আওয়ামীপন্থি পুলিশের কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশে আশ্রয় নিয়ে নানাভাবে পুলিশ বাহিনীকে সরকারের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান ও চাকরিচ্যুত অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম পুলিশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা তৈরির জন্য জুলাই আন্দোলনে পুলিশ হত্যা কার্ড নিয়ে খেলছেন।
আন্দোলনে দেড় হাজার ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও কয়েক হাজার আন্দোলনকারীকে পঙ্গু করে দেওয়া বিষয়টি চেপে গিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীকে পেশাগত দায়িত্ব থেকে সরিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সম্প্রতি বিদেশে বসে দাবি করে তিনি জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন। তার দাবি, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর সমর্থন থাকা রাজনৈতিক দলকে কেবল নিষেধাজ্ঞা বা পুলিশি শক্তি দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ২০২৪ সালের সহিংসতায় কোনো হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়া এবং কিছু থানা ও স্থাপনা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় পুলিশের নিচের পর্যায়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক কাজ করছে বলে তথাকথিত একটি টক শোতে যুক্ত হয়ে মনিরুল ইসলাম দাবি করেন। তিনি বলেন, পুলিশ যখন কেবল ঝটিকা মিছিল ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী আটক করতে তাদের ৯০ শতাংশ মনোযোগ দিচ্ছে, তখন দেশের ক্রাইম কন্ট্রোল ও জঙ্গিবাদবিরোধী কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে। তার এ ধরনের বক্তব্যে পুলিশে থাকা আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের উসকে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা এতে কিছুটা উৎসাহ পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তারা বলছেন, মনিরুলদের এ ধরনের উসকানিমূলক কথাবার্তায় পুলিশ বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বাহিনীর কাজের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ঝটিকা মিছিল ও সমাবেশ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়তা বাড়িয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতে নানাভাবে চেষ্টা করছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে দেশের সীমান্তঘেঁষা জেলাগুলো এবং রাজধানী ঢাকার কয়েকটি স্পটে হঠাৎ ব্যানার নিয়ে কয়েক মিনিটের মহড়া দিয়ে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পুলিশের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে তারা। সাম্প্রতিক সময়ে গুলশান, উত্তরা, পিরোজপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, বরিশাল, বাগেরহাট ও নেত্রকোনার ঝটিকা মিছিল ভাবিয়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। ঝটিকা মিছিল নিয়ে মাঠ পুলিশে কিছুটা আতঙ্কও তৈরি হয়েছে। কারণ পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, কোনো এলাকায় ঝটিকা মিছিল হলে তার দায় এসপি, ডিসি ও ওসিকে নিতে হবে। ইতোমধ্যেই এ বক্তব্যের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যানুযায়ী, আগামী ডিসেম্বর মাসে আওয়ামী লীগ সভাপতি পলাতক ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির গোপন পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন, বিশেষ করে যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কিছু নিষ্ক্রিয় সদস্যকে অর্থায়ন করে এই তৎপরতায় নামানোর চেষ্টা চলছে। এক্ষেত্রে পুলিশের ভেতরে থাকা আওয়ামীপন্থি বেশকিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। এদেরই একজন ক্যান্টনমেন্ট থানার সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ওসি রাকিবুল হাসান। কেবল রাকিবুল একাই নন, তার মতো অনেকেই গোপনে এখনো বিগত শাসকগোষ্ঠীর পুনর্বাসনের আশা প্রকাশ করছেন।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অডিও ক্লিপ ও দিকনির্দেশনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে সরকারের অর্থনৈতিক বা আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সংকটগুলোকে হাইলাইট করে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। দৃশ্যমান কর্মসূচির বদলে ছোট ছোট গ্রুপ বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে যোগাযোগ রেখে কর্মী ভিত্তি টিকিয়ে রাখার কৌশল হাতে নিয়েছে দলটি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকার পুলিশকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে যে ধ্বংসাত্মক অবস্থায় ফেলে গেছে, তার রেশ কাটাতে সময় লাগছে। গত ৫ আগস্টের পর পুলিশের ভেতরের শৃঙ্খলা ও মনোবল পুনর্গঠনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। আন্দোলন চলাকালীন সংঘর্ষে বেশকিছু পুলিশ সদস্য নিহতের ঘটনায় বাহিনীর একাংশের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সুযোগকেও কাজে লাগাতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল এবং পুলিশে থাকা তাদের সহযোগী ও পলাতক সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা। তবে ক্ষোভ থাকলেও পেশাদার পুলিশ বাহিনী কখনো কোনো অপশক্তির পুনর্বাসনে সহযোগী হতে পারে না বলে তারা জানিয়েছেন।
পুলিশের সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, পুলিশ একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। পেশাগত দায়িত্ব পালন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাই পুলিশের মূল কাজ। রাজনৈতিক পক্ষপাত না করে পেশাদারত্বের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। তিনি বলেন, বিগত সময়ে পুলিশে ব্যাপক দলীয়করণ হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল না। অনিয়মের মাধ্যমে দলীয় লোককে সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছিল। সরকারি নির্দেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ বা স্থগিত রয়েছে। তাই তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম করতে না দেওয়া এবং তা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। কোনো পুলিশ সদস্যের রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে কাজ করা উচিত নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের এমন কাজ বাহিনীর মর্যাদা ও দেশের শৃঙ্খলা নষ্ট করে। তাই তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।










