সারাদেশ

  • মধুখালীতে আমনের চারা কিনতে হাটে কৃষকের ভিড়

    মধুখালীতে আমনের চারা কিনতে হাটে কৃষকের ভিড়

    ফরিদপুরের মধুখালীর বিভিন্ন হাটে রোপা আমনের চারা সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। অনুকূল আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের কারণে চলতি মৌসুমে উপজেলায় রোপা আমনের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

    উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটি হাট মধুখালী সদর ও কামারখালীতে রোপা আমনের চারা কিনতে কৃষকদের ভিড় দেখা গেছে। সোমবার (৩১ আগস্ট) মধুখালী হাটে প্রতি বোঝা চারা ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা যায়। এ ছাড়া প্রতি বোঝা চারার জন্য ২০ থেকে ৩০ টাকা খাজনা আদায় করা হচ্ছে।

    হাটের চারা বিক্রেতা সামাদ শেখ বলেন, হাটে প্রচুর পরিমাণে ধানের চারা আসছে। কৃষকেরা নিজেদের পছন্দ ও জমির উপযোগিতা অনুযায়ী চারা কিনছেন।

    বাজারের খাজনা আদায়কারী মো. ইমন শেখ বলেন, হাটে চারার আমদানি ভালো। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চারা কেনাবেচা চলছে। ভালো মানের চারার প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বেশি।

    মধুখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহাবুব ইলাহী জানান, রোপা আমনের বিরি-৮৭, বিরি-৩৭, বিরি-৭৫ ও বিনা-৭সহ বিভিন্ন জাতের ধান সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত রোপণ করা হয়। আগাম ভাসমান চারা ও অন্যান্য পদ্ধতিতে আগস্টের শেষ পর্যন্ত উপজেলায় ৮ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের চারা রোপণ করা হয়েছে।

    তিনি জানান, চলতি বছর উপজেলায় ৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মৌসুমে আবাদ হয়েছিল ৮ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে।

    সেপ্টেম্বর মাসজুড়েই চারা রোপণের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে বৃষ্টিপাত হওয়ায় জমিতে প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে চলতি মৌসুমে রোপা আমনের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

  • কৃষকের সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা লুটের আয়োজন

    কৃষকের সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা লুটের আয়োজন

    যশোরের শেখহাটি গ্রামের এসএম কবীর হোসেন এবার দেড় বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করেছেন। এজন্য বর্তমানে তার ৩০ কেজি টিএসপি সার দরকার। কিন্তু এই সার সংগ্রহ করতে গিয়ে তাকে নানামুখী হয়রানের শিকার হতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় জামরুলতলা বাজারের একটি দোকান থেকে ২৫ কেজি সার ম্যানেজ করতে পারলেও এর জন্য তাকে সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।

    এটা শুধু কৃষক কবীর হোসেনের গল্প নয়, যশোরের হাজার হাজার কৃষককে সারের জন্য এখন এমন হয়রানি এবং দ্বিগুণ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।
    তবে প্রকাশ্যে এভাবে দ্বিগুন দরে সরকারি সার বিক্রি হলেও বাস্তবিক অর্থে কার্যকর কোন ব্যবস্থাই এখনো নেওয়া হয়নি। ক্ষেত্রবিশেষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই একটি অভিযান পরিচালনা করা হলেও কার্যত এই অতিরিক্ত দামের প্রকাশ্য তৎপরতাকে এখনো পর্যন্ত স্বীকার করা হয়নি। তাই প্রকাশ্যেই বাঁধাহীনভাবে চলছে সার সিন্ডিকেটের কৃষকের শ্রম লুটের কারবার।
    এসএম কবীর হোসেন অভিযোগ করেন, ‘প্রকাশ্যেই অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু কার্যত কোন ব্যবস্থা তো নেওয়া হচ্ছে না। দোকানদার আমার পরিচিত তাই আমার কাছ থেকে দ্বিগুণের কিছু কম নিয়েছে। কিন্তু আমি থাকতে থাকতেই আরেকজনের কাছে টিএসপি সার ৫২ টাকা কেজি দারে বিক্রি করল।’

    তরিকুল ইসলাম নামে এক সার বিক্রেতা বলেন, ‘সার পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিনই সারের দাম ওঠানামা করছে। আমাদের বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। তাই সরকারি নির্ধারিত দামে সার বিক্রি করতে পারছি না।’
    যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার নারাঙ্গালী গ্রামের কৃষক আবদুল আলিমও সম্প্রতি জানিয়েছেন, চার বিঘা আমন জমির জন্য তিনি খোলাবাজার থেকে ৫২ টাকা কেজি দরে ২০ কেজি টিএসপি কিনেছেন।
    হিসাব বলছে, এভাবে দ্বিগুন দরে সার বিক্রির মাধ্যমে যশোরের সার সিন্ডিকেট কৃষকের কাছ থেকে চলতি আমন মৌসুমেই সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার বেশি লুটে নিচ্ছে।
    তবে দায়িত্বশীল কৃষি কর্মকর্তারা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির বিষয়টি শিকার না করলেও মাঠ পর্যায়ের একাধিক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানিয়েছেন তারা নিজেরাও কৃষকদের তোপের মুখে পড়ছেন।
    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যশোর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব জমির জন্য সারের মোট চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ২৩৭ মেট্রিক টন।

    এর মধ্যে ইউরিয়া সারের চাহিদা ৬৮ হাজার ৯০৩ মেট্রিক টন, টিএসপি ১৭ হাজার ৫৯৮ মেট্রিক টন, ডিএপি ৪৩ হাজার ২২৫ মেট্রিক টন এবং এমওপি ২৫ হাজার ৫১১ মেট্রিক টন।
    কৃষক পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত দামে এই পরিমাণ সারের মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩৭৫ কোটি ৩৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এর মধ্যে ইউরিয়ার মূল্য ১৮৬ কোটি ৩ লাখ ৮১ হাজার টাকা, টিএসপি ৪৭ কোটি ৫১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা, ডিএপি ৯০ কোটি ৭৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং এমওপি ৫১ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার টাকা।
    সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় দ্বিগুণ দামে এসব সার বিক্রি করা হলে কৃষকদের কাছ থেকে মোট অর্থ আদায়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৭৫০ কোটি ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ সরকারি দামের তুলনায় কৃষকদের অতিরিক্ত গুনতে হবে ৩৭৫ কোটি ৩৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা।

    সর্বশেষ পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২৫ আগস্ট পর্যন্ত চলতি মাসের বরাদ্দ থেকে যশোরে ইউরিয়া উত্তোলন করা হয়েছে ৮ হাজার ৫৩৪ মেট্রিক টন ইউরিয়া, টিএসপি ২ হাজার ৮১০ টন, ডিএপি ২ হাজার ১৪০ টন এবং এমওপি ২ হাজার ২৩১ টন।
    একই তারিখে জেলার গুদামগুলোতে মজুত ছিল ইউরিয়া ৩ হাজার ৭৩৫ মেট্রিক টন, টিএসপি ১ হাজার ১৪৮ টন, ডিএপি ১ হাজার ২৯ টন এবং এমওপি ১ হাজার ৪১৩ টন। চার ধরনের সারের গুদামজাত মজুতের পরিমাণ দাঁড়ায় মোট ৭ হাজার ৪২৫ মেট্রিক টন।

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যশোর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন দুই সপ্তাহ আগে দৈনিক রানারকে জানিয়েছিলেন, তাদের কাছে পর্যাপ্ত সার মজুদ আছে। বাড়তি দামে সার বিক্রির সুযোগ নেই। কেউ বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
    তবে বর্তমানে প্রকাশ্যেই প্রায় দ্বিগুন দামে বিক্রি হচ্ছে সার। এব্যাপারে তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পাঠালেও তিনি কোন জবাব দেননি।

  • বীজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঝুঁকিতে কৃষি

    বীজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঝুঁকিতে কৃষি

    একসময় কৃষকের গোলাভরা ধানের পাশে মাটির মটকা, বাঁশের গোলা কিংবা ঘরের চালে যত্ন করে রাখা থাকত পরের মৌসুমের বীজ। ভালো ফসল থেকে বাছাই করা সেই বীজেই শুরু হতো নতুন মৌসুমের চাষ। বীজ ছিল কৃষকের নিজের সম্পদ, নিজের নিরাপত্তা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। কৃষকের ঘরের বীজের জায়গা নিয়েছে বাজারের প্যাকেট। নিজের বীজ হারিয়ে কৃষক ক্রমেই হয়ে পড়ছেন বাজারনির্ভর।

    ঝিনাইদহের মাঠে এখন সেই পরিবর্তনের স্পষ্ট চিত্র দেখা যাচ্ছে। কৃষকের হাতে জমি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই পরবর্তী মৌসুমের বীজের নিয়ন্ত্রণ আর তার হাতে নেই। সরকারি সরবরাহ সীমিত হওয়ায় চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে হচ্ছে বেসরকারি কোম্পানি ও স্থানীয় বাজার থেকে। এতে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে কোনো কারণে বাজারে বীজ সরবরাহ ব্যাহত হলে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন কৃষকেরা। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষির বৈচিত্র্য ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও।
    চড়া দামে বেসরকারি বীজ
    শৈলকুপা উপজেলার হাজরামিনা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক হাশেম হোসেন চলতি মৌসুমে ৩৫ বিঘা জমিতে আমন ধান রোপণ করেছেন। সরকারি বীজ পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অনুমোদিত ডিলারের কাছে ঘুরেও প্রত্যাশিত বীজ পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাজার থেকে চড়া দামে বেসরকারি কোম্পানির প্যাকেটজাত হাইব্রিড বীজ কিনে বীজতলায় দেন। সেই বীজ থেকে উৎপাদিত চারাই এখন তাঁর জমিতে রোপণ করা হয়েছে।
    একই উপজেলার কাঁচেরকোল গ্রামের কৃষক মসলেম উদ্দিনের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। তাঁর হাতে পাওয়া বীজের একটি অংশে অঙ্কুরোদগম হয়নি। তিনি বলেন, ‘একসময় ধান কাটার পর ভালো ধান আলাদা করে বীজ হিসেবে সংরক্ষণ করা হতো। মাটির মটকা কিংবা গোলায় যত্ন করে রাখা সেই বীজ দিয়েই পরের বছর চাষ করা সম্ভব ছিল। এখন সেই নিশ্চয়তা নেই। প্রতি মৌসুমে বীজের জন্য বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।’
    বাড়ছে বেসরকারি নির্ভরতা
    জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ঝিনাইদহে মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩৫ হেক্টর। এর মধ্যে বিএডিসি উফশী বীজের প্রায় ১৯ শতাংশ এবং হাইব্রিড বীজের প্রায় ১ শতাংশ সরবরাহ করে। অর্থাৎ বীজের চাহিদার বড় অংশই পূরণ হচ্ছে বেসরকারি কোম্পানি ও বাজারের মাধ্যমে।
    কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ বছর আগে জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষক নিজেদের উৎপাদিত ফসল থেকে পরবর্তী মৌসুমের বীজ সংরক্ষণ করতেন। বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। অধিকাংশ কৃষকই বিভিন্ন কোম্পানি ও বাজার থেকে বীজ কিনে চাষ করছেন।
    ঝিনাইদহের বীজের বাজারে লাল তীর, এসিআই, বায়ারসহ বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির বীজ রয়েছে। সরকারি সরবরাহ চাহিদার তুলনায় সীমিত হওয়ায় কৃষকদের বড় একটি অংশকে বেসরকারি বাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
    প্রতি মৌসুমে নতুন বীজ
    উচ্চফলনের আশায় কৃষকের মধ্যে হাইব্রিড বীজের ব্যবহারও বাড়ছে। কিন্তু হাইব্রিড বীজের ক্ষেত্রে উৎপাদিত ফসল থেকে পরবর্তী মৌসুমে একই মান ও বৈশিষ্ট্যের বীজ সংরক্ষণ করে ব্যবহার করা যায় না। ফলে প্রতি মৌসুমেই নতুন বীজ কেনার প্রয়োজন হয়।
    এতে কৃষকের বীজের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ আরও কমে যাচ্ছে। কৃষকের হাতে জমি থাকলেও চাষের অন্যতম প্রধান উপকরণ বীজের জন্য তাঁকে নির্ভর করতে হচ্ছে বাজারের ওপর।
    শৈলকুপার দামুকদিয়া গ্রামের কৃষক মাসুদ মোল্লা বলেন, ‘আগে ধান কাটার সময় ভালো ধান আলাদা করে রেখে দিতাম। পরের মৌসুমে ওই ধান থেকেই বীজ তৈরি করে চাষ করতাম। এখন কোম্পানির বীজ কিনতে হয়। নিজের বীজ রাখার অভ্যাসও অনেকটা চলে গেছে।’
    হারিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় জাত
    বীজের বাজারনির্ভরতার পাশাপাশি ঝিনাইদহে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী জাতের বীজ হারিয়ে যাওয়া নিয়ে।
    একসময় বিভিন্ন মৌসুমে ধানের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি, ডালের ২২ থেকে ২৫টি এবং সবজির প্রায় ৩০টি জাতের চাষ হতো। বর্তমানে ধানের জাত বেড়ে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি, ডালের ৩২ থেকে ৩৫টি এবং সবজির জাত ৫৫ থেকে ৬৫টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে জাতের সংখ্যা বাড়লেও অনেক স্থানীয় জাতের চাষ ও সংরক্ষণ কমে গেছে।
    ঝিঙাশাইল, লতিশাইল, কাটারিভোগ, রাজাশাইল, দুধকলম, বাঁশফুল, রূপশাইল, দিঘাসহ বিভিন্ন স্থানীয় ধানের জাত বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায়। একইভাবে দেশি খেসারি, স্থানীয় লাল মুগ, মাষকলাই, মাঘী সরিষা, তিলসহ বিভিন্ন স্থানীয় সবজির জাতও আগের তুলনায় কম চাষ হচ্ছে।

    কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় জাত শুধু ঐতিহ্যের অংশ নয়; এগুলো কৃষকের ঝুঁকি মোকাবিলারও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একাধিক জাতের বীজ কৃষকের হাতে থাকলে কোনো একটি জাত রোগ, পোকামাকড় বা বৈরী আবহাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য জাত দিয়ে উৎপাদন ধরে রাখার সুযোগ থাকে। বিপরীতে সীমিত কয়েকটি বাণিজ্যিক জাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কৃষিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
    মনোহরপুর গ্রামের কৃষক সিজার জিকরুল বলেন, ‘বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির বীজ পাওয়া যায়। বিক্রেতারা ভালো ফলনের কথা বলে বীজ দেন। কিন্তু বীজ ভালো না হলে আমাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। বীজের সঙ্গে সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমের খরচও জড়িয়ে থাকে।’

    কালীগঞ্জের কৃষক বসির আহমেদ বলেন, ‘নিজের ঘরে বীজ মজুদ থাকলে চাষাবাদের খরচ অনেকটা কমে যায়। তাতে কৃষক লাভবান হন। কিন্তু বর্তমানে তা হচ্ছে না। বীজ কিনতে গিয়ে লাভের অংশ কমে যাচ্ছে।’
    বীজ ব্যাংকের প্রয়োজন বাড়ছে
    শৈলকুপার কাঁচেরকোল গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমানের অভিজ্ঞতাতেও সরকারি বীজ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা উঠে এসেছে। তাঁর ভাষ্য, কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী দেখে নতুন জাতের ধান চাষ করে ভালো ফলন পাওয়ার পর পরের বছর সেই জাতের বীজ সংগ্রহ করতে গিয়ে সরকারি বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা শুনতে হয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে বেশি দামে বেসরকারি বীজ কিনতে হয়েছে।
    মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, কৃষক পর্যায়ে মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের উদ্যোগ থাকলেও এর আওতা এখনো সীমিত। ফলে অধিকাংশ কৃষক এ সুবিধার বাইরে রয়েছেন।
    এ অবস্থায় ইউনিয়ন পর্যায়ে বীজ ব্যাংক গড়ে তোলা, কৃষকদের বিজ্ঞানসম্মতভাবে বীজ সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্থানীয় জাতের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং বিএডিসির উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জোরালো হচ্ছে।

    ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কামরুজ্জামান বলেন, ‘কৃষকদের মানসম্মত বীজ ব্যবহারের পাশাপাশি নিজেদের উৎপাদিত ভালো ফসল থেকে বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
    তিনি বলেন, ‘ভালো ও রোগমুক্ত জমি থেকে উপযুক্ত সময়ে বীজ সংগ্রহ করে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে কৃষক পরবর্তী মৌসুমে নিজের বীজ ব্যবহার করতে পারবেন। এতে একদিকে বীজ কেনার খরচ কমবে, অন্যদিকে প্রয়োজনের সময় বাজারের ওপর নির্ভরশীলতাও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।’

    কৃষকদের মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে উন্নত জাতের ফসলের সঙ্গে কৃষকদের পরিচয় করানো হচ্ছে। ভালো ফলন পাওয়া গেলে কৃষকদের নিজেদের জমির উপযোগী বীজ সংরক্ষণে উৎসাহিত করা হচ্ছে।’
    কামরুজ্জামান আরও বলেন, ‘বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু বীজ সংগ্রহ করলেই হবে না, সেটি ভালোভাবে শুকানো, রোগমুক্ত রাখা এবং উপযুক্ত পরিবেশে সংরক্ষণ করতে হবে। কৃষকদের এ বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।’

  • কেঁচো সারে স্বাবলম্বী কুষ্টিয়ার শত নারী

    কেঁচো সারে স্বাবলম্বী কুষ্টিয়ার শত নারী

    কুষ্টিয়ার বিত্তিপাড়া গ্রামের শতাধিক নারী বাড়ির আঙিনায় কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করে আয় করছেন। নিজেদের জমি ও বাড়ির আঙিনায় উৎপাদিত সবজিতে এই সার ব্যবহারের পাশাপাশি বাড়তি সার বিক্রি করছেন তাঁরা। কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতায় একজনের হাত ধরে শুরু হওয়া উদ্যোগটি এখন ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের শতাধিক নারীর মধ্যে।

    কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ধরে জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে বিত্তিপাড়া বাজার। সেখান থেকে পূর্ব দিকে আধা কিলোমিটার গেলেই বিত্তিপাড়া গ্রাম। গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির আঙিনায় সারি করে রাখা সিমেন্টের চাকে তৈরি হচ্ছে ভার্মি কম্পোস্ট। গোবর, সবজির উচ্ছিষ্ট ও কলাগাছের বাকল ব্যবহার করে তৈরি এ সার নিজেদের ফসল উৎপাদনে ব্যবহারের পাশাপাশি বিক্রি করছেন নারীরা।
    বিত্তিপাড়া গ্রামে কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন গৃহবধূ জাহানারা খাতুন। ২০২১ সালে বাড়ির আঙিনায় দুটি সিমেন্টের চাক বসিয়ে তিনি গোবর ও কেঁচো দিয়ে জৈব সার তৈরি শুরু করেন। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহযোগিতাও নেন তিনি।

    এখন তাঁর বাড়ির পেছনের টিনশেডে ৪০টি এবং বাড়ির সামনে আরও ১০টি চাক রয়েছে। নিজের গরুর গোবরের পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে গোবর সংগ্রহ করেন। এর সঙ্গে সবজির উচ্ছিষ্ট ও কলাগাছের বাকল মিশিয়ে তৈরি করেন সার।
    জাহানারা খাতুন বলেন, ‘কেঁচো সারেই আমাদের জীবন বদলে গেছে। কয়েক বছর আগেও বাড়িতে ছাপড়া ছিল। সেখানে দালান তুলেছি। গরু-ছাগল পালছি। সামান্য জমি আছে। সেখানে যা ধান হয়, তা দিয়ে আমাদের চলে যায়। তা ছাড়া বাড়ির আঙিনায় শাকসবজি ফলাই। সরকারি নানা সহযোগিতা পেয়ে এতদূর এসেছি। আমার দেখাদেখি গ্রামের অনেক নারী এখন জৈব সার তৈরি করছেন। তারাও স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।’
    জাহানারা খাতুন জানান, প্রতিটি সিমেন্টের চাক ১০০ থেকে ১৫০ টাকা দিয়ে কেনা হয়। এতে গোবর, সবজির উচ্ছিষ্ট ও কলাগাছের বাকল দেওয়ার পর কেঁচো ছাড়া হয়। ২০ থেকে ২৫ দিন চাক ঢেকে রাখার পর তৈরি হয় জৈব সার। এ সময় মাঝে মাঝে পানি ছিটিয়ে দিতে হয়।

    প্রতিটি চাক থেকে প্রায় ৩০ কেজি সার পাওয়া যায়। বর্তমানে মাসে প্রায় ৪০ মণ সার উৎপাদন করছেন জাহানারা। প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে বিক্রি করলে মাসে প্রায় ২৪ হাজার টাকার সার উৎপাদন হয়। এর মধ্যে দুই থেকে তিন মণ নিজেদের জমিতে ব্যবহার করেন। বাকিটা বিক্রি করেন।
    বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তাঁর বাড়ি থেকে সার কিনে নিয়ে যান।
    বিত্তিপাড়া গ্রামের নারীরা শুধু সার বিক্রি করছেন না, নিজেদের উৎপাদিত সার দিয়ে বাড়ির আঙিনা ও কৃষিজমিতে সবজি চাষও করছেন।
    রিনা পারভীন ও নিলুফা ইয়াসমীন বলেন, ‘বিত্তিপাড়া গ্রামে সবজি ও অন্যান্য ফসলের আবাদ হয়। জৈব সার ব্যবহার করে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের চেষ্টা করছেন নারীরা। প্রথমত নিজেদের ফসলের জমিতে এই সার ব্যবহার করা হয়। বাড়তি সার বিক্রি করে কিছু টাকা আয় হয়। সংসারের কাজে লাগে।’

    মনিরা খাতুন বলেন, গ্রামের বাসিন্দারা আগের তুলনায় কম রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন। জৈব সার দিয়ে বাড়ির আঙিনায় মরিচ, বেগুনসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদনের পাশাপাশি ধান, ভুট্টা ও শসার ক্ষেতেও এই সার ব্যবহার করা হচ্ছে।
    উদ্যোক্তা নারীরা জানান, জৈব সার বিক্রির অর্থ দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া, স্কুলের পোশাকসহ পরিবারের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাচ্ছেন তাঁরা। সার তৈরিতে স্থানীয়ভাবে পাওয়া উপকরণ ব্যবহার হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও তুলনামূলক কম।

    বিত্তিপাড়া ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশরাফ সিদ্দিকী বলেন, ‘পুরুষেরা অনেক সময় বাড়ির বাইরে থাকেন। কিন্তু নারীরা বাড়িতে থেকে নানা কাজ করেন। তাই জৈব সার উৎপাদনের জন্য নারীদের বেছে নেওয়া হয়েছে। আর্থিকভাবে সুবিধা পাওয়ায় নারীরা এখন নিজেরাই জৈব সার উৎপাদন করতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এখন তারা এই সারের উপকারিতা বিষয়ে সচেতন।’
    সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুপালী খাতুন বলেন, ‘আমি একজন নারী। এতে নারীদের সঙ্গে মিশতে সহজ হয়েছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে আমি ও আমার টিমের সদস্যরা নারীদের কী প্রয়োজন, সেটা জেনে মেটানোর চেষ্টা করছি। পাশাপাশি নারীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই গ্রামে একজন থেকে শুরু করে এখন শতাধিক নারী জৈব সার উৎপাদন করছেন। এটাই আমাদের জন্য বড় সাফল্য।’

    তিনি আরও বলেন, ‘প্রণোদনা ও সহযোগিতা দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। প্রায় প্রতি বাড়িতে বস্তায় সবজি উৎপাদনের জন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বস্তা ও বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলের গাছ বিতরণ করা হচ্ছে। নারীরা যাতে জৈব সার ব্যবহার করে নিরাপদ সবজি উৎপাদন করতে পারেন এবং এই সার বিক্রি করে বাড়তি আয় করতে পারেন, সে জন্য আমাদের এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’
    জাহানারা খাতুনের শুরু করা উদ্যোগ এখন বিত্তিপাড়া গ্রামের শতাধিক নারীর বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করেছে। নিজেদের ফসল উৎপাদনে জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত সার বিক্রি করে সংসারে অর্থ যোগ করছেন তাঁরা। কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এ উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

  • খরা ও অতিবৃষ্টি জয় করে আমন চাষে সফলতার উপায়

    খরা ও অতিবৃষ্টি জয় করে আমন চাষে সফলতার উপায়

    আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে আমন চাষে এখন কখনো খরা, আবার কখনো অতিবৃষ্টির মুখে পড়তে হচ্ছে কৃষককে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের সঙ্গে বাড়ছে রোগ-পোকার আক্রমণও। ফলে ভালো ফলনের জন্য শুধু জমি ও বীজ প্রস্তুত করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উপযোগী জাত নির্বাচন, সুষম সার প্রয়োগ, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ। খরা ও অতিবৃষ্টির মতো প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আমনের কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে কৃষকের করণীয় নিয়ে রানার কৃষির নিয়মিত আয়োজনে পরামর্শ দিয়েছেন যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইন।

    দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম শস্যভাণ্ডার যশোর। এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির প্রাণ রোপা আমন ধান। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক খরা, অতিবৃষ্টি, পোকামাকড়ের আক্রমণ ও সুষম সারের অভাবে অনেক কৃষকই কাক্সিক্ষত ফলন পাচ্ছেন না। জলবায়ুর পরিবর্তনকে মাথায় রেখে চলতি মৌসুমে কিছু কৌশল মেনে চললে খরা ও অতিবৃষ্টি দুটোই মোকাবিলা করে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।
    অনাবৃষ্টি ও সম্পূরক সেচ
    আমন ধানের জীবনচক্রে দুটি সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো চারা রোপণের পর গাছের শিকড় স্থাপনের সময়, অন্যটি কাইচ থোড় আসার সময়। এ দুই সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে জমি শুকিয়ে গিয়ে ফলন কমে যেতে পারে।
    এ সময় জমি কোনোভাবেই ফেটে যাওয়া পর্যন্ত শুকাতে দেওয়া যাবে না। বৃষ্টি না হলে দ্রুত হালকা সম্পূরক সেচ দিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ২-৩ ইঞ্চি পানি ধরে রাখা যেতে পারে। অল্প পানিতে বারবার সেচ দিলে পানির অপচয়ও কম হবে।
    মাজরা ও পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ
    ইউরিয়া সার বেশি দিলে ধানগাছ অতিরিক্ত সবুজ ও কোমল হয়ে যায়। এতে মাজরা ও পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ বাড়তে পারে।
    এ ক্ষেত্রে প্রথমেই পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। একে বলা হয় ‘পার্চিং’। প্রতি বিঘা জমিতে ৪-৫টি উঁচু বাঁশের কঞ্চি বা গাছের ডাল পুঁতে দিতে হবে। পাখিরা এসব কঞ্চিতে বসে মাঠের ক্ষতিকর পোকা খাওয়ার সুযোগ পাবে।
    পোকার আক্রমণ বেশি হলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওষুধের সঠিক মাত্রা ও প্রয়োগের সময় মেনে চলা জরুরি। অপ্রয়োজনে কীটনাশক ব্যবহার করা উচিত নয়।
    খোল পচা ও পাতা পোড়া রোগ
    বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে এবং অপরিকল্পিতভাবে ইউরিয়া প্রয়োগ করলে ধানে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। খোল পচা ও পাতা পোড়া রোগের ক্ষেত্রেও সুষম সার ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।
    শুধু ইউরিয়ার ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পটাশ, জিংক ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান দিতে হবে। রোগের লক্ষণ দেখা দিলে রোগ শনাক্ত করে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে।
    উচ্চ ফলনের জন্য সঠিক জাত নির্বাচন
    সময় বদলেছে, তাই জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে হবে। জমির ধরন, পানি ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় আবহাওয়া এবং ফসল কাটার সময় বিবেচনা করে জাত নির্বাচন করা প্রয়োজন।
    উচ্চফলনশীল জাতের মধ্যে ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭৫ ও ব্রি ধান৯০ উল্লেখযোগ্য। খরা ও প্রতিকূলতা সহনশীল জাতের মধ্যে রয়েছে ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান১০৩, বিনাধান-১৭, বিনাধান-২০, বিনাধান-২২ ও বিনাধান-২৩।
    এসব জাতের একটি বড় সুবিধা হলো অনেক জাত তুলনামূলকভাবে দ্রুত পাকে। ফলে আমন কাটার পর দ্রুত সরিষা, শাকসবজিসহ বিভিন্ন রবি ফসল চাষের সুযোগ পাওয়া যায়। একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষ করা গেলে কৃষকের আয়ও বাড়তে পারে।
    সুষম সার ও মাটির স্বাস্থ্য
    শুধু রাসায়নিক সার ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফলন ধরে রাখা সম্ভব নয়। মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
    জমি তৈরির সময় গোবর বা অন্যান্য জৈব সার ব্যবহার করা যেতে পারে। বোরো ধান কাটার পর জমিতে ধৈঞ্চা বুনে ৪৫-৫০ দিন পর তা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া যায়। এটি সবুজ সার হিসেবে মাটির জৈব পদার্থ ও উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করে। এর ফলে রাসায়নিক সারের প্রয়োজনও কমতে পারে।
    শেষ চাষের সময় মাটির পরীক্ষা ও ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও জিংক সালফেট প্রয়োগ করতে হবে।
    ইউরিয়া সার একসঙ্গে প্রয়োগ করা যাবে না। কয়েক কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। সাধারণভাবেÑপ্রথম কিস্তি: চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পর। দ্বিতীয় কিস্তি: কাইচ থোড় আসার ১৫-২০ দিন আগে। তৃতীয় কিস্তি: থোড় বের হওয়ার সময়। তবে জমির উর্বরতা, ধানের জাত ও স্থানীয় কৃষি সুপারিশ অনুযায়ী সারের মাত্রা নির্ধারণ করা উচিত।
    বিজ্ঞানসম্মত পানি ব্যবস্থাপনা
    কাইচ থোড় আসা থেকে দানায় দুধ আসা পর্যন্ত সময়ে ধানগাছের পানির চাহিদা বেশি থাকে। এ সময় জমিতে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি নিশ্চিত করতে হবে।
    তবে জমিতে সবসময় অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা ঠিক নয়। অতিবৃষ্টির সময় দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। জমিতে পানি জমে থাকলে ধানের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে।
    ধান কাটার ১০-১২ দিন আগে জমি থেকে পানি বের করে দেওয়া ভালো। এতে জমি কিছুটা শুকিয়ে আসে, ধান কাটতে সুবিধা হয় এবং ফসল সংগ্রহের সময়ও কমে।
    নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ
    আমন চাষে সফলতার অন্যতম শর্ত হলো নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ। আগাছা, পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে কম খরচে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
    তাই কৃষকদের নিয়মিত জমি দেখতে হবে। পোকামাকড় দেখা দিলেই অযথা কীটনাশক ব্যবহার না করে প্রথমে পোকার ধরন ও আক্রমণের মাত্রা শনাক্ত করতে হবে। প্রয়োজন হলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে হবে।
    সময়মতো আগাছা দমন, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা, পার্চিং, প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ, অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন এবং নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ—এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও আমনের ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।

    কৃষক ভাই ও বোনেরা, আমন ধানের জমিতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত আপনার এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। সমস্যার কথা জানান এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিন।
    সবাই ভালো থাকুন।

  • চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় নিজ দলীয় কর্মীর হাতে যুবদল নেতা খুন!

    চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় নিজ দলীয় কর্মীর হাতে যুবদল নেতা খুন!

    চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁওয়ে সড়কে ভাসমান ভ্যান বসানো ও চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে ফজলুল আমিন নামে এক যুবদল নেতাকে মারধরের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে।

    শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে চান্দগাঁও থানার ওমর আলী মাতব্বর বাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

    স্বজনদের অভিযোগ, ভ্যান বসানো চাঁদা নেওয়ার প্রতিবাদ করায় নিজ দলের কর্মী হিসেবে পরিচিত শাহজাহান ও তার ছেলে সিফাতের সঙ্গে ফজলুল আমিনের বিরোধ হয়। একপর্যায়ে তাকে ধাক্কা ও ঘুষি মারা হলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

    নিহত ফজলুল আমিন ৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। অভিযুক্ত শাহাজাহান চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির এক সদস্যের অনুসারী এবং কৃষক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে।

    এ ঘটনায় অভিযুক্ত মো. শাহজাহান (৪৫) ও তার ছেলে সিফাতকে (২০) আসামি করে চান্দগাঁও থানায় মামলা করেছেন নিহতের পরিবার।

    স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকায় ভাসমান ভ্যান বসানো নিয়ে আগে থেকেই বিরোধ ছিল। স্থানীয়দের বৈঠকে নির্দিষ্ট স্থানে ভ্যান না বসানোর সিদ্ধান্ত হলেও শুক্রবার সেখানে আবার ভ্যান বসানো হলে ফজলুল আমিন বাধা দেন। এ নিয়ে শাহজাহানের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। ঘটনার আগের দিন ভ্যান সরিয়ে দেওয়া হলেও পরে আবার তা বসানো হয়। ভ্যান বসানোর পেছনে প্রভাবশালী এক নেতার নির্দেশের কথা বলা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

    ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক যুবক বলেন, ‘চলাচলের রাস্তায় ভ্যান না বসাতে বলেন। এ নিয়ে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে তাকে ঘুষি মারা হলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। আমরা তাকে হাসপাতালে পাঠাই। মারামারি বেশি হয়নি, তবে ঘুষির আঘাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে জানতে পারি, হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়েছে।’

    ৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ড যুবদলের জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘ভাসমান ভ্যান থেকে চাঁদা আদায়ের বিষয়টি নিয়ে ফজল আমিন শাহজাহানের কাছে জানতে চেয়েছিল বলে শুনেছি। গরিব মানুষ ভাসমান দোকান বসিয়ে জীবিকা চালায়, তাদের কাছ থেকে কেন চাঁদা নেওয়া হচ্ছে এমন প্রশ্নের পর তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। পরে শাহজাহান ফজল আমিনকে ধাক্কা ও ঘুষি মারে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এরপর তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’

    নিহতের ছেলে বলেন, ‘আমার বাবা সারাজীবন এলাকার মানুষের জন্য কাজ করেছেন। আমরা চাই, তার মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং যারা জড়িত তাদের বিচার হোক। ৫ আগস্টের পর এলাকায় নতুন করে নেতৃত্বে আসা কিছু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের বিষয়ে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।’

    চান্দগাঁও থানার ওসি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে। মামলায় আরও ৫ থেকে ৭ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং বিরোধের প্রকৃত কারণ কী, তা তদন্ত করা হচ্ছে।’

    এদিকে, ফজলুল আমিনের মরদেহ এলাকায় আনার পর স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিজ দলের কর্মীর হাতে তার মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্বজন ও স্থানীয়রা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।

  • রাতে খুলতে পারে কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট

    রাতে খুলতে পারে কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট

    কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছায় উজান ও ভাটি অঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণে আজ শনিবার রাত ১০টা থেকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্পিলওয়ের ১৬টি জলকপাট খুলে পানি নিষ্কাশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আজ শনিবার দুপুরে এক বিজ্ঞপ্তিতে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানায়।

    কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুর ২টায় কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা ১০৫ দশমিক ৬৪ ফুট এমএসএল (মিন সি লেভেল) রেকর্ড করা হয়েছে। হ্রদের সর্বোচ্চ পানি ধারণক্ষমতা ১০৯ ফুট এমএসএল।

    বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, হ্রদের পানির সমতল বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছানোয় উজান ও ভাটি এলাকার পানি ব্যবস্থাপনা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষে স্পিলওয়ের ১৬টি গেট খুলে পানি নিষ্কাশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আজ শনিবার রাত ১০টা থেকে গেটগুলো ৬ ইঞ্চি পরিমাণ উঠিয়ে পানি ছাড়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

    প্রাথমিকভাবে ১৬টি জলকপাট ৬ ইঞ্চি করে খুলে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশন করা হবে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিট চালু রয়েছে। এসব ইউনিটের মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে আরও প্রায় ৩২ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে।

    কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান জানান, হ্রদের পানির উচ্চতা, বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে আসা পানির প্রবাহ প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বৃষ্টিপাত ও পানির প্রবাহের পরিস্থিতি বিবেচনায় স্পিলওয়ে খোলার সময় এবং পানি ছাড়ার পরিমাণ বাড়ানো হতে পারে।

  • ডিসির গাছের চারা বিতরণ

    ডিসির গাছের চারা বিতরণ

    নেত্রকোনার মদনে সরকার ঘোষিত পাঁচ বছর মেয়াদী দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের মাঝে গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে। শনিবার সকালে উপজেলা পরিষদ চত্বরে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

    অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের হাতে গাছের চারা তুলে দেন নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মুশফিকুর রহমান।

    প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। নতুন প্রজন্মকে বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে গড়ে তুলতেই শিক্ষার্থীদের মাঝে এই চারা বিতরণ করা হচ্ছে।

    অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাদির হোসেন শামীম, মদন থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন করিম, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরসহ উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা শেষে অতিথিরা উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিভিন্ন ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করেন।

  • সপরিবারে আত্মগোপনে থাকা স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু আটক

    সপরিবারে আত্মগোপনে থাকা স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু আটক

    চাঁদপুরের আত্মগোপনে থাকা স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাসকে চট্টগ্রামের পটিয়া এলাকা থেকে আটক করেছে চাঁদপুর সদর মডেল থানা পুলিশ। এ সময় পিন্টু দাসের স্ত্রী রিমি ও ২ ছেলে তার সঙ্গে ছিলেন। শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে অভিযান চালিয়ে সপরিবারে তাকে আটক করা হয়। চাঁদপুর সদর মডেল থানার এসআই কালামের নেতৃত্বে পুলিশ অভিযানটি পরিচালনা করে।

    জানা যায়, নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু আত্মগোপনে ছিলেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ তার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে চট্টগ্রামের পটিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে।

    চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, সিসিটিভিতে ট্রাকে মালামাল তোলার ফুটেজের সূত্র ধরে আমরা পিন্টু দাসকে সপরিবারে উদ্ধার করতে সক্ষম হই। এর আগে ২২ আগস্ট তিনি নিখোঁজ হন বলে আমরা জানতে পারি। পিন্টু দাসের সঙ্গে তার স্ত্রী রিমি ও দুই ছেলেও রয়েছেন।

    সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কালাম গণমাধ্যমকে বলেন, দুই দিন অভিযানের পর অবশেষে সফল। মূলত ঋণের চাপেই তিনি সপরিবারে আত্মগোপনে যান। আটকের পর তাকে চাঁদপুরে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া চলছে। এ ঘটনায় বিস্তারিত তথ্যের জন্য পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

  • ‘স্যার, কসম করেন’, গ্রেপ্তারের আগে পুলিশের সাথে সন্ত্রাসী মোবারকের কথোপকথন

    ‘স্যার, কসম করেন’, গ্রেপ্তারের আগে পুলিশের সাথে সন্ত্রাসী মোবারকের কথোপকথন

    ঘরের ফলস ছাদে অস্ত্রসহ লুকিয়ে ছিলেন ‘সন্ত্রাসী’ মোবারক হোসেন ওরফে গলা কাটা মোবারক। দরজার বাইরে ছিল পুলিশ। ঘরে পুলিশ সদস্যরা ঢোকার চেষ্টা করতেই গুলি ছুড়তে থাকেন মোবারক। পরপর ছয়টি গুলি ছোড়েন তিনি। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। অভিযানের একপর্যায়ে মোবারককে প্রাণে বাঁচতে আত্মসমর্পণ করতে বলে পুলিশ। জবাবে মোবারক বলেন, ধরা দেওয়ার আগে তিনি নিজের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চান।

    গত বুধবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর এলাকায় ‘সন্ত্রাসী’ মোবারককে ধরতে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানের সময় মোবারকের সঙ্গে পুলিশের সদস্যদের কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

    ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের এক সদস্য মোবারকের উদ্দেশে বলছেন,‘জীবন বাঁচাতে চাইলে অস্ত্র ফেলে দে। আমাদের হাতে ধরা দে। আমরা জীবন বাঁচাব। আমরা খবর পাইছি, তোরে বাইরে কেউ মারার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা তোরে বাঁচানোর জন্য আসছি।’

    তখন জবাবে মোবারক বলেন, ‘অস্ত্র দিলে সমস্যা হবে।’ এরপর পুলিশের ওই সদস্য আবার বলেন, ‘মোবারক, তোর ভালোর জন্য আসছি। তুই সারেন্ডার কর। তোর বাঁচার সুযোগ নেই। তোকে আমরা বাঁচানোর জন্য আসছি। তুই অস্ত্র ফেল, সময় নষ্ট করিস না। বের হওয়ার এখান থেকে আর কোনো সুযোগ নেই। পুলিশ বর্তমানে কাউকে মারে না।’

    গ্রেপ্তারের আগে অভিযানে থাকা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে ফলস ছাদে লুকিয়ে থাকা মোবারকের কথোপকথন চলছে ছবি: ভিডিও থেকে

    এরপরও মোবারক বলেন, ‘অস্ত্র ফেলব না।’ তখন ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশের একজন বলেন, ‘অস্ত্র দিলে কেউ মারবে না তোকে। কেন মারব? আমি ওসি বলছি, অস্ত্রটা দিয়ে দে।’ মোবারক তখন পুলিশকে সরে যেতে বলেন।

    জবাবে পুলিশ সদস্যরা বলেন, ‘না, যাব না। মোবারক, অস্ত্রটা দে। অস্ত্রটা ফেল। নিচে নাম, আগে নিচে নাম।’ একপর্যায়ে মোবারক বলেন, ‘আপনারা কসম করেন, আমাকে কিছু করবেন না।’

    পুলিশ সদস্যরা তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘কিছু করব না। খোদার কসম, কিছু করব না। এই মুরুব্বির (ঘরে থাকা বৃদ্ধ) কাছে অস্ত্র দে, চিন্তা থাকবে না। মুরুব্বির কাছে অস্ত্রটা দে।’ পুলিশ সদস্যদের একজন তখন বলেন, ‘আমাদের কাছে কিন্তু চায়না রাইফেল, এসএমজি—সবকিছুই আছে। মোবারক, ইমন (ডেভিড ইমন) গ্রেপ্তার হয়েছে। ইমনের চেয়ে তুই বড় সন্ত্রাসী না।’

    জবাবে মোবারক বলেন, ‘স্যার, আমি একটু পরে বলব স্যার। একটা অনুরোধ…আপনারা কসম করেন, আমাকে কিছু করবেন না।’ তখন এক পুলিশ সদস্য আবারও বলেন, ‘কসম করলাম তো। খোদার কসম, কিছু করব না। কিছু করব না। অস্ত্র ফেলে দে। খোদার কসম, কিছু করব না আমরা। তোর কিচ্ছু হবে না।’

    জবাবে মোবারককে বলতে শোনা যায়, ‘থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ, ভালো হইছে।’ এরপর পুলিশের ওই সদস্য ঘরে থাকা বৃদ্ধকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মুরুব্বি, অস্ত্রটা নিয়ে আসেন। মুরুব্বি, অস্ত্র নিয়ে নেন।’

    মোবারকের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম নগরে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে। তিনি বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী বলে জানিয়েছে পুলিশ।

    মোবারকের সঙ্গে তাঁর তিন সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে ৩টি পিস্তল, ২৩ রাউন্ড পিস্তলের গুলি ও ৪টি শটগানের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। মোবারককে গ্রেপ্তারের অভিযানে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মোবারক অভিযানের সময় পুলিশ সদস্যদের গুলি ছুড়তে থাকেন। মোবারকের ছোড়া গুলিতে তিনি নিজেসহ পাঁচজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত মোবারককে ফলস ছাদ থেকে নামিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়।