পানিতে তলিয়ে গেছে ধান, ঋণে জর্জরিত হাওরের কৃষকেরা

Floodwaters drown paddy as haor farmers in Moulvibazar sink deeper into debt

প্রতিবেদন:

·

, , , , , ,

সোমবার দুপুরে রোদ উঠতেই হাওরপারের গ্রামগুলো কিছুটা চাঙা হয়ে ওঠে। গ্রামীণ পাকা–কাঁচা সড়ক, উঁচু ফাঁকা জায়গা যেখানে সুযোগ মিলেছে, সেখানেই রোদে ধান শুকানোর ধুম পড়ে যায়। কেউ সড়কের ওপর, কেউ পলিথিন বা চটের চাটাইয়ে, আবার কেউ খলায় ধান মেলে দিয়েছেন। তবে ধান শুকাতে দিলেও কারও মনে স্বস্তি নেই।

কৃষকেরা জানান, পানিতে তলিয়ে যাওয়া খেত থেকে যা ধান তোলা গেছে, তা খুবই সামান্য। তোলা ধানের অনেকটাই সময়মতো শুকাতে না পারায় নষ্ট হয়ে গেছে। ধানের দিকে তাকালেই তাঁদের বুক কষ্টে ভরে ওঠে। যেখানে ৩০০ থেকে ৪০০ মণ ধান পাওয়ার কথা, সেখানে এখন খলায় আছে মাত্র ১০–২০ মণ। অনেকেই ধান দিয়ে শোধ করার শর্তে আগাম ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলেন। এখন সেই ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়ে উঠেছে। এতে ঋণ শোধ তো দূরের কথা, বছরের খোরাকিও জুটবে না।

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের অন্তেহরি গ্রামের চিত্র সবচেয়ে বেশি খারাপ। পাকা ধানের খেত পানির নিচে, কেটে আনা ধানও রোদ না থাকায় শুকানো যায়নি। অনেক ধান পচে গেছে, কোথাও আবার অঙ্কুর গজিয়েছে। গতকাল বিকেলে অন্তেহরি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জুমাপুর সড়ক থেকে অন্তেহরি বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ধান ও খড় বিছানো। গ্রামে ফাঁকা জায়গা বলতে কিছু নেই—সবখানেই ভেজা ধান ও খড় শুকানো হচ্ছে। কোথাও যন্ত্রে ধান মাড়াই চলছে। হাওরের দিকে নারী–পুরুষ ছড়িয়ে কাজ করছেন। ধান শুকাতে ব্যস্ত সবাই।

একটি খলার পাশে দাঁড়িয়ে সুমি রানি দাস বলছিলেন, ‘খলায় এ সময় চাইরবায় (চারপাশে) ধানর গিলা (স্তূপ) থাকে। এখন ধানই নাই।’ তাঁর সঙ্গে থাকা তপন দাস বলেন, ‘খলায় এখন ২০-২৫ মণ ধান আছে। এবার ধান অইছিল খেতে। ২০-২২ মণ ধান অইলোনে কিয়ারও (১ কিয়ার=৩০ শতাংশ)। ২২ কিয়ার করছিলাম। যদি দিন দেয়, তাইলে সাত কিয়ার তোলা যাইব। বড় খলা করছিলাম, ৭০ মণ ধান আটে। ৪০০ থাকি সাড়ে ৪০০ মণ ধান পাওয়ার কথা। ১০০ মণ পাইমু কি না সন্দেহ আছে।’

স্থানীয় লোকজন জানান, দুশ্চিন্তা শুধু ফলনহানিই নয়, ঋণ শোধ নিয়েও। অনেক কৃষক ৮০০ টাকা মণ দরে ধান দেওয়ার শর্তে আগাম টাকা নিয়েছিলেন। দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সুদ বা দাদন ছাড়া ঋণের সুযোগ নেই বললেই চলে। ফলে বাধ্য হয়েই এ ধরনের শর্তে ঋণ নিতে হয়। অন্তেহরি গ্রামের সুখেন দাস বলেন, ‘তার চেয়ে রুজি করতাম, ভালা থাকতাম। যেদিন ধান কাটার পরিকল্পনা করছি, শ্রমিক জোগার করছি। অউদিনই এক রাইতে খেতর মধ্যে কোমরসমান পানি।’ এক নারী বলেন, ‘এলাকায় সুদ ছাড়া কেউ টাকা ধার দেয় না।’

রনি চক্রবর্তী বলেন, ‘চাইর আনাও ধান কাটা অইছে না। ঋণের জ্বালায় প্রায় জনরই বাড়িঘর ছাড়া লাগব। ১৫ বছরর মাঝে এত ক্ষতি অইছে না।’ সুমন দাস আধা পচা ধানের আঁটি মাথায় নিয়ে স্তূপ করছিলেন, আর গান গাইছিলেন। তিনি বলেন, ‘আনন্দে নায় ভাই, মনের জ্বালায় গান গাইরাম। এক লাখ টাকা ঋণ আছে। ভাবছিলাম ২০০ মণ ধান পাইমু। ১০০ মণে ঋণ দিমু। ১০০ মণ থাকব। এখন ধান, খেড় সব গেছে।…এখন গরু বাঁচব, না মানুষ বাঁচব।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মৌলভীবাজারের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন আজ মঙ্গলবার বলেন, জেলার হাওরাঞ্চলে ৩ হাজার ৬৩৮ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে। কাউয়াদীঘি হাওরে ৪০০ হেক্টরের মতো হতে পারে। হাওরে পানি সামান্য বাড়ছে। এক দফা কৃষকের ক্ষতি হয়ে গেছে।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ