স্ট্রিট ফুড-রেস্তোরাঁর খাবারে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া

মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ খাবার, অথচ সেই খাবারই হয়ে উঠেছে নীরব ঘাতক। দেশের স্ট্রিট ফুড কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের মান নিয়ে সাধারণত আলোচনা হয় না। তবে যখনই ভোক্তা অধিকারের অভিযানে কোনো রেস্তোরাঁর খাবারে সমস্যা ধরা পড়ে; তখনই হৈচৈ শুরু হয়। কিন্তু কয়েক দিন পরই তা আর থাকে না; ফলে আবারও সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মে চলতে থাকে। এসব কারণে খাবারের মান উন্নতি হচ্ছে না; যা হাজারো মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছে।

সম্প্রতি স্ট্রিট ফুড বা রেডি টু মিল নিয়ে এক গবেষণায় বাইরের বিভিন্ন খাবারে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ‘স্ট্রিটফুড এবং রেস্তোরাঁর ‘রেডি-টু-ইট’ সালাদে অণুজীবজনিত ঝুঁকির উপস্থিতি ও তার সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ’ শিরোনামে গবেষণাটি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান গবেষক ড. মো. লতিফুল বারী।

গবেষণায় স্ট্রিট ফুড, রেস্তোরাঁর সালাদ, জুস ও শরবতে ই-কোলাই, স্যালমোনেলা ও ভিবরিওর মতো রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার নিরাপদ মাত্রার বেশি উপস্থিতি পেয়েছেন তিনি। চানাচুর মাখা বা ছোলা-মুড়ি থেকে ই-কোলাই সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ৪৫.৫ শতাংশ, অ্যালোভেরা শরবতে স্যালমোনেলার ঝুঁকি সর্বোচ্চ ১০.৫ শতাংশ, আর চটপটিতে ভিবরিও সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ২২ শতাংশ।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ২০১৮ সালের জরিপে ১০০টি হোটেলের মধ্যে মাত্র চারটি সবুজ, ৪৫টি হলুদ ও ৫১টি লাল স্টিকার পেয়েছিল। আট বছর পরও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটি মাত্র ১২৬৫ হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বেকারি গ্রেডিং করে ৫৫৭টির তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে, যেখানে খাদ্য কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন মোল্লার ভাষ্যে অর্ধেক প্রতিষ্ঠানের মান ভালো অবস্থানে আছে, আর সি ক্যাটাগরির প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অথচ দেশে সরকারি হিসাবেই হোটেল-রেস্তোরাঁর সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে। সংস্থার সচিব শ্রাবস্তী রায় জানান, মাত্র ৩৭১ জন জনবল দিয়ে এই বিশাল খাতে নজরদারি চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। এ জন্য জনবল বাড়াতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০১৭ সালের সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকার ৯০ শতাংশ রাস্তার খাবারই অনিরাপদ। আইসিডিডিআরবির ২০১৫ সালের গবেষণায় ৫৫ শতাংশ রাস্তার খাবারে জীবাণু ও ৮৮ শতাংশ বিক্রেতার হাতে অস্বাস্থ্যকর জীবাণু পাওয়া যায়। বিএআরসির ২০১৯ সালের গবেষণা আরো উদ্বেগজনক; ঝালমুড়ি, ফুচকা, চটপটি, নুডলসসহ বিভিন্ন নমুনার প্রতি গ্রামে এক হাজার ১০০-এর বেশি টোটাল কলিফর্মস ও ই-কোলাই পাওয়া গেছে, যেখানে নিরাপদ সীমা মাত্র ৩০। বিএআরসির সাবেক পরিচালক মনিরুল ইসলামের মতে, রাস্তার খাবারে ব্যবহৃত পানিই সবচেয়ে ভয়াবহ সমস্যা, অথচ এটি নিয়ে কারো তেমন মাথাব্যথা নেই।

অর্থ সংকটে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল

বিএআরসির গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৯ সালে ঢাকার রাস্তায় প্রায় ১৪০ ধরনের খাবার বিক্রি হতো, এসব থাবার প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ মানুষ খেয়ে থাকেন। ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে একই তথ্য জানানো হয়। শিক্ষার্থীরা এসব খাবারের বড় ক্রেতা। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুরি খেতে খেতে শিক্ষার্থী আব্দুল আলিম বলেন, ধুলাবালি ও পানির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এ বিষয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগের কথা তিনি শোনেননি।

জানা যায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে রাস্তার খাবার দোকানের নিবন্ধন ব্যবস্থা নেই, বিক্রেতাদের নির্দিষ্ট কোনো তালিকাও নেই কর্তৃপক্ষের কাছে। দক্ষিণ সিটির খাদ্য পরিদর্শক মো. মাহমুদুল হাসান আনসারী আমার দেশকে বলেন, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের খাবারের মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে এক সময় উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা না করায় পরে তা থেমে যায়। বর্তমানে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। এছাড়া এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া বেশ কঠিন।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, রাস্তার খাবারের মান নিয়ে এখনো তেমন কোনো কাজ হয়নি, কার্যক্রম পরিদর্শন-পরিবীক্ষণেই সীমাবদ্ধ। এফএও ও আইসিডিডিআরবির যৌথ উদ্যোগে ২০১৫ সালে ঢাকা-খুলনা-বরিশালে বিতরণ করা ৪০০টি কাচ-ঘেরা ‘স্ট্রিট ফুড ভ্যান’ও প্রকল্প শেষে অকার্যকর হয়ে পড়েছে, বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কারো কাছে কোনো তথ্যই নেই।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার মণ্ডল জানান, রান্না করা খাবার ও কাঁচা মাংস একসঙ্গে রাখা, অভিজাত হোটেলে দীর্ঘ সময় ফ্রিজিং করা খাবারে রঙ মেশানোর মতো ঘটনা তারা দেখেছেন। তিনি বলেন, এক প্লেট ফুসকাতে সাত কোটিরও বেশি ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। মলমূত্রের যে জীবাণু, সেগুলোও এসব খাবারে পাওয়া গেছে।

এছাড়া পাঁচতারা হোটেলগুলোর ওপরও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, বাধ্যতামূলক গ্রেডিং থমকে আছে আহ্বানেই; এ কাজের জন্য আছেন মাত্র চারজন ম্যাজিস্ট্রেট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আমিনুল হক ভূঁইয়ার মতে, অনেক দেশেই রাস্তার খাবারের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা, জীবাণুমুক্ত পানি ও নিয়মিত তদারকি আছে বাংলাদেশেও তা সম্ভব, প্রয়োজন শুধু সঠিক ব্যবস্থাপনা ও আন্তরিকতা। বিক্রেতাদের নিবন্ধনের আওতায় এনে নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দ দিলে মান নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।

ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, জনবল সীমাবদ্ধতায় অভিযানের পর কিছুদিন পরিস্থিতি ভালো থাকলেও ধীরে ধীরে আবার পুরোনো চিত্রে ফিরে যায় সবকিছু। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সমস্যা সমাধানে শুধু প্রশাসন নয়, ব্যবসায়ী সমাজ, গণমাধ্যম ও সচেতন ভোক্তা সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। জনবল বৃদ্ধি, বাধ্যতামূলক গ্রেডিং এবং উৎপাদন থেকে পরিবেশন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ধারাবাহিক তদারকি নিশ্চিত না হলে দেশের কোটি কোটি মানুষের খাবারের এই অনিশ্চয়তা কাটবে না বলেই মনে করছেন তারা।