এই কর্মসূচির আওতায় খুলনা কৃষি অঞ্চলের চার জেলায় মোট প্রায় দুই লাখ চারা বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও জুন মাসের শেষ পর্যন্ত অর্ধেকেরও কম চারা বিতরণ হয়েছে। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, দ্রুতগতিতে বিতরণ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) খুলনা অঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইল—এই চার জেলায় মোট ১ লাখ ৯৫ হাজার ৯০০টি ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে গত ৩০ জুন পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ৯৩ হাজার ৯৪৫টি চারা, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪৮ শতাংশ।
জেলাভিত্তিক অগ্রগতি
চারা বিতরণে চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাগেরহাট। সেখানে ৫৬ হাজার ৩০০টি চারার বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে ৪৮ হাজার ১৫৫টি, যা লক্ষ্যমাত্রার ৮৬ শতাংশ। সাতক্ষীরায় ৪৮ হাজার ৬০০টি চারার মধ্যে ৩৭ হাজার ১১০টি বিতরণ হয়েছে, যা প্রায় ৭৬ শতাংশ। অন্যদিকে খুলনায় ৬৭ হাজার ৯৫০টি চারার বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৮ হাজার ৬৮০টি, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৩ শতাংশ।
সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে নড়াইল। সেখানে ২৩ হাজার ৫০টি চারা বিতরণের লক্ষ্য থাকলেও ৩০ জুন পর্যন্ত বিতরণ কার্যক্রম শুরুই হয়নি। তবে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই সেখানে বিতরণ কার্যক্রম শুরু হবে।
৫৩ কোটি টাকার প্রণোদনা
চলতি অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতের আওতায় দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকার ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় দেশের ৬৪ জেলায় বিনামূল্যে ১৬ লাখ ২৮ হাজার ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ইনপুটস-২ উইংয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, চারাগুলো চারটি শ্রেণিতে ভাগ করে বিতরণ করা হচ্ছে। প্রতিটি চারার সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে—৩০ কেজি জৈব সার, একটি বাঁশের খুঁটি এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহায়ক উপকরণ। এর ফলে চারার পরিচর্যা সহজ হবে এবং বেঁচে থাকার হারও বাড়বে বলে মনে করছে কৃষি বিভাগ।
ডিএই খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিটি কৃষক বা প্রতিষ্ঠানকে পাঁচটি করে চারা দেওয়া হচ্ছে। এসব চারা বাড়ির আঙিনা, পতিত জমি, খালের পাড়, রাস্তার ধারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খালি জায়গায় রোপণ করা যাবে।
তিনি বলেন, ‘উপকারভোগীদের কৃষি কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর যাচাই করে মাস্টার রোলের মাধ্যমে চারা বিতরণ করা হচ্ছে। এতে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে কৃষকের বাড়তি আয়ও নিশ্চিত করতে পারে। ফলজ গাছ থেকে পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত ফল বিক্রি করে আয় করা সম্ভব। বনজ গাছ কাঠের চাহিদা পূরণে সহায়ক, আর ঔষধি গাছ স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ও ভেষজ শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া ব্যাপক বৃক্ষরোপণ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, কার্বন শোষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, মাটির ক্ষয় রোধ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
গতি বাড়ানোর প্রয়োজন
যদিও বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় চারা বিতরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তবে খুলনা ও নড়াইলের ধীরগতির কারণে সামগ্রিক কর্মসূচির অগ্রগতি এখনও সন্তোষজনক নয়।
কৃষি বিভাগ আশা করছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত চারা বিতরণ সম্পন্ন হবে এবং সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে খুলনা অঞ্চলও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
কৃষি
-

চারা বিতরনে গতি বাড়ানোর তাগিদ
-

বর্ষায় বীজতলা তলিয়ে গেলে কী করবেন?
আষাঢ়-শ্রাবণের এই অতিবৃষ্টিতে যশোরের অনেক নিচু এলাকায় রোপা আমনের বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেকেই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন যে সাধের চারাগুলো পচে নষ্ট হয়ে যাবে কি না। মনে রাখবেন, চারা যদি ৩-৪ দিনের বেশি পানির নিচে থাকে, তবেই ক্ষতির আশঙ্কা বেশি। তবে ভয়ের কিছু নেই, সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই চারা দিয়েই আমরা ভালো ফলন ঘরে তুলতে পারব। বীজতলা রক্ষায় আমার সরাসরি মাঠের কিছু জরুরি পরামর্শ নিচে দেওয়া হলো:
১. পানি সরানোর ব্যবস্থা করুন সবার আগে
মেঘ কেটে রোদ ওঠার সাথে সাথে জমি থেকে পানি বের করার ব্যবস্থা করুন। যদি চারার ডগা সামান্য ডুবে থাকে, তবে নালা কেটে বা সেচ দিয়ে দ্রুত পানি কমিয়ে চারার মাথাটি অন্তত বের করে দিন। বীজতলার আশপাশে কোনো আগাছা বা ময়লা জমতে দেবেন না, এতে বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে চারা পচে যায়।২. কাদার আস্তরণ ধুয়ে ফেলুন
বৃষ্টি বা বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর চারার গায়ে কাদার একটা পাতলা আস্তরণ বা পলি জমে যায়। কাদা জমে থাকলে চারা রোদের আলো থেকে খাদ্য তৈরি করতে পারে না, ফলে চারা দ্রুত হলুদ হয়ে মারা যায়। তাই পানি নামার সাথে সাথে বালতি দিয়ে পরিষ্কার পানি ছিটিয়ে বা স্প্রেয়ার দিয়ে চারার কাদা ধুয়ে দিন।
৩. এখনই ইউরিয়া সার দেবেন না
পানি নেমে যাওয়ার পরপরই অনেকে তাড়াহুড়ো করে বীজতলায় ইউরিয়া সার দিয়ে ফেলেন—এটি একটি মারাত্মক ভুল কাজ। এতে চারা আরও নরম হয়ে পচে যাবে।
সঠিক নিয়ম: পানি সম্পূর্ণ নেমে যাওয়ার ৩ থেকে ৪ দিন পর চারা যখন সোজা হয়ে দাঁড়াবে এবং কিছুটা সতেজ দেখাবে, তখন সার দেবেন। চারা যদি হলুদ হয়ে যায়, তবে শতাংশ প্রতি ২৮০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৪০০ গ্রাম জিপসাম সার একসাথে মিশিয়ে উপরিপ্রয়োগ করুন।
৪. রোগ ও পোকার আক্রমণ ঠেকাতে স্প্রে
পানিতে ডুবে থাকার কারণে চারার গোড়া নরম হয়ে যায় এবং ছত্রাকের আক্রমণ ঘটে, যাকে আমরা ‘চারা পচা রোগ’ বা ‘বাকানি রোগ’ বলি।
সমাধান: পানি শুকানোর পর পর প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম কারবেনডাজিম বা ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন: নোইন বা ডাইথেন এম-৪৫) ভালোভাবে মিশিয়ে পুরো বীজতলায় স্প্রে করুন।
এই সময় মাজরা বা লেদা পোকার আক্রমণ দেখা দিলে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে সঠিক কীটনাশক স্প্রে করুন।৫. চারা তোলার সময় বাড়তি সতর্কতা
জলে ভেজা মাটি থেকে চারা তোলার সময় গোড়া বা শিকড় ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই পানি নামার সাথে সাথেই চারা তুলবেন না। মাটি হালকা ভেজা ও ঝুরঝুরে থাকা অবস্থায় (যেটিকে আমরা ‘জোঁ’ বলি) অত্যন্ত সাবধানে চারা তুলুন যাতে মূল শিকড় অক্ষত থাকে।
বিশেষ পরামর্শ
যদি কোনো কারণে বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েও যায়, তবে ভেঙে পড়বেন না। এখনও সময় আছে। দ্রুত নাবি বা দেরি করে লাগানো যায় এমন আমনের জাত—যেমন বিআর ২২, বিআর ২৩, ব্রি ধান ৪৬ অথবা নাইজারশাইল ধানের বীজ নতুন করে ফেলুন।
ডাপোগ বীজতলা: জায়গা না থাকলে বাঁশের চটা বা কলার ভেলায় কাদা মাটি দিয়ে “ডাপোগ বীজতলা” তৈরি করুন। এই পদ্ধতিতে মাত্র ১২-১৫ দিনেই রোপণযোগ্য চারা পাওয়া যায়।
নোট: যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি মাঠে কর্মরত আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আমরা সবসময় আপনাদের পাশেই আছি। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।
-

টানা বৃষ্টিতে যশোরে সবজির চারা উৎপাদনে কোটি টাকার ক্ষতি
চাষিরা জানান, এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চারা উৎপাদন করেছেন তারা। চারা নষ্টের ফলে কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় মাথার ওপর ঋণের বোঝা বেড়ে চলেছে। তারা অভিযোগ করেন, আব্দুলপুর মাঠের পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত কালভার্টটি ছোট ও অপ্রশস্ত। ফলে বছরভর জলাবদ্ধতার সংকট থাকে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের আব্দুলপুর গ্রামের চাষিরা বছরে কমবেশি ১৫ কোটি টাকার চারা উৎপাদন ও বেচাকেনা করেন। চার দশকের বেশি আগে এই সবজির চারা উৎপাদনের কারবার গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও বিনামূল্যের সার, বীজ ও কীটনাশকের আওতায় নেই এখানকার চারা উৎপাদকরা। ফলে উৎপাদনের মূলধনের জন্য এনজিও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ যে-কোনো কারণে উৎপাদনে বিপর্যয় ঘটলে লোকসান ও ঋণের বোঝা নিয়ে দুশ্চিন্তা, দুর্ভোগ ও সংকটে পড়তে হয়।
সম্প্রতি এই প্রতিবেদক যখন আব্দুলপুর মাঠে গিয়েছিলেন, তখন আকাশজুড়ে হঠাৎই মেঘের ঘনঘটা শুরু হয়। আর তখন চারা বাঁচাতে পলিথিন হাতে ছোটাছুটি শুরু করেন চাষিরা। চারপাশে পুঁতে রাখা বাঁশের চারটি ছোট খুঁটির সঙ্গে পলিথিন বেঁধে শেড বা ছাউনি দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তারা।
মাঠটির কৃষকদের সঙ্গে আলাপচারিতার ফাঁকে ঘুরে দেখা যায়, বহু বেড চারা নষ্ট হয়ে খালি পড়ে আছে। যে-সব বেডে এখনও চারাগাছ আছে, সেগুলোরও বেশিরভাগ নষ্টের উপক্রম হয়েছে। মাঠটির চাষি জাকির হোসেন বেডে অবশিষ্ট থাকা চারাগুলোর একটি থেকে আরেকটি হাত দিয়ে সরিয়ে দেখিয়ে বলেন, এগুলোর গোড়া পচে গেছে। দুই-একদিনের মধ্যে মরে যাবে। এই চারা কেউ কিনবে না। তিনি বলেন, ৯০টি বেডের বেশিরভাগ চারার গোড়া জলাবদ্ধতায় পচে গেছে। রোপণ করা সব বীজও নষ্ট হয়ে গেছে। এতে লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে।
আরেক কৃষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ৪২ শতক জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা ছিল। পাশাপাশি এসব ফসলের বীজও রোপণ করেছিলেন। গত ১০ ও ১১ জুলাইয়ের টানা বৃষ্টিতে বেশিরভাগ চারা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রোপণ করা সব বীজ পচে গেছে। তিনি বলেন, একটি বেড তৈরি করতে শ্রমিক খরচ ছাড়াও সার ও বীজের দাম মিলিয়ে ৪ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। বর্তমানে বীজের দামও অনেক বেশি। পাতাকপির একেক প্যাকেট বীজের দাম ৯০০ টাকা। ফলে সব মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
আব্দুলপুর গ্রামের সবজির চারা উৎপাদনকারী চাষিরা বলেন, ধান, পাট, গম ও ভুট্টাসহ অন্যান্য চাষাবাদে সরকারি প্রণোদনা সহায়তা মেলে। এসব চাষি বিনামূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক সুবিধা পান। কিন্তু এখানকার চাষিরা বছরভর কোটি কোটি টাকার সবজির চারা উৎপাদন করলেও প্রণোদনার আওতার বাইরে রয়েছেন। চারা উৎপাদনের পুঁজি জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে চড়া সুদে এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়। উচ্চমূল্যের সার, বীজ ও কীটনাশকের কারণে উৎপাদন ব্যয়ও অনেক বেড়ে গেছে। এমন অবস্থায় চারা ও বীজ নষ্ট হওয়ায় আর্থিক লোকসানের পাশাপাশি ঋণের বোঝাও বেড়েছে।
আব্দুলপুরের আরেক চাষি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ৩৩ শতক জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি ও বেগুনের চারা উৎপাদনে নেমেছিলেন। দুদিনের বৃষ্টিতে আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। চারা নষ্ট ও বীজ পচে আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, কিস্তি ঠিকমতো পরিশোধ করতে না পারায় ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে। এমন পরিস্থিতি উত্তরণে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে সরকারি ঋণসুবিধা পেলে সবজির চারা উৎপাদনকারীরা উপকৃত হতেন।
এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ না নিয়ে কৃষি ব্যাংক বা এ ধরনের ঋণ দেয় এমন ব্যাংকের সুবিধা কেন নেন না- এ প্রশ্নের জবাবে সবজির চারা উৎপাদনকারী চাষি আসাদুজ্জামান বলেন, ঋণ নিতে গেলে নানা কাগজপত্র চায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। কাগজপত্র তৈরি ও জমা দিতে দিনের পর দিন ব্যাংকে ঘুরতে হয়। তারপরও ঋণ পাওয়া যায় না। দেখা যায়, এভাবে ঘুরতে ঘুরতে ঋণ মিললেও মৌসুম শেষ হয়ে যায়। তিনি বলেন, এনজিও ঋণ নিয়ে ১০ শতক জমিতে উৎপাদিত ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন ও টমেটোর চারা এবং রোপণ করা সব বীজ নষ্ট হয়ে লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা অবস্থায় রয়েছি। আরেকটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আবার নতুন করে শুরুর চেষ্টা করছি।
৩৩ শতক জমিতে চারা ও বীজ নষ্টে ক্ষতির শিকার চাষি জাকির হোসেনের ভাষ্য, কৃষি সেক্টরের চারা উৎপাদনের এই খাতটি একদম অবহেলিত। কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এ খাতটি প্রণোদনা ও ঋণসুবিধার আওতায় নেই। সরকারের এদিকে নজর দেওয়া উচিত।
কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ৬৬ শতক জমিতে চারা উৎপাদন করেছিলাম। বেড তৈরি থেকে শুরু করে বীজ, সার ও পরিচর্যায় লাখ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। তিনি বলেন, মাঠের পানি নিষ্কাশনের কালভার্টটি অত্যন্ত ছোট। সরু ও অপ্রশস্ত হওয়ায় পানি নিষ্কাশন না হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্টদের কাছে নতুন করে প্রশস্ত একটি কালভার্ট নির্মাণের দাবি জানাই।
এ ব্যাপারে ওই এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, দুদিনের টানা বৃষ্টিতে পানি জমে টমেটো, বেগুন, ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। অন্যান্য সবজি ও ফসলের আবাদ করে কীভাবে এই ক্ষতি দ্রুত পুষিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
-

কাঁঠালের উপকারিতা ও অপকারিতা
কাঁঠালের উপকারিতা ও অপকারিতা
যেসকল পুষ্টি মানুষের দেহে প্রয়োজন তার প্রায় সবই কাঁঠালের মধ্যে আছে। এজন্যই বাঙালিরা পুষ্টির অভাব পূরণ করার জন্য কাঁঠাল খেয়ে থাকেন। শুধু তাইনয় কাঁঠাল পুষ্টির রাজা এবং গরিবের খাদ্য হিসেবে পরিচিত। কাঁঠাল কাঁচা, পাকা, খোসা, বীজ, শিকড় সবভাবেই খাওয়া যায় এবং প্রতিটি স্তরই পুষ্টির চমৎকারউৎস।কাঁচাকাঁঠালওকাঁঠালেরবিচিরান্নাকরেতরকারিবাহালুয়াওভর্তাহিসেবেখাওয়াহয়।আবারকাঁঠালের যেমন উপকারিতা রয়েছে তেমনিঅপকারিতাও রয়েছে। নিম্নেকাঁঠালের উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে জেনে নিন।
কাঁঠালের যত গুণ –
কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। এর বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus heterophyllus এবং ইংরেজিতে Jackfruit. কাঁঠাল বাংলাদেশে জন্মানো এমন একটি ফল যার প্রতিটি অংশই গুরুত্বপূর্ণ।
কাঁঠালের উপকারিতা
আসুন জেনে নিন কাঁচা ও পাকা কাঁঠালের স্বাস্থ্য উপকারিতা-
পুষ্টিবিদরা বলছেন, কাঁঠাল পুষ্টিগুণে ভরপুর। এবংমানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান যেমন- বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন এ, সি, বি-১, বি-২, থায়ামিন,রিবোফ্লাভিন,পটাশিয়াম,ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম,ফাইবার, প্রোটিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট,ম্যাংগানিজ,কপার আয়রনসহ নানা রকমের পুষ্টি ও খনিজ উপাদান পাওয়া যায়। এ ছাড়া আমিষ, শর্করা ও বিভিন্ন রকম ভিটামিনের ভাণ্ডার হচ্ছে এই কাঁঠাল । যেমনঃ-
♥উপাদান: প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁঠালে শক্তি ৩৯৭ কিলোক্যালরি, খাদ্য-আঁশ ২.০০ গ্রাম, চিনি ১৯.০৮ গ্রাম, স্নেহ- ০৬৪ গ্রাম, প্রোটিন ১.৭২ গ্রাম, ভিটামিন এ ৫ মাইক্রোগ্রাম, ভিটা ক্যারোটিন ৬১ মাইক্রোগ্রাম, লুটিন জিয়াক্সানথিন ১৫৭ মাইক্রোগ্রাম, থায়ামিন (বি১) ০.১০৫ মিঃগ্রাম, রিবোফ্লাবিন (বি২) ০.৫৫ মিঃগ্রাম, নায়াসিন (বি৩) ০.৯২ মিঃগ্রাম, প্যানটোথেনিক অ্যাসিড (বি৫) ০.২৩৫ মিঃগ্রাম, ভিটামিন (বি৬) ০.৩২৯ মিঃগ্রাম, ফোলেট (বি৯) ২৪ মাইক্রোগ্রাম, ভিটামিন সি ১৩.৮ মিঃগ্রাম, ভিটামিন ই ০.৩৪ মিঃগ্রাম, ক্যালসিয়াম ২৪ মিঃগ্রাম, লৌহ ০.২৩ মিঃগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ২৯ মিঃগ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ ০.০৪৩ মিঃগ্রাম, ফসফরাস ২১ মিঃগ্রাম, পটাসিয়াম ৪৪৮ মিঃগ্রাম, সোডিয়াম ২ মিঃগ্রাম, জিংক ০.১৩ মিঃগ্রাম ও অন্যান্য।
♥কাঁঠালে থাকা প্রোটিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ করে।
♥কাঁঠালে থাকা ভিটামিন সি চুল,দাঁত ও দাঁতের মাড়ি সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। এ ছাড়া ক্যান্সার ও টিউমারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
কাঁঠালে থাকা ভিটামিন এ রাতকানা রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
♥কাঁঠালে বিদ্যমান ফাইটো-নিউট্রিয়েন্টস আলসার, পাইলস ও কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় এবং বার্ধক্য ও উচ্চ রক্তচাপপ্রতিরোধে সহায়তা করে।
♥কাঁঠালে রয়েছে পটাশিয়াম, ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
♥কাঁঠালে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ এবং বিটা ক্যারোটিন, যা চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে।
♥কাঁঠালে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ে ও বলিরেখা কমিয়ে তারুণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে। মুখে বলিরেখা পড়তে বাধা দেয়। এছাড়াও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে সৃষ্টিকারী ফ্রি রেডিক্যাল প্রতিরোধ করতে লড়াই করে। যা ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী।
♥কাঁঠালে থাকা সোডিয়াম ও পটাশিয়াম শরীরের ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্সকে ঠিক রাখে, যা উচ্চরক্তচাপ ও হার্টও ভালো রাখে।
♥কাঁঠালে রয়েছে কার্বোহাইড্রেট ও ক্যালোরি। এজন্যই কাঁঠাল খেলে তাৎক্ষণিকশক্তিপাওয়াযায়।
♥কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকায় হজমের সমস্যা দূর করে। যা হজমশক্তি বাড়ায়, পেট পরিষ্কার রাখে ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
♥কাঁঠালে থাকা ক্যালশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম হাড় মজবুত করে ও অস্টিওপোরসিস রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
কাঁঠালে আয়রন থাকে, যা রক্তে লোহিতকণিকার পরিমাণ বাড়ায়। রক্তাল্পতায় রোগীদের জন্য কাঁঠাল খুবই উপকারী যা দেহের রক্তস্বল্পতা দূর করে।
♥কাঁঠালে কোনো ক্ষতিকর কোলেস্টেরল নেই এবং ক্ষতিকারক ফ্যাটের পরিমাণ কম হওয়ায় ওজন বাড়ার খুব একটা আশঙ্কা থাকে না
♥টেনশন, নার্ভাসনেস ও বদ হজম কমাতে কাঁঠালে ভূমিকা অনেক।
♥দুগ্ধদানকারী মা তাজা পাকা কাঁঠাল খেলে দুধের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
♥কাঁঠালে থাকা ম্যাঙ্গানিজ ও খনিজ উপাদান যা রক্তে শর্করা বা চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
♥কাঁঠালে থাকা ভিটামিন বি-৬ হৃদরোগের ঝুঁঁকি কমায়।
♥মায়ের পুষ্টিতে: প্রতিদিন ২০০ গ্রাম পাকা কাঁঠাল খেলে গর্ভবতী মা ও তার গর্ভধারণকৃত শিশুর সব ধরনের পুষ্টির অভাব দূর হয়ে যায়।
কাঁঠালের বিচির উপকারিতা :
কাঁঠালের বিচিতে রয়েছে ভিটামিন বি-১ ও বি-১২ এর ভালো উৎস।এছাড়াআছেভিটামিনএ, ও সি, থায়ামিন, নায়াসিন, লিগন্যান, আইসোফ্ল্যাভোন এবং স্যাপোনিনের মতো ফাইটো ক্যামিক্যালস। যা মানব দেহের জন্য উপকারী।
♦কাঁঠালের বিচিতে প্রতি ১০০ গ্রামে শক্তি পাওয়া যায় ৯৮ ক্যালরি। এ ছাড়া প্রতি ১০০ গ্রামে থাকে কার্বোহাইড্রেট ৩৮.৪ গ্রাম, প্রোটিন ৬.৬ গ্রাম, ফাইবার ১.৫ গ্রাম, চর্বি ০.৪ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ০.০৫ থেকে ০.৫৫ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ০.১৩ থেকে ০.২৩ মিলিগ্রাম, আয়রন ১.২ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ২ মিলিগ্রাম ও পটাশিয়াম ৪.০৭ মিলিগ্রাম।
♦কাঁঠালের বিচিতে আছে শর্করা যা শক্তির উৎকৃষ্টউৎস।
♦বিচিতে প্রোটিনও আছে যা কি না মাংসপেশি গঠনে ভূমিকা রাখে।
♦ফাইবার ও কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেটের কারণে এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম। ফলে এটি ওজন নাবাড়িয়েই যোগাতে পারে অনেক এনার্জি।
♦যে সমস্ত মানুষ মাছ, মাংস কম খায় তাদের জন্য আমিষের চাহিদা মেটাতে কাঁঠাল বিচি উৎকৃষ্টখাবার।
♦কাঁঠালবিচির জীবানুনাশক গুণও রয়েছে। এটি Escherichia coli I Bacillus megaterium ব্যাক্টেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর এবং এতে থাকা বিশেষ উপাদান Jacalin এইডস রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নয়নে সফল বলে প্রমাণিত হয়েছে।
♦এটি বলিরেখা দূর করে এবং ত্বকের বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
♦কাঁঠালের বিচি খেলে চুলের আগা ফাটা সমস্যা রোধ করে ও চুল পড়া কমাতে সাহায্য করে।
♦এতে বিদ্যমান ক্যালসিয়াম কেবল হাড়ের জন্য উপকারী নয় রক্ত সঙ্কোচন প্রক্রিয়া সমাধানেও ভূমিকা রাখে।
♦কাঁঠালের বিচিতেও রয়েছে প্রোটিন। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় কাঁঠালের বিচি খেতে পারেন। ফলে শরীরের রক্ত সরবরাহ বাড়বে। এ ছাড়া কাঁঠালে থাকা কপার থাইরয়েডগ্রন্থি ভালো রাখে।
♦কাঁঠালের বিচিতে থাকা এন্টি অক্সিডেন্টগুলো ক্যান্সার প্রতিরোধী এবং বার্ধক্যের প্রভাব সৃষ্টিকারি উপাদানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
কাঁঠালের খোসার উপকারিতা :
♣ কাঁঠালের খোসা দিয়ে তৈরি করা যায় জেলি। কারণ এতে ভিটামিন সি ও প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট জাতীয় উপাদান পাওয়া যায়।
♣কাঁঠালের খোসা দিয়ে তৈরি জেলিতেক্যালশিয়ামের ও পটাশিয়াম মতো খনিজ উপাদানগুলো শরীরে সোডিয়ামের প্রভাব নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন ঠিক রাখতে অনেকটা সাহায্য করে থাকে।
♣এছাড়াও এই জেলিতে রয়েছে বিটা ক্যারোটিন যা সেল ড্যামেজ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে থাকে।
কাঁঠালের শিকড়ের উপকারিতা :
♠যাদের হাঁপানি সমস্যা রয়েছে তারা কাঁঠালের শিকড় সিদ্ধ করে তা গ্রহণ করলে হাঁপানি সমস্যা সহজে নিরাময় করতে সহায়তা করে।
♠কাঁঠালের শিকড় জ্বর ও ডায়রিয়া নিরাময়ে খুব ভালো উপকার করে।
♠তাছাড়াও চর্মরোগ সমস্যার সমাধানে খুবই কার্যকরী ।
কাঁঠালেরঅপকারিতাঃ
কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। কাঁঠালের যেমনউপকারিতা রয়েছে তেমনি কাঁঠালের উপকারিতা রয়েছে এখানে আলোচনা করব কাঁঠালেরঅপকারিতা সম্পর্কে। কাঁঠালের অপকারিতা নিচে উল্লেখ্য করা হলো জেনে নিনঃ
যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাঁদের কাঁঠাল খাওয়ায় কিছুটা বিধিনিষেধ আছে। কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁদের রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি, তাদের কাঁঠাল না খাওয়াই ভালো। তাছাড়াও অধিক পরিমাণে কাঠাল খেলে তা বদহজম হতে পারে।
√√চলুন তাহলে দেখে নেই কাঁঠাল খাওয়ার পর কি কি ফল খাওয়া যাবে নাঃ
♥দুধঃ কাঁঠাল খাওয়ার পর দুধ খেলে পেট ফুলে যেতে পারে এবংত্বকে ফুসকুড়ি আবার সাদা সাদা দাগের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
♥পেঁপেঃ কাঁঠাল খাওয়ার পরে আপনি যদি পেঁপে খেতে যান তাহলে মুখে বা শরীরে এলার্জি চুলকানির সমস্যা
দেখা দিতে পারে।
♥ঢেঁড়সঃ কাঁঠাল খাওয়ার পর যদি ঢেঁড়স খেয়ে থাকেন তাহলে এসিডিটির সমস্যা দেখা দিতে পারে।
♥পানিঃ কাঁঠাল খাওয়ার পর পানি খেলে আপনার মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
-

বন্যায় বান্দরবানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিখাত
টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানি নেমে যেতে শুরু করলেও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে কৃষিখাতের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। জেলার সদর ছাড়াও লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ি উপজেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, সবজিক্ষেত ও ফলের বাগান পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে।
শুধু কৃষিজমিই নয়, বন্যার তীব্র স্রোতে সাংগু ও মাতামুহুরী নদীর দুই তীরজুড়ে গড়ে ওঠা বিস্তীর্ণ মৌসুমি চাষাবাদও ভেসে গেছে। নদীতীরবর্তী সবজি, ভুট্টা, মরিচ, আদা, হলুদ, কলা, পেঁপে, শসা, ঢেঁড়সসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কৃষকের আমন ধানের বীজতলা ও ফলের বাগানও নষ্ট হয়ে গেছে। পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে অনেক কৃষকের।
ক্ষতি থেকে কাটিয়ে উঠতে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা।
বান্দরবানের ছাইঙ্গ্যা এলাকার কৃষক মংমং মারমা জানান, হঠাৎ বৃষ্টি আর নদীর পানি এসে আমার তিতকরলা আর শসার বাগান পঁচে গেছে। অনেক টাকা লোন নিয়েছি, এখন কেমনে কিস্তি দেব জানি না।
বান্দরবানের বালাঘাটা ভরাখালীর কৃষক জসীম জানান, এমন বৃষ্টি আর বন্যা হয়েছে যে, আমাদের কৃষকেরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের এই ক্ষতি এখন কে পুষিয়ে দেবে?
আলীকদমের পানবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আবদুর রহমান জানান, কয়েক দিনের বৃষ্টি আর বন্যায় ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। বেশিরভাগ শসার বাগান ও সবজিবাগান পানিতে ডুবে শেষ। বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সব শেষ হয়ে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বান্দরবানের উপপরিচালক আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন জানান, বান্দরবানে কৃষিখাতের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এ পর্যন্ত আমরা বান্দরবানের সাত উপজেলার যে তথ্য পেয়েছি, সে অনুযায়ী ২ হাজার ১০৪ হেক্টর কৃষিজমি ও বাগান দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে এবং ৩৬৮ হেক্টর কৃষিজমি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫ হাজার ৩২৩ জন কৃষক।
-

৩০টি চারা থেকে এখন ৪ বিঘার লটকনবাগান
সকালের সূর্য তখনো পুরোপুরি তেজ ছড়ায়নি। ময়মনসিংহের ভালুকার নয়নপুর গ্রামের একটি বাগানে ঢুকতেই চোখে পড়ে ফলের ভারে নুয়ে থাকা সারি সারি লটকনগাছ। হলুদাভ পাকা ফলের থোকা হাতে নিয়ে কখনো পাইকারদের সঙ্গে দরদাম করছেন, কখনো আবার দূরদূরান্ত থেকে আসা কৃষকদের উন্নত জাতের কলম দেখাচ্ছেন রোকন উদ্দিন।
কয়েক বছর আগেও হাফেজ রোকন উদ্দিনের পরিচয় ছিল মসজিদের ইমাম হিসেবে। আজ তিনি পরিচিত একজন সফল লটকনচাষি ও উন্নত জাতের লটকনের চারা উদ্ভাবক হিসেবে। তাঁর বাগানে উদ্ভাবিত একটি জাত এখন স্থানীয়ভাবে ‘নয়নপুরী লটকন’ নামে পরিচিত।
গত সোমবার উপজেলার মল্লিকবাড়ি ইউনিয়নের নয়নপুর গ্রামে গিয়ে রোকন উদ্দিনের সঙ্গে কথা হয়। বাগান ঘুরে দেখাতে দেখাতে তিনি তাঁর কৃষক হয়ে ওঠার গল্প শোনান। তিনি জানান, জীবিকার জন্য দীর্ঘদিন বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসায় ইমামতি করেছেন। কিন্তু ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের ফাঁকে ফাঁকেই গাছ লাগানো ছিল তাঁর নেশা। মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা বাড়ির আঙিনায় সুযোগ পেলেই ফলগাছ রোপণ করতেন। একসময় সেই শখই তাঁকে বাণিজ্যিক ফল চাষে নিয়ে আসে।রোকন উদ্দিন বলেন, ২০১৮ সালে মুক্তাগাছা উপজেলা থেকে ৩০টি লটকনের চারা কিনে যাত্রা শুরু করেন তিনি। তবে শুরুতেই বড় ধাক্কা খেতে হয়। অনেক গাছ পুরুষ হওয়ায় প্রত্যাশিত ফলন পাননি। এরপর নিজেই কলম করার কৌশল শিখে ভালো ফলনশীল গাছ নির্বাচন করে নতুন করে বাগান গড়ে তোলেন। পুরোনো এক বিঘা জমির পাশাপাশি নতুন করে তিন বিঘা জমিতে প্রায় ২০০টি গাছ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করেন লটকন চাষ। ২০২৩ সাল থেকে বাগানে সফলতা আসতে শুরু করে।রোকন উদ্দিন বলেন, আট বছরে ৮–১০টি জাত নিয়ে কাজ করেছেন। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দুটি জাতকে সবচেয়ে ভালো মনে হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাতের ফল বড়, খেতে খুব মিষ্টি এবং বাজারেও এর চাহিদা বেশি। এই উন্নত জাতের নামকরণের পেছনেও রয়েছে একটি গল্প। তিনি জানান, কৃষিভিত্তিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’–এর উপস্থাপক শাইখ সিরাজ চলতি বছর তাঁর বাগান পরিদর্শনে এসে গ্রামের নাম অনুসারে জাতটির নাম ‘নয়নপুরী লটকন’ রাখার পরামর্শ দেন। এরপর থেকেই স্থানীয়ভাবে এ নামেই পরিচিতি পেয়েছে জাতটি।রোকন উদ্দিন জানান, বর্তমানে চার বিঘা জমির দুটি বাগানে লটকনের চাষ করছেন তিনি। নিজে চাষের পাশাপাশি কলম করে চারা উৎপাদন করে বিক্রিও করছেন। এক বছরের কলম চারা ১০০ টাকা এবং দেড় থেকে দুই বছরের কলম চারা ২০০–২৫০ টাকায় বিক্রি হয়। বছরে তার এখানে ৫-৮ লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষক ও উদ্যোক্তারা তাঁর বাগানে এসে চারা সংগ্রহ করেন। ভালো জাতের চারা না হলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই পরীক্ষিত গাছ থেকেই চারা তৈরি করেন। চারা নিয়ে যেন অন্যরাও সফল হন, সেটাই চান।
বর্তমানে বাগানের লটকন প্রতি মণ ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতেই প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন। সামনে বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছেন। নিজের বাগানের পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি বাগানের ফলও পাইকারিভাবে কিনে বাজারজাত করেন তিনি।চারা কিনতে আসা গফরগাঁও উপজেলার কৃষক মো. এনামুল হকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘ফেসবুকের মাধ্যমে তাঁর বাগান দেখে এসেছিলাম। ফল খেয়ে খুব ভালো লেগেছে। তাই ৩২টি কলম চারা কিনেছি। সফল হলে আমিও বাণিজ্যিকভাবে লটকনের বাগান করব।’
রোকন উদ্দিনের লটকনের ফল বড়, দেখতে সুন্দর ও খেতে মিষ্টি হয় বলে জানান স্থানীয় কৃষক আবদুস সালাম। তিনি আরও বলেন, এ কারণে তাঁর চারার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে। তাই এখানে অনেকে আসেন চারা নিতে ও ফল কিনতে।ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান বলেন, শখ থেকে শুরু হওয়া রোকন উদ্দিনের পথচলা এখন আর শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য ও উদ্ভাবনী চিন্তা থাকলে গ্রামবাংলার পতিত জমিও একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
উপজেলার প্রায় ৫ হেক্টর জমিতে লটকনের চাষ হচ্ছে উল্লেখ করে কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান বলেন, রোকন উদ্দিনের মতো উদ্যোক্তারা উন্নত মানের চারা উৎপাদন করায় নতুন নতুন বাগান গড়ে উঠছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ভালুকার লটকন রপ্তানিরও সম্ভাবনা রয়েছে।
-

আঁশফল চাষাবাদে সম্ভাবনার নতুন দ্বার
গ্রীষ্ম ও বর্ষার সন্ধিক্ষণে প্রকৃতিতে এখন মৌসুমি ফলের সমারোহ। আম, জাম ও কাঠালের মৌসুম শেষের দিকে। ঠিক এমন সময় মাগুরার শালিখার স্থানীয় বাজারগুলোতে দৃষ্টি কাড়ছে আরেকটি পরিচিত ও পুষ্টিগুণে ভরপুর ফল কাঠলিচু। অঞ্চলভেদে এটি ‘আশফল’ বা ‘পিচফল’ নামেও পরিচিত।
বর্তমানে শালিখা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ হাট-বাজারে কাঠ লিচুর ব্যাপক সরবরাহ দেখা যাচ্ছে। লিচুর মতোই খোসা ছাড়িয়ে ভেতরের সাদা শাঁস খেতে হয়। স্বাদে মিষ্টি ও রসালো হলেও এর আঁটি তুলনামূলক বড়। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কাছে ফলটি বেশ জনপ্রিয়।
একসময় রাস্তার ধারে, বাড়ির আঙিনায় কিংবা পরিত্যক্ত জমিতে অযত্ন-অবহেলায় জন্মানো এই ফলের তেমন কোনো বাণিজ্যিক মূল্য ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই চিত্র। এখন কাঠ লিচুর চাহিদা ও বাজারমূল্য বাড়ায় অনেকেই পুরোনো গাছের পরিচর্যায় মনোযোগ দিচ্ছেন। পাশাপাশি নতুন করে চারা রোপণেও আগ্রহ বাড়ছে।
ফল পাকার মৌসুমে বাদুড় ও বিভিন্ন পাখির আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে অনেক চাষিকে গাছ মশারির জাল দিয়ে ঢেকে রাখতে দেখা যায়। শালিখা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে এটি এখন পরিচিত এক দৃশ্য।
উপজেলা সদর আড়পাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা কাঠ লিচুর ক্রেতা শহিদুল ইসলাম বলেন, আগে কাঠ লিচু এতটা জনপ্রিয় ছিল না। তবে গত কয়েক বছরে এর চাহিদা অনেক বেড়েছে। আমার বাচ্চারা এই ফল খুব পছন্দ করে। লিচুর তুলনায় দামও কম। তাই অনেকেই এখন এই গাছ লাগাতে আগ্রহী হচ্ছেন।
একই ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্রামের মৌসুমি ফল ব্যবসায়ী রোস্তম কাজী বলেন, লিচুর মৌসুম শেষ হওয়ার পর থেকেই কাঠ লিচুর বিক্রি বেড়ে যায়। বাণিজ্যিকভাবে বড় আকারে চাষ না হলেও স্থানীয় বাজারে এর ভালো চাহিদা রয়েছে। আকার ও মানভেদে প্রতি আঁটি বা ছড়া ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আরও প্রায় এক মাস বাজারে এই ফল পাওয়া যাবে বলেও জানান তিনি।
আঁশফলের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানতে চাইলে শালিখা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাইমুন নিসা বলেন, কাঠ লিচু শুধু সুস্বাদুই নয়, এটি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে প্রচুর পরিমাণে শর্করা, খনিজ উপাদান ও ভিটামিন ‘সিথ রয়েছে। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে এই ফল খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে সহায়তা করে। পাশাপাশি এটি সিজোনাল অনেক রোগের প্রষেধক হিসেবে কাজ করে।
একসময় অবহেলিত ফল হিসেবে পরিচিত কাঠ লিচু এখন শালিখার গ্রামীণ অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় মৌসুমি ফলে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এই ফল কৃষকদের জন্য লাভজনক আয়েরএকটি অন্যতম উৎস হতে পারে খুলে যেতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।
-

পদ্মার বালুচরে সবুজের সমারোহ, চিনাবাদামে স্বপ্ন দেখছেন কৃষক
নাটোরের লালপুরে পদ্মা নদীর পাড়ে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ বালুচরে এখন সোনালি স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা। একসময় খরস্রোতা পদ্মার বুকে জমে থাকা পলিতে তৈরি হওয়া এসব চরে বর্তমানে ব্যাপকভাবে চিনাবাদাম চাষ হচ্ছে। যতদূর চোখ যায়, সবুজ বাদামের খেতে ভরে উঠেছে চরাঞ্চল। মৌসুমের এ সময়ে বাদাম তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় কৃষকরা।
কম খরচে অধিক উৎপাদন এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় চিনাবাদাম চাষে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। ফলে দিন দিন এ ফসলের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে চরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে।
তিলোকপুর, নিমতলী, গৌরীপুর, চর জাজিরা, মোহরকয়া, বিলমাড়ীয়া ও নওশারা চর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিতে বাদাম চাষ হয়েছে। কোথাও কৃষকরা মাঠ থেকে বাদাম তুলছেন, আবার কেউ বাড়িতে এনে গাছ থেকে বাদাম আলাদা করছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঈশ্বরদী, লালপুর, সদর ও বিলমাড়ীয়া ইউনিয়নের পাঁচটি কৃষি ব্লকের প্রায় ৩ হাজার ৭৫৪ হেক্টর চরাঞ্চলের মধ্যে ৪৬৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের চিনাবাদাম চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে বারি চিনাবাদাম-৮ ও ৯, ঢাকা চিনাবাদাম-১ এবং বিনা চিনাবাদাম-৮ উল্লেখযোগ্য। প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ২ দশমিক ১ মেট্রিক টন ফলন হয়েছে।
ঈশ্বরদী ইউনিয়নের কৃষক রবি হোসেন জানান, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে চিনাবাদাম চাষ করে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। ফলন ভালো হওয়ায় বাজারদর ঠিক থাকলে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার বাদাম বিক্রির আশা করছেন।
আরেক কৃষক আব্বাস উদ্দিন বলেন, পদ্মার বালুচরে অন্য ফসল ভালো না হলেও চিনাবাদাম বেশ ভালো হয়। এতে সার, কীটনাশক ও সেচের তেমন প্রয়োজন হয় না। পাইকাররা সরাসরি জমি থেকেই বাদাম কিনে নেওয়ায় পরিবহন খরচও কমে যায়। তিনি প্রতি বিঘায় ১৩ থেকে ১৪ মণ পর্যন্ত ফলন পেয়েছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানান, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের চিনাবাদাম চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে ভালো ফলন হওয়ায় আগামী বছর এ অঞ্চলে এ ফসলের আবাদ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
-

গাংনীতে পার্টনার ফিল্ড স্কুল কংগ্রেস-২০২৬
আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও যন্ত্র সহায়তা প্রদান
গাংনী (মেহেরপুর) সংবাদদাতা:
মেহেরপুরের গাংনীতে কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা, মাঠ পর্যায়ে কৃষি জ্ঞান সম্প্রসারণ এবং টেকসই কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘পার্টনার ফিল্ড স্কুল কংগ্রেস-২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) গাংনী উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আয়োজনে এ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়।
গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন এর সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষিবিদ আলমগীর বিশ্বাস, অতিরিক্ত পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যশোর অঞ্চল। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সঞ্জীব মৃধা, উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মেহেরপুর।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কৃষিবিদ শেখ সাজ্জাদ হোসেন, সিনিয়র মনিটরিং অফিসার, ডিএই পার্টনার, যশোর।
অনুষ্ঠানে কৃষকদের কৃষিকাজে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে চারজন কৃষকের মাঝে চারটি ভারমিকম্পোজট সেপারেটর মেশিন বিতরণ করা হয়। এসব যন্ত্র কৃষি উৎপাদন কার্যক্রমকে আরও সহজ ও আধুনিক করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন গাংনী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলফাজ উদ্দিন কালু, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল আওয়াল, কাজীপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মু. আলম হুসাইন, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান বাবলু, উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য শফিকুল ইসলাম, গাংনী পৌর বিএনপির সভাপতি মকবুল হোসেন মেঘলা এবং উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা।
বক্তারা বলেন, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব।
অনুষ্ঠানে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা, ফিল্ড স্কুলের সদস্য ও স্থানীয় কৃষকরা অংশগ্রহণ করেন।
-

পচনশীল কৃষিপণ্য রক্ষায় সরকার এক হাজার হিমাগার তৈরির পরিকল্পনা
পচনশীল কৃষিপণ্য সংরক্ষণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এক হাজার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদাম (কোল্ডস্টোরেজ) নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, টমেটোসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন-পরবর্তী অপচয় কমানো এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় নাকি প্রকল্প ছাড়াই দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে—তা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দিয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অধীনে না গিয়ে সরাসরি বাজেট বরাদ্দ বা জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই কোল্ডস্টোরেজগুলো স্থাপন করা হবে। সম্প্রতি ঈদুল আজহার আগে কৃষি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।ওই বৈঠকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক কৃষিবিদ আবদুর রহিমকে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যোগাযোগ করা হলে ডিএইর মহাপরিচালক আবদুর রহিম বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেন। আমার দেশকে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে কোনো প্রকল্প ছাড়াই জরুরি ভিত্তিতে এক হাজার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদাম ঘর তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমি দপ্তরের অধীনস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে এ বিষয়ে দ্রুত করণীয় নির্ধারণ করব। তিনি আরো জানান, দেশে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় সংরক্ষণাগার বা গুদামের সংখ্যা অত্যন্ত কম। ফলে পচনশীল সব উৎপাদিত পণ্য দীর্ঘ সময় টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। এই বাস্তবতায় সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আদেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে চার হাজার পেঁয়াজ সংরক্ষণের মেশিন কেনার প্রস্তুতিও চলছে।কৃষিখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রতি বছর বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়লেও সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি সংরক্ষণ অবকাঠামো। বিশেষ করে আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও মৌসুমি সবজির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কোল্ডস্টোরেজ না থাকায় বাজারে একসঙ্গে সরবরাহ বেড়ে যায়। এতে দাম কমে যায় এবং উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হয় কৃষকদের।
ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন। এর বিপরীতে বিদ্যমান হিমাগারগুলোর ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৫ লাখ টন। সরকারি হিসাবে, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে মোট উৎপাদিত আলুর প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কেবল আলুই নয়, পেঁয়াজ ও অন্যান্য পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এই ঘাটতি মেটাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আগ্রহে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেয়। ‘আলুর বহুমুখী ব্যবহার, সংরক্ষণ ও বিপণন উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় রংপুর বিভাগসহ দেশের ১৬টি জেলায় ৪৫০টি ‘অহিমায়িত মডেল ঘর’ তৈরি করা হয়। সরকারি খরচে একেকটি ঘর নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। গত অর্থবছর শুধু রংপুর জেলাতেই ৭৫টি অহিমায়িত মডেল ঘরের মধ্যে ৪৫টিতে আলু সংরক্ষণের পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় এই অহিমায়িত মডেল ঘরগুলো চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। ফলে এক হাজার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নতুন গুদাম ঘর ও চার হাজার পেঁয়াজ সংরক্ষণ মেশিন দ্রুত স্থাপন করা সম্ভব হলে তা দেশের কৃষি অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হতে পারে।
এ এম