ফুটবল

  • পর্তুগিজ গণমাধ্যমে রোনালদোর তীব্র সমালোচনা

    পর্তুগিজ গণমাধ্যমে রোনালদোর তীব্র সমালোচনা

    বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও, কাঙ্ক্ষিত পারফর্ম করতে ব্যর্থ পর্তুগাল। গ্রুপপর্বে কঙ্গোর বিপক্ষে টেনেটুনে ড্র দিয়ে শুরু, এরপর উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে হারিয়ে দেওয়ার পর শেষ ম্যাচে ফের কলম্বিয়ার সঙ্গে ড্র।

    কলম্বিয়া ম্যাচে নিষ্প্রভ পারফরম্যান্সের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে পর্তুগাল ফুটবল দল। এমনকি দেশটির ঐতিহ্যবাহী সংবাদপত্র ‘আ বোলা’ মাঠের সবচেয়ে খারাপ খেলোয়াড় হিসেবে বেছে নিয়েছে রোনালদোকে। তারা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের বিচারে প্রধান তারকাকে ১০ এর মধ্যে ৪ রেটিং দিয়েছে।

    প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোনালদোর শটগুলো তেমন বিপজ্জনক ছিল না এবং কলম্বিয়া গোলরক্ষক কামিলো ভার্গাসের মুখোমুখি হয়ে পাওয়া বড় সুযোগটিও কাজে লাগাতে পারেননি। যদিও পরে সেই আক্রমণ অফসাইড হিসেবে বাতিল হয়। ম্যাচটিতে রোনালদো পুরো ৯০ মিনিট মাঠে ছিলেন। টুর্নামেন্টে যা ছিল দ্বিতীয়বার রোনালদোর কাছে পাওয়া প্রত্যাশার চেয়ে কম পারফরম্যান্স।

    এর আগে প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচেও ম্লান ছিলেন সিআরসেভেন। তার সেরা পারফরম্যান্স ছিল উজবেকিস্তানের বিপক্ষে, যেখানে তিনি দুটি গোল করেছিলেন। রোনালদোর সমালোচনা করার পাশাপাশি কলম্বিয়ার বিপক্ষে পর্তুগালের সেরা খেলোয়াড় হিসবে গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তার কথা উল্লেখ করেছে ‘আ বোলা’। তাদের মতে, কস্তা ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় এবং ৮ রেটিং পেয়েছেন।

    কলম্বিয়ার একের পর এক আক্রমণ সামলে ক্লিনশিট ধরে রেখেছেন দিয়োগো কস্তা। তিনি ‘সবকিছুই আটকে দিয়েছেন’ এবং ‘দুর্দান্ত পারফরম্যান্স’ করার কথা উল্লেখ করে গণমাধ্যমটি। কস্তার সেরা সেভের একটি ছিল দ্বিতীয়ার্ধের ৪৩ মিনিটে। হুয়ান কুইন্তেরোর ক্রস থেকে লুইস সুয়ারেজের কাছে বল পৌঁছানোর আগেই তিনি পা দিয়ে ঠেকিয়ে দেন।

    এ নিয়ে গ্রুপপর্বের দুটি ম্যাচে ড্র করেছে পর্তুগাল। ম্যাচের ফল তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির হলেও পুরো লড়াইয়ে এগিয়ে ছিল কলম্বিয়া এবং বেশি সুযোগও তারাই তৈরি করে। অতিরিক্ত সময়ে ডেভিনসন সানচেজ গোল করলেও মিলিমিটার অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়। শেষ ৩২–এ রোনালদোর পর্তুগাল ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে লড়বে।

  • তৃতীয় হয়েও নকআউটের টিকিট পেল যে ৮ দল

    তৃতীয় হয়েও নকআউটের টিকিট পেল যে ৮ দল

    প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ। ফলে নকআউট পর্বও সম্প্রসারিত হয়েছে ৩২ দলে। নতুন ফরম্যাটের কারণে বদলে গেছে নকআউট পর্বে ওঠার হিসাব-নিকাশও। এবার শুধু প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দলই নয়; তৃতীয় অবস্থানে থেকেও ১২টি গ্রুপ থেকে ৮টি দল শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিয়েছে।

    গ্রুপপর্ব শেষে তৃতীয় অবস্থানে থাকা দলগুলোর মধ্যে নকআউটের টিকিট পেয়েছে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, প্যারাগুয়ে, সুইডেন, ইকুয়েডর, ঘানা, সেনেগাল, আলজেরিয়া এবং ডিআর কঙ্গো।

    এর মধ্যে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, প্যারাগুয়ে, সুইডেন, ইকুয়েডর, ঘানা, আলজেরিয়া ও ডিআর কঙ্গো ৪ পয়েন্ট নিয়ে এবং সেনেগাল ৩ পয়েন্ট নিয়েও সেরা আটে জায়গা করে নিয়েছে।

    ফিফার নতুন নিয়ম অনুযায়ী, গ্রুপে তৃতীয় হওয়া দলগুলোর মধ্যে পয়েন্টের ভিত্তিতে ৮টি দলকে নির্ধাবিচত করা হয়েছে। সমান পয়েন্ট হলে টাইব্রেকার হিসেবে গোল ব্যবধান বিবেচনা করা হয়েছে।

    এ কারণে তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও ভাগ্য সহায় হয়নি ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, স্কটল্যান্ড ও উরুগুয়ের। গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকার কারণে ৪টি দলকে গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়েছে।

    তৃতীয় অবস্থানে থেকে নকআউট নিশ্চিত হলেও সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন সব পরীক্ষা। শেষ বত্রিশে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার প্রতিপক্ষ স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র, প্যারাগুয়ের প্রতিপক্ষ জার্মানি, সুইডেন লড়াই করবে ফ্রান্সের বিপক্ষে, ইকুয়েডর মুখোমুখি হবে মেক্সিকোর, ঘানার প্রতিপক্ষ কলম্বিয়া, সেনেগাল খেলবে বেলজিয়ামের বিপক্ষে, আলজেরিয়ার সামনে সুইজারল্যান্ড আর ডিআর কঙ্গোর প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড।

    আজ রাতেই স্বাগতিক কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে সিঙ্গেল-এলিমিনেশন ভিত্তিক নকআউট পর্বের খেলা। এই পর্বের ১৬ ম্যাচের বিজয়ীরাই রাউন্ড সিক্সটিনে জায়গা করে নেবে। আর হেরে যাওয়া দলগুলোর ধরতে হবে দেশে ফেরার ফ্লাইট।

  • গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে সবার ওপরে মেসি

    গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে সবার ওপরে মেসি

    বয়স যতই বাড়ুক, গোল করার ক্ষুধায় যে এতটুকুও ভাটা পড়েনি, তা আবারও প্রমাণ করলেন লিওনেল মেসি। চলতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা আর্জেন্টাইন অধিনায়ক সোমবার জর্ডানের বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেই নিজের জাত চিনিয়েছেন। ম্যাচের ৮০তম মিনিটে দৃষ্টিনন্দন এক ফ্রি-কিক থেকে গোল করে টুর্নামেন্টে নিজের গোলসংখ্যা বাড়িয়ে করেছেন ৬।

    এই গোলের সুবাদে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এককভাবে শীর্ষে উঠে গেছেন ৩৯ বছর বয়সি এই মহাতারকা। কিলিয়ান এমবাপ্পে, এরলিং হালান্ড ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো সময়ের সেরা তরুণ ফরোয়ার্ডদের পেছনে ফেলে মাত্র তিন ম্যাচে ছয় গোল করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন মেসিই। গ্রুপ পর্বে তার এই দুর্দান্ত গোল-পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, বয়স কেবলই একটি সংখ্যা।

    বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম দুই ম্যাচেও দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন মেসি। জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচে ৬০তম মিনিটে তিনি মাঠে নামেন, যখন আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও প্রতিপক্ষ চাপ সৃষ্টি করছিল। মাঠে নেমেই আক্রমণে গতি এনে শেষ পর্যন্ত ফ্রি-কিক থেকে দুর্দান্ত গোল করে দলের জয় প্রায় নিশ্চিত করে দেন তিনি।

    ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সাত গোল করে সিলভার বুট জিতেছিলেন মেসি। এবার গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার আগেই ছয় গোল করে তিনি গোল্ডেন বুট জয়ের অন্যতম প্রধান দাবিদারে পরিণত হয়েছেন। বর্তমান ফর্ম ধরে রাখতে পারলে ক্যারিয়ারে আরও একটি বিশ্বকাপ গোল্ডেন বুট জয়ের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে তার।

    আগামী ৩ জুলাই রাউন্ড অব ৩২-এ কেপ ভার্দের বিপক্ষে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। নকআউট পর্বেও যদি মেসি একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন, তাহলে গোল্ডেন বুট জয়ের পাশাপাশি শিরোপা ধরে রাখার আর্জেন্টিনার স্বপ্নও আরও শক্ত ভিত পাবে।

  • যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইরান ফিরছে মাথা উঁচু করে

    যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইরান ফিরছে মাথা উঁচু করে

    ‘যদি কোনো কিছুকে তুমি পুরোটা হৃদয় দিয়ে চাইতে পারো, তাহলে পুরো মহাবিশ্ব তোমাকে সেটা পাইয়ে দিতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়’ — পাউলো কোয়েলহোর আলকেমিস্টের এই উক্তি জগদ্বিখ্যাত বললেও কম হয়।

    তবে ব্রাজিলিয়ান এই কথাসাহিত্যিকের এই উক্তিটাকে আজ চাইলে ইরান প্রশ্নবিদ্ধ করলেও পারে। তারাও তো চেয়েছিল নকআউটের চৌকাঠ ছুঁতে, মনপ্রাণ দিয়েই চেয়েছিল; তাহলে কেন তাদের ক্ষেত্রে হলো তার ঠিক ১৮০ ডিগ্রি উল্টো বিষয়টা! গোটা মহাবিশ্ব ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো বটে, কিন্তু এই ষড়যন্ত্র গেল তাদের বিপক্ষে।

    ইরান চাইলে প্রশ্ন করতেই পারে, ‘এভাবেও স্বপ্ন ভেঙে যায়?’ একবার হলে হতো, দুবারও মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু তাই বলে তিন বার? ইরানের সামনে হিসেবটা ছিল পরিষ্কার। শেষ ম্যাচে মিশরকে হারাতে পারলেই শেষ ৩২-এ পৌঁছে যেত পশ্চিম এশিয়ার এই দেশ। গড়া হয়ে যেত ইতিহাসও, কখনোই যে নকআউটে খেলা হয়নি তাদের!

    সোজা খালিলজাদেহর পায়ে ভর করে সে স্বপ্ন দেখতে শুরুও করেছিল তারা। যোগ করা সময়ে মিশরের জালে বল জড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তবে বাঁধ সাধল ভিএআর, আর এমন এক নিয়ম, যার দেখা মেলে কালেভদ্রে। সাধারণত মনে করা হয় পাস রিসিভ করার সময় একজন ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিতে পারলেই বুঝি অফসাইডকে ফাঁকি দেওয়া যায়। সে ধারণা যে ভুল, আসল নিয়মে যে অন্য কিছু বলা আছে, সেটা জানানোর জন্যই যেন এমন দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।

    খালিলজাদেহ যখন বলটা পায়ে পেলেন, তখন তার সামনে গোলমুখে দাঁড়িয়ে মিশরের এক ডিফেন্ডার, তার অনেক পেছনে মিশরের গোলরক্ষক, আর ভগ্নাংশের ব্যবধানে পেছনে ফরোয়ার্ড হামজা আবদেলকারিম। সামনে এক ডিফেন্ডার দাঁড়িয়ে, তাহলে তো অফসাইডের কোনো ঝামেলা নেই, তাহলে আর কী, তার শট যখন আছড়ে পড়ল জালে, তখন উদযাপন শুরু হয়ে গেছে সিয়াটল থেকে তেহরান পর্যন্ত। হবেই তো, প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউট নিশ্চিত বলে কথা।

    ঠিক তখন বাঁধ সাধল ভিএআর। অফসাইড! কারণ? অফসাইডের নিয়ম হচ্ছে, সামনে দুইজন ডিফেন্ডার থাকতে হয়, গোলকিপার সবসময় সামনে থাকেন বলেই সে সংখ্যাটা প্রায় সময় নেমে আসে ১-এ। ভুলটা সেখানেই হয়। ইরানও কি সে ফাঁদেই পা দিয়েছিল? সে যাই হোক, ভুলটা হয়েছে জায়গামতোই। যার ফল, ভাগ্যটা গেল ঝুলে। অনেকগুলো সুযোগ ছিল তাদের সামনে, তার কোনো একটার ফল পক্ষে এলেই কেল্লাফতে!

    তাই তাদের অপেক্ষা ছিল আজ সকালের। ক্রোয়েশিয়াকে হারতে হতো, ক্রোয়েশিয়া জিতল; জেতারই কথা ছিল অবশ্য। এরপর উজবেকিস্তান যখন ডিআর কঙ্গোকে চমকে দিয়ে প্রথম গোলটা করে বসল, তখন আশায় বুক বেধে বসেছিল ইরান। এরপর তিনটি গোল করে কঙ্গো চলে গেল শেষ ৩২-এ, ইরানের অপেক্ষাটা গিয়ে ঠেকল অস্ট্রিয়া-আলজেরিয়া ম্যাচে, এই ম্যাচে কোনো এক দল হেরে গেলেই ৩ পয়েন্ট নিয়ে অষ্টম দল হিসেবে নকআউটে চলে যেত ইরান।

    তাদেরকে প্রথমে আশা দিলেন অস্ট্রিয়ার মার্কো আর্নাতোভিচ, তার গোলে অস্ট্রিয়ানরা এগিয়ে গিয়েছিল। এরপর আলজেরিয়াকে সমতায় ফেরালেন রাফিক বেলঘালি। ৫৫ মিনিটে মার্সেল সাবিতজার গোল করলেন, ইরান একটু আশা দেখল, সেটাও উবে গেল ৫ মিনিট পর রিয়াদ মাহরেজ গোল করলে।

    ডেডলকটা গিয়ে ভাঙল যোগ করা সময়েরও চতুর্থ মিনিটে। রিয়াদ মাহরেজ আবারও গোল করে এগিয়ে দিলেন আলজেরিয়াকে। যেখানে চতুর্থ অফিসিয়াল অতিরিক্ত সময় দিয়েছেনই মোটে ৫ মিনিট, সেখানে ৯৪ মিনিটের গোলের জবাব আসে কী করে! ইরান শিবির থেকে শুরু করে তেহরানে বোধ হয় উৎসবটা শুরু হয়েই গিয়েছিল চূড়ান্তভাবে।

    সেটাতেও বাধ সাধল ভাগ্য। ৯৬ মিনিটে সাশা কালাইজিচের গোলে সমতা ফেরাল অস্ট্রিয়া। আলজেরিয়ারও ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি, দুই দলই চলে গেছে শেষ ৩২-এ। মাঝে কপাল পুড়ল ইরানের, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ নকআউট ধরা দিতে দিতেও শেষমেশ গিয়ে ধরা দিল না।

    তবে ইরান চাইলে চোয়াল শক্ত করে নিজেদের অর্জনের দিকে তাকাতেই পারে। তিন ম্যাচ খেলেছে দলটি; নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম, আর মিশরের মতো দলের বিপক্ষে ম্যাচ হারেনি একটিও। এই ড্রকে আপনি জয়ের সমান করেই দেখবেন, যখন আপনার মনে পড়বে প্রেক্ষাপটটা।

    যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের যুদ্ধের জেরে ইরান ফুটবল দলও বেশ ঝক্কিতে পড়েছে। একগাদা অফিসিয়ালকে ভিসা দেওয়া হয়নি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা মিললেও থাকার অনুমতি পায়নি পুরো দল। তিনটি ম্যাচেই ইরান খেলেছে ভিন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে। ম্যাচের আগের দিন প্রত্যেক দলের জন্য স্টেডিয়ামে যাওয়ার অনুমতি থাকে। ইরান সেটাও পায়নি, পাবে কী করে, ম্যাচের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ারই তো অনুমতি পায়নি তারা! দিনে দিনে গিয়ে খেলে দিনে দিনে ফিরতে হয়েছে মেক্সিকোতে। ম্যাচ শেষে রিকভারি খেলোয়াড়দের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজটা ইরানকে সারতে হয়েছে আরও এক বিমানযাত্রার ধকল সামলে এর পর!

    একে তো ‘শত্রু’র দেশে খেলার মানসিক চাপ, তার ওপর এমন বিমানযাত্রার শারীরিক চাপ… সব মিলিয়ে এতো প্রতিকূলতা ছিল সামনে। তা সামলে ইরান পারফর্ম করেছে। চলে গিয়েছিল নকআউটের হাতছোঁয়া দূরত্বেও। একে কি আপনি অর্জন বলবেন না?

    ইরানের এই যাত্রা তাই ব্যর্থ নয় কোনোভাবেই। কারণ তারা যে দেশে ফিরছে যুক্তরাষ্ট্রের মাটি থেকে অপরাজিত থেকে, সবচেয়ে বড় কথা, মাথা উঁচু করে!

  • ফিফার বিরুদ্ধে ক্ষোভ  ইরানি অধিনায়কের, কেউ আমাদের সাহায্য করছে না

    ফিফার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ইরানি অধিনায়কের, কেউ আমাদের সাহায্য করছে না

    ইরানের অধিনায়ক মেহদি তারেমি তার দেশের বিশ্বকাপ অভিযানের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ফিফা এবং সংস্থাটির সভাপতি গিয়ান্নি ইনফান্তিনোর কঠোর সমালোচনা করেছেন। গ্রুপ পর্বে টানা তৃতীয় ড্রয়ের পরও ইরানকে এখন শেষ ৩২-এ ওঠার জন্য অন্য ম্যাচগুলোর ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। ম্যাচ শেষে তারেমি বিশ্বকাপের ভ্রমণ ও লজিস্টিক ব্যবস্থাকে একটি বিপর্যয় বলে অভিহিত করেন। শুক্রবারের ম্যাচ শেষে তারেমি ও তার সতীর্থদের যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল থেকে উড়ে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। প্রথমে টুর্নামেন্ট চলাকালে দলটির বেস ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাঅঙ্গরাজ্যের টুকসনে হওয়ার কথা থাকলেও, মে মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের কারণে তারা বেস ক্যাম্প মেক্সিকোতে সরিয়ে নেয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য আটলান্টিক।

    যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের যুদ্ধ শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথ সামরিক হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করে। এর জবাবে ইরান পাল্টা হামলা চালায়। ইরান দল এবং তাদের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ খেলতে যাওয়া ও সেখান থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে বারবার জটিলতার মুখে পড়েছেন। তারেমির অভিযোগ, পরিস্থিতির উন্নতির যে প্রতিশ্রুতি ইনফান্তিনো দিয়েছিলেন, তা তিনি বাস্তবায়ন করতে পারেননি।

    তারেমি সাংবাদিকদের বলেন, এটি একটি বিপর্যয়কর বিশ্বকাপ; পুরোপুরি একটি বিপর্যয়। ফিফার এখানে প্রতিটি সমস্যার সমাধান করা উচিত ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা শুরু থেকেই কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। তিনি বলেন, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের পর মি. ইনফান্তিনো আমাদের ড্রেসিংরুমে এসে বলেছিলেন, ‘এটা তো কেবল শুরু…’।

    তারেমি আরও বলেন, আমাদের লজিস্টিক কর্মীরা এখানে নেই। তারা ভিসা পাননি। এটা কীভাবে সম্ভব যে আমাদের প্রতিবার তিহুয়ানা থেকে যাতায়াত করতে হচ্ছে? আমরা তিহুয়ানার মানুষকে ভালোবাসি। আমরা মেক্সিকোকে ভালোবাসি। তারা অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ। কিন্তু একজন পেশাদার ফুটবলার হিসেবে, একটি পেশাদার প্রতিযোগিতায় এভাবে খেলাটা ঠিক নয়। তিনি বলেন, এটা ন্যায়সংগত নয়। আমাদের মতে, এটা মোটেও ন্যায়সংগত নয়। ফিফার কাছে যদি এটা ন্যায়সংগত মনে হয়, সেটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু আমাদের কাছে নয়। আসলে আমাদেরকে কে সাহায্য করতে চায়? যদি তারা চায় আমরা টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিই, তাহলে ঠিক আছে, আমরা বিদায় নেব। কিন্তু এটা ন্যায়সংগত নয়। আমাদের পুনর্বাসন (রিকভারি) বিশেষজ্ঞ নেই, লজিস্টিক কর্মীও নেই, যারা আমাদের সাহায্য করবে। আমরা সব সময় এসব বিষয়ে অভিযোগ করি, কিন্তু কেউ আমাদের সাহায্য করে না, কেউই না।

    বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মেক্সিকো সিটিতে দেয়া বক্তব্যে গিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছেন, প্রয়োজন হলে তিনি ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে নিজেই বাস চালিয়ে দলটিকে বিশ্বকাপে নিয়ে আসতেন। মিশরের বিপক্ষে ড্র হওয়া ম্যাচের প্রথমার্ধে একটি পেনাল্টি মিস করা তারেমিকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তার কি মনে হয় ইরানকে এই টুর্নামেন্টে স্বাগত জানানো হয়নি? জবাবে তিনি বলেন, এখানে আমাদের সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মানুষ আসলে কী চায়, আমি জানি না। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হয়, তারা সম্ভবত এটাই চায়। ৯০ মিনিট খেলার পর আবার তিহুয়ানায় ফিরে যেতে হবে, এটা কীভাবে সম্ভব?

    মিশরের বিপক্ষে শুক্রবারের ড্রয়ের ফলে ইরান গ্রুপ জি’তে তৃতীয় স্থানে শেষ করেছে। শেষ ৩২-এ ওঠার জন্য শনিবারের গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচগুলোর ফল তাদের অনুকূলে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। যদি গ্রুপ জে’তে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া ড্র করে। গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো হারিয়েছে উজবেকিস্তানকে। ক্রোয়েশিয়া হারিয়েছে ঘানা’কে। ফলে ইরানকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়েছে।

  • কে সেরা, মেসি না রোনালদো?

    কে সেরা, মেসি না রোনালদো?

    কে সেরা। মেসি না রোনালদো? বিশ্বব্যাপী ফুটবল দুনিয়ায় এ নিয়ে অনন্ত বিতর্ক। মাঠের রাজা হচ্ছেন লিওনেল মেসি। আর বলা হয়ে থাকে, নাটকের সম্রাট ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। আসলে দু’জনের মধ্যে মহাকাব্যিক যুদ্ধ। ফুটবল দুনিয়ায় এটাই হচ্ছে এক চিরন্তন লড়াই। এই লড়াই মাঠের সবুজ ঘাসেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, বিলাসবহুল জীবনযাত্রার মধ্যেও। চলতি বিশ্বকাপে এই দুই মহাতারকা আলোচনার কেন্দ্রে। একে অপরকে তারা যেভাবে টেক্কা দিচ্ছেন তা যে কোনো হলিউড থ্রিলারকেও হার মানায়। ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। এখন পর্যন্ত তিনি এককভাবে সিংহাসনে। অন্যদিকে ৪১ বছর বয়সী পর্তুগিজ যুবরাজ রোনালদো উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে দুটো গোল করে এক অবিশ্বাস্য নজির স্থাপন করেছেন। বিশেষ করে টানা ছটি বিশ্বকাপে গোলের সুবাদে। মেসির জন্ম ১৯৮৭ সনে। বাবা হোর্হে হোরাসিও ছিলেন তার প্রথম কোচ। ফুটবলের প্রতি মেসির ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা। তার দাদি সেলিয়া ছাড়া আর কেউ তাকে সমর্থন করতো না। খেলায়ও নিতে চায়তো না অনেকেই। এর বিরুদ্ধে লড়াই করতেন দাদি।

    দুর্ভাগ্য হচ্ছে- মেসির কিংবদন্তি হয়ে ওঠা সেলিয়া দেখে যেতে পারেননি। তিনি মারা যান ১৯৯৮ সনে ৬৭ বছর বয়সে। পাঁচ বছর পর অনেকটা নাটকীয়ভাবে বার্সেলোনায় সুযোগ পান মেসি। ২০০৫ সনে আন্ডার টুয়েন্টিতে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় , বার্সেলোনার সঙ্গে তার চুক্তি হয়েছিল একটি ন্যাপকিনে। এ কারণেই সম্ভবত বলা হয়ে থাকে—একটি ন্যাপকিন মেসির জীবনকে বদলে দেয়। অন্যদিকে পর্তুগিজ সুপারস্টার রোনালদোর জন্ম ১৯৮৫ সনে। তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। রোনালদো শেষ, তিনি বুড়ো হয়ে গেছেন। এমনটাই ফুটবল দুনিয়ায় চাউর ছিল। কিন্তু এবার ফুটবল দুনিয়া আবিস্কার করলো পাঁচটি ব্যালন ডি’অর জয়ী অন্য এক রোনালদোকে। ক্যামেরুনের রোজার মিলাও বিশ্বকাপে গোল করে রেকর্ড করেছিলেন। যাইহোক, মেসি এবং রোনালদোর মাঠের বাইরের জীবনযাপনে বিস্ময়কর তফাৎ রয়েছে। রোনালদোর জীবন যেন এক গ্ল্যামারাস সিনেমার মতো। তিনি বরাবরই বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। কোটি টাকার সুপার কার কালেকশন তার যেন এক নেশা। নিজস্ব ব্র্যান্ড রয়েছে সিআর-৭ এর। এরসবই মিডিয়ায় তার জীবন নিয়ে একটা হটকেক আলোচনা। ৪১ বছর বয়সেও তার শরীরে মেদ নেই। যেমনটা থাকে একজন তরুণ অ্যাথলেটের মধ্যে। মেসি কিন্তু এসবের ঊর্ধ্বে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের এক চেনা মুখ। শৈশবের প্রেমিকা আন্তোনেলাকে বিয়ে করে তিন সন্তান নিয়ে ভালোই আছেন। মেসিকে দেখা যায় পরিবারের সঙ্গে সমুদ্র সৈকতে। বাচ্চাদের নিয়ে মাঝেমধ্যে ফুটবলও খেলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজত্ব আসলে কার হাতে। এর উত্তর খুঁজতে গেলে রোনালদোকে এগিয়ে রাখতে হবে। সবক’টা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরমে তিনি এখন বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি, যার রয়েছে এক বিলিয়নেরও বেশি ফলোয়ার। তিনি অহংকারী, সোজাসাপ্টা কথা বলতে পছন্দ করেন। মেসি এদিক থেকে অনেকটাই সংযত। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বরাবরই মৃদুভাষী। বিতর্ক তাকে স্পর্শ করে না।

    ফুটবল পণ্ডিতরা বলছেন, ব্যক্তিগত জীবনের সামগ্রিক মূল্যায়নে দু’জনকে আলাদা করা খুব কঠিন। মেসির মধ্যে রয়েছে পেশাদারিত্ব। এ কারণেই হয়তো তাকে গোট(GOAT) বলে আখ্যায়িত করেন অনেকেই। মেসির ঝুলিতে রেকর্ডসংখ্যক ট্রফি ও ব্যালন ডি’অর রয়েছে। সমীকরণ যদি সঠিক হয়ে থাকে তাহলে, চলতি বিশ্বকাপে আগামী ১১ জুলাই কানসাস সিটিতে একটি সম্ভাব্য কোয়ার্টার ফাইনালের মুখোমুখি হয়ে যেতে পারেন এই দুই মহাতারকা। এটা অবশ্য নির্ভর করে আর্জেন্টিনা ও পর্তুগাল নিজ নিজ নকআউট ম্যাচগুলো জিততে পারলে। তাহলেই কেবল বিশ্বমঞ্চে এই দুই তারকার শেষ যুদ্ধ দেখার সুযোগ হতে পারে ফুটবল বিশ্বের। মাঠের পারফরম্যান্সে মেসি সত্যিই একজন জাদুকর। আর জীবনের ড্রামায় রোনালদোই সত্যিকার বিনোদন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জীবন গ্ল্যামারে ভরা। রোনালদো এর মধ্যেই বলেছেন, আমি ফিরে এসেছি। ইঙ্গিতটা কিন্তু মেসির দিকেই। আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচটা গোল করে মেসি ফুটবল ইতিহাস বদলে দেন। এরমধ্যে তো একটা হ্যাটট্রিক আছেই।

    ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তখন পেছনের সারিতে। অবশ্য বেশি সময় নেননি। উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে দুই গোল করে বিশ্বকে বললেন, আমি আবার ফিরে এসেছি। ছয়টি বিশ্বকাপে খেলার রেকর্ডও তিনি লিখলেন অন্যভাবে। মেসি কখনো রোনালদোকে নিয়ে বাজে কোনো মন্তব্য করেননি। অনেকক্ষেত্রে প্রশংসাও করেন। কিন্তু রোনালদো তার বিপরীত।

  • ‘কোনো কিছুই অসম্ভব নয়’ – আর্জেন্টিনাকে পেয়ে বলল কেপ ভার্দে

    ‘কোনো কিছুই অসম্ভব নয়’ – আর্জেন্টিনাকে পেয়ে বলল কেপ ভার্দে

    বিশ্বকাপে অভিষেকেই ইতিহাস গড়ল কেপ ভার্দে। হিউস্টনে সৌদি আরবের সঙ্গে ০-০ ড্র করে গ্রুপ এইচ-এ দ্বিতীয় হয়ে রাউন্ড অব ৩২-এ উঠেছে তারা। এই অর্জনে তারা হয়েছে জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বকাপের নকআউটে ওঠা সবচেয়ে ছোট দেশ এবং ২০১০ সালের পর প্রথমবার অভিষেকেই নকআউটে যাওয়া দল।

    স্পেন ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলের সঙ্গে একই গ্রুপে থেকেও তিনটি ড্র করে এই অসাধারণ কীর্তি গড়েছে কেপ ভার্দে।

    সংবাদ সম্মেলনে দেশের পতাকা গায়ে জড়িয়ে কথা বললেন কোচ বুবিস্তা। রেকর্ডের কথা জানার পর তিনি বললেন, ‘আমরা? আমি জানতামই না। তাহলে আমরা একটা উদাহরণ হয়ে গেলাম যে যদি মনোযোগ, দৃঢ়তা এবং সংগঠিত থাকে তাহলে ছোট দেশগুলোও বড় লক্ষ্য রাখতে পারে। আমরা দেখিয়েছি কিছুই অসম্ভব নয়। আমরা শুধু আমাদের দেশকে নয়, আফ্রিকাকে এবং সারা বিশ্বের ছোট দেশগুলোকে প্রতিনিধিত্ব করেছি।’

    তিনি আরও বলেন, ‘আমি সবসময় বলেছি, দেরিতে হলেও কেপ ভার্দে একদিন এই মঞ্চে আসবে। কঠিন ছিল, কিন্তু আমরা একের পর এক ধাপ পেরিয়েছি। বিশ্বকে দেখিয়েছি, কঠিনকে ভয় পেতে নেই। এখন আমরা নকআউটে, এটা আমাদের মানুষের জন্য, আমাদের দলের সঙ্গে পরিচয় রাখা সবার জন্য এবং বিশেষ করে খেলোয়াড়দের জন্য অসাধারণ একটা মুহূর্ত।’

    এরপর শুক্রবার মিয়ামিতে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে কেপ ভার্দে। মেসির দল নিয়ে বুবিস্তা বললেন, ‘আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলতে পেরে আমরা গর্বিত। এই দেশের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ সম্পর্ক আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিপক্ষ যেই হোক আমরা আমাদের নিজেদের পরিচয়েই খেলব। আমরা জানি আর্জেন্টিনায় বিশ্বের সেরা কিছু খেলোয়াড় আছেন, আর আছেন মেসি, যাকে অনেকে সর্বকালের সেরা মনে করেন।’

    ম্যাচের সময় ড্রেসিং রুম থেকে কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের উৎসব করার শব্দ ভেসে আসছিল। সংবাদ সম্মেলন কক্ষ থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে চলছিল সেই আনন্দ।

  • শেষ ম্যাচে জিতলেই বিপাকে পড়বে এই ২ দল

    শেষ ম্যাচে জিতলেই বিপাকে পড়বে এই ২ দল

    শনিবার গ্রুপ জে-র শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া। দুই দলই তিন পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে। ড্র করলেও দুটি দলেরই নকআউটে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। তবু দুই কোচই বলছেন, জয়ের জন্যই মাঠে নামবেন তারা।

    ম্যাচ শুরুর আগেই দুই দল জেনে যাবে নকআউটের বাকি ব্র্যাকেট কেমন। গ্রুপ জে-তে দ্বিতীয় হলে মুখোমুখি হতে হবে গ্রুপ এইচ-এর শীর্ষ দলের, যেটি হতে পারে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। আর তৃতীয় হলে সামনে পড়বে গ্রুপ বি-র শীর্ষ দল সুইজারল্যান্ড, যাকে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ বলা যায়। সুইজারল্যান্ডের চেয়ে স্পেন নিশ্চয়ই ধারে-ভারে কঠিন দল, সে কারণে ম্যাচটা জিতলেই বুঝি বেশি কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে দলকে। তাই অনেকেই ভাবছিলেন, দুই দল হয়তো ইচ্ছে করে ড্র খুঁজবে।

    কিন্তু অস্ট্রিয়া কোচ রাল্ফ রাংনিক তা সরাসরি নাকচ করলেন। তিনি বললেন, ‘না, একদমই না। ম্যাচ শুরুর পর আমরা পরিস্থিতি বুঝব, কিন্তু সেটা আমাদের খেলাকে প্রভাবিত করবে না। ড্র করলে হয়তো এগিয়ে যাওয়া যাবে, কিন্তু ড্রয়ের জন্য মাঠে নামা যায় না।’

    আলজেরিয়া কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচও একই সুরে বললেন, ‘ফুটবলে কোনো যদি বা কিন্তু নেই। আমাদের সবসময় প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হয় একই মনোভাব নিয়ে, পারফর্ম করার ইচ্ছা আর জয়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। ম্যাচের পর কী হবে দেখা যাবে, কিন্তু আগে জেতার চেষ্টা করতে হবে।’

    এই ম্যাচটি নিয়ে ১৯৮২ সালের স্মৃতিও উঠে আসছে বারবার। সেবার স্পেনের গিহনে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া এমনভাবে খেলেছিল যে আলজেরিয়া বাদ পড়ে গিয়েছিল। প্রথম গোলের পর দুই দলই যেন চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছিল। ইতিহাসে এটি ‘গিহনের কলঙ্ক’ নামে পরিচিত। সেই ঘটনার পরই ফিফা গ্রুপের শেষ দুই ম্যাচ একই সময়ে আয়োজনের নিয়ম চালু করে।

    সেই প্রসঙ্গে রানগনিক বলেন, ‘আমার খেলোয়াড়রা হয়তো গত কয়েক দিনে খবরের কাগজে এটা পড়েছে। কিন্তু আমি মনে করি না এটা আগামীকালের ম্যাচে কোনো প্রভাব ফেলবে।’

    অস্ট্রিয়া মিডফিল্ডার কনরাড লাইমার বলেন, ‘আমরা মাঠে নামব জেতার জন্য। প্রতিপক্ষ কে সেটা কোনো ব্যাপার না।’

    দুই দলই আগে আর্জেন্টিনার কাছে হেরেছে এবং জর্ডানকে হারিয়েছে। জর্ডান ইতোমধ্যে বাদ পড়ে গেছে।

  • কেপ ভার্দের রূপকথার নেপথ্য কারিগর ‘বুবিস্তা’

    কেপ ভার্দের রূপকথার নেপথ্য কারিগর ‘বুবিস্তা’

    বোয়া ভিস্তা দ্বীপের পোভোয়াসাও ভেলহা গ্রাম। পুরো গ্রামে ছিল মাত্র একটি টেলিভিশন। বিশ্বকাপের রাতে সেই টিভির সামনে ভিড় করতেন গ্রামের মানুষ। সবার পেছনে দাঁড়িয়ে এক ছোট্ট ছেলে মুগ্ধ চোখে দেখত ডিয়েগো ম্যারাডোনা আর লোথার ম্যাথাউসের ফুটবল জাদু। ঘরে ফিরে মা তার জন্য মোজা দিয়ে বানিয়ে দিতেন একটি বল। সেই মোজার বল নিয়েই শুরু হয়েছিল তার ফুটবল-যাত্রা।

    বহু বছর পর সেই ছেলেটিই টানা ১১ বছর কেপ ভার্দে জাতীয় দলের অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরেছেন। ফুটবল বিশ্ব এখন তাকে চেনে ‘বুবিস্তা’ নামে। যদিও তার আসল নাম পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো। জন্ম বোয়া ভিস্তা দ্বীপে বলেই শৈশবের ডাকনাম ‘বুবিস্তা’ আজ তার পরিচয় হয়ে গেছে। আর শনিবার সকালে হিউস্টনের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে ৫৬ বছর বয়সী সেই মানুষটিই লিখলেন দেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় ইতিহাস। তার হাত ধরেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠেছে আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে।

    বিশ্বকাপে জায়গা পেতে নানা বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে হয়েছে কেপ ভার্দেকে। টানা সাতবার ব্যর্থ হওয়ার পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে আফ্রিকান ব্লু শার্কসরা। আর প্রথমবার সুযোগ পেয়েই চমকে দিয়েছে তারা। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নের গ্রুপ থেকে অপরাজিত রানার্সআপ হয়ে শেষ বত্রিশে জায়গা করে নিয়েছে দলটি। বাইরে থেকে এটি রূপকথা মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে প্রায় দুই দশকের পরিকল্পনা, ধৈর্য আর কঠোর পরিশ্রম।

    কেপ ভার্দের এই সাফল্যের অন্যতম বড় ভিত্তি সেন্টার-ব্যাক লোগান কস্তা। ভিয়ারিয়ালের এই ডিফেন্ডার গত বছরের জুলাইয়ে এসিএল ইনজুরিতে পড়ে প্রায় ১০ মাস মাঠের বাইরে ছিলেন। বিশ্বকাপের আগে গত ১৭ মে লা লিগায় মাত্র ১৩ মিনিট খেলেছিলেন। এমন একজন ফুটবলারকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু বুবিস্তা বিশ্বাস হারাননি। সেটার ফলও মিলেছে হাতেনাতে। স্পেন, উরুগুয়ে কিংবা সৌদি আরব- কেউই সহজে ভাঙতে পারেনি কস্তাদের রক্ষণপ্রাচীর। পুরো গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের সংগঠিত রক্ষণভাগ।

    কেপ ভার্দের জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ। কিন্তু দেশের মানুষের চেয়ে প্রবাসী কেপ ভার্দিয়ানের সংখ্যা আরও বেশি। সেই ছড়িয়ে থাকা মানুষদেরই এক সুতোয় গেঁথেছেন বুবিস্তা। এই যেমন মিডফিল্ডার জামিরো মন্তেইরোর জন্ম নেদারল্যান্ডসের রটারডামে। অভিবাসী পরিবারে বেড়ে ওঠা এই ছেলেটি পাড়ার রাস্তায় ফুটবল শেখা শিখেছেন। পরে নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকার ঘুরে জাতীয় দলে জায়গা করে নেন। বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে এসওয়াতিনির বিপক্ষে নিজের ৫০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেই নিশ্চিত করেছিলেন কেপ ভার্দের বিশ্বকাপের টিকিট।

    কেভিন পিনার গল্পও কম অবাক করার মতো নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের ব্রকটনের রাস্তায় খেলতে খেলতেই সাবেক অধিনায়ক কার্লোস মোরাইসের চোখে পড়েছিলেন তিনি। সেখান থেকেই পেশাদার ফুটবলে যাত্রা। এখন রাশিয়ার ক্রাসনোদারে খেলেন। বিশ্বকাপে উরুগুয়ের বিপক্ষে তার ফ্রিকিক গোল এখনও টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা মুহূর্ত।

    আবার উরুগুয়ের বিপক্ষে বদলি নেমে সমতাসূচক গোল করা হেলিও ভারেলা খেলেন ইসরায়েলের ক্লাবে। ম্যাচের আগে হয়তো খুব কম মানুষই তার নাম জানত, কিন্তু একটি গোলই তাকে কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসে জায়গা করে দিয়েছে।

    ডিফেন্ডার পিকো লোপেসের গল্প আরও মজার। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার প্রথমে ভেবেছিলেন, লিংকডইনে পর্তুগিজ ভাষায় আসা কেপ ভার্দে কোচের বার্তাটি বুঝি স্প্যাম! পরে বুঝতে পারেন, সেটিই ছিল জাতীয় দলের ডাক। সেই বার্তা উপেক্ষা করলে হয়তো ইতিহাসের অংশ হওয়াই হতো না।

    আর গোলরক্ষক ভোজিনহা তো এখন পুরো দেশের নায়ক। স্পেনের বিপক্ষে একাই সাতটি সেভ করে ম্যাচসেরা হয়ে ওঠেন তিনি। শেষ বাঁশির পর চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কারণ সেই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছিল প্রয়াত দাদা-দাদিকে- যাদের হাত ধরেই ফুটবলে তার প্রথম পথচলা।

    ৩৬ বছর বয়সী অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেস এই দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ মুখ। গত ১৬ বছরে ৯৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে তিনি ছিলেন কেপ ভার্দের প্রতিটি উত্থান-পতনের সাক্ষী। আর ২৫ বছর বয়সী ডেইলন লিভ্রামেন্তো বাছাইপর্বে ক্যামেরুন ও এসওয়াতিনির বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে বিশ্বকাপের পথটাই খুলে দিয়েছিলেন। বিশ্বকাপ শুরুর আগে সেই গোলগুলোর কথা খুব বেশি মানুষ মনে রাখেনি, কিন্তু ইতিহাসের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল সেখানেই।

    কেপ ভার্দের জন্য বিশ্বকাপ শুধু স্বপ্ন নয়, ভবিষ্যতের বিনিয়োগও। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব খেলেই কেপ ভার্দে ফিফার কাছ থেকে পাচ্ছে এক কোটি পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার। ফেডারেশনের পরিকল্পনা, এই অর্থের পুরোটা ব্যয় হবে দেশের ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা কেপ ভার্দিয়ান প্রতিভাদের খুঁজে বের করতে। ১৪ বছর বয়সী একাডেমি ফুটবলার ইউরি মার্লে ফার্নান্দেসদের প্রজন্মকে তাই আর কল্পনা করতে হয় না। তারা বড় হয়েছে এমন একটি জাতীয় দলকে দেখে, যারা আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে, ক্যামেরুনের মতো দলকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপে উঠেছে। তাদের কাছে বিশ্বমঞ্চ আর অসম্ভব কোনো স্বপ্ন নয়।

    সৌদি আরব ম্যাচের আগে বুবিস্তা বলেছিলেন, ‘সবারই স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে। অসম্ভব বলে কিছু নেই।’ মোজার ফুটবল দিয়ে খেলা শুরু করা এই মানুষটি ভালো করেই জানেন, বিশ্ব ফুটবলের সমীহ আদায় করতে ঠিক কতটা রক্ত-ঘাম ঝরাতে হয়।

    আগামী ৪ জুলাই নকআউট পর্বে তাদের সামনে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষে থাকবেন লিওনেল মেসি। পোভোয়াসাও ভেলহা গ্রামের সেই ছোট্ট ছেলেটি ধার করা টেলিভিশনে এর চেয়েও বড় বড় ম্যাজিক দেখে বড় হয়েছে। এবার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের গল্প লেখার পালা তার।

  • দশ বিশ্বকাপের পথিক: তপন চৌধুরীর চোখে ফুটবলের পৃথিবী

    দশ বিশ্বকাপের পথিক: তপন চৌধুরীর চোখে ফুটবলের পৃথিবী

    কিছু মানুষের কাছে বিশ্বকাপ ফুটবল মানে পৃথিবীকে কাছ থেকে দেখা। নিজের জীবনের সঙ্গে কিছু মুহূর্তকে চিরস্থায়ী করে রাখার নাম। তপন চৌধুরীর গল্প তেমনই।

    ব্যবসায়িক পরিচয়ে তিনি দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে রয়েছেন। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও দীর্ঘ পথচলা। গোপীবাগের ব্রাদার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এসবের বাইরে আরেকটি দিক আছে, যা তাকে আলাদা করে। তপন চৌধুরী বিশ্বকাপ ফুটবলের এক নিবেদিত পথিক।

    তার বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু ১৯৮৬ সালে, মেক্সিকো থেকে। সেই সময় মেক্সিকো নিয়ে নানা আতঙ্ক ছিল। পরিচিতরা বলেছিলেন, সাবধানে থাকতে, পরিস্থিতি নাকি খুব ভালো নয়। চারদিকে ছিনতাই, নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা। ভয় তাকে আটকে রাখতে পারেনি। বন্ধু ফকির মাহবুব আনামকে (বর্তমানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ) উড়ে গেলেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ দেখতে।

    সেই সময়ের হিসাবেই একেকজনের খরচ হয়েছিল প্রায় ১৮শ মার্কিন ডলার। থাকা, খাওয়া, খেলা দেখা সব মিলিয়ে। তারা দেখেছিলেন সাতটি ম্যাচ। কিন্তু খেলার ফলের চেয়ে বেশি মনে গেঁথে আছে স্টেডিয়ামের বাইরের পৃথিবী।

    তপন চৌধুরী এখনও মনে করতে পারেন সেই দিনটির কথা, যেদিন দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল।

    তিনি বলছিলেন, সেদিন পুরো মেক্সিকো যেন উৎসবে ভেঙে পড়েছিল। রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ। আনন্দ, উচ্ছ্বাস, উদ্‌যাপন। তিনি আর তার বন্ধুও সেই জনসমুদ্রে মিশে গিয়েছিলেন।

    তারপর হোটেলে ফিরে টেলিভিশনে দেখলেন আরেক গল্প, ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত হাতের গোল। মাঠে বসে তারা কেউই বুঝতে পারেননি কী ঘটেছে।

    তারপর শুরু হয় এক দীর্ঘ বিশ্বকাপ যাত্রা। ১৯৯০–এ দেখেছেন রোমের সেই রাত। যেখানে ফুটবলের রাজা ম্যারাডোনা কাঁদলেন, আর জার্মানি ট্রফি তুলল।

    ১৯৯৪–এ দেখেছেন আমেরিকার গরমে বদলে যাওয়া ফুটবলের ভাষা। শেষ পর্যন্ত পেনাল্টিতে ইতালির স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার দৃশ্য।

    ১৯৯৮–এ প্যারিসে দেখেছেন তরুণ এক ফরাসি দলের উত্থান। যখন পুরো স্টেডিয়াম জিদানের নামে কাঁপছিল।

    ২০০২–এ এশিয়ার আকাশের নিচে দেখেছেন ব্রাজিলের পুনর্জন্ম। রোনালদো যেন হারানো সময় ফিরে পেয়েছিলেন।

    ২০০৬–এ দেখেছেন বার্লিনের ফাইনাল। এক মহাতারকার বিদায় ফুটবলকে বিষণ্ন করেছিল।

    ২০১০–এ দক্ষিণ আফ্রিকার রাতজাগা ভুভুজেলা আর স্পেনের ধৈর্যের ফুটবল তাকে নতুন এক সৌন্দর্য চিনিয়েছিল।

    ২০১৪–তে রিওর উৎসব আর তার মাঝেই দেখেছেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ভাঙনের একটি। ব্রাজিল–জার্মানির সেই ম্যাচ। তিনি বলছিলেন, প্রথম গোল খাওয়ার পরই তার মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঠিক নেই। ব্রাজিল যেন নিজের ছায়াকেও চিনতে পারছিল না। বিরক্ত হয়ে পাশে বসা মানুষদের বলে ফেলেছিলেন, “আজ ব্রাজিল সাত গোল খাবে।” মিনিটের পর মিনিট যেন সময় থেমে গিয়েছিল। স্কোরবোর্ড বদলাচ্ছিল, মানুষ বদলাচ্ছিল। একসময় আর গোল গোনা হচ্ছিল না, গোনা হচ্ছিল স্তব্ধতা। ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের চোখে পানি, মুখে অবিশ্বাস। কেউ পতাকা দিয়ে মুখ ঢেকেছে, কেউ মাথা নিচু করে বসে আছে।

    তিনি বলছিলেন, জীবনে এত খেলা দেখেও কোনো দেশের ফুটবল হৃদয়কে এভাবে ভেঙে যেতে দেখেননি। যখন সপ্তম গোল হলো, পাশে বসা এক ইতালিয়ান ভদ্রলোক বারবার তার দিকে তাকাচ্ছিলেন। হয়তো ভাবছিলেন, এ মানুষটা কি সত্যিই আগেই জানত।

    তপন চৌধুরী হাসতে হাসতে বলেন, “আমি জ্যোতিষী ছিলাম না। শুধু মনে হয়েছিল ব্রাজিল সেদিন আর মাঠে ছিল না।”

    ২০১৮–তে দেখেছেন নতুন প্রজন্মের উত্থান।

    আর ২০২২–এ কাতারের সেই রাত, যেখানে ফুটবল যেন এক মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় লিখেছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে লিওনেল মেসি ট্রফি তুললেন, আর গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে মানুষ শুধু একটা ম্যাচ দেখেনি। দেখেছিল সময়কে পূর্ণ হতে।

    বিশ্বকাপের সঙ্গে তার সম্পর্ক এরপরও থামেনি। এবারও তিনি বিশ্বকাপে যাচ্ছেন। এটা হবে তার দশম বিশ্বকাপ। একসময় প্রায় প্রতি আসরেই তার সঙ্গে ছেলে কিংবা মেয়ে অথবা পরিবারের কেউ না কেউ থাকত। বিশ্বকাপ ছিল পরিবারেরও উৎসব।

    এবার যাত্রার আগে একটি অনুপস্থিতি তাকে অন্যরকমভাবে স্পর্শ করছে। তার ছেলে ড্যানি আর নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন তাকে। কথা বলতে বলতে থেমে যান তপন চৌধুরী। বলেন, ছেলেটাকে খুব মিস করেন।

    হয়তো এবারও যাওয়ার কথা ছিল। বাবা–ছেলে একসঙ্গে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখতেন। গোল হলে উঠে দাঁড়াতেন, ছবি তুলতেন, তর্ক করতেন, ফিরে এসে রাতভর আলোচনা করতেন। এখন সেই আসন খালি।

    বিশ্বকাপ থেমে থাকে না। জীবনও না। তপন চৌধুরী আবার যাচ্ছেন আরেকটি বিশ্বকাপ দেখতে। এবার তার ব্যাগে থাকবে শুধু টিকিট আর পাসপোর্ট নয়, থাকবে ১৯৮৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত অসংখ্য ফাইনালের আলো, হাজারো গ্যালারির শব্দ, আর এক না–ফেরা সঙ্গীর জন্য গভীর, নীরব এক অপেক্ষা।