বিডি গ্লোবাল ডেস্ক,
টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার চৌধুরী বাড়ি এলাকায় দীর্ঘ ৬৪ বছর ধরে একই আঙিনায় অবস্থিত মসজিদ ও মন্দিরে ধর্মচর্চা করে আসছেন স্থানীয় মুসলিম ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা হানাহানি ছাড়াই দুই ধর্মের অনুসারীরা সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নিজ নিজ ধর্ম চর্চা করে আসছে বহু বছর ধরে। উভয় ধর্মের অনুসারীরা একে অপরের ধর্মচর্চায় সহযোগিতার মাধ্যমে নিজ নিজ ধর্ম পালনে সারাদেশে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
জানা যায়, উপজেলার চৌধুরী বাড়িতে ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে (১৯৩২/১৯৩৩ সাল) ওঁঝা ঠাকুর ও হরনাথ স্মৃতি কেন্দ্রীয় দুর্গা মন্দির প্রতিষ্ঠিত করেন শ্রী পরেশ চন্দ্র ও শৈলেশ চন্দ্র দাসয়ো। এরপর থেকে প্রতি বছর ধুমধাম করে দুর্গাপূজা উদযাপন করে এলাকার সনাতন ধর্মের লোকজন।
মন্দির প্রতিষ্ঠার পর সেটির আঙিনার অপরপাশে (পশ্চিমাংশে) ১৯৬২ সালে নির্মাণ করা হয় নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। একই মাঠের পশ্চিমাংশে মসজিদ আর পূর্বাংশে মন্দির নিয়ে স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে কখনো ধর্মীয় কোনো দ্বন্দ্ব বা সাম্প্রদায়িক হানাহানি হয়নি।
সরেজমিনে নাগরপুর ওঁঝা ঠাকুর ও হরনাথ স্মৃতি কেন্দ্রীয় দুর্গামন্দির পূজামণ্ডপে গিয়ে দেখা যায়, পূজা-অর্চনা, উলুধ্বনি ও ঢাকের বাজনা চলছে। দর্শনার্থীরা প্রতিমা দেখতে ভিড় করছেন। আজানের আগে ঘোষণা করা হলো, আজান ও নামাজের পর আবার পূজার কার্যক্রম শুরু হবে।
নির্ধারিত সময়ে আজান শুরু হতেই থেমে গেল ঢাক-ঢোল-কাঁসর, মাইক ও উচ্চশব্দের বক্সের বাজনা। আজানের পর মুসল্লিরা মসজিদে এসে নামাজ আদায় করছেন। নামাজ শেষ হওয়ার বেশ কিছু সময় পর আবার বেজে ওঠে মন্দিরের ঢাক-ঢোল-কাঁসর আর উচ্চশব্দের বাজনা।
এভাবেই নামাজের ওয়াক্তের আজানের শুরুতেই থেমে যায় শঙ্খ ও ঢাক-ঢোলের শব্দ এবং নীরব থাকে নামাজ আদায় শেষ না হওয়া পর্যন্ত। ঠিক তেমনি সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যখন পূজা অর্চনায় মেতে ওঠেন তখন নামাজ ছাড়া কোনো ধরনের ইসলাম ধর্মীয় চর্চা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকেন মুসল্লিরা।
এছাড়াও, প্রতিমা দর্শনে আগতরা বেশিরভাগ সময়ে অবস্থান নেন মসজিদের আঙিনায়। রোজা, নামাজ, পূজা একই আঙিনায় পালন করেন দুই ধর্মের অনুসারীরা। এলাকার হিন্দু-মুসলিম সবাই একে অপরের মসজিদ মন্দিরের সুরক্ষায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুগের পর যুগ ধরে রেখেছে বন্ধন।
এর আগে কোনো সহিংসতা তো দূরের কথা, কোনোদিন বাগ্বিতণ্ডার নজির নেই এখানে। উভয় ধর্মের অনুসারীরা এই সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধকে শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকিয়ে রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
মসজিদে নামাজে আসা মুসল্লিরা জানান, এই এলাকার মানুষ অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়। দুই ধর্মের লোকদের মাঝে ধর্ম পালন নিয়ে কোনোদিন কোনো বিরোধিতা সৃষ্টি হয়নি। ইসলাম ধর্মের মানুষ তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে। তারাও নামাজ ও আজানের সময় পূজা বন্ধ রাখেন। এটা কাউকে বলে দিতে হয় না।
অন্যদিকে মন্দির পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে আসা ভক্তদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই মন্দিরের নামকরণ করা হয় নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি ওঁঝা ঠাকুর কেন্দ্রীয় দুর্গা মন্দির। মন্দির প্রতিষ্ঠার পর এখানকার ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মন্দিরের পাশেই প্রতিষ্ঠা করেন নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। এরপর থেকেই পাশাপাশি চলছে দুই ধর্মের মসজিদ-মন্দিরের কার্যক্রম। এতে ধর্ম পালনে কোনোদিন কোনো ঝামেলা হয়নি। তাদের প্রত্যাশা, যুগ যুগ ধরে চলতে থাকবে এই সম্প্রীতি।
পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি শিব শংকর সূত্র ধর বলেন, এবার নাগরপুর উপজেলায় ১২টি ইউনিয়নে ১৩৯টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপন হচ্ছে। এই এলাকার হিন্দু-মুসলিম সকলেই একে অপরের মসজিদ-মন্দিরের সুরক্ষায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুগের পর যুগ ধরে কাজ করে আসছে। এছাড়াও প্রতিমা দর্শনে আগতরা বেশিরভাগ সময়ে অবস্থান নেন মসজিদ আঙিনায়। ইতোপূর্বে কোনো সহিংসতা তো দূরের কথা, কোনো বাগ্বিতণ্ডার নজির নেই এখানে। উভয় ধর্মের অনুসারীরা এই সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধকে শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকিয়ে রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
মসজিদের পেশ ইমাম ও খতীব মুফতি হুমায়ুন কবীর জানান, মসজিদে আজান দেয়ার আগেই তারা ঢোল বাজনা, পূজা বন্ধ রাখেন। তখন বোঝার উপায় নেই যে এখানে একটু আগেই পূজা হচ্ছিল। একই আঙ্গিনায় মসজিদের পাশে মন্দির বাংলাদেশে নজির স্থাপন করেছে। এখানে এখন পর্যন্ত কোনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সৃষ্টি হয়নি। এ,আর
