নারায়ণগঞ্জের বন্দরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জের ধরে রিকশা গ্যারেজে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় দায়ের করা মামলার বাদী ও ইসলামী যুব আন্দোলনের স্থানীয় নেতা জাহিদ হাসান বুলবুলকে (৩৮) কুপিয়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় বাহিনীপ্রধান সিফাতসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
নিহত জাহিদ হাসান বুলবুল ২২নং ওয়ার্ড বন্দরের শাহী মসজিদ ঠাকুরবাড়ী এলাকার মৃত রাজা মাস্টারের ছেলে। তিনি ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশ বন্দর থানা শাখার যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। মামলা তুলে না নেওয়া এবং পূর্বশত্রুতার জের ধরে বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে বন্দরের সালেহনগর এলাকায় এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে খুনিদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে শুক্রবার সকালে বন্দরের মদনপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাকর্মীরা। মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে সকাল ১০টায় অবস্থান নেন তারা। এ সময় মহাসড়কের উভয় পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ এসে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সব আসামিকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিলে নেতাকর্মীরা বেলা পৌনে ১১টায় অবরোধ তুলে নিলে মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। পরে জুমার নামাজের কিছু আগে বন্দর থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন তারা।
এদিকে এ ঘটনায় শুক্রবার ভোরে ২৩নং ওয়ার্ড বন্দরে কদমরসুল মাঠপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে সিফাত বাহিনীর প্রধান শেখ সিফাতসহ (২৮) ওই বাহিনীর ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
গ্রেফতার শেখ সিফাত ২১নং ওয়ার্ড বন্দরের শাহী মসজিদ এলাকার শাহীন ওরফে রিং শাহীনের ছেলে। অপর গ্রেফতারকৃতরা হলেন- বন্দরের বারপাড়া এলাকার রবিউল হাসানের ছেলে মাহাবুব হোসেন ওরফে মাহফুজ (৩২) নবীগঞ্জ কদমরসুল ফকিরবাড়ি এলাকার আলী আকবরের ছেলে জুম্মান ওরফে হোয়াইট জুম্মান (২৯), বন্দর শাহী মসজিদ এলাকার আবদুস সোবহানের ছেলে রিয়াদ (৩৩), কদমরসুল মাঠপাড়া এলাকার সুলাইমানের ছেলে সিয়াম (২৫), বন্দর চিতাশাল এলাকার ইমরান আলীর ছেলে ইরফান (২৯), সালেহনগর এলাকার পারভেজের স্ত্রী মিনারা (৩৫), একই এলাকার মাসুদের স্ত্রী নাসিমা বেগম (৩৬) ও দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী রুমা বেগম (৩৬)।
এ ব্যাপারে নিহত বুলবুলের বড় ভাই জুবাইদ আল আমিনকে বাদী করে বন্দর থানায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
নিহতের স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন বুলবুল। আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় তার মালিকানাধীন রিকশার গ্যারেজে হামলা ও ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়। এ সময় বুলবুলের গ্যারেজ থেকে ১৮টি রিকশা লুট করা হয় বলে বড় ভাই জুবাইদ আল আমিন জানান।
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট বুলবুল বাদী হয়ে শেখ সিফাতসহ কয়েকজনকে আসামি করে বন্দর থানায় একটি মামলা করেন। শেখ সিফাত ওই মামলার ১ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি। মামলা দায়ের করার পর থেকেই এটি তুলে নেওয়ার জন্য বুলবুলকে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
বৃহস্পতিবার রাতে সালেহনগর এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় বুলবুলকে একা পেয়ে ঘিরে ধরে সিফাত বাহিনীর সদস্যরা। এ সময় মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বুলবুলকে চাপ প্রয়োগ করে তারা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে বুলবুলকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় সড়কে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা বুলবুলকে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র হাতে সড়কে নেমে আসেন। তারা সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
উত্তপ্ত পরিস্থিতির একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত শেখ সিফাত ও তার আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। বর্তমানে এলাকাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি ও তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়াতে ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে বন্দর থানার ওসি জামালউদ্দিন জানান, পূর্বশত্রুতা ও মামলা করার জেরে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার ভোরে অভিযান চালিয়ে সিফাত বাহিনীর প্রধান শেখ সিফাত ও হোয়াইট জুম্মানসহ বাহিনীর ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
