কুড়িগ্রামে গ্রেপ্তার আতঙ্কে বাড়িছাড়া কৃষকরা

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সারের দাবিতে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাসহ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মারধর এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছে। মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার দুজন হলেন– উপজেলার গণাইয়েরকুটি গ্রামের আল আমিন মোল্লা ও সুরুজ মিয়া। অজ্ঞাতপরিচয় আসামি থাকায় গ্রেপ্তার ও হয়রানির আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় সাধারণ কৃষকরা। তারা বলছেন, সারের দাবিতে বিক্ষোভ করতে গিয়ে এখন তারা মামলার আসামি হয়েছেন। গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেকে রাতে বাড়িতে থাকছেন না।

গত সোমবার উপজেলার সোনাহাট ইউনিয়নের পাটেশ্বরী ব্রিজপাড় এলাকায় সারের দাবিতে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন স্থানীয় কৃষকরা। এক পর্যায়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বারকে অবরুদ্ধ করা হয়। পরদিন তিনি ভূরুঙ্গামারী থানায় মামলা করলে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বিএডিসি সার ডিলার মেসার্স আফি সার ঘরের গুদামে সেপ্টেম্বরের জন্য বরাদ্দ ছিল ৪৮৭ বস্তা সার। এর মধ্যে ২৩৫ বস্তা ডিএপি, ৯৫ বস্তা টিএসপি ও ১৫৭ বস্তা এমওপি। সরকার নির্ধারিত মূল্যে ওই সার বিতরণের জন্য সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গুদামে যান। সেখানে কৃষকদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছিল।

এজাহারে কৃষি কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, যাচাই-বাছাইয়ের সময় কয়েকজন চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন। বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটের দিকে তাঁকে ও তাঁর সঙ্গে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গালাগাল করা হয়। পরে তাদের নিরাপদ স্থানে নেওয়ার সময় হামলা চালিয়ে কিলঘুসি মারা হয়। এতে কয়েকজন আহত হন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, হামলার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি ঘরে আটকে রেখে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। আহত কৃষি কর্মকর্তা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন।

তবে স্থানীয় কয়েকজন কৃষকের দাবি, তারা আমন মৌসুমে চাষাবাদের জন্য সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়ার আশায় ডিলারের কাছে গিয়েছিলেন। সার না পাওয়ার আশঙ্কা থেকেই তারা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন। তাদের কেউ কৃষি কর্মকর্তার ওপর হামলা করেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শহীদ মোড় এলাকার এক কৃষক বলেন, ‘সার চাওয়া কি আমাগরে অপরাধ? আমরা তো কাউকে আঘাত করি নাই। সার না পেয়ে রাস্তায় বসে পড়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ মামলা দিয়ে দুইজনকে ধরে নিয়ে গেছে। এখন প্রতি রাতে গ্রামে পুলিশ আসে। সারাদিন রোদে কাজ করি। অজ্ঞাতনামা আসামি করেও ধরে নিয়ে যেতে পারে। রাতে বাসায় ঘুমানোরও উপায় নেই।’
আরেক কৃষক বলেন, গ্রেপ্তারের ভয়ে এক রকম বাড়িছাড়া এখন আমরা। সার চাওয়াটাই কি এখন আমাদের অপরাধ?

এদিকে সারের দাবিতে বিক্ষোভ করতে গিয়ে কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার এবং অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী সংগঠন জাতীয় কৃষক শক্তি। গতকাল শনিবার বিকেলে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, সারের সংকট, বিতরণে অনিয়ম বা বৈষম্যের অভিযোগের সমাধান না করে কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের পরিবেশ তৈরি করা গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো নিরপরাধ কৃষক যাতে হয়রানি বা অযথা গ্রেপ্তারের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আজিম উদ্দিন বলেন, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে। নিরপরাধ কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না।

Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।