শীতকালীন
শীতের আগমনে বদলে গেছে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার গ্রামীণ জনপদের মাঠের চিত্র। কোথাও সবুজ পাতার ফাঁকে বেড়ে উঠছে ফুলকপি ও বাঁধাকপি, কোথাও মাচায় মাচায় শোভা পাচ্ছে লাউ ও শিম। আবার কোনো জমিতে সারি সারি মুলা, বেগুন, টমেটো, মরিচসহ নানা সবজির চাষ। পালংশাক, লালশাক, ধনেপাতাসহ বিভিন্ন শাকের আবাদেও ব্যস্ত কৃষকেরা। আগাম সবজি বাজারে তুলে ভালো দাম পাওয়ার আশায় দিনরাত পরিশ্রম করছেন তারা।
তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবার লাভের হিসাব মেলাতে পারছেন না অনেকেই। ভালো ফলন ও বাজারদর নিয়ে আশার পাশাপাশি তাদের মনে রয়েছে লোকসানের শঙ্কা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও আগাম ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করে তুলনামূলক ভালো লাভ হতো। তখন সার, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের দাম ছিল কম। ফলে উৎপাদন খরচও থাকত নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু গত দুই বছরে সার, কীটনাশক, জমি চাষ, কৃষি যন্ত্রপাতি ও শ্রমিকের মজুরিসহ প্রায় সব খাতেই খরচ বেড়েছে। এতে সবজি চাষের লাভের হিসাব কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলন ভালো হলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেলে লোকসানে পড়তে হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
জানা গেছে, প্রতিবছর পাকুন্দিয়া উপজেলায় ব্যাপক পরিমাণে সবজির আবাদ হয়। এখানকার উৎপাদিত সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। মৌসুমের শুরুতেই আগাম সবজি চাষের পাশাপাশি নানা ধরনের শীতকালীন সবজি উৎপাদনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন উপজেলার কৃষকেরা।
সরেজমিনে উপজেলার তারাকান্দি, চরকাওনা মুনিয়ারীকান্দা, জাঙ্গালিয়া, চরফরাদী ও চণ্ডিপাশা বড় আজলদীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাঠে মাঠে শীতকালীন সবজি চাষ ও পরিচর্যার কর্মযজ্ঞ চলছে। কেউ জমি প্রস্তুত করছেন, কেউ চারা রোপণ করছেন, আবার কেউ ব্যস্ত আগাছা পরিষ্কার ও সেচের কাজে। কোথাও ফুলকপি ও বাঁধাকপির জমিতে পরিচর্যা করছেন কৃষকেরা, কোথাও মুলা, শিম, লাউ, বেগুন ও টমেটোর আবাদ হচ্ছে। আবার কোনো জমিতে পালংশাক, লালশাক ও ধনেপাতার চাষ করেছেন তারা।চণ্ডিপাশা ইউনিয়নের বড় আজলদী গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, কয়েক বছর ধরে নিয়মিত আগাম জাতের ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করছেন তিনি। এবারও ৪০ শতক জমিতে ফুলকপির আবাদ করেছেন। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এসব ফুলকপি বিক্রির উপযোগী হবে। বাজারদর ভালো থাকলে লাভবান হওয়ার আশা করছেন তিনি।
নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও টমেটোসহ বিভিন্ন জাতের সবজির চারা নিজেই উৎপাদন করেন। নিজের জমিতে রোপণের পাশাপাশি অন্য কৃষকদের কাছেও এসব চারা বিক্রি করেন। এতে বাড়তি আয় হয় তার।
একই গ্রামের কৃষক গিয়াস উদ্দিন ফুলকপি, বাঁধাকপি ও লাউসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজির আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আগে থেকে তো কিছু বলা যায় না। আল্লাহ দিলে আর বাজার ভালো থাকলে লাভ অইতে পারে।’
কৃষক নাসির উদ্দিন বলেন, আগে সবজি চাষে ভালো লাভ হতো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে কৃষি যন্ত্রপাতি, সার ও কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। এখন লাভ-লোকসানের শঙ্কা নিয়েই সবজি চাষ করতে হচ্ছে। বাজারদর ভালো থাকলে কিছুটা লাভের আশা করছেন তিনি।
চণ্ডিপাশা ব্লকের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও ব্লকের বড় আজলদী গ্রামে আগাম জাতের ফুলকপি চাষ করেছেন কৃষকেরা। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এসব ফুলকপি বাজারে তোলার উপযোগী হবে। বাজারদর ভালো থাকলে কৃষকেরা লাভবান হতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে মাটির অম্লত্বের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এ সমস্যা কমাতে ডলোচুন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে মাটির গুণাগুণ বজায় রাখার পাশাপাশি রাসায়নিক সারের ব্যবহারও কমানো সম্ভব হবে।
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নুরে ই আলম বলেন, রবি মৌসুম পাকুন্দিয়ার কৃষকদের জন্য অত্যন্ত ব্যস্ততম একটি মৌসুম। এ মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের রবি ফসলের চাষাবাদ হয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলু, ৩৫০ হেক্টরে পেঁয়াজ এবং ১৪০ হেক্টরে গমের আবাদ করা হয়। এ ছাড়া ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন সবজির চাষ হয়ে থাকে।
তিনি জানান, উপজেলার প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই এসব সবজির আবাদ দেখা যায়। ইতোমধ্যে কৃষকেরা শীতকালীন সবজি চাষাবাদ শুরু করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ মৌসুমে ভালো ফলনের পাশাপাশি কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাবেন বলে আশা করছেন তিনি।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
