহ, গোপালগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাচ্ছেন। পাটকাঠি সংগ্রহের পর শুকিয়ে ও প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

    স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগের তুলনায় পাটকাঠির চাহিদা বেড়েছে। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি কিনে তারা বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছেন। শুকনো ও ভালো মানের পাটকাঠির চাহিদা বেশি হওয়ায় কৃষকরাও তা সংরক্ষণে আগ্রহী হচ্ছেন।

    এক পাটকাঠি ব্যবসায়ী বলেন, ‘আগে পাটকাঠি অনেকটা অবহেলিত ছিল। এখন এর চাহিদা বেড়েছে। আমরা কৃষকদের কাছ থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ দরে পাটকাঠি কিনে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করছি। চাহিদা থাকায় কৃষকরাও এটি বিক্রি করে ভালো দাম পাচ্ছেন।’

    কৃষকের মুখে বাড়তি আয়ের কথা

    পাটচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাটের আঁশ বিক্রির পর পাটকাঠি থেকেও আয় হওয়ায় উৎপাদন খরচের একটি অংশ উঠে আসছে। এতে পাটচাষে তাদের আগ্রহও বাড়ছে।

    বোয়ালমারী উপজেলার ফেলান নগর গ্রামের কৃষক হালিম বলেন, ‘পাট থেকে আঁশ বিক্রি করার পর পাটকাঠিগুলো আগে তেমন দাম পেতাম না। এখন ব্যবসায়ীরা বাড়ি থেকে এসে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। মণপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পাওয়ায় পাটকাঠি থেকেও বাড়তি আয় হচ্ছে।’আলফাডাঙ্গা উপজেলার কৃষক হাবিব মোল্লা বলেন, ‘আগে পাটকাঠি দিয়ে রান্নার জ্বালানি, ঘরের মাচা কিংবা বেড়ার কাজে ব্যবহার করতাম। এখন বিক্রি করেও টাকা পাওয়া যাচ্ছে। তাই পাট কাটার পর পাটকাঠি যত্ন করে শুকিয়ে রাখি।’

    বোয়ালমারী উপজেলার ময়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কালিপদ চক্রবর্ত্তী বলেন, পাটকাঠি বর্তমানে শুধু জ্বালানি বা ঘরোয়া কাজে সীমাবদ্ধ নেই। পাটকাঠি পুড়িয়ে উৎপাদিত ছাই ও অন্যান্য উপাদান বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাটকাঠি থেকে তৈরি কার্বনজাত উপাদান বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে ব্যবহারের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে কালি ও বিভিন্ন শিল্পপণ্য তৈরিতেও এর ব্যবহার রয়েছে। এ ছাড়া পানবরজ, সবজির মাচা, ঘরের বেড়া ও বিভিন্ন কৃষিকাজেও পাটকাঠি ব্যবহার করা হয়।

    তিনি বলেন, ‘ফলে পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটকাঠিও কৃষকের জন্য একটি মূল্যবান উপজাত পণ্যে পরিণত হয়েছে।’

    বোয়ালমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলভীর রহমান বলেন, পাটকাঠির বাড়তি ব্যবহার ও বাজার তৈরি হওয়া কৃষকদের জন্য ইতিবাচক। পাটের পাশাপাশি পাটকাঠি বিক্রি করে কৃষক অতিরিক্ত আয় করতে পারছেন। তবে পাটকাঠি সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে কৃষকদের আরও সচেতন হওয়া দরকার।

    তিনি আরও বলেন, ‘পাট আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটকাঠিরও অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হয়েছে। কৃষকরা পাটকাঠি বিক্রি করে বাড়তি আয় করতে পারছেন। পাটকাঠির বহুমুখী ব্যবহার ও বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে পাটচাষিদের আয় আরও বাড়তে পারে।’

    এতে ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী পাটচাষ আরও লাভজনক হয়ে উঠবে বলে মনে করেন তিনি।