শরীরে ট্যাটু বা উল্কি আঁকা নিয়ে ইসলামে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। হাদিসে উল্কি অঙ্কন ও গ্রহণের বিষয়ে কঠোর সতর্কতা এসেছে। তবে কারও শরীরে আগে থেকেই ট্যাটু থাকলে তার অজু ও নামাজ হবে কি না—এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন রয়েছে। ট্যাটু থাকলে অজু-গোসল ও নামাজের বিধান কী, এ বিষয়ে ইসলামী শরিয়তের ব্যাখ্যা জানা জরুরি।
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে শরীরে ট্যাটু বা উল্কি আঁকা জায়েয নয়। এ বিষয়ে হাদিসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) উল্কি অঙ্কন করতে নিষেধ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৪০৮)
আরেক হাদিসে আবু জুহাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) উল্কি অঙ্কনকারিনী, উল্কি গ্রহণকারিনী, সুদগ্রহীতা ও সুদদাতার ওপর অভিসম্পাত করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৪৭)
হাদিসের আলোকে শরীরে ট্যাটু বা উল্কি আঁকা হারাম ও কবিরা গুনাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে কারও শরীরে আগে থেকেই ট্যাটু থাকলে অজু-গোসলের ক্ষেত্রে বিষয়টি নির্ভর করে ট্যাটুর ধরন ও পানি শরীরে পৌঁছানোর ওপর।
সাধারণত ট্যাটু ত্বকের ভেতরে রং প্রবেশ করিয়ে তৈরি করা হয়। ফলে ট্যাটুর কারণে যদি শরীরের ওপর এমন কোনো আবরণ সৃষ্টি না হয়, যা ত্বকে পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়, তাহলে অজু ও গোসল শুদ্ধ হবে। অর্থাৎ শুধু ত্বকের ভেতরে ট্যাটুর রং থাকার কারণে অজু-গোসল নষ্ট হবে না। তবে ট্যাটুর ওপর যদি এমন কোনো আবরণ থাকে, যা পানিকে ত্বকে পৌঁছাতে বাধা দেয়, তাহলে সেই আবরণ অপসারণ করে অজু বা গোসল করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে ট্যাটু করানো হারাম হওয়ার বিষয়টি আলাদা এবং অজু-গোসল শুদ্ধ হওয়ার বিষয়টি আলাদা। কারও শরীরে আগে থেকেই ট্যাটু থাকলে তা অপসারণের ক্ষেত্রে নিজের শরীরের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে আলেমদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করাও জরুরি।
চিত্র অঙ্কন ও শরীরে আকৃতি পরিবর্তনের বিষয়ে হাদিসেও সতর্ক করা হয়েছে। হজরত সাঈদ বিন আবুল হাসান বলেন, এক ব্যক্তি হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কাছে এসে বলল, ‘আমি চিত্রকর এবং চিত্র অঙ্কন করি। এ সম্পর্কে আমাকে শরিয়তের বিধান বলে দিন।’ ইবনে আব্বাস (রা.) তাকে কাছে ডাকেন এবং বলেন, ‘আমি তোমাকে এ সম্পর্কে এমন একটি হাদিস শোনাচ্ছি, যা আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে শুনেছি।’
তিনি বলেন, রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘সকল চিত্রকরই জাহান্নামে যাবে। আর প্রত্যেক চিত্রের পরিবর্তে জীবিত এক ব্যক্তিকে বানানো হবে, যা জাহান্নামে তাকে শাস্তি দেবে।’ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘যদি তোমাকে এমন করতেই হয়, তাহলে গাছপালা বা এমন বস্তুর ছবি আঁকো, যা প্রাণী নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৬৬২)
পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ তায়ালা মানুষের সৃষ্টিগত সৌন্দর্য ও কাঠামোর কথা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম কাঠামো দিয়ে।’ (সুরা তিন, আয়াত: ৪)।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তারা আল্লাহর সৃষ্টির বিকৃতি করবেই।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১১৯)।
এ প্রসঙ্গে সুরা নিসার ১১৭ থেকে ১১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা আল্লাহকে পরিত্যাগ করে শুধু নারীর আরাধনা করে এবং শুধু অবাধ্য শয়তানের পূজা করে। যার প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। শয়তান বলল, আমি অবশ্যই আপনার বান্দাদের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে অবলম্বন করব। তাদের পথভ্রষ্ট করব, তাদের আশ্বাস দেব; তাদের পশুদের কর্ণ ছেদন করতে বলব এবং তাদের আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন করতে আদেশ দেব। যে কেউ আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, সে প্রকাশ্য ক্ষতিতে পতিত হয়।’
অতএব, ইচ্ছাকৃতভাবে শরীরে ট্যাটু বা উল্কি আঁকা থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে কারও শরীরে আগে থেকেই ট্যাটু থাকলে শুধু ট্যাটু থাকার কারণে অজু ও গোসল বাতিল হবে—এমন নয়। মূল বিষয় হলো, ত্বকের ওপর এমন কোনো আবরণ আছে কি না, যা শরীরে পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়। পানি ত্বকে পৌঁছালে অজু-গোসল শুদ্ধ হবে এবং সে অনুযায়ী নামাজও আদায় করতে হবে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
