সরকারি কোম্পানির কর্মীরা আসছেন ‘প্রগতি’ পেনশন স্কিমে

সরকারি মালিকানাধীন যেসব কোম্পানির কর্মীরা সরকারের প্রচলিত পেনশন সুবিধা পান না, তাদের সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির ‘প্রগতি’ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।

একই সঙ্গে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থা চালু, পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর নমিনির সুবিধার বয়সসীমা বাড়ানো এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ১১.৬৮% থেকে ১১.৭২% মুনাফা দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে কর্তৃপক্ষ।

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ সভায় এসব সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।

সভা শেষে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর যেসব কর্মী সরকারের সরাসরি পেনশন ব্যবস্থার আওতায় নেই, তাদের ‘প্রগতি’ স্কিমে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মীর অবসর-সুবিধা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির চাকরি বিধি ও নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে; তারা সরকারি সিভিল কর্মচারীদের মতো রাষ্ট্রীয় পেনশন পান না। সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ও আনুতোষিকের জন্য আলাদা সরকারি ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রগতি স্কিমে সরকারি কোম্পানির কর্মীরা

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তের ফলে সরকারি মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের এমন কর্মীরা সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আসার সুযোগ পাবেন, যারা সরাসরি সরকারি চাকরির পেনশন ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত নন।

তবে কোন কোন কোম্পানির কর্মীরা এই সুবিধার আওতায় আসবেন, তার পূর্ণ তালিকা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি পরবর্তী সময়ে নির্ধারণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সর্বোচ্চ মুনাফা ১১.৭২%

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সর্বজনীন পেনশন তহবিলে ১১.৬৮% থেকে ১১.৭২% মুনাফা দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে পরিচালনা পর্ষদ।

এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১১.৬১% মুনাফা দেওয়া হয়েছিল।

ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, পেনশন তহবিলের বিনিয়োগ ও আয়-ব্যয়ের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে।

চালু হবে ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থা

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে পর্ষদ।

এ বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থার জন্য আলাদা বিধিমালা করা হবে বলে জানান নির্বাহী চেয়ারম্যান।

৫৫ বছর থেকে পেনশনের প্রস্তাব পর্যালোচনা

৫৫ বছর বয়স থেকে পেনশন পাওয়ার প্রস্তাবটি একচুরিয়াল পরামর্শ নিয়ে চূড়ান্ত করা হবে।

ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, অন্যান্য দেশের অবসর ও পেনশন ব্যবস্থার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, স্পেনে ৬৭ বছর এবং যুক্তরাজ্যে ৬৬ বছর বয়স থেকে পেনশন সুবিধা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। তাই ৫৫ বছর বয়স থেকে পেনশন দেওয়ার প্রস্তাবটি আর্থিক ও জনমিতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে পর্যালোচনা করা হবে।

নমিনির পেনশন পাওয়ার বয়স ৮০ বছর

পেনশনভোগী মারা গেলে তার নমিনির পেনশন সুবিধা পাওয়ার বয়সসীমা ৭৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, পেনশনভোগীর স্বামী বা স্ত্রী পেনশনভোগীর ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত এই সুবিধা পাবেন।

পাঁচ বছর পর টাকা তুলে বের হওয়ার প্রস্তাব পর্যালোচনায়

পেনশন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির পাঁচ বছর পর অংশগ্রহণকারী তার জমা করা পুরো অর্থ তুলে নিয়ে কর্মসূচি থেকে বের হয়ে যেতে পারবেন—এমন একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রস্তাবটি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান ড. সুরাতুজ্জামান।

পেনশন তহবিল থেকে অংশগ্রহণকারীদের ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়েও সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি আরও পর্যালোচনা করা হবে। ঋণ দেওয়া হলে তাতে অংশগ্রহণকারীরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। ঋণের সুদের হারও একচুরিয়াল পরামর্শের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে।

স্বাস্থ্যবীমা নিয়েও পর্যালোচনা

পেনশন কর্মসূচির সঙ্গে স্বাস্থ্যবীমা চালুর বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হবে। কোন মডেলে স্বাস্থ্যবীমা চালু করা হবে এবং এতে পেনশন তহবিলের ওপর কী ধরনের আর্থিক প্রভাব বা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান নির্বাহী চেয়ারম্যান।

এ ছাড়া মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে পেনশনের মুনাফা দেওয়ার বিষয়েও এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। পেনশন তহবিলের আকার আরও বড় হলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিদেশ যাওয়ার সময় পেনশনে অন্তর্ভুক্তির তথ্য

প্রবাসীদের সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বাড়াতে বিদেশে যাওয়ার সময়ই তাদের এ কর্মসূচি সম্পর্কে জানানো হবে।

এ জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কাজ করবে বলে জানান ড. সুরাতুজ্জামান।

এ ছাড়া পেনশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বাড়াতে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস কোম্পানিগুলোর অন্তর্ভুক্তির এককালীন ফি ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পেনশন তহবিল বেসরকারি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ফার্মের মাধ্যমে অডিট করার সিদ্ধান্তও হয়েছে।

Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।