যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের পর মার্কিন রাজনীতির ইতিহাসে তৈরি হতে যাচ্ছে নতুন এক অধ্যায়। দেশটির আইনসভার নিম্নকক্ষের ৪৩৫ সদস্যের নেতৃত্ব দিতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন ৫৬ বছর বয়সী প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পিকার হিসেবে শপথ নেবেন তিনি।
মার্কিন সংবিধানে পদমর্যাদার দিক থেকে প্রেসিডেন্টের উত্তরাধিকারের ক্রমানুসারে ভাইস প্রেসিডেন্টের ঠিক পরেই স্পিকারের অবস্থান। প্রতিনিধি পরিষদের প্রধান নীতি-নির্ধারক হিসেবে স্পিকারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন কোন বিলটি ভোটের জন্য ফ্লোরে উত্থাপিত হবে এবং কোনটি শুরুতেই আটকে দেওয়া হবে। নিউ ইয়র্কের অষ্টম কংগ্রেশনাল আসনে নিজের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর এক বিজয় ভাষণে হাকিম জেফ্রিস ঘোষণা করেন, ‘আজ থেকে আমেরিকার মহান প্রত্যাবর্তন শুরু হলো। আমেরিকান জনগণ তাদের রায় দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তারা চরমপন্থা ও দুর্নীতি আর সহ্য করবে না; তারা এমন এক কংগ্রেস চায় যা সাধারণ জনগণের স্বার্থে কাজ করবে।’
আইনজীবী থেকে ক্ষমতার শীর্ষ বিন্দুতে
রাজনীতিতে পূর্ণকালীন সম্পৃক্ত হওয়ার আগে হাকিম জেফ্রিস একজন করপোরেট আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৩ সালে তিনি প্রথমবারের মতো মার্কিন কংগ্রেসে যোগ দেন। প্রতিনিধি পরিষদের বিচারবিষয়ক কমিটিতে নিজের প্রজ্ঞা ও দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থায় চলে আসেন।
বিশেষ করে ২০২০ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম অভিশংসন প্রক্রিয়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। সে সময় সিনেটে ট্রাম্পের অভিশংসন বিচারে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তুলে ধরার মতো স্পর্শকাতর দায়িত্বে তৎকালীন হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তরুণ এই নেতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। সেই লড়াই থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে তার বলিষ্ঠ উপস্থিতি সবার নজর কাড়ে।
সাধারণ মানুষের অর্থনীতি ও ট্রাম্পকে কড়া জবাব
ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, জেফ্রিসের প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অর্থনৈতিক দাবিগুলোকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নীতিমালার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা। মার্কিনিদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, নিত্যপণ্যের লাগাম টানা এবং ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর পক্ষে তিনি শুরু থেকেই সোচ্চার।
অন্যদিকে, রিপাবলিকান শিবির ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের কারণেও তিনি সুপরিচিত। অতীতে ট্রাম্প যখন তার বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কটাক্ষ করেছিলেন, তখন পাল্টা জবাবে ট্রাম্পকে তীব্র আক্রমণ করে জেফ্রিস বলেছিলেন, হোয়াইট হাউসে বসা ট্রাম্প হচ্ছেন সবচেয়ে নির্বোধ ব্যক্তি—একজন দুর্বল, বেসামাল, ব্যর্থ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানো প্রবীণ প্রেসিডেন্ট।
সামনে কঠিন পরীক্ষা ও সমঝোতার চ্যালেঞ্জ
স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর হাকিম জেফ্রিসের সামনে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। ট্রাম্প সম্প্রতি নিজেকে ‘মিস্টার ভেটো’ হিসেবে ঘোষণা করায় ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদ থেকে পাস হওয়া যেকোনো জনকল্যাণমুখী বিলে প্রেসিডেন্টের ভেটোর মুখে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
তবে জেফ্রিস প্রয়োজনে সমঝোতার পথও খোলা রাখার বার্তা দিয়েছেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন, সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করাই তাদের মূল দায়িত্ব এবং সে কারণে প্রয়োজন হলে বিরোধী পক্ষের সাথে আলোচনাতেও বসতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যেহেতু হোয়াইট হাউস ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তাই দলমত নির্বিশেষে গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করা এবং একই সঙ্গে নবনির্বাচিত প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রত্যাশাগুলোকে বাস্তবতার নিরিখে সংযত রাখাই হবে নতুন এই কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকারের সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা।
