বিয়ের পর দীর্ঘ বছর দেখা না হলেও মৃত্যুর পর সীমান্তের শূন্যরেখায় শেষবার বাবার মুখ দেখলেন মেয়ে ফেরদৌসী খাতুন।
৪৫ বছর আগে বিয়ের পর পর কয়েকবার দেখা হয়েছে। তারপর আর মা-বাবা ও মেয়ের কেউ কারোর মুখ দেখেনি। জীবিত বাবার অথবা মেয়ের মুখটি শেষবারের মতো দেখার সুযোগও হয়নি তাদের। দুই দেশের সীমান্তের কাঁটাতার আটকে রেখেছিল বাবা-মেয়ের দেখা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। সময়ের সাথে দীর্ঘ হয়েছে দেখাদেখির অপেক্ষা।
অবশেষে বাবার মৃত্যুর পর সেই অপেক্ষার অবসান হলো। তবে দেখা হলো না ঘরের আঙিনায়, হলো দুই দেশের সীমান্তের শূন্যরেখায়। সেখানে বাবার নিথর মুখ দেখে দীর্ঘদিনের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা কিছুটা হলেও মেটালেন মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার সোনাপুর নতুনপাড়া গ্রামের স্বামী ইসরাফিলের স্ত্রী মোছা: ফেরদৌসী খাতুন।
ফেরদৌসী খাতুনের বাবার বাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাপড়া থানার হৃদয়পুর গ্রামে। আর স্বামীর বাড়ি এ দেশের সীমান্তবর্তী মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার সোনাপুর নতুনপাড়া গ্রামে। চাপড়া ও সোনাপুর দুই দেশের দুই গ্রামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল দুই দেশের সীমান্ত। সেই সীমান্তের কারণে দীর্ঘদিন দেখা করা সম্ভব হয়নি। যখন তাদের বিয়ে হয়, তখন সীমান্তে এমন কড়াকড়ি ছিল না। ছিল না কাঁটা তারের বেড়া। তখন দুই বাংলার ছেলে মেয়েদের মধ্যে হরহামেশাই বিয়ে হতো।
বাবা বৃদ্ধ মনোরঞ্জন শেখের শেষ ইচ্ছা ছিল, মৃত্যুর পর হলেও মেয়ে যেন তার মুখটি শেষবারের মতো দেখতে পারে। জীবদ্দশায় যে দেখা হয়ে ওঠেনি, অন্তত মৃত্যুর পর সেই সুযোগটুকু যেন মেয়ে পায়। অবশেষে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের মানবিক উদ্যোগে পূরণ হলো বাবার সেই শেষ ইচ্ছা।
ভারতের নদীয়া জেলার চাপড়া থানার হৃদয়পুর গ্রামের নিজ বাড়িতে বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান মনোরঞ্জন শেখ।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে তার লাশ নিয়ে আসা হয় মুজিবনগর স্বাধীনতা সড়কের ১০৯ নম্বর সীমান্ত পিলারের শূন্যরেখায়। সেখানে বাবার শেষ মুখ দেখেন মেয়ে ফেরদৌসী খাতুন। তার সাথে ছিলেন স্বামী ইসরাফিল, ছেলে মেয়ে ও নিকটাত্মীয়রা।
দুই দেশের সীমান্তের মাঝখানে বাবার নিথর মুখ। জীবিত অবস্থায় যে মুখ দেখার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে, সেই মুখই শেষবারের মতো দেখলেন ফেরদৌসী। বাবা-মেয়ের দেখা হলো ঠিকই, কিন্তু সেই দেখা আর কোনো কথার, কোনো সাড়ার কিংবা ফিরে পাওয়ার নয়। সীমান্তের শূন্যরেখায় এটিই হয়ে রইল তাদের শেষ দেখা।
এ সময় বাংলাদেশের পক্ষে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নায়েব সুবেদার এনায়েত হোসেন এবং ভারতের পক্ষে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের এএসআই নিলয় কুমারসহ দুই দেশের মোট ১০ জন সীমান্তরক্ষী সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
