বাণিজ্য সহজীকরণে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) শর্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের তাগাদা দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে পণ্য চালান খালাসের সময় ও ব্যয় কমাতে সরকার দপ্তরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি সচিবালয়ে ন্যাশনাল ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন কমিটির দশম সভায় এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, এনবিআর, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভার কার্যপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বাণিজ্য সহজীকরণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত মোট ৫৪টি পদক্ষেপের মধ্যে ইতোমধ্যে ৪৭টি বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মধ্যে ক্যাটাগরি-‘এ’-এর ২১টি এবং ক্যাটাগরি-‘বি’-এর ১৮টি বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করে ডব্লিউটিওকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, ক্যাটাগরি-‘সি’-এর ১৫টি পদক্ষেপের মধ্যে ৮টি ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং বাকি ৭টি পদক্ষেপ আগামী ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে দেশের সক্ষমতা অটুট রাখতে অবশিষ্ট কার্যক্রমগুলো দ্রুত শেষ করার ওপর সভায় তাগাদা দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে বাণিজ্য সুরক্ষার সমীকরণ আরো বদলে যাবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক-সুবিধা সংকুচিত হওয়ার এই ক্রান্তিকালে দেশি শিল্প খাতকে বিদেশি পণ্যের অন্যায্য প্রতিযোগিতা ও তীব্র প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করতে এখন থেকেই নেওয়া হচ্ছে বিশেষ প্রস্তুতি। এ লক্ষ্যে এলডিসি উত্তরণে নতুন রোডম্যাপ তৈরি করেছে সরকার। সে লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনমুখী, উদ্ভাবনভিত্তিক শিল্প অর্থনীতিতে রূপান্তরের সুনির্দিষ্ট রূপকল্প সামনে রেখে একটি রোডম্যাপ করা হয়েছে। সেখানে ২০২৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ যে মূল লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে চায়, তার মধ্যে রয়েছে—সামষ্টিক অর্থনীতি এবং বাহ্যিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করা, তৈরি পোশাক বা আরএমজি খাতের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বৈশ্বিক মূল্য সংযোজন শৃঙ্খলের সঙ্গে দেশের বাণিজ্যব্যবস্থার গভীর ও টেকসই ইন্টিগ্রেশন নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে টিকিয়ে রাখতে এফটিএ, সিইপিএ বা পিটিএ চুক্তি চূড়ান্ত করা, ব্যবসা সহজীকরণ সূচকের দৃশ্যমান উন্নতি সাধন, দক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মী বাহিনী তৈরি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে।
সভায় জানানো হয়েছে, বাণিজ্য-সংক্রান্ত সব সনদ, লাইসেন্স ও পারমিটের আবেদন এবং সেবা একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ‘ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো’ বাস্তবায়ন করেছে। এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এখন পর্যন্ত ১৯টি সংস্থাকে যুক্ত করা হয়েছে এবং আরো ১৮টি নতুন দপ্তরকে এর আওতায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এছাড়া, এই পুরো কার্যক্রমটি সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য একটি পৃথক ‘বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো কমিশনারেট’ গঠনের কাজও বর্তমানে চলমান রয়েছে।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার বা এআরএমএসের কার্যক্রম আগামী অক্টোবরের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে। ঝুঁকি বিশ্লেষণভিত্তিক এ ব্যবস্থা চালু হলে পণ্য খালাস দ্রুত করার সুযোগ তৈরি হবে। অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতেও এনবিআর উদ্যোগ নিয়েছে।
জানা গেছে, পচনশীল পণ্য বা পেরিশেবল গুডস দ্রুত খালাস ও সংরক্ষণের জন্য বন্দরগুলোতে কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দর এলাকায় কোল্ড স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি স্থাপন এবং তা আধুনিকায়নের কাজ চলমান রয়েছে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরামর্শক সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে এবং পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষও বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বেনাপোল স্থলবন্দরে কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে যার দরপত্র মূল্যায়ন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সীমান্ত এজেন্সিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বর্ডার এজেন্সি কোঅপারেশন-সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করে তা ডব্লিউটিওকে অবহিত করা হয়েছে। সার্বিক দিক বিবেচনা করে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্বচ্ছতা আনা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, বাণিজ্য সহজীকরণ চুক্তির সব কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সহযোগিতায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হবে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
