মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ভারতে পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। তবে তার দেশে ফেরার গুঞ্জনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা প্রোপাগান্ডা। নাশকতার মাধ্যমে সারা দেশে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টাও করা হচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও শ্রমিকদের আন্দোলনের সঙ্গে ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর জড়িত থাকার অভিযোগ তোলা হয়েছে। আন্দোলনে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে দলটির বেশকিছু নেতাকর্মীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার কথিত ‘ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা’কে ঘিরে দেশ-বিদেশে নানা অপতৎপরতা শুরু করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। এর অংশ হিসেবে তারা নাশকতা আর চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে জনমনে ভীতি সৃষ্টি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিলের নামে দলের তথাকথিত ‘শক্তি প্রদর্শন’-এর চেষ্টা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গোপন লবিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃতপক্ষে হাসিনা দেশে ফিরবেন না। তবে জুলাই বিপ্লবের পর ভয়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়া নেতাকর্মীদের মনোবল ফেরানো, ঝিমিয়ে পড়াদের চাঙা রাখা এবং দেশ-বিদেশে আওয়ামী লীগের অবস্থান জানান দিতে এ ধরনের বার্তা দেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বর পার হলে কর্মীদের মাঠে ধরে রাখতে নতুন কোনো ঘোষণা আসবে।
বিগত দেড় দশকের নির্বিচারে গুম-হত্যা, ভোটাধিকার হরণ, আর্থিক খাতের লুটপাট, আয়নাঘরের নির্যাতন এবং জুলাই বিপ্লবের সময় ১,৪০০ মানুষকে হত্যার দায় নিয়ে হাসিনার দেশে ফেরার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলেন, জুলাইয়ের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। তীব্র ঘৃণা ও ঐতিহাসিক গণধিক্কারের কারণে রাজনৈতিকভাবে তার ফেরার পথ চিরতরে অবরুদ্ধ হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে তৈরি হওয়া বিভাজনকে সুযোগ হিসেবে নিতে চায় ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ। তারা নাশকতা করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।
ছাত্র-জনতার বিপ্লবে চব্বিশের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান হাসিনা। পলাতক অবস্থাতেই জুলাই গণহত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। আদালতের আদেশের পর গত বছরের ২১ নভেম্বর প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য ভারতকে চিঠি (কূটনৈতিক পত্র) দেয় বাংলাদেশ। পরে ভারতের তরফ থেকে বিষয়টিকে আইনি উল্লেখ করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়।
দুই দেশের চিঠি চালাচালির মধ্যেই প্রথমে ভারতের একটি গণমাধ্যমে এবং পরে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে টেলিফোন সাক্ষাতে হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরবেন বলে ঘোষণা দেন। তার ওই ঘোষণার পরপরই দেশ-বিদেশে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ব্যাপক অপতৎপরতা শুরু হয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নগণ্যসংখ্যক নেতাকর্মী দিয়ে ঝটিকা মিছিল শুরু করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। দলটির বিদেশে পলাতক নেতারাও প্রস্তুতি সভাসহ নানা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভারতীয় একাধিক গণমাধ্যমসহ আওয়ামী বয়ান তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক ইউটিউব চ্যানেলে টকশো, পডকাস্টসহ নানাভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কেউ কেউ হাসিনার সাক্ষাৎকারও নিচ্ছেন। বিদেশে পলাতক নেতারা হাসিনার সঙ্গে ৪০টি বিমান নিয়ে ঢাকায় আসার ঘোষণাও দেন। কেউ কেউ হেলিকপ্টারে আসার কথাও বলেন। দলীয় নেতাকর্মীসহ আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থকরা এও বলতে শুরু করেছেন, হাসিনা দেশে ফিরে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন। ব্যাপক হারে গুজব ছড়ানো ও ফেক নিউজ প্রচারের ঘটনাও ঘটছে। নানা ধরনের প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে তারা জনগণের মাঝে বিশ্বাস তৈরি করাতে চাচ্ছেন, হাসিনা ফিরবেনই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার দূরত্ব বৃদ্ধির সুযোগে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। দলটিকে ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের ঠেলাঠেলির ফাঁকে ওই দলই সুবিধা পাচ্ছে। এ সময় দেশকে অস্থিতিশীল করতে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছে তারা। চলমান শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গেও তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ অভিযোগে ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উসকে দেওয়া, শিল্পাঞ্চলগুলোয় কৃত্রিম শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি করে অর্থনীতিকে পঙ্গু করার পাঁয়তারা এবং গোপনে ঝটিকা মিছিলের ভিডিও তৈরি করে বিদেশে অবস্থানরত নেতৃত্বকে নিজেদের সক্রিয়তা দেখানোর অপপ্রয়াস নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত সোমবার তৈরি পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের পর গণমাধ্যমকে বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে প্রকৃত পোশাক শ্রমিকদের কিংবা ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এবং শিল্প খাত ধ্বংস করতে সুযোগ সন্ধানী ও ফ্যাসিস্টের সমর্থকরা মুখে মাস্ক পরে আন্দোলনস্থলে অনুপ্রবেশ করেছেন। তারা ভুয়া স্লোগান দিয়ে সহিংসতা ছড়াচ্ছেন। সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী এর সঙ্গে জড়িত বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এদিকে, হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে তার দলের একটি অংশকে সক্রিয় করতে পারলেও বড় অংশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ধরপাকড়ের মধ্যে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বড় অংশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে এলাকায় সক্রিয় হতে শুরু করে। পাশাপাশি দীর্ঘ আত্মগোপনে থাকা একটি অংশও আত্মপ্রকাশ করে নিজ নিজ ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনাসহ স্বাভাবিক কাজকর্ম করার সুযোগ পায়। তবে হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণায় এসব নেতাকর্মী আবার চাপে পড়েছেন। ডিসেম্বর সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সারা দেশে ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান শুরু করেছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও শুরু করেছেন তল্লাশি কার্যক্রম। এতে অনেকটা স্বাভাবিক জীবনে ফেরা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের আবার গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বাড়িঘর ছেড়ে পলাতক জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
একদিকে হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, অন্যদিকে আইনি বাস্তবতা এবং ভিসা বা ট্রাভেল পাসজনিত বাস্তবতার পাশাপাশি সরকারের শক্ত অবস্থানের কারণে তার এই প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাকে অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দেশে ফেরার প্রস্তুতি প্রশ্নে সম্প্রতি প্রবাসী বাংলাদেশি এক সাংবাদিকের সঙ্গে টেলিফোন সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেন, তার প্রস্তুতি তেমন কিছু না। কারণ, তার পাসপোর্ট ও আইডি কার্ড বন্ধ। টিকিট করতে গেলে করা যায় না। তবে তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন উল্লেখ করে জানান, যেভাবে হোক তিনি যাওয়ার একটি ব্যবস্থা করবেন। দেশে ফেরার বিষয়ে সবকিছু গুছিয়ে ফেলেছেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে, বাংলাদেশের কাছে ট্রাভেল পাস চাওয়ার জন্য পাঁচ সদস্যের বিদেশি আইনজীবী প্যানেল প্রস্তুত করার খবর প্রচার হলেও বিষয়টি সত্য নয় বলে হাসিনা নিজেই উল্লেখ করেন। এ-সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেকে এ বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। আমাকে ট্রাভেল পাসের জন্য বলতে হবে—হয় আমার পাসপোর্ট অ্যাক্টিভেট করে দিতে হবে, না হয় আমাকে ট্রাভেল পাস দিতে হবে, যাতে আমি দেশে ফিরতে পারি। ট্রাভেল পাস বা পাসপোর্ট না পেলে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেবেন বলে তিনি জানান। তবে ব্যবস্থাটা কী, তা জানাতে রাজি হননি।
তার দেশে ফেরার ইস্যুতে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে দলীয় নেতাকর্মীদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন হাসিনা নিজেই। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্প্রতি অনলাইনে যুক্ত হয়ে হাসিনা সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান এবং আঘাত এলে পাল্টা আঘাতের নির্দেশ দেন। এ সময় সাবেক এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন ভোলা থেকে তিন-চার লাখ লোক নিয়ে ঢাকায় জড়ো হবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। জবাবে হাসিনা কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘এত লম্বা লম্বা কথা বলো, আওয়ামী লীগ অফিসটা তো এখনো উদ্ধার করতে পারোনি। এক-দেড়শ লোক নিয়ে গেলে কি তোমাদের মেরেকেটে শেষে করে দেবে? আবার বলছ লাখ লাখ লোক আনবে। বাস্তবসম্মত কথা বলবা।’
হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর ভারতে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া সেনাবাহিনী ও পুলিশকে প্রকারান্তরে সরকারের বিরুদ্ধে উসকে দিয়েছেন। তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা ভয় পাবেন না। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা আপনাদের পাশে আছি। এই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়া হবে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার কর্মীদের খেলা দেখানো হবে।’
আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট আমলে গৃহপালিত বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের সম্প্রতি একটি টকশোতে যুক্ত হয়ে বলেন, হাসিনার সঙ্গে তার মাঝেমধ্যে কথা হয়। তিনি দেশে ফেরার কথা তাকে একাধিকবার বলেছেন। যেভাবে হোক, যে করেই হোক, তিনি ফিরবেন। উনি একটি সময়সীমা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু কবে ফিরবেন, তা সুনির্দিষ্ট করে বলেননি। হয়তোবা ওনার সময় চূড়ান্ত হয়নি। আর হলেও তা প্রকাশ করার সময় হয়নি বলেই বলেননি।
সরকারের মন্ত্রী-উপদেষ্টারাও হাসিনার দেশে আসার ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন। তবে হাসিনার দেশে আসার হুমকিতে তারা বিচলিত নন। বরং প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবেশী দেশ তাকে ফেরত দেবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তারা। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ডিসেম্বরে হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে তার গলায় মালা যাওয়ার আগেই আইনের হ্যান্ডকাফ হাতে পৌঁছে যাবে।
প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে হাসিনাকে ফেরত পেতে প্রতিবেশী দেশের কাছে বারবার আবেদন করার বিষয়টি উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘কে কখন আসতে চায় বা না চায়, এটা নিয়ে সরকার মোটেও বিচলিত নয়। সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। যে যখনই আসুক, তাদের আইনানুযায়ী হেফাজতে নেওয়া হবে। এ দেশের জনগণ তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেবে বলে মনে করি না। ডিসেম্বরে কোনো অপশক্তি এখানে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।’
তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান বলেন, ‘উনি ঘোষণা দিয়েছেন, উনি আসবেন কি আসবেন না, এটা সময় বলে দেবে। তবে আমি মনে করি, ওই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়নি। কারণ, চব্বিশের হত্যা ও অত্যাচারের ট্রমা থেকে দেশের মানুষ এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি।’
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে কোনো মবের মুখোমুখি হতে হবে না। তাকে ন্যায়বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
হাসিনা স্বেচ্ছায় এলে সরকার খুশি হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা যাকে চাই, তিনি আসবেন, আমরা হ্যাপি। আমাদের ধরেবেঁধে আনতে হলো না। উনি এলে বিচারের মুখোমুখি হবেন। তিনি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তাকে ন্যায়বিচার দিয়ে আমরা প্রতিশোধ নেব।
হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নেই—এমনটি জানিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, এই ছয় মাস আলোচনায় থাকলেন। নিশ্চিত থাকুন—এরপর বলবেন ডিসেম্বরে না, জুনে আসব। এতে নতুন করে আরো ছয় মাস আলোচনায় থাকবেন। পরে বলবেন ডিসেম্বর। এভাবে চলতে থাকবে।
এক ডাকাত পালিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এরশাদ সাহেব পতনের পর পালিয়ে যাননি। উনি কী এমন করেছেন যে, বায়তুল মোকাররমের ইমাম নিয়ে পালিয়ে যেতে হলো? সেই মানুষ আবার দেশে আসবেন! অসম্ভব।’
হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে বলে মনে করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সাহাবুল হক। আমার দেশকে তিনি বলেন, জুলাইয়ের রক্তপাত এবং হাসিনার শাসনামল নিয়ে জনমনে জমে থাকা ক্ষোভ ও আদালতের দণ্ডের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে দেশে ফিরে স্বাভাবিক রাজনৈতিক জীবনে অংশ নেওয়া তার জন্য অত্যন্ত কঠিন। দেশে ফিরলে তাকে প্রথমেই আইনি প্রক্রিয়া এবং আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। বয়স ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও তার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাকে আরো জটিল করে তুলেছে। তার দেশে ফেরার এ ঘোষণা মূলত রাজনৈতিকভাবে আলোচনায় থাকা এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার একটি কৌশল বলে মনে করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
হাসিনাকে ঘিরে বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা জেনেছি, নির্বাচনের আগে উভয় দলই আওয়ামী লীগের ভোট ও সমর্থন পাওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। পরে তাদের বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটিকে আবার আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তবে হাসিনা যদি সত্যিই দেশে ফিরে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পান, তাহলে বিএনপি কিংবা জামায়াত—কোনো দলের জন্যই তা স্বস্তিদায়ক হবে না। হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা দেশ-বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দলকে সংগঠিত ও সক্রিয় করার অংশ বলে অভিমত অধ্যাপক সাহাবুলের।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তারেক ফজল আমার দেশকে বলেন, হাসিনার পক্ষ থেকে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণাকে শুধু ‘ঘোষণা’ হিসেবেই মনে করার সুযোগ রয়েছে। যদিও তার চেহারা দেখা যায়নি, কণ্ঠ শোনা গেছে। ওই কণ্ঠকে আপাতত অস্বীকার করা যাচ্ছে না। অপরদিকে তার ঘোষণার পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেশ-বিদেশে যেসব পদক্ষেপ দেখছি, সেটাও বিবেচনায় নেওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
এর আগেও হাসিনা চট করে চলে আসবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন উল্লেখ করে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, পার্থক্যের জায়গা হলো, এবার তিনি অনেকটা টাইমফ্রেম ঘোষণা করেছেন। কাজেই বিষয়টি আমলে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার দেশে এলে যে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, সেটাও ভাবনার বিষয়। তবে তার দেশে ফেরাকে যারা হুমকি মনে করেন, সেটা বর্তমান সরকার হোক বা বিরোধী দল হোক, সবারই বিষয়টি আমলে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
তিনি বলেন, হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা থাকলেও আইন মোকাবিলার বিষয়ে প্রকাশ্য কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। ভেতরে ভেতরে থাকলে সেটা ভিন্ন কথা।
ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী দেশে অস্থিরতা তৈরির সর্বাত্মক চেষ্টা করবে বলে মনে করেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। আমার দেশকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, চলমান শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা বলা মুশকিল। এগুলো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বিষয়। তবে তারা নাশকতার চেষ্টা করতে পারে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শক্তিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মাহবুব উল্লাহ বলেন, এই মুহূর্তে সরকার ও বিরোধী দলসহ ফ্যাসিস্টবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ঐক্যের বিকল্প নেই। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রবল জনমত তৈরি করতে হবে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশে খুন-গুম, লুটতরাজ, অর্থপাচারসহ যেসব অরাজকতা সৃষ্টি করেছিলেন, সে বিষয়ে দেশবাসীকে সদা জাগ্রত করতে হবে।
( সুত্র: দৈনিক আমার দেশ )
