জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় একসময় বছরের বেশিরভাগ সময় পতিত পড়ে থাকা নিচু জমি ও জলাশয় এখন কাজে লাগছে পানিফল চাষে। বর্ষা মৌসুমে পানিতে তলিয়ে থাকা এ সব জমিতে পানিফল চাষ করে বাড়তি আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নিচু জমি ও জলাশয়ের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে সবুজ পানিফলের গাছ ছড়িয়ে রয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজের চাদরে ঢেকে গেছে পুরো জলাশয়। পানির ওপর ভেসে থাকা পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে উঠছে পানিফলের গাছ।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, আগে এ সব জমির বড় একটি অংশ বর্ষাকালে পানিতে ডুবে থাকায় কৃষিকাজ করা সম্ভব হতো না। ফলে জমিগুলো বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় অনেকটাই অনাবাদি পড়ে থাকত। এখন সেই পতিত জমিতে পানিফল চাষ করে পরিবারের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দেশে প্রথম পানিফল চাষ শুরু হয় জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে। অল্প সময় ও কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় পানিফল চাষে অনেক আগ্রহী হয়ে উঠেছে চাষিরা। উপজেলায় পানিফল উৎপাদনে সফলতা পাওয়ায় অন্যান্য উপজেলার চাষিরা অনুপ্রাণিত হয়ে চাষাবাদ পদ্ধতি শিখে তাদের পতিত জমিতে পানিফল চাষ শুরু করেছে।
স্থানীয় নাম ‘সিঙ্গারা’, অনেকই চিনেন ‘পানিফল’ হিসেবে। তাছাড়াও নানা জায়গায় বাহারি সব নাম রয়েছে। ওয়াটার কালট্রপ, বাফেলো নাট, ডেভিল পড ইত্যাদি। আবার ইংরাজিতে একে ‘ওয়াটার চেস্টনাট’ বলা হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘ট্রাপা নাটানস’। এটি কেবল হাঁটু বা কোমর পানিতেই জন্মায়। দেখতে খানিকটা বাজারে তৈরি সিঙ্গারা মতো হওয়ায় অনেকেই সিঙ্গারা বলেও চিনেন।
পানিফল চাষে সার-কীটনাশকের তেমন প্রয়োজন হয় না। ফলে চাষিদের খরচ কম। পতিত জলাশয়ে চারা রোপণ করে শুধুমাত্র ভাল পরিচর্যায় এর ভালো ফলন পাওয়া যায়। বর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ পানিফলের গাছ ৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পানির নীচে মাটিতে শিকড় থাকে পানির উপর পাতাগুলি ভাসতে থাকে। বিভিন্ন পতিত ডোবা, খাল, পুকুরের অল্প পানিতেই পানিফল চাষ করা যায়। যার কারণে এই চাষে উৎসাহ পাচ্ছে চাষিরা।
পানিফল চাষে তুলনামূলকভাবে জমি প্রস্তুতের ঝামেলা কম। নিচু ও পানিযুক্ত জমিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে পানিফলের চারা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর গাছগুলো পানির ওপর বিস্তৃত হয়ে ফলন দিতে শুরু করে। মৌসুমে কয়েক দফায় ফল সংগ্রহ করা যায় বলে কৃষকদের কাছে এ চাষ বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। কৃষকরা জানান, পানিফল স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন হাট-বাজারেও সরবরাহ করা হয়। মৌসুমে চাহিদা থাকায় উৎপাদিত পানিফল বিক্রি করে অনেকেই সংসারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি অর্থ উপার্জন করছেন।
স্থানীয়দের মতে, দেওয়ানগঞ্জে বর্ষাকালে অনেক নিচু জমি পানিতে তলিয়ে থাকে। পরিকল্পিতভাবে এ সব জমিকে পানিফলসহ জলজ কৃষির আওতায় আনা গেলে একদিকে যেমন পতিত জমির ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকদের কর্মসংস্থান ও আয়ও বৃদ্ধি পাবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রতন মিয়া জানান, দেওয়ানগঞ্জে এ বছরে ৩৫ হেক্টর জমিতে পানি ফল চাষাবাদ হয়েছে, যেসব জমি দীর্ঘ সময় জলমগ্ন থাকে, সেখানে পানিফল চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে কৃষকদের এ চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
তবে কৃষকদের দাবি, উন্নত জাতের চারা সরবরাহ, সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা এবং উৎপাদিত ফলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এ চাষাবাদ আরও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব। অনাবাদি জমিগুলো চাষের আওতায় আনলে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
