ক্যাটাগরি অপরাধ ও বিচার

  • ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ আসামির মৃত্যুদণ্ড

    ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ আসামির মৃত্যুদণ্ড

    আইন-আদালত

    জুলাই বিপ্লবে গণহত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল-২।

    আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করে। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

    মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল। এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

    এছাড়া ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ এবং মাইনুল হোসেন খান নিখিলের সকল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এই সম্পত্তি বিক্রয় করে পাওয়া টাকা জুলাই/আগস্ট ২০২৪ সময়কালে শহীদ ও আহত সব ব্যক্তি বা তাদের পরিবারকে জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্যকোন বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

    মামলার বিচার প্রক্রিয়া: এই মামলা প্রথমে ৫/২০২৫ মিস কেস হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। এরপর তদন্ত শুরু হয় গত বছরের ১৮ জুন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ৭ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এতে আসামিদের বিরুদ্ধে ৯টি অভিযোগ আনা হয়। ওই দিনই অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয়।সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করা হয় এ বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি। ওই দিনই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রসিকিউশন আসামিদের বিরুদ্ধে ২৯ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় ২ আগস্ট। যুক্তিতর্ক শুরু ৪ আগস্ট এবং শেষ হয় ১৭ আগস্ট। ওই দিনই মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল।

  • সাবেক এমপি আজিজুল হক আটক

    রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার মো. আজিজুল হক আরজুকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে লালমাটিয়ার মিনা বাজারের সামনে থেকে স্থানীয় ছাত্রদল নেতাদের সহায়তায় তাকে আটক করা হয়।

    আটক খন্দকার মো. আজিজুল হক আরজুর বয়স ৬৯ বছর। তিনি পাবনা জেলার আমিনপুর থানার নাটিয়াবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা। ২০১৪ সালে পাবনা-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

    মঙ্গলবার মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল হালিম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

    ওসি জানান, আটকের সময় ধস্তাধস্তিতে আজিজুল হক আরজু সামান্য আহত হন। তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় পুলিশি প্রহরায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাকে চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়েছে।

    পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি তদন্ত করে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

  • ডিজিএফআই পরিচয়ে প্রতারক আটক

    ডিজিএফআই পরিচয়ে প্রতারক আটক

    প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) পিএস পরিচয় দিয়ে জালিয়াতির চেষ্টাকালে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। আটক হওয়া মাসুদুর রহমান (৩৪) রাজধানীর মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কার্যালয়ে গত দুই দিন ধরে একটি ফাইলে স্বাক্ষরের জন্য এক প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে চাপ দিয়ে আসছিল।

    বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাকে আটক করে আনসার সদস্যরা। বাহিনীটির সহকারী পরিচালক ও গণসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ নাজমুস সাকিব স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সে ওই কর্মকর্তার পিএসকে ভয়ভীতি দেখিয়ে হুমকি দিয়ে বলে, ‘তোমার নামে অনেক রিপোর্ট আছে, তোমাকে দেখে নেব। ’

    বিষয়টি সেখানে দায়িত্ব পালনরত আনসার সদস্যদের নজরে এলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে ওই ব্যক্তির মুখোমুখি হন। তার পরিচয় ও সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে কথাবার্তায় অসঙ্গতি ও প্রতারণার প্রমাণ মেলে। পরবর্তীতে আনসার সদস্যরা তাকে আটক করে বনানী থানা পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে প্রতারককে তাদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। আনসার বাহিনীর পিসি মোঃ সাহাবউদ্দীনের নেতৃত্বে এ অভিযানে অংশ নেন এপিসি জালাল উদ্দীন, আনসার মনিরুল ইসলাম ও আনসার শ্রী পূর্ণ রায়।

  • রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টার অভিযানে ৫১ মামলায় গ্রেপ্তার ৫৪২

    রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টার অভিযানে ৫১ মামলায় গ্রেপ্তার ৫৪২

    রাজধানীতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নিয়মিত অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় ৫৪২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মোট ৫১টি মামলা করেছে পুলিশ।

    গত বুধবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় এসব অভিযান চালানো হয়। ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন আজ এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মিরপুর বিভাগ এলাকার—১৯৩ জন। এ ছাড়া তেজগাঁও বিভাগে ৯১ জন, ওয়ারীতে ৬০ জন, মতিঝিলে ৫২ জন, উত্তরায় ৪২ জন, গুলশানে ৪১ জন, লালবাগে ২৮ জন এবং রমনা বিভাগে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ১২ জন ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট একজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

    অভিযানের সময় আসামিদের কাছ থেকে ৪৫ কেজি ৪৯০ গ্রাম গাঁজা, ৩ হাজার ২৯১টি ইয়াবা বড়ি, ১টি শটগান, ১টি প্রাইভেট কার, ১৫টি মুঠোফোন ও ১ জোড়া হাতকড়া উদ্ধার করা হয়। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে বুধবার দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত) রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে মোট ৪৭৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল ডিএমপি।

  • আদাবরে হাত-গলাকাটা ১০ টুকরো লাশ উদ্ধার

    আদাবরে হাত-গলাকাটা ১০ টুকরো লাশ উদ্ধার

    জধানীর আদাবর থেকে হাত ও গলাকাটা অবস্থায় এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। লাশটি প্রায় ১০ টুকরো করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

    শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) আদাবর ১০ নম্বরের হাক্কার মোড় এলাকা থেকে লাশটিটি উদ্ধার করা হয়।

    পুলিশ জানায়, স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি টি উদ্ধার করা হয়। তবে নিহত ব্যক্তির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। কী কারণে এবং কারা তাকে হত্যা করেছে, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও হত্যার রহস্য উদঘাটনে কাজ চলছে।

  • ইসকন মন্দিরে ভাঙচুর হিন্দু শিক্ষার্থী আটক

    ইসকন মন্দিরে ভাঙচুর হিন্দু শিক্ষার্থী আটক

    পাবনা শহরের ইসকন মন্দিরে প্রতিমা ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুরের অভিযোগে প্রান্থ কুমার দাস (২৫) নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে।

    গত সোমবার সকালে পাবনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসংলগ্ন মন্দিরে এ ঘটনা ঘটে। পরে মন্দির কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করে পুলিশে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।


    প্রান্থ কুমার দাস পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সুধিরপুর এলাকায়। তিনি প্রশান্ত চন্দ্র ম-লের ছেলে বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।


    মন্দির কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সকালে মন্দির খোলার পর প্রান্থ সেখানে প্রবেশ করে মন্দিরে ভাঙচুর করেন। বিষয়টি টের পেয়ে মন্দিরের লোকজন তাকে ঘটনাস্থলেই আটক করেন। আটকের পর মন্দির কর্তৃপক্ষের লোকজন তাকে মারধর করেন বলে একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।


    পাবনা সদর থানার ওসি তরিকুল ইসলাম জানান, প্রান্থ মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন বলে জানো গেছে। মন্দিরে প্রবেশের পর তার মানসিক সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় তিনি ভাঙচুর শুরু করেন বলে পুলিশের দাবি। তবে তার মানসিক অসুস্থতার বিষয়ে কোনো চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি বা বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।


    পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় প্রান্থের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। পরে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। মামলায় কী কী ধারা দেওয়া হয়েছে এবং মন্দিরের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি নিয়ে পাবনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে ভাঙচুরের প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সময় ওই শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা কী ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

  • ভারতের সিইসির জেলা শাসক মেয়ের শাস্তি, বেতন থেকে কাটা যাবে ৫ লাখ রুপি

    ভারতের সিইসির জেলা শাসক মেয়ের শাস্তি, বেতন থেকে কাটা যাবে ৫ লাখ রুপি

    ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের মতো তাঁর মেয়েও চলে এসেছেন খবরের শিরোনামে। বাবার মতো বিতর্কিত হয়ে উঠেছেন উত্তর প্রদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জেলা গৌতম বুদ্ধ নগরের জেলা শাসক (ডিএম) মেধা রুপম। মশা মারতে কামান দাগার অপরাধে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণের অর্থ এবার তাঁর বেতন থেকে কাটা হবে।

    শুধু তাই নয়, অন্যায়ভাবে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের (এনএসএ) প্রয়োগ করে কাউকে পাঁচ মাস বন্দী রাখার এই ব্যতিক্রমী ঘটনা নিয়ে আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণের বিষয়টি মেধা রুপমের চাকরিসংক্রান্ত রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশও হাইকোর্টের বিচারপতিরা দিয়েছেন। সরকারি আমলাদের বেতন থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ কাটার এই রায় অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন না হলেও নিশ্চিতভাবেই দৃষ্টান্তমূলক। আদালত মনে করেন, এর ফলে আমলাশাহি ও পুলিশ প্রশাসনের বেপরোয়া হয়ে ওঠা রোখা যাবে। তাঁদের আইন ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকতে বাধ্য করা যাবে।

    মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কিছুদিন ধরেই বিরোধীদের নিশানায় জ্বলজ্বল করছেন। সারা দেশে ভোটের তালিকা সংশোধনের নামে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ চালু করার মধ্য দিয়ে তিনি বিতর্কে জড়িয়েছেন। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজ্যের ১০ কোটি ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ঠিক আগে এভাবে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ছিল ১ কোটি। এখনো ২৭ লাখ ভোটারের নাম বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালের বিবেচনাধীন। বিরোধীদের অভিযোগ, এসআইআরের নামে নির্বাচন কমিশন বেছে বেছে বিরোধী অনুগত ভোটারদের নাম বাদ দিচ্ছে। বিশেষ করে বাদ দেওয়া হচ্ছে সংখ্যালঘু মুসলমানদের নাম। এভাবে তিনি শাসকদল বিজেপির সুবিধা করে দিচ্ছেন। এর বিরুদ্ধে প্রতিকারের কোনো উপায়ও নেই, যেহেতু কেন্দ্রীয় আইন অনুযায়ী নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।

    মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের মেয়ে মেধা রুপম। তিনি দিল্লির লাগোয়া উত্তর প্রদেশের গৌতম বুদ্ধ নগরের জেলা শাসক। এই জেলা নয়ডা নামেই বেশি পরিচিত। ২০২৫ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তাঁর এত গুরুত্বপূর্ণ জেলার দায়িত্বভার পাওয়া নিয়ে নানা কথা উঠেছিল। বাবার প্রভাব নিয়ে বেশ চর্চা হয়েছিল। এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে তাঁর বিরুদ্ধে যেসব কথা বলা হয়েছে, যেভাবে তাঁকে ভর্ৎসনা করা হয়েছে এবং জরিমানার টাকা যেভাবে তাঁর বেতন থেকে কাটার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবেই তাঁর কর্মজীবনের কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। মাস কয়েক আগে দিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থিত নয়ডার শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকেরা বেতন বৃদ্ধি ও অন্যান্য সুবিধার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। আকৃতি সেই আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের সেই শ্রমিক আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। উত্তর প্রদেশ পুলিশের অভিযোগ, শ্রমিক আন্দোলনকে হিংসাত্মক করে তোলার প্ররোচনা দিয়েছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালি ছাত্রী আকৃতি চৌধুরী। সেই অভিযোগে আকৃতিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারা প্রয়োগ করা হয়। ওই আইনে তাঁকে ৫ মাস বিনা বিচারে আটকও রাখা হয়। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে মোট ১১টি মামলা রুজু করা হয়।

    সেপ্টেম্বর মাসের ২ তারিখে এলাহাবাদ হাইকোর্ট আকৃতির বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আনা মামলা বাতিল করার নির্দেশ দেন। বিচারপতি অতুল শ্রীধরন ও বিচারপতি অচল সচদেবের ডিভিশন বেঞ্চ এনএসএতে আনা মামলা খারিজ করে জানান, আকৃতিকে অন্যায়ভাবে আটক করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর একটাও পুলিশ প্রমাণ করতে পারেনি। এমন কোনো প্রমাণ দাখিল করতে পারেনি যাতে প্রমাণিত হয় তিনি শ্রমিকদের সহিংস আচরণে প্ররোচনা জুগিয়েছেন। তা ছাড়া দেখা যাচ্ছে, শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হওয়ার আগেই আকৃতিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। দুই বিচারপতি তাঁদের রায়ে জেলা শাসিকা মেধা রুপমের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ এনে বলেছেন, সংবিধানের প্রতি অনুগত না থেকে তিনি রাজনৈতিক প্রশাসনের কাছে অনুগত থাকতে চেয়েছেন। দৃষ্টান্ত স্থাপনের তাগিদে তাই তিনি আকৃতির বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের ধারা প্রয়োগের অনুমতি দিয়েছেন। বিচারপতিরা বলেন, পুলিশ ও আমলাদের মনে রাখা উচিত তাঁরা সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ। অন্য কারও প্রতি নন। তাঁদের এমন আচরণ করা উচিত নয় যাতে মনে হয় যে তাঁরা ব্রিটিশ আমলের মতো দমনপীড়নের বাহকে পরিণত হয়েছেন।

    বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘১৯৮৪’–এর উল্লেখ করে বিচারপতিরা কড়া ভাষায় বলেছেন, এভাবে চললে উত্তর প্রদেশ ক্রমেই ‘অরওয়েলীয় দুঃসহ সমাজব্যবস্থায়’ পরিণত হবে। রাজ্যটা পরিণত হবে ‘সম্পূর্ণভাবে জীবনগ্রাসী রাষ্ট্রে’।

    শুধু এনএসএতে আনা মামলা খারিজ করেই বিচারপতিরা ক্ষান্ত হননি, আকৃতিকে তাঁরা ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, জেলা শাসিকা মেধা রুপম মতপ্রকাশের অধিকারে বাধা সৃষ্টি করে তাঁর সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা লঙ্ঘন করেছেন। একই অপরাধ করেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। আকৃতিকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে যে ৫ লাখ রুপি দেওয়া হবে, তা মেধা ও অন্য কর্মকর্তাদের বেতন থেকে কাটতে হবে। জরিমানার অর্থ রাষ্ট্র দেবে না। সেই সঙ্গে আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণ মেধার কর্মজীবনের রিপোর্ট ও রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

    মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কন্যা মেধা দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। জাতীয় স্তরের সাবেক শুটারও ছিলেন তিনি। তিনিই নয়ডার প্রথম নারী জেলা শাসক। বাবার মতো তিনিও বিতর্কে জড়ালেন। আইন অনুযায়ী জ্ঞানেশ কুমার আইন আদালতের ঊর্ধ্বে হলেও কন্যা মেধা আদালতের রোষ থেকে বাঁচতে পারলেন না। বরং এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় তাঁর কর্মজীবনের রেকর্ডভুক্ত হয়ে রইল।

  • পূর্ণাঙ্গ মানুষ থেকে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ

    পূর্ণাঙ্গ মানুষ থেকে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ

    তুরস্কের শিক্ষাবিদ ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মাহমুদ ওজেরে ‘পূর্ণাঙ্গ মানুষ’ ও ‘ন্যায়ভিত্তিক নগরসমাজ’ধারণাগুলোকে ‘জাস্টিস ইন ইসলামিক থট’ বইয়ের আলোকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ওমর তুর্কার ও ইউনুস কাপলান সম্পাদিত বইটি ইসলামি চিন্তায় ন্যায়বিচারের ধারণা কীভাবে ব্যক্তি, পরিবার, রাজনীতি ও রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে- তা বিশ্লেষণ করে। লেখাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো—ন্যায়বিচার কেবল আদালত, আইন বা রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় নয়; এটি মানুষের অস্তিত্ব ও চরিত্র থেকে শুরু হয়ে পুরো সামাজিক ব্যবস্থাকে ধারণ করে।

    এখানে ‘পূর্ণাঙ্গ মানুষ’ ও ‘ন্যায়ভিত্তিক সমাজ’ দুটি আলাদা আদর্শ নয়। বরং একটি আরেকটির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যে মানুষ নিজের আত্মার ভেতরে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে। আবার যে সমাজ ন্যায়, নৈতিকতা ও সুবিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেই সমাজ ব্যক্তিকে নৈতিকভাবে বিকশিত হওয়ার পরিবেশ দেয়। অর্থাৎ ব্যক্তি সমাজকে তৈরি করে, আবার সমাজও ব্যক্তিকে তৈরি করে।

    এই ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের আত্মার শৃঙ্খলা। প্লেটোনীয় ঐতিহ্যে মানুষের আত্মার তিনটি প্রধান শক্তির কথা বলা হয়—বুদ্ধি, উদ্দীপনা বা সাহসের শক্তি এবং আকাঙ্ক্ষা ও ভোগের প্রবৃত্তি। প্রত্যেকটির মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হলে জ্ঞান, সাহস ও সংযমের মতো গুণের বিকাশ ঘটে। আর এই গুণগুলোর মধ্যে সামগ্রিক সমন্বয় ঘটায় ন্যায়বিচার। ফলে ন্যায় হয়ে ওঠে অন্যান্য নৈতিক গুণের সমন্বিত ভিত্তি।

    এই দৃষ্টিতে পূর্ণাঙ্গ মানুষ সেই ব্যক্তি, যিনি নিজের বুদ্ধি, সাহস ও আকাঙ্ক্ষাকে যথাযথ ভারসাম্যের মধ্যে আনতে পেরেছেন। তার চরিত্রে জ্ঞান আছে, কিন্তু জ্ঞান অহংকারে পরিণত হয়নি; সাহস আছে, কিন্তু তা উগ্রতায় রূপ নেয়নি; আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু তা তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে না। ন্যায়বোধ এই প্রবৃত্তিগুলোকে যথাস্থানে রাখে।

    ইসলামি নৈতিক দর্শনে এই ধারণা ব্যক্তি থেকে পরিবারের দিকে বিস্তৃত হয়। নাসিরুদ্দিন তুসির ‘আখলাক-ই নাসিরি’তে নৈতিক দর্শনকে ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র—এই তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত স্তরে দেখা হয়েছে। এখানে নৈতিকতা ও ন্যায়বিচার আলাদা বিষয় নয়। ব্যক্তি যেমন নিজের চরিত্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে, তেমনি পরিবার পরিচালনা এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক জীবনের ক্ষেত্রেও একই নীতি কার্যকর হবে।

    আধুনিক যুগে ন্যায়বিচারকে আমরা সাধারণত আইন, আদালত, অধিকার কিংবা রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু ধ্রুপদি ইসলামি চিন্তায় ন্যায়বিচারের পরিধি আরো বিস্তৃত। সেখানে ন্যায় মানে শুধু কারও অধিকার রক্ষা করা নয়; বরং প্রতিটি বিষয়কে তার যথাযথ অবস্থানে রাখা এবং প্রতিটি সম্পর্ককে তার উপযুক্ত ভারসাম্যের মধ্যে পরিচালনা করা। অন্যায় হলো কোনো কিছুকে তার যথার্থ স্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া।

    এই ধারণাটি আল-গাজ্জালির চিন্তাতেও গুরুত্বপূর্ণ। তার কাছে ন্যায় এমন একটি বাস্তব নৈতিক গুণ, যা মানুষের আচরণে প্রকাশ পেতে হবে। শুধু ন্যায় সম্পর্কে জ্ঞান থাকা যথেষ্ট নয়; ন্যায়কে চরিত্রে পরিণত করতে হবে এবং জীবনের কাজে তার প্রকাশ ঘটাতে হবে। ফলে নৈতিকতা কোনো বক্তৃতা বা তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়—এটি জীবনযাপনের বিষয়।

    এই জায়গায় ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্কটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি সমাজের ন্যায়বিচার শুধু ভালো আইন দিয়ে নিশ্চিত হয় না। আইন প্রয়োগকারী মানুষ, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পরিবার এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে ন্যায়বোধের চর্চা করতে হয়। ন্যায়বান মানুষ ছাড়া ন্যায়বান প্রতিষ্ঠান টেকসই হয় না। আবার ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া ব্যক্তির নৈতিক বিকাশও কঠিন হয়ে পড়ে।

    আল-ফারাবির ‘গুণী নগর’ ধারণার মূল শক্তি এখানেই। গুণী নগর এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষের সর্বোচ্চ কল্যাণ বা সুখ অর্জনের পরিবেশ তৈরি হয়। শিক্ষা, আইন, পরিবার, বাণিজ্য, প্রশাসন—সব সামাজিক প্রতিষ্ঠান মানুষের নৈতিক বিকাশে ভূমিকা রাখে। ফলে রাষ্ট্র কেবল নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার যন্ত্র নয়; এটি মানুষের চরিত্র গঠনের পরিবেশও তৈরি করে।

    এই ধারণার সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব সাধারণত নাগরিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। কিন্তু ধ্রুপদি ইসলামি রাজনৈতিক দর্শনে রাষ্ট্রের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত—মানুষের নৈতিক ও সামগ্রিক উৎকর্ষের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে উন্নত করতে পারে।

    এ কারণে ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি শুধু জনগণের জন্য নয়, শাসকের জন্যও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাষ্ট্রের ন্যায় অনেকাংশে নির্ভর করে তার নেতৃত্বের নৈতিক চরিত্রের ওপর। ধ্রুপদি ইসলামি চিন্তায় শাসককে নিজেকেই ন্যায় ও আত্মশুদ্ধির পথে অগ্রসর একজন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ শাসকের চরিত্র রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। লেখক আল-গাজ্জালির আলোচনার সূত্র ধরে দেখিয়েছেন, শাসকের ন্যায়বিচার শুধু তার ব্যক্তিগত আচরণের বিষয় নয়; তার চারপাশের ক্ষমতাকাঠামো ও সমাজেও এর প্রতিফলন ঘটে।

    এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষা পাওয়া যায়। শুধু আইন তৈরি করে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না। যদি রাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দুর্নীতিগ্রস্ত হন, বিচারব্যবস্থা পক্ষপাতদুষ্ট হয়, ক্ষমতাবানরা আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন এবং নাগরিকের মধ্যে ন্যায়বোধ দুর্বল থাকে, তাহলে সংবিধান ও আইন থাকা সত্ত্বেও সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে না।

    ন্যায় তাই একটি সামগ্রিক সংস্কৃতি। এটি পরিবারে যেমন প্রয়োজন, রাষ্ট্রেও তেমন প্রয়োজন। ব্যবসায় যেমন প্রয়োজন, রাজনীতিতেও তেমন প্রয়োজন। আদালতে যেমন প্রয়োজন, ব্যক্তিগত সম্পর্কেও তেমন প্রয়োজন। একজন নাগরিকের ন্যায়বোধ এবং একজন শাসকের ন্যায়বোধ একই নৈতিক মূলনীতির অংশ।

    ইসলামি চিন্তায় ন্যায়কে আরও বৃহত্তর এক মহাজাগতিক শৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ইবনে আরাবির চিন্তায় আল্লাহর ‘আল-আদল’—ন্যায়বিচারক—নামের সঙ্গে সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলার সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের জগতে অন্যায় সেই শৃঙ্খলাকে বিঘ্নিত করে। ফলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠা কেবল রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়; এটি অস্তিত্বের একটি বৃহত্তর নৈতিক শৃঙ্খলার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কেরও অংশ।

    এই জায়গায় আধুনিক বিশ্বের সংকটগুলোর সঙ্গে ধ্রুপদি ইসলামি চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়। আজকের পৃথিবীতে আমরা দুর্নীতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক সংকট, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আস্থার সংকট নিয়ে আলোচনা করি। এসব সমস্যার সমাধান খুঁজতে আমরা প্রায়ই নতুন আইন, নতুন প্রতিষ্ঠান কিংবা নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর কথা বলি। কিন্তু মানুষের চরিত্রের পরিবর্তন ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান কতটা কার্যকর হবে—সেই প্রশ্নটি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।

    ‘পূর্ণাঙ্গ মানুষ’ ও ‘গুণী নগর’-এর ধারণা সেই জায়গাটিই সামনে আনে। একটি ভালো সমাজের জন্য শুধু ভালো প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন নয়; ভালো মানুষও প্রয়োজন। আবার ভালো মানুষ তৈরির জন্য প্রয়োজন এমন সামাজিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যা নৈতিকতাকে উৎসাহিত করবে।

    অর্থাৎ পরিবর্তনের পথ একমুখী নয়। শুধু মানুষ বদলালে সমাজ বদলাবে—এটিও পুরো সত্য নয়। আবার শুধু প্রতিষ্ঠান বদলালেই মানুষ বদলে যাবে—এটিও যথেষ্ট নয়। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে পরিবর্তিত হতে হয়। ন্যায়বান নাগরিক ন্যায়বান প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে, আর ন্যায়বান প্রতিষ্ঠান নতুন প্রজন্মের ন্যায়বান নাগরিক তৈরিতে সহায়তা করে।

    এখানেই ‘পূর্ণাঙ্গ মানুষ’ থেকে ‘গুণী নগর’-এর যাত্রা। ব্যক্তি তার আত্মার মধ্যে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে; পরিবার সেই ন্যায়কে সম্পর্কের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে; সমাজ সেটিকে সামাজিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেবে; রাষ্ট্র সেটিকে আইন ও শাসনের কাঠামোর মাধ্যমে সংরক্ষণ করবে। আবার রাষ্ট্র ও সমাজের সেই ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ ব্যক্তির নৈতিক বিকাশকে আরও শক্তিশালী করবে।

    এই দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ন্যায় কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এটি একটি জীবনদর্শন। ব্যক্তি যদি ন্যায়বান না হন, পরিবারে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয় না; পরিবারে ন্যায় না থাকলে সমাজে ন্যায় দুর্বল হয়; সমাজে ন্যায় দুর্বল হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।

    তাই একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের আত্মার প্রশ্নেও ফিরে আসে। রাষ্ট্রের ন্যায় শুরু হয় মানুষের ভেতর থেকে, আবার মানুষের নৈতিক বিকাশের জন্য ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রয়োজন। ব্যক্তি ও সমাজের এই পারস্পরিক নির্মাণই ‘পূর্ণাঙ্গ মানুষ’ ও ‘গুণী নগর’-এর সবচেয়ে গভীর শিক্ষা।

    সমকালীন পৃথিবীতে যখন ন্যায়বিচারকে অনেক সময় শুধু আদালত, অধিকার ও আইনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করা হয়, তখন ইসলামি চিন্তার এই বিস্তৃত ধারণা নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। ন্যায় মানে শুধু অপরাধীর বিচার নয়; ন্যায় মানে প্রত্যেক মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও সম্পর্ককে তার যথাযথ মর্যাদা ও অবস্থান দেওয়া। ন্যায় মানে ক্ষমতার ব্যবহারেও সংযম, সম্পদের বণ্টনে ভারসাম্য, পরিবারে দায়িত্বশীলতা এবং ব্যক্তিজীবনে আত্মশুদ্ধি।

    এই অর্থে একটি ন্যায়ভিত্তিক শহর বা রাষ্ট্র কেবল উন্নত অবকাঠামো, শক্তিশালী অর্থনীতি কিংবা কার্যকর প্রশাসনের নাম নয়। এটি এমন একটি নৈতিক পরিবেশ, যেখানে মানুষ নিজেকে উন্নত করতে পারে এবং অন্যের উন্নতির পথও তৈরি করে। আর সেই সমাজের সূচনা হয় একজন মানুষের নিজের ভেতরে ন্যায় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

    পূর্ণাঙ্গ মানুষ ও গুণী নগর তাই দুটি আলাদা স্বপ্ন নয়। একটি অন্যটির কারণও, ফলও। ন্যায় তাদের মধ্যে সেতুবন্ধন। ব্যক্তি ন্যায়বান হলে সমাজের ভিত্তি শক্ত হয়; সমাজ ন্যায়বান হলে ব্যক্তির উৎকর্ষের পথ প্রশস্ত হয়। এই পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেই একটি ন্যায়ভিত্তিক সভ্যতার সম্ভাবনা নিহিত।

    মানুষ একা বসবাসের জন্য সৃষ্টি হয়নি। পারস্পরিক প্রয়োজন ও সম্পর্কের কারণে মানুষ পরিবার গড়ে, সমাজ তৈরি করে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও নগরসভ্যতার জন্ম দেয়। কিন্তু মানুষের সম্মিলিত জীবন কীভাবে এমনভাবে সংগঠিত হবে, যাতে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত হয়—এই প্রশ্নটি প্রাচীনকাল থেকেই দর্শন ও রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম প্রধান বিষয়।

    প্লেটো ও অ্যারিস্টটল থেকে আল-ফারাবি, ইবনে সিনা, আল-গাজ্জালি, নাসিরুদ্দিন তুসি, ইবনে বাজ্জাহ ও ইবনে খালদুন পর্যন্ত মুসলিম ও অমুসলিম বহু চিন্তক এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে এ আলোচনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘আল-ইনসান আল-কামিল’—পূর্ণাঙ্গ বা পরিপূর্ণ মানুষ এবং ‘আল-মাদিনাহ আল-ফাদিলাহ’—গুণী বা ন্যায়ভিত্তিক নগররাষ্ট্র। আল-ফারাবি এই চিন্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি নির্মাণ করেন।

  • মুসলিম নারীকে পুশইন: আসাম সরকারকে জরিমানা করল ভারতীয় হাইকোর্ট

    মুসলিম নারীকে পুশইন: আসাম সরকারকে জরিমানা করল ভারতীয় হাইকোর্ট

    বাংলাভাষী এক মুসলিম নারীকে জোর করে বাংলাদেশে পুশইন করার ঘটনায় ভারতে আসামের রাজ্য সরকারকে দু’লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে গৌহাটি হাইকোর্ট।

    ভারত থেকে কাউকে বাংলাদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে ডিপোর্টেশন সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য কোনো রাজ্য সরকারকে আদালতের খরচ বা ক্ষতিপূরণ দিতে বলার ঘটনা এই প্রথম।

    মুমতাজ বেগমের পরিবার গৌহাটি হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাস মামলা দায়ের করার পর জানতে পারে যে তাকে জোর করে ভারত থেকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

    এই মামলায় হাইকোর্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও পক্ষভুক্ত করে।

    আদালত আরো জানিয়েছে, এই নারীকে বাংলাদেশ থেকে খুঁজে বের করে তাকে ভারতে ফিরিয়ে আনার জন্য দেশটির সরকারকে ‘চেষ্টা চালাতে’ নির্দেশ দেওয়া হবে।

    মুমতাজ বেগমকে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনায় আসামের নগাঁও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের ভূমিকাতেও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট।

    হেবিয়াস কর্পাস মামলার ভিত্তিতে শুনানি করতে গিয়ে বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা এবং বিচারপতি সুস্মিতা ফুকন খাউন্ডের বেঞ্চ বলেছে, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল যে ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে আদালত মনে করেছে যে আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে বিদ্বেষপ্রসূত পদক্ষেপের বিষয়টি নথি থেকেই স্পষ্ট।

  • মাদক মামলা

    মাদক মামলা

    মিসরে টিভি উপস্থাপকসহ ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড

    মাদকদ্রব্য তৈরি ও পাচারের মামলায় মিসরে জনপ্রিয় এক নারী টেলিভিশন উপস্থাপকসহ ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। গতকাল শনিবার দেশটির সরকারি গণমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।

    মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ওই উপস্থাপকের নাম সারাহ খলিফা। তার বয়স ৩৯ বছর। ‘মিশন ইমপসিবল’ নামের একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনার জন্য তিনি বেশি পরিচিত। অনুষ্ঠানটিতে নিরাপত্তা ও অপরাধ নিয়ে আলোচনা করা হতো।

    সরকার-সংশ্লিষ্ট পত্রিকা আল-আহরামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদক তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণ সংগ্রহ এবং সেগুলো পাচারের জন্য একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র গঠনের অভিযোগে সারাহ খলিফা ও অপর ১১ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে লাইসেন্সবিহীন আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ রাখা এবং বহনের অভিযোগও রয়েছে।

    কায়রোর একটি আদালত এই রায় দেন। রায় ঘোষণার আগে আদালত মিসরের গ্র্যান্ড মুফতির কাছে ফতোয়া বা ধর্মীয় মতামত জানতে চেয়েছিলেন। দেশটির আইনে মৃত্যুদণ্ডের মামলায় এটি বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া। তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে।

    রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আখবার এল-ইয়োম-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে পাচারের উদ্দেশ্যে সিনথেটিক মাদক তৈরি এবং বিদেশ থেকে মাদক তৈরির উপকরণ আমদানির অভিযোগ আনা হয়েছে।

    আল-আহরাম জানিয়েছে, অভিযানে ৭৫০ কেজির বেশি মাদকদ্রব্য ও মাদক তৈরির কাঁচামাল জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া মাদক তৈরির পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহৃত দুটি অ্যাপার্টমেন্ট এবং লাইসেন্সবিহীন আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।

    সারাহ খলিফার একটি কসমেটিক সার্জারি ক্লিনিক রয়েছে। তিনি বিভিন্ন পার্টি ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করা একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানেরও মালিক।

    অন্য মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড

    অন্য একটি মামলায় সারাহ খলিফা ও অপর আসামিদের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। ওই মামলায় এক তরুণকে অপহরণ ও মারধরের অভিযোগ ছিল।

    মিসরে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, ধর্ষণসহ কয়েক ধরনের অপরাধ এবং মাদক পাচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

    মিসরীয় কমিশন ফর রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে ৫৪১ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।