বিডি গ্লোবাল ডেস্ক,
শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌরসভায় অফিস সহায়ক পদে চাকরি করেন রিতা রানী ও নাসিমা বেগম। পৌরসভার দাপ্তরিক কাজে সহায়তা করাই তাদের দায়িত্ব। তবে অভিযোগ উঠেছে, দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে তাদের দিয়ে নিয়মিত পৌর প্রশাসকের ব্যক্তিগত বাসায় বিভিন্ন কাজ করানো হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসকের বাসায় যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলে দুই নারী কর্মচারীকে চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়। এ অভিযোগ উঠেছে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার ফিরোজ আহমেদের বিরুদ্ধে। তবে চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
অভিযোগ অনুসন্ধান
অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, অফিস সহায়ক রিতা রানী প্রতিদিন সকালে পৌরসভা কার্যালয়ে এসে হাজিরা দেওয়ার পর চলে যান পৌর প্রশাসকের বাসায়। সেখানে প্রায় তিন ঘণ্টা অবস্থান করে দুপুর ১টার দিকে আবার পৌরসভায় ফেরেন তিনি।
বিষয়টি সরেজমিনে যাচাই করতে নড়িয়া পৌরসভা কার্যালয়ে গিয়ে রিতা রানীকে পাওয়া যায়নি। পরে পৌরসভার কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে অফিসে এসে হাজিরা দেন। এরপর প্রশাসকের বাসায় চলে যান। সেখানে কাজ শেষে দুপুর ১টার দিকে আবার কার্যালয়ে ফেরেন।
স্বীকারোক্তি
পরে দুপুর ১টার দিকে রিতা রানীকে পৌরসভা কার্যালয়ে ঢুকতে দেখা যায়। এ সময় কথা হলে তিনি প্রশাসকের বাসা থেকে কাজ করে ফেরার কথা জানান।
সপ্তাহে কতদিন প্রশাসকের বাসায় যেতে হয়—জানতে চাইলে রিতা রানী বলেন, ‘প্রতিদিনই যেতে হয়।’
পৌরসভার একাধিক কর্মচারীর অভিযোগ, রিতা রানীর পাশাপাশি আরেক অফিস সহায়ক নাসিমা বেগমকেও মাঝে মধ্যে প্রশাসকের বাসায় যেতে হয়। অর্থাৎ, তাদের দাপ্তরিক দায়িত্বের বাইরে ব্যক্তিগত বাসার কাজেও পাঠানো হচ্ছে।
অন্য কর্মচারীদের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার এক কর্মচারী বলেন, প্রতিদিন রিতা রানীকে প্রশাসকের বাসায় কাজের জন্য পাঠানো হয়। তিনি যেতে না চাইলে চাকরি চলে যাওয়ার ভয় দেখানো হয়। মাঝে মধ্যে রিতা রানী ও নাসিমা বেগম দুজনকেই একসঙ্গে বাসায় কাজ করতে যেতে হয়।
ওই কর্মচারীর দাবি, একজন অফিস সহায়ক দিনের বড় একটি সময় পৌরসভা কার্যালয়ের বাইরে থাকায় দাপ্তরিক কাজে অন্য কর্মচারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
‘স্যারের অনুরোধে পাঠাই’
দুই নারী কর্মচারীকে প্রশাসকের বাসায় পাঠানোর অভিযোগের বিষয়ে নড়িয়া পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার ফিরোজ আহমেদের সঙ্গে কথা হলে তিনি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
তবে তিনি বলেন, প্রশাসকের বাসায় স্থায়ীভাবে কাজের লোক রয়েছে। তিনি বলেন, ‘স্যারের এখানে কেউ থাকেন না। ছোট একটা মেয়ে নিয়ে থাকেন। তার বাসায় পার্মানেন্ট কাজের মানুষ আছে। তবুও মাঝে মধ্যে রিতা তার মেয়েকে একটু রাখতে যায়। স্যারের অনুরোধে আমি পাঠাই।’
তবে দুই কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
একপর্যায়ে প্রকৌশলী বলেন, ‘স্যারের জন্য কিছু করলেও তিনি কখনো খুশি হন না। তিনি সবসময় আরও চাইতেই থাকেন।’
প্রশাসকের সহজ স্বীকারোক্তি
অভিযোগের বিষয়ে নড়িয়া পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাসের সঙ্গে কথা হলে তিনিও ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
তবে পৌরসভার কর্মচারীকে নিজের বাসায় পাঠানোর কথা স্বীকার করেন তিনি।
লাকি দাস বলেন, ‘আমি ছোট একটা বাচ্চা নিয়ে একা থাকি। আমার বাসায় পার্মানেন্ট কাজের লোক রয়েছে। তবে মাঝে মধ্যে রিতাকে আমার মেয়েকে একটু রাখার জন্য বাসায় পাঠাই।’
অফিসের কর্মচারী দিয়ে ব্যক্তিগত বাসার কাজ করানো যায় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা আমি পারি না। তবে মাঝে মধ্যে বাধ্য হয়ে নিতে হয়।’
পরে তিনি বলেন, ‘এটা একটা ছোট বিষয়। যেহেতু আপনারা বলেছেন, তাকে আর বাসায় নেব না।’
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে নড়িয়া পৌরসভার প্রশাসক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাস।
বিষয়টাকে মানবিক বললেন: উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা
এ বিষয়ে নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাইয়ুম খান বলেন, ‘বিষয়টা একটু মানবিক। তিনি এখানে একা থাকেন। বাসায় তার ছোট মেয়ে থাকে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পৌরসভা আমার অধীনস্থ না। তাই এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না। যদিও এসিল্যান্ড হিসেবে তিনি আমার সহকর্মী। সেই ক্ষেত্রে আমি তাকে বলতে পারি, যেন এ ধরনের কাজ সে আর না করে।’
পৌরসভার কর্মচারীদের দাপ্তরিক দায়িত্বের বাইরে ব্যক্তিগত বাসার কাজে ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে প্রশাসকের বাসায় কর্মচারী পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করা হলেও, চাকরিচ্যুতির হুমকির অভিযোগ নিয়ে রয়েছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য।
