বিডি গ্লোবাল ডেস্ক,
ফরিদপুরের সদরপুরে বর্ষা মৌসুম প্রায় শেষের দিকে, তবুও থামেনি পদ্মার ভাঙন। এখনো তীব্র স্রোতে নদীর তীর ভেঙে চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতভিটা, ফসলি জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। নদীর পাড়ে বসবাসকারী মানুষের দিন কাটছে আতঙ্কে, রাত কাটছে নির্ঘুম। কখন যে স্রোতের টানে নিজের ঘরবাড়িটুকুও নদীগর্ভে চলে যায়, সেই শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে পদ্মা পাড়ের জনগণ।
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পদ্মার ভাঙন তীব্র হলেও এবার বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পরও তা অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়েছে, নিঃস্ব হয়েছে বহু পরিবার। দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের শিকার এসব মানুষের দাবি, সাময়িকভাবে বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর পাশাপাশি প্রয়োজন স্থায়ী ও টেকসই নদীশাসন।
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার পদ্মাতীরবর্তী ঢেউখালী, আকোটেরচর ও দিয়ারা নারিকেলবাড়িয়া, চরমানাইর এবং চরনাছিরপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় এবারো নদীভাঙন হয়েছে এবং ভাঙন অব্যহত রয়েছে। ঢেউখালী ইউনিয়নের শয়তানখালী, বেপারীডাঙ্গী ও মুন্সিরচর এবং আকোটেরচর ইউনিয়নের ছলেনামা, কালিখোলা, মোল্যাকান্দি ও খালাসীকান্দি এলাকায় নদীর তীব্র স্রোতে পাড় ভাঙছে। একই সাথে দিয়ারা নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের নুরুদ্দিন সরদার কান্দি, আব্দুল হামিদ জঙ্গির কান্দি, আলেফ সরদার কান্দি ও জব্বার শিকদার কান্দির বাসিন্দারাও ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানায়, পদ্মার পানি ও স্রোত বেড়ে যাওয়ায় কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন তীব্র হয়েছে। ইতোমধ্যে শত শত বিঘা ফসলি জমি ও বহু বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, একটি ইটভাটা ও গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের অংশ। স্থানীয়দের হিসাবে, প্রায় শতাধিক বসতঘর নদীগর্ভে চলে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলেও দাবি তাদের। ভাঙনের আতঙ্কে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে।
পদ্মার ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের মধ্যে বেপারীডাঙ্গী গ্রামের ১০০ বছর বয়সি হাসমত বেপারীর গল্পটি যেন নদীভাঙনের নির্মমতার প্রতিচ্ছবি। নিজের ভিটেমাটিতে জীবনের শেষ সময়টা কাটানোর স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু কয়েক দশকে একের পর এক নদীভাঙনে বারবার বসতভিটা হারিয়েছেন তিনি। জীবনে আটবার ঘর তুলেও কোনোবারই স্থায়ী হতে পারেননি। সর্বশেষ ভাঙনে আবারো স্মৃতিবিজড়িত বাড়িঘর ছেড়ে স্ত্রী, পুত্রবধূ ও নাতিকে নিয়ে ভাড়া বাসায় উঠতে হয়েছে তাকে। তার একমাত্র ছেলে সৌদি আরবে কর্মরত।
স্থানীয় বাসিন্দা সাজ্জাদ শিকদার নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘জীবনে সাতবার ঘর তুলেছি। সবই গিলে খেয়েছে পদ্মা। এই বয়সে এসে আর নতুন করে কিছু করার শক্তি নেই। বাধ্য হয়ে ভাড়া বাসায় উঠেছি। জানি না, শেষ বয়সে নিজের একটা ঘরে মরতে পারব কি না।’
পদ্মাপাড়ের অসংখ্য পরিবার বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙনের সাথে লড়াই করছে। কারো ঘর গেছে, কারো ফসলি জমি, আবার কেউ হারিয়েছেন ব্যবসা ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। বর্ষা শেষ হওয়ার পরও ভাঙন অব্যাহত থাকায় এসব পরিবারের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অনেকে ঘরের আসবাবপত্র, গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভাঙন অব্যাহত থাকলে আকোট জনসংঘ উচ্চ বিদ্যালয়, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পিয়াজখালী বাজার, সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প ও গুচ্ছগ্রামসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আকোটেরচর ইউনিয়নের গুচ্ছগ্রামে বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যেও রয়েছে চরম উদ্বেগ। সরকারি উদ্যোগে পাওয়া ঘরই তাদের শেষ আশ্রয়। সেই ঘরও নদীগর্ভে চলে গেলে নতুন করে কোথায় আশ্রয় নেবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। এছাড়া চর নাসিরপুরের চৌধুরীর হাট ও শিমুলতলী বাজার ঘাটও ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আকোটেরচর ইউনিয়নের গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আরিফ মাহমুদ বলেন, ‘এই সময় এলেই আমাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। পানি বাড়লেই ভাঙন শুরু হয়। বর্ষা চলে গেলেও ভাঙন এখনো থামেনি। সরকার আমাদের থাকার জায়গা দিয়েছে, এই ঘরবাড়িই এখন আমাদের শেষ সম্বল। এটাও হারালে আর কিছু থাকবে না।’
দিয়ারা নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের নুরুদ্দিন সরদার কান্দি গ্রামের বাসিন্দা আ: আজিজ চোকদার বলেন, প্রতি বছরই নদীভাঙনের শিকার হতে হচ্ছে। ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীতে চলে যাচ্ছে। ভাঙন শুরু হওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে আগেভাগেই টেকসই নদীশাসনের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। আমরা চরের মানুষ এমন বিপদে আর কতবার পড়ব?
ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হলেও কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে প্রতি বছর নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ে এবং নতুন করে মানুষ ভিটেমাটি হারায়। তাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধের ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
আকোটেরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আসলাম বেপারী বলেন, ‘নদীভাঙন এখন আর হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো দুর্যোগ নয়, এটি একটি বার্ষিক দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আমরা বারবার জানিয়েছি। তারা এলাকা পরিদর্শনও করেছেন। আশা করছি, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সদরপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নুরুনাহার বলেন, ‘আমরা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ ও তালিকা প্রস্তুতের কার্যক্রম শুরু করেছি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলা হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে ক্ষতিগ্রস্তদের মানবিক সহায়তা ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরীফ শাওন বলেন, ‘পদ্মা নদীর ভাঙনের বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অবহিত করা হয়েছে। নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: রাকিব হোসেন বলেন, ‘ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে বিষয়টি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তারা এ বিষয়ে অবগত রয়েছেন। ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে। খুব শিগগিরই টেকসই ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’
এ বিষয়ে ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম খান বাবুল বলেন, ‘নদীর সাথে আমাদের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। নদীভাঙন নিয়ে আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে কথা বলেছি। পাশের চরভদ্রাসনে একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সদরপুরেও আমরা স্থায়ী সমাধানের দিকে এগিয়ে যাবো। আপাতত বালুর বস্তা ফেলে নদীভাঙন রোধে কাজ করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় শিগগিরই স্থায়ী নদীশাসনের ব্যবস্থা করা হবে।’
পদ্মার ভাঙনে বছরের পর বছর ধরে বসতভিটা, ফসলি জমি ও জীবিকার অবলম্বন হারানো মানুষের দুর্ভোগ যেন শেষ হওয়ার নয়। তাদের ভাষ্য, ত্রাণ বা সাময়িক সহায়তা দিয়ে নদীভাঙনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিরাপদ বসতি ও জমি রক্ষায় কার্যকর নদীশাসন। তাই ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী বাঁধ ও টেকসই নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের একটাই প্রত্যাশা-আর কখনো যেন চোখের সামনে নিজের ভিটেমাটি পদ্মার স্রোতে বিলীন হয়ে যেতে দেখতে না হয়। এ,আর

মন্তব্য করুন