সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এক মাসের মধ্যেই বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে—সৌদি ভূখণ্ডে হামলা হলে চুক্তির আওতায় পাকিস্তান কি সৌদিকে সামরিকভাবে রক্ষা করবে, নাকি ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে যাবে?
৭ আগস্ট মক্কায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির মূল নীতি হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পাকিস্তান অবশ্য শুরু থেকেই চুক্তিটিকে প্রতিরক্ষামূলক হিসেবে বর্ণনা করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এর লক্ষ্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়; বরং বহিঃআক্রমণের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো।
এর মধ্যেই ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সংঘর্ষ তীব্র হয়েছে। হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলে অগ্রসর হয়ে গ্রেটার ও লেসার হানিশ দ্বীপপুঞ্জ দখল করেছে এবং মোকা এলাকার দিকে এগিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ইয়েমেনে এক লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে।
সৌদি আরবের ভূখণ্ডেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ৯ সেপ্টেম্বর বলেছিলেন, ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি আরবে ছড়িয়ে পড়লে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হতে পারে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজন হলে পাকিস্তান তার দায়িত্ব পালন করবে।
তবে বক্তব্যের পরও পাকিস্তান এখন পর্যন্ত ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করেনি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১১ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিল, মক্কা চুক্তি তখনো পুরোপুরি কার্যকর পর্যায়ে যায়নি এবং ইয়েমেনের ভেতরে হুথি লক্ষ্যবস্তুতে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলার কোনো পরিকল্পনা নেই। ইসলামাবাদ একই সঙ্গে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন এবং ইয়েমেন সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে।
পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে জটিল। সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সম্পর্কও তাকে বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। হুথিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে উল্লেখ করা হয়। ফলে ইয়েমেনে সরাসরি পাকিস্তানি সামরিক অভিযান শুরু হলে সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার হলেও ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণে সৌদি ভূখণ্ড রক্ষায় বিমান প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রশিক্ষণ ও সামরিক সহযোগিতা এবং ইয়েমেনের ভেতরে সরাসরি হামলা—এই দুই ধরনের পদক্ষেপকে আলাদা করে দেখছে ইসলামাবাদ। সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা এবং ইয়েমেনে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া একই ধরনের সিদ্ধান্ত নয়।
পাকিস্তানের জন্য ২০১৫ সালের ইয়েমেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। সে সময় সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে পাকিস্তান সরাসরি অংশ নেয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতেও ইসলামাবাদ সৌদি নিরাপত্তার প্রতি অঙ্গীকার এবং ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ—দুটিকে পৃথক রাখার চেষ্টা করছে।
এরই মধ্যে সৌদি আরবের দিকে হুথি হামলা অব্যাহত রয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, হুথিরা সৌদি রাজধানী রিয়াদ ও ইয়ানবুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে। হুথিদের দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই এখন এর সামরিক প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগ। সৌদি আরবের ওপর হামলা হলে পাকিস্তান কী ধরনের সহায়তা দেবে—সেটি কি শুধু প্রতিরক্ষা, নাকি প্রয়োজনে ইয়েমেনের ভেতরে হুথি অবস্থানে হামলাও এর অংশ হবে—চুক্তির প্রকাশ্য তথ্য থেকে এখনো তার পূর্ণ উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে পাকিস্তানের প্রকাশ্য অবস্থান এখন পর্যন্ত স্পষ্ট: মক্কা চুক্তি প্রতিরক্ষামূলক, সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি ইসলামাবাদের অঙ্গীকার রয়েছে, কিন্তু ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ফলে চুক্তিটির প্রথম পরীক্ষা শুধু সামরিক নয়; সৌদি নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি বজায় রেখে পাকিস্তান কীভাবে ইয়েমেনের যুদ্ধ থেকে নিজেকে দূরে রাখে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখানে মূল লেখাটির ‘পাকিস্তান কি যুদ্ধে যাবে’ প্রশ্নটি রাখা হয়েছে, কিন্তু পাকিস্তান ইতিমধ্যে যুদ্ধে প্রবেশ করেছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তমূলক দাবি করা হয়নি। প্রকাশ্য সরকারি অবস্থান ও সাম্প্রতিক ঘটনাকে আলাদা করে উপস্থাপন করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন