চলতি অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) খাতে সরকারকে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। অথচ পুরো অর্থবছরের জন্য এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহে বিঘ্নের কারণে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হওয়ায় এ চাপ তৈরি হয়েছে।
এলএনজির পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ খাতেও বাড়ছে সরকারের আর্থিক চাপ।
গত সাড়ে ছয় মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। গত ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হলেও ডিজেলে এখনো প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা লোকসান হচ্ছে।
কয়লা, ফার্নেস অয়েল ও এলএনজির দাম বাড়ায় চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতের লোকসান ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, গত সাড়ে ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে এলএনজি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে আরো ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির বর্তমান মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা কয়েক গুণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান বলেন, ‘যুদ্ধের প্রভাবে গত সাড়ে ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে অতিরিক্ত ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ ছাড়া গত আড়াই মাসে এলএনজির জন্য প্রায় ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেটের ওপরও নির্ভরতা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন এবং কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকায় স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১০ থেকে ১২ ডলারে কেনা হলেও সেপ্টেম্বরে তা প্রায় ৩০ ডলারে উঠেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘জ্বালানিসংকট সামাল দিতে বাধ্য হয়ে বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহকারীরা ফোর্স মেজর ঘোষণা করায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচ হলেও মানুষের দুর্ভোগ ও শিল্প-কারখানার ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার এই ঝুঁকি নিচ্ছে। ’
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েও বিপিসির লোকসান পুরোপুরি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। গত ২০ সেপ্টেম্বর দাম সমন্বয়ের সময় বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছিল, প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে গড়ে প্রায় ২০৫ টাকা ব্যয় হচ্ছে। নতুন মূল্য সমন্বয়ের পর দেশে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়। ফলে প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা লোকসান হচ্ছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, গত সাড়ে ছয় মাসে সংস্থাটির মাসিক গড় লোকসান প্রায় তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজভাড়া, প্রিমিয়ামসহ আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বিপিসির লোকসানের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কাভার হতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় না করায় বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। মূল্য সমন্বয় না করলে এক বছরে শুধু ডিজেলেই সরকারের লোকসান প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং সব ধরনের জ্বালানি তেল মিলিয়ে তা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা দাঁড়াত।
বিদ্যুৎ খাতেও বাড়ছে ব্যয়ের চাপ। গ্যাসের সংকট থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে চার হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে কয়লার দাম ও পরিবহন ব্যয়। ফলে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা লোকসানের যে হিসাব ধরা হয়েছিল, তা বেড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সরকারকে ভর্তুকি ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর লোকসানের বাড়তি চাপ সামলাতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে পরিবহন ও কৃষিতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
